poet
stringclasses 137
values | category
stringclasses 21
values | poem
stringlengths 9
18.7k
|
---|---|---|
অমিতাভ দাশগুপ্ত
|
স্বদেশমূলক
|
বুকের রক্ত মুখে তুলে যারা মরে
ওপারে ঢাকায় এপারের শিলচরে
তারা ভালোবাসা-বাংলাভাষার জুড়ি—
উনিশে মে আর একুশে ফেব্রুয়ারি।সিঁদুর কুড়িয়ে নেওয়া যায় এক আলো
প্রাণের পুণ্যে হয়ে ওঠে জমকালো
সে-আলোয় দেয় মারের সাগর পাড়ি
উনিশে মে আর একুশে ফেব্রুয়ারি।সে-আলো টলে না মৃত্যুর কালো ঝড়ে
তর্জনি তুলে জেগে থাকে ঘরে ঘরে,
দুলিয়ে গলায় তাজা বুলেটের মালা
পার হয়ে শত শ্মশান ও কারবালা
হাজার মুখের মিছুলে দিয়েছে পাড়ি
উনিশে মে আর একুশে ফেব্রুয়ারি।কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন বুকের রক্ত মুখে তুলে যারা মরে
ওপারে ঢাকায় এপারের শিলচরে
তারা ভালোবাসা-বাংলাভাষার জুড়ি—
উনিশে মে আর একুশে ফেব্রুয়ারি।সিঁদুর কুড়িয়ে নেওয়া যায় এক আলো
প্রাণের পুণ্যে হয়ে ওঠে জমকালো
সে-আলোয় দেয় মারের সাগর পাড়ি
উনিশে মে আর একুশে ফেব্রুয়ারি।সে-আলো টলে না মৃত্যুর কালো ঝড়ে
তর্জনি তুলে জেগে থাকে ঘরে ঘরে,
দুলিয়ে গলায় তাজা বুলেটের মালা
পার হয়ে শত শ্মশান ও কারবালা
হাজার মুখের মিছুলে দিয়েছে পাড়ি
উনিশে মে আর একুশে ফেব্রুয়ারি।
|
অমিতাভ দাশগুপ্ত
|
রূপক
|
মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
দুই ঠোঁট ছিঁড়ে নাও,
চোখের কোটর থেকে নীলপদ্ম তুলে নাও,
নিষিদ্ধ দেরাজ থেকে তুলে নাও বক্র ছুরি-ছররা-কার্তুজ।মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
পিকাপে চকিত দেখা রূপস চিতার আলোড়ণে
তোমার শাড়ির ডোরা, হেডলাইট ছুটেছে অস্থির,
ভুটানি মদের গন্ধ খোলা চিলে,
তোমাকে চুম্বন করলে সমুদ্রের নীল জল ভয়ঙ্কর ফুঁসে ওঠে,
খাঁড়ির গর্জনে গ্রীবার সটান ভঙ্গি—
নাভির পাতালে তুমি প্রতি রাত্রে গুম করো একটি যুবক।মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
চোখ দুটো দৃষ্টি রাখছে চোখের ওপর
হাত দুটো দৃষ্টি রাখছে হাতের ওপর
গোপন গহ্বর খুলে উবু হয়ে বের করো রেশমের ফাঁস
তুমি বিশালাক্ষী, তুমি মৃত্যু, নীলতারা,
হঠাৎ সশব্দে ফেটে বুক মুখ জ্বেলে দাও ঈর্ষার অ্যাসিডে!মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
এত সরলতা
স্টোভের বুকের পরে নীল ফুল হয়ে বসে থাকা
লাল রিবনের ঘূর্ণি মহল্লায় মহল্লায় ছোরা-চালাচালি
করুণ শাখার মতো কৃশ হাত কতকাল ছুঁইনি তোমাকে
ঘুমের ভিতরে নির্বাসন-দণ্ড দিইনি তোমাকে
শুয়োরের গন্ধে ম ম শালবন—
খয়েরি ফিতার টানে ছুটে যায় লাটাগুড়ি, চালসা ফরেস্ট।
কিছুটা সময় আরো
রুদ্র সাগরের তেল হু হু করে জ্বলে যাচ্ছে
ত্যাপিটালে শব্দ তুলে কেটে যায় হাজার মাইল
স্টিয়ারিং জেদি ঘোড়া অবাধ্য গিয়ার-বাক্সো ব্রেক ধরছে না . . .এই বেলা
টান টান উঠে এসো,
ঘন ঘন দন্তের পীড়নে
ওষ্ঠপুটে ফোটাও প্রবাল,
এই বেলা
ছোখ মুখ খুবলে নাও
. ট্রিগারে তর্জনি রাখো জ্বালাও মাইন
কিছুটা সময় আরো
মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
. পাঁচ . . .
. চার . . .
. তিন . . .কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
দুই ঠোঁট ছিঁড়ে নাও,
চোখের কোটর থেকে নীলপদ্ম তুলে নাও,
নিষিদ্ধ দেরাজ থেকে তুলে নাও বক্র ছুরি-ছররা-কার্তুজ।মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
পিকাপে চকিত দেখা রূপস চিতার আলোড়ণে
তোমার শাড়ির ডোরা, হেডলাইট ছুটেছে অস্থির,
ভুটানি মদের গন্ধ খোলা চিলে,
তোমাকে চুম্বন করলে সমুদ্রের নীল জল ভয়ঙ্কর ফুঁসে ওঠে,
খাঁড়ির গর্জনে গ্রীবার সটান ভঙ্গি—
নাভির পাতালে তুমি প্রতি রাত্রে গুম করো একটি যুবক।মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
চোখ দুটো দৃষ্টি রাখছে চোখের ওপর
হাত দুটো দৃষ্টি রাখছে হাতের ওপর
গোপন গহ্বর খুলে উবু হয়ে বের করো রেশমের ফাঁস
তুমি বিশালাক্ষী, তুমি মৃত্যু, নীলতারা,
হঠাৎ সশব্দে ফেটে বুক মুখ জ্বেলে দাও ঈর্ষার অ্যাসিডে!মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
এত সরলতা
স্টোভের বুকের পরে নীল ফুল হয়ে বসে থাকা
লাল রিবনের ঘূর্ণি মহল্লায় মহল্লায় ছোরা-চালাচালি
করুণ শাখার মতো কৃশ হাত কতকাল ছুঁইনি তোমাকে
ঘুমের ভিতরে নির্বাসন-দণ্ড দিইনি তোমাকে
শুয়োরের গন্ধে ম ম শালবন—
খয়েরি ফিতার টানে ছুটে যায় লাটাগুড়ি, চালসা ফরেস্ট।
কিছুটা সময় আরো
রুদ্র সাগরের তেল হু হু করে জ্বলে যাচ্ছে
ত্যাপিটালে শব্দ তুলে কেটে যায় হাজার মাইল
স্টিয়ারিং জেদি ঘোড়া অবাধ্য গিয়ার-বাক্সো ব্রেক ধরছে না . . .এই বেলা
টান টান উঠে এসো,
ঘন ঘন দন্তের পীড়নে
ওষ্ঠপুটে ফোটাও প্রবাল,
এই বেলা
ছোখ মুখ খুবলে নাও
. ট্রিগারে তর্জনি রাখো জ্বালাও মাইন
কিছুটা সময় আরো
মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
. পাঁচ . . .
. চার . . .
. তিন . . .
|
অমিতাভ দাশগুপ্ত
|
চিন্তামূলক
|
. এসো।
. ছোঁও।
সম্পূর্ণ পাথর হয়ে গেছি কিনা, দ্যাখো।
পাথরের বুক থেকে মাংস নাও,
পাঁজরের রিডে রিডে চাপ দাও দশটি আঙুলে,
. আমাকে বাজাও তুমি
. বিঠোফেন-বালিকার হাত,
. বলো—
. আমি প্রত্ন নই,
. নই অন্ধ, জমাট খনিজ,
. বলো—সব শেষ নয়,
এখনও আমার কিছু সম্ভাবনা আছে।টিলার ওপরে হা হা সূর্যাস্ত দেখার সাধ
. মেটেনি কুসুম।
ভুল চাওয়া নিয়ে গেছে ভুল সিন্ধু পারে।
সেখানে মুখোশ, পরচুলো
বালির সাদায় ওড়ে দূরতম হাসির মতন,
গাঢ় শোচনার রঙে সন্ধ্যা নামে,
ডেকে ওঠে হাড়গিলে, অসুখী শকুন—
টিলার ওপরে হা হা সূর্যাস্ত দেখার সাধ
. মেটেনি কুসুম।. দ্যাখো,
কতখানি দীন হয়ে গেছি আশায় আশায়
. কত বেশি পেতে চেয়ে
নিজেকে ভেঙেছি অন্ধ, ভ্রুক্ষেপবিহীন,
ছেঁড়া শিমুলের আঁশে উড়িয়েছি সর্বস্ব আমার,
. ‘দাও’ ‘দাও’ হাহাকারে
কখন উঠেছে জেগে বৈজুনাথ—প্রধান চণ্ডাল ;
. সুনীলে পাতালে
. এখন যে দিকে চাও
ব্যথিত প্রশ্নের হাড়, করোটি, কংকাল!. মকরবাহিনী-জলে
পোশাক ভাসিয়ে আজ এসে দাঁড়িয়েছি—
. স্পর্শ করো,
অগ্নিতে সঁপেছি স্বাহা, অহংকার,
. রাখো, ভাঙো মারো,
তুলনামূলক প্রেমে সারারাত জেগে থাক
. আমাদের কাঠ ও করাত,
. আমাকে বাজাও তুমি
. বিঠোফেন-বালিকার হাত।কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন . এসো।
. ছোঁও।
সম্পূর্ণ পাথর হয়ে গেছি কিনা, দ্যাখো।
পাথরের বুক থেকে মাংস নাও,
পাঁজরের রিডে রিডে চাপ দাও দশটি আঙুলে,
. আমাকে বাজাও তুমি
. বিঠোফেন-বালিকার হাত,
. বলো—
. আমি প্রত্ন নই,
. নই অন্ধ, জমাট খনিজ,
. বলো—সব শেষ নয়,
এখনও আমার কিছু সম্ভাবনা আছে।টিলার ওপরে হা হা সূর্যাস্ত দেখার সাধ
. মেটেনি কুসুম।
ভুল চাওয়া নিয়ে গেছে ভুল সিন্ধু পারে।
সেখানে মুখোশ, পরচুলো
বালির সাদায় ওড়ে দূরতম হাসির মতন,
গাঢ় শোচনার রঙে সন্ধ্যা নামে,
ডেকে ওঠে হাড়গিলে, অসুখী শকুন—
টিলার ওপরে হা হা সূর্যাস্ত দেখার সাধ
. মেটেনি কুসুম।. দ্যাখো,
কতখানি দীন হয়ে গেছি আশায় আশায়
. কত বেশি পেতে চেয়ে
নিজেকে ভেঙেছি অন্ধ, ভ্রুক্ষেপবিহীন,
ছেঁড়া শিমুলের আঁশে উড়িয়েছি সর্বস্ব আমার,
. ‘দাও’ ‘দাও’ হাহাকারে
কখন উঠেছে জেগে বৈজুনাথ—প্রধান চণ্ডাল ;
. সুনীলে পাতালে
. এখন যে দিকে চাও
ব্যথিত প্রশ্নের হাড়, করোটি, কংকাল!. মকরবাহিনী-জলে
পোশাক ভাসিয়ে আজ এসে দাঁড়িয়েছি—
. স্পর্শ করো,
অগ্নিতে সঁপেছি স্বাহা, অহংকার,
. রাখো, ভাঙো মারো,
তুলনামূলক প্রেমে সারারাত জেগে থাক
. আমাদের কাঠ ও করাত,
. আমাকে বাজাও তুমি
. বিঠোফেন-বালিকার হাত।
|
অমিতাভ দাশগুপ্ত
|
মানবতাবাদী
|
সব সময় বিপ্লবের কথা না ব’লে
যদি মাঝে মাঝে প্রেমের কথা বলি—
. আমাকে ক্ষমা করবেন, কমরেডস।
সব সময় ইস্তেহার না লিখে
যদি মাঝে মাঝে কবিতা লিখতে চাই—
. আমাকে ক্ষমা করবেন, কমরেডস।
সব সময় দলের কথা না ভেবে
যদি মাঝে মাঝে দেশের কথা ভেবে ফেলি—
. আমাকে ক্ষমা করবেন, কমরেডস।
পাঁচ আর সাত নম্বর ওয়ার্ডে আমাদের ভোট কম ব’লে
সেখানকার মানুষ রাস্তা পাবে কি পাবে না— জানতে চেয়েছিলাম।
আমার জিভ কেটে নেবেন না।
পার্টির ছেলে নয় ব’লে
ইকনমিক্স-এ ফার্স্ট ক্লাস চন্দন
কাজটা পাবে কি পাবে না— বলতে চেয়েছিলাম।
আমার নাক ঘষে দেবেন না।
দাগি বদমায়েশ
আমাদের হয়ে উর্দি বদল করলেই
রেহাই পাবে কি পাবে না— বলতে চেয়েছিলাম।
আমায় জুতোয় মাড়িয়ে যাবেন না।বিশ্বাস করুন কমরেডস
আমি দলছুট নই বিক্ষুব্ধও নই ;
বিশ তিরিশ চল্লিশের গনগনে দিনগুলিতে
কমরেড লেনিন থেকে প্রিয় হো চি মিন
আমাদের যেসব কথা বলেছিলেন,
এই শতকের অন্তিম দশকে দাঁড়িয়ে
আমি স্রেফ সেই কথাগুলো
সেই সব আহত, রক্তিম অথচ একান্ত জরুরি কথাগুলো
আপনাদের সামনে
সরাসরি তুলে ধরতে চাই।
জানতে চাই
অবিশ্বাস আর ঘৃণার
ছোট ছোট জরজা জানালা ভেঙে
আমরা কি একবারের জন্যেও
সেই বিস্তীর্ণ মাঠের ওপর গিয়ে দাঁড়াতে পারি না
যেখানে
সূর্যের আলো
সব জায়গায় সমানভাবে এসে পড়ে ?কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন সব সময় বিপ্লবের কথা না ব’লে
যদি মাঝে মাঝে প্রেমের কথা বলি—
. আমাকে ক্ষমা করবেন, কমরেডস।
সব সময় ইস্তেহার না লিখে
যদি মাঝে মাঝে কবিতা লিখতে চাই—
. আমাকে ক্ষমা করবেন, কমরেডস।
সব সময় দলের কথা না ভেবে
যদি মাঝে মাঝে দেশের কথা ভেবে ফেলি—
. আমাকে ক্ষমা করবেন, কমরেডস।
পাঁচ আর সাত নম্বর ওয়ার্ডে আমাদের ভোট কম ব’লে
সেখানকার মানুষ রাস্তা পাবে কি পাবে না— জানতে চেয়েছিলাম।
আমার জিভ কেটে নেবেন না।
পার্টির ছেলে নয় ব’লে
ইকনমিক্স-এ ফার্স্ট ক্লাস চন্দন
কাজটা পাবে কি পাবে না— বলতে চেয়েছিলাম।
আমার নাক ঘষে দেবেন না।
দাগি বদমায়েশ
আমাদের হয়ে উর্দি বদল করলেই
রেহাই পাবে কি পাবে না— বলতে চেয়েছিলাম।
আমায় জুতোয় মাড়িয়ে যাবেন না।বিশ্বাস করুন কমরেডস
আমি দলছুট নই বিক্ষুব্ধও নই ;
বিশ তিরিশ চল্লিশের গনগনে দিনগুলিতে
কমরেড লেনিন থেকে প্রিয় হো চি মিন
আমাদের যেসব কথা বলেছিলেন,
এই শতকের অন্তিম দশকে দাঁড়িয়ে
আমি স্রেফ সেই কথাগুলো
সেই সব আহত, রক্তিম অথচ একান্ত জরুরি কথাগুলো
আপনাদের সামনে
সরাসরি তুলে ধরতে চাই।
জানতে চাই
অবিশ্বাস আর ঘৃণার
ছোট ছোট জরজা জানালা ভেঙে
আমরা কি একবারের জন্যেও
সেই বিস্তীর্ণ মাঠের ওপর গিয়ে দাঁড়াতে পারি না
যেখানে
সূর্যের আলো
সব জায়গায় সমানভাবে এসে পড়ে ?
|
অমিতাভ দাশগুপ্ত
|
মানবতাবাদী
|
এক‘মেয়েমানুষের মাংস এমনিতেই খেতে খুব স্বাদু,
আর যদি দিশি মদে ভিজিয়ে ভিজিয়ে
হায় হায় ভাবাই যায় না…..
তাছাড়া এখন খুব পড়েছে মরশুম,
ছয় মাসে ছ-ডজন নারীকে কিডন্যাপ করে চাকুমচুকুম
ঢাউস ঢেঁকুর তুলে
‘ক্যায়সা খুশি কি রাত’…..গেয়ে নেচে চলে গেল ঘোর দেশপ্রেম,
দ্যাখো, কি এলেম !!’দুই‘তুই কি আমার বোন ?
তুমি আমার মা ?
মুখে নখের আঁচড় কেন—-উদলা কেন গা ?
গিয়েছিলাম বনে,
বনে ছিল কালকেউটে কামড়াল নির্জনে।
পুতের মত ভায়ের মত পাঁচটি সোনার ছা
আশ মিটিয়ে মাস খেয়েছে উদলা করে গা ।’তিন—- মা কোথায় যাস ?
—- পার্কে।
— সাথে যাবে তোর আর কে ?
— শ্যামের বিধবা বোন।
দরজা ভেজিয়ে পথে নামে মেয়ে,
ডুকরে ওঠে মা — শোন……..
শিস দিয়ে দিয়ে ছিনাল বাতাস বহে যায় শন শন।।’চার‘গাঁ থেকে এসেছে চাষার ঝিয়ারি
ফুটপাতে পাল পাল,
জানে না কোথায় কার পাশে শুলে
হাত ভরে মেলে চাল।’পাঁচ‘মেয়েকে বসিয়ে ফাঁকা মাঠে
বাপ দূরে দাঁতে ঘাস কাটে।
দরের ব্যাপারে টনটনে
কোলাকুলি সেয়ানে সেয়ানে।
দিন রাত বছরে বছরে
তবে না উনুনে হাড়ি চড়ে !’ছয়‘তখন ধূ- ধূ রাত।
ছিটে বেড়ার ঘরের পাশে
সাপের শিসের শব্দ।
বোনের ঘরে গিয়েছিলাম।
বোনের ঘর ফাঁকা।
দিদির ঘরে গিয়েছিলাম।
দিদির ঘর ফাঁকা।
বাপের ঘরে ঢুকেই দেখি,
প্যারালিটিক দুহাতে তাঁর
আঁজলা -ভরা টাকা !’সাত
.
‘তুমি তো নও যাজ্ঞসেনী,
বাঁধবে, বেণী বাঁধবে।
অশ্রু মুছে বাপের ভায়ের
পোয়ের অন্ন রাঁধবে।
কে খায়, তোমায় কে খায়,
রাক্ষসদের মরণ আছে
যজ্ঞিডালের মাথায়।
রাবণবধের তলোয়ারের
দু-কষ বেয়ে মর্চে
অনেক প্রায়শ্চিত্তের পর
ঝরছে—-একটু ঝরছে !’এক‘মেয়েমানুষের মাংস এমনিতেই খেতে খুব স্বাদু,
আর যদি দিশি মদে ভিজিয়ে ভিজিয়ে
হায় হায় ভাবাই যায় না…..
তাছাড়া এখন খুব পড়েছে মরশুম,
ছয় মাসে ছ-ডজন নারীকে কিডন্যাপ করে চাকুমচুকুম
ঢাউস ঢেঁকুর তুলে
‘ক্যায়সা খুশি কি রাত’…..গেয়ে নেচে চলে গেল ঘোর দেশপ্রেম,
দ্যাখো, কি এলেম !!’দুই‘তুই কি আমার বোন ?
তুমি আমার মা ?
মুখে নখের আঁচড় কেন—-উদলা কেন গা ?
গিয়েছিলাম বনে,
বনে ছিল কালকেউটে কামড়াল নির্জনে।
পুতের মত ভায়ের মত পাঁচটি সোনার ছা
আশ মিটিয়ে মাস খেয়েছে উদলা করে গা ।’তিন—- মা কোথায় যাস ?
—- পার্কে।
— সাথে যাবে তোর আর কে ?
— শ্যামের বিধবা বোন।
দরজা ভেজিয়ে পথে নামে মেয়ে,
ডুকরে ওঠে মা — শোন……..
শিস দিয়ে দিয়ে ছিনাল বাতাস বহে যায় শন শন।।’চার‘গাঁ থেকে এসেছে চাষার ঝিয়ারি
ফুটপাতে পাল পাল,
জানে না কোথায় কার পাশে শুলে
হাত ভরে মেলে চাল।’পাঁচ‘মেয়েকে বসিয়ে ফাঁকা মাঠে
বাপ দূরে দাঁতে ঘাস কাটে।
দরের ব্যাপারে টনটনে
কোলাকুলি সেয়ানে সেয়ানে।
দিন রাত বছরে বছরে
তবে না উনুনে হাড়ি চড়ে !’ছয়‘তখন ধূ- ধূ রাত।
ছিটে বেড়ার ঘরের পাশে
সাপের শিসের শব্দ।
বোনের ঘরে গিয়েছিলাম।
বোনের ঘর ফাঁকা।
দিদির ঘরে গিয়েছিলাম।
দিদির ঘর ফাঁকা।
বাপের ঘরে ঢুকেই দেখি,
প্যারালিটিক দুহাতে তাঁর
আঁজলা -ভরা টাকা !’সাত
.
‘তুমি তো নও যাজ্ঞসেনী,
বাঁধবে, বেণী বাঁধবে।
অশ্রু মুছে বাপের ভায়ের
পোয়ের অন্ন রাঁধবে।
কে খায়, তোমায় কে খায়,
রাক্ষসদের মরণ আছে
যজ্ঞিডালের মাথায়।
রাবণবধের তলোয়ারের
দু-কষ বেয়ে মর্চে
অনেক প্রায়শ্চিত্তের পর
ঝরছে—-একটু ঝরছে !’
|
অমিতাভ দাশগুপ্ত
|
প্রেমমূলক
|
মেঘের খোঁপায় ফুটেছে আলোর ফুল,
তোমাকে কি দেব অনন্য উপহার ?
কোন ঘাটে পার
হ’তে চেয়েছিলে খুঁজে অনুকুল হাওয়া,
নাবিক বাছো নি, এ-নৌকো বেয়ে যায় কি সুদূরে যাওয়া
ভাবো নি, নরম অঞ্জলি মেলে ফুল
ভাসালে জোয়ারে রাজহাঁস বলে—সব ভুল, সব ভুল!কেবল কথায় বহে গেল বেলা
জল ঝরে গেল মেঘে,
বুকের গভীরে কি শঙ্কা ছিল জেগে
বলে নি বাচাল মুখ,
কথার সাঁকোয় হৃদয়ের আসা-যাওয়া
হয় নি, সমুত্সুক
অধীরতা প্রাণে এসে ফিরে গেছে পাহাড়তলির হাওয়া।এখন জেনেছো, নীরবতা কত ভালো,
ক্ষীণ সম্বল নিবিড় আঁচলে ঢেকে দিলে, অনুপমা,
বুঝেছ, আমার সকলই চাতুরি, ছল—
জলপ্রপাতে ধাবিত তোমার চোখের তরল ক্ষমা।কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন মেঘের খোঁপায় ফুটেছে আলোর ফুল,
তোমাকে কি দেব অনন্য উপহার ?
কোন ঘাটে পার
হ’তে চেয়েছিলে খুঁজে অনুকুল হাওয়া,
নাবিক বাছো নি, এ-নৌকো বেয়ে যায় কি সুদূরে যাওয়া
ভাবো নি, নরম অঞ্জলি মেলে ফুল
ভাসালে জোয়ারে রাজহাঁস বলে—সব ভুল, সব ভুল!কেবল কথায় বহে গেল বেলা
জল ঝরে গেল মেঘে,
বুকের গভীরে কি শঙ্কা ছিল জেগে
বলে নি বাচাল মুখ,
কথার সাঁকোয় হৃদয়ের আসা-যাওয়া
হয় নি, সমুত্সুক
অধীরতা প্রাণে এসে ফিরে গেছে পাহাড়তলির হাওয়া।এখন জেনেছো, নীরবতা কত ভালো,
ক্ষীণ সম্বল নিবিড় আঁচলে ঢেকে দিলে, অনুপমা,
বুঝেছ, আমার সকলই চাতুরি, ছল—
জলপ্রপাতে ধাবিত তোমার চোখের তরল ক্ষমা।
|
অমিতাভ দাশগুপ্ত
|
মানবতাবাদী
|
ওর মা মরেছে আটষট্টির বন্যায়
বাপ এ সনের খরায়,
ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ
ও যে যমের অরুচি!চরায়-বড়ায় খই ফুটেছে তপ্ত খোলা
পাথর মাটি পাথর,
গোয়ালে গাই বিইয়েছে
তার দুধ বাঁটে নেই এক পো,
পুকুর-নদীর জল শুকিয়ে বাষ্প,
কোলে কলসি, কাঁখে কলসি কাতার কাতার
ছা বৌ জোয়ান মদ্দ ভাতারচলছে চলছে—
এক মূকাভিনয়
তার খেজুরের মাথার ওপর খাঁড়ার মতো দাঁড়িয়ে দ্যাখে
অলপ্পেয়ে সময়।ওর মা মরেছে আটষট্টির বন্যায়
বাপ এ সনের খরায়,
ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ
ও যে যমের অরুচি!লে লে ছে আনা লে যা লিবি ছে আনা
আমি রাজার ভাতিজা—এসেছি সদর থেকে
গাঁও বুড়ো থেকে ঘরের ঝিয়ারি,
বাল-বাচ্চাও শুধোয়—
তুমি কোঁচড়ো এনেছো কি ?
এনেছি—এনেছি প্রতিশ্রুতি।
আমি এনেছি টি আর, জি আর
সেচ প্রকল্প, সার, গোরু,
আমি ছ’হাজার নলকূপে
জলে নদী করে দেব মরু।
এই আমিন, এদিকে এসো,
ওরা যা বলে, সবটা টোকো
খুব ভালো করে মাপো-জোকো
যত দাবি আছে মোটা সরু—
আমি ছ’হাজার নলকূপে
জলে নদী করে দেব মরু।হাড়ের ওপর মাই কামড়ে
টিংটিঙে প্যাকাটি—
ফটো খিঁচুন প্রেস,
মজা পুকুরে পেট ফুলো ঢোল
শ্যামলী ধবলী—
ফটো খিঁচুন প্রেস.
এমন মাটি মায়ের আঁচল
এখন গর্ত-খোদল-ফাটল,
ছাতিফাটার মাঠ
হা হা খিদে দিচ্ছে ঝাঁট,
মুখে মুখোশ এঁটে নিস,
হিস্ হিস্ হিস্ হিস্
জমি-জিরেত জ্বালিয়ে
ধা ধা কালকেউটের বিষ।
হট্ যা হট্ টিয়ে টা
এই সিরিঙ্গী মেয়েটাওর মা মরেছে আটষট্টির বন্যায়
বাপ এ সনের খরায়,
ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ
ও যে যমের অরুচি!কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন ওর মা মরেছে আটষট্টির বন্যায়
বাপ এ সনের খরায়,
ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ
ও যে যমের অরুচি!চরায়-বড়ায় খই ফুটেছে তপ্ত খোলা
পাথর মাটি পাথর,
গোয়ালে গাই বিইয়েছে
তার দুধ বাঁটে নেই এক পো,
পুকুর-নদীর জল শুকিয়ে বাষ্প,
কোলে কলসি, কাঁখে কলসি কাতার কাতার
ছা বৌ জোয়ান মদ্দ ভাতারচলছে চলছে—
এক মূকাভিনয়
তার খেজুরের মাথার ওপর খাঁড়ার মতো দাঁড়িয়ে দ্যাখে
অলপ্পেয়ে সময়।ওর মা মরেছে আটষট্টির বন্যায়
বাপ এ সনের খরায়,
ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ
ও যে যমের অরুচি!লে লে ছে আনা লে যা লিবি ছে আনা
আমি রাজার ভাতিজা—এসেছি সদর থেকে
গাঁও বুড়ো থেকে ঘরের ঝিয়ারি,
বাল-বাচ্চাও শুধোয়—
তুমি কোঁচড়ো এনেছো কি ?
এনেছি—এনেছি প্রতিশ্রুতি।
আমি এনেছি টি আর, জি আর
সেচ প্রকল্প, সার, গোরু,
আমি ছ’হাজার নলকূপে
জলে নদী করে দেব মরু।
এই আমিন, এদিকে এসো,
ওরা যা বলে, সবটা টোকো
খুব ভালো করে মাপো-জোকো
যত দাবি আছে মোটা সরু—
আমি ছ’হাজার নলকূপে
জলে নদী করে দেব মরু।হাড়ের ওপর মাই কামড়ে
টিংটিঙে প্যাকাটি—
ফটো খিঁচুন প্রেস,
মজা পুকুরে পেট ফুলো ঢোল
শ্যামলী ধবলী—
ফটো খিঁচুন প্রেস.
এমন মাটি মায়ের আঁচল
এখন গর্ত-খোদল-ফাটল,
ছাতিফাটার মাঠ
হা হা খিদে দিচ্ছে ঝাঁট,
মুখে মুখোশ এঁটে নিস,
হিস্ হিস্ হিস্ হিস্
জমি-জিরেত জ্বালিয়ে
ধা ধা কালকেউটের বিষ।
হট্ যা হট্ টিয়ে টা
এই সিরিঙ্গী মেয়েটাওর মা মরেছে আটষট্টির বন্যায়
বাপ এ সনের খরায়,
ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ
ও যে যমের অরুচি!
|
অমিতাভ দাশগুপ্ত
|
রূপক
|
মায়ের সঙ্গে ঠোঙা বানায়.,
বিকেলে খেলে খো খো,
বনগাঁ থেকে বার্লিনে যায়,
সাধ্যি থাকে রোখো।
মেয়ের বাবা সকাল-সন্ধে
চৌমাথাতে হকার,
ছোট বোনটি ফাইভে পড়ে,
এখনও দাদা বেকার।
তবুও খো খো খেলুড়ে মেয়ে
লড়ছে এমন লড়াই
তাকে নিয়েই দেশসুদ্ধ
আমজনতার বড়াই।হাত ঝুমঝুম পা ঝুমঝুম
সিয়ারামের খেলা
খেলতে খেলতে সাঁঝের কোলে
গড়িয়ে আসে বেলা,
ভাতের গন্ধে লাফিয়ে ওঠে
খিদের নাড়িভুঁড়ি
বালিকা তবু উজানভরা
স্বপ্ন করে চুরি,
মায়ের সঙ্গে ঠোঙা বানায়,
বিকেলে খেলে খো-খো
খেলার পাতায় সেই মেয়েটির
স্বপ্ন ছেপে রেখো।কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন মায়ের সঙ্গে ঠোঙা বানায়.,
বিকেলে খেলে খো খো,
বনগাঁ থেকে বার্লিনে যায়,
সাধ্যি থাকে রোখো।
মেয়ের বাবা সকাল-সন্ধে
চৌমাথাতে হকার,
ছোট বোনটি ফাইভে পড়ে,
এখনও দাদা বেকার।
তবুও খো খো খেলুড়ে মেয়ে
লড়ছে এমন লড়াই
তাকে নিয়েই দেশসুদ্ধ
আমজনতার বড়াই।হাত ঝুমঝুম পা ঝুমঝুম
সিয়ারামের খেলা
খেলতে খেলতে সাঁঝের কোলে
গড়িয়ে আসে বেলা,
ভাতের গন্ধে লাফিয়ে ওঠে
খিদের নাড়িভুঁড়ি
বালিকা তবু উজানভরা
স্বপ্ন করে চুরি,
মায়ের সঙ্গে ঠোঙা বানায়,
বিকেলে খেলে খো-খো
খেলার পাতায় সেই মেয়েটির
স্বপ্ন ছেপে রেখো।
|
অমিতাভ দাশগুপ্ত
|
মানবতাবাদী
|
কাঁড়া না আকাড়া?
এ-প্রশ্ন বিলাসিতা—
খরার উপোশে ভিক্ষার চাল তুমি।
ওই চাল থেকে ছুটেছে রমনী, ভিক্ষু ও ভিক্ষুক
খুনখারাবির মরীয়া লাল দু চোখে,
বাঁধের কোমরবন্ধ ফাটানো গতির তুমুল বন্যায়
আহা চাল,আহা একমুঠো শাদা চাল
কোথায় লুকোবে বলো,
অন্ধ কয়েদি
সে-ও তো তোমার জন্মের মাটি চেনে।সারারাত ধরে নিখাক শিশুকে ভুলিয়ে
যে-নারী হাড়িতে সেদ্ধ করেছে ভাতের বদলে নুড়ি,
সে তোমাকে চেনে নিজের তালুর মতন।
না খেতে পাওয়ার চিল-চিতকার সইতে না পেরে
যে মরদ কেটে ভাসিয়ে দিয়েছে দুধের বাচ্চা
সে তোমাকে চেনে তাঁর রক্তের মতন।আহা চাল,
তুমি কত মানুষের দীর্ঘশ্বাসে শাপে,
এত তিতকুটে, কালো।
তোমাকে জ্বালিয়ে ভাত করে খাবে বলে
ভাঁটার মতন গনগনে রাগে
যেদিকে তাকাও ছুটেছে লুঠেরা করতল,
কোথায় লুকোবে তুমি?
অন্ধ কয়েদি – সে-ও যে তোমার জন্মের মাটি চেনে।কাঁড়া না আকাড়া?
এ-প্রশ্ন বিলাসিতা—
খরার উপোশে ভিক্ষার চাল তুমি।
ওই চাল থেকে ছুটেছে রমনী, ভিক্ষু ও ভিক্ষুক
খুনখারাবির মরীয়া লাল দু চোখে,
বাঁধের কোমরবন্ধ ফাটানো গতির তুমুল বন্যায়
আহা চাল,আহা একমুঠো শাদা চাল
কোথায় লুকোবে বলো,
অন্ধ কয়েদি
সে-ও তো তোমার জন্মের মাটি চেনে।সারারাত ধরে নিখাক শিশুকে ভুলিয়ে
যে-নারী হাড়িতে সেদ্ধ করেছে ভাতের বদলে নুড়ি,
সে তোমাকে চেনে নিজের তালুর মতন।
না খেতে পাওয়ার চিল-চিতকার সইতে না পেরে
যে মরদ কেটে ভাসিয়ে দিয়েছে দুধের বাচ্চা
সে তোমাকে চেনে তাঁর রক্তের মতন।আহা চাল,
তুমি কত মানুষের দীর্ঘশ্বাসে শাপে,
এত তিতকুটে, কালো।
তোমাকে জ্বালিয়ে ভাত করে খাবে বলে
ভাঁটার মতন গনগনে রাগে
যেদিকে তাকাও ছুটেছে লুঠেরা করতল,
কোথায় লুকোবে তুমি?
অন্ধ কয়েদি – সে-ও যে তোমার জন্মের মাটি চেনে।
|
অমিতাভ দাশগুপ্ত
|
স্বদেশমূলক
|
যত দূরেই যাচ্ছি
. তোদের পায়ের শব্দ পাচ্ছি।
তোরা আমার সঙ্গ ছাড়িস না,
আঁচল পেতে আছেন বসে
. ঐ আমাদের মা,
একজোটে ঐ দুঃখিনীটির ঘরের দাওয়ায় যাবো
. খুঁদকুড়ো যা পাই, সব্বাই খাবো।মাটি এখন জংলা
ঐখানে ঠায় আছেন বসে
. দুঃখিনী মা বাংলা,
মায়ের দুধের মতন সরল ভাষা,
এবার থেকে হোক আমাদের নিত্যি যাওয়া-আসা।
. যাচ্ছি মানে আসছি
দূর থেকে কার পায়ের শব্দ শ্রবণে টের পাচ্ছি।যতই আকাশ গর্জায়,
তোদের আমার অস্থি মাংস মজ্জায়
ফিনিক দিয়ে উঠছে তবু
. বুকের বাংলা ভাষা—
এবার থেকে ঐখানে হোক নিত্যি যাওয়া-আসা।কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন যত দূরেই যাচ্ছি
. তোদের পায়ের শব্দ পাচ্ছি।
তোরা আমার সঙ্গ ছাড়িস না,
আঁচল পেতে আছেন বসে
. ঐ আমাদের মা,
একজোটে ঐ দুঃখিনীটির ঘরের দাওয়ায় যাবো
. খুঁদকুড়ো যা পাই, সব্বাই খাবো।মাটি এখন জংলা
ঐখানে ঠায় আছেন বসে
. দুঃখিনী মা বাংলা,
মায়ের দুধের মতন সরল ভাষা,
এবার থেকে হোক আমাদের নিত্যি যাওয়া-আসা।
. যাচ্ছি মানে আসছি
দূর থেকে কার পায়ের শব্দ শ্রবণে টের পাচ্ছি।যতই আকাশ গর্জায়,
তোদের আমার অস্থি মাংস মজ্জায়
ফিনিক দিয়ে উঠছে তবু
. বুকের বাংলা ভাষা—
এবার থেকে ঐখানে হোক নিত্যি যাওয়া-আসা।
|
অমিতাভ দাশগুপ্ত
|
রূপক
|
সরলের মধ্যে আছে কত মারাত্মক প্রতারণা,
যখন তা জানা যায়–
বড় বেশি দেরি হয়ে গেছে।
ঐ গ্রীক নাক নিয়ে বিনয়ে সন্নত
যে-যুবক বসেছে সামনে,
নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে কত তীব্র আর্সেনিক,
যখন তা বোঝা যায়–
সারা দেহ নীল হয়ে গেছে।
নীলের কাঙাল তুমি?
নদী দ্যাখো, সাঁতারে যেয়ো না,
ওর বুকে কমপক্ষে
গোটাকুড়ি নৌকাডুবি আছে।
|
অমিতাভ দাশগুপ্ত
|
রূপক
|
তুই সেই শেষ ঘোড়া
যার ওপর আমার সর্বস্ব বাজি ধরেছি।একত্রিশ বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে
এ আমার স্পেকুলেশন।
তোমার ডাইনে সুইট ফায়ার,
বাঁয়ে ব্লিডিং হার্ট,
এক কদম পিছনে প্রিন্স কাজু,
নেক-টু-নেক ফুলমালা—
আমার একত্রিশ বছরের সুখদুঃখ
একত্রিশ বছরের চাপা ব্যর্থতাকে অধীর ক’রে তুমি ছুটছো।
হোয়াইট স্ট্যাণ্ডে বায়নাকুলার ভেঙে লাফিয়ে উঠি।
কনুয়ের ধাক্কায় উল্টে যায় জগত্সংসার।
তোমার পাঁজরের পিসটনে আমার হাঁফ্ সে ওঠা বুক
তোমার ছুটন্ত ধমনীতে আমার টালমাটাল রক্ত,
তোমার প্রতিটি গ্যালপে আমার বাদামি উরুর জলোচ্ছাস—
তোমার অসহ তারুণ্য খানিকটা খিমচে নিয়েছে আমার বয়স।ভরাডুবির সময় তুমি লাল বয়া,
থৈ থৈ জলের ওপর পেট্রলের আগুন-জ্বালা হারেম-সুন্দরী,
মরিয়াপানার ল্যাসো দিয়ে
. চম্বলের জঙ্গল থেকে বেঁধে আনা বেওকুফ, বাত্তামিজ ঘোড়া,
কদমের চকমকিতে ফুটেছে লাল নীল ফুল,
ডাইনে হেলো না বাঁয়ে ঝুঁকো না—
ট্রাক সামাল রাখ।পথ ভুল হলেই,
ফেন্সের ওপর রাফেল উঁচিয়ে আছে তোমার মরণ,
পথ ভুল হলেই
আস্তিনে লুকানো বক্র ছুরিতে ওঁৎ পেতে আছে তোমার মরণ,
কাঙাল হয়ে দাবি জানাই,
সম্রাট হয়ে পদাঘাত করি—
উইন চাই, উইন।তোমার ডাইনে সুইট ফায়ার বাঁয়ে ব্লিডিং হার্ট,
এক কদম পিছনে প্রিন্স কাজু নেক-টু-নেক ফুলমালা,
মনে রেখো,
তুমি সেই শেষ ঘোড়া
যার ওপর আমার সর্বস্ব বাজি ধরেছি।কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন তুই সেই শেষ ঘোড়া
যার ওপর আমার সর্বস্ব বাজি ধরেছি।একত্রিশ বছরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে
এ আমার স্পেকুলেশন।
তোমার ডাইনে সুইট ফায়ার,
বাঁয়ে ব্লিডিং হার্ট,
এক কদম পিছনে প্রিন্স কাজু,
নেক-টু-নেক ফুলমালা—
আমার একত্রিশ বছরের সুখদুঃখ
একত্রিশ বছরের চাপা ব্যর্থতাকে অধীর ক’রে তুমি ছুটছো।
হোয়াইট স্ট্যাণ্ডে বায়নাকুলার ভেঙে লাফিয়ে উঠি।
কনুয়ের ধাক্কায় উল্টে যায় জগত্সংসার।
তোমার পাঁজরের পিসটনে আমার হাঁফ্ সে ওঠা বুক
তোমার ছুটন্ত ধমনীতে আমার টালমাটাল রক্ত,
তোমার প্রতিটি গ্যালপে আমার বাদামি উরুর জলোচ্ছাস—
তোমার অসহ তারুণ্য খানিকটা খিমচে নিয়েছে আমার বয়স।ভরাডুবির সময় তুমি লাল বয়া,
থৈ থৈ জলের ওপর পেট্রলের আগুন-জ্বালা হারেম-সুন্দরী,
মরিয়াপানার ল্যাসো দিয়ে
. চম্বলের জঙ্গল থেকে বেঁধে আনা বেওকুফ, বাত্তামিজ ঘোড়া,
কদমের চকমকিতে ফুটেছে লাল নীল ফুল,
ডাইনে হেলো না বাঁয়ে ঝুঁকো না—
ট্রাক সামাল রাখ।পথ ভুল হলেই,
ফেন্সের ওপর রাফেল উঁচিয়ে আছে তোমার মরণ,
পথ ভুল হলেই
আস্তিনে লুকানো বক্র ছুরিতে ওঁৎ পেতে আছে তোমার মরণ,
কাঙাল হয়ে দাবি জানাই,
সম্রাট হয়ে পদাঘাত করি—
উইন চাই, উইন।তোমার ডাইনে সুইট ফায়ার বাঁয়ে ব্লিডিং হার্ট,
এক কদম পিছনে প্রিন্স কাজু নেক-টু-নেক ফুলমালা,
মনে রেখো,
তুমি সেই শেষ ঘোড়া
যার ওপর আমার সর্বস্ব বাজি ধরেছি।
|
মুকুন্দরাম চক্রবর্তী
|
গীতিগাথা
|
দূর হৈতে ফুল্লরা বীরের পাল্য সাড়া |
সম্ভ্রমে বসিতে দিল হরিণের ছড়া ||
বোঁচা নারিকেলের পুরিয়া দিল জল |
করিল ফুল্লরা তবে ভোজনের স্থল |
চরণ পাখালি বীর জল দিল মুখে |
ভোজন করিতে বৈসে মনের কৌতুকে ||
সম্ভ্রমে ফুল্লরা পাতে মাটিয়া পাথরা |
ব্যঞ্জনের তরে দিলা নূতন খাপরা |
মোচড়িয়া গোঁফ দুটা বান্ধিলেন ঘাড়ে |
এক শ্বাসে সাত হাড়ি আমানি উজাড়ে ||
চারি হাড়ি মহাবীর খায় খুদ জাউ,
ছয় হান্ডি মুসুরি সুপ মিশ্যা তথি লাউ |
ঝুড়ি দুই তিন খায় আলু ওল পোড়া |
কচুর সহিত খায় করঞ্জা আমড়া ||
অম্বল খাইয়া বীর বনিতারে পুছে,
রন্ধন করাছ ভালো আর কিছু আছে |
এন্যাছি হরিণী দিয়া দধি এক হাড়ি ,
তাহা দিয়া অন্ন বীর খায় তিন হাড়ি |
শয়ন কুতসিত বীরের ভোজন বিটকাল,
গ্রাসগুলি তোলে যেন তে আটিয়া তাল ||
ভোজন করিয়া সাঙ্গ কৈল আচমন,
হরীতকী খায়্যা কৈল মুখের শোধন |
নিশাকাল হৈল বীর করিলা শয়নে,
নিবেদিল পশূগণ রাজার চরণে |
অভয়ার চরণে মজুক নিজ চিত,
শ্রীকবিকঙ্কণ গান মধুর সংগীত |
|
মুকুন্দরাম চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
‘পউষের প্রবল শীত সুখী যেজন।তুলি পাড়ি আছারি শীতের নিবারণ ॥ফুল্লরার কত আছে কর্মের বিপাক।মাঘ মাসে কাননে তুলিতে নাহি শাক ॥’
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
চেয়ে দেখ, চলিছেন মৃদে অস্তাচলে
দিনেশ, ছড়ায়ে স্বর্ণ, রত্ন রাশি রাশি
আকাশে। কত বা যত্নে কাদম্বিনী আসি
ধরিতেছে তা সবারে সুনীল আঁচলে! –
কে না জানে অলঙ্কারে অঙ্গনা বিলাসী?
অতি-ত্বরা গড়ি ধনী দৈব-মায়া-বলে
বহুবিধ অলঙ্কার পরিবে লো হাসি,—
কনক-কঙ্কণ হাতে, স্বর্ণ-মালা গলে!
সাজাইবে গজ, বাজী; পৰ্ব্বতের শিরে
সুবর্ণ কিরীট দিবে; বহাবে অম্বরে
নদস্রোতঃ, উজ্জ্বলিত স্বর্ণবর্ণ নীরে!
সুবর্ণের গাছ রোপি, শাখার উপরে
হেমাঙ্গ বিহঙ্গ থোবে। –এ বাজী করি রে
শুভ ক্ষণে দিনকর কর-দান করে।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
ফিরাইলা বনপথে অতি ক্ষুণ্ণ মনে
সুরথী লক্ষ্মণ রথ, তিতি চক্ষুঃ-জলে ;----
উজলিল বন-রাজী কনক কিরণে
স্যন্দন, দিনেন্দ্র যেন অস্তের অচলে।
নদী-পারে একাকিনী সে বিজন বনে
দাঁড়ায়ে, কহিলা সতী শোকের বিহ্বলে ;---
“ত্যজিলা কি, রঘু-রাজ, আজি এই ছলে
চির জন্যে জানকীরে?হে নাথ!কেমনে---
কেমনে বাঁচিবে দাসী ও পদ-বিরহে?
কে, কহ, বারিদ-রূপে, স্নেহ-বারি দানে,
( দাবানল-রূপে যবে দুখানল দহে )
জুড়াবে,হে রঘুচূড়া,এ পোড়া পরাণে?
নীরবিলা ধীর সাধ্বী;ধীরে যথা রহে
বাহ্য-জ্ঞান-শূন্য মূর্ত্তি,নির্ম্মিত পাষাণে!
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
চল যাই, জয়দেব, গোকুল-ভবনে
তব সঙ্গে, যথা রঙ্গে তমালের তলে
শিখীপুচ্ছ-চূড়া শিরে, পীতধড়া গলে
নাচে শ্যাম, বামে রাধা— সৌদামিনী ঘনে!
না পাই যাদবে যদি, তুমি কুতূহলে
পূরিও নিকুঞ্জরাজী বেণুর স্বননে।
ভুলিবে গোকুল-কুল এ তোমার ছলে,—
নাচিবে শিখিনী সুখে, গাবে পিকগণে,—
বহিবে সমীর ধীরে সুস্বর-লহরী,—
মৃদুতর কলকলে কালিন্দী আপনি
চলিবে। আনন্দে শুনি সে মধুর ধ্বনি,
ধৈরজ ধরি কি রবে ব্রজের সুন্দরী?
মাধবের রব, কবি, ও তব বদনে,
কে আছে ভারতে ভক্ত নাহি ভাবে মনে?(চতুদ্দর্শপদী কবিতাবলী)
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
হুহুঙ্কারি টঙ্কারিলা ধনুঃ ধনুর্দ্ধারী
ধনঞ্জয়,মৃত্যুঞ্জয় প্রলয়ে যেমতি!
চৌদিকে ঘেরিল বীরে রথ সারি সারি,
স্থির বিজলীর তেজঃ,বিজলীর গতি!---
শর-জালে শূর-ব্রজে সহজে সংহারি
শূরেন্দ্র,শোভিলা পূনঃ যথা দিনপতি
প্রখর কিরণে মেঘে খ-মুখে নিবারি,
শোভেন অম্লানে নভে।উত্তরের প্রতি
কহিলা আনন্দে বলী;---''চালাও স্যন্দনে
বিরাট-নন্দন,দ্রুতে,যথা সৈন-দলে
লুকাইছে দুর্য্যোধন হেরি মোরে রণে,
তেজস্বী মৈনাক যথা সাগরের জলে
বজ্রাগ্নির কাল তেজে ভয় পেয়ে মনে।---
দণ্ডিব প্রচণ্ডে দুষ্টে গাণ্ডীবের বলে।''
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
কমলে কামিনী আমি হেরিনু স্বপনে
কালিদহে। বসি বামা শতদল-দলে
(নিশীথে চন্দ্রিমা যথা সরসীর জলে
মনোহরা।) বাম করে সাপটি হেলনে
গজেশে, গ্রাসিছে তারে উগরি সঘনে
গুঞ্জরিছে অলিপুঞ্জ অন্ধ পরিমলে,
বহিছে দহের বারি মৃদু কলকলে!---
কার না ভোলে রে মনঃ, এহেন ছলনে!
কবিতা-পঙ্কজ-রবি, শ্রীকবিকঙ্কণ,
ধন্য তুমি বঙ্গভূমে! যশঃ-সুধাদানে
অমর করিলা তোমা অমরকারিণী
বাগ্দেবী! ভোগিলা দুখ জীবনে, ব্রাহ্মণ,
এবে কে না পূজে তোমা, মজি তব গানে?---
বঙ্গ-হৃদ-হ্রদে চণ্ডী কমলে কামিনী॥
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
নিত্য তোমা হেরি প্রাতে ওই গিরি-শিরে
কি হেতু, কহ তা মোরে, সুচারু-হাসিনি ?
নিত্য অবগাহি দেহ শিশিরের নীরে,
দেও দেখা, হৈমবতি, থাকিতে যামিনী।
বহে কলকল রবে স্বচ্ছ প্রবাহিণী
গিরি-তলে ; সে দর্পণে নিরখিতে ধীরে
ও মুখের আভা কি লো, আইস, কামিনি,
কুসুম-শয়ন থুয়ে সুবর্ণ মন্দিরে?—
কিম্বা, দেহ কারাগার তেয়াগি ভূতলে,
স্নেহ-কারী জন-প্রাণ তুমি দেব-পুরে,
ভাল বাসি এ দাসেরে, আইস এ ছলে
হৃদয় আঁধার তার খেদাইতে দূরে ?
সত্য যদি, নিত্য তবে শোভ নভস্তলে,
জুড়াও এ আঁখি দুটি নিত্য নিত্য ঊরে।।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
চিন্তামূলক
|
আশার ছলনে ভুলি কী ফল লভিনু, হায়,
তাই ভাবি মনে?
জীবন-প্রবাহ বহি কাল-সিন্ধু পানে যায়,
ফিরাবো কেমনে?
দিন-দিন আয়ুহীন হীনবল দিন-দিন ,--
তবু এ আশার নেশা ছুটিল না ? এ কি দায়!রে প্রমত্ত মন মম! কবে পোহাইবে রাতি?
জাগিবি রে কবে?
জীবন-উদ্যানে তোর যৌবন-কুসুম-ভাতি
কত দিন র'বে?
নীরবিন্ধু, দূর্বাদলে, নিত্য কিরে ঝলঝলে?
কে না জানে অম্বুবিম্ব অম্বুমুখে সদ্যঃপাতি?নিশার স্বপন-সুখে সুখী যে কী সুখ তার?
জাগে সে কাঁদিতে!
ক্ষণপ্রভা প্রভা-দানে বাড়ায় মাত্র আঁধার
পথিকে ধাঁদিতে!
মরীচিকা মরুদেশে, নাশে প্রাণ তৃষাক্লেশে--
এ তিনের ছল সম ছল রে এ কু-আশার।প্রেমের নিগড় গড়ি পরিলি চরণে সাধে
কী ফল লভিলি?
জ্বলন্ত-পাবক-শিখা-লোভে তুই কাল ফাঁদে
উড়িয়া পড়িলি
পতঙ্গ যে রঙ্গে ধায়, ধাইলি, অবোধ, হায়
না দেখলি না শুনিলি, এবে রে পরাণ কাঁদেবাকি কি রাখিলি তুই বৃথা অর্থ-অন্বেষণে,
সে সাধ সাধিতে?
ক্ষত মাত্র হাত তোর মৃণাল-কণ্টকগণে
কমল তুলিতে
নারিলি হরিতে মণি, দংশিল কেবল ফণী
এ বিষম বিষজ্বালা ভুলিবি, মন, কেমনে!যশোলাভ লোভে আয়ু কত যে ব্যয়িলি হায়,
কব তা কাহারে?
সুগন্ধ কুসুম-গন্ধে অন্ধ কীট যথা ধায়,
কাটিতে তাহারে?
মাৎসর্য-বিষদশন, কামড়ে রে অনুক্ষণ!
এই কি লভিলি লাভ, অনাহারে, অনিদ্রায়?মুকুতা-ফলের লোভে, ডুবে রে অতল জলে
যতনে ধীবর,
শতমুক্তাধিক আয়ু কালসিন্ধু জলতলে
ফেলিস, পামর!
ফিরি দিবি হারাধন, কে তোরে, অবোধ মন,
হায় রে, ভুলিবি কত আশার কুহক-ছলে!
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
দুই মত্ত হস্তী যথা ঊর্দ্ধশুণ্ড করি,
রকত-বরণ আঁখি,গরজে সঘনে,---
ঘুরায়ে ভীষণ গদা শূন্যে,কাল রণে,
গরজিলা দুর্য্যোধন,গরজিলা অরি
ভীমসেন।ধূলা-রাশি,চরণ-তাড়নে
উড়িল;অধীরে ধরা থর থর থরি
কাঁপিলা;---টলিল গিরি সে ঘন কম্পনে;
উথলিল দ্বৈপায়নে জলের লহরী,
ঝড়ে যেন!যথা মেঘ,বজ্রানলে ভরা,
বজ্রানলে ভরা মেঘে আঘাতিলে বলে,
উজলি চৌদিক তেজে বাহিরায় ত্বরা
বিজলী;গদায় গদা লাগি রণ-স্থলে,
উগরিল অগ্নি-কণা দরশন-হরা!
আতঙ্কে বিহঙ্গ-দল পড়িল ভূতলে।।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
নীতিমূলক
|
গদা সদা নামে
কোন এক গ্রামে
ছিল দুই জন।
দূর দেশে যাইতে হইল;
দুজনে চলিল।
ভয়ানক পথ—পাশে পশু ফণী বন,
ভল্লুক শার্দ্দূল তাহে গর্জ্জে অনুক্ষণ।
কালসর্প যেমতি বিবরে,
তস্কর লুকায়ে থাকে গিরির গহ্বরে;
পথিকের অর্থ অপহরে,
কখন বা প্রাণনাশ করে।
কহে সদা গদারে আহ্বানি
কর কিরা পর্শি মোর পাণি
ধৰ্ম্মে সাক্ষী মানি,
আজি হতে আমরা দুজন
হ’নু একপ্রাণ একমন,—
সিন্ধু উপসুন্দ যথা—জান সে কাহিনী।
আমার মঙ্গল যাহে,
তোমার মঙ্গল তাহে,
কবচে ভেদিলে বাণ, বক্ষ ক্ষত যথা,
অমঙ্গলে অমঙ্গল উভয়ের তথা।
কহে গদা ধর্ম্ম সাক্ষী করি,
কিরা মোর তব কর ধরি,
একাত্মা আমরা দোঁহে কি বাঁচি কি মরি।
এইরূপে মৈত্র অালাপনে
মনানন্দে চলিলা দুজনে।
সতর্ক রক্ষকরূপে সদা গদা যেন
বন পাশে একদৃষ্টে চাহে অনুক্ষণ,
পাছে পশু সহসা করয়ে আক্রমণ।
গদা চারি দিকে চায়,
এরূপে উভয়ে যায়;
দেখে গদা সম্মুখে চাহিয়া
থল্যে এক পথেতে পড়িয়া।
দৌড়ে মূঢ় থল্যে তুলি
হেরে কুতূহলে খুলি
পূর্ণ থল্যে সুবর্ণমুদ্রায়,
তোলা ভার, এত ভারি তায়।
কহে গদা সহাস বদনে
করেছিনু যাত্রা আজি আতি শুভক্ষণে
আমরা দুজনে।
‘দুজনে?’ কহিল সদা রাগে,
‘লোভে কি করিস্ তুই এ অর্থের ভাগে?
মোর পূর্ব্ব পুণ্যফলে
ভাগ্যদেবী এই ছলে
মোরে অর্থ দিলা।
পাপী তুই, অংশ তোরে
কেন দিব, ক’ তা মোরে
এ কি বাললীলা?
রবির করের রাশি পরশি রতনে
বরাঙ্গের অাভা তার বাড়ায় যতনে;
কিন্তু পড়ি মাটির উপরে
সে কর কি কোন ফল ধরে?
সৎ যে তাহার শোভা ধনে,
অসৎ নিতান্ত তুই, জনম কুক্ষণে।
এই কয়ে সদানন্দ থল্যে তুলে লয়ে
চলিতে লাগিলা সুখে অগ্রসর হয়ে।
বিস্ময়ে অবাক্ গদা চলিল পশ্চাতে,---
বামন কি কভু পায় চারু চাঁদে হাতে?
এই ভাবি অতি ধীরে ধীরে
গেল গদা তিতি অশ্রুনীরে।
দুই পাশে শৈলকুল ভীষণ-দর্শন,
শৃঙ্গ যেন পরশে গগন।
গিরিশিরে বরষায় প্রবলা যেমতি
ভীমা স্রোতস্বতী,
পথিক দুজনে হেরি তস্করের দল
নাবি নীচে করি কোলাহল
উভে আক্রমিল।
সদা অতি কাতরে কহিল,---
শুন ভাই, পঞ্চালে যেমতি,
বিষ্ণু রথিপতি,
জিনি লক্ষ রাজে শূর কৃষ্ণায় লভিলা,
মার চোরে করি রণ-লীলা।
হিসাবে করিয়া আঁটাআঁটি,
এই ধন নিও পরে বাঁটি
তস্করদলের মাথা কাটি।
কহে গদা, পাপী অামি, তুমি সৎজন,
ধর্ম্মবলে নিজধন করহ রক্ষণ।
তস্কর-কুল-ঈশ্বরে
কহিল সে যোড় করে,
অধিপতি ওই জন ভাই,
সঙ্গী মাত্র অামি ওর, ধর্ম্মের দোহাই।
সঙ্গী মাত্র যদি তুই, যা চলি বর্ব্বর,
নতুবা ফেলিব কাটি, কহিল তস্কর।
ফাঁদে বাঁধা পাখী যথা পাইলে মুকতি,
উড়ি যায় বায়ুপথে অতি দ্রুতগতি,
গদা পলাইল।
সদানন্দ নিরানন্দে বিপদে পড়িল।
অালোক থাকিতে তুচ্ছ কর তুমি যারে,
বঁধু কি তোমার কভু হয় সে আঁধারে?
এই উপদেশ কবি দিলা এ প্রকারে।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
আকাশ-পরশী গিরি দমি গুণ-বলে,
নিৰ্ম্মিল মন্দির যারা সুন্দর ভারতে ;
তাদের সন্তান কি হে আমরা সকলে ?—
আমরা,—দুর্ব্বল, ক্ষীণ, কুখ্যাত জগতে,
পরাধীন, হা বিধাতঃ, আবদ্ধ শৃঙ্খলে?—
কি হেতু নিবিল জ্যোতিঃ মণি, মরকতে,
ফুটিল ধুতুরা ফুল মানসের জলে
নির্গন্ধে ? কে কবে মোরে ? জানিব কি মতে
বামন দানব-কুলে, সিংহের ঔরসে
শৃগাল কি পাপে মোরা কে কবে আমারে?
রে কাল, পূরিবি কি রে পুনঃ নব রসে
রস-শূন্য দেহ তুই ? অমৃত-আসারে
চেতাইবি মৃত-কল্পে ? পুনঃ কি হরষে,
শুক্লকে ভারত-শশী ভাতিবে সংসারে ?
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
নিজাগারে ছিল মোর অমূল্য রতন
অগণ্য ; তা সবে আমি অবহেলা করি,
অর্থলোভে দেশে দেশে করিনু ভ্রমণ,
বন্দরে বন্দরে যথা বাণিজ্যের তরী |
কাটাইনু কতকাল সুখ পরিহরি,
এই ব্রতে, যথা তপোবনে তপোধন,
অশন, শয়ন ত্যাজে, ইষ্টদেবে স্মরি,
তাঁহার সেবায় সদা সঁপি কায় মন |
বঙ্গকুল-লক্ষ্মী মোরে নিশার স্বপনে
কহিলা-- 'হে বত্স, দেখি তোমার ভকতি,
সুপ্রসন্ন তব প্রতি দেবী সরস্বতী!
নিজ গৃহে ধন তব, তবে কি কারণে
ভিখারী তুমি হে আজি, কহ ধন-পতি?
কেন নিরানন্দ তুমি আনন্দ-সদনে?'
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
কাহিনীকাব্য
|
মহানন্দে সুন্দ উপসুন্দাসুর বলী
অমরারি, তুষি যত দৈত্যকুলেশ্বরে
মধুর সম্ভাষে, এবে, সিংহাসন ত্যজি,
উঠিলা,--কুসুমবনে ভ্রমণ প্রয়াসে,
একপ্রাণ দুই ভাই--বাগর্থ যেমতি!
'হে দানব' আরম্ভিলা নিকুম্ভ-কুমার
সুন্দ,--'বীরদলশ্রেষ্ঠ, অমরমর্দ্দন,
যার বাহু-পরাক্রমে লভিয়াছি আমি
ত্রিদিব-বিভব ; শুন, হে সুরারি রথী-
ব্যূহ, যার যাহা ইচ্ছা, সেই তাহা কর |
চিরবাদী রিপু এবে জিনিয়া বিবাদে
ঘোরতর পরিশ্রমে, আরাম সাধনে
মন রত কর সবে |' উল্লাসে দনুজ,
শুনি দনুজেন্দ্র-বাণী, অমনি নাদিল |
সে ভৈরব-রবে ভীত আকাশ-সম্ভবা
প্রতিধ্বনি পলাইলা রড়ে ; মূর্ছা পায়ে
খেচর, ভূচর সহ, পড়িল ভূতলে |
থরথরি গিরিবর বিন্ধ্য মহামতি
কাঁপিলা, কাঁপিলা ভয়ে বসুধা সুন্দরী |
দূর কাম্যবনে যথা বসেন বাসব,
শুনি সে ঘোর ঘর্ঘর, ত্রস্ত হয়ে সবে,
নীরবে এ ওঁর পানে লাগিলা চাহিতে |
চারি দিকে দৈত্যদল চলিলা কৌতুকে,
যথা শিলীমুখ-বৃন্দ, ছাড়ি মধুমতী-
পুরী উড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে আনন্দে গুঞ্জরি
মধুকালে, মধুতৃষা তুষিতে কুসুমে |
মধুকুঞ্জে বামাব্রজরঞ্জন দুজন
ভ্রমিলা, অশ্বিনী-পুত্র-যুগ সম রূপে
অনুপম ; কিম্বা যথা পঞ্চবটি-বনে
রাম রামানুজ, --যবে মোহিনী রাক্ষসী
সূর্পনখা হেরি দোঁহে, মাতিল মদনে!
ভ্রমিতে ভ্রমিতে দৈত্য আসি উতরিলা
যথায় ফুলের মাঝে বসে একাকিনী
তিলোত্তমা | সুন্দ পানে চাহিয়া সহসা
কহে উপসুন্দাসুর,-- 'কি আশ্চর্য্য, দেখ--
দেখ, ভাই, পূর্ণ আজি অপূর্ব সৌরভে
বনরাজী! বসন্ত কি আবার আইল?
আইস দেখি কোন্ ফুল ফুটি আমোদিছে
কানন?' উত্তরে হাসি সুন্দাসুর বলী,--
'রাজ-সুখে সুখী প্রজা ; তুমি, আমি, রথি,
সসাগরা বসুধারে দেবালয় সহ
ভুজবলে জিনি, রাজা ; আমাদের সুখে
কেন না সুখিনী হবে বনরাজী আজি?'
এইরূপে দুইজন ভ্রমিলা কৌতুকে,
না জানি কালরূপিণী ভুজঙ্গিনী রূপে
ফুটিছে বনে সে ফুল, যার পরিমলে
মত্ত এবে দুই ভাই, হায় রে, যেমতি
বকুলের বাসে অলি মত্ত মধুলোভে!
বিরাজিছে ফুলকুল-মাঝে একাকিনী
দেবদূতী, ফুলকুল-ইন্দ্রাণী যেমতি
নলিনী! কমল-করে আদরে রূপসী
ধরে যে কুসুম, তার কমনীয় শোভা
বাড়ে শতগুণ, যথা রবির কিরণে
মণি-আভা! একাকিনী বসিয়া ভাবিনী,
হেন কালে উতরিলা দৈত্যদ্বয় তথা |
চমকিলা বিধুমুখী দেখিয়া সম্মুখে
দৈত্যদ্বয়ে, যথা যবে ভোজরাজবালা
কুন্তী, দুর্ব্বাসার মন্ত্র জপি সুবদনা,
হেরিলা নিকটে হৈম-কিরীটী ভস্করে!
বীরকুল-চূড়ামণি নিকুম্ভ-নন্দন
উভে ; ইন্দ্রসম রূপ--অতুল ভূবনে |
হেরি বীরদ্বয়ে ধনী বিস্ময় মানিয়া
একদৃষ্টে দোঁহা পানে লাগিলা চাহিতে,
চাহে যথা সূর্য্যমুখী সে সূর্য্যের পানে!
'কি আশ্চর্য্য! দেখ, ভাই,' কহিল শূরেন্দ্র
সুন্দ ; 'দেখ চাহি, ওই নিকুঞ্জ-মাঝারে |
উজ্জ্বল এ বন বুঝি দাবাগ্নিশিখাতে
আজি ; কিম্বা ভগবতী আইলা আপনি
গৌরী! চল, যাই ত্বরা, পূজি পদযুগ!
দেবীর চরণ-পদ্ম-সদ্মে যে সৌরভ
বিরাজে, তাহাতে পূর্ণ আজি বনরাজী |'
মহাবেগে দুই ভাই ধাইলা সকাশে
বিবশ | অমনি মধু, মন্মথে সম্ভাষি,
মৃদুস্বরে ঋতুবর কহিলা সত্বরে ;--
'হান তব ফুল-শর, ফুল-ধনু ধরি,
ধনুর্দ্ধর, যথা বনে নিষাদ, পাইলে
মৃগরাজে |' অন্তরীক্ষে থাকি রতিপতি,
শরবৃষ্টি করি, দোঁহে অস্থির করিলা,
মেঘের আড়ালে পশি মেঘনাদ যথা
প্রহারয়ে সীতাকান্ত ঊর্ম্মিলাবল্লভে |
জর জর ফুলশরে, উভয়ে ধরিলা
রূপসীরে | আচ্ছন্নিল গগন সহসা
জীমূত! শোণিতবিন্দু পড়িল চৌদিকে!
ঘোষিল নির্ঘোষে ঘন কালমেঘ দূরে ;
কাঁপিলা বসুধা ; দৈত্য-কুল-রাজলক্ষ্মী,
হায় রে, পূরিলা দেশ হাহাকার রবে!
কামমদে মত্ত এবে উপসুন্দাসুর
বলী, সুন্দাসুর পানে চাহিয়া কহিলা
রোষে ; 'কি কারণে তুমি স্পর্শ এ বামারে,
ভ্রাতৃবধূ তব, বীর?' সুন্দ উত্তরিলা--
'বরিনু কন্যায় আমি তোমার সম্মুখে
এখনি! আমার ভার্য্যা গুরুজন তব ;
দেবর বামার তুমি ; দেহ হাত ছাড়ি |'
যথা প্রজ্বলিত অগ্নি আহুতি পাইলে
আরো জ্বলে, উপসুন্দ--হায়, মন্দমতি--
মহা কোপে কহিল--'রে অধর্ম-আচারি,
কুলাঙ্গার, ভ্রাতৃবধূ মাতৃসম মানি ;
তার অঙ্গ পরশিস্ অনঙ্গ-পীড়নে?'
'কি কহিলি, পামর? অধর্মচারী আমি?
কুলাঙ্গার? ধিক্ তোরে, ধিক্, দুষ্টমতি,
পাপি! শৃগালের আশা কেশরীকামিনী
সহ কেলি করিবার,--ওরে রে বর্ব্বর!'
এতেক কহিয়া রোষে নিষ্কোশিলা অসি
সুন্দাসুর, তা দেখিয়া বীরমদে মাতি,
হুহুঙ্কারি নিজ অস্ত্র ধরিলা অমনি
উপসুন্দ,--গ্রহ-দেষে বিগ্রহ-প্রয়াসী |
মাতঙ্গিনী-প্রেম-লোভে কামার্ত্ত যেমতি
মাতঙ্গ যুঝয়ে, হায়, গহন কাননে
রোষাবেশে, ঘোর রণে কুক্ষণে রণিলা
উভয়, ভুলিয়া, মরি, পূর্ব্বকথা যত!
তমঃসম জ্ঞান-রবি সতত আবরে
বিপত্তি! দোঁহার অস্ত্রে ক্ষত দুইজন,
তিতি ক্ষিতি রক্তস্রোতে, পড়িলা ভূতলে!
কতক্ষণে সুন্দাসুর চেতন পাইয়া,
কাতরে কহিল চাহি উপসুন্দ পানে ;
'কি কর্ম করিনু, ভাই, পূর্ব্বকথা ভুলি?
এত যে করিনু তপঃ ধাতায় তুষিতে ;
এত যে যুঝিনু দোঁহে বাসবের সহ ;
এই কি তাহার ফল ফলিল হে শেষে?
বালিবন্ধে সৌধ, হায়, কেন নির্ম্মাইনু
এত যত্নে? কাম-মদে রত যে দুর্ম্মতি,
সতত এ গতি তার বিদিত জগতে |
কিন্তু এই দুঃখ, ভাই, রহিল এ মনে--
রণক্ষেত্রে শত্রু জিনি, মরিনু অকালে,
মরে যথা মৃগরাজ পড়ি ব্যাধ-ফাঁদে |'
এতেক কহিয়া, হায়, সুন্দাসুর বলী,
বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি, শরীর ত্যাজিলা
অমরারি, যথা, মরি, গান্ধারীনন্দন,
নরশ্রেষ্ঠ, কুরুবংশ ধ্বংস গণি মনে,
যবে ঘোর নিশাকালে অশ্বথামা রথী
পাণ্ডব-শিশুর শির দিলা রাজহাতে!
মহা শোকে শোকী তবে উপসুন্দ বলী
কহিলা ; 'হে দৈত্যপতি, কিসের কারণে
লুটায় শরীর তব ধরণীর তলে?
উঠ, বীর, চল, পুনঃ দলিগে সমরে
অমর! হে শূরমণি, কে রাখিবে আজি
দানব-কুলের মান, তুমি না উঠিলে?
হে অগ্রজ, ডাকে দাস চির অনুগত
উপসুন্দ ; অল্প দোষে দেষী তব পদে
কিঙ্কর ; ক্ষমিয়া তারে হে বাসবজয়ী,
লয়ে এ বামারে, ভাই, কেলি কর উঠি!'
এইরূপে বিলাপিয়া উপসুন্দ রথী,
অকালে কালের হস্তে প্রাণ সমর্পিলা
কর্মদোষে | শৈলাকারে রহিলা দুজনে
ভূমিতলে, যতা শৈল--নীরব, অচল |
সমরে পড়িল দৈত্য | কন্দর্প অমনি
দর্পে শঙ্খ ধরি ধীর নাদিলা গম্ভিরে |
বহি সে বিজয় নাদ আকাশ সম্ভবা
প্রতিধ্বনি, রড়ে ধনী ধাইলা আশুগা
মহারঙ্গে | তুঙ্গ শৃঙ্গে, পর্ব্বতকন্দরে,
পশিল স্বর-তরঙ্গ | যথা কাম্যবনে
দেব-দল, কতক্ষণে উতরিলা তথা
নিরাকারা দূতী | 'উঠ,' কহিলা সুন্দরী,
'শীঘ্র করি উঠ, ওহে দেবকুলপতি!
ভ্রাতৃভেদে ক্ষয় আজ দানব দুর্জ্জয় |'
যথা অগ্নি-কণা-স্পর্শে বারুদ-কণিক-
রাশি, ইরম্মদরূপে, উঠয়ে নিমিষে
গরজি পবন-মার্গে, উঠিলা তোমতি
দেবসৈন্য শূণ্যপথে! রতনে খচিত
ধ্বজদণ্ড ধরি করে, চিত্ররথ রথী
উন্মীলিলা দেবকেতু কৌতুকে আকাশে |
শোভিল সে কেতু, শোভে ধূমকেতু যথা
তারাশির,--তেজে ভস্ম করি সুররিপু!
বাজাইল রণবাদ্য বাদ্যকর-দল
নিক্কণে | চলিলা সবে জয়ধ্বনি করি |
চলিলেন বায়ুপতি খগপতি যথা
হেরি দূরে নাগবৃন্দ--ভয়ঙ্কর গতি ;
সাপটি প্রচণ্ড দন্ড চলিলা হরষে
শমন ; চলিলা ধনুঃ টঙ্কারিয়া রথী
সেনানী ; চলিলা পাশি ; অলকার পতি,
গদা হস্তে ; স্বর্ণরথে চলিলা বাসব,
ত্বিষায় জিনিয়া ত্বিষাম্পতি দিনমণি |
চলে বাসবীয় চমূ জীমূত যেমতি
ঝড় সহ মহা রড়ে ; কিম্বা চলে যথা
প্রমথনাথের সাথে প্রমথের কুল
নাশিতে প্রলয়কালে, ববম্বম রবে--
ববম্বম রবে যবে রবে শিঙ্গাধ্বনি!
ঘোর নাদে দেবসৈন্য প্রবেশিল আসি
দৈত্যদেশে | যে যেখানে আছিল দানব,
হতাশ তরাসে কেহ, কেহ ঘোর রণে
মরিল! মুহুর্তে, আহা, যত নদ নদী
প্রস্রবণ, রক্তময় হইয়া বহিল!
শৈলাকার শবরাশি গগন পরশে |
শকুনি গৃধিনী যত--বিকট মুরতি--
যুড়িয়া আকাশদেশ, উড়ে ঝাঁকে ঝাঁকে
মাংসলোভে | বায়ুসখা সুখে বায়ু সহ
শত শত দৈত্যপুরী লাগিলা দহিতে |
মরিল দানব-শিশু, দানব-বনিতা |
হায় রে, যে ঘোর বাত্যা দলে তরু-দলে
বিপিনে, নাশে সে মূঢ় মুকুলিত লতা,
কুসুম-কাঞ্চন-কান্তি! বিধির এ লীলা |
বিলাপী বিলাপধ্বনি জয়নাদ সহ
মিশিয়া পূরিল বিশ্ব ভৈরব আরবে!
কত যে মারিলা যম কে পারে বর্ণিতে?
কত যে চূর্ণিলা, ভাঙ্গি তুঙ্গ শৃঙ্গ, বলী
প্রভঞ্জন ;--তীক্ষ্ণ শরে কত যে কাটিলা
সেনানী ; কত যে যূতনাথ গদাঘাতে
নাশিলা অলকানাথ ; কত যে প্রচেতা
পাশী ; হায়, কে বর্ণিবে, কার সাধ্য এত?
দানব-কুল-নিধনে, দেব-কুল-নিধি
শচিকান্ত, নিতান্ত কাতর হয়ে মনে
দয়াময়, ঘোর নাদে শঙ্খ নিনাদিলা
রণভূমে | দেবসেনা, ক্ষান্ত দিয়া রণে
অমনি, বিনতভাবে বেড়িলা বাসবে |
কহিলেন সুনাসীর গম্ভীর বচনে ;--
'সুন্দ-উপসুন্দাসুর, হে শূরেন্দ্র রথি,
অরি মম, যমালয়ে গেছে দোঁহে চলি
অকালে কপালদোষে | আর কারে ডরি?
তবে বৃথা প্রাণিহত্যা কর কি কারণে?
নীচের শরীরে বীর কভু কি প্রহারে?
অস্ত্র? উচ্চ তরু--সেই ভস্ম ইরম্মদে |
যাক্ চলি নিজালয়ে দিতিসুত যত |
বিষহীন ফণী দেখি কে মারে তাহারে?
আনহ চন্দনকাষ্ঠ কেহ, কেহ ঘৃত ;
আইস সবে দানবের প্রেতকর্ম্ম করি
যথা বিধি | বীর-কুলে সামান্য সে নহে,
তোমা সবা যার শরে কাতর সমরে!
বিশ্বনাশী বজ্রাগ্নিরে অবহেলা করি,
জিনিল যে বাহুবলে দেবকুলরাজে,
কেমনে তাহার দেহ দিবে সবে আজি
খেচর ভূচর জীবে? বীরশ্রেষ্ঠ যারা,
বীরারি পূজিতে রত সতত জগতে!'
এতেক কহিলা যদি বাসব, অমনি
সাজাইলা চিতা চিত্ররথ মহারথী |
রাশি রাশি আনি কাষ্ঠ সুরভি, ঢালিলা
ঘৃত তাহে | আসি শুচি--সর্ব্বশুচিকারী--
দহিলা দানব-দেহ | অনুমৃতা হয়ে,
সুন্দ-উপসুন্দাসুর-মহিষী রূপসী
গেলা ব্রহ্মলোকে,--দোঁহে পতিপরায়ণা |
তবে তিলোত্তমাপানে চাহি সুরপতি
জিষ্ণু, কহিলেন দেব মৃদু মন্দস্বরে ;--
'তারিলে দেবতাকুলে অকূলপাথারে
তুমি ; দলি দানবেন্দ্রে তোমার কল্যাণে,
হে কল্যাণি, স্বর্গলাভ আবার করিনু |
এ সুখ্যাতি তব, সতি, ঘুষিবে জগতে
চিরদিন | যাও এবে (বিধির এ বিধি)
সূর্য্যলোকে ; সুখে পশি আলোক-সাগরে,
কর বাস, যথা দেবী কেশব-বাসনা,
ইন্দুবদনা ইন্দিরা--জলধির তলে |'
চলি গেলা তিলোত্তমা--তারকারা ধনী--
সূর্য্যলোকে | সুরসৈন্য সহ সুরপতি
অমরাপুরীতে হর্ষে পুনঃ প্রবেশিলা |
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
মহাকাব্য
|
সম্মুখ সমরে পড়ি, বীর-চূড়ামণি
বীরবাহু, চলি যবে গেলা যমপুরে
অকালে, কহ, হে দেবি অমৃতভাষিণি,
কোন্ বীরবরে বরি সেনাপতি-পদে,
পাঠাইলা রণে পুনঃ রক্ষঃকুলনিধি
রাঘবারি? কি কৌশলে, রাক্ষসভরসা
ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদে — অজেয় জগতে —
ঊর্মিলাবিলাসী নাশি, ইন্দ্রে নিঃশঙ্কিলা?
বন্দি চরণারবিন্দ, অতি মন্দমতি
আমি, ডাকি আবার তোমায়, শ্বেতভুজে
ভারতি! যেমতি, মাতঃ, বসিলা আসিয়া,
বাল্মীকির রসনায় (পদ্মাসনে যেন)
যবে খরতর শরে, গহন কাননে,
ক্রৌঞ্চবধূ সহ ক্রৌঞ্চে নিষাদ বিঁধিলা,
তেমতি দাসেরে, আসি, দয়া কর, সতি।
কে জানে মহিমা তব এ ভবমণ্ডলে?
নরাধম আছিল যে নর নরকুলে
চৌর্যে রত, হইল সে তোমার প্রসাদে,
মৃ্ত্যুঞ্জয়, যথা মৃত্যুঞ্জয় উমাপতি!
হে বরদে, তব বরে চোর রত্নাকর
কাব্যরত্নাকর কবি! তোমার পরশে,
সুচন্দন-বৃক্ষশোভা বিষবৃক্ষ ধরে!
হায়, মা, এহেন পুণ্য আছে কি এ দাসে?
কিন্তু যে গো গুণহীন সন্তানের মাঝে
মূঢ়মতি, জননীর স্নেহ তার প্রতি
সমধিক। ঊর তবে, ঊর দয়াময়ি
বিশ্বরমে! গাইব, মা, বীররসে ভাসি,
মহাগীত; ঊরি, দাসে দেহ পদছায়া।
— তুমিও আইস, দেবি তুমি মধুকরী
কল্পনা! কবির ঢিত্ত-ফুলবন-মধু
লয়ে, রচ মধুচক্র, গৌড়জন যাহে
আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি।
কনক-আসনে বসে দশানন বলী —
হেমকূট-হৈমশিরে শৃঙ্গবর যথা
তেজঃপুঞ্জ। শত শত পাত্রমিত্র আদি
সভাসদ, নতভাবে বসে চারি দিকে।
ভূতলে অতুল সভা — স্ফটিকে গঠিত;
তাহে শোভে রত্নরাজি, মানস-সরসে
সরস কমলকুল বিকশিত যথা।
শ্বেত, রক্ত, নীল, পীত, স্তম্ভ সারি সারি
ধরে উচ্চ স্বর্ণছাদ, ফণীন্দ্র যেমতি,
বিস্তারি অযুত ফণা, ধরেন আদরে
ধরারে। ঝুলিছে ঝলি ঝালরে মুকুতা,
পদ্মরাগ, মরকত, হীরা; যথা ঝোলে
(খচিত মুকুলে ফুল) পল্লবের মালা
ব্রতালয়ে। ক্ষণপ্রভা সম মুহুঃ হাসে
রতনসম্ভবা বিভা — ঝলসি নয়নে!
সুচারু চামর চারুলোচনা কিঙ্করী
ঢুলায়; মৃণালভুজ আনন্দে আন্দোলি
চন্দ্রাননা। ধরে ছত্র ছত্রধর; আহা
হরকোপানলে কাম যেন রে না পুড়ি
দাঁড়ান সে সভাতলে ছত্রধর-রূপে!—
ফেরে দ্বারে দৌবারিক, ভীষণ মুরতি,
পাণ্ডব-শিবির দ্বারে রুদ্রেশ্বর যথা
শূলপাণি! মন্দে মন্দে বহে গন্ধে বহি,
অনন্ত বসন্ত-বায়ু, রঙ্গে সঙ্গে আনি
কাকলী লহরী, মরি! মনোহর, যথা
বাঁশরীস্বরলহরী গোকুল বিপিনে!
কি ছার ইহার কাছে, হে দানবপতি
ময়, মণিময় সভা, ইন্দ্রপ্রস্থে যাহা
স্বহস্তে গড়িলা তুমি তুষিতে পৌরবে?
এহেন সভায় বসে রক্ষঃকুলপতি,
বাক্যহীন পুত্রশোকে! ঝর ঝর ঝরে
অবিরল অশ্রুধারা — তিতিয়া বসনে,
যথা তরু, তীক্ষ্ণ শর সরস শরীরে
বাজিলে, কাঁদে নীরবে। কর জোড় করি,
দাঁড়ায় সম্মুখে ভগ্নদূত, ধূসরিত
ধূলায়, শোণিতে আর্দ্র সর্ব কলেবর।
বীরবাহু সহ যত যোধ শত শত
ভাসিল রণসাগরে, তা সবার মাঝে
একমাত্র বাঁচে বীর; যে কাল তরঙ্গ
গ্রাসিল সকলে, রক্ষা করিল রাক্ষসে—
নাম মকরাক্ষ, বলে যক্ষপতি সম।
এ দূতের মুখে শুনি সুতের নিধন,
হায়, শোকাকুল আজি রাজকুলমণি
নৈকষেয়! সভাজন দুঃখী রাজ-দুঃখে।
আঁধার জগৎ, মরি, ঘন আবরিলে
দিননাথে! কত ক্ষণে চেতন পাইয়া,
বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি, কহিলা রাবণ;—
“নিশার স্বপনসম তোর এ বারতা,
রে দূত! অমরবৃন্দ যার ভুজবলে
কাতর, সে ধনুর্ধরে রাঘব ভিখারী
বধিল সম্মুখ রণে? ফুলদল দিয়া
কাটিলা কি বিধাতা শাল্মলী তরুবরে?
হা পুত্র, হা বীরবাহু, বীর-চূড়ামণি!
কি পাপে হারানু আমি তোমা হেন ধনে?
কি পাপ দেখিয়া মোর, রে দারুণ বিধি,
হরিলি এ ধন তুই? হায় রে, কেমনে
সহি এ যাতনা আমি? কে আর রাখিবে
এ বিপুল কুল-মান এ কাল সমরে!
বনের মাঝারে যথা শাখাদলে আগে
একে একে কাঠুরিয়া কাটি, অবশেষে
নাশে বৃক্ষে, হে বিধাতঃ, এ দুরন্ত রিপু
তেমতি দুর্বল, দেখ, করিছে আমারে
নিরন্তর! হব আমি নির্মূল সমূলে
এর শরে! তা না হলে মরিত কি কভু
শূলী শম্ভুসম ভাই কুম্ভকর্ণ মম,
অকালে আমার দোষে? আর যোধ যত—
রাক্ষস-কুল-রক্ষণ? হায়, সূর্পণখা,
কি কুক্ষণে দেখেছিলি, তুই অভাগী,
কাল পঞ্চবটীবনে কালকূটে ভরা
এ ভুজগে? কি কুক্ষণে (তোর দুঃখে দুঃখী)
পাবক-শিখা-রূপিণী জানকীরে আমি
আনিনু এ হৈম গেহে? হায় ইচ্ছা করে,
ছাড়িয়া কনকলঙ্কা, নিবিড় কাননে
পশি, এ মনের জ্বালা জুড়াই বিরলে!
কুসুমদাম-সজ্জিত, দীপাবলী-তেজে
উজ্জ্বলিত নাট্যশালা সম রে আছিল
এ মোর সুন্দরী পুরী! কিন্তু একে একে
শুখাইছে ফুল এবে, নিবিছে দেউটি;
নীরব রবাব, বীণা, মুরজ, মুরলী;
তবে কেন আর আমি থাকি রে এখানে?
কার রে বাসনা বাস করিতে আঁধারে?”
এইরূপে বিলাপিলা আক্ষেপে রাক্ষস–
কুলপতি রাবণ; হায় রে মরি, যথা
হস্তিনায় অন্ধরাজ, সঞ্জয়ের মুখে
শুনি, ভীমবাহু ভীমসেনের প্রহারে
হত যত প্রিয়পুত্র কুরুক্ষেত্র-রণে!
তবে মন্ত্রী সারণ (সচিবশ্রেষ্ঠ বুধঃ)
কৃতাঞ্জলিপুটে উঠি কহিতে লাগিলা
নতভাবে; — “হে রাজন্, ভুবন বিখ্যাত,
রাক্ষসকুলশেখর, ক্ষম এ দাসেরে!
হেন সাধ্য কার আছে বুঝায় তোমারে
এ জগতে? ভাবি, প্রভু দেখ কিন্তু মনে;—
অভ্রভেদী চূড়া যদি যায় গুঁড়া হয়ে
বজ্রাঘাতে, কভু নহে ভূধর অধীর
সে পীড়নে। বিশেষতঃ এ ভবমণ্ডল
মায়াময়, বৃথা এর দুঃখ সুখ যত।
মোহের ছলনে ভুলে অজ্ঞান যে জন।”
উত্তর করিলা তবে লঙ্কা-অধিপতি;—
“যা কহিলে সত্য, ওহে অমাত্য-প্রধান
সারণ! জানি হে আমি, এ ভব-মণ্ডল
মায়াময়, বৃথা এর দুঃখ সুখ যত।
কিন্তু জেনে শুনে তবু কাঁদে এ পরাণ
অবোধ। হৃদয়-বৃন্তে ফুটে যে কুসুম,
তাহারে ছিঁড়িলে কাল, বিকল হৃদয়
ডোবে শোক-সাগরে, মৃণাল যথা জলে,
যবে কুবলয়ধন লয় কেহ হরি।”
এতেক কহিয়া রাজা, দূত পানে চাহি,
আদেশিলা,— “কহ, দূত, কেমনে পড়িল
সমরে অমর-ত্রাস বীরবাহু বলী?”
প্রণমি রাজেন্দ্রপদে, করযুগ জুড়ি,
আরম্ভিলা ভগ্নদূত;— “হায়, লঙ্কাপতি,
কেমনে কহিব আমি অপূর্ব কাহিনী?
কেমনে বর্ণিব বীরবাহুর বীরতা?—
মদকল করী যথা পশে নলবনে,
পশিলা বীরকুঞ্জর অরিদল মাঝে
ধনুর্ধর। এখনও কাঁপে হিয়া মম
থরথরি, স্মরিলে সে ভৈরব হুঙ্কারে!
শুনেছি, রাক্ষসপতি, মেঘের গর্জনে;
সিংহনাদে; জলধির কল্লোলে; দেখেছি
দ্রুত ইরম্মদে, দেব, ছুটিতে পবন–
পথে; কিন্তু কভু নাহি শুনি ত্রিভুবনে,
এহেন ঘোর ঘর্ঘর কোদণ্ড-টঙ্কারে!
কভু নাহি দেখি শর হেন ভয়ঙ্কর!—
পশিলা বীরেন্দ্রবৃন্দ বীরবাহু সহ
রণে, যূথনাথ সহ গজযূথ যথা।
ঘন ঘনাকারে ধূলা উঠিল আকাশে,—
মেঘদল আসি যেন আবরিলা রুষি
গগনে; বিদ্যুৎঝলা-সম চকমকি
উড়িল কলম্বকুল অম্বর প্রদেশে
শনশনে!— ধন্য শিক্ষা বীর বীরবাহু!
কত যে মরিল অরি, কে পারে গণিতে?
এইরূপে শত্রুমাঝে যুঝিলা স্বদলে
পুত্র তব, হে রাজন্! কত ক্ষণ পরে,
প্রবেশিলা, যুদ্ধে আসি নরেন্দ্র রাঘব।
কনক-মুকুট শিরে, করে ভীম ধনুঃ,
বাসবের চাপ যথা বিবিধ রতনে
খচিত,”— এতেক কহি, নীরবে কাঁদিল
ভগ্নদূত, কাঁদে যথা বিলাপী, স্মরিয়া
পূর্বদুঃখ! সভাজন কাঁদিলা নীরবে।
অশ্রুময়-আঁখি পুনঃ কহিলা রাবণ,
মন্দোদরীমনোহর;— “কহ, রে সন্দেশ–
বহ, কহ, শুনি আমি, কেমনে নাশিলা
দশাননাত্মজ শূরে দশরথাত্মজ?”
“কেমনে, হে মহীপতি,” পুনঃ আরম্ভিল
ভগ্নদূত, “কেমনে, হে রক্ষঃকুলনিধি,
কহিব সে কথা আমি, শুনিবে বা তুমি?
অগ্নিময় চক্ষুঃ যথা হর্যক্ষ, সরোষে
কড়মড়ি ভীম দন্ত, পড়ে লম্ফ দিয়া
বৃষস্কন্ধে, রামচন্দ্র আক্রমিলা রণে
কুমারে! চৌদিকে এবে সমর-তরঙ্গ
উথলিল, সিন্ধু যথা দ্বন্দ্বি বায়ু সহ
নির্ঘোষে! ভাতিল অসি অগ্নিশিখাসম
ধূমপুঞ্জসম চর্মাবলীর মাঝারে
অযুত! নাদিল কম্বু অম্বুরাশি-রবে!—
আর কি কহিব, দেব? পূর্বজন্মদোষে,
একাকী বাঁচিনু আমি! হায় রে বিধাতঃ,
কি পাপে এ তাপ আজি দিলি তুই মোরে?
কেন না শুইনু আমি শরশয্যোপরি,
হৈমলঙ্কা-অলঙ্কার বীরবাহু সহ
রণভূমে? কিন্তু নহি নিজ দোষে দোষী।
ক্ষত বক্ষঃস্থল মম, দেখ, নৃপমণি,
রিপু-প্রহরণে; পৃষ্ঠে নাহি অস্ত্রলেখা।”
এতেক কহিয়া স্তব্ধ হইল রাক্ষস
মনস্তাপে। লঙ্কাপতি হরষে বিষাদে
কহিলা; “সাবাসি, দূত! তোর কথা শুনি,
কোন্ বীর-হিয়া নাহি চাহে রে পশিতে
সংগ্রামে? ডমরুধ্বনি শুনি কাল ফণী
কভু কি অলসভাবে নিবাসে বিবরে?
ধন্য লঙ্কা, বীরপুত্রধারী! চল, সবে,—
চল যাই, দেখি, ওহে সভাসদ-জন,
কেমনে পড়েছে রণে বীর-চূড়ামণি
বীরবাহু; চল, দেখি জুড়াই নয়নে।”
উঠিলা রাক্ষসপতি প্রাসাদ-শিখরে,
কনক-উদয়াচলে দিনমণি যেন
অংশুমালী। চারিদিকে শোভিল কাঞ্চন-
সৌধ-কিরীটিনী লঙ্কা— মনোহরা পুরী!
হেমহর্ম্য সারি সারি পুষ্পবন মাঝে;
কমল-আলয় সরঃ; উৎস রজঃ-ছটা;
তরুরাজি; ফুলকুল— চক্ষু-বিনোদন,
যুবতীযৌবন যথা; হীরাচূড়াশিরঃ
দেবগৃহ; নানা রাগে রঞ্জিত বিপণি,
বিবিধ রতনপূর্ণ; এ জগৎ যেন
আনিয়া বিবিধ ধন, পূজার বিধানে,
রেখেছে, রে চারুলঙ্কে, তোর পদতলে,
জগত-বাসনা তুই, সুখের সদন।
দেখিলা রাক্ষসেশ্বর উন্নত প্রাচীর—
অটল অচল যথা; তাহার উপরে,
বীরমদে মত্ত, ফেরে অস্ত্রীদল, যথা
শৃঙ্গধরোপরি সিংহ। চারি সিংহদ্বার
(রুদ্ধ এবে) হেরিলা বৈদেহীহর; তথা
জাগে রথ, রথী, গজ, অশ্ব, পদাতিক
অগণ্য। দেখিলা রাজা নগর বাহিরে,
রিপুবৃন্দ, বালিবৃন্দ সিন্ধুতীরে যথা,
নক্ষত্র-মণ্ডল কিম্বা আকাশ-মণ্ডলে।
থানা দিয়া পূর্ব দ্বারে, দুর্বার সংগ্রামে,
বসিয়াছে বীর নীল; দক্ষিণ দুয়ারে
অঙ্গদ, করভসম নব বলে বলী;
কিংবা বিষধর, যবে বিচিত্র কঞ্চুক-
ভূষিত, হিমান্তে অহি ভ্রমে, ঊর্ধ্ব ফণা—
ত্রিশূলসদৃশ জিহ্বা লুলি অবলেপে!
উত্তর দুয়ারে রাজা সুগ্রীব আপনি
বীরসিংহ। দাশরথি পশ্চিম দুয়ারে—
হায় রে বিষণ্ণ এবে জানকী-বিহনে,
কৌমুদী-বিহনে যথা কুমুদরঞ্জন
শশাঙ্ক! লক্ষ্মণ সঙ্ঘে, বায়ুপুত্র হনু,
মিত্রবর বিভীষণ। এত প্রসরণে,
বেড়িয়াছে বৈরিদল স্বর্ণ-লঙ্কাপুরী,
গহন কাননে যথা ব্যাধ-দল মিলি,
বেড়ে জালে সাবধানে কেশরিকামিনী,—
নয়ন–রমণী রূপে, পরাক্রমে ভীমা
ভীমাসমা! অদূরে হেরিলা রক্ষঃপতি
রণক্ষেত্র। শিবাকুল, গৃধিনী, শকুনি,
কুক্কুর, পিশাচদল ফেরে কোলাহলে।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
আলোক-সাগর-রূপ রবির কিরণে,
ডুবে যথা প্রভাতের তারা সুহাসিনী ;–
ফুটে যথা প্রেমামোদে, আইলে যামিনী,
কুসুম-কুলের কলি কুসুম-যৌবনে ;–
বহি যথা সুপ্রবাহে প্রবাহ-বাহিনী,
লভে নিরবাণ সুখে সিন্ধুর চরণে,---
এই রূপে ইহ লোক—শাস্ত্রে এ কাহিনী—
নিরস্তর সুখরূপ পরম রতনে
পায় পরে পর-লোকে, ধরমের বলে ।
হে ধৰ্ম্ম, কি লোভে তবে তোমারে বিস্মরি,
চলে পাপ-পথে নর, ভুলি পাপ-ছলে ?
সংসার-সাগর-মাঝে তব স্বর্ণতরি
তেয়াগি, কি লোভে ডুবে বাতময় জলে ?
দু দিন বাঁচিতে চাহে, চির দিন মরি ?
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
বসন্তে কুসুম-কুল যথা বনস্থলে,
চেয়ে দেখ, তারাচয় ফুটিছে গগনে,
মৃগাক্ষি !— সুহাস-মুখে সরসীর জলে,
চন্দ্রিমা করিছে কেলি প্রেমানন্দ-মনে।
কত যে কি কহিতেছে মধুর স্বননে
পবন— বনের কবি, ফুল্ল ফুল-দলে,
বুঝিতে কি পার, প্রিয়ে ? নারিবে কেমনে,
প্ৰেম-ফুলেশ্বরী তুমি প্রমদা-মণ্ডলে?
এ হৃদয়, দেখ, এবে ওই সরোবরে,—
চন্দ্রিমার রূপে এতে তোমার মূরতি !
কাল বলি অবহেলা, প্রেয়সি, যে করে
নিশায়, আমার মতে সে বড় দুৰ্ম্মতি।
হেন সুবাসিত শ্বাস, হাস স্নিগ্ধ করে
যার, সে কি কভু মন্দ, ওলো রসবতি?
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
ভক্তিমূলক
|
১মৃদু কলরবে তুমি,ওহে শৈবলিনি,
কি কহিছ ভাল করে কহ না আমারে।
সাগর-বিরহে যদি, প্রাণ তব কাঁদে, নদি,
তোমার মনের কথা কহ রাধিকারে---
তুমি কি জান না, ধনি, সেও বিরহিণী?২তপনতনয়া তুমি;তেঁই কাদম্বিনী
পালে তোমা শৈলনাথ-কাঞ্চন-ভবনে;
জন্ম তব রাজকুলে,(সৌরভ জনমে ফুলে)
রাধিকারে লজ্জা তুমি কর কি কারণে?
তুমি কি জান না সেও রাজার নন্দিনী?৩এস, সখি, তুমি আমি বসি এ বিরলে!
দু'জনের মনোজ্জ্বালা জুড়াই দু'জনে;
তব কূলে,কল্লোলিনি,ভ্ৰমি আমি একাকিনী,
অনাথা অতিথি আমি তোমার সদনে—
তিতিছে বসন মোর নয়নের জলে!৪ফেলিয়া দিয়াছি আমি যত অলঙ্কার---
রতন, মুকুতা, হীরা, সব আভরণ!
ছিঁড়িয়াছি ফুল-মালা জুড়াতে মনের জ্বালা,
চন্দন চর্চ্চিত দেহে ভস্মের লেপন!
আর কি এ সবে সাদ আছে গো রাধার?৫তবে যে সিন্দূরবিন্দু দেখিছ ললাটে,
সধবা বলিয়া আমি রেখেছি ইহারে!
কিন্তু অগ্নিশিখা সম, হে সখি, সীমস্তে মম
জ্বলিছে এ রেখা আজি—কহিমু তোমারে—
গোপিলে এ সব কথা প্রাণ যেন ফাটে!৬বসো আসি,শশিমুখি,আমার আঁচলে,
কমল আসনে যথা কমলবাসিনী!
ধরিয়া তোমার গলা, কাঁদি লো আমি অবলা,
ক্ষণেক ভুলি এ জ্বালা, ওহে প্রবাহিণি!
এস গো বসি দুজনে এ বিজন স্থলে!৭কি আশ্চৰ্য্য!এত করে করিনু মিনতি,
তবু কি আমার কথা শুনিলে না, ধনি?
এ সকল দেখে শুনে, রাধার কপাল-গুণে,
তুমিও কি ঘৃণিলা গো রাধায়, স্বজনি?
এই কি উচিত তব, ওহে স্রোতস্বতি?৮হায় রে তোমারে কেন দোষি, ভাগ্যবতি?
ভিখারিণী রাধা এবে—তুমি রাজরাণী।
হরপ্রিয়া মন্দাকিনী,সুভগে,তব সঙ্গিনী,
অর্পেণ সাগর-করে তিনি তব পাণি!
সাগর-বাসরে তব তাঁর সহ গতি!৯মৃদু হাসি নিশি আসি দেখা দেয় যবে,
মনোহর সাজে তুমি সাজ লো কামিনী।
তারাময় হার পরি,শশধরে শিরে ধরি,
কুসুমদাম কবরী,তুমি বিনোদিনী,
দ্রুতগতি পতিপাশে যাও কলরবে ।১০হায় রে এ ব্রজে আজি কে আছে রাখার?
কে জানে এ ব্ৰজজনে রাধার যাতন?
দিবা অবসান হলে,রবি গেলে অস্তাচলে,
যদিও ঘোর তিমিরে ডোবে ত্রিভুবন,
নলিনী যেমনি জ্বলে–এত জ্বালা কার?১১উচ্চ তুমি নীচ এবে আমি হে যুবতি,
কিন্তু পর-দুঃখে দুঃখী না হয় যে জন,
বিফল জনম তার,অবশ্য সে দুরাচার।
মধু কহে, মিছে ধনি করিছ রোদন,
কাহার হৃদয়ে দয়া করেন বসতি?(ব্রজাঙ্গনা কাব্য)
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
ভূত-রূপ সিন্ধু-জলে গড়ায়ে পড়িল
বৎসর, কালের ঢেউ, ঢেউর গমনে।
নিত্যগামী রথচক্র নীরবে ঘুরিল
আবার আয়ুর পথে। হৃদয়-কাননে,
কত শত আশা-লতা শুখায়ে মরিল,
হায় রে, কব তা কারে, কব তা কেমনে!
কি সাহসে আবার বা রোপিব যতনে ।
সে বীজ, যে বীজ ভূতে বিফল হইল!
বাড়িতে লাগিল বেলা ; ডুবিবে সত্বরে
তিমিরে জীবন-রবি। আসিছে রজনী,
নাহি যার মুখে কথা বায়ু-রূপ স্বরে ;
নাহি যার কেশ-পাশে তারা-রূপ মণি ;
চির-রুদ্ধ দ্বার যার নাহি মুক্ত করে
ঊষা,—তপনের দূতী, অরুণ-রমণী!
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
মোহিনী-রূপসী-বেশে ঝাঁপি কাঁখে করি
পশিছেন, ভবানন্দ, দেখ তব ঘরে
অন্নদা! বহিছে শূন্যে সঙ্গীত-লহরী,
অদৃশ্যে অপ্সরাচয় নাচিছে অম্বরে।–
দেবীর প্রসাদে তোমা রাজপদে বরি,
রাজাসন, রাজছত্র, দিবেন সত্বরে
রাজলক্ষ্মী; ধন-স্রোতে তব ভাগ্যতরি
ভাসিবে অনেক দিন, জননীর বরে।
কিন্তু চিরস্থায়ী অর্থ নহে এ সংসারে;
চঞ্চলা ধনদা রমা, ধনও চঞ্চল;
তবু কি সংশয় তব, জিজ্ঞাসি তোমারে?
তব বংশ-যশঃ-ঝাঁপি–অন্নদামঙ্গল–
যতনে রাখিবে বঙ্গে মনের ভাণ্ডারে,
রাখে যথা সুধামৃতে চন্দ্রের মণ্ডলে।কাব্য গ্রন্থঃ-সংকলিত (মাইকেল মধুসূদন দত্ত)
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
স্রোতঃ-পথে বহি যথা ভীষণ ঘোষণে
ক্ষণ কাল, অল্পায়ুঃ পয়োরাশি চলে
বরিষায় জলাশয়ে ; দৈব-বিড়ম্বনে
ঘটিল কি সেই দশা সুবঙ্গ-মণ্ডলে
তোমার, কোবিদ বৈদ্য ? এই ভাবি মনে,—
নাহি কি হে কেহ তব বান্ধবের দলে,
তব চিতা-ভস্মরাশি কুড়ায়ে যতনে,
স্নেহ-শিল্পে গড়ি মঠ, রাখে তার তলে ?
আছিলে রাখাল-রাজ কাব্য-ব্রজধামে
জীবে তুমি ; নানা খেলা খেলিলা হরষে ;
যমুনা হয়েছ পার ; তেঁই গোপগ্রামে
সবে কি ভুলিল তোমা ? স্মরণ-নিকষে,
মন্দ-স্বর্ণ-রেখা-সম এবে তব নামে
নাহি কি হে জ্যোতিঃ, ভাল স্বর্ণের পরশে?
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
কে না লোভে, ফণিনীর কুন্তলে যে মণি
ভূপতিত তারারূপে, নিশাকালে ঝলে ?
কিন্তু কৃতান্তের দূত বিষদন্তে গণি,
কে করে সাহস তারে কেড়ে নিতে বলে ?
হায় লো ভারত-ভূমি! বৃথা স্বর্ণ-জলে
ধুইলা বরাঙ্গ তোর, কুরঙ্গ-নয়নি,
বিধাতা ? রতন সিঁথি গড়ায়ে কৌশলে,
সাজাইলা পোড়া ভাল তোর লো, যতনি!
নহিস্ লো বিষময়ী যেমতি সাপিনী;
রক্ষিতে অক্ষম মান প্রকৃত যে পতি ;
পুড়ি কামানলে, তোরে করে লো অধীনী
(হা ধিক্!) যবে যে ইচ্ছে, যে কামী দুৰ্ম্মতি!
কার শাপে তোর তরে, ওলো অভাগিনি,
চন্দন হইল বিষ;সুধা তিত অতি ?
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
চন্দ্রচূড় জটাজালে আছিলা যেমতি
জাহ্নবী, ভারত-রস ঋষি দ্বৈপায়ন,
ঢালি সংস্কৃত-হ্রদে রাখিলা তেমতি; —
তৃষ্ণায় আকুল বঙ্গ করিত রোদন।
কঠোরে গঙ্গায় পূজি ভগীরথ ব্রতী,
(সুধন্য তাপস ভবে, নর-কুল-ধন! )
সগর-বংশের যথা সাধিলা মুকতি,
পবিত্ৰিলা আনি মায়ে, এ তিন ভুবন;
সেই রূপে ভাষা-পথ খননি স্ববলে,
ভারত-রসের স্রোতঃ আনিয়াছ তুমি
জুড়াতে গৌড়ের তৃষা সে বিমল জলে।
নারিবে শোধিতে ধার কভু গৌড়ভূমি।
মহাভারতের কথা অমৃত-সমান।
হে কাশি, কবীশদলে তুমি পুণ্যবান্॥(চতুদ্দর্শপদী কবিতাবলী)
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
অনুক্ষণ মনে মোর পড়ে তব কথা,
বৈদেহি! কখন দেখি, মুদিত নয়নে,
একাকিনী তুমি, সতি, অশোক-কাননে,
চারি দিকে চেড়ীবৃন্দ, চন্দ্রকলা যথা
আচ্ছন্ন মেঘের মাঝে ! হায়, বহে বৃথা
পদ্মাক্ষি, ও চক্ষুঃ হতে অশ্রু-ধারা ঘনে !
কোথা দাশরথি শূর কোথা মহারথী
দেবর লক্ষ্মণ, দেবি, চিরজয়ী রণে ?
কি সাহসে, সুকেশিনি, হরিল তোমারে
রাক্ষস ? জানে না মূঢ়, কি ঘটিবে পরে !
রাহু-গ্রহ-রূপ ধরি বিপত্তি আঁধারে
জ্ঞান-রবি, যবে বিধি বিড়ম্বণ করে !
মজিবে এ রক্ষোবংশ, খ্যাত ত্রিসংসারে,
ভূকম্পণে, দ্বীপ যথা অতল সাগরে !
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
নহে দিন দূরে, দেবি যবে ভূভারতে
বিসর্জ্জিব ভূভারত, বিস্মৃতির জলে,
ও তব ধবল মূর্ত্তি সুদল কমলে ;—
কিন্তু চিরস্থায়ী পূজা তোমার জগতে !
মনোরূপ-পদ্ম যিনি রোপিলা কৌশলে
এ মানব-দেহ-সরে, তাঁর ইচ্ছামতে
সে কুসুমে বাস তব, যথা মরকতে
কিম্বা পদ্মরাগে জ্যোতিঃ নিত্য ঝলঝলে !
কবির হৃদয়-বনে যে ফুল ফুটিবে,
সে ফুল-অঞ্জলি লোক ও রাঙা চরণে
পরম-ভকতি-ভাবে চিরকাল দিবে
দশ দিশে, যত দিন এ মর ভবনে
মনঃ-পদ্ম ফোটে, পূজা, তুমি, মা, পাইবে !—
কি কাজ মাটির দেহে তবে, সনাতনে ?
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
অন্ধ যে, কি রূপ কবে তার চক্ষে ধরে
নলিনী ? রোধিলা বিধি কৰ্ণ-পথ যার,
লভে কি সে সুখ কভু বীণার সুস্বরে ?
কি কাক, কি পিকধ্বনি,—সম-ভাব তার !
মনের উদ্যান-মাঝে, কুসুমের সার
কবিতা-কুসুম-রত্ন !—দয়া করি নরে,
কবি-মুখ-ব্রহ্ম-লোকে ঊরি অবতার
বাণীরূপে বীণাপাণি এ নর-নগরে।—
দুৰ্ম্মতি সে জন, যার মনঃ নাহি মজে
কবিতা-অমৃত-রসে ! হায়, সে দুৰ্ম্মতি,
পুষ্পাঞ্জলি দিয়া সদা যে জন না ভজে
ও চরণপদ্ম, পদ্মবাসিনি ভারতি !
কর পরিমলময় এ হিয়া-সরোজে—
তুষি যেন বিজ্ঞে, মা গো, এ মোর মিনতি।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
সুরপুরে সশরীরে, শূর-কুল-পতি
অর্জ্জুন, স্বকাজ যথা সাধি পুণ্য-বলে
ফিরিলা কানন-বাসে ;---তুমি হে তেমতি,
যাও সুখে ফিরি এবে ভারত-মণ্ডলে,
মনোদ্যানে আশা-লতা তব ফলবতী !—
ধন্য ভাগ্য, হে সুভগ, তব ভব-তলে !
শুভ ক্ষণে গর্ভে তোমা ধরিলা সে সতী,
তিতিবেন যিনি, বৎস, নয়নের জলে
( স্নেহাসার!) যবে রঙ্গে বায়ু-রূপ ধরি
জনরব, দূর বঙ্গে বহিবে সত্বরে
এ তোমার কীৰ্ত্তি-বাৰ্ত্তা!—যাও দ্রুতে, তরি,
নীলমণি-ময় পথ অপথ সাগরে!
অদৃশ্যে রক্ষার্থে সঙ্গে যাবেন সুন্দরী
বঙ্গ-লক্ষ্মী! যাও, কবি আশীৰ্ব্বাদ করে!–
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
ওই যে শুনিছ ধ্বনি ও নিকুঞ্জ-বনে,
ভেবো না গুঞ্জরে অলি চুম্বি ফুলাধরে ;
ভেবো না গাইছে পিক কল কুহরণে,
তুষিতে প্রত্যূষে আজি ঋতু-রাজেশ্বরে !
দেখ, মীলি,ভক্ত জন, ভক্তির নয়নে,
অধোগামী দেব-গ্রাম উজ্জ্বল-অম্বরে,—
আসিছেন সবে হেথা--এই দোলাসনে--
পূজিতে রাখালরাজ—রাধা-মনোহরে !
স্বর্গীয় বাজনা ওই ! পিককুল কবে,
কবে বা মধুপ, করে হেন মধু-ধ্বনি ?
কিন্নরের বীনা-তান অপ্সরার রবে !
আনন্দে কুসুম-সাজ ধরেন ধরণী,—
নন্দন-কানন-জাত পরিমল ভবে
বিতরেন বায়ু-ইন্দ্র পবন আপনি !
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
ভক্তিমূলক
|
(১) কি কহিলি কহ, সই, শুনি লো আবার—
মধুর বচন!
সহসা হইনু কালা; জুড়া এ প্রাণের জ্বালা,
আর কি এ পোড়া প্রাণ পাবে সে রতন?
হ্যাদে তোর পায় ধরি, কহ না লো সত্য করি,
আসিবে কি ব্রজে পুনঃ রাধিকারমণ?(২) কহ, সখি, ফুটিবে কি এ মরুভূমিতে
কুসুমকানন ?
জলহীনা স্রোতস্বতী, হবে কি লো জলবতী,
পয়ঃ সহ পয়োদে কি বহিবে পবন?
হ্যাদে তোর পায় ধরি, কহ না লো সত্য করি,
আসিবে কি ব্রজে পুনঃ রাধিকারঞ্জন?(৩) হায় লো সয়েছি কত, শ্যামের বিহনে—
কতই যাতন।
যে জন অন্তরযামী সেই জানে আর আমি,
কত যে কেঁদেছি তার কে করে বর্ণন?
হ্যাদে তোর পায় ধরি, কহ না লো সত্য করি,
আসিবে কি ব্রজে পুনঃ রাধিকামোহন।(৪) কোথা রে গোকুল-ইন্দু,---বৃন্দাবন-সর—
কুমুদ-বাসন।
বিষাদ নিশ্বাস বায়, ব্রজ, নাথ, উড়ে যায়,
কে রাখিবে, তব রাজ, ব্রজের রাজন!
হ্যাদে তোর পায় ধরি, কহ না লো সত্য করি,
আসিবে কি ব্রজে পুনঃ রাধিকাভূষণ!(৫) শিখিনী ধরি, স্বজনি, গ্রাসে মহাফণী—
বিষের সদন!
বিরহ বিষের তাপে শিখিনী আপনি কাঁপে,
কুলবালা এ জ্বালায় ধরে কি জীবন!
হ্যাদে তোর পায় ধরি, কহ না লো সত্য করি,
আসিবে কি ব্রজে পুনঃ রাধিকারতন!(৬) এই দেখ্, ফুলমালা গাঁথিয়াছি আমি—
মধুর বচন।
দোলাইব শ্যামগলে, বাঁধিব বঁধুরে ছলে—
প্ৰেম-ফুল-ডোরে তাঁরে করিব বন্ধন!
হ্যাদে তোর পায় ধরি, কহ না লো সত্য করি,
আসিবে কি ব্রজে পুনঃ রাধাবিনোদন।(৭) কি কহিলি কহ, সই, শুনি লো আবার—
মধুর বচন।
সহসা হইনু কালা, জুড়া এ প্রাণের জ্বালা
আর কি এ পোড়া প্রাণ পাবে সে রতন!
মধু—যার মধুধ্বনি— কহে কেন কাঁদ, ধনি,
ভুলিতে কি পারে তোমা শ্ৰীমধুসূদন? (ব্রজাঙ্গনা কাব্য)
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
স্বদেশমূলক
|
দাঁড়াও, পথিক-বর, জন্ম যদি তব
বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধিস্থলে
( জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি
বিরাম ) মহীর পদে মহানিদ্রাবৃত
দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন!
যশোরে সাগরদাঁড়ী কবতক্ষ-তীরে
জন্মভূমি, জন্মদাতা দত্ত মহামতি
রাজনারায়ণ নামে, জননী জাহ্নবী!
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
ভক্তিমূলক
|
১ তরুশাখা উপরে, শিখিনি,
কেনে লো বসিয়া তুই বিরস বদনে?
না হেরিয়া শ্যামচাঁদে, তোরও কি পরাণ কাঁদে,
তুইও কি দুঃখিনী!
আহা!কে না ভালবাসে রাধিকারমণে?
কার না জুড়ায় আঁখি শশী, বিহঙ্গিনি?২ আয়,পাখি,আমরা দুজনে
গলা ধরাধরি করি ভাবি লো নীরবে;
নবীন নীরদে প্রাণ; তুই করেছিস্ দান---
সে কি তোর হবে?
আর কি পাইবে রাধা রাধিকারঞ্জনে?
তুই ভাব্ ঘনে ধনি,আমি শ্ৰীমাধবে!৩ কি শোভা ধরয়ে জলধর,
গভীর গরজি যবে উড়ে সে গগনে!
স্বর্ণবর্ণ শক্র-ধনু— রতনে খচিত তনু—
চূড়া শিরোপর;
বিজলী কনক দাম পরিয়া যতনে,
মুকুলিত লতা যথা পরে তরুবর!৪ কিন্তু ভেবে দেখ্ লো কামিনি,
মম শ্যাম-রূপ অনুপম ত্রিভুবনে!
হায়,ও রূপ-মাধুরী, কার মন নাহি চুরি,
করে,রে শিখিনি!
যার অাঁখি দেখিয়াছে রাধিকামোহনে,
সেই জানে কেনে রাধা কুলকলঙ্কিনী!৫ তরুশাখা উপরে, শিখিনি,
কেনে লো বসিয়া তুই বিরসবদনে?
না হেরিয়া শ্যামচাঁদে, তোর কি পরাণ কাঁদে
তুই কি দুঃখিনী?
আহা!কে না ভালবাসে শ্রীমধুসূদনে?
মধু কহে, যা কহিলে,সত্য বিনোদিনি!
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
ভক্তিমূলক
|
১
ওই যে পার্থীটি, সখি, দেখিছ পিঞ্জরে রে,
সতত চঞ্চল,—
কভু কাঁদে, কভু গায়, যেন পাগলিনী-প্রায়,
জলে যথা জ্যোতিবিম্ব—তেমতি তরল!
কি ভাবে ভাবিনী যদি বুঝিতে,স্বজনি,
পিঞ্জর ভাঙিয়া ওরে ছাড়িতে অমনি!২নিজে যে দুঃখিনী, পরদুঃখ বুঝে সেই রে,
কহিনু তোমারে;---
আজি ও পাখীর মনঃ বুঝি আমি বিলক্ষণ---
আমিও বন্দী লো আজি ব্রজ-কারাগারে!
সারিকা অধীর ভাবি কুসুম-কানন,
রাধিকা অধীর ভাবি রাধা-বিনোদন!৩ বনবিহারিণী ধনী বসন্তের সখী রে—
শুকের সুখিনী?
বলে ছলে,ধরে তারে, বাঁধিয়াছ কারাগারে---
কেমনে ধৈরজ ধরি রবে সে কামিনী?
সারিকার দশা, সখি, ভাবিয়া অস্তরে,
রাধিকারে বেঁধো না লো সংসার-পিঞ্জরে!৪ ছাড়ি দেহ বিহগীরে মোর অনুরোধে রে—
হইয়া সদয়।
ছাড়ি দেহ যাক্ চলি, হাসে যথা বনস্থলী---
শুকে দেখি সুখে ওর জুড়াবে হৃদয়!
সারিকার ব্যথা সারি, ওলো দয়াবতি,
রাধিকার বেড়ি ভাঙ—এ মম মিনতি।৫ এ ছার সংসার আজি অাঁধার, স্বজনি রে—
রাধার নয়নে!
কেনে তবে মিছে তারে রাখ তুমি এ আঁধারে---
সফরী কি ধরে প্রাণ বারির বিহনে?
দেহ ছাড়ি, যাই চলি যথা বনমালী;
লাগুক্ কুলের মুখে কলঙ্কের কালি!৬ ভাল যে বাসে, স্বজনি, কি কাজ তাহার রে
কুলমান ধনে?
শ্যামপ্রেমে উদাসিনী রাধিকা শ্যাম-অধীনী---
কি কাজ তাহার অাজি রত্ন আভরণে?
মধু কহে, কুলে ভুলি কর লো গমন---
শ্ৰীমধুসূদন, ধনি, রসের সদন!
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
নহ তুমি পিক, পাখি, বিখ্যাত ভারতে,
মাধবের বাৰ্ত্তাবহ ; যার কুহরণে
ফোটে কোটি ফুল-পুঞ্জ মঞ্জু কুঞ্জবনে !—
তবুও সঙ্গীত-রঙ্গ করিছ যে মতে
গায়ক, পুলক তাহে জনমে এ মনে !
মধুময় মধুকাল সৰ্ব্বত্র জগতে ,—
কে কোথা মলিন কবে মধুর মিলনে,
বসুমতী সতী যবে রত প্রেমব্রতে?—
দুরন্ত কৃতান্ত-সম হেমন্ত এ দেশে
নিৰ্দ্দয় ; ধরার কষ্টে দুষ্ট তুষ্ট অতি !
না দেয় শোভিতে কভু ফুলরত্মে কেশে,
পরায় ধবল বাস বৈধব্যে যেমতি !—
ডাক তুমি ঋতুরাজে, মনোহর বেশে
সাজাতে ধরায় আসি, ডাক শীঘ্ৰগতি !
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
নীতিমূলক
|
খুঁটিতে খুঁটিতে ক্ষুদ কুক্কুট পাইল
একটি রতন;---
বণিকে সে ব্যগ্রে জিজ্ঞাসিল;---
“ঠোঁটের বলে না টুটে, এ বস্তু কেমন?”
বণিক্ কহিল,-“ভাই,
এ হেন অমূল্য রত্ন, বুঝি, দুটি নাই।''
হাসিল কুক্কুট শুনি;---''তণ্ডুলের কণা
বহুমূল্যতর ভাবি;---কি আছে তুলনা?”
“নহে দোষ তোর, মূঢ়, দৈব এ ছলনা,
জ্ঞান-শূন্য করিল গোঁসাই!”
এই কয়ে বণিক ফিরিল।
মূর্খ যে, বিদ্যার মূল্য কভু কি সে জানে?
নর-কুলে পশু বলি লোকে তারে মানে;---
এই উপদেশ কবি দিলা এই ভানে।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
মহাকাব্য
|
প্রমোদ-উদ্যানে কাঁদে দানব-নন্দিনী
প্রমীলা, পতি-বিরহে কাতরা যুবতী।
অশ্রুআঁখি-বিধুমুখী ভ্রমে ফুলবনে
কভু,ব্রজ-কুঞ্জ-বনে,হায়রে, যেমনি
ব্রজবালা,নাহি হেরি কদম্বের মূলে
পীতধড়া পীতাম্বরে,অধরে মূরলী।
অবচয়ি ফুল-চয়ে সে নিকুঞ্জ বনে,
বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি,সখীরে সম্ভাষি
কহিলা প্রমীলা সতী; “এইত তুলিনু
ফুলরাশি; চিকনিয়া গাঁথিনু,স্বজনি,
ফুলমালা;কিন্তু কোথা পাব সে চরণে,
পুস্পাঞ্জলি দিয়া যাহে চাহি পূজিবারে;
কে বাঁধিল মৃগরাজে বুঝিতে না পারি।
চল,সখি, লঙ্কাপুরে যাই মোরা সবে।”
কহিল বাসন্তী সখী;–“কেমনে পশিবে
লঙকাপুরে আজি তুমি? অলঙ্ঘ্য সাগর-
সম রাঘবীয় চমূ বেড়িছে তাহারে;
লক্ষ লক্ষ রক্ষঃ- অরি ফিরিছে চৌদিকে
অস্ত্রপাণি,দন্ডপাণি দন্ডধর যথা”
রুষিলা দানব-বালা প্রমীলা রূপসী;–
“কি কহিলি, বাসন্তি? পর্ব্বত-গৃহ ছাড়ি,
বাহিরায় যবে নদী সিন্ধুর উদ্দেশে,
কার হেন সাধ্য যে সে রোধে তার গতি?
দানব-নন্দিনী আমি,রক্ষ-কুল-বধূ;
রাবণ শ্বশুর মম, মেঘনাদ স্বামী,–
আমি কি ডরাই,সখি,ভিখারী রাঘবে?
পশিব লঙ্কায় আজি নিজ ভূজ-বলে;
দেখিব কেমনে মোরে নিবারে নৃমনি?
যথা বায়ু-সখা সহ দাবানল গতি
দুর্ব্বার,চলিলা সতী পতির উদ্দেশে।
টলিল কনক-লঙ্কা, গর্জ্জিল জলধি;
ঘনঘনাকারে রেণু উড়িল চৌদিকে;–
কিন্তু নিশা-কালে কবে ধূম-পুঞ্জ পারে
আবরিতে অগ্নি-শিখা? অগ্নিশিখা-তেজে
চলিলা প্রমীলা দেবী বামা-বল-দলে।
কতক্ষনে উতরিলা পশ্চিম দুয়ারে
বিধুমুখী। একবারে শত শঙ্খ ধরি
ধ্বনিলা, টঙ্কারি রোষে শত ভীম ধনুঃ,
স্ত্রীবৃন্দ; কাঁপিল লঙকা আতঙ্কে; কাঁপিল
মাতঙ্গে নিষাদী; রথে রথী; তুরঙ্গমে
সাদীবর; সিংহাসনে রাজা;অবরোধে
কুলবধূ; বিহঙ্গম কাঁপিল কুলায়ে;
পর্ব্বত-গহ্বরে সিংহ; বন-হস্তী বনে
ডুবিল অতল জলে জলচর যত ;
শিবিরে বসেন প্রভু রঘু-চুড়ামণি
করপুটে শূর-সিংহ লক্ষণ সম্মুখে,
পাশে বিভীষণ সখা, আর বীর যত,
রুদ্র-কুল-সমতেজঃ,ভৈরব মুরতি ।
সহসা নাদিল ঠাট; ‘জয় রাম’-ধ্বনি
উঠিল আকাশ-দেশে ঘোর কোলাহলে,
সাগর-কল্লোল যথা; ত্রস্তে রক্ষোরথী,
দাশরথি-পানে চাহি, কহিলা কেশরী,–
“চেয়ে দেখ,রাঘবেন্দ্র, শিবির-বাহিরে।
নিশীথে কি ঊষা আসি উতরিলা হেথা?”
বিস্ময়ে চাহিলা সবে শিবির-বাহিরে।
“ভৈরবীরূপিণী বামা,” কহিলা নৃমণি,
“দেবী কি দানবী,সখে, দেখ নিরখিয়া;
মায়াময় লঙ্কা-ধাম; পূর্ণ ইন্দ্রজালে;
কামরূপী তবাগ্রজ। দেখ ভাল করি;
এ কুহক তব কাছে অবিদিত নহে।
শুভক্ষণে, রক্ষোবর,পাইনু তোমারে
আমি। তোমা বিনা,মিত্র,কে আর রাখিবে
এ দুর্ব্বল বলে,কহ,এ বিপত্তি-কালে?
রামের চির-রক্ষণ তুমি রক্ষঃপুরে;”
হেনকালে হনু সহ উতরিলা দূতী
শিবিরে। প্রণমি বামা কৃতাঞ্জলিপুটে,
(ছত্রিশ রাগিণী যেন মিলি এক তানে;)
কহিলা; “প্রণমি আমি রাঘবের পদে,
আর যত গুরুজনে;— নৃ-মুন্ড-মালিনী
নাম মম;দৈত্যবালা প্রমীলা সুন্দরী,
বীরেন্দ্র-কেশরী ইন্দ্রজিতের কামিনী,
তাঁর দাসী।” আশীষিয়া, বীর দাশরথি
সুধিলা; “কি হেতু,দূতি, গতি হেথা তব?
বিশেষিয়া কহ মোরে, কি কাজে তুষিব
তোমার ভর্ত্রিনী,শুভে? কহ শীঘ্র করি;”
উত্তরিলা ভীমা-রূপী; “বীর-শ্রেষ্ঠ তুমি,
রঘুনাথ; আসি যুদ্ধ কর তাঁর সাথে;
নতুবা ছাড়হ পথ; পশিবে রূপসী
স্বর্ণলঙ্কাপুরে আজি পূজিতে পতিরে।”
এতেক কহিয়া বামা শিরঃ নোয়াইলা,
প্রফুল্ল কুসুম যথা (শিশির মন্ডিত)
বন্দে নোয়াইয়া শিরঃ মন্দ-সমীরণে;
উত্তরিলা রঘুপতি; ”শুন, সুকেশিনী,
বিবাদ না করি আমি কভু অকারণে।
অরি মম রক্ষ-পতি; তোমরা সকলে
কুলবালা,কুলবধূ; কোন অপরাধে
বৈরি-ভাব আচরিব তোমাদেরসাথে?
আনন্দে প্রবেশ লঙ্কা নিঃশঙ্ক হৃদয়ে”।
এতেক কহিয়া প্রভু কহিলা হনুরে;–
“দেহ ছাড়ি পথ, বলি। অতি সাবধানে,
শিষ্ট আচরণে তুষ্ট কর বামা-দলে।”
প্রণমিয়া সীতানাথে বাহিরিলা দূতী
হাসিয়া কহিলা মিত্র বিভীষণ “দেখ,
প্রমীলার পরাক্রম দেখ বাহিরিয়া,
রঘুপতি;দেখ, দেব, অপূর্ব কৌতুক।
না জানি এ বামা-দলে কে আঁটে সমরে
ভীমারূপী, বীর্য্যবতী চামুন্ডা যেমতি–
রক্তবীজ-কুল-অরি?” কহিলা রাঘব;–
”চল, মিত্র, দেখি তব ভ্রাতৃ-পুত্র-বধূ।”
যথা দূর দাবানল পশিলে কাননে,
অগ্নিময় দশ দিশ; দেখিলা সম্মুখে
রাঘবেন্দ্র বিভা-রাশি নির্ধূম আকাশে,
সুবর্নি বারিদপুঞ্জে; শুনিলা চমকি
কোদন্ড-ঘর্ঘর ঘোর,ঘোড়া-দড়বড়ি,
হুহুঙ্কার,কোষে বদ্ধ অসির ঝনঝনি।
সে রোলের সহ মিশি বাজিছে বাজনা,
ঝড় সঙ্গে বহে যেন কাকলী লহরী;
উড়িছে পতাকা —রত্ন-সঙ্কলিত-আভা;
মন্দগতি আস্কন্দিতে নাচে বজী রাজী;
বোলিছে ঘুঙ্ঘুরাবলী ঘুনু ঘুনু বোলে।
গিরিচূড়াকৃতি ঠাট দাঁড়ায় দুপাশে
অটল,চলিছে মধ্যে বামা-কুল-দল;
উপত্যকা-পথে যথা মাতঙ্গিনী-যূথ,
গরজে পূরিয়া দেশ, ক্ষিতি টলমলি।
সর্ব-অগ্রে উগ্রচন্ডা নৃ-মুন্ডমালিনী,
কৃষ্ণ-হয়ারূঢ়া ধনী, ধ্বজ-দন্ড করে
হৈমময়; তার পাছে চলে বাদ্যকরী,
বিদ্যাধরী-দল যথা, হায় রে ভূতলে
অতুলিত; বীণা বাঁশী, মৃদঙ্গ, মন্দিরা-
আদি যন্ত্র বাজে মিলি মধুর নিক্কণে;
তার পাছে শূল-পাণি বীরাঙ্গনা-মাঝে
প্রমীলা,তারার দলে শশিকলা যথা;
চলি গেলা বামাকুল। কেহ টঙ্কারিলা
শিঞ্জিনী; হুঙ্কারি কেহ উলঙ্গিলা অসি;
আস্ফালিলা শূলে কেহ; হাসিলা কেহ বা
অট্টহাসে টিটকারি; কেহ বা নাদিলা,
গহন বিপিনে যথা নাদে কেশরিণী,
বীর-মদে, কাম-মদে উন্মাদ ভৈরবী;
লক্ষ্য করি রক্ষোবরে, কহিলা রাঘব;–
”কি আশ্চর্য্য, নৈকষেয়? কভু নাহি দেখি,
কভু নাহি শুনি হেন এ তিন ভুবনে;
নিশার স্বপন আজি দেখিনু কি জাগি?”
উত্তরিলা বিভীষণ; ”নিশার স্বপন
নহে এ,বৈদেহী-নাথ,কহিনু তোমারে।
কালনেমি নামে দৈত্য বিখ্যাত জগতে
সুরারি,তনয়া তার প্রমীলা সুন্দরী।
মহাশক্তি-সম তেজে;দম্ভোলি-নিক্ষেপী
সহস্রাক্ষে যে হর্ষ্যক্ষ বিমুখে সংগ্রামে,
সে রক্ষেন্দ্রে,রাঘবেন্দ্র,রাখে পদতলে
বিমোহিনী,দিগম্বরী যথা দিগম্বরে;”
লঙ্কার কনক-দ্বারে উতরিলা সতী
প্রমীলা। বাজিল শিঙ্গা,বাজিল দুন্দুভি
ঘোর রবে;গরজিল ভীষণ রাক্ষস,
প্রলয়ের মেঘ কিম্বা করীযুথ যথা;
উচ্চৈস্বরে কহে চন্ডা নৃ-মুন্ডমালিনী;—
”কাহারে হানিস্ অস্ত্র,ভীরু,এ আঁধারে?
নহি রক্ষোরিপু মোরা, রক্ষঃ-কুল-বধূ,
খুলি চক্ষুঃ দেখ চেয়ে।” অমনি দুয়ারী
টানিল হুড়ুকা ধরি হুড় হুড় হড়ে;
বজ্রশব্দে খুলে দ্বার। পশিলা সুন্দরী
আনন্দে কনক লঙ্কা জয় জয় রবে। ==========
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
বাহ্য-জ্ঞান শূন্য করি,নিদ্রা মায়াবিনী
কত শত রঙ্গ করে নিশা-আগমনে!---
কিন্তু কি শকতি তোর এ মর-ভবনে
লো আশা!---নিদ্রার কেলি আইলে যামিনী,
ভাল মন্দ ভুলে লোক যখন শয়নে,
দুখ,সুখ,সত্য,মিথ্যা!তুই কুহকিনী,
তোর লীলা-খেলা দেখি দিবার মিলনে,---
জাগে যে স্বপন তারে দেখাস্,রঙ্গিণি!
কাঙ্গালী যে,ধন-ভোগ তার তোর বলে;
মগন যে,ভাগ্য-দোষে বিপদ-সাগরে,
(ভুলি ভূত,বর্ত্তমান ভুলি তোর ছলে)
কালে তীর-লাভ হবে,সেও মনে করে!
ভবিষ্যৎ-অন্ধকারে তোর দীপ জ্বলে,---
এ কুহক পাইলি লো কোন্ দেব-বরে?
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
নীতিমূলক
|
ময়ুর কহিল কাঁদি গেীরীর চরণে,
কৈলাস-ভবনে;—
“অবধান কর দেবি,
আমি ভৃত্য নিত্য সেবি
প্রিয়োত্তম সুতে তব এ পৃষ্ঠ-আসনে।
রথী যথা দ্রুত রথে,
চলেন পবন-পথে
দাসের এ পিঠে চড়ি সেনানী সুমতি;
তবু, মা গো, আমি দুখী অতি!
করি যদি কেকাধ্বনি,
ঘৃণায় হাসে অমনি
খেচর, ভূচর জন্তু;—মরি, মা, শরমে!
ডালে মূঢ় পিক যবে
গায় গীত, তার রবে
মাতিয়া জগৎ-জন বাখানে অধমে!
বিবিধ কুসুম কেশে,
সাজি মনোহর বেশে,
বরেন বসুধা দেবী যবে ঋতুবরে
কোকিল মঙ্গল-ধ্বনি করে।
অহরহ কুহুধ্বনি বাজে বনস্থলে;
নীরবে থাকি, মা, আমি; রাগে হিয়া জ্বলে!
ঘুচাও কলঙ্ক শুভঙ্করি,
পুত্রের কিঙ্কর আমি এ মিনতি করি,
পা দুখানি ধরি।”
উত্তর করিলা গৌরী সুমধুর স্বরে;—
“পুত্রের বাহন তুমি খ্যাত চরাচরে,
এ আক্ষেপ কর কি কারণে?
হে বিহঙ্গ, অঙ্গ-কান্তি ভাবি দেখ মনে!
চন্দ্রককলাপে দেখ নিজ পুচ্ছ-দেশে;
রাখাল রাজার সম চূড়াখানি কেশে!
আখণ্ডল-ধনুর বরণে
মণ্ডিলা সু-পুচ্ছ ধাতা তোমার সৃজনে!
সদা জ্বলে তব গলে
স্বর্ণহার ঝল ঝলে,
যাও, বাছা, নাচ গিয়া ঘনের গর্জ্জনে,
হরষে সু-পুচ্ছ খুলি
শিরে স্বর্ণ-চূড়া তুলি;
করগে কেলি ব্রজ-কুঞ্জ-বনে।
করতালি ব্রজাঙ্গনা
দেবে রঙ্গে বরাঙ্গনা—
তোষ গিয়া ময়ূরীরে,প্রেম-আলিঙ্গনে!
শুন বাছা, মোর কথা শুন,
দিয়াছেন কোন কোন গুণ,
দেব সনাতন প্রতি-জনে;
সু-কলে কোকিল গায়,
বাজ বজ্র-গতি ধায়,
অপরূপ রূপ তব, খেদ কি কারণে?”—
নিজ অবস্থায় সদা স্থির যার মন,
তার হতে সুখীতর অন্য কোন্ জন?
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
সুন্দর নদের তীরে হেরিনু সুন্দরী
বামারে মলিন-মুখী,শরদের শশী
রাহুর তরাসে যেন!সে বিরলে বসি,
মৃদে কাঁদে সুবদনা;ঝরঝরে ঝরি,
গলে অশ্রু-বিন্দু,যেন মুক্তা-ফল খসি!
সে নদের স্রোতঃ অশ্রু পরশন করি,
ভাসে,ফুল্ল কমলের স্বর্ণকান্তি ধরি,
মধুলোভী মধুকরে মধুরসে রসি
গন্ধামোদী গন্ধবহে সুগন্ধ প্রদানী।
না পারি বুঝিতে মায়া,চাহিনু চঞ্চলে
চৌদিকে;বিজন দেশ;হৈল দেব-বাণী;---
''কবিতা-রসের স্রোতঃ এ নদের ছলে;
করুণা বামার নাম---রস-কুলে রাণী;
সেই ধন্য,বশ সতী যার তপোবলে!''
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
মেনকা অপ্সরারূপী, ব্যাসের ভারতী
প্রসবি, ত্যজিলা ব্যস্তে, ভারত-কাননে,
শকুন্তলা সুন্দরীরে, তুমি, মহামতি,
কণ্বরূপে পেয়ে তারে পালিলা যতনে,
কালিদাস ! ধন্য কবি, কবি-কুল-পতি !
তব কাব্যাশ্রমে হেরি এ নারী-রতনে
কে না ভাল বাসে তারে, দুষ্মন্ত যেমতি
প্রেমে অন্ধ?কে না পড়ে মদন-বন্ধনে?
নন্দনের পিক-ধ্বনি সুমধুর গলে;
পারিজাত-কুসুমের পরিমল শ্বাসে;
মানস-কমল-রুচি বদন-কমলে;
অধরে অমৃত-সুধা;সৌদামিনী হাসে;
কিন্তু ও মৃগাক্ষি হতে যবে গলি,ঝলে
অশ্রুধারা,ধৈর্য্য ধরে কে মর্ত্ত্যে,আকাশে?
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
চিন্তামূলক
|
রাগিণী বসন্ত,তাল ধীমা তেতালা
শুন হে সভাজন!
আমি অভাজন,
দীন ক্ষীণ জ্ঞানগুণে,
ভয় হয় দেখে শুনে,
পাছে কপাল বিগুণে,
হারাই পূর্ব্ব মূলধন! যদি অনুরাগ পাই,
আনন্দের সীমা নাই,
এ কাষেতে একষাই,
দিব দরশন!
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
“কি কাজ বাজায়ে বীণা ; কি কাজ জাগায়ে
সুমধুর প্রতিধ্বনি কাব্যের কাননে ?
কি কাজ গরজে ঘন কাব্যের গগনে
মেঘ-রূপে, মনোরূপ ময়ূরে নাচায়ে ?
স্বতরিতে তুলি তোরে বেড়াবে কি বায়ে
সংসার-সাগর-জলে, স্নেহ করি মনে
কোন জন ?দেবে---অন্ন অৰ্দ্ধ মাত্র খায়ে,
ক্ষুধায় কাতর তোরে দেখি রে তোরণে ?
ছিঁড়ি তার-কুল, বীণা ছুড়ি ফেল দূরে! ”
কহে সাংসারিক জ্ঞান—ভবে বৃহস্পতি ।
কিন্তু চিত্ত-ক্ষেত্রে যবে এ বীজ অস্কুরে,
উপাড়ে ইহায় হেন কাহার শকতি ?
উদাসীন-দশা তার সদা জীব-পুরে,
যে অভাগা রাঙা পদ ভজে, মা ভারতি।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
বড় রম্য স্থলে বাস তোর, লো সরসি!
দগধা বসুধা যবে চৌদিকে প্রখরে
তপনের, পত্রময়ী শাখা ছত্র ধরে
শীতলিতে দেহ তোর ; মৃদু শ্বাসে পশি,
সুগন্ধ পাখার রূপে, বায়ু বায়ু করে।
বাড়াতে বিরাম তোর আদরে, রূপসি,
শত শত পাতা মিলি মিষ্টে মরমরে;
স্বর্ণ-কান্তি ফুল ফুটি, তোর তটে বসি,
যোগায় সৌরভ-ভোগ, কিঙ্করী যেমতি
পাট-মহিষীর খাটে, শয়ন-সদনে।
নিশায় বাসর রঙ্গ তোর, রসবতি,
লয়ে চাঁদে,—কত হাসি প্রেম-আলিঙ্গনে!
বৈতালিক-পদে তোর পিক-কুল-পাত;
ভ্রমর গায়ক ; নাচে খঞ্জন, ললনে ।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
যথা ঘোর বনে ব্যাধ বধি অজাগরে,
চিরি শিরঃ তার, লভে অমূল রতনে ;
বিমুখি কেশীরে আজি, হে রাজা, সমরে,
লভিলা ভুবন-লোভ তুমি কাম-ধনে !
হে সুভগ, যাত্রা তব বড় শুভ ক্ষণে !—
ঐ যে দেখিছ এবে, গিরির উপরে,
আচ্ছন্ন, হে মহীপতি, মূৰ্চ্ছা-রূপ ঘনে
চাঁদেরে, কে ও, তা জান ? জিজ্ঞাস সত্বরে,
পরিচয় দেবে সখী, সমুখে যে বসি ।
মানসে কমল, বলি, দেখেছ নয়নে ;
দেখেছ পূর্ণিমা-রাত্রে শরদের শশী ;
বধিয়াছ দীর্ঘ-শৃঙ্গী কুরঙ্গে কাননে;---
সে সকলে ধিক্ মান ! ওই হে উৰ্ব্বশী !
সোণার পুতলি যেন, পড়ি অচেতনে।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
কে সৃজিলা এ সুবিশ্বে,জিজ্ঞাসিব কারে
এ রহস্য কথা,বিশ্বে,আমি মন্দমতি?
পার যদি,তুমি দাসে কহ,বসুমতি;---
দেহ মহা-দীক্ষা,দেবি,ভিক্ষা,চিনিবারে
তাঁহায়,প্রসাদে যাঁর তুমি,রূপবতি,---
ভ্রম অসম্ভ্রমে শূন্যে!কহ,হে আমারে,
কে তিনি,দিনেশ রবি,করি এ মিনতি,
যাঁর আদি জ্যোতিঃ,হেম-আলোক সঞ্চারে
তোমার বদন,দেব,প্রত্যহ উজ্জ্বলে?
অধম চিনিতে চাহে সে পরম জনে,
যাঁহার প্রসাদে তুমি নক্ষত্র-মণ্ডলে
কর কেলি নিশাকালে রজত-আসনে,
নিশানাথ।নদকুল,কহ কলকলে,
কিম্বা তুমি,অম্বুপতি,গম্ভীর স্বননে।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
গীতিগাথা
|
উদয়-অচলে,
দিবা-মুখে এক-চক্রে দিলা দরশন,
অংশু-মালা গলে,
বিতরি সুবর্ণ-রশ্মি চৌদিকে তপন।
ফুটিল কমল-জলে
সূর্য্যমুখী সুখে স্থলে,
কোকিল গাইল কলে,
আমোদি কানন।
জাগে বিশ্বে নিদ্রা ত্যজি বিশ্ববাসী জন;
পুনঃ যেন দেব স্রষ্টা সৃজিলা মহীরে;
সজীব হইলা সবে জনমি, অচিরে।
অবহেলি উদয়-অচলে,
শূন্য-পথে রথবর চলে;
বাড়িতে লাগিল বেলা,
পদ্মের বাড়িল খেলা,
রজনী তারার মেলা সর্ব্বত্র ভাঙ্গিল;—
কর-জালে দশ দিক্ হাসি উজলিল।
উঠিতে লাগিলা ভানু নীল নভঃস্থলে;
দ্বিতীয়-তপন-রূপে নীল সিন্ধু-জলে
মৈনাক ভাসিল।
কহিল গম্ভীরে শৈল দেব দিবাকরে;—
“দেখি তব ধীর গতি দুখে আঁখি ঝরে;
পাও যদি কষ্ট,—এস, পৃষ্ঠাসন দিব;
যেখানে উঠিতে চাও, সবলে তুলিব।”
কহিলা হাসিয়া ভানু;—“তুমি শিষ্টমতি;
দৈববলে বলী অামি, দৈববলে গতি।” মধ্যাকাশে শোভিল তপন,—
উজ্জ্বল-যৌবন, প্রচণ্ড-কিরণ;
তাপিল উত্তাপে মহী; পবন বহিলা
অাগুনের শ্বাস-রূপে; সব শুকাইলা---
শুকাল কাননে ফুল;
প্রাণিকুল ভয়াকুল;
জলের শীতল দেহ দহিয়া উঠিল;
কমলিনী কেবল হাসিল!
হেন কালে পতনের দশা,
আ মরি; সহসা
আসি উতরিল;—
হিরণ্ময় রাজাসন ত্যজিতে হইল!
অধোগামী এবে রবি,
বিষাদে মলিন-ছবি,
হেরি মৈনাকেরে পুনঃ নীল সিন্ধু-জলে,
সম্ভাষি কহিলা কুতূহলে;—
“পাইতেছি কষ্ট, ভাই, পূর্ব্বাসন লাগি;
দেহ পৃষ্ঠাসন এবে, এই বর মাগি;
লও ফিরে মোরে, সখে, ও মধ্য-গগনে;—
অাবার রাজত্ব করি, এই ইচ্ছা মনে।”
হাসি উত্তরিল শৈল;—“হে মূঢ় তপন,
অধঃপাতে গতি যার কে তার রক্ষণ!
রমার থাকিলে কৃপা, সবে ভালবাসে;—
কাঁদ যদি, সঙ্গে কাঁদে; হাস যদি, হাসে;
ঢাকেন বদন যবে মাধব-রমণী,
সকলে পলায় রড়ে, দেখি যেন ফণী।”
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
শুনিনু নিদ্রায় আমি,নিকুঞ্জ-কাননে,
মনোহর বীণা-ধ্বনি;---দেখিনু সে স্থলে
রূপস পুরুষ এক কুসুম-আসনে,
ফুলের ঠৌপর শিরে,ফুল-মালা গলে।
হাত ধরাধরি করি নাচে কুতূহলে
চৌদিকে রমণী-চয়,কামাগ্নি-নয়নে,---
উজলি কানন-রাজি বরাঙ্গ-ভূষণে,
ব্রজে যথা ব্রজাঙ্গনা রাস-রঙ্গ-ছলে।
সে কামাগ্নি-কণা লয়ে সে যুবক,হাসি
জ্বালাইছে হিয়াবৃন্দে;ফুল-ধনুঃ ধরি
হানিতেছে চারি দিকে বাণ রাশি রাশি
কি দেব কি নর উভে জর জর করি!
''কামদেব অবতার রস-কুলে আসি,
শৃঙ্গার রসের নাম।''জাগিনু শিহরি।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
মেঘ-রূপ চাপ ছাড়ি, বজ্রাগ্নি যেমনে
পড়ে পাহাড়ের শৃঙ্গে ভীষণ নির্ঘোষে ;
হেরি ক্ষেত্রে ক্ষত্র-গ্লানি দুষ্ট দুঃশাসনে,
রৌদ্ররূপী ভীমসেন ধাইলা সরোষে ;
পদাঘাতে বসুমতী কাঁপিলা সঘনে ;
বাজিল ঊরুতে অসি গুরু অসি-কোষে
যথা সিংহ সিংহনাদে ধরি মৃগে বনে
কামড়ে প্রগাঢ়ে ঘাড় লহু-ধারা শোষে ;
বিদরি হৃদয় তার ভৈরব-আরবে,
পান করি রক্ত-স্রোতঃ গৰ্জ্জিলা পাবনি ।
“মানাগ্নি নিবানু আমি আজি এ আহবে
বর্ব্বর!–পাঞ্চালী সতী, পাণ্ডব-রমণী,
তার কেশপাশ পর্শি, আকর্ষিলি যবে,
কুরু-কুলে রাজলক্ষ্মী ত্যজিলা তখনি।"
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;--
তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,
পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ
পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।
কাটাইনু বহু দিন সুখ পরিহরি!
অনিদ্রায়, অনাহারে সঁপি কায়, মনঃ,
মজিনু বিফল তপে অবরেণ্যে বরি;--
কেলিনু শৈবালে, ভুলি কমল-কানন!
স্বপ্নে তব কুললক্ষ্মী কয়ে দিলা পরে, --
"ওরে বাছা, মাতৃকোষে রতনের রাজি,
এ ভিখারী-দশা তবে কেন তোর আজি?
যা ফিরি, অজ্ঞান তুই, যারে ফিরি ঘরে।"
পালিলাম আজ্ঞা সুখে' পাইলাম কালে
মাতৃভাষা-রূপ খনি, পূর্ণ মণিজালে।।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
প্রকৃতিমূলক
|
১ কনক উদয়াচলে তুমি দেখা দিলে,
হে সুর-সুন্দরি!
কুমুদ-মুদয়ে আঁখি, কিন্তু সুখে গায় পাখী,
গুঞ্জরি নিকুঞ্জে ভ্ৰমে ভ্রমর ভ্রমরী;
বরসরোজিনী ধনী, তুমি হে তার স্বজনী,
নিত্য তার প্রাণনাথে আন সাথে করি!2 তুমি দেখাইলে পথ যায় চক্রবাকী
যথা প্রাণপতি!
ব্ৰজাঙ্গনে দয়া করি, লয়ে চল যথা হরি,
পথ দেখাইয়া তারে দেহ শীঘ্ৰগতি!
কাঁদিয়া কাঁদিয়া আঁধা, আজি গো শ্যামের রাধা,
ঘুচাও আঁধার তার, হৈমবতি সতি!৩ হায়, ঊষা, নিশাকালে আশার স্বপনে
ছিলাম ভুলিয়া,
ভেবেছিনু তুমি, ধনি, নাশিবে ব্রজ রজনী,
ব্রজের সরোজরবি ব্রজে প্রকাশিয়া!
ভেবেছিনু কুঞ্জবনে পাইব পরাণধনে
হেরিব কদম্বমূলে রাধা-বিনোদিয়া!৪ মুকুতা-কুণ্ডলে তুমি সাজাও, ললনে,
কুসুমকামিনী;
অান মন্দ সমীরণে বিহারিতে তার সনে
রাধা-বিনোদনে কেন আন না, রঙ্গিণি?
রাধার ভূষণ যিনি, কোথায় আজি গো তিনি
সাজাও আনিয়া তাঁরে রাধা বিরহিণী!৫ ভালে তব জ্বলে, দেবি, আভাময় মণি---
বিমল কিরণ;
ফণিনী নিজ কুন্তলে পরে মণি কুতূহলে
কিন্তু মণি-কুলরাজা ব্রজের রতন!
মধু কহে,ব্রজাঙ্গনে, এই লাগে মোর মনে
ভূতলে অতুল মণি শ্রীমধুসূদন!
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
''যেয়ো না,রজনি,আজি লয়ে তারাদলে!
গেলে তুমি,দয়াময়ি,এ পরাণ যাবে!---
উদিলে নির্দ্দয় রবি উদয়-অচলে,
নয়নের মণি মোর নয়ন হারাবে!
বার মাস তিতি,সত্যি,নিত্য অশ্রুজলে,
পেয়েছি উমায় আমি!কি সান্ত্বনা-ভাবে---
তিনটি দিনেতে,কহ,লো তারা-কুন্তলে,
এ দীর্ঘ বিরহ-জ্বালা এ মন জুড়াবে?
তিন দিন স্বর্ণদীপ জ্বলিতেছে ঘরে
দূর করি অন্ধকার;শুনিতেছি বাণী---
মিষ্টতম এ সৃষ্টিতে এ কর্ণ-কুহরে!
দ্বিগুণ আঁধার ঘর হবে,আমি জানি,
নিবাও এ দীপ যদি!''---কহিলা কাতরে
নবমীর নিশা-শেষে গিরীশের রাণী।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
হেরিনু নিশায় তরি অপথ সাগরে,
মহাকায়া, নিশাচরী, যেন মায়া-বলে,
বিহঙ্গিনী-রূপ ধরি, ধীরে ধীরে চলে,
রঙ্গে সুধবল পাখা বিস্তারি অম্বরে!
রতনের চূড়া-রূপে শিরোদেশে জ্বলে
দীপাবলী, মনোহরা নানা বর্ণ করে,—
শ্বেত, রক্ত, নীল, পীত, মিশ্রিত পিঙ্গলে
চারি দিকে ফেনাময় তরঙ্গ সুস্বরে
গাইছে আনন্দে যেন, হেরি এ সুন্দরী
বামারে, বাখানি রূপ, সাহস, আকৃতি।
ছাড়িতেছে পথ সবে আস্তে ব্যস্তে সরি,
নীচ জন হেরি যথা কুলের যুবতী।
চলিছে গুমরে বামা পথ আলো করি,
শিরোমণি-তেজে যথা ফণিনীর গতি।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
নীতিমূলক
|
একটি সন্দেশ চুরি করি,
উড়িয়া বসিলা বৃক্ষোপরি,
কাক, হৃষ্ট-মনে;
সুখাদ্যের বাস পেয়ে,
আইল শৃগালী ধেয়ে,
দেখি কাকে কহে দুষ্টা মধুর বচনে;—
“অপরূপ রূপ তব, মরি!
তুমি কি গো ব্রজের শ্রীহরি,—
গোপিনীর মনোবাঞ্ছা?—কহ গুণমণি! হে নব নীরদ-কান্তি,
ঘুচাও দাসীর ভ্রান্তি,
যুড়াও এ কান দুটি করি বেণু-ধ্বনি!
পুণ্যবতী গোপ-বধূ অতি।
তেঁই তারে দিলা বিধি,
তব সম রূপ-নিধি,—
মোহ হে মদনে তুমি; কি ছার যুবতী?
গাও গীত, গাও, সখে করি এ মিনতি!
কুড়াইয়া কুসুম-রতনে,
গাঁথি মালা সুচারু গাঁথনে,
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
কি পাপে, কহ তা মোরে, লো বন-সুন্দরি,
কোমল হৃদয়ে তব পশিল,—কি পাপে—
এ বিষম যমদূত ? কাঁদে মনে করি
পরাণ যাতনা তব ; কত যে কি তাপে
পোড়ায় দুরন্ত তোমা, বিষদন্তে হরি
বিরাম দিবস নিশি ! মৃদে কি বিলাপে
এ তোমার দুখ দেখি সখী মধুকরী,
উড়ি পড়ি তব গলে যবে লো সে কাঁপে ?
বিষাদে মলয় কি লো, কহ, সুবদনে,
নিশ্বাসে তোমার ক্লেশে, যবে লো সে আসে
যাচিতে তোমার কাছে পরিমল-ধনে ?
কানন-চন্দ্রিমা তুমি কেন রাহু-গ্রাসে?
মনস্তাপ-রূপে রিপু, হায়, পাপ-মনে,
এইরূপে, রূপবতি, নিত্য সুখ নাশে !
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
রাজসূয়-যজ্ঞে যথা রাজাদল চলে
রতন-মুকুট শিরে ; আসিছে সঘনে
অগন্য জোনাকীব্রজ, এই তরুতলে
পূজিতে রজনী-যোগে বৃষভ-বাহনে।
ধূপরূপ পরিমল অদূর কাননে
পেয়ে, বহিতেছে তাহে হেথা কুতূহলে
মলয় ; কৌমুদী, দেখ, রজত-চরণে
বীচি-রব-রূপ পরি নূপুর, চঞ্চলে
নাচিছে; আচাৰ্য্য-রূপে এই তরু-পতি
উচ্চারিছে বীজমন্ত্র। নীরবে অম্বরে,
তারাদলে তারানাথ করেন প্রণতি
(বোধ হয়) আরাধিয়া দেবেশ শঙ্করে !
তুমিও, লো কল্লোলিনি, মহাব্ৰতে ব্ৰতী,—
সাজায়েছ, দিব্য সাজে, বর-কলেবরে !
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
কেন মন্দ গ্রহ বলি নিন্দা তোমা করে
জ্যোতিষী ? গ্রহেন্দ্র তুমি,শনি মহামতি!
ছয় চন্দ্র রত্নরূপে সুবর্ণ টোপরে
তোমার ; সুকটিদেশে পর, গ্রহ-পতি
হৈম সারসন, যেন আলোক-সাগরে !
সুনীল গগন-পথে ধীরে তব গতি।
বাখানে নক্ষত্র-দল ও রাজ-মূরতি
সঙ্গীতে, হেমাঙ্গ বীণা বাজায়ে অম্বরে।
হে চল রশ্মির রাশি,সুধি কোন জনে,---
কোন জীব তব রাজ্যে আনন্দে নিবাসে?
জন-শূন্য নহ তুমি,জানি আমি মনে,
হেন রাজা প্রজা-শূন্য,---প্রত্যয়ে না আসে!---
পাপ,পাপ-জাত মৃত্যু,জীবন-কাননে,
তব দেশে,কীটরূপে কুসুম কি নাশে?
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
ইতালি, বিখ্যাত দেশ, কাব্যের কানন,
বহুবিধ পিক যথা গায় মধুস্বরে,
সঙ্গীত‐সুধার রস করি বরিষণ,
বাসন্ত আমোদে আমোদ মন পূরি নিরন্তরে;—
সে দেশে জনম পূর্বে করিলা গ্রহণ
ফ্রাঞ্চিস্কো পেতরাকা কবি; বাক্দেবীর বরে
বড়ই যশস্বী সাধু, কবি‐কুল‐ধন,
রসনা অমৃতে সিক্ত, স্বর্ণ বীণা করে।
কাব্যের খনিতে পেয়ে এই ক্ষুদ্র মণি,
স্বমন্দিরে প্রদানিলা বাণীর চরণে
কবীন্দ্র: প্রসন্নভাবে গ্রহিলা জননী
(মনোনীত বর দিয়া) এ উপকরণে।
ভারতে ভারতী‐পদ উপযুক্ত গণি,
উপহাররূপে আজি অরপি রতনে॥
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
প্রকৃতিমূলক
|
হিমন্তের আগমনে সকলে কম্পিত,
রামাগণ ভাবে মনে হইয়া দুঃখিত।
মনাগুনে ভাবে মনে হইয়া বিকার,
নিবিল প্রেমের অগ্নি নাহি জ্বলে অার।
ফুরায়েছে সব অাশা মদন রাজার
অাসিবে বসন্ত অাশা—এই অাশা সার।
অাশায় অাশ্রিত জনে নিরাশ করিলে,
অাশাতে আশার বশ অাশায় মারিলে।
সৃজিয়াছি অাশাতরু অাশিত হইয়া,
নষ্ট কর হেন তরু নিরাশ করিয়া।
যে জন করয়ে আশা, অাশার অাশ্বাসে,
নিরাশ করয়ে তারে কেমন মানসে॥
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
ভৈরব-আকৃতি শূরে দেখিনু নয়নে
গিরি-শিরে ; বায়ু-রথে, পূর্ণ ইরম্মদে,
প্রলয়ের মেঘ যেন! ভীম শরাসনে
ধরি বাম করে বীর, মত্ত বীর-মদে,
টঙ্কারিছে মুহুর্মুহুঃ,হুঙ্কারি ভীষণে,
ব্যোমকেশ-সম কায়;ধরাতল পদে,
রতন-মণ্ডিত শিরঃ ঠেকিছে গগনে,
বিজলী-ঝলসা-রূপে উজলি জলদে।
চাঁদের পরিধি,যেন রাহুর গরাসে
ঢালখান;ঊরু-দেশে অসি তীক্ষ্ণ অতি,
চৌদিকে,বিবিধ অস্ত্র।সুধিনু তরাসে,---
''কে এ মহাজন,কহ গিরি মহামতি?''
আইল শব্দ বহি স্তব্ধ আকাশে---
''বীর-রস এ বীবেন্দ্র,রস-কুল-পতি!''
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
ভক্তিমূলক
|
(১) সখি রে,—
বন অতি রমিত হইল ফুল ফুটনে!
পিককুল কলকল, চঞ্চল অলিদল,
উছলে সুরবে জল,
চল লো বনে!
চল লো, জুড়াব আঁখি দেখি ব্ৰজরমণে!(২) সখি রে,—
উদয় অচলে ঊষা, দেখ, আসি হাসিছে!
এ বিরহ বিভাবরী কাটানু ধৈরজ ধরি
এবে লো রব কি করি?
প্রাণ কাঁদিছে!
চল লো নিকুঞ্জে যথা কুঞ্জমণি নাচিছে!(৩) সখি রে,—
পূজে ঋতুরাজে আজি ফুলজালে ধরণী!
ধূপরূপে পরিমল, আমোদিছে বনস্থল,
বিহঙ্গমকুলকল,
মঙ্গল ধ্বনি!
চল লো, নিকুঞ্জ পূজি শ্যামরাজে, স্বজনি!(৪) সখি রে,—
পাদ্যরূপে অশ্রুধারা দিয়া ধোব চরণে!
দুই কর কোকনদে, পূজিব রাজীব পদে;
শ্বাসে ধূপ, লো প্রমদে,
ভাবিয়া মনে!
কঙ্কণ কিঙ্কিণী ধ্বনি বাজিবে লো সঘনে।(৫) সখি রে,—
এ যৌবন ধন, দিব উপহার রমণে!
ভালে যে সিন্দূরবিন্দু, হইবে চন্দনবিন্দু;---
দেখিব লো দশ ইন্দু
সুনখগণে!
চিরপ্রেম বর মাগি লব, ওলো ললনে!(৬) সখি রে,—
বন অতি রমিত হইল ফুল ফুটনে!
পিককুল কলকল, চঞ্চল অলিদল
উছলে সুরবে জল,
চল লো বনে!
চল লো, জুড়াব আঁখি দেখি—মধুসূদনে!
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
বিষাগার শিরঃ হেরি মণ্ডিত কমলে
তোর, যম-দূত, জন্মে বিস্ময় এ মনে!
কোথায় পাইলি তুই,—কোন্ পুণ্যবলে—
সাজাতে কুচূড়া তোর, হেন সুভূষণে ?
বড়ই অহিত-কারী তুই এ ভবনে।
জীব-বংশ-ধ্বংস-রূপে সংসার-মণ্ডলে
সৃষ্টি তোর। ছটফটি, কে না জানে, জ্বলে
শরীর, বিষাগ্নি যবে জ্বালাস্ দংশনে?—
কিন্তু তোর অপেক্ষা রে, দেখাইতে পারি,
তীক্ষ্ণতর বিষধর অরি নর-কুলে!
তোর সম বাহ-রূপে অতি মনোহারী,—
তোর সম শিরঃ-শোভা রূপ-পদ্ম-ফুলে।
কে সে ? কবে কবি, শোন্! সে রে সেই নারী,
যৌবনের মদে যে রে ধৰ্ম্ম-পথ ভুলে!
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
যথা তুষারের হিয়া, ধবল-শিখরে,
কভু নাহি গলে রবি-বিভার চুম্বনে,
কামানলে ; অবহেলি মন্মথের শরে
রথীন্দ্র, হেরিল, জাগি, শয়ন-সদনে
( কনক-পুতলী যেন নিশার স্বপনে )
উৰ্ব্বশীরে । “কহ, দেবি, কহ এ কিঙ্করে,”—
সুধিলা সম্ভাষি শূর সুমধুর স্বরে,
“কি হেতু অকালে হেথা, মিনতি চরণে ?”
উন্মদা মদন-মদে, কহিলা উৰ্ব্বশী ;
“কামাতুরা আমি, নাথ, তোমার কিঙ্করী ;
সরের সুকান্তি দেখি যথা পড়ে খসি
কৌমুদিনী তার কোলে, লও কোলে ধরি
দাসীরে ; অধর দিয়া অধর পরশি,
যথা কৌমুদিনী কাঁপে, কাঁপি থর থরি।”
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
কি দুখে,হে পাখি,তুমি শাখার উপরে
বসি,বউ কথা কও,কও এ কাননে?----
মানিনী ভামিনী কি হে,ভামের গুমরে,
পাখা-রূপ ঘোমটায় ঢেকেছে বদনে?
তেঁই সাধ তারে তুমি মিনতি-বচনে?
তেঁই হে এ কথাগুলি কহিছ কাতরে?
বড়ই কৌতুক,পাখি,জনমে এ মনে---
নর-নারী-রঙ্গ কি হে বিহঙ্গিনী করে?
সত্য যদি,তবে শুন,দিতেছি যুকতি;
(শিখাইব শিখেছি যা ঠেকি এ কু-দায়ে)
পবনের বেগে যাও যথায় যুবতী;
''ক্ষম,প্রিয়ে'' এই বলি পড় গিয়া পায়ে!---
কভু দাস,কভু প্রভু,শুন,ক্ষুণ্ণ-মতি,
প্রেম-রাজ্যে রাজাসন থাকে এ উপায়ে।।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
মূঢ় সে, পণ্ডিতগণে তাহে নাহি গণি,
কহে যে, রূপসী তুমি নহ, লো সুন্দরি
ভাষা!—শত ধিক্ তারে! ভুলে সে কি করি,
শকুন্তলা তুমি, তব মেনকা জননী ?
রূপ-হীনা দুহিতা কি, মা যার অপ্সরী ?—
বীণার রসনা-মূলে জন্মে কি কুধ্বনি ?
কবে মন্দ-গন্ধ শ্বাস শ্বাসে ফুলেশ্বরী
নলিনী ? সীতারে গর্ভে ধরিলা ধরণী ।
দেব-যোনি মা তোমার ; কাল নাহি নাশে
রূপ তাঁর ; তবু কাল করে কিছু ক্ষতি ।
নব রস-সুধা কোথা বয়েসের হাসে ?
কালে সুবর্ণের বর্ণ ম্লান, লো যুবতি!
নব শশিকলা তুমি ভারত-আকাশে,
নব-ফুল বাক্য-বনে, নব মধুমতী।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
তোমার হরণ-গীত গাব বঙ্গাসরে
নব তানে, ভেবেছিনু সুভদ্রা সুন্দরি;
কিন্তু ভাগ্যদোষে, শুভে, আশার লহরী
শুখাইল, যথা গ্ৰীষ্মে জলরাশি সরে!
ফলে কি ফুলের কলি যদি প্রেমাদরে
না দেন শিশিরামৃত তারে বিভাবরী?
ঘৃতাহুতি না পাইলে, কুণ্ডের ভিতরে,
ম্রিয়মাণ, অভিমানে তেজঃ পরিহরি,
বৈশ্বানর দুরদৃষ্ট মোর, চন্দ্রাননে,
কিন্তু ( ভবিষ্যৎ কথা কহি ) ভবিষ্যতে
ভাগ্যবানতর কবি, পূজি দ্বৈপায়নে,
ঋষি-কুল-রত্ব দ্বিজ গাবে লো ভারতে
তোমার হরণ-গীত ; তুষি বিজ্ঞ জনে
লভিবে সুযশঃ, সাঙ্গি---এ সঙ্গীত-ব্ৰতে !
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
ভক্তিমূলক
|
(১) কোথা রে রাখাল-চূড়ামণি?
গোকুলের গাভীকুল, দেখ,সখি,শোকাকুল,
না শুনে সে মুরলীর ধ্বনি!
ধীরে ধীরে গোষ্ঠে সবে পশিছে নীরব,—
আইল গোধূলি, কোথা রহিল মাধব! (২) আইল লো তিমির যামিনী;
তরুডালে চক্রবাকী বসিয়া কাঁদে একাকী--
কাঁদে যথা রাধা বিরহিণী!
কিন্তু নিশা অবসানে হাসিবে সুন্দরী;
আর কি পোহাবে কভু মোর বিভাবরী?(৩) ওই দেখ উদিছে গগনে—
জগত-জন-রঞ্জন— সুধাংশু রজনীধন,
প্রমদা কুমুদী হাসে প্রফুল্লিত মনে;
কলঙ্কী শশাঙ্ক, সখি, তোষে লো নয়ন--
ব্রজ-নিষ্কলঙ্ক-শশী চুরি করে মন।(৪) হে শিশির, নিশার আসার!
তিতিও না ফুলদলে ব্রজে আজি তব জলে,
বৃথা ব্যয় উচিত গো হয় না তোমার;
রাধার নয়ন-বারি ঝরি অবিরল,
ভিজাইবে আজি ব্রজে—যত ফুলদল!(৫) চন্দনে চর্চ্চিয়া কলেবর,
পরি নানা ফুলসাজ, লাজের মাথায় বাজ;
মজায় কামিনী এবে রসিক নাগর;
তুমি বিনা, এ বিরহ, বিকট মূরতি,
কারে আজি ব্রজাঙ্গনা দিবে প্রেমারতি?(৬) হে মন্দ মলয় সমীরণ,
সৌরভ ব্যাপারী তুমি, ত্যজ আজি ব্রজভূমি--
অগ্নি যথা জ্বলে তথা কি করে চন্দন?
যাও হে, মোদিত কবলয় পরিমলে,
জুড়াও সুরতক্লান্ত সীমন্তিনী দলে!(৭) যাও চলি, বায়ু-কুলপতি,
কোকিলার পঞ্চস্বর বহ তুমি নিরন্তর--
ব্রজে আজি কাঁদে যত ব্রজের যুবতী!
মধু ভণে, ব্রজাঙ্গনে, করো না রোদন,
পাবে বঁধু---অঙ্গীকারে শ্রীমধুসূদন!(ব্রজাঙ্গনা কাব্য)
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
ভক্তিমূলক
|
(১) শুনেছি মলয় গিরি তোমার আলয়—
মলয় পবন!
বিহঙ্গিনীগণ তথা গায়ে বিদ্যাধরী যথা,
সঙ্গীত সুধায় পূরে নন্দনকানন; কুসুমকুলকামিনী, কোমলা কমলা জিনি,
সেবে তোমা, রতি যথা সেবেন মদন!(২) হায়, কেনে ব্রজে আজি ভ্ৰমিছ হে তুমি—
মন্দ সমীরণ?
যাও সরসীর কোলে, দোলাও মৃদু হিল্লোলে
সুপ্রফুল্ল নলিনীরে—প্রেমানন্দ মন!
ব্ৰজ-প্রভাকর যিনি ব্ৰজ আজি ত্যজি তিনি,
বিরাজেন অস্তাচলে—নন্দের নন্দন!(৩) সৌরভ রতন দানে তুষিবে তোমারে
আদরে নলিনী;
তব তুল্য উপহার কি আজি আছে রাধার?
নয়ন আসারে, দেব, ভাসে সে দুঃখিনী!
যাও যথা পিকবধূ— বরিষে সঙ্গীত-মধু,—
এ নিকুঞ্জে কাঁদে আজি রাধা বিরহিণী।(৪) তবে যদি, সুভগ, এ অভাগীর দুঃখে
দুঃখী তুমি মনে,
যাও আশু, আশুগতি, যথা ব্ৰজকুলপতি—
যাও যথা পাবে, দেব, ব্রজের রতনে!
রাখার রোদনধ্বনি বহ যথা শ্যামমণি—
কহ তাঁরে মরে রাধা শ্যামের বিহনে!(৫) যাও চলি, মহাবলি, যথা বনমালী–
রাধিকা-বাসন;
তুঙ্গ শৃঙ্গ দুষ্টমতি, রোধে যদি তব গতি,
মোর অনুরোধে তারে ভেঙো, প্রভঞ্জন!
তরুরাজ যুদ্ধ আশে, তোমারে যদি সম্ভাষে--
ব্রজাঘাতে যেও তায় করিয়া দলন!(৬) দেখি তোমা পীরিতের ফাঁদ পাতে যদি
নদী রূপবতী;
মজো না বিভ্রমে তার, তুমি হে দূত রাধার,
হেরো না, হেরো না দেব কুসুম যুবতী!
কিনিতে তোমার মন, দিবে সে সৌরভধন,
অবহেলি সে ছলনা, যেয়ো আশুগতি!(৭) শিশিরের নীরে ভাবি অশ্রুবারিধারা,
ভুলো না, পবন!
কোকিলা শাখা উপরে, ডাকে যদি পঞ্চস্বরে,
মোর কিরে---শীঘ্র করে ছেড়ো সে কানন!
স্মরি রাধিকার দুঃখ, হইও সুখে বিমুখ—
মহৎ যে পরদুঃখে দুঃখী সে সুজন!(৮) উতরিবে যবে যথা রাধিকারমণ,
মোর দূত হয়ে,
কহিও গোকুল কাঁদে হারাইয়া শ্যামচাঁদে---
রাধার রোদনধ্বনি দিও তাঁরে লয়ে;
আর কথা আমি নারী শরমে কহিতে নারি,---
মধু কহে, ব্রজাঙ্গনে, আমি দিব কয়ে।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
ভেবো না জনম তার এ ভবে কুক্ষণে,
কমলিনী-রূপে যার ভাগ্য-সরোবরে
না শোভেন মা কমলা সুবর্ণ কিরণে ;–
কিন্তু যে, কম্পনা-রূপ খনির ভিতরে
কুড়ায়ে রতন-ব্ৰজ, সাজায় ভূষণে
স্বভাষা, অঙ্গের শোভা বাড়ায়ে আদরে!
কি লাভ সঞ্চয়ি, কহ, রজত কাঞ্চনে,
ধনপ্রিয় ?বাঁধা রমা চির কার ঘরে ?
তার ধন-অধিকারী হেন জন নহে,
যে জন নিৰ্ব্বংশ হলে বিস্মৃতি-আঁধারে
ডুবে নাম, শিলা যথা তল-শূন্য দলে।
তার ধন-অধিকারী নারে মরিবারে–
রসনা-যন্ত্রের তার যত দিন বহে
ভাবের সঙ্গীত-ধ্বনি, বাঁচে সে সংসারে।।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
দেব-অবতার ভাবি বন্দে যে তোমারে,
নাহি চাহে মনঃ মোর তাহে নিন্দা করি,
তরুরাজ ! প্রত্যক্ষতঃ ভারত-সংসারে,
বিধির করুণা তুমি তরু-রূপ ধরি !
জীবকুল-হিতৈষিণী, ছায়া সু-সুন্দরী,
তোমার দুহিতা, সাধু ! যবে বসুধারে
দগধে আগ্নেয় তাপে, দয়া পরিহরি,
মিহির, আকুল জীব বাঁচে পূজি তাঁরে।
শত-পত্রময় মঞ্চে, তোমার সদনে,
খেচর—অতিথি-ব্রজ, বিরাজে সতত,
পদ্মরাগ ফলপুঞ্জে ভুঞ্জি হৃষ্ট-মনে ;—
মৃদু-ভাষে মিষ্টালাপ কর তুমি কত,
মিষ্টালাপি, দেহ-দাহ শীতলি যতনে !
দেব নহ; কিন্তু গুণে দেবতার মত।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
মহাকাব্য
|
কুশাসনে ইন্দ্রজিৎ পূজে ইষ্টদেবে
নিভৃতে; কৌশিক বস্ত্র,কৌশিক উত্তরি,
চন্দনের ফোঁটা ভালে, ফুলমালা গলে।
পুড়ে ধূপ দানে ধূপ; জ্বলিছে চৌদিকে
পুত ঘৃতরসে দীপ; পুস্প রাশি রাশি,
গন্ডারের শৃঙ্গে গড়া কোষা কোষী, ভরা
হে জাহ্নবি, তব জলে, কলুষনাশিনী
তুমি; পাশে হেম-ঘন্টা, উপহার নানা
হেমপাত্রে; রুদ্ধ দ্বার;— বসেছে একাকী
যমদূত, ভীমবাহু লক্ষণ পশিলা
মায়াবলে দেবালয়ে। ঝনঝনিল অসি
পিধানে,ধ্বনিল বাজি তুণীর-ফলকে,
কাঁপিল মন্দির ঘন বীরপদভরে।
চমকি মুদিত আঁখি মিলিলা রাবণি।
দেখিলা সম্মুখে বলী দেবকৃতি রথী—
তেজস্বী মধ্যাহ্নে যথা দেব অংশুমালী;
সাষ্টাঙ্গে প্রণমি শূর, কৃতাঞ্জলিপুটে,
কহিলা “হে বিভাবসু, শুভক্ষণে আজি
পূজিল তোমারে দাস, তেঁই, প্রভু, তুমি
পবিত্রিলা লঙ্কাপুরী ও পদ-অর্পণে;
কিন্তু কি কারণে,কহ, তেজস্বি, আইলা
রক্ষঃকুলরিপু নর লক্ষণের রূপে
প্রসাদিতে এ অধীনে? এ কি লীলা তব,
প্রভাময়? ”পুনঃ বলী নমিলা ভূতলে।
উত্তরিলা বীরদর্পে রৌদ্র দাশরথি;—
”নহি বিভাবসু আমি, দেখ নিরখিয়া,
রাবণি; লক্ষণ নাম, জন্ম রঘুকুলে;
সংহারিত, বীরসিংহ, তোমায় সংগ্রামে
আগমন হেথা মম; দেহ রণ মোরে
অবিলম্বে।” যথা পথে সহসা হেরিলে
ঊর্দ্ধফণা ফণীশ্বরে, ত্রাসে হীনগতি
পথিক, চাহিলা বলী লক্ষণের পানে
সভয় হইল আজি ভয়শূ্ন্য হিয়া;
প্রচন্ড উত্তাপে পিন্ড হায় রে গলিল;
গ্রাসিল মিহিরে রাহু, সহসা আঁধারি
তেজপুঞ্জ ;অম্বুনাথে নিদাঘ শুষিল;
পশিল কৌশলে কলি নলের শরীরে;
বিস্ময়ে কহিলা শূর, “সত্য যদি তুমি
রামানুজ,কহ,রথি,কি ছলে পশিলা
রক্ষোরাজপুরে আজি? রক্ষঃ শত শত,
যক্ষপতিত্রাস বলে, ভীম-অস্ত্রপাণি,
রক্ষিছে নগরদ্বার;শৃঙ্গধরসম
এ পুর-প্রাচীর উচ্চ;—প্রাচীর উপরে ==========
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
উজলি ঠৌদিক এবে রূপের কিরণে,
বীরেশ ভীমের পাশে কর যোড় করি
দাঁড়াইলা,প্রেম-ডোরে বাঁধা কায় মনে
হিড়িম্বা;সুবর্ণ-কান্তি বিহঙ্গী সুন্দরী
কিরাতের ফাঁদে যেন!ধাইল কাননে
গন্ধামোদে অন্ধ অলি,আনন্দে গুঞ্জরি,---
গাইল বাসন্তামোদে শাখার উপরি
মধুমাখা গীত পাখী সে নিকুঞ্জ-বনে।
সহসা নড়িল বন ঘোর মড়মড়ে,
মদ-মত্ত হস্তী কিম্বা গণ্ডার সরোষে
পশিলে বনেতে,বন যেই মতে নড়ে!
দীর্ঘ-তাল-তুল্য গদা ঘুরায়ে নির্ঘোষে,
ছিন্ন করি লতা-কুলে ভাঙি বৃক্ষ রড়ে,
পশিল হিড়িম্ব রক্ষঃ----রৌদ্র ভগ্নী-দোষে।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
নিশান্তে সুবর্ণ-কান্তি নক্ষত্র যেমতি
(তপনের অনুচর ) সুচারু কিরণে
খেদায় তিমির-পুঞ্জে ; হে কবি, তেমতি
প্রভা তব বিনাশিল মানস-ভুবনে
অজ্ঞান!জনম তব পরম সুক্ষণে।
নব কবি-কুল-পিতা তুমি, মহামতি,
ব্রহ্মাণ্ডের এ সুখণ্ডে । তোমার সেবনে
পরিহরি নিদ্রা পুনঃ জাগিলা ভারতী।
দেবীর প্রসাদে তুমি পশিলা সাহসে
সে বিষম দ্বার দিয়া আঁধার নরকে,
যে বিষম দ্বার দিয়া, ত্যজি আশা,পশে
পাপ প্রাণ, তুমি, সাধু, পশিলা পুলকে।
যশের আকাশ হতে কভু কি হে খসে।
এ নক্ষত্ৰ?কোন্ কীট কাটে এ কোরকে?
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
কি সুরাজ্যে, প্রাণ, তব রাজ-সিংহাসন !
বাহু-রূপে দুই রথী, দুর্জয় সমরে,
বিধির বিধানে পুরী তব রক্ষা করে ;—
পঞ্চ অনুচর তোমা সেবে অনুক্ষণ ।
সুহাসে ঘ্ৰাণেরে গন্ধ দেয় ফুলবন ;
যতনে শ্রবণ আনে সুমধুর স্বরে ;
সুন্দর যা কিছু আছে, দেখায় দর্শন
ভূতলে, সুনীল নভে, সৰ্ব্ব চরাচরে !
স্পর্শ, স্বাদ, সদা ভোগ যোগায়, সুমতি !
পদরূপে দুই বাজী তব রাজ-দ্বারে ;
জ্ঞান-দেব মন্ত্রী তব—ভবে বৃহস্পতি ;—
সরস্বতী অবতার রসনা সংসারে !
স্বর্ণস্রোতোরূপে লহু, অবিরল-গতি,
বহি অঙ্গে, রঙ্গে ধনী করে হে তোমারে !
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
ভক্তিমূলক
|
(১) ফুটিল বকুলকুল কেন লো গোকুলে আজি,
কহ তা, স্বজনি?
আইলা কি ঋতুরাজ? ধরিলা কি ফুলসাজ,
বিলাসে ধরণী?
মুছিয়া নয়ন-জল, চল লো সকলে চল,
শুনিব তমাল তলে বেণুর সুরব;---
আইল বসন্ত যদি, আসিবে মাধব!(২) যে কালে ফুটে লো ফুল, কোকিল কুহরে, সই,
কুসুমকাননে,
মুঞ্জরয়ে তরুবলী, গুঞ্জরয়ে সুখে অলি,
প্রেমানন্দ মনে,
সে কালে কি বিনোদিয়া, প্রেমে জলাঞ্জলি দিয়া,
ভুলিতে পারেন, সখি, গোকুলভবন?
চল লো নিকুঞ্জবনে পাইব সে ধন!(৩) স্বন, স্বন, স্বনে শুন, বহিছে পবন, সই,
গহন কাননে,
হেরি শ্যামে পাই প্ৰীত, গাইছে মঙ্গল গীত,
বিহঙ্গমগণে!
কুবলয় পরিমল, নহে এ ; স্বজনি, চল,—
ও সুগন্ধ দেহগন্ধ বহিছে পবন।
হায় লো, শ্যামের বপুঃ সৌরভসদন!(৪) উচ্চ বীচি রবে, শুন, ডাকিছে যমুনা ওই
রাধায়, স্বজনি;
কল কল কল কলে, সুতরঙ্গ দল চলে,
যথা গুণমণি।
সুধাকর-কররাশি সম লো শ্যামের হাসি,
শোভিছে তরল জলে; চল, ত্বরা করি—
ভুলি গে বিরহ-জ্বালা হেরি প্রাণহরি!(৫) ভ্রমর গুঞ্জরে যথা ; গায় পিকবর, সই,
সুমধুর বোলে;
মরমরে পাতাদল; মৃদুরবে বহে জল
মলয় হিল্লোলে;---
কুসুম-যুবতী হাসে, মোদি দশ দিশ বাসে,—
কি সুখ লভিব, সখি, দেখ ভাবি মনে,
পাই যদি হেন স্থলে গোকুলরতনে?(৬) কেন এ বিলম্ব আজি, কহ ওলো সহচরি,
করি এ মিনতি?
কেন অধোমুখে কাঁদ, আবরি বদনচাঁদ,
কহ, রূপবতি?
সদা মোর সুখে সুখী, তুমি ওলো বিধুমুখি,
আজি লো এ রীতি তব কিসের কারণে?
কে বিলম্বে হেন কালে? চল কুঞ্জবনে!(৭) কাঁদিব লো সহচরি, ধরি সে কমলপদ,
চল, ত্বরা করি,
দেখিব কি মিষ্ট হাসে, শুনিব কি মিষ্ট ভাষে,
তোষেন শ্রীহরি
দুঃখিনী দাসীরে; চল, হইমু লো হতবল,
ধীরে ধীরে ধরি মোরে, চল লো স্বজনি ;–
সুধে---মধু শূন্য কুঞ্জে কি কাজ, রমণি?(ব্রজাঙ্গনা কাব্য)
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
শত ধিক্ সে মনেরে, কাতর যে মনঃ
পরের সুখেতে সদা এ ভব-ভবনে !
মোর মতে নর-কুলে কলঙ্ক সে জন
পোড়ে আঁখি যার যেন বিষ-বরিষণে,
বিকশে কুসুম যদি, গায় পিক-গণে
বাসন্ত আমোদে পূরি ভাগ্যের কানন
পরের! কি গুণ দেখে, কব তা কেমনে,
প্রসাদ তোমার, রম, কর বিতরণ
তুমি ? কিন্তু এ প্রসাদ, নমি যোড় করে
মাগি রাঙা পায়ে, দেবি; দ্বেষের অনলে
( সে মহানরক ভবে!) সুখী দেখি পরে,
দাসের পরাণ যেন কভু নাহি জ্বলে,
যদিও না পাত তুমি তার ক্ষুদ্র ঘরে
রত্ন-সিংহাসন, মা গো, কুভাগ্যের বলে!
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
মহাকাব্য
|
সম্মুখ সমরে পড়ি, বীর-চূড়ামণি
বীরবাহু, চলি যবে গেলা যমপুরে
অকালে, কহ, হে দেবি অমৃতভাষিণি,
কোন্ বীরবরে বরি সেনাপতি-পদে,
পাঠাইলা রণে পুনঃ রক্ষঃকুলনিধি
রাঘবারি? কি কৌশলে, রাক্ষসভরসা
ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদে — অজেয় জগতে —
ঊর্মিলাবিলাসী নাশি, ইন্দ্রে নিঃশঙ্কিলা?
বন্দি চরণারবিন্দ, অতি মন্দমতি
আমি, ডাকি আবার তোমায়, শ্বেতভুজে
ভারতি! যেমতি, মাতঃ, বসিলা আসিয়া,
বাল্মীকির রসনায় (পদ্মাসনে যেন)
যবে খরতর শরে, গহন কাননে,
ক্রৌঞ্চবধূ সহ ক্রৌঞ্চে নিষাদ বিঁধিলা,
তেমতি দাসেরে, আসি, দয়া কর, সতি।
কে জানে মহিমা তব এ ভবমণ্ডলে?
নরাধম আছিল যে নর নরকুলে
চৌর্যে রত, হইল সে তোমার প্রসাদে,
মৃ্ত্যুঞ্জয়, যথা মৃত্যুঞ্জয় উমাপতি!
হে বরদে, তব বরে চোর রত্নাকর
কাব্যরত্নাকর কবি! তোমার পরশে,
সুচন্দন-বৃক্ষশোভা বিষবৃক্ষ ধরে!
হায়, মা, এহেন পুণ্য আছে কি এ দাসে?
কিন্তু যে গো গুণহীন সন্তানের মাঝে
মূঢ়মতি, জননীর স্নেহ তার প্রতি
সমধিক। ঊর তবে, ঊর দয়াময়ি
বিশ্বরমে! গাইব, মা, বীররসে ভাসি,
মহাগীত; ঊরি, দাসে দেহ পদছায়া।
— তুমিও আইস, দেবি তুমি মধুকরী
কল্পনা! কবির ঢিত্ত-ফুলবন-মধু
লয়ে, রচ মধুচক্র, গৌড়জন যাহে
আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি।কনক-আসনে বসে দশানন বলী —
হেমকূট-হৈমশিরে শৃঙ্গবর যথা
তেজঃপুঞ্জ। শত শত পাত্রমিত্র আদি
সভাসদ, নতভাবে বসে চারি দিকে।
ভূতলে অতুল সভা — স্ফটিকে গঠিত;
তাহে শোভে রত্নরাজি, মানস-সরসে
সরস কমলকুল বিকশিত যথা।
শ্বেত, রক্ত, নীল, পীত, স্তম্ভ সারি সারি
ধরে উচ্চ স্বর্ণছাদ, ফণীন্দ্র যেমতি,
বিস্তারি অযুত ফণা, ধরেন আদরে
ধরারে। ঝুলিছে ঝলি ঝালরে মুকুতা,
পদ্মরাগ, মরকত, হীরা; যথা ঝোলে
(খচিত মুকুলে ফুল) পল্লবের মালা
ব্রতালয়ে। ক্ষণপ্রভা সম মুহুঃ হাসে
রতনসম্ভবা বিভা — ঝলসি নয়নে!
সুচারু চামর চারুলোচনা কিঙ্করী
ঢুলায়; মৃণালভুজ আনন্দে আন্দোলি
চন্দ্রাননা। ধরে ছত্র ছত্রধর; আহা
হরকোপানলে কাম যেন রে না পুড়ি
দাঁড়ান সে সভাতলে ছত্রধর-রূপে!—
ফেরে দ্বারে দৌবারিক, ভীষণ মুরতি,
পাণ্ডব-শিবির দ্বারে রুদ্রেশ্বর যথা
শূলপাণি! মন্দে মন্দে বহে গন্ধে বহি,
অনন্ত বসন্ত-বায়ু, রঙ্গে সঙ্গে আনি
কাকলী লহরী, মরি! মনোহর, যথা
বাঁশরীস্বরলহরী গোকুল বিপিনে!
কি ছার ইহার কাছে, হে দানবপতি
ময়, মণিময় সভা, ইন্দ্রপ্রস্থে যাহা
স্বহস্তে গড়িলা তুমি তুষিতে পৌরবে?এহেন সভায় বসে রক্ষঃকুলপতি,
বাক্যহীন পুত্রশোকে! ঝর ঝর ঝরে
অবিরল অশ্রুধারা — তিতিয়া বসনে,
যথা তরু, তীক্ষ্ণ শর সরস শরীরে
বাজিলে, কাঁদে নীরবে। কর জোড় করি,
দাঁড়ায় সম্মুখে ভগ্নদূত, ধূসরিত
ধূলায়, শোণিতে আর্দ্র সর্ব কলেবর।
বীরবাহু সহ যত যোধ শত শত
ভাসিল রণসাগরে, তা সবার মাঝে
একমাত্র বাঁচে বীর; যে কাল তরঙ্গ
গ্রাসিল সকলে, রক্ষা করিল রাক্ষসে—
নাম মকরাক্ষ, বলে যক্ষপতি সম।
এ দূতের মুখে শুনি সুতের নিধন,
হায়, শোকাকুল আজি রাজকুলমণি
নৈকষেয়! সভাজন দুঃখী রাজ-দুঃখে।
আঁধার জগৎ, মরি, ঘন আবরিলে
দিননাথে! কত ক্ষণে চেতন পাইয়া,
বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি, কহিলা রাবণ;—“নিশার স্বপনসম তোর এ বারতা,
রে দূত! অমরবৃন্দ যার ভুজবলে
কাতর, সে ধনুর্ধরে রাঘব ভিখারী
বধিল সম্মুখ রণে? ফুলদল দিয়া
কাটিলা কি বিধাতা শাল্মলী তরুবরে?
হা পুত্র, হা বীরবাহু, বীর-চূড়ামণি!
কি পাপে হারানু আমি তোমা হেন ধনে?
কি পাপ দেখিয়া মোর, রে দারুণ বিধি,
হরিলি এ ধন তুই? হায় রে, কেমনে
সহি এ যাতনা আমি? কে আর রাখিবে
এ বিপুল কুল-মান এ কাল সমরে!
বনের মাঝারে যথা শাখাদলে আগে
একে একে কাঠুরিয়া কাটি, অবশেষে
নাশে বৃক্ষে, হে বিধাতঃ, এ দুরন্ত রিপু
তেমতি দুর্বল, দেখ, করিছে আমারে
নিরন্তর! হব আমি নির্মূল সমূলে
এর শরে! তা না হলে মরিত কি কভু
শূলী শম্ভুসম ভাই কুম্ভকর্ণ মম,
অকালে আমার দোষে? আর যোধ যত—
রাক্ষস-কুল-রক্ষণ? হায়, সূর্পণখা,
কি কুক্ষণে দেখেছিলি, তুই অভাগী,
কাল পঞ্চবটীবনে কালকূটে ভরা
এ ভুজগে? কি কুক্ষণে (তোর দুঃখে দুঃখী)
পাবক-শিখা-রূপিণী জানকীরে আমি
আনিনু এ হৈম গেহে? হায় ইচ্ছা করে,
ছাড়িয়া কনকলঙ্কা, নিবিড় কাননে
পশি, এ মনের জ্বালা জুড়াই বিরলে!
কুসুমদাম-সজ্জিত, দীপাবলী-তেজে
উজ্জ্বলিত নাট্যশালা সম রে আছিল
এ মোর সুন্দরী পুরী! কিন্তু একে একে
শুখাইছে ফুল এবে, নিবিছে দেউটি;
নীরব রবাব, বীণা, মুরজ, মুরলী;
তবে কেন আর আমি থাকি রে এখানে?
কার রে বাসনা বাস করিতে আঁধারে?”এইরূপে বিলাপিলা আক্ষেপে রাক্ষস–
কুলপতি রাবণ; হায় রে মরি, যথা
হস্তিনায় অন্ধরাজ, সঞ্জয়ের মুখে
শুনি, ভীমবাহু ভীমসেনের প্রহারে
হত যত প্রিয়পুত্র কুরুক্ষেত্র-রণে!তবে মন্ত্রী সারণ (সচিবশ্রেষ্ঠ বুধঃ)
কৃতাঞ্জলিপুটে উঠি কহিতে লাগিলা
নতভাবে; — “হে রাজন্, ভুবন বিখ্যাত,
রাক্ষসকুলশেখর, ক্ষম এ দাসেরে!
হেন সাধ্য কার আছে বুঝায় তোমারে
এ জগতে? ভাবি, প্রভু দেখ কিন্তু মনে;—
অভ্রভেদী চূড়া যদি যায় গুঁড়া হয়ে
বজ্রাঘাতে, কভু নহে ভূধর অধীর
সে পীড়নে। বিশেষতঃ এ ভবমণ্ডল
মায়াময়, বৃথা এর দুঃখ সুখ যত।
মোহের ছলনে ভুলে অজ্ঞান যে জন।”উত্তর করিলা তবে লঙ্কা-অধিপতি;—
“যা কহিলে সত্য, ওহে অমাত্য-প্রধান
সারণ! জানি হে আমি, এ ভব-মণ্ডল
মায়াময়, বৃথা এর দুঃখ সুখ যত।
কিন্তু জেনে শুনে তবু কাঁদে এ পরাণ
অবোধ। হৃদয়-বৃন্তে ফুটে যে কুসুম,
তাহারে ছিঁড়িলে কাল, বিকল হৃদয়
ডোবে শোক-সাগরে, মৃণাল যথা জলে,
যবে কুবলয়ধন লয় কেহ হরি।”এতেক কহিয়া রাজা, দূত পানে চাহি,
আদেশিলা,— “কহ, দূত, কেমনে পড়িল
সমরে অমর-ত্রাস বীরবাহু বলী?”প্রণমি রাজেন্দ্রপদে, করযুগ জুড়ি,
আরম্ভিলা ভগ্নদূত;— “হায়, লঙ্কাপতি,
কেমনে কহিব আমি অপূর্ব কাহিনী?
কেমনে বর্ণিব বীরবাহুর বীরতা?—
মদকল করী যথা পশে নলবনে,
পশিলা বীরকুঞ্জর অরিদল মাঝে
ধনুর্ধর। এখনও কাঁপে হিয়া মম
থরথরি, স্মরিলে সে ভৈরব হুঙ্কারে!
শুনেছি, রাক্ষসপতি, মেঘের গর্জনে;
সিংহনাদে; জলধির কল্লোলে; দেখেছি
দ্রুত ইরম্মদে, দেব, ছুটিতে পবন–
পথে; কিন্তু কভু নাহি শুনি ত্রিভুবনে,
এহেন ঘোর ঘর্ঘর কোদণ্ড-টঙ্কারে!
কভু নাহি দেখি শর হেন ভয়ঙ্কর!—পশিলা বীরেন্দ্রবৃন্দ বীরবাহু সহ
রণে, যূথনাথ সহ গজযূথ যথা।
ঘন ঘনাকারে ধূলা উঠিল আকাশে,—
মেঘদল আসি যেন আবরিলা রুষি
গগনে; বিদ্যুৎঝলা-সম চকমকি
উড়িল কলম্বকুল অম্বর প্রদেশে
শনশনে!— ধন্য শিক্ষা বীর বীরবাহু!
কত যে মরিল অরি, কে পারে গণিতে?এইরূপে শত্রুমাঝে যুঝিলা স্বদলে
পুত্র তব, হে রাজন্! কত ক্ষণ পরে,
প্রবেশিলা, যুদ্ধে আসি নরেন্দ্র রাঘব।
কনক-মুকুট শিরে, করে ভীম ধনুঃ,
বাসবের চাপ যথা বিবিধ রতনে
খচিত,”— এতেক কহি, নীরবে কাঁদিল
ভগ্নদূত, কাঁদে যথা বিলাপী, স্মরিয়া
পূর্বদুঃখ! সভাজন কাঁদিলা নীরবে।অশ্রুময়-আঁখি পুনঃ কহিলা রাবণ,
মন্দোদরীমনোহর;— “কহ, রে সন্দেশ–
বহ, কহ, শুনি আমি, কেমনে নাশিলা
দশাননাত্মজ শূরে দশরথাত্মজ?”
“কেমনে, হে মহীপতি,” পুনঃ আরম্ভিল
ভগ্নদূত, “কেমনে, হে রক্ষঃকুলনিধি,
কহিব সে কথা আমি, শুনিবে বা তুমি?
অগ্নিময় চক্ষুঃ যথা হর্যক্ষ, সরোষে
কড়মড়ি ভীম দন্ত, পড়ে লম্ফ দিয়া
বৃষস্কন্ধে, রামচন্দ্র আক্রমিলা রণে
কুমারে! চৌদিকে এবে সমর-তরঙ্গ
উথলিল, সিন্ধু যথা দ্বন্দ্বি বায়ু সহ
নির্ঘোষে! ভাতিল অসি অগ্নিশিখাসম
ধূমপুঞ্জসম চর্মাবলীর মাঝারে
অযুত! নাদিল কম্বু অম্বুরাশি-রবে!—
আর কি কহিব, দেব? পূর্বজন্মদোষে,
একাকী বাঁচিনু আমি! হায় রে বিধাতঃ,
কি পাপে এ তাপ আজি দিলি তুই মোরে?
কেন না শুইনু আমি শরশয্যোপরি,
হৈমলঙ্কা-অলঙ্কার বীরবাহু সহ
রণভূমে? কিন্তু নহি নিজ দোষে দোষী।
ক্ষত বক্ষঃস্থল মম, দেখ, নৃপমণি,
রিপু-প্রহরণে; পৃষ্ঠে নাহি অস্ত্রলেখা।”
এতেক কহিয়া স্তব্ধ হইল রাক্ষস
মনস্তাপে। লঙ্কাপতি হরষে বিষাদে
কহিলা; “সাবাসি, দূত! তোর কথা শুনি,
কোন্ বীর-হিয়া নাহি চাহে রে পশিতে
সংগ্রামে? ডমরুধ্বনি শুনি কাল ফণী
কভু কি অলসভাবে নিবাসে বিবরে?
ধন্য লঙ্কা, বীরপুত্রধারী! চল, সবে,—
চল যাই, দেখি, ওহে সভাসদ-জন,
কেমনে পড়েছে রণে বীর-চূড়ামণি
বীরবাহু; চল, দেখি জুড়াই নয়নে।”উঠিলা রাক্ষসপতি প্রাসাদ-শিখরে,
কনক-উদয়াচলে দিনমণি যেন
অংশুমালী। চারিদিকে শোভিল কাঞ্চন-
সৌধ-কিরীটিনী লঙ্কা— মনোহরা পুরী!
হেমহর্ম্য সারি সারি পুষ্পবন মাঝে;
কমল-আলয় সরঃ; উৎস রজঃ-ছটা;
তরুরাজি; ফুলকুল— চক্ষু-বিনোদন,
যুবতীযৌবন যথা; হীরাচূড়াশিরঃ
দেবগৃহ; নানা রাগে রঞ্জিত বিপণি,
বিবিধ রতনপূর্ণ; এ জগৎ যেন
আনিয়া বিবিধ ধন, পূজার বিধানে,
রেখেছে, রে চারুলঙ্কে, তোর পদতলে,
জগত-বাসনা তুই, সুখের সদন।দেখিলা রাক্ষসেশ্বর উন্নত প্রাচীর—
অটল অচল যথা; তাহার উপরে,
বীরমদে মত্ত, ফেরে অস্ত্রীদল, যথা
শৃঙ্গধরোপরি সিংহ। চারি সিংহদ্বার
(রুদ্ধ এবে) হেরিলা বৈদেহীহর; তথা
জাগে রথ, রথী, গজ, অশ্ব, পদাতিক
অগণ্য। দেখিলা রাজা নগর বাহিরে,
রিপুবৃন্দ, বালিবৃন্দ সিন্ধুতীরে যথা,
নক্ষত্র-মণ্ডল কিম্বা আকাশ-মণ্ডলে।
থানা দিয়া পূর্ব দ্বারে, দুর্বার সংগ্রামে,
বসিয়াছে বীর নীল; দক্ষিণ দুয়ারে
অঙ্গদ, করভসম নব বলে বলী;
কিংবা বিষধর, যবে বিচিত্র কঞ্চুক-
ভূষিত, হিমান্তে অহি ভ্রমে, ঊর্ধ্ব ফণা—
ত্রিশূলসদৃশ জিহ্বা লুলি অবলেপে!
উত্তর দুয়ারে রাজা সুগ্রীব আপনি
বীরসিংহ। দাশরথি পশ্চিম দুয়ারে—
হায় রে বিষণ্ণ এবে জানকী-বিহনে,
কৌমুদী-বিহনে যথা কুমুদরঞ্জন
শশাঙ্ক! লক্ষ্মণ সঙ্ঘে, বায়ুপুত্র হনু,
মিত্রবর বিভীষণ। এত প্রসরণে,
বেড়িয়াছে বৈরিদল স্বর্ণ-লঙ্কাপুরী,
গহন কাননে যথা ব্যাধ-দল মিলি,
বেড়ে জালে সাবধানে কেশরিকামিনী,—
নয়ন–রমণী রূপে, পরাক্রমে ভীমা
ভীমাসমা! অদূরে হেরিলা রক্ষঃপতি
রণক্ষেত্র। শিবাকুল, গৃধিনী, শকুনি,
কুক্কুর, পিশাচদল ফেরে কোলাহলে।কাব্য গ্রন্থঃ -মেঘনাদবধ কাব্য
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
কহ মোরে, শশিপ্রিয়ে, কহ, কৃপা করি,
কার হেতু নিত্য তুমি সাজাও গগনে,
এ পথ,—উজ্জ্বল কোটি মণির কিরণে ?
এ সুপথ দিয়া কি গো ইন্দ্রাণী সুন্দরী
আনন্দে ভেটিতে যান নন্দন-সদনে
মহেন্দ্রে, সঙ্গেতে শত বরাঙ্গী অপ্সরী,
মলিনি ক্ষণেক কাল চারু তারা-গণে—
সৌন্দর্য্যে ?—এ কথা দাসে কহ, বিভাবরি !
রাণী তুমি ; নীচ আমি ; তেঁই ভয় করে,
অনুচিত বিবেচনা পার করিবারে
আলাপ আমার সাথে ; পবন-কিঙ্করে,—
ফুল-কুল সহ কথা কহ দিয়া যারে,
দেও কয়ে ; কহিবে সে কানে, মৃদুস্বরে,
যা কিছু ইচ্ছহ, দেবি, কহিতে আমারে !
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
এখনও আছে লোক দেশ দেশান্তরে
দেব ভাবি পূজে তোমা, রবি দিনমণি,
দেখি তোমা দিবামুখে উদয়-শিখরে,
লুটায়ে ধরণীতলে, করে স্তুতি-ধ্বনি ;
আশ্চর্যের কথা, সূৰ্য্য, এ না মনে গণি।
অসীম মহিমা তব, যখন প্রখরে
শোভ তুমি, বিভাবসু, মধ্যাহ্নে অম্বরে
সমুজ্জ্বল করজালে আবরি মেদিনী !
অসীম মহিমা তব, অসীম শকতি,
হেম-জ্যোতিঃ-দাতা তুমি চন্দ্র-গ্রহ-দলে ;
উর্ব্বরা তোমার বীর্য্যে সতী বসুমতী ;
বারিদ, প্রসাদে তব, সদা পূর্ণ জলে ;—
কিন্তু কি মহিমা তাঁর, কহ, দিনপতি,
কোটি রবি শোভে নিত্য যাঁর পদতলে!
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
স্বপনে ভ্রমিনু আমি গহন কাননে
একাকী ৷ দেখিনু দূরে যুব এক জন,
দাঁড়ায়ে তাহার কাছে প্রাচীন ব্রাহ্মণ---
দ্রোণ যেন ভয়-শূন্য কুরুক্ষেত্র-রণে ৷
''চাহিস্ বধিতে মোরে কিসের কারণে?''
জিজ্ঞাসিলা দ্বিজবর মধুর বচনে ৷
''বধি তোমা হরি আমি লব তব ধন,''
উত্তরিলা যুব জন ভীম গরজনে ৷---
পরিবরতিল স্বপ্ন ৷ শুনিনু সত্বরে
সুধাময় গীত-ধ্বনি,আপনি ভারতী,
মোহিতে ব্রহ্মার মনঃ,স্বর্ণ বীণা করে,
আরম্ভিলা গীত যেন---মনোহর অতি!
সে দুরন্ত যুব জন,সে বৃদ্ধের বরে,
হইল,ভারত,তব কবি-কুল-পতি!
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
লও দাসে, হে ভারতি, নন্দন-কাননে,
যথা ফোটে পারিজাত ; যথায় উৰ্ব্বশী,---
কামের আকাশে বামা চির-পূর্ণ-শশী,—
নাচে করতালি দিয়া বীণার স্বননে ;
যথা রম্ভা, তিলোত্তমা, অলকা রূপসী
মোহে মনঃ সুমধুর স্বর বরিষণে ,—
মন্দাকিনী বাহিনীর স্বর্ণ তীরে বসি,
মিশায়ে সু-কণ্ঠ-রব বীচির বচনে !
যথায় শিশিরের বিন্দু ফুল্ল ফুল-দলে
সদা সদ্যঃ ; যথা অলি সতত গুঞ্জরে ;
বহে যথা সমীরণ বহি পরিমলে ;
বসি যথা শাখা-মুখে কোকিল কুহরে ;
লও দাসে ; আঁখি দিয়া দেখি তব বলে
ভাব-পটে কল্পনা যা সদা চিত্র করে।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
বড় ভাল বাসি আমি ভ্রমিতে এ স্থলে,---
তত্ত্ব-ধীক্ষা-দায়ী স্থল জ্ঞানের নয়নে ৷
নীরবে আসীন হেথা দেখি ভস্মাসনে
মৃত্যু---তেজোহীন আঁখি,হাড়-মালা গলে,
বিকট অধরে হাসি,যেন ঠাট-ছলে!
অর্থের গৌরব বৃথা হেথা---এ সদনে---
রূপের প্রফুল্ল ফুল শুষ্ক হুতাশনে,
বিদ্যা,বুদ্ধি,বল,মান,বিফল সকলে।
কি সুন্দর অট্টালিকা,কি কুটীর-বাসী,
কি রাজা,কি প্রজা,হেথা উভয়ের গতি।
জীবনের স্রোতঃ পড়ে এ সাগরে আসি।
গহন কাননে বায়ু উড়ায় যেমতি
পত্র-পুঞ্জে,আয়ু-কুঞ্জে,কাল,জীব-রাশি
উড়ায়ে,এ নদ-পাড়ে তাড়ায় তেমতি।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
নীতিমূলক
|
উড়িল আকাশে মেঘ গরজি ভৈরবে;—
ভানু পলাইল ত্রাসে;
তা দেখি তড়িৎ হাসে;
বহিল নিশ্বাস ঝড়ে;
ভাঙ্গে তবু মড়-মড়ে;
গিরি-শিরে চূড়া নড়ে,
যেন ভূ-কম্পনে;
অধীরা সভয়ে ধরা সাধিলা বাসবে।
আইল চাতক-দল,
মাগি কোলাহলে জল—
“তৃষায় আকুল মোরা, ওহে ঘনপতি!
এ জ্বালা জুড়াও, প্রভু, করি এ মিনতি।”
বড় মানুষের ঘরে ব্রতে, কি পরবে,
ভিখারী-মণ্ডল যথা অাসে ঘোর রবে;—
কেহ আসে, কেহ যায়;
কেহ ফিরে পুনরায়
আবার বিদায় চায়;
ত্রস্ত লোভে সবে;—
সেরূপে চাতক-দল,
উড়ি করে কোলাহল;—
“তৃষায় আকুল মোরা, ওহে ঘনপতি!
এ জ্বালা জুড়াও জলে, করি এ মিনতি।”
রোষে উত্তরিলা ঘনবর;—
“অপরে নির্ভর যার, অতি সে পামর!
বায়ু-রূপ দ্রুত রথে চড়ি,
সাগরের নীল পায়ে পড়ি,
আনিয়াছি বারি;—
ধরার এ ধার ধারি।
এই বারি পান করি,
মেদিনী সুন্দরী
বৃক্ষ-লতা-শস্যচয়ে
স্তন-দুগ্ধ বিতরয়ে
শিশু যথা বল পায়,
সে রসে তাহারা খায়,
অপরূপ রূপ-সুধা বাড়ে নিরন্তর;
তাহারা বাঁচায়, দেখ, পশু-পক্ষী-নর।
নিজে তিনি হীন-গতি;
জল গিয়া আনিবারে নাহিক শকতি;
তেঁই তাঁর হেতু বারি-ধারা।—
তোমরা কাহারা?
তোমাদের দিলে জল,
কভু কি ফলিবে ফল?
পাখা দিয়াছেন বিধি;
যাও, যথা জলনিধি;
যাও, যথা জলাশয়;—
নদ-নদী-তড়াগাদি, জল যথা রয়।
কি গ্রীষ্ম, কি শীত কালে,
জল যেখানে পালে,
সেখানে চলিয়া যাও, দিনু এ যুকতি।”
চাতকের কোলাহল অতি।
ক্রোধে তড়িতেরে ঘন কহিলা,—
“অগ্নি-বাণে তাড়াও এ দলে।”—
তড়িৎ প্রভুর আজ্ঞা মানিলা।
পলায় চাতক, পাখা জ্বলে।
যা চাহ, লভ সদা নিজ-পরিশ্রমে;
এই উপদেশ কবি দিলা এই ক্রমে।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
পাষাণময় যে দেশ, সে দেশে পড়িলে
বীজকুল, শস্য তথা কখন কি ফলে?
কিন্তু কত মনানন্দ তুমি মোরে দিলে,
হে পুরুল্যে!দেখাইয়া ভকত-মণ্ডলে!
শ্ৰীভ্রষ্ট সরস সম, হায়, তুমি ছিলে,
অজ্ঞান-তিমিরাচ্ছন্ন এ দূর জঙ্গলে;
অজ্ঞান-তিমিরাচ্ছন্ন এ দূর জঙ্গলে;
এবে রাশি রাশি পদ্ম ফোটে তব জলে,
পরিমল-ধনে ধনী করিয়া অনিলে!
প্রভুর কি অনুগ্রহ! দেখ ভাবি মনে,
(কত ভাগ্যবান্ তুমি কব তা কাহারে?)
রাজাসন দিলা তিনি ভূপতিত জনে!
উজলিলা মুখ তব বঙ্গের সংসারে;
বাড়ুক সৌভাগ্য তব এ প্রার্থনা করি,
ভাসুক সত্যতা-স্রোতে নিত্য তব তরি।
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
কার সাথে তুলনিবে,লো সুর-সুন্দরি,
ও রূপের ছটা কবি এ ভব-মণ্ডলে?
আছে কি লো হেন খনি,যার গর্ভে ফলে
রতন তোমার মত,কহ,সহচরি
গোধূলির?কি ফণিনী,যার সু-কবরী
সাজায় সে তোমা সম মণির উজ্জ্বলে?---
ক্ষণমাত্র দেখি তোমা নক্ষত্র-মণ্ডলে
কি হেতু?ভাল কি তোমা বাসে না শর্ব্বরী?
হেরি অপরূপ রূপ বুঝি ক্ষুণ্ণ মনে
মানিনী রজনী রাণী,তেঁই অনাদরে
না দেয় শোভিতে তোমা সখীদল-সনে,
যবে কেলি করে তারা সুহাস-অম্বরে?
কিন্তু কি অভাব তব,ওলো বরাঙ্গনে,---
ক্ষণমাত্র দেখী মুখ,চির আঁখি স্মরে!
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
এ মন্দির-বৃন্দ হেথা কে নির্ম্মিল কবে?
কোন্ জন?কোন্ কালে?জিজ্ঞাসিব কারে?
কহ মোরে কহ তুমি কল কল রবে,
ভুলে যদি,কল্লোলিনি,না থাক লো তারে।
এ দেউল-বর্গ গাঁথি উৎসর্গিল যবে
সে জন,ভাবিল কি সে,মাতি অহঙ্কারে,
থাকিবে এ কীর্ত্তি তার চিরদিন ভবে,
দীপরূপে আলো করি বিস্মৃতি-আঁধারে?
বৃথা ভাব,প্রবাহিণি,দেখ ভাবি মনে।
কি আছে লো চিরস্থায়ী এ ভবমণ্ডলে?
গুঁড়া হয়ে উড়ি যায় কালের ফীড়নে
পাথর;হুতাশে তার কি ধাতু না গলে?---
কোথা সে?কোথা বা নাম?ধন?লো ললনে?
হায়,গত,যথা বিম্ব তব চল জলে!
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
কোন্ মূল্য দিয়া পুনঃ কিনি ভূত কালে,
----কোন্ মূল্য ----এ মন্ত্রণা কারে লয়ে করি?
কোন্ ধন, কোন্ মুদ্রা, কোন্ মণি-জালে
এ দুর্ল্লভ দ্রব্য-লাভ ? কোন্ দেবে স্মরি,
কোন্ যোগে,কোন্ তপে,কোন্ ধর্ম্ম করি?
আছে কি এমন জন ব্রাহ্মণে,চণ্ডালে,
এ দীক্ষা-শিক্ষার্থে যারে গুরু-পদে বরি,
এ তত্ত্ব-স্বরূপ পদ্ম পাই যে মৃণালে?---
পশে যে প্রবাহ বহি অকূল সাগরে,
ফিরি কি সে আসে পুনঃ পর্ব্বত-সদনে?
যে বারির ধারা ধরা সতৃষ্ণায় ধরে,
উঠে কি সে পুনঃ কভু বারিদাতা ঘনে?---
বর্ত্তমানে তোরে,কাল,যে জন আদরে
তার তুই!গেলে তোরে পায় কোন্ জনে?
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
কবিতা-নিকুঞ্জে তুমি পিককুল-পতি।
কার গো না মজে মনঃ ও মধুর স্বরে?
শুনিয়াছি লোক মুখে আপনি ভারতী,
সৃজি মায়াবলে সরঃ বনের ভিতরে,
নব নাগরীর বেশে তুষিলেন বরে
তোমায়;অমৃত রসে রসনা সিকতি,
আপনার স্বর্ণ বীণা অরপিলা করে!—
সত্য কি হে এ কাহিনী, কহ, মহামতী?
মিথ্যা বা কি বলে বলি! শৈলেন্দ্র-সদনে,
লভি জন্ম মন্দাকিনী (আনন্দ জগতে!)
নাশেন কলুষ যথা এ তিন ভূবনে;
সঙ্গীত-তরঙ্গ তব উথলি ভারতে
(পূণ্যভূমি!) হে কবীন্দ্র, সুধা বরিষ্ণে,
দেশ-দেশান্তরে কর্ণ তোষে সেই মতে!
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
মহাকাব্য
|
কুসুম-শয়নে যথা সুবর্ণ-মন্দিরে
বিরাজে বীরেন্দ্র বলী ইন্দ্রজিত,তথা
পশিল কূজন-ধ্বনি সে সুখ-সদনে।
জাগিলা বীর-কুন্জর কুন্জবন-গীতে।
প্রমীলার করপদ্ম করপদ্মে ধরি
রথীন্দ্র, মধুর স্বরে, হায় রে, যেমতি
নলিনীর কানে অলি কহে গুন্জরিয়া
প্রেমের রহস্য কথা, কহিলা (আদরে
চুম্বি নিমীলিত আঁখি )—“ডাকিছে কূজনে,
হৈমবতী ঊষা তুমি,রূপসি, তোমারে
পাখী-কুল; মিল, প্রিয়ে, কমল লোচন
উঠ, চিরানন্দ মোর; সূর্য্যকান্তমণি-
সম এ পরাণ,কান্তে, তুমি রবিচ্ছবি;—-
তেজোহীন আমি তুমি মুদিলে নয়ন;
ভাগ্য-বৃক্ষে ফলোত্তম তুমি হে জগতে
আমার; নয়ন-তারা; মহার্হ রতন;
উঠি দেখ,শশিমুখি,কেমনে ফুটিছে,
চুরি করি কান্তি তব মন্জু কুন্জবনে
কুসুম ;” চমকি রামা উঠিলা সত্বরে;—
গোপিনী কামিনী যথা বেনুর সুরবে;
আবরিলা অবয়ব সুচারু-হাসিনী
শরমে। কহিলা পুনঃ কুমার আদরে;—
“পোহাইল এতক্ষনে তিমির-শর্বরী;
তা না হলে ফুটিতে কি তুমি, কমলিনি,
জুড়াতে এ চক্ষুর্দ্বয়? চল, প্রিয়ে, এবে
বিদায় হইব নমি জননীর পদে;
পরে যথাবিধি পূজি দেব বৈশ্বানরে,
ভীষণ-অশনি-সম শর-বরিষণে
রামের সংগ্রাম-সাধ মিটাব সংগ্রামে।”
সাজিলা রাবণ-বধূ, রাবণ-নন্দন,
অতুল জগতে দোঁহে; বামাকুলোত্তমা
প্রমীলা, পুরুষোত্তম মেঘনাদ বলী;
শয়ন-মন্দির হতে বাহিরিলা দোঁহে—
প্রভাতের তারা যথা অরুনের সাথে;
বাজিল রাক্ষস-বাদ্য; নমিল রক্ষক;
জয় মেঘনাদ উঠিল গগনে;
রতন-শিবিকাসনে বসিলা হরষে
দম্পতী। বহিলা যান যানবাহ- দলে
মন্দোদরী মহিষীর সুবর্ন-মন্দিরে।
প্রবেশিলা অরিন্দম, ইন্দু-নিভাননা
প্রমীলা সুন্দরী সহ,সে স্বর্ণ-মন্দিরে।
ত্রিজটা নামে রাক্ষসী আইল ধাইয়া।
কহিল বীর-কেশরী; ”শুন লো ত্রিজটে,
নিকুম্ভিলা-যজ্ঞ সাঙ্গ করি আমি আজি
যুঝিব রামের সঙ্গে পিতার আদেশে,
নাশিব রাক্ষস-রিপু; তেঁই ইচ্ছা করি
পূজিতে জননী পদ। যাও বার্তা লয়ে;
কহ,পুত্র, পুত্রবধু দাঁড়ায়ে দুয়ারে
তোমার,হে লঙ্কেশ্বরী;” সাষ্টাঙ্গে প্রণমি,
কহিলা শূরে ত্রিজটা, (বিকটা রাক্ষসী)—
”শিবের মন্দিরে এবে রাণী মন্দোদরী,
যুবরাজ; তোমার মঙ্গল-হেতু তিনি
অনিদ্রায়, অনাহারে পূজেন উমেশে;
তব সম পুত্র, শূর,কার এ জগতে?
কার বা এ হেন মাতা?”—এতেক কহিয়া
সৌদামিনী-গতি দূতী ধাইল সত্বরে।
বাহিরিলা লঙ্কেশ্বরী শিবালয় হতে
প্রণমে দম্পতী পদে। হরষে দুজনে
কোলে করি, শিরঃ চুম্বি, কাঁদিলা মহিষী।
কহিলা বীরেন্দ্র; ”দেবি আশীষ দাসেরে।
নিকুম্ভিলা-যজ্ঞ সাঙ্গ করি যথাবিধি,
পশিব সমরে আজি, নাশিব রাঘবে;
শিশু ভাই বীরবাহু; বধিয়াছে তারে
পামর। দেখিব মোরে নিবারে কি বলে?
দেহ পদ-ধূলি, মাতঃ ;তোমার প্রসাদে
নির্ব্বিঘ্ন করিব আজি তীক্ষ্ন শর-জালে
লঙ্কা; বাঁধি দিব আনি তাত বিভীষণে
রাজদ্রোহী; খেদাইব সুগ্রীব অঙ্গদে
সাগর অতল জলে;” উত্তরিলা রাণী,
মুছিয়া নয়ন-জল রতন-আঁচলে;—
“কেমনে বিদায় তোরে করি রে বাছনি;
আঁধারি হৃদয়াকাশ,তুই পূর্ণ শশী
আমার। দুরন্ত রণে সীতাকান্ত বলী;
দুরন্ত লক্ষণ শূর; কাল-সর্প-সম
দয়া-শূন্য বিভীষণ; মত্ত লোভ-মদে,
স্ববন্ধু-বান্ধবে মূঢ় নাশে অনায়াসে,
ক্ষুধায় কাতর ব্যাঘ্র গ্রাসয়ে যেমতি
স্বশিশু; কুক্ষনে,বাছা, নিকষা শাশুড়ী
ধরেছিলা গর্ভে দুষ্টে, কহিনু রে তোরে;
এ কনক-লঙ্কা মোর মজালে দুর্ম্মতি;”
হাসিয়া মায়ের পদে উত্তরিলা রথী;—
কেন, মা ডরাও তুমি রাঘবে লক্ষণে,
রক্ষোবৈরী? দুইবার পিতার আদেশে
তুমুল সংগ্রামে আমি বিমুখিনু দোঁহে
অগ্নিময় শর-জালে; ও পদ-প্রসাদে
চির-জয়ী দেব-দৈত্য-নরের সমরে
এ দাস; জানেন তাত বিভীষণ, দেবি,
তব পুত্র-পরাক্রম; দম্ভোলি-নিক্ষেপী
সহস্রাক্ষ সহ যত দেব-কুল-রথী;
পাতালে নাগেন্দ্র, মর্ত্তে নগেন্দ্র; কি হেতু
সভয় হইলা আজি,কহ, মা, আমারে?
কি ছার সে রাম, তারে ডরাও আপনি?
মুছিয়া নয়ন-জল রতন-আঁচলে,
উত্তরিলা লঙ্কেশ্বরী; ”যাইবি রে যদি;—
রাক্ষস-কুল-রক্ষণ বিরূপাক্ষ তোরে
রক্ষুন এ কাল-রণে; এই ভিক্ষা করি
তার পদ যুগে আমি। কি আর কহিব?
নয়নের তারা হারা করি রে থুইলি
আমায় এ ঘরে তুই;” কাঁদিয়া মহিষী
কহিলা,চাহিয়া তবে প্রমীলার পানে;—
“থাক,মা,আমার সঙ্গে তুমি; জুড়াইব,
ও বিধুবদন হেরি এ পোড়া পরাণ;
বহুলে তারার করে উজ্জ্বল ধরণী।”
বন্দি জননীর পদ বিদায় হইলা
ভীমবাহু কাঁদি রাণী, পুত্র-বধূ সহ,
প্রবেশিলা পুনঃ গৃহে। শিবিকা ত্যজিয়া,
পদ-ব্রজে যুবরাজ চলিলা কাননে—
ধীরে ধীরে রথীবর চলিলা একাকী,
কুসুম-বিব্রিত পথে যজ্ঞশালা মুখে। ===========
|
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
|
সনেট
|
বড়ই নিষ্ঠুর আমি ভাবি তারে মনে,
লো ভাষা, পীড়িতে তোমা গড়িল যে আগে
মিত্রাক্ষররূপ বেড়ি ! কত ব্যথা লাগে
পর' যবে এ নিগড় কোমল চরণে-
স্মরিলে হৃদয় মোর জ্বলি উঠে রাগে
ছিল না কি ভাবধন, কহ, লো ললনে,
মনের ভাণ্ডারে তার, যে মিথ্যা সোহাগে
ভুলাতে তোমারে দিল এ তুচ্ছ ভূষণে ?
কি কাজ রঞ্জনে রাঙি কমলের দলে ?
নিজরূপে শশিকলা উজ্জ্বল আকাশে !
কি কাজ পবিত্রি' মন্ত্রে জাহ্নবীর জলে ?
কি কাজ সুগন্ধ ঢালি পারিজাত-বাসে ?
প্রকৃত কবিতা রূপী কবিতার বলে,-
চীন-নারী-সম পদ কেন লৌহ ফাঁসে ?
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.