poet
stringclasses
137 values
category
stringclasses
21 values
poem
stringlengths
9
18.7k
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
যে দেশে উদয়ি রবি উদয়-অচলে, ধরণীর বিম্বাধর চুম্বেন আদরে প্রভাতে; যে দেশে গাই, সুমধুর কলে, ধাতার প্রশংসা-গীত, বহেন সাগরে জাহ্নবী; যে দেশে ভেদি বারিদ-মণ্ডলে (তুষারে বপিত বাস উর্দ্দ্ধ কলেবরে, রজতের উপবীত স্রোতঃ-রূপে গলে,) শোভেন শৈলেন্দ্র-রাজ, মানঃ-সরোবরে (স্বচ্ছ দরপণ!) হেরি ভীষণ মূরতি;– যে দেশে কুহরে পিক বাসন্ত কাননে;– দিনেশে যে দেশে সেবে নলিনী যুবতী;— চাঁদের আমোদ যথা কুমুদ-সদনে;– সে দেশে জনম মম; জননী ভারতী; তেঁই প্রেম-দাস আমি, ওলো বরাঙ্গনে!
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
ভক্তিমূলক
(১)     এই যে কুসুম শিরোপরে, পরেছি যতনে, মম শ্যাম-চূড়া-রূপ ধরে এ ফুল রতনে! বসুধা নিজ কুন্তলে                 পরেছিল কুতূহলে এ উজ্জ্বল মণি, রাগে তারে গালি দিয়া,  লয়েছি আমি কাড়িয়া--- মোর কৃষ্ণ-চূড়া কেনে পরিবে ধরণী?(২)     এই যে কম মুকুতাফল, এ ফুলের দলে,— হে সখি, এ মোর আঁখিজল, শিশিরের ছলে! লয়ে কৃষ্ণচূড়ামণি,            কাঁদিনু আমি, স্বজনি, বসি একাকিনী, তিতিনু নয়ন-জলে;                সেই জল এই দলে গলে পড়ে শোভিতেছে, দেখ্ লো কামিনি!(৩)     পাইয়া এ কুসুম রতন—শোন্ লো যুবতি, প্রাণহরি করিনু স্মরণ —স্বপনে যেমতি! দেখিনু রূপের রাশি                মধুর অধরে বাঁশী, কদমের তলে, পীত ধড়া স্বর্ণরেখা,         নিকষে যেন লো লেখা, কুঞ্জশোভা বরগুঞ্জমালা দোলে গলে!(৪)     মাধবের রূপের মাধুরী, অতুল ভুবনে— কার মনঃ নাহি করে চুরি, কহ লো ললনে? যে ধন রাধায় দিয়া,              রাধার মনঃ কিনিয়া লয়েছিলা হরি, সে ধন কি শ্যামরায়,          কেড়ে নিলা পুনরায়? মধু কহে, তাও কভু হয় কি, সুন্দরি?(ব্রজাঙ্গনা কাব্য)
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
জনক জননী তব দিলা শুভ ক্ষণে কৃত্তিবাস নাম তোমা!— কীর্ত্তির বসতি সতত তোমার নামে সুবঙ্গ-ভবনে, কোকিলের কণ্ঠে যথা স্বর, কবিপতি, নয়নরঞ্জন-রূপ কুসুম-যৌবনে, রশ্মি মাণিকের দেহে। আপনি ভারতী, বুঝি কয়ে দিলা নাম নিশার স্বপনে, পূর্ব্ব-জনমের তব স্মরি হে ভকতি! পবন-নন্দন হনু, লঙ্ঘি ভীমবলে সাগর, ঢালিলা যথা রাঘবের কানে সীতার বারতা-রূপ সঙ্গীত-লহরী;– তেমতি, যশস্বি, তুমি সুবঙ্গ-মণ্ডলে গাও গো রামের নাম সুমধুর তানে, কবি-পিতা বাল্মীকিকে তপে তুষ্ট করি!(চতুদ্দর্শপদী কবিতাবলী)
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
হেরি দূরে উর্দ্ধশিরঃ তোমার গগনে, অচল, চিত্রিত পটে জীমূত যেমতি। ব্যোমকেশ তুমি কি হে, (এই ভাবি মনে) মজি তপে, ধরেছ ও পাষাণ-মূরতি? এ হেন ভীষণ কায়া কার বিশ্বজনে? তবে যদি নহ তুমি দেব উমাপতি, কহ, কোন্ রাজবীর তপোব্রতে ব্ৰতী— খচিত শিলার বর্ম্ম কুসুম-রতনে তোমার? যে হর-শিরে শশিকলা হাসে, সে হর কিরীটরূপে তব পুণ্য শিরে, চিরবাসী, যেন বাঁধা চিরপ্রেমপাশে! হেরিলে তোমায় মনে পড়ে ফাল্গুনিরে সেবিলা বীরেশ যবে পাশুপত আশে ইন্দ্ৰকীল নীলচূড়ে দেব ধূর্জ্জটিরে।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
সু-শ্যামাঙ্গ বঙ্গ এবে মহাব্রতে রত। এসেছেন ফিরে উমা, বৎসরের পরে, মহিষমৰ্দ্দিনীরূপে ভকতের ঘরে; বামে কমকায়া রমা, দক্ষিণে আয়ত- লোচনা বচনেশ্বরী, স্বর্ণবীণা করে; শিখীপৃষ্ঠে শিখীধ্বজ, যাঁর শরে হত তারক—অসুরশ্রেষ্ঠ; গণ-দল যত, তার পতি গণদেব, রাঙা কলেবরে করি-শিরঃ; —আদিব্রহ্ম বেদের বচনে । এক পদ্মে শতদল৷ শত রূপবতী— নক্ষত্রমণ্ডলী যেন একত্রে গগনে!— কি আনন্দ! পূৰ্ব্ব কথা কেন কয়ে, স্মৃতি, আনিছ হে বারি-ধারা আজি এ নয়নে?— ফলিবে কি মনে পুনঃ সে পূর্ব্ব ভকতি?
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
মহাকাব্য
'এতক্ষণে' -অরিন্দম কহিলা বিষাদে 'জানিনা কেমনে আসি লক্ষণ পশিল রক্ষঃপুরে ! হায়, তাত, উচিত কি তব একাজ, নিকষা সতী তোমার জননী, সহোদর রক্ষশ্রেষ্ঠ ? -শূলী-শম্ভূনিভ কুম্ভকর্ণ ? ভ্রাতৃপুত্র বাসব বিজয়ী ? নিজগৃহপথ, তাত, দেখাও তস্করে ? চণ্ডালে বসাও আনি রাজার আলয়ে ? কিন্তু নাহি গঞ্জি তোমা, গুরুজন তুমি পিতৃতুল্য | ছাড় দ্বার, যাব অস্ত্রাগারে, পাঠাইব রামানুজে শমন-ভবনে, লঙ্কার কলঙ্ক আজি ভঞ্জিব আহবে |' উত্তরিলা বিভীষণ;-'বৃথা এ সাধনা, ধীমান্ ! রাঘবদাস আমি ; কি প্রকারে তাঁহার বিপক্ষ কাজ করিব, রক্ষিতে অনুরোধ ?' উত্তরিলা কাতরে রাবণি ;- 'হে পিতৃব্য, তব বাক্যে ইচ্ছি মরিবারে ! রাঘবের দাস তুমি ? কেমনে ও মুখে আনিলে ও কথা, তাত, কহ তা দাসেরে ! স্থপিলা বিধুরে বিধি স্থানুর ললাটে ; পড়ি কি ভূতলে শশী যান গড়াগড়ি ধুলায় ? হে রক্ষোরথি, ভুলিলে কেমনে কে তুমি ? জনম তব কোন্ মহাকুলে ? কেবা সে অধম রাম ? স্বচ্ছ সরোবরে করে ফেলি রাজ হংস পঙ্কজ কাননে ; যায় কি সে কভু, পঙ্কিল সলিলে, শৈবালদলের ধাম ? মৃগেন্দ্র কেশরী কবে, হে বীর-কেশরী, সম্ভাষে শৃগালে মিত্রভাবে ? অজ্ঞ দাস, বিজ্ঞতম তুমি, অবিদিত নহে কিছু তোমার চরণে | ক্ষুদ্রমতি নর, শূর, লক্ষণ ; নহিলে অস্ত্রহীন যোধে কি সে সম্বোধে সংগ্রামে ? কহ, মহারথি, একি মহারথিপ্রথা ? নাহি শিশু লঙ্কাপুরে, শুনি না হাসিবে এ কথা ! ছাড়হ পথ ; আসিব ফিরিয়া এখনি ! দেখিব আজি, কোন্ দেববলে, বিমুখে সমরে মোরে সৌমিত্রি কুমতি ! দেব-দৈত্য-নর-রণে, স্বচক্ষে দেখেছ, রক্ষঃশ্রেষ্ঠ, পরাক্রম দাসের ! কি দেখি ডরিবে এ দাস হেন দুর্বল মানবে ? নিকুম্ভিলা-যজ্ঞাগারে প্রগল্ ভে পশিল দম্ভী ; আজ্ঞা কর দাসে, শাস্তি নরাধমে | তব জন্মপুরে, তাত, পদার্পণ করে বনবাসী ! হে বিধাতঃ, নন্দন-কাননে ভ্রমে দুরাচার দৈত্য ? প্রফুল্ল কমলে কীটবাস ? কহ, তাত, সহিব কেমনে হেন অপমান আমি,-ভ্রাতৃ পুত্র তব ? তুমিও, হে রক্ষোমণি, সহিছ কেমনে ?' মহামন্ত্রবলে যথা নম্রশিরঃ ফণী, মলিনবদন লাজে, উত্তরিলা রথী রাবণ-অনুজ, লক্ষি রাবণ-আত্মজে ;- 'নহি দোষী আমি, বত্স; বৃথা ভর্ত্স মোরে তুমি ! নিজ কর্ম দোষে হায় মজাইলা এ কনক-লঙ্কা রাজা, মজিলা আপনি ! বিরত সতত পাপে দেবকুল ; এবে পাপপূর্ণ লঙ্কা পুরী ; প্রলয়ে যেমতি বসুধা, ডুবিছে লঙ্কা এ কাল-সলিলে ! রাঘবের পদাশ্রয়ে রক্ষার্থে আশ্রয়ী তেঁই আমি ! পরদোষে কে চাহে মজিতে ?' রুষিলা বাসবত্রাস ! গম্ভীরে যেমতি নিশীথে অম্বরে মন্দ্রে জীমূতেন্দ্র কোপি, কহিলা বীরেন্দ্র বলী ;-'ধর্মপথগামী, হে রাক্ষসরাজানুজ, বিখ্যাত জগতে তুমি ;-কোন্ ধর্মমতে, কহ দাসে, শুনি, জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্ব, জাতি,-এ সকলে দিলা জলাঞ্জলি ? শাস্ত্রে বলে, গুণবান্ যদি পরজন, গুণহীন স্বজন, তথাপি নির্গুণ স্বজন শ্রেয়ঃ, পরঃ পরঃ সদা ! এ শিক্ষা হে রক্ষোবর, কোথায় শিখিলে ? কিন্তু বৃথা গঞ্জি তোমা ! হেন সহবাসে, হে পিতৃব্য, বর্বরত কেন না শিখিবে ? গতি যার নীচ সহ, নীচ সে দুর্মতি |'
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
তপনের তাপে তাপি পথিক যেমতি পড়ে গিয়া দড়ে রড়ে ছায়ার চরণে ; তৃষাতুর জন যথা হেরি জলবতী নদীরে, তাহার পানে ধায় ব্যগ্ৰ মনে পিপাসা-নাশের আশে ; এ দাস তেমতি, জ্বলে যবে প্রাণ তার দুঃখের জ্বলনে, ধরে রাঙা পা দুখানি, দেবি সরস্বতি!--- মার কোল-সম, মা গো, এ তিন ভুবনে আছে কি আশ্রম আর ? নয়নের জলে ভাসে শিশু যবে, কে সাম্ভনে তারে ? কে মোচে আঁখির জল অমনি আঁচলে ? কে তার মনের খেদ নিবারিতে পারে, মধুমাখা কথা কয়ে, স্নেহের কৌশলে ?— এই ভাবি, কৃপাময়ি, ভাবি গো তোমারে!
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
নর-পাল-কুলে তব জনম সুক্ষণে শিশুপাল ! কহি শুন, রিপুরূপ ধরি, ওই যে গরুড়-ধ্বজে গরজেন ঘনে বীরেশ, এ ভব-দহে মুকতির তরি! টঙ্কারি কার্ম্মুক, পশ হুহুঙ্কারে রণে ; এ ছার সংসার-মায়া অম্তিমে পাসরি ; নিন্দাছলে বন্দ, ভক্ত, রাজীব-চরণে । জানি, ইষ্টদেব তব, নহেন হে অরি বাসুদেব ; জানি আমি বাগ্দেবীর বরে । লৌহদন্ত হল, শুন, বৈষ্ণব সুমতি, ছিঁড়ি ক্ষেত্রে-দেহ যথা ফলবান করে সে ক্ষেত্রে ; তোমায় ক্ষণ যাতিনি তেমতি আজি, তীক্ষ্ণ শর-জালে বধি এ সমরে, পাঠাবেন সুবৈকুণ্ঠে সে বৈকুণ্ঠ-পতি ।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
শুনি গুন গুন ধ্বনি তোর এ কাননে, মধুকর,এ পরাণ কাঁদে রে বিষাদে! ফুল-কুল-বধূ-দলে সাধিস্ যতনে অনুক্ষণ,মাগি ভিক্ষা অতি মৃদু নাদে, তুমকী বাজায়ে যথা রাজার তোরণে ভিখারী,কি হেতু তুই?ক মোরে,কি সাদে মোমের ভাণ্ডারে মধু রাখিস্ গোপনে, ইন্দ্র যথা চন্দ্রলোকে,দানব-বিবাদে সুধামৃত?এ আয়াসে কি সুফল ফলে? কৃপণের ভাগ্য তোর!কৃপণ যেমতি অনাহারে,অনিদ্রায়,সঞ্চয়ে বিকলে বৃথা অর্থ;বিধি-বশে তোর সে দুর্গতি! গৃহ-চ্যুত করি তোরে,লুটি লয় বলে পর জন পরে তোর শ্রমের সঙ্গতি!
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
স্বদেশমূলক
রেখো মা দাসেরে মনে, এ মিনতি করি পদে সাধিতে মনের সাধ, ঘটে যদি পরমাদ, মধুহীন করো না গো তব মনঃকোকনদে। প্রবাসে দৈবের বশে, জীব-তারা যদি খসে এ দেহ-আকাশ হতে, – নাহি খেদ তাহে। জন্মিলে মরিতে হবে, অমর কে কোথা কবে, চিরস্থির কবে নীর, হায় রে, জীবন-নদে? কিন্তু যদি রাখ মনে, নাহি, মা, ডরি শমনে; মক্ষিকাও গলে না গো, পড়িলে অমৃত-হ্রদে! সেই ধন্য নরকুলে, লোকে যারে নাহি ভুলে, মনের মন্দিরে সদা সেবে সর্ব্বজন; – কিন্তু কোন্ গুণ আছে, যাচিব যে তব কাছে, হেন অমরতা আমি, কহ, গো, শ্যামা জন্মদে! তবে যদি দয়া কর, ভুল দোষ, গুণ ধর, অমর করিয়া বর দেহ দাসে, সুবরদে! – ফুটি যেন স্মৃতি-জলে, মানসে, মা, যথা ফলে মধুময় তামরস কি বসন্ত, কি শরদে!সংকলিত
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
কাণ্ডারী-বিহীন তরি যথা সিন্ধু-জলে সহি বহু দিন ঝড়, তরঙ্গ-পীড়নে, লভে কূল কালে, মন্দ পবন-চালনে; সে সুদশা আজি তব সুভাগ্যের বলে, সংস্কৃত, দেব-ভাষা মানব-মণ্ডলে, সাগর-কল্লোল-ধ্বনি, নদের বদনে, বজ্রনাদ, কম্পবান্ বীণা-তার-গণে! রাজাশ্রম আজি তব ! উদয়-অচলে, কনক-উদয়াচলে, আবার, সুন্দরি, বিক্রম-অাদিত্যে তুমি হের লো হরষে, নব আদিত্যের রূপে ! পুৰ্ব্বে-রূপ ধরি, ফোট পুনঃ পুর্ব্বরূপে, পুনঃ পূৰ্ব্ব-রসে এত দিনে প্রভাতিল দুখ-বিভাবরী ; ফোট মনানন্দে হাসি মনের সরসে ।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
বিসর্জ্জিব আজি, মা গো, বিস্মৃতির জলে ( হৃদয়-মণ্ডপ, হায়, অন্ধকার করি!) ও প্রতিমা!নিবাইল,দেখ,হোমানলে মনঃ-কুণ্ডে অশ্রু-ধারা মনোদুঃখে ঝরি! শুখাইল দুরদৃষ্ট সে ফুল্ল কমলে, যার গন্ধামোদে অন্ধ এ মনঃ,বিস্মরি সংসারে ধর্ম্ম,কর্ম্ম!ডুবিল সে তরি, কাব্য-নদে খেলাইনু যাহে পদ-বলে অল্প দিন!নারিনু,মা,চিনিতে তোমারে শৈশব,অবোধ আমি!ডাকিলা যৌবনে; (যদিও অধম পুত্র,মা কি ভুলে তারে?) এবে---ইন্দ্রপ্রস্থ ছাড়ি যাই দূর বনে! এই বর,হে রবদে,মাগি শেষ বারে,--- জ্যোতির্ম্ময় কর বঙ্গ---ভারত-রতনে!
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
কে তোর তরিতে বসি,ঈশ্বরী পটনি? ছলিতে তোর রে যদি কামিনী কমলে,--- কোথা করী,বাম করে ধরি যারে বলে, উগরি,গ্রাসিল পুনঃ পূর্ব্বে সুবদনী? রূপের খনিতে আর আছে কিরে মণি? এর সম?চেয়ে দেখ,পদ-ছায়া-ছলে,--- কনক কমল ফুল্ল এ নদীর জলে--- কোন্ দেবতারে পূজি,পেলি এ রমণী? কাঠের সেঁউতি তোর,পদ-পরশনে হইতেছে স্বর্ণময়!এ এব যুবতী--- নহে রে সামান্যা নারী,এই লাগে মনে; বলে বেয়ে নদী-পারে যা রে শীঘ্রগতি। মেগে নিস্,পার করে,বর-রূপ ধনে দেখায়ে ভকতি শোন্,এ মোর যুকতি!
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
মহাকাব্য
নমি আমি,কবি-গুরু তব পদাম্বুজে, বাল্মীকি;হে ভারতের শিরঃচূড়ামণি, তব অনুগামী দাস,রাজেন্দ্র-সঙ্গমে দিন যথা যায় দূর তীর্থ দরশনে; তব পদ-চিহ্ন ধ্যান করি দিবানিশি, পশিয়াছে কত যাত্রী যশের মন্দিরে, দমনিয়া ভব-দম দুরন্ত শমনে— অমর; শ্রীভর্ত্তৃহরি; সূরী ভবভূতি শ্রীকন্ঠ;ভারতে খ্যাত বরপুত্র যিনি ভারতীর, কালিদাস–সুমধুর-ভাষী; মুরারী-মূরলীধ্বনি-সদৃশ মুরারি মনোহর;কীর্ত্তিবাস,কীর্ত্তিবাস কবি, এ বঙ্গের অলঙকার;–হে পিতঃ, কেমনে, কবিতা-রসের সরে রাজহংস-কুলে মিলি করি কেলি আমি, না শিখালে তুমি? গাঁথিব নূতন মালা ,তুলি সযতনে তব কাব্যদানে ফুল; ইচ্ছা সাজাইতে বিবিধ ভূষনে ভাষা; কিন্তু কোথা পাব (দীন আমি;) রত্নরাজী,তুমি নাহি দিলে, রত্নাকর? কৃপা,প্রভু কর আকিন্চনে। একাকিনি শোকাকুলা, অশোক-কাননে কাঁদেন রাঘব-বান্ছা আঁধার কুটিরে নীরবে;দুরন্ত চেড়ী,সতীরে ছাড়িয়া, ফেরে দূরে মত্ত সবে উৎসব-কৌতুকে– হীন-প্রাণা হরিণীরে রাখিয়া বাঘিনী নির্ভয় হৃদয়ে যথা ফেরে দূর বনে মলিন-বদনা দেবী,হায় রে যেমতি খনির তিমির গর্ভে (না পারে পশিতে সৌর-কর-রাশি যথা) সূর্য্যকান্ত-মণি; কিম্বা বিম্বাধরা রমা অম্বুরাশি-তলে; স্বনিছে পবন, দূরে রহিয়া রহিয়া উছ্বাসে বিলাপী যথা; লড়িছে বিষাদে মর্মরিয়া পাতাকুল; বসেছে অরবে শাখে পাখী; রাশি রাশি কুসুম পড়েছে তরুমূলে; যেন তরু, তাপি মনস্তাপে, ফেলিয়াছে খুলি সাজ; দূরে প্রবাহিণী, উচ্চ বিচী-রবে কাঁদি, চলিছে সাগরে, কহিতে বারীশে যেন এ দুঃখ-কাহিনী; না পশে সুধাংশু-অংশু সে ঘোর বিপিনে ফোটে কি কমল কভু সমল সলিলে? তবুও উজ্বল বন ও অপূর্ব্ব রূপে; একাকিনী বসি দেবী, প্রভা আভাময়ী, তমোময় ধামে যেন; হেন কালে তথা সরমা সুন্দরী আসি বসিলা কাঁদিয়া সতীর চরণ-তলে,সরমা সুন্দরী– রক্ষঃকুল-রাজলক্ষী রক্ষোবধূ-বেশে; কতক্ষনে চক্ষু-জল মুছি সুলোচনা কহিলা মধুর স্বরে; ”দুরন্ত চেড়ীরা, তোমারে ছাড়িয়া, দেবি ফিরিছে নগরে, মহোৎসবে রত সবে আজি নিশা-কালে; এই কথা শুনি আমি আইনু পূজিতে পা-দুখানি। আনিয়াছি কৌটায় ভরিয়া সিন্দুর; করিলে আজ্ঞা,সুন্দর ললাটে দিব ফোঁটা। এয়ো তুমি, তোমার কি সাজে এ বেশ? নিষ্ঠুর,হায়, দুষ্ট লঙ্কাপতি; কে ছেঁড়ে পদ্মের পর্ণ? কেমনে হরিল ও বরাঙ্গ-অলঙ্কার, বুঝিতে না পারি? কৌটা খুলি,রক্ষো বধূ যত্নে দিলা ফোঁটা। সীমন্তে ; সিন্দুর বিন্দু শোভিল ললাটে, গোধূলি-ললাটে, আহা; তারা-রত্ন-যথা; দিয়া ফোঁটা, পদ-ধূলি লইলা সরমা । ”ক্ষম লক্ষি, ছুইনু ও দেব-আকাঙ্খিত তনু;কিন্তু চির-দাসী দাসী ও চরণে;” এতেক কহিয়া পুনঃ বসিলা যুবতী পদতলে;আহা মরি সুবর্ণ-দেউটি তুলসীর মূলে যেন জ্বলিল, উজলি দশ দিশ; মৃদু-স্বরে কহিলা মৈথিলী;— ”বৃথা গন্জ দশাননে তুমি, বিধুমুখী; আপনি খুলিয়া আমি ফেলাইনু দূরে আভরণ,যবে পাপী আমারে ধরিল বনাশ্রমে। ছড়াইনু পথে সে সকলে, চিহ্ন হেতু। সেই হেতু আনিয়াছে হেথা– এ কনক-লঙ্কাপুরে—-ধীর রঘুনাথে; মণি,মুক্তা, রতন, কি আছে লো জগতে, যাহে নাহি অবহেলি লভিতে সে ধনে? যথা গোমুখীর মুখ হইতে সুস্বনে ঝরে পূত বারি-ধারা, কহিলা জানকী, মধুর ভাষিণী সতী, আদরে সম্ভাষি সরমারে,—“হিতৈষিণী সীতার পরমা তুমি,সখি; পূর্ব্ব-কথা শুনিবারে যদি ইচ্ছা তব,কহি আমি, শুন মনঃ দিয়া।— ছিনু মোরা, সুলোচনে, গোদাবরী-তীরে, কপোত কপোতী যথা উচ্চ বৃক্ষ-চূড়ে বাঁধি নীড়,থাকে সুখে;ছিনু ঘোর বনে, নাম পঞ্চবটী,মর্ত্ত্যে সুর-বন-সম। সদা করিতেন সেবা লক্ষণ সুমতি। দন্ডক ভান্ডার যার, ভাবি দেখ মনে, কিসের অভাব তার? যোগাতেন আনি নিত্য ফল-মূল বীর সৌমিত্রি; মৃগয়া করিতেন কভু প্রভু; কিন্তু জীব নাশে সতত বিরত,সখি রাঘবেন্দ্র বলী,— দয়ার সাগর নাথ ,বিদিত জগতে; “ভুলিনু পূর্ব্বের সুখ। রাজার নন্দিনী রঘু-কুল-বধু আমি; কিন্তু এ কাননে, পাইনু, সরমা সই,পরম পিরীতি ; কুটীরের চারিদিকে কত যে ফুটিত ফুলকুল নিত্য নিত্য,কহিব কেমনে? পঞ্চবটী-বন-চর মধু নিরবধি; জাগাত প্রভাতে মোরে কহরি সুস্বরে পিকরাজ;কোন রাণী,কহ; শশিুমুখি, হেন চিত্ত-বিনোদন বৈতালিক-গীতে খোলে আঁখি? শিখী সহ । শিখীনি সুখিনী নাচিত দুয়ারে মোর; নর্ত্তক,নর্ত্তকী, এ দোঁহার সম, রামা,আছে কি জগতে? অতিথি আসিত নিত্য করভ,করভী, মৃগ- শিশু, বিহঙ্গম,স্বর্ণ-অঙ্গ কেহ, কেহ, শুভ্র,কেহ কাল,কেহ বা চিত্রিত, যথা বাসবের ধনুঃ ঘন-বন-শিরে; অহিংসক জীব যত। সেবিতাম সবে, মহাদরে; পালিতাম পরম যতনে, মরুভূমে স্রতোস্বতী তৃষাতুরে যথা, আপনি সুজলবতী বারিদ-প্রসাদে। সরসী আরসি মোর; তুলি কুবলয়ে, (অতুল রতন-সম) পরিতাম কেশে; সাজিতাম ফুল-সাজে; হাসিতেন প্রভু, বনদেবী বলি মোরে সম্ভাষি কৌতুকে; হায়, সখি, আর কি লো পাব প্রাণনাথে? আর কি এ পোড়া আঁখি এ ছার জনমে দেখিবে সে পা-দুখানি—আশার সরসে রাজীব; নয়ন মণি? হে দারুণ বিধি, কি পাপে পাপী এ দাসী তোমার সমীপে? এতেক কহিয়া দেবী কাঁদিলা নীরবে। কাঁদিলা সরমা সতী তিতি অশ্রু-নীরে। কতক্ষনে চক্ষু-জল মুছি রক্ষোবধূ সরমা, কহিলা সতী সীতার চরণে;— ”স্মরিলে পূর্ব্বের কথা ব্যাথা মনে যদি পাও, দেবী, থাক তবে ; কি কাজ স্মরিয়া?— হেরি তব অশ্রু-বারি ইচ্ছি মরিবারে;” উত্তরিলা প্রিয়ম্বদা ( কাদম্বা যেমতি মধু-স্বরা);–“এ অভাগী,হায়, লো সুভগে, যদি না কাঁদিবে, তবে কে আর কাঁদিবে এ জগতে? কহি, শুন পূর্ব্বের কাহিনী। বরিষার কালে,সখি,প্লাবন-পীড়নে কাতর,প্রবাহ,ঢালে,তীর অতিক্রমি, বারি-রাশি দুই পাশে; তেমতি যে মনঃ দুঃখিত,দুঃখের কথা কহে সে অপরে। তেঁই আমি কহি,তুমি শুন,লো সরমে; কে আছে সীতার আর এ অবরু-পুরে? ”পঞ্চবটী-বনে মোরা গোদাবরী-তটে ছিনু সুখে। হায়, সখি,কেমনে বর্ণিব সে কান্তার-কান্তি আমি? সতত স্বপনে শুনিতাম মন-বীণা বন-দেবী-করে; সরসীর তীরে বসি, দেখিতাম কভু সৌর-কর-রাশি-বেশে সুরবালা-কেলি পদ্মবনে; কভু সাধ্ধী ঋষিবংশ-বধূ সুহাসিনী আসিতেন দাসীর কুটীরে, সুধাংশুর অংশু যেন অন্ধকার ধামে; অজিন (রন্জিত, আহা, কত শত রঙে;) পাতি বসিতাম কভু দীর্ঘ তরুমূলে, সখী-ভাবে সম্ভাষিয়া ছায়ায়,কভু বা কুরঙ্গিনী-সঙ্গে রঙ্গে নাচিতাম বনে, গাইতাম গীত শুনি কোকিলের ধ্বনি; নব-লতিকার,সতি দিতাম বিবাহ তরু-সহ; চুম্বিতাম মন্জরিত যবে দম্পতী, মন্জরীবৃন্দে আনন্দে সম্ভাষি নাতিনী বলিয়া সবে; গুন্জরিলে অলি, নাতিনী-জামাই বলি বরিতাম তারে; কভু বা প্রভুরর সহ ভ্রমিতাম সুখে নদী-তটে; দেখিতাম তরল সলিলে নূতন গগন যেন,নব তারাবলী, নব নিশাকান্ত-কান্তি ; কভু বা উঠিয়া পর্ব্বত-উপরে ,সখি বসিতাম আমি নাথের চরণ-তলে, ব্রততী যেমতি বিশাল রসাল-মূলে; কত যে আদরে তুষিতেন প্রভু মোরে, বরষি বচন- সুধা, হায়, কব কারে ? কব বা কেমনে? শুনেছি কৈলাস-পুরে কৈলাস-নিবাসী ব্যোমকেশ,স্বর্ণাসনে বসি গৌরী-সনে, আগম,পুরাণ, বেদ, পঞ্চতন্ত্র-কথা পঞ্চমুখে পঞ্চমুখ কহেন উমারে; শুনিতাম সেইরূপে আমিও,রূপি, নানাকথা ; এখনও, এ বিজন বনে, ভাবি আমি শুনি যেন সে মধুর বাণী;— সাঙ্গ কি দাসীর পক্ষে, হে নিষ্ঠুর বিধি, সে সঙ্গীত ?”—নীরবিলা আয়ত-লোচনা বিষাদে। কহিলা তবে সরমা সুন্দরী;— “শুনিলে তোমার কথা, রাঘব-রমণি, ঘৃণা জন্মে রাজ-ভোগে ; ইচ্ছা করে,ত্যজি রাজ্য-সুখ, যাই চলি হেন বনবাসে; কিন্তু ভেবে দেখি যদি,ভয় হয় মনে। রবিকর যবে, দেবি, পশে বনস্থলে তমোময়,নিজগুনে আলো করে বনে সে কিরণ; নিশি যবে যায় কোন দেশে, মলিন-বদন সবে তার সমাগমে; যথা পদার্পণ তুমি কর, মধুমতি, কেন না হইবে সুখী সর্ব্ব জন তথা, জগৎ-আনন্দ তুমি, ভুবন-মোহিনী; কহ, দেবি, কি কৌশলে হরিল তোমারে রক্ষঃপতি? শুনিয়াছে বীণা-ধ্বনি দাসী, পিকবর-রব নব পল্লব-মাঝারে সরষ মধুর মাসে ; কিন্তু নাহি শুনি হেন মধুমাখা কথা কভু এ জগতে;” ===========
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
সাধিনু নিদ্রায় বৃথা সুন্দর সিংহলে।— স্মৃতি, পিতা বাল্মীকির বৃদ্ধ-রূপ ধরি, বসিলা শিয়রে মোর ; হাতে বীণা করি, গাইলা সে মহাগীত, যাহে হিয়া জ্বলে, যাহে আজু আঁখি হতে অশ্রু-বিন্দু গলে ! কে সে মূঢ় ভূভারতে, বৈদেহি সুন্দরি, নাদি আর্দ্রে মনঃ যার তব কথা স্মরি, নিত্য-কান্তি কমলিনী তুমি ভক্তি-জলে! দিব্য চক্ষুঃ দিলা গুরু;দেখিনু সুক্ষণে শিলা জলে;কুম্ভকর্ণ পশিল সমরে, চলিল অচল যেন ভীষণ ঘোষণে, কাঁপায় ধরায় ঘন ভীম-পদ-ভরে। বিনাশিলা রামানুজ মেঘনাদে রণে; বিনাশিলা রঘুরাজ রক্ষোরাজেশ্বরে।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
ভক্তিমূলক
(১)          যমুনা পুলিনে আমি ভ্রমি একাকিনী, হে নিকুঞ্জবন, না পাইয়া ব্রজেশ্বরে,              আইনু হেথা সত্বরে, হে সখে, দেখাও মোরে ব্রজের রঞ্জন! সুধাংশু সুধার হেতু,            বাঁধিয়ে আশার সেতু, কুমুদীর মনঃ যতা উঠে গো গগনে, হেরিতে মুরলীধর---             রূপে যিনি শশধর--- আসিয়াছি আমি দাসী তোমার সদনে--- তুমি হে অম্বর, কুঞ্জবর, তব চাঁদ নন্দের নন্দন!(২)          তুমি জান কত ভাল বাসি শ্যামধনে আমি অভাগিনী; তুমি জান, সুভাজন,             হে কুঞ্জকুল রাজন, এ দাসীরে কত ভাল বাসিতেন তিনি! তোমার কুসুমালয়ে           যবে গো অতিথি হয়ে, বাজায়ে বাঁশরী ব্রজ মোহিত মোহন, তুমি জান কোন ধনী            শুনি সে মধুর ধ্বনি, অমনি আসি সেবিত ও রাঙা চরণ, যথা শুনি জলদ-নিনাদ ধায় রড়ে প্রমদা শিখিনী।(৩)          সে কালে---জ্বলে রে মনঃ স্মরিলে সে কথা, মঞ্জু কুঞ্জবন,--- ছায়া তব সহচরী                সোহাগে বসাতো ধরি মাধবে অধীনী সহ পাতি ফুলাসন; মুঞ্জরিত তরুবলী,                গুঞ্জরিত যত অলি, কুসুম-কামিনী তুলি ঘোমটা অমনি, মলয়ে সৌরভধন                    বিতরিত অনুক্ষণ, দাতা যথা রাজেন্দ্রনন্দিনী---গন্ধামোদে মোদিয়া কানন!(৪)          পঞ্চস্বরে কত যে গাইত পিকবর মদন-কীর্ত্তন,--- হেরি মম শ্যাম-ধন                 ভাবি তারে নবঘন, কত যে নাচিত সুখে শিখিনী, কানন,--- ভুলিতে কি পারি তাহা,     দেখেছি শুনেছি যাহা? রয়েছে সে সব লেখা রাধিকার মনে। নলিনী ভুলিবে যবে             রবি-দেবে, রাধা তবে ভুলিবে, হে মঞ্জু কুঞ্জ, ব্রজের রঞ্জনে। হায় রে, কে জানে যদি ভুলি যবে আসি গ্রাসিবে শমন।(৫)          কহ, সখে, জান যদি কোথা গুণমণি--- রাধিকারমণ? কাম-বঁধু যথা মধু                 তুমি হে শ্যামের বঁধু একাকী আজি গো তুমি কিসের কারণ,--- হে বসন্ত, কোথা আজি তোমার মদন? তব পদে বিলাপিনী          কাঁদি আমি অভাগিনী, কোথা মম শ্যামমণি---কহ কুঞ্জবর! তোমার হৃদয় দয়া,              পদ্মে যথা পদ্মালয়া, বধো না রাধার প্রাণ না দিয়া উত্তর! মধু কহে, শুন ব্রজাঙ্গনে, মধুপুরে শ্রীমধুসূদন!
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
মহাকাব্য
সম্মুখ সমরে পড়ি, বীর-চূড়ামণি বীরবাহু, চলি যবে গেলা যমপুরে অকালে, কহ, হে দেবি অমৃতভাষিণি, কোন্ বীরবরে বরি সেনাপতি-পদে, পাঠাইলা রণে পুনঃ রক্ষঃকুলনিধি রাঘবারি? কি কৌশলে, রাক্ষসভরসা ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদে — অজেয় জগতে — ঊর্মিলাবিলাসী নাশি, ইন্দ্রে নিঃশঙ্কিলা? বন্দি চরণারবিন্দ, অতি মন্দমতি আমি, ডাকি আবার তোমায়, শ্বেতভুজে ভারতি! যেমতি, মাতঃ, বসিলা আসিয়া, বাল্মীকির রসনায় (পদ্মাসনে যেন) যবে খরতর শরে, গহন কাননে, ক্রৌঞ্চবধূ সহ ক্রৌঞ্চে নিষাদ বিঁধিলা, তেমতি দাসেরে, আসি, দয়া কর, সতি। কে জানে মহিমা তব এ ভবমণ্ডলে? নরাধম আছিল যে নর নরকুলে চৌর্যে রত, হইল সে তোমার প্রসাদে, মৃ্ত্যুঞ্জয়, যথা মৃত্যুঞ্জয় উমাপতি! হে বরদে, তব বরে চোর রত্নাকর কাব্যরত্নাকর কবি! তোমার পরশে, সুচন্দন-বৃক্ষশোভা বিষবৃক্ষ ধরে! হায়, মা, এহেন পুণ্য আছে কি এ দাসে? কিন্তু যে গো গুণহীন সন্তানের মাঝে মূঢ়মতি, জননীর স্নেহ তার প্রতি সমধিক। ঊর তবে, ঊর দয়াময়ি বিশ্বরমে! গাইব, মা, বীররসে ভাসি, মহাগীত; ঊরি, দাসে দেহ পদছায়া। — তুমিও আইস, দেবি তুমি মধুকরী কল্পনা! কবির ঢিত্ত-ফুলবন-মধু লয়ে, রচ মধুচক্র, গৌড়জন যাহে আনন্দে করিবে পান সুধা নিরবধি। কনক-আসনে বসে দশানন বলী — হেমকূট-হৈমশিরে শৃঙ্গবর যথা তেজঃপুঞ্জ। শত শত পাত্রমিত্র আদি সভাসদ, নতভাবে বসে চারি দিকে। ভূতলে অতুল সভা — স্ফটিকে গঠিত; তাহে শোভে রত্নরাজি, মানস-সরসে সরস কমলকুল বিকশিত যথা। শ্বেত, রক্ত, নীল, পীত, স্তম্ভ সারি সারি ধরে উচ্চ স্বর্ণছাদ, ফণীন্দ্র যেমতি, বিস্তারি অযুত ফণা, ধরেন আদরে ধরারে। ঝুলিছে ঝলি ঝালরে মুকুতা, পদ্মরাগ, মরকত, হীরা; যথা ঝোলে (খচিত মুকুলে ফুল) পল্লবের মালা ব্রতালয়ে। ক্ষণপ্রভা সম মুহুঃ হাসে রতনসম্ভবা বিভা — ঝলসি নয়নে! সুচারু চামর চারুলোচনা কিঙ্করী ঢুলায়; মৃণালভুজ আনন্দে আন্দোলি চন্দ্রাননা। ধরে ছত্র ছত্রধর; আহা হরকোপানলে কাম যেন রে না পুড়ি দাঁড়ান সে সভাতলে ছত্রধর-রূপে!— ফেরে দ্বারে দৌবারিক, ভীষণ মুরতি, পাণ্ডব-শিবির দ্বারে রুদ্রেশ্বর যথা শূলপাণি! মন্দে মন্দে বহে গন্ধে বহি, অনন্ত বসন্ত-বায়ু, রঙ্গে সঙ্গে আনি কাকলী লহরী, মরি! মনোহর, যথা বাঁশরীস্বরলহরী গোকুল বিপিনে! কি ছার ইহার কাছে, হে দানবপতি ময়, মণিময় সভা, ইন্দ্রপ্রস্থে যাহা স্বহস্তে গড়িলা তুমি তুষিতে পৌরবে? এহেন সভায় বসে রক্ষঃকুলপতি, বাক্যহীন পুত্রশোকে! ঝর ঝর ঝরে অবিরল অশ্রুধারা — তিতিয়া বসনে, যথা তরু, তীক্ষ্ণ শর সরস শরীরে বাজিলে, কাঁদে নীরবে। কর জোড় করি, দাঁড়ায় সম্মুখে ভগ্নদূত, ধূসরিত ধূলায়, শোণিতে আর্দ্র সর্ব কলেবর। বীরবাহু সহ যত যোধ শত শত ভাসিল রণসাগরে, তা সবার মাঝে একমাত্র বাঁচে বীর; যে কাল তরঙ্গ গ্রাসিল সকলে, রক্ষা করিল রাক্ষসে— নাম মকরাক্ষ, বলে যক্ষপতি সম। এ দূতের মুখে শুনি সুতের নিধন, হায়, শোকাকুল আজি রাজকুলমণি নৈকষেয়! সভাজন দুঃখী রাজ-দুঃখে। আঁধার জগৎ, মরি, ঘন আবরিলে দিননাথে! কত ক্ষণে চেতন পাইয়া, বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি, কহিলা রাবণ;— “নিশার স্বপনসম তোর এ বারতা, রে দূত! অমরবৃন্দ যার ভুজবলে কাতর, সে ধনুর্ধরে রাঘব ভিখারী বধিল সম্মুখ রণে? ফুলদল দিয়া কাটিলা কি বিধাতা শাল্মলী তরুবরে? হা পুত্র, হা বীরবাহু, বীর-চূড়ামণি! কি পাপে হারানু আমি তোমা হেন ধনে? কি পাপ দেখিয়া মোর, রে দারুণ বিধি, হরিলি এ ধন তুই? হায় রে, কেমনে সহি এ যাতনা আমি? কে আর রাখিবে এ বিপুল কুল-মান এ কাল সমরে! বনের মাঝারে যথা শাখাদলে আগে একে একে কাঠুরিয়া কাটি, অবশেষে নাশে বৃক্ষে, হে বিধাতঃ, এ দুরন্ত রিপু তেমতি দুর্বল, দেখ, করিছে আমারে নিরন্তর! হব আমি নির্মূল সমূলে এর শরে! তা না হলে মরিত কি কভু শূলী শম্ভুসম ভাই কুম্ভকর্ণ মম, অকালে আমার দোষে? আর যোধ যত— রাক্ষস-কুল-রক্ষণ? হায়, সূর্পণখা, কি কুক্ষণে দেখেছিলি, তুই অভাগী, কাল পঞ্চবটীবনে কালকূটে ভরা এ ভুজগে? কি কুক্ষণে (তোর দুঃখে দুঃখী) পাবক-শিখা-রূপিণী জানকীরে আমি আনিনু এ হৈম গেহে? হায় ইচ্ছা করে, ছাড়িয়া কনকলঙ্কা, নিবিড় কাননে পশি, এ মনের জ্বালা জুড়াই বিরলে! কুসুমদাম-সজ্জিত, দীপাবলী-তেজে উজ্জ্বলিত নাট্যশালা সম রে আছিল এ মোর সুন্দরী পুরী! কিন্তু একে একে শুখাইছে ফুল এবে, নিবিছে দেউটি; নীরব রবাব, বীণা, মুরজ, মুরলী; তবে কেন আর আমি থাকি রে এখানে? কার রে বাসনা বাস করিতে আঁধারে?” এইরূপে বিলাপিলা আক্ষেপে রাক্ষস– কুলপতি রাবণ; হায় রে মরি, যথা হস্তিনায় অন্ধরাজ, সঞ্জয়ের মুখে শুনি, ভীমবাহু ভীমসেনের প্রহারে হত যত প্রিয়পুত্র কুরুক্ষেত্র-রণে! তবে মন্ত্রী সারণ (সচিবশ্রেষ্ঠ বুধঃ) কৃতাঞ্জলিপুটে উঠি কহিতে লাগিলা নতভাবে; — “হে রাজন্, ভুবন বিখ্যাত, রাক্ষসকুলশেখর, ক্ষম এ দাসেরে! হেন সাধ্য কার আছে বুঝায় তোমারে এ জগতে? ভাবি, প্রভু দেখ কিন্তু মনে;— অভ্রভেদী চূড়া যদি যায় গুঁড়া হয়ে বজ্রাঘাতে, কভু নহে ভূধর অধীর সে পীড়নে। বিশেষতঃ এ ভবমণ্ডল মায়াময়, বৃথা এর দুঃখ সুখ যত। মোহের ছলনে ভুলে অজ্ঞান যে জন।” উত্তর করিলা তবে লঙ্কা-অধিপতি;— “যা কহিলে সত্য, ওহে অমাত্য-প্রধান সারণ! জানি হে আমি, এ ভব-মণ্ডল মায়াময়, বৃথা এর দুঃখ সুখ যত। কিন্তু জেনে শুনে তবু কাঁদে এ পরাণ অবোধ। হৃদয়-বৃন্তে ফুটে যে কুসুম, তাহারে ছিঁড়িলে কাল, বিকল হৃদয় ডোবে শোক-সাগরে, মৃণাল যথা জলে, যবে কুবলয়ধন লয় কেহ হরি।” এতেক কহিয়া রাজা, দূত পানে চাহি, আদেশিলা,— “কহ, দূত, কেমনে পড়িল সমরে অমর-ত্রাস বীরবাহু বলী?” প্রণমি রাজেন্দ্রপদে, করযুগ জুড়ি, আরম্ভিলা ভগ্নদূত;— “হায়, লঙ্কাপতি, কেমনে কহিব আমি অপূর্ব কাহিনী? কেমনে বর্ণিব বীরবাহুর বীরতা?— মদকল করী যথা পশে নলবনে, পশিলা বীরকুঞ্জর অরিদল মাঝে ধনুর্ধর। এখনও কাঁপে হিয়া মম থরথরি, স্মরিলে সে ভৈরব হুঙ্কারে! শুনেছি, রাক্ষসপতি, মেঘের গর্জনে; সিংহনাদে; জলধির কল্লোলে; দেখেছি দ্রুত ইরম্মদে, দেব, ছুটিতে পবন– পথে; কিন্তু কভু নাহি শুনি ত্রিভুবনে, এহেন ঘোর ঘর্ঘর কোদণ্ড-টঙ্কারে! কভু নাহি দেখি শর হেন ভয়ঙ্কর!— পশিলা বীরেন্দ্রবৃন্দ বীরবাহু সহ রণে, যূথনাথ সহ গজযূথ যথা। ঘন ঘনাকারে ধূলা উঠিল আকাশে,— মেঘদল আসি যেন আবরিলা রুষি গগনে; বিদ্যুৎঝলা-সম চকমকি উড়িল কলম্বকুল অম্বর প্রদেশে শনশনে!— ধন্য শিক্ষা বীর বীরবাহু! কত যে মরিল অরি, কে পারে গণিতে? এইরূপে শত্রুমাঝে যুঝিলা স্বদলে পুত্র তব, হে রাজন্! কত ক্ষণ পরে, প্রবেশিলা, যুদ্ধে আসি নরেন্দ্র রাঘব। কনক-মুকুট শিরে, করে ভীম ধনুঃ, বাসবের চাপ যথা বিবিধ রতনে খচিত,”— এতেক কহি, নীরবে কাঁদিল ভগ্নদূত, কাঁদে যথা বিলাপী, স্মরিয়া পূর্বদুঃখ! সভাজন কাঁদিলা নীরবে। অশ্রুময়-আঁখি পুনঃ কহিলা রাবণ, মন্দোদরীমনোহর;— “কহ, রে সন্দেশ– বহ, কহ, শুনি আমি, কেমনে নাশিলা দশাননাত্মজ শূরে দশরথাত্মজ?” “কেমনে, হে মহীপতি,” পুনঃ আরম্ভিল ভগ্নদূত, “কেমনে, হে রক্ষঃকুলনিধি, কহিব সে কথা আমি, শুনিবে বা তুমি? অগ্নিময় চক্ষুঃ যথা হর্যক্ষ, সরোষে কড়মড়ি ভীম দন্ত, পড়ে লম্ফ দিয়া বৃষস্কন্ধে, রামচন্দ্র আক্রমিলা রণে কুমারে! চৌদিকে এবে সমর-তরঙ্গ উথলিল, সিন্ধু যথা দ্বন্দ্বি বায়ু সহ নির্ঘোষে! ভাতিল অসি অগ্নিশিখাসম ধূমপুঞ্জসম চর্মাবলীর মাঝারে অযুত! নাদিল কম্বু অম্বুরাশি-রবে!— আর কি কহিব, দেব? পূর্বজন্মদোষে, একাকী বাঁচিনু আমি! হায় রে বিধাতঃ, কি পাপে এ তাপ আজি দিলি তুই মোরে? কেন না শুইনু আমি শরশয্যোপরি, হৈমলঙ্কা-অলঙ্কার বীরবাহু সহ রণভূমে? কিন্তু নহি নিজ দোষে দোষী। ক্ষত বক্ষঃস্থল মম, দেখ, নৃপমণি, রিপু-প্রহরণে; পৃষ্ঠে নাহি অস্ত্রলেখা।” এতেক কহিয়া স্তব্ধ হইল রাক্ষস মনস্তাপে। লঙ্কাপতি হরষে বিষাদে কহিলা; “সাবাসি, দূত! তোর কথা শুনি, কোন্ বীর-হিয়া নাহি চাহে রে পশিতে সংগ্রামে? ডমরুধ্বনি শুনি কাল ফণী কভু কি অলসভাবে নিবাসে বিবরে? ধন্য লঙ্কা, বীরপুত্রধারী! চল, সবে,— চল যাই, দেখি, ওহে সভাসদ-জন, কেমনে পড়েছে রণে বীর-চূড়ামণি বীরবাহু; চল, দেখি জুড়াই নয়নে।” উঠিলা রাক্ষসপতি প্রাসাদ-শিখরে, কনক-উদয়াচলে দিনমণি যেন অংশুমালী। চারিদিকে শোভিল কাঞ্চন- সৌধ-কিরীটিনী লঙ্কা— মনোহরা পুরী! হেমহর্ম্য সারি সারি পুষ্পবন মাঝে; কমল-আলয় সরঃ; উৎস রজঃ-ছটা; তরুরাজি; ফুলকুল— চক্ষু-বিনোদন, যুবতীযৌবন যথা; হীরাচূড়াশিরঃ দেবগৃহ; নানা রাগে রঞ্জিত বিপণি, বিবিধ রতনপূর্ণ; এ জগৎ যেন আনিয়া বিবিধ ধন, পূজার বিধানে, রেখেছে, রে চারুলঙ্কে, তোর পদতলে, জগত-বাসনা তুই, সুখের সদন। দেখিলা রাক্ষসেশ্বর উন্নত প্রাচীর— অটল অচল যথা; তাহার উপরে, বীরমদে মত্ত, ফেরে অস্ত্রীদল, যথা শৃঙ্গধরোপরি সিংহ। চারি সিংহদ্বার (রুদ্ধ এবে) হেরিলা বৈদেহীহর; তথা জাগে রথ, রথী, গজ, অশ্ব, পদাতিক অগণ্য। দেখিলা রাজা নগর বাহিরে, রিপুবৃন্দ, বালিবৃন্দ সিন্ধুতীরে যথা, নক্ষত্র-মণ্ডল কিম্বা আকাশ-মণ্ডলে। থানা দিয়া পূর্ব দ্বারে, দুর্বার সংগ্রামে, বসিয়াছে বীর নীল; দক্ষিণ দুয়ারে অঙ্গদ, করভসম নব বলে বলী; কিংবা বিষধর, যবে বিচিত্র কঞ্চুক- ভূষিত, হিমান্তে অহি ভ্রমে, ঊর্ধ্ব ফণা— ত্রিশূলসদৃশ জিহ্বা লুলি অবলেপে! উত্তর দুয়ারে রাজা সুগ্রীব আপনি বীরসিংহ। দাশরথি পশ্চিম দুয়ারে— হায় রে বিষণ্ণ এবে জানকী-বিহনে, কৌমুদী-বিহনে যথা কুমুদরঞ্জন শশাঙ্ক! লক্ষ্মণ সঙ্ঘে, বায়ুপুত্র হনু, মিত্রবর বিভীষণ। এত প্রসরণে, বেড়িয়াছে বৈরিদল স্বর্ণ-লঙ্কাপুরী, গহন কাননে যথা ব্যাধ-দল মিলি, বেড়ে জালে সাবধানে কেশরিকামিনী,— নয়ন–রমণী রূপে, পরাক্রমে ভীমা ভীমাসমা! অদূরে হেরিলা রক্ষঃপতি রণক্ষেত্র। শিবাকুল, গৃধিনী, শকুনি, কুক্কুর, পিশাচদল ফেরে কোলাহলে।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
ভক্তিমূলক
১নাচিছে কদম্বমূলে, বাজায়ে মুরলী,রে, রাধিকারমণ! চল,সখি,ত্বরা করি, দেখিগে প্রাণের হরি, ব্রজের রতন! চাতকী আমি স্বজনি, শুনি জলধর-ধ্বনি কেমনে ধৈরজ ধরি থাকি লো এখন? যাক্ মান,যাক্ কুল, মন-তরী পাবে কূল; চল,ভাসি প্রেমনীরে,ভেবে ও চরণ!২       মানস সরসে,সখি, ভাসিছে মরাল রে, কমল কাননে! কমলিনী কোন্ ছলে, থাকিবে ডুবিয়া জলে, বঞ্চিয়া রমণে? যে যাহারে ভাল বাসে, যে যাইবে তার পাশে--- মদন রাজার বিধি লঙ্ঘিব কেমনে? যদি অবহেলা করি, রুষিবে শম্বর-অরি; কে সম্বরে স্মর-শরে এ তিন ভুবনে!৩ওই শুন,পুনঃ বাজে মজাইয়া মন,রে, মুরারির বাঁশী! সুমন্দ মলয় আনে ও নিনাদ মোর কাণে--- আমি শ্যাম-দাসী। জলদ গরজে যবে, ময়ূরী নাচে সে রবে;--- আমি কেন না কাটিব শরমের ফাঁসি? সৌদামিনী ঘন সনে, ভ্রমে সদানন্দ মনে;--- রাধিকা কেন ত্যজিবে রাধিকাবিলাসী।৪ফুটিছে কুসুমকুল মুঞ্জু কুঞ্জবনে,রে, যথা গুণমণি! হেরি মোর শ্যামচাঁদ, পীরিতের ফুল ফাঁদ, পাতে লো ধরণী! কি লজ্জা!হা ধিক্ তারে, ছয় ঋতু বরে যারে, আমার প্রাণের ধন লোভে সে রমণী? চল,সখি,শীঘ্র যাই, পাছে মাধবে হারাই,--- মণিহারা ফণিনী কি বাঁচে লো স্বজনি?৫সাগর উদ্দেশে নদী ভ্রমে দেশে দেশে,রে, অবিরাম গতি--- গগনে উদিলে শশী, হাসি যেন পড়ে খসি, নিশি রূপবতী; আমার প্রেম-সাগর, দুয়ারে মোর নাগর, তাবে ছেড়ে রব আমি?ধিক্ এ কুমতি! আমার সুধাংশু নিধি--- দিয়াছে আমায় বিধি--- বিরহ আঁধারে আমি?ধিক্ এ যুকতি!৬নাচিছে কদম্বমূলে, বাজায়ে মুরলী,রে, রাধিকারমণ! চল,সখি,ত্বরা করি, দেখিগে প্রাণের হরি, গোকুল রতন! মধু কহে ব্রজাঙ্গনে, স্মরি ও রাঙা চরণে, যাও যথা ডাকে তোমা শ্রীমধুসূদন! যৌবন মধুর কাল, আশু বিনাশিবে কাল, কালে পিও প্রেমমধু করিয়া যতন।(ব্রজাঙ্গনা কাব্য)
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
ভক্তিমূলক
১কেনে এত ফুল তুলিলি, স্বজনি— ভরিয়া ডালা? মেঘাবৃত হলে,            পরে কি রজনী তারার মালা? অার কি যতনে,          কুসুম রতনে ব্রজের বালা?২আর কি পরিবে          কভু ফুলহার ব্ৰজকামিনী? কেনে লো হরিলি        ভূষণ লতার— বনশোভিনী? অলি বঁধু তার;           কে আছে রাধার— হতভাগিনী?৩হায় লো দোলাবি,      সখি,কার গলে মালা গাঁথিয়া? আর কি নাচে লো     তমালের তলে বনমালিয়া? প্রেমের পিঞ্জর,         ভাঙি পিকবর, গেছে উড়িয়া!৪আর কি বাজে লো    মনোহর বাঁশী নিকুঞ্জবনে? ব্রজ সুধানিধি            শোভে কি লো হাসি, ব্রজগগনে? ব্রজ কুমুদিনী,            এবে বিলাপিনী ব্রজভবনে!৫হায় রে যমুনে            কেনে না ডুবিল তোমার জলে অদয় অক্রূর,             যবে সে আইল ব্রজমণ্ডলে? ক্রূর দূত হেন,             বধিলে না কেন বলে কি ছলে?৬হরিল অধম               মম প্রাণ হরি ব্রজরতন! ব্রজবনমধু                 নিল ব্রজ অরি, দলি ব্রজবন? কবি মধু ভণে,            পাবে, ব্রজাঙ্গনে, মধুসূদন!
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
সুবর্ণ-দেউল আমি দেখিনু স্বপনে অতি-তুঙ্গ শৃঙ্গ শিরে! সে শৃঙ্গের তলে, বড় অপ্রশস্ত সিঁড়ি গড়া মায়া-বলে, বহুবিধ রোধে রুদ্ধ উর্দ্ধগামী জনে! তবুও উঠিতে তথা-- সে দুর্গম স্থলে-- করিছে কঠোর চেষ্টা কষ্ট সহি মনে বহু প্রাণী। বহু প্রাণী কাঁদিছে বিকেলে, না পারি লভিতে যত্নে সে রত্ন-ভবনে। ব্যথিল হৃদয় মোর দেখি তা সবারে।-- শিয়রে দাঁড়ায়ে পরে কহিলা ভারতী, মৃদু হাসি; ``ওরে বাছা, না দিলে শকতি আমি, ও দেউলে কার সাধ্য উঠিবারে? যশের মন্দির ওই; ওথা যার গতি, অশক্ত আপনি যম ছুঁইতে রে তারে!''
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
শুনিনু গম্ভীর ধ্বনি গিরির গহ্বরে, ক্ষুধাৰ্ত্ত কেশরী যেন নাদিছে ভীষণে; প্রলয়ের মেঘ যেন গর্জ্জিছে গগনে ; সচূড়ে পাহাড় কাঁপে থর থর থরে, কাঁপে চারি দিকে বন যেন ভূকম্পনে ; উথলে অদূরে সিন্ধু যেন ক্রোধ-ভরে, যবে প্রভঞ্জন আসে নির্ঘোষ ঘোষণে। জিজ্ঞাসিনু ভারতীরে জ্ঞানার্থে সত্বরে! কহিলা মা;---''রৌদ্র নামে রস,রৌদ্র অতি, রাখি আমি,ওরে বাছা,বাঁধি এই স্থলে, (কৃপা করি বিধি মোরে দিলা এ শকতি) বাড়বাগ্নি মগ্ন যথা সাগরের জল। বড়ই কর্কশ-ভাষী,নিষ্ঠুর,দুর্ম্মতি, সতত বিবাদে মত্ত,পুড়ি রোষানলে।''
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
মহাকাব্য
প্রমোদ-উদ্যানে কাঁদে দানব-নন্দিনী প্রমীলা, পতি-বিরহে কাতরা যুবতী। অশ্রুআঁখি-বিধুমুখী ভ্রমে ফুলবনে কভু,ব্রজ-কুঞ্জ-বনে,হায়রে, যেমনি ব্রজবালা,নাহি হেরি কদম্বের মূলে পীতধড়া পীতাম্বরে,অধরে মূরলী। অবচয়ি ফুল-চয়ে সে নিকুঞ্জ বনে, বিষাদে নিশ্বাস ছাড়ি,সখীরে সম্ভাষি কহিলা প্রমীলা সতী; “এইত তুলিনু ফুলরাশি; চিকনিয়া গাঁথিনু,স্বজনি, ফুলমালা;কিন্তু কোথা পাব সে চরণে, পুস্পাঞ্জলি দিয়া যাহে চাহি পূজিবারে; কে বাঁধিল মৃগরাজে বুঝিতে না পারি। চল,সখি, লঙ্কাপুরে যাই মোরা সবে।” কহিল বাসন্তী সখী;–“কেমনে পশিবে লঙকাপুরে আজি তুমি? অলঙ্ঘ্য সাগর- সম রাঘবীয় চমূ বেড়িছে তাহারে; লক্ষ লক্ষ রক্ষঃ- অরি ফিরিছে চৌদিকে অস্ত্রপাণি,দন্ডপাণি দন্ডধর যথা” রুষিলা দানব-বালা প্রমীলা রূপসী;– “কি কহিলি, বাসন্তি? পর্ব্বত-গৃহ ছাড়ি, বাহিরায় যবে নদী সিন্ধুর উদ্দেশে, কার হেন সাধ্য যে সে রোধে তার গতি? দানব-নন্দিনী আমি,রক্ষ-কুল-বধূ; রাবণ শ্বশুর মম, মেঘনাদ স্বামী,– আমি কি ডরাই,সখি,ভিখারী রাঘবে? পশিব লঙ্কায় আজি নিজ ভূজ-বলে; দেখিব কেমনে মোরে নিবারে নৃমনি? যথা বায়ু-সখা সহ দাবানল গতি দুর্ব্বার,চলিলা সতী পতির উদ্দেশে। টলিল কনক-লঙ্কা, গর্জ্জিল জলধি; ঘনঘনাকারে রেণু উড়িল চৌদিকে;– কিন্তু নিশা-কালে কবে ধূম-পুঞ্জ পারে আবরিতে অগ্নি-শিখা? অগ্নিশিখা-তেজে চলিলা প্রমীলা দেবী বামা-বল-দলে। কতক্ষনে উতরিলা পশ্চিম দুয়ারে বিধুমুখী। একবারে শত শঙ্খ ধরি ধ্বনিলা, টঙ্কারি রোষে শত ভীম ধনুঃ, স্ত্রীবৃন্দ; কাঁপিল লঙকা আতঙ্কে; কাঁপিল মাতঙ্গে নিষাদী; রথে রথী; তুরঙ্গমে সাদীবর; সিংহাসনে রাজা;অবরোধে কুলবধূ; বিহঙ্গম কাঁপিল কুলায়ে; পর্ব্বত-গহ্বরে সিংহ; বন-হস্তী বনে ডুবিল অতল জলে জলচর যত ; শিবিরে বসেন প্রভু রঘু-চুড়ামণি করপুটে শূর-সিংহ লক্ষণ সম্মুখে, পাশে বিভীষণ সখা, আর বীর যত, রুদ্র-কুল-সমতেজঃ,ভৈরব মুরতি । সহসা নাদিল ঠাট; ‘জয় রাম’-ধ্বনি উঠিল আকাশ-দেশে ঘোর কোলাহলে, সাগর-কল্লোল যথা; ত্রস্তে রক্ষোরথী, দাশরথি-পানে চাহি, কহিলা কেশরী,– “চেয়ে দেখ,রাঘবেন্দ্র, শিবির-বাহিরে। নিশীথে কি ঊষা আসি উতরিলা হেথা?” বিস্ময়ে চাহিলা সবে শিবির-বাহিরে। “ভৈরবীরূপিণী বামা,” কহিলা নৃমণি, “দেবী কি দানবী,সখে, দেখ নিরখিয়া; মায়াময় লঙ্কা-ধাম; পূর্ণ ইন্দ্রজালে; কামরূপী তবাগ্রজ। দেখ ভাল করি; এ কুহক তব কাছে অবিদিত নহে। শুভক্ষণে, রক্ষোবর,পাইনু তোমারে আমি। তোমা বিনা,মিত্র,কে আর রাখিবে এ দুর্ব্বল বলে,কহ,এ বিপত্তি-কালে? রামের চির-রক্ষণ তুমি রক্ষঃপুরে;” হেনকালে হনু সহ উতরিলা দূতী শিবিরে। প্রণমি বামা কৃতাঞ্জলিপুটে, (ছত্রিশ রাগিণী যেন মিলি এক তানে;) কহিলা; “প্রণমি আমি রাঘবের পদে, আর যত গুরুজনে;— নৃ-মুন্ড-মালিনী নাম মম;দৈত্যবালা প্রমীলা সুন্দরী, বীরেন্দ্র-কেশরী ইন্দ্রজিতের কামিনী, তাঁর দাসী।” আশীষিয়া, বীর দাশরথি সুধিলা; “কি হেতু,দূতি, গতি হেথা তব? বিশেষিয়া কহ মোরে, কি কাজে তুষিব তোমার ভর্ত্রিনী,শুভে? কহ শীঘ্র করি;” উত্তরিলা ভীমা-রূপী; “বীর-শ্রেষ্ঠ তুমি, রঘুনাথ; আসি যুদ্ধ কর তাঁর সাথে; নতুবা ছাড়হ পথ; পশিবে রূপসী স্বর্ণলঙ্কাপুরে আজি পূজিতে পতিরে।” এতেক কহিয়া বামা শিরঃ নোয়াইলা, প্রফুল্ল কুসুম যথা (শিশির মন্ডিত) বন্দে নোয়াইয়া শিরঃ মন্দ-সমীরণে; উত্তরিলা রঘুপতি; ”শুন, সুকেশিনী, বিবাদ না করি আমি কভু অকারণে। অরি মম রক্ষ-পতি; তোমরা সকলে কুলবালা,কুলবধূ; কোন অপরাধে বৈরি-ভাব আচরিব তোমাদেরসাথে? আনন্দে প্রবেশ লঙ্কা নিঃশঙ্ক হৃদয়ে”। এতেক কহিয়া প্রভু কহিলা হনুরে;– “দেহ ছাড়ি পথ, বলি। অতি সাবধানে, শিষ্ট আচরণে তুষ্ট কর বামা-দলে।” প্রণমিয়া সীতানাথে বাহিরিলা দূতী হাসিয়া কহিলা মিত্র বিভীষণ “দেখ, প্রমীলার পরাক্রম দেখ বাহিরিয়া, রঘুপতি;দেখ, দেব, অপূর্ব কৌতুক। না জানি এ বামা-দলে কে আঁটে সমরে ভীমারূপী, বীর্য্যবতী চামুন্ডা যেমতি– রক্তবীজ-কুল-অরি?” কহিলা রাঘব;– ”চল, মিত্র, দেখি তব ভ্রাতৃ-পুত্র-বধূ।” যথা দূর দাবানল পশিলে কাননে, অগ্নিময় দশ দিশ; দেখিলা সম্মুখে রাঘবেন্দ্র বিভা-রাশি নির্ধূম আকাশে, সুবর্নি বারিদপুঞ্জে; শুনিলা চমকি কোদন্ড-ঘর্ঘর ঘোর,ঘোড়া-দড়বড়ি, হুহুঙ্কার,কোষে বদ্ধ অসির ঝনঝনি। সে রোলের সহ মিশি বাজিছে বাজনা, ঝড় সঙ্গে বহে যেন কাকলী লহরী; উড়িছে পতাকা —রত্ন-সঙ্কলিত-আভা; মন্দগতি আস্কন্দিতে নাচে বজী রাজী; বোলিছে ঘুঙ্ঘুরাবলী ঘুনু ঘুনু বোলে। গিরিচূড়াকৃতি ঠাট দাঁড়ায় দুপাশে অটল,চলিছে মধ্যে বামা-কুল-দল; উপত্যকা-পথে যথা মাতঙ্গিনী-যূথ, গরজে পূরিয়া দেশ, ক্ষিতি টলমলি। সর্ব-অগ্রে উগ্রচন্ডা নৃ-মুন্ডমালিনী, কৃষ্ণ-হয়ারূঢ়া ধনী, ধ্বজ-দন্ড করে হৈমময়; তার পাছে চলে বাদ্যকরী, বিদ্যাধরী-দল যথা, হায় রে ভূতলে অতুলিত; বীণা বাঁশী, মৃদঙ্গ, মন্দিরা- আদি যন্ত্র বাজে মিলি মধুর নিক্কণে; তার পাছে শূল-পাণি বীরাঙ্গনা-মাঝে প্রমীলা,তারার দলে শশিকলা যথা; চলি গেলা বামাকুল। কেহ টঙ্কারিলা শিঞ্জিনী; হুঙ্কারি কেহ উলঙ্গিলা অসি; আস্ফালিলা শূলে কেহ; হাসিলা কেহ বা অট্টহাসে টিটকারি; কেহ বা নাদিলা, গহন বিপিনে যথা নাদে কেশরিণী, বীর-মদে, কাম-মদে উন্মাদ ভৈরবী; লক্ষ্য করি রক্ষোবরে, কহিলা রাঘব;– ”কি আশ্চর্য্য, নৈকষেয়? কভু নাহি দেখি, কভু নাহি শুনি হেন এ তিন ভুবনে; নিশার স্বপন আজি দেখিনু কি জাগি?” উত্তরিলা বিভীষণ; ”নিশার স্বপন নহে এ,বৈদেহী-নাথ,কহিনু তোমারে। কালনেমি নামে দৈত্য বিখ্যাত জগতে সুরারি,তনয়া তার প্রমীলা সুন্দরী। মহাশক্তি-সম তেজে;দম্ভোলি-নিক্ষেপী সহস্রাক্ষে যে হর্ষ্যক্ষ বিমুখে সংগ্রামে, সে রক্ষেন্দ্রে,রাঘবেন্দ্র,রাখে পদতলে বিমোহিনী,দিগম্বরী যথা দিগম্বরে;” লঙ্কার কনক-দ্বারে উতরিলা সতী প্রমীলা। বাজিল শিঙ্গা,বাজিল দুন্দুভি ঘোর রবে;গরজিল ভীষণ রাক্ষস, প্রলয়ের মেঘ কিম্বা করীযুথ যথা; উচ্চৈস্বরে কহে চন্ডা নৃ-মুন্ডমালিনী;— ”কাহারে হানিস্ অস্ত্র,ভীরু,এ আঁধারে? নহি রক্ষোরিপু মোরা, রক্ষঃ-কুল-বধূ, খুলি চক্ষুঃ দেখ চেয়ে।” অমনি দুয়ারী টানিল হুড়ুকা ধরি হুড় হুড় হড়ে; বজ্রশব্দে খুলে দ্বার। পশিলা সুন্দরী আনন্দে কনক লঙ্কা জয় জয় রবে। ==========
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
লিখিনু কি নাম মোর বিফল যতনে বালিতে,রে কাল,তোর সাগরের তীরে ? ফেন-চূড় জল-রাশি আসি কি রে ফিরে, মুছিতে তুচ্ছেতে ত্বরা এ মোর লিখনে ? অথবা খোদিনু তারে যশোগিরি-শিরে, গুণ-রূপ যন্ত্রে কাটি অক্ষর সুক্ষণে নারিবে উঠাতে যাহে,ধুয়ে নিজ নীরে, বিস্মৃতি,বা মলিনিতে মলের মিলনে?--- শূন্য-জল জল-পথে জলে লোক স্মরে; দেব-শূন্য দেবালয়ে অদৃশ্যে নিবাসে দেবতা;ভস্মের রাশি ঢাকে বৈশ্বানরে। সেই রূপে,ধড় যবে পড়ে কাল-গ্রাসে, যশোরূপাশ্রমে প্রাণ মর্ত্ত্যে বাস করে;--- কুযশে নরকে যেন সুযশে---আকাশে।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
কল্পনা-বাহনে সুখে করি আরোহণ, উতরিনু, যথা বসি বদরীর তলে, করে বীণা, গাইছেন গীত কুতূহলে সত্যবতী-সুত কবি,—ঋষিকুল-ধন ! শুনিলু গম্ভীর ধ্বনি ; উম্মীলি নয়ন দেখিনু কৌরবেশ্বরে, মত্ত বাহুবলে ; দেখিনু পবন-পুত্রে, ঝড় যথা চলে হুঙ্কারে !আইলা কর্ণ—সূর্যের নন্দন— তেজস্বী। উজ্জ্বলি যথা ছোটে অনম্বরে নক্ষত্র, আইলা ক্ষেত্রে পার্থ মহামতি, আলো করি দশ দিশ, ধরি বাম করে গাণ্ডীব—প্রচণ্ড-দণ্ড-দাতা রিপু প্রতি। তরাসে আকুল হৈনু এ কাল সমরে দ্বাপরে গোগৃহ-রণে উত্তর যেমতি।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
ভক্তিমূলক
১       চেয়ে দেখ,প্রিয়সখি,কি শোভা গগনে! সুগন্ধ-বহ-বাহন,                  সৌদামিনী সহ ঘন ভ্ৰমিতেছে মন্দগতি প্রেমানন্দ মনে! ইন্দ্র-চাপ রূপ ধরি,             মেঘরাজ ধ্বজোপরি, শোভিতেছে কামকেতু—খচিত রতনে!২       লাজে বুঝি গ্রহরাজ মুদিছে নয়ন! মদন উৎসবে এবে,            মাতি ঘনপতি সেবে রতিপতি সহ রতি ভুবনমোহন! চপলা চঞ্চলা হয়ে,            হাসি প্রাণনাথে লয়ে তুষিছে তাহায় দিয়ে ঘন আলিঙ্গন!৩       নাচিছে শিখিনী সুখে কেকা রব করি, হেরি ব্রজ কুঞ্জবনে,             রাধা রাধাপ্রাণধনে, নাচিত যেমতি যত গোকুল সুন্দরী! উড়িতেছে চাতকিনী            শূন্যপথে বিহারিণী জয়ধ্বনি করি ধনী—জলদ-কিঙ্করী!৪      হায় রে কোথায় আজি শ্যাম জলধর। তব প্রিয় সৌদামিনী,           কাঁদে নাথ একাকিনী রাধারে ভুলিলে কি হে রাধামনোহর? রত্নচূড়া শিরে পরি,            এস বিশ্ব আলো করি, কনক উদয়াচলে যথা দিনকর।৫      তব অপরূপ রূপ হেরি, গুণমণি, অভিমানে ঘনেশ্বর             যাবে কাঁদি দেশান্তর, আখণ্ডল-ধনু লাজে পালাবে অমনি; দিনমণি পুনঃ আসি          উদিবে আকাশে হাসি; রাধিকার সুখে সুখী হইবে ধরণী;৬      নাচে গোকুল নারী, যথা কমলিনী নাচে মলয়-হিল্লোলে          সরসী-রূপসী-কোলে, রুণু রুণু মধু বোলে বাজায়ে কিঙ্কিণী! বসাইও ফুলাসনে             এ দাসীরে তব সনে তুমি নব জলধর এ তব অধীনী!৭     অরে আশা আর কি রে হবি ফলবতী? আর কি পাইব তারে          সদা প্রাণ চাহে যারে পতি-হারা রতি কি লো পাবে রতি-পতি? মধু কহে হে কামিনী,         আশা মহামায়াবিনী! মরীচিকা কার তৃষা কবে তোষে সতি?
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
নীতিমূলক
রসাল কহিল উচ্চে স্বর্ণলতিকারে;--- ''শুন মোর কথা, ধনি, নিন্দ বিধাতারে। নিদারুণ তিনি অতি; নাহি দয়া তব প্রতি; তেঁই ক্ষুদ্র-কায়া করি সৃজিলা তোমারে। মলয় বহিলে, হায়, নতশিরা তুমি তায়, মধুকর- ভরে তুমি পড় লো ঢলিয়া; হিমাদ্রি সদৃশ আমি, বন-বৃক্ষ-কুল-স্বামী, মেঘলোকে উঠে শির আকাশ ভেদিয়া! কালাগ্নির মত তপ্ত তপন তাপন,--- আমি কি লো ডরাই কখন? দূরে রাখি গাভী-দলে, রাখাল আমার তলে বিরাম লভয়ে অনুক্ষণ,--- শুন, ধনি, রাজ-কাজ দরিদ্র পালন! আমার প্রসাদ ভুঞ্জে পথ-গামী জন। কেহ অন্ন রাঁধি খায় কেহ পড়ি নিদ্রা যায এ রাজ চরণে। শীতলিয়া মোর ডরে সদা আসি সেবা করে মোর অতিথির হেথা আপনি পবন! মধু-মাখা ফল মোর বিখ্যাত ভূবনে! তুমি কি তা জান না ললনে? দেখ মোর ডাল-রাশি, কত পাখী বাঁধে আসি বাসা এ আগারে! ধন্য মোর জনম সংসারে! কিন্তু তব দুখ দেখি নিত্য আমি দুখী; নিন্দ বিধাতায় তুমি, নিন্দ, বিধুমুখি!'' যুদ্ধার্থ গম্ভীরতার বাণী তব পানে! সুধা-আশে আসে অলি, দিলে সুধা যায় চলি,--- কে কোথা কবে গো দুখী সখার মিলনে?'' ''ক্ষুদ্র-মতি তুমি অতি'' রাগি কহে তরুপতি, ''নাহি কিছু অভিমান?ধিক্ চন্দ্রাননে!'' নীরবিলা তরুরাজ; উড়িল গগনে যমদূতাকৃতি মেঘ গম্ভীর স্বননে; আইলেন প্রভঞ্জন, সিংহনাদ করি ঘন, যথা ভীম ভীমসেন কৌরব-সমরে। আইল খাইতে মেঘ দৈত্যকুল রড়ে; ঐরাবত পিঠে চড়ি রাগে দাঁত কড়মড়ি, ছাড়িলেন বজ্র ইন্দ্র কড় কড় কড়ে! ঊরু ভাঙ্গি কুরুরাজে বধিলা যেমতি। ভীম যোধপতি; মহাঘাতে মড়মড়ি রসাল ভূতলে পড়ি হায়, বায়ুবলে হারাইয়া আয়ু-সহ দর্প বনস্থলে! ঊর্দ্ধশির যদি তুমি কুল মান ধনে; করিও না ঘৃণা তবু নীচশির জনে! এই উপদেশ কবি দিলা এ কৌশলে।।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
রাজপথে,শোভে যথা, রম্য-উপবনে, বিরাম-অ্যালয়বৃন্দ ; গড়িলা তেমতি দ্বাদশ মন্দির বিধি, বিবিধ রতনে, তব নিত্য পথে শূন্যে, রবি, দিনপতি। মাস কাল প্রতি গৃহে তোমার বসতি, গ্রহেন্দ্র ; প্রবেশ তব কখন সুক্ষণে,— কখন বা প্রতিকুল জীব-কুল প্রতি! অাসে এ বিরামালয়ে সেবিতে চরণে গ্রহব্রজ ; প্রজাব্রজ, রাজাসন-তলে পূজে রাজপদ যথা ; তুমি তেজাকর, হৈমময় তেজ-পুঞ্জ প্রসাদের ছলে, প্রদান প্রসন্ন ভাবে সবার উপর। কাহার মিলনে তুমি হাস কুতূহলে, কাহার মিলনে বাম,—শুনি পরস্পর।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
কামী যক্ষ দগ্ধ,মেঘ,বিরহ-দহনে, দূত-পদে বরি পূর্ব্বে,তোমায় সাধিল বহিতে বারতা তার অলকা-ভবনে, যেখানে বিরহে প্রিয়া ক্ষুণ্ণ মনে ছিল। কত যে মিনতি কথা কাতরে কহিল তব,পদতলে সে,তা পড়ে কি হে মনে? জানি আমি,তুষ্ট হয়ে তার সে সাধনে প্রদানিলা তুমি তারে যা কিছু যাচিল; তেঁই গো প্রবাসে আজি এই ভিক্ষা করি;--- দাসের বারতা লয়ে যাও শীঘ্রগতি বিরাজে,হে মেঘরাজ,যথা সে যুবতী, অধীর এ হিয়া হায়,যার রূপ স্মরি! কুসুমের কানে স্বনে মলয় যেমতি মৃদু নাদে,কয়ো তারে,এ বিরহে মরি!
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
লিপিমূলক
কে তুমি,--বিজন বনে ভ্রম হে, একাকী, বিভূতি-ভূষিত অঙ্গ? কি কৌতুকে, কহ, বৈশ্বানর, লুকাইছ ভস্মের মাঝারে? মেঘের আড়ালে যেন পূর্ণশশী আজি? ফাটে বুক জটাজুট হেরি তব শিরে, মঞ্জুকেশি! স্বর্ণশয্যা ত্যজি জাগি আমি বিরাগে, যখন ভাবি, নিত্য নিশাযোগে শয়ন, বারাঙ্গ তব, হায় রে, ভূতলে! উপাদেয় রাজভোগ যোগাইলে দাসী, কাঁদি ফিরাইয়া মুখ, পড়ে যাবে মনে তোমার আহার নিত্য ফল মূল, বলি! সুবর্ণ-মন্দিরে পশি নিরানন্দ গতি, কেন না--নিবাস তব বঞ্জুল মঞ্জুলে! হে সুন্দর, শীঘ্র আসি কহ মোরে শুনি-- কোন্ দুঃখে ভব-সুখে বিমুখ হইলা এ নব যৌবনে তুমি? কোন্ অভিমানে রাজবেশ ত্যজিলা হে উদাসীর বেশে? হেমাঙ্গ মৈনাক-সম, হে তেজস্বি কহ, কার ভয়ে ভ্রম তুমি এ বন সাগরে একাকী, আবরি তেজঃ, ক্ষীণ, ক্ষুন্ন খেদে? তোমার মনের কথা কহ আসি মোরে |-- যদি পরাভূত তুমি রিপুর বিক্রমে, কহ শিঘ্র ; দিব সেনা ভব-বিজয়িনী, রথ, গজ, অশ্ব, রথী--অতুল জগতে! বৈজয়ন্ত-ধামে নিত্য শচিকান্ত বলী ত্রস্ত অস্ত্র-ভয়ে যার, হেন ভীম রথী যুঝিবে তোমার হেতু--আমি আদেশিলে! চন্দ্রলোকে, সূর্যলোকে,--যে লোকে ত্রিলোকে লুকাইবে অরি তব, বাঁধি আনি তারে দিব তব পদে, শূর! চামুণ্ডা আপনি, (ইচ্ছা যদি কর তুমি) দাসীর সাধনে, (কুলদেবী তিনি, দেব,) ভীমখণ্ডা হাতে, ধাইবেন হুহুঙ্কারে নাচিতে সংগ্রামে-- দেব-দৈত্য-নর-ত্রাস!--যদি অর্থ চাহ, কহ শীঘ্র ; --অলঙ্কার ভান্ডার খুলিব তুষিতে তোমার মনঃ ; নতুবা কুহকে শুষি রত্নাকরে, লুটি দিব রত্ন-জালে! মণিযোনি খনি যত, দিব হে তোমারে! প্রেম-উদাসীন যদি তুমি, গুণমণি, কহ, কোন্ যুবতীর--(আহা, ভগ্যবতী রামাকুলে সে রমণী!)--কহ শীঘ্র করি,-- কোন্ যুবতীর নব যৌবনের মধু বাঞ্ছা তব? অনিমেষে রূপ তার ধরি, (কামরূপা আমি, নাথ,) সেবিব তোমারে! আনি পারিজাত ফুল, নিত্য সাজাইব শয্যা তব! সঙ্গে মোর সহস্র সঙ্গিনী, নৃত্য গীত রঙ্গে রত | অপ্সরা, কিন্নরী, বিদ্যাধরী,--ইন্দ্রাণীর কিঙ্করী যেমতি, তেমতি আমারে সেবে দশ শত দাসী | সুবর্ণ-নির্মিত গৃহে আমার বসতি-- মুক্তাময় মাঝ তার ; সোপান খচিত মরকতে ; স্তম্ভে হীরা ; পদ্মরাগ মণি ; গবাক্ষে দ্বিরদ-রদ, রতন কপাটে! সুকল স্বরলহরী উথলে চৌদিকে দিবানিশি ; গায় পাখী সুমধুর স্বরে ; সুমধুরতর স্বরে গায় বীণাবাণী বামাকুল! শত শত কুসুম-কাননে লুটি পরিমল, বায়ু অনুক্ষণ বহে! খেলে উত্স ; চলে জল কল কল কলে! কিন্তু বৃথা এ বর্ণনা | এস, গুণনিধি, দেখ আসি,--এ মিনতি দাসীর ও পদে! কায়, মনঃ, প্রাণ আমি সঁপিব তোমারে! ভঞ্জ আসি রাজভোগ দাসীর আলয়ে ; নহে কহ, প্রাণেশ্বর! অম্লান বদনে, এ বেশ ভূষণ ত্যজি, উদাসিনী-বেশে সাজি, পূজি, উদাসীন, পাদ-পদ্ম তব! রতন কাঁচলি খুলি, ফেলি তারে দূরে, আবরি বাকলে স্তন ; ঘুচাইয়া বেণী, মণ্ডি জটাজূটে শিরঃ ; ভুলি রত্নরাজী, বিপিন-জনিত ফুলে বাঁধি হে কবরী! মুছিয়া চন্দন, লেপি ভস্ম কলেবরে | পরি রুদ্রাক্ষের মালা, মুক্তামালা ছিঁড়ি গলদেশে! প্রেম-মন্ত্র দিও কর্ণ-মূলে ; গুরুর দক্ষিণা-রূপে প্রেম-গুরু-পদে দিব এ যৌবন-ধন প্রেম-কুতূহলে! প্রেমাধীনা নারীকুল ডরে কি হে দিতে জলাঞ্জলি, মঞ্জুকেশি, কুল, মান, ধনে প্রেম-লাভ লোভে কভু?--বিরলে লিখিয়া লেখন, রাখিনু, সখে, এই তরুতলে | নিত্য তোমা হেরি হেথা ; নিত্য ভ্রম তুমি এই স্থলে | দেখ চেয়ে ; ওই যে শোভিছে শমী,--লতাবৃতা, মরি, ঘোনটায় যেন, লজ্জাবতী!--দাঁড়াইয়া উহার আড়ালে, গতিহীনা লজ্জাভয়ে, কত যে চেয়েছি তব পানে, নরবর--হায়! সূর্যমুখী চাহে যথা স্থির-আঁখি সে সূর্যের পানে!-- কি আর কহিব তার? যত ক্ষণ তুমি থাকিতে বসিয়া, নাথ ; থাকিত দাঁড়ায়ে প্রেমের নিগড়ে বদ্ধা এ তোমার দাসী! গেলে তুমি শূণ্যাসনে বসিতাম কাঁদি! হায় রে, লইয়া ধূলা, সে স্থল হইতে যথায় রাখিতে পদ, মাখিতাম ভালে, হব্য-ভস্ম তপস্বিনী মাখে ভালে যথা! কিন্তু বৃথা কহি কথা! পড়িও নৃমণি, পড়িও এ লিপিখানি, এ মিনতি পদে! যদিও ও হৃদয়ে দয়া উদয়ে, যাইও গোদাবরী-পূর্বকূলে ; বসিব সেখানে মুদিত কুমুদীরূপে আজি সায়ংকালে ; তুষিও দাসীরে আসি শশধর-বেশে! লয়ে তরি সহচরী থাকিবেক তীরে ; সহজে পাইবে পার | নিবিড় সে পারে কানন, বিজন দেশ | এস, গুণনিধি! দেখিব প্রেমের স্বপ্ন জাগি হে দুজনে! যদি আজ্ঞা দেহ, এবে পরিচয় দিব সংক্ষেপে | বিখ্যাত, নাথ, লঙ্কা, রক্ষঃপুরী স্বর্ণময়ী, রাজা তথা রাজ-কুল-পতি রাবণ, ভগিনী তাঁর দাসী ; লোকমুখে যদি না শুনিয়া থাক, নাম সূর্পনখা | কত যে বয়স তার ; কি রূপ বিধাতা দিয়েছেন, আশু আসি দেখ, নরমণি! আইস মলয়-রূপে ; গন্ধহীন যদি এ কুসুম, ফিরে তবে যাইও তখনি! আইস ভ্রমর-রূপে ; না যোগায় যদি মধু এ যৌবন-ফুল, যাইও উড়িয়া গুঞ্জরি বিরাগ-রাগে! কি আর কহিব? মলয় ভ্রমর, দেব, আসি সাধে দোহে বৃন্তাসনে মালতীরে! এস, সখে, তুমি ;-- এই নিবেদন করে সূর্পনখা পদে | শুন নিবেদন পুনঃ | এত দূর লিখি লেখন, সখীর মুখে শুনিনু হরষে, রাজরথী দশরথ অযোধ্যাধিপতি, পুত্র তুমি, হে কন্দর্প-গর্ব্ব-খর্ব্ব-কারি, তাঁহার ; অগ্রজ সহ পশিয়াছ বনে পিতৃ-সত্য-রক্ষা-হেতু | কি আশ্চর্য্য! মরি,-- বালাই লইয়া তব, মরি, রঘুমণি, দয়ার সাগর তুমি! তা না হলে কভু রাজ্য-ভোগ ত্যজিতে কি ভাতৃ-প্রেম-বশে? দয়ার সাগর তুমি | কর দয়া মোরে, প্রেম-ভিখারিনী আমি তোমার চরণে! চল শীঘ্র যাই দোঁহে স্বর্ণ লঙ্কাধামে | সম পাত্র মানি তোমা, পরম আদরে, অর্পিবেন শুভ ক্ষণে রক্ষঃ-কুল-পতি দাসীরে কমল-পদে | কিনিয়া, নৃমণি, অযোধ্যা-সদৃশ রাজ্য শতেক যৌতুকে, হবে রাজা ; দাসী-ভাবে সেবিবে এ দাসী! এস শীঘ্র, প্রাণেশ্বর ; আর কথা যত নিবেদিব পাদ-পদ্মে বসিয়া বিরলে | ক্ষম অশ্রু-চিহ্ন পত্রে ; আনন্দে বহিছে অশ্রু-ধারা! লিখেছে কি বিধাতা এ ভালে হেন সুখ, প্রাণসখে? আসি ত্বরা করি, প্রশ্নের উত্তর, নাথ, দেহ এ দাসীরে |
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
যথাবিধি বন্দি কবি, আনন্দে আসরে, কহে, জোড় করি কর, গৌড় সুভাজনে;— সেই আমি, ডুবি পূর্বে ভারত‐সাগরে, তুলিল যে তিলোত্তমা‐মুকুতা যৌবনে;— কবি‐গুরু বাল্মীকির প্রসাদে তৎপরে, গম্ভীরে বাজায়ে বীণা, গাইল, কেমনে, নাশিলা সুমিত্রা‐পুত্র, লঙ্কার সমরে, দেব‐দৈত্য‐নরাতঙ্ক— রক্ষেন্দ্র‐নন্দনে; কল্পনা দূতীর সাথে ভ্রমি ব্রজ‐ধামে শুনিল যে গোপিনীর হাহাকার ধ্বনি, (বিরহে বিহ্বলা বালা হারা হয়ে শ্যামে;)— বিরহ‐লেখন পরে লিখিল লেখনী যার, বীর জায়া‐পক্ষে বীর পতি‐গ্রামে, সেই আমি, শুন, যত গৌড়‐চূড়ামণি!— ইতালি, বিখ্যাত দেশ, কাব্যের কানন, বহুবিধ পিক যথা গায় মধুস্বরে, সঙ্গীত-সুধার রস করি বরিষণ, বাসন্ত আমোদে আমোদ মন পূরি নিরন্তরে;— সে দেশে জনম পূর্বে করিলা গ্রহণ ফ্রাঞ্চিস্কো পেতরাকা কবি; বাক্দেবীর বরে বড়ই যশস্বী সাধু, কবি-কুল-ধন, রসনা অমৃতে সিক্ত, স্বর্ণ বীণা করে। কাব্যের খনিতে পেয়ে এই ক্ষুদ্র মণি, স্বমন্দিরে প্রদানিলা বাণীর চরণে কবীন্দ্র: প্রসন্নভাবে গ্রহিলা জননী (মনোনীত বর দিয়া) এ উপকরণে। ভারতে ভারতী-পদ উপযুক্ত গণি, উপহাররূপে আজি অরপি রতনে॥
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
স্বদেশমূলক
শচী সহ শচীপতি স্বর্ণ-মেঘাসনে, বাহিরিলা বিশ্ব দরশনে। আরোহি বিচিত্র রথ, চলে সঙ্গে চিত্ররথ, নিজদলে বিমণ্ডিত অস্ত্র আভরণে, রাজাজ্ঞায় আশুগতি বহিলা বাহনে। হেরি নানা দেশ সুখে, হেরি বহু দেশ দুঃখে— ধর্ম্মের উন্নতি কোন স্থলে; দেব অগ্রগতি বঙ্গে উতরিল। কহিলা মাহেন্দ্র সতী শচী সুলোচনা, কোন্‌ দেশে এবে গতি, কহ হে প্রাণের পতি, এ দেশের সহ কোন্ দেশের তুলনা? উত্তরিলা মধুর বচনে বাসব, লো চন্দ্রাননে, বঙ্গ এ দেশের নাম বিখ্যাত জগতে। ভারতের প্রিয় মেয়ে মা নাই তাহার চেয়ে নিত্য অলঙ্কৃত হীরা, মুক্ত, মরকতে। সস্নেহে জাহ্নবী তারে মেখলেন চারি ধারে বরুণ ধোয়েন পা দু’খানি। নিত্য রক্ষকের বেশে হিমাদ্রি উত্তর দেশে পরেশনাথ আপনি শিরে তার শিরোমণি সেই এই বঙ্গভূমি শুন লো ইন্দ্রাণি! দেবাদেশে আশুগতি চলিলেন মৃদুগতি উঠিল সহসা ধ্বনি সভয়ে শচী আমনি ইন্দ্রেরে সুধিলা,— নীচে কি হতেছে রণ কহ সখে বিবরণ হেন দেশে হেন শব্দ কি হেতু জন্মিলা? চিত্ররথ হাত জোড় করি, কহে, শুন, ত্রিদিব-ঈশ্বরি! ‘বিবাহ করিয়া এক বালক যাইছে, পত্নী আসে দেখ তার পিছে।’ সুধাংশুর অংশুরূপে নয়ন-কিরণ নীচদেশে পড়িল তখন।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে। সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে; সতত ( যেমতি লোক নিশার স্বপনে শোনে মায়া-যন্ত্রধ্বনি ) তব কলকলে জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে!-- বহু দেশে দেখিয়াছি বহু নদ-দলে, কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে? দুগ্ধ-স্রোতোরূপী তুমি জন্ম-ভূমি-স্তনে! আর কি হে হবে দেখা?--যত দিন যাবে, প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে বারি-রূপ কর তুমি ; এ মিনতি, গাবে বঙ্গজ-জনের কানে, সখে, সখা-রীতে নাম তার, এ প্রবাসে মজি প্রেম-ভাবে লইছে যে তব নাম বঙ্গের সঙ্গীতে!
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
লও দাসে সঙ্গে রঙ্গে, হেমাঙ্গি কল্পনে, বাগদেবীর প্রিয়সখি, এই ভিক্ষা করি ; হায়, গতিহীন আমি দৈব-বিড়ম্বনে,— নিকুঞ্জ-বিহারী পাখী পিঞ্জর-ভিতরি! চল যাই মনানন্দে গোকুল-কাননে, সরস বসন্তে যথা রাধাকান্ত হরি নাচিছেন, গোপীচয়ে নাচায়ে ; সঘনে পূরি বেণুরবে দেশ! কিম্বা, শুভঙ্করি, চল লো, আতঙ্কে যথা লঙ্কায় অকালে পূজেন উমায় রাম, রঘুরাজ-পতি, কিম্বা সে ভীষণ ক্ষেত্রে, যথা শরজালে নাশিছেন ক্ষত্ৰকুলে পার্থ মহামতি। কি স্বরগে, কি মরতে, অতল পাতালে, নাহি স্থল যথা, দেবি, নহে তব গতি ।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
নির্ম্মি গোলাকারে তোমা আরোপিলা যবে বিশ্ব-মাঝে স্রষ্টা ধরা! অতি হৃষ্ট মনে চারি দিকে তারা-চয় সুমধুর রবে ( বাজায়ে সুবর্ণ বীণা ) গাইল গগনে, কুল-বালা-দল যবে বিবাহ-উৎসবে হুলাহুলি দেয় মিলি বধূ-দরশনে। আইলেন আদি প্রভা হেম-ঘনাসনে, ভাসি ধীরে শূন্যরূপ সুনীল অর্ণবে, দেখিতে তোমার মুখ। বসন্ত আপনি আবরিলা শ্যাম বাসে বর কলেবরে; আঁচলে বসায়ে নব ফুলরূপ মণি, নব ফুল-রূপ মণি কবরী উপরে। দেবীর আদেশে তুমি,লো নব রমণি, কটিতে মেঘলা-রূপে পরিলা সাগরে।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
আঁধার পিঞ্জরে তুই,রে কুঞ্জ-বিহারি বিহঙ্গ, কি রঙ্গে গীত গাইস্ সুস্বরে ? ক মোরে, পূর্ব্বের সুখ কেমনে বিস্মরে মনঃ তোর ? বুঝা রে, যা বুঝিতে না পারি! সঙ্গীত-তরঙ্গ-সঙ্গে মিশি কি রে ঝরে অদৃশ্যে ও কারাগারে নয়নের বারি? রোদন-নিনাদ কি রে লোকে মনে করে মধুমাখা গীত-ধ্বনি, অজ্ঞানে বিচারি? কে ভাবে, হৃদয়ে তোর কি ভাব উথলে?— কবির কুভাগ্য তোর, আমি ভাবি মনে। দুখের আঁধারে মজি গাইস্ বিরলে তুই,পাখি, মজায়ে রে মধু-বরিষণে! কে জানে যাতনা কত তোর ভব-তলে ? মোহে গন্ধে গন্ধরস সহি হুতাশনে!
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
যথা দাবানল বেড়ে অনল-প্রাচীরে সিংহ-বৎসে । সপ্ত রথী বেড়িলা তেমতি কুমারে । অনল-কণা-রূপে শর, শিরে পড়ে পুঞ্জে পুঞ্জে পুড়ি, অনিবার-গতি! সে কাল অনল-তেজে, সে বনে যেমতি রোষে, ভয়ে সিংহ-শিশু গরজে অস্থিরে, গরজিলা মহাবাহু চারি দিকে ফিরে রোষে, ভয়ে। ধরি ঘন ধূমের মূরতি, উড়িল চৌদিকে ধুলা, পদ-আস্ফালনে অশ্বের । নিশ্বাস ছাড়ি আর্জ্জুনি বিষাদে, ছাড়িলা জীবন-আশা তরুণ যৌবনে। আঁধারি চৌদিক যথা রাহু গ্রাসে চাঁদে গ্রাসিলা বীরেশে যম । অস্তের শয়নে নিদ্রা গেলা অভিমন্যু অন্যায় বিবাদে।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
নীতিমূলক
শঙ্খনাদ করি মশা সিংহে আক্রমিল; ভব-তলে যত নর, ত্রিদিবে যত অমর, আর যত চরাচর, হেরিতে অদ্ভুত যুদ্ধ দৌড়িয়া আইল। হুল-রূপ শূলে বীর, সিংহেরে বিঁধিল। অধীর ব্যথায় হরি, উচ্চ-পুচ্ছে ক্রোধ করি, কহিলা;—“কে তুই, কেন বৈরিভাব তোর হেন? গুপ্তভাবে কি জন্য লড়াই?— সম্মুখ-সমর কর্‌; তাই অামি চাই। দেখিব বীরত্ব কত দূর, আঘাতে করিব দর্প-চূর; লক্ষ্মণের মুখে কালি ইন্দ্রজিতে জয়-ডালি, দিয়াছে এ দেশে কবি।” কহে মশা;—“ভীরু, মহাপাপি, যদি বল থাকে, বিষম-প্রতাপি, অন্যায়-ন্যায়-ভাবে, ক্ষুধায় যা পায়, খাবে; ধিক্‌, দুষ্টমতি! মারি তোরে বন-জীবে দিব, রে, কু-মতি।'' হইল বিষম রণ, তুলনা না মিলে; ভীম দুর্য্যোধনে, ঘোর গদা-রণে, হ্রদ দ্বৈপায়নে, তীরস্থ সে রণ-ছায়া পড়িল সলিলে; ডরাইয়া জল-জীবী জল-জন্তুচয়ে, সভয়ে মনেতে ভাবিল, প্রলয়ে বুঝি এ বীরেন্দ্র-দ্বয় এ সৃষ্টি নাশিল! মেঘনাদ মেঘের পিছনে, অদৃশ্য অাঘাতে যথা রণে; কেহ তারে মারিতে না পায়, ভয়ঙ্কর স্বপ্নসম অাসে,—এসে যায়, জর-জরি শ্রীরামের কটক লঙ্কায়। কভু নাকে, কভু কাণে, ত্রিশূল-সদৃশ হানে হুল, মশা বীর। না হেরি অরিরে হরি, মুহুর্মুহুঃ নাদ করি, হইলা অধীর। হায়! ক্রোধে হৃদয় ফাটিল;— গত-জীব মৃগরাজ ভূতলে পড়িল! ক্ষুদ্র শত্রু ভাবি লোক অবহেলে যারে, বহুবিধ সঙ্কটে সে ফেলাইতে পারে;— এই উপদেশ কবি দিলা অলঙ্কারে।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
ভক্তিমূলক
(১)          কে তুমি, শ্যামেরে ডাক রাধা যথা ডাকে--- হাহাকার রবে? কে তুমি, কোন্ যুবতী,       ডাক এ বিরলে, সতি, অনাথা রাধিকা যথা ডাকে গো মাধবে? অভয় হৃদয়ে তুমি কহ আসি মোরে— কে না বাঁধা এ জগতে শ্যাম-প্রেম-ডোরে।(২)          কুমুদিনী কায়, মনঃ সঁপে শশধরে— ভুবনমোহন! চকোরি শশীর পাশে,        আসে সদা সুধা আশে, নিশি হাসি বিহারয়ে লয়ে সে রতন; এ সকল দেখিয়া কি কোপে কুমুদিনী? স্বজনী উভয় তার---চকোরী, যামিনী!(৩)          বুঝিলাম এতক্ষণে কে তুমি ডাকিছ--- আকাশ-নন্দিনি---! পৰ্ব্বত গহন বনে,                   বাস তব, বরাননে, সদা রঙ্গরসে তুমি রত, হে রঙ্গিণি! নিরাকারা ভারতি, কে না জানে তোমারে? এসেছ কি কাঁদিতে গো লইয়া রাধারে?(৪)          জানি আমি, হে স্বজনি, ভাল বাস তুমি, মোর শ্যামধনে! শুনি মুরারির বাঁশী,          গাইতে তুমি গো আসি, শিখিয়া শ্যামের গীত, মঞ্জু কুঞ্জবনে! রাধা রাধা বলি যবে ডাকিতেন হরি— রাধা রাধা বলি তুমি ডাকিতে, সুন্দরি!(৫)          যে ব্রজে শুনিতে আগে সঙ্গীতের ধ্বনি, আকাশসম্ভবে, ভূতলে, নন্দবন,                  আছিল যে বৃন্দাবন, সে ব্রজ পূরিছে আজি হাহাকার রবে! কত যে কাঁদে রাধিকা কি কব, স্বজনি, চক্রবাকী সে---এ তার বিরহ রজনী!(৬)          এস, সখি, তুমি আমি ডাকি দুই জনে রাধা-বিনোদন; যদি এ দাসীর রব,                  কুরব ভেবে মাধব না শুনেন, শুনিবেন তোমার বচন! কত শত বিহঙ্গিনী ডাকে ঋতুবরে— কোকিলা ডাকিলে তিনি আসেন সত্বরে!(৭)          না উত্তরি মোরে, রামা, যাহা আমি বলি, তাই তুমি বল? জানি পরিহাসে রত,              রঙ্গিণি, তুমি সতত, কিন্তু আজি উচিত কি তোমার এ ছল? মধু কহে, এই রীতি ধরে প্রতিধ্বনি,— কাঁদ, কাঁদে ; হাস, হাসে, মাধব-রমণি!(ব্রজাঙ্গনা কাব্য)
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
স্বদেশমূলক
রাগিণী খাম্বাজ,তাল মধ্যমান মরি হায়,কোথা সে সুখের সময়, সে সময় দেশময় নাট্যরস সবিশেষ ছিল রসময়! শুন গো ভারতভূতি, কত নিদ্রা যাবে তুমি, আর নিদ্রা উচিত না হয়। উঠ ত্যজ ঘুম ঘোর, হইল,হইল ভোর, দিনকর প্রাচীতে উদয়। কোথায় বাল্মীকি,ব্যাস, কোথা তব কালিদাস, কোথা ভবভূতি মহোদয়। অলীক কুনাট্য রঙ্গে, মজে লোক রাঢ়ে বঙ্গে, নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়। সুধারস অনাদরে, বিষবারি পান করে, তাহে হয় তনু মনঃ ক্ষয়। মধু বলে জাগ মা গো, বিভু স্থানে এই মাগ, সুরসে প্রবৃত্ত হউক তব তনয় নিচয়।।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
কে কবি-- কবে কে মোরে? ঘটকালি করি, শবদে শবদে বিয়া দেয় যেই জন, সেই কি সে যম-দমী? তার শিরোপরি শোভে কি অক্ষয় শোভা যশের রতন? সেই কবি মোর মতে, কল্পনা সুন্দরী যার মনঃ-কমলেতে পাতেন আসন, অস্তগামি-ভানু-প্রভা-সদৃশ বিতরি ভাবের সংসারে তার সুবর্ণ-কিরণ। আনন্দ, আক্ষেপ ক্রোধ, যার আজ্ঞা মানে অরণ্যে কুসুম ফোটে যার ইচ্ছা-বলে; নন্দন-কানন হতে যে সুজন আনে পারিজাত কুসুমের রম্য পরিমলে; মরুভূমে-- তুষ্ট হয়ে যাহার ধেয়ানে বহে জলবতী নদী মৃদু কলকলে!
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে। করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে, দীন যে, দীনের বন্ধু !- উজ্জল জগতে হেমাদ্রির হেম-কান্তি অম্লান কিরণে। কিন্তু ভাগ্য-বলে পেয়ে সে মহা পর্বতে, যে জন আশ্রয় লয় সুবর্ণ চরণে, সেই জানে কত গুণ ধরে কত মতে গিরীশ। কি সেবা তার সে সুখ সদনে ! দানে বারি নদীরূপ বিমলা কিঙ্করী। যোগায় অমৃত ফল পরম আদরে দীর্ঘ-শিরঃ তরু-দল, দাসরূপ ধরি। পরিমলে ফুল-কুল দশ দিশ ভরে, দিবসে শীতল শ্বাসী ছায়া, বনেশ্বরী, নিশায় সুশান্ত নিদ্রা, ক্লান্তি দূর করে।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
সনেট
যথা ধীরে স্বপ্ন-দেবী রঙ্গে সঙ্গে করি মায়া-নারী—রত্নোত্তমা রূপের সাগরে,— পশিলা নিশায় হাসি মন্দিরে সুন্দরী সত্যভামা, সাথে ভদ্রা, ফুল-মালা করে । বিমলিল দীপ-বিভা ; পূরিল সত্বরে সৌরভে শয়নাগার, যেন ফুলেশ্বরী সরোজিনী প্রফুল্লিলা আচম্বিতে সরে, কিম্বা বনে বন-সখী মুনাগকেশরী ! শিহরি জাগিলা পার্থ, যেমতি স্বপনে সম্ভোগ-কৌতুকে মাতি সুপ্ত জন জাগে;--- কিন্তু কাঁদে প্রাণ তার সে কু-জাগরণে, সাধে সে নিদ্রায় পুনঃ বৃথা অমুরাগে । তুমি, পার্থ, ভাগ্য-বলে জাগিলা সুক্ষণে মরতে স্বরগ-ভোগ ভোগিতে সোহাগে।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
প্রকৃতিমূলক
গভীর গর্জ্জন সদা করে জলধর, উথলিল নদনদী ধরণী উপর । রমণী রমণ লয়ে, সুখে কেলি করে, দানবাদি দেব, যক্ষ সুখিত অন্তরে। সমীরণ ঘন ঘন ঝন ঝন রব, বরুণ প্রবল দেখি প্রবল প্রভাব । স্বাধীন হইয়া পাছে পরাধীন হয়, কলহ করয়ে কোন মতে শান্ত নয়।।
মলয় রায়চৌধুরী
মানবতাবাদী
মা শুকনো কচুরিপানার মাঝে, রান্নাঘরে, সায়াপরা অবস্হায়, পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন, চুল খোলা ছিল শীত-মিশেল হেমন্তে বাঁ হাতে ভাঙা বয়ামে উড়ন্ত ঘোড়া, আঁচলগিঁটে মেঘ-ভেজা উল্কার হলুদ টুকরো থেকে খড়ের নৌকো ভাসালেন, উদাস, বালকদের হল্লায় কুর্চিকুসুম এবার ওনার কী দশা হবে জানি আবদুল, গফুরের ভাই, খবরটা প্রথম দিল কিন্তু মা হাল ছেড়ে দিলেন, ভুরুর ধুলোয় ঝাপসা সংসার কালী ঠাকুরের প্রদীপের তেলে কেন যে লুকিয়ে রাখেছিলেন মুর্শিদাবাদী খুদ আর ভাঙামুগ খানিক রোদমাখা ত্বক, অপরিচিত ভয়ে, গালে হাত রেখে, নাম ভুলে ছেন গরাদের স্যাঁতসেতে ছায়া পড়েছে ঝুরিনরম মুখে মগজ একেবারে ল্যাংটো থিরথিরে শিশিরে, ওঁর হাসির মতন দেখতে রোগা কৃষ্ণসার তুষারে কাঠের জুতো পায়ে, আকাশমুখো নেকড়েরা, সারাদিন কেঁদেছেন পুরুতমশায় ছুঁচে টানা রক্ত নিলেন হাত থেকে ঠোঁটের কোণায় কষ্ট, হাঁপিয়ে উঠছেন সিঁড়ি চড়তে ২৭ মার্চ ১৯৮৯
মলয় রায়চৌধুরী
চিন্তামূলক
আবলুশ অন্ধকারে তলপেটে লাথি খেয়ে ছিটকে পড়ি পিছমোড়া করে বাঁধা হাতকড়া স্যাঁসেঁতে ধুলো-পড়া মেঝে আচমকা কড়া আলো জ্বলে উঠে চোখ ধাঁধায় তক্ষুনি নিভে গেলে মুখে বুট জুতো পড়ে দু-তিনবার কষ বেয়ে রক্ত গড়াতে থাকে টের পাই আবার তীব্র আলো মুহূর্তে জ্বলে উঠে নিভে যায় গরম লোহার রড খালি পিঠে মাংস ছেঁচে তোলে আমাকে ল্ষ করে চারিদিক থেকে আলো ঝলসে ওঠে ফের আপনা থেকেই চোখ কুঁচকে যায় দেখতে পাই না কাউকে একসঙ্গে সব আলো আরেকবার নিভে গেলে পরবর্তী আক্রমণ সহ্য করার জন্যে নিজেকে তৈরি করে নিই। ২ মাঘ ১৩৯১
মলয় রায়চৌধুরী
রূপক
ওগো স্তন্যপায়ী ভাষা পিপীলিকাভূক মুখচোরা ভূচর খেচর জলচর দাম্পত্যজীবনে তুষ্ট একশিঙা নীলগাই বারাশিঙা চোরাকিশোরীর হাতে মূল্যবান প্রাণী স্হলে বিচরণকারী উদবিড়াল গন্ধগোকোল বিনোদিনী শব্দগহ্বর খেয়ে নোকরশাহির রাজ্য এনেছো এদেশে। ২ ভাদ্র ১৩৯২
মলয় রায়চৌধুরী
মানবতাবাদী
ভাবা যায় ? কোনো প্রতিপক্ষ নেই ! সবকটা আধমরা হয়ে আজ শুয়ে আছে জুতোর তলায় ? কিছুই করিনি আমি কেবল মুখেতে হাত চাপা দিয়ে চিৎকার করেছি থেকে থেকে হাহাহা হাহাহা হাহা হাহা পিস্তল কোমরে বাঁধা তেমনই ছিল সঙ্গোপনে ক্ষুর বা ভোজালি বের করিনিকো বোমাগুলো শান্তিনিকেতনি ব্যাগে চুপচাপ যেমন-কে-তেমন পড়ে আছে আমি তো আটঘাট বেঁধে ভেবেছি বদলা নেবো নিকেশ করব একে-একে সকলেই এত ভিতু জানতে পারিনি একা কেউ যুঝতে পারে না বলে দল বেঁধে ঘিরে ধরেছিল এখন ময়দান ফাঁকা তাবৎ মাস্তান আজ গোরুর চামড়ায় তৈরি জুতোর তলায় কিংবা পালিয়েছে পাড়া ছেড়ে কোনো জ্ঞাতির খামারে আমি তো বিধর্মী যুবা এদের পাড়ার কেউ নই জানালার খড়খড়ি তুলে তবু যুবতীরা আমার ভুরুর দিকে তাকিয়ে রয়েছে ছ্যাঃ এরকম জয় চাইনি কখনো এর চেয়ে সামনে শিখণ্ডী রেখে জেতা ছিল ভালো ভেবেছি চেংঘিজ খান যে-লাগাম ছেড়েছে মৃত্যুর কিছু পরে তার রাশ টেনে নিয়ে চুরমার করে দেবো এইসব জাল-জুয়াচুরি আগুন লাগিয়ে দেবো মাটিতে মিশিয়ে দেবো ধুরন্ধর গঞ্জ-শহর কিন্তু আজ সমগ্র এলাকা দেখি পড়ে আছে পায়ের তলায় । ৪ মাঘ ১৩৯১
মলয় রায়চৌধুরী
চিন্তামূলক
মোচড়খোলা আলোয় আকাশকে এক জায়গায় জড়ো করে ফড়িং-ফোসলানো মুসুরিক্ষেতে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন বোলডার-নিতম্ব কবি মরাবাতাসের বদবুমাখা কন্ঠস্বরে ঝরছিল বঁড়শিকেঁচোর কয়েলখোলা গান থেকে এক-সিটিঙে সূর্যের যতখানি রোজগার শেষ হয়ে যায় মধু দিয়ে সেলাই করা মৌচাকে মোতায়েন জেড ক্যাটাগরির ভোঁদড়ের খলিফা-আত্মা সামলাতে প্রদূষণ বিরোধীদের দিকে ছোঁড়া কাঁদানে গ্যাসের হাসি চুয়ে পড়ছিল লিপস্টিক-বোলানো গোধূলি থেকে চুলকুনি-জালে বানানো চামড়ায় ভুটভুটির মাঝি-মেকানিক তখন ফ্রিজের কুমড়োর শীতঘুম থেকে উঠে দু-চার ক্রেট নদী ভরেছে ডতপেনের নীল শিরদাঁড়ায় যার ফলে আঙুলের ডগায় লেগে থাকা স্মৃতিতে খুঁজে পাওয়া গেছে হারানো চাবির বিকল্প এক আয়ুর্বেদিক জ্যোৎস্না মাথার ওপর বয়ে নিয়ে চলেছে বোরখা-ঢাকা মেঘের মধ্যে পালক-খোলা টিয়াদের জোয়ারে হেলান-দেয়া গেঁহুয়াপিঠ ঢেউ পাটনা ৬ জুন ১৯৯৮
মলয় রায়চৌধুরী
মানবতাবাদী
মুখের গহ্বরে এক জান্তব গোঙানিডাক চলাফেরা করে জেলহাজতের ভিড়ে ত্রিকালজ্ঞ ভিড় দেখে চমকে উঠি এরা কারা হাতকড়া পরে ঠাঠা হাসে সারাদিন বাইরে যারা রয়ে গেল ঝুঁকিয়ে দাঁতাল-মাথা তারাই বা কারা জল্লাদের ছেড়ে দেয়া প্রশ্বাস বুক ভরে টানে চাই না এসব ধন্ধ মশারি খাটিয়ে বিছানায় সাপ নারীর বদলে নৌকোর গলুই থেকে ছুরি হাতে জ্যোৎস্নায় বুকের ওপরে বসবে লুঙিপরা রোমশ সারেঙ নাসারন্ধ্র থেকে বন্দুকের ধোঁয়া “বল শালা শকুন্তলার আঙটি কোন মাছে আছে” জানি তবু বলতে পারি না মুখের ভেতর আঙটি জিভের তলায় আমি লুকিয়ে রেখেছি। ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৩৯২
মলয় রায়চৌধুরী
মানবতাবাদী
মাগগি গণ্ডার দিনে পাইকারি হারে খুন হল কি হল না গুদামঘরের ছাদ ভেঙে কে রে গদি টানাটানি করে সে ফেরারি গৃহবধু যোনিতে কুলুপ এঁটে ঋণমেলা থেকে নোনা বালি লিঙ্গ পেয়েছিল সুদ জরিমানা মিলে স্পর্শকাতর আদালতে মুদ্দোফরাস এসে লাশটাকে চুমু খেয়ে স্বাগত জানালে জিপ খুলে বললেন উঁহুহু চলবে না বিগ্রহ ধুলোয় তৈরি নামাব কোথায় আপনি তো জানেনই ভালো গুখোর কাকেরা বড়ো বস্তুনিষ্ঠ খাদির বাকলে বুড়ো বটবৃক্ষের ডাল খোঁজে কেননা কেননা পার্টি না বললে পরে এত্তেলা লেখা চলবে না বরঞ্চ আমাদের দেখভালে থাকো আমাদের এদিকটায় শিরদাঁড়া ঘিরে মোম সবায়ের ঝরে নারীর গন্ধটুকু রেখে নিয়ে ধোপারা ফেরত দ্যায় শাড়ি লাঙলে নিজের ছায়া ফেড়ে ফ্যালে চাষি এমন মরদ গেঁড়ে চোখে লোলুপতা নেই হৃদয়ে রিরংসা নেই লিঙ্গ বহুচারী নয় তার মানে যে কলঙ্ক থাকলে মেধা বীর্যবান তেমন পুরুষ নেই এ তল্লাটে ফুঃ ২৪ ডিসেম্বর ১৯৯৫
মলয় রায়চৌধুরী
চিন্তামূলক
আমি যে নাকি গাইডের কাছে ইতিহাস-শেখা ফোস্কাপড়া পর্যটক ছায়ায় হেলান-দেয়া বাতিস্তম্ভের আদলে গিসলুম পিতৃত্ব ফলাবার ইসকুলে জানতুম যতই যাই হোক ল্যাজটাই কুকুরকে নাড়ায় রে আমি যে নাকি প্ল্যাটফর্মে ভবিষ্যভিতু কনের টাকলামাথা দোজবর বস্তাপ্রতিম বানিয়ের বংশে এনেছিলুম হাইতোলা চিকেন-চাউনি কাদা-কাঙাল ঠ্যাঙ থেকে ঝরাচ্ছিলুম ঘেসো ঝিঁঝির সাম্ভা নাচ আমি যে নাকি ফানুসনাভি ব্যাঙ-থপথপে শুশুকমাথা আমলা মাটি-মাখা নতুন আলুর চোখে দেখা দুটাকা ডজন রামপ্রসাদী জবা চাষির ঢঙে বলদ অনুসরণ করে পৌঁছেছিলুম বিধানসভার কুয়োতলায় আমি যে নাকি পোলকাফোঁটা পুঁইফুলে দু-ভাঁজ করা হেঁইয়োরত বাতাস ঢেউ চাবকানো ঝড়ে যখন বঁড়শি-খেলা পুঁটির পাশে ভাসছি তখন বুঝলি লম্বালম্বি করে-কাটা কথাবাত্রার লাটিমছেঁড়া ঘুড়ি আমি যে নাকি ভুতলবাহী আওয়াজমিস্ত্রি হলদে-ল্যাঙোট বাবুই চোখে-চোখে শেকল-আঁকা ভিড়ের মধ্যে এঁদো বিভাগের কেঁদো চিংড়ি-দাড়া আঙুল দিয়ে খুলছি বসে জটপাকানো মুচকি-ঠোঁটের হাসি ৯ জুন ১৯৯৮
মলয় রায়চৌধুরী
রূপক
১.যতটুকু ঝুঁকে-দেখা বাতাসে ছড়ানো আকাশ ল্যাজের রক্তাভ আলো ২.কোমরে হাত মেয়েটি সম্রাট অশোক কাঁদছেন কালো ঠান্ডা পাথর ৩.মেঠোপটে লাশ লেবু-পাতায় সবুজ টুপটাপ স্যাতসেঁতে ঘাসফড়িং ৪. সুন্দরী পাতার রস রক্তাক্ত হাত ছেলেটির মৌয়ালিরা ফিরছে মধু নিয়ে ৫.শ্মশানে ধোঁয়ার কুন্ডলী জলে চিংড়ি মাছের ঝাঁক গৌতমবুদ্ধ হেঁটে গেলেন ৬.হাসছে বুড়ো লোকটির ভুঁড়ি আমের গাছে লাল-হলুদ কেউ একজন চুমু খেল ৭.শিমুলগাছে কোকিলের গান আঁস্তাকুড়ে ভিড় বাড়ছে কবিরদাস দোহা গাইতে-গাইতে গেলেন ৮.বর্ষার প্রথম সকাল বারান্দায় বাবার চটিজোড়া ডাকপিওনের হাঁক ৯. মুম্বাইয়ের তিরিশ তলায় নাকতলার গলি কুকুরের পেছনে ছোঁড়ারা ১০.ছাদে কাপড় মেলছে বউটি দড়িতে ঘুড়ি আটক দুপুরের গান ১১.দ্রুতিমেদুর শ্বেতাঙ্গিনীরা অকেজো কমপিউটার মেকানিকের মুঠোয় তিনগুণিতক ১২.আকাশে ২৩৮ প্রার্থনায় পিছলে গেলেন ইষ্টদেবতা পেট্রলগন্ধী দাউদাউ ১৩.দিশি বন্দুকের ফটকা আলকুশির রোঁয়া উড়ছে। গোলা পায়রার ঝাঁক ১৪. শিশির ভেজা ঘাসে আজ সবুজ পায়ের দাগ বৈরাগির দোতারায় সন্ধ্যা ১৫.খুপরির অন্ধকার দিকটিতে পিছন ফিরে পূর্ণিমা ভিখারিনীর নোয়া ১৬.জ্বলন্ত শহরের ছাইয়ে গ্রিক সেনাপতি মিনান্ডার। পাটলিপুত্রে নাগার্জুন ধুলো মাখলেন ১৭.কুয়াপুজোয় নাচছে হিজড়েরা রাধেশ্যাম রাধেশ্যাম কেঁদে উঙল নতুন মানুষ ১৮.আঙিনায় থইথই ঝলমলে খিচুড়ির অমলতাস প্রগাঢ় চোখমুখ ১৯.গোধুলিলগ্নের পানের বরজে অশ্রুসজল রুমাল বিসমিল্লা খান ২০.যুযুধান ঝড়ে বনজ মণিপদ্মে গোন্ড-মুর্মু-ওঁরাও, উনি অশথ্থ গাছের তলায় চোখ বুজলেন
মলয় রায়চৌধুরী
মানবতাবাদী
আমরা তো জানি রে আমরা সেরে ওঠার অযোগ্য তাই বলে বৃষ্টির প্রতিধ্বনিতে ভেজা তোদের কুচুটে ফুসফুসে গোলাপি বর্ষাতি গায়ে কুঁজো ভেটকির ঝাঁক সাঁতরাবে কেন তোদের নাকি ধমনীতে ছিল ছাইমাখা পায়রাদের একভাষী উড়াল শুনেছি অন্ধের দিব্যদৃষ্টি মেলে গাবদাগতর মেঘ পুষতিস বগলে গুঁজে রাখতিস গাধার চিল্লানিতে ঠাসা রোজনামচা আর এখন বলছিস ভোটদান তো দানবীর কর্ণও করেননি কে না জানে শববাহকরাই চিরকাল অমর হয়েছে ঔরসের অন্ধকারে কথা বলার লোক পেলি না বলে ঘড়িঘরহীন শহরে ওয়ান-শত প্রেমিকা খুঁজলি কী রে তোদের কি ঢিক ঢিকানা নেই না রক্তের দোষ যে বলিপড়া আয়নায় চোপরদিন লোলচর্ম প্রতিবিম্ব পড়ে ছি ছি ছি নিঃশ্বাস ফেলে সেটাই আবার প্রশ্বাস হিসাবে ফেরত চাস আমি তো ভেবেছিলুম তোরা সন্দেহ করার অধিকার প্রয়োগ করবি তা নয় সারা গায়ে প্রাগৈতিহাসিক চুল নিয়ে ঢুং ঢুং তুলো ধুনছিস শুভেচ্ছা রইল তোরা যেন দুঃশাসনের হাত দুটো পাস যা দিয়ে ধোঁয়ার দুর্গে বসে ফুলঝুরির ফিনকি গুনবি ২৭ এপ্রিল ২০০০
ফয়জুল আলম পাপপু
প্রেমমূলক
তুমি তো জল-ছবি নও,তবে-মৃদু বাতাসেই কেন এলামেলো হও?
বিভাস রায় চৌধুরী
চিন্তামূলক
এই যে আমি মরতে চাই মরতে চাই’ বলে সহ্য করি ময়লা পশু মায়াবী ম্যানহোলেকখনও আমি শব্দ ভেঙে মর্ম ছুঁতে যাইনি চাইনি কিছু পাইনি কিছু চাইনি, কিছু পাইনি।এই যে আমি স্বপ্নকামী জ্বরের ঠোঁটে বিষ। বীর্যপাত, তরল চাঁদ দেখছি ভাগ্যিসকখনো আমি বমির ঝুঁকে গলন প্রিয় মেম রাত জেগেছি, সঙ্গী সাদা বিদায়ী কনডম।ঘুমাও পাখি, আমার হাতে চমকপ্রদ পেন। কাটছি লেখা, হাঁটছি সুখে সঘন শ্যাম্পেন।সব বুঝেছি, সব মুছেছি বুঝলি খোকা খুকু! খিদের দেশে ল্যাজ বেড়েছে। ছন্দ, মানে কুকুরতাই তার টুঁটি কামড়ে ধরে হিংস্র হয়ে যাই। একটা-দুটো ফুল এনেছে। আমারই বনসাইএই যে আমি বামন, তবু বাল্য প্রেমে ভরা। চাঁদ ধরতে পারিনি, তুমি বকো বসুন্ধরা।প্রভু আমার, প্রিয় আমার পেছনে প্রিয় পাখি! সমস্ত পাগল আমি নগ্ন করে আঁকি…
রুদ্র গোস্বামী
প্রেমমূলক
আজকাল একলা হলেই একটা মিনি বাসের চাকা মাথার মধ্যে বনবন ঘুরতে থাকে। ছটা দশ, ডালহৌসি থেকে শিয়ালদা। কন্ডাকটরের বাজখাই চিৎকার সেন্ট্রাল, সেন্ট্রাল, হঠাৎ একটা যান্ত্রিক ঝাকুনি! একটা ধাতব শব্দে দলা পাকিয়ে যায় আমার মাথার মধ্য বয়সি ঘিলু।ছিটকে পড়া বাইফোকালের আড়ালেও আমি স্পষ্ট দেখতে পাই, রক্তে ভেসে যাচ্ছে একটা কি ভীষণ পরিচিত মুখ! অসহ্য যন্ত্রণায় কানে হাত চেপে, তলপেটে লাথি খাওয়া নেড়ি কুকুরের মত চিৎকার করে উঠি , – নীলা আ আ আ …মা ছুটে আসেন, ছোট’কা আসে, মনি মা আসে। ছোট্ট টুবলুটা পাঁচ বাই সাত বিছানার দখল আঁকড়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। ইদানিং ডক্টরের আনাগোনা বেড়েছে বাড়িতে। ঘরের আনাচে কানাচে কান পাতলেই শুনতে পাই, আমার এ্যালজাইমা হয়েছে। আমি নাকি ভুলে গেছি আমার অতীত! এক সময় আমার একুশ সেলাই মাথায় স্মৃতি বলে নাকি কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।অথচ পৃথিবীর সমস্ত বিজ্ঞান মিথ্যে প্রমানিত করে আমি ভুলতে পারিনা নীলাকে। আমি ভুলতে পারিনা, বাসের প্লাস্টিক হাতলে আমার হাতের উপর নীলার হাত, আমার বুকে ঝুঁকে পড়া ওর নিঃশ্বাস। ওর সুগন্ধি রুমাল, লিপস্টিকের দাগ ওর আনমনা পাখির মতো চোখ!যারা জানে নীলা আর নেই, কোত্থাও নেই। তারা কখনো জানতেই পারেনি, নীলা কি বিচ্ছিরি ভাবে ছড়িয়ে আছে আমার একুশ সেলাই মাথায়, বুকে, ঠোঁটে, হাতে।
রুদ্র গোস্বামী
মানবতাবাদী
কন্যা সন্তান প্রসব করার অপরাধে আসামের যে মেয়েটাকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল ? আজ তার মৃত্যু বার্ষিকী। যে কবি সেদিন তার নিরানব্বইতম কবিতাটি মেয়েটাকে উৎসর্গ করেছিলেন, তিনি এখন তার প্রিয় পাঠিকার অনুরোধে লিখছেন বসন্ত গল্প। যে সংবাদপত্র গুলো সেদিন ফলাও করে ছেপেছিল মেয়েটার গনগনে আর্তনাদ , তাদের প্রত্যেকটা ক্যামেরার ফ্লাশ আজ তাক করে দাঁড়িয়ে আছে বুদ্ধিজীবী সম্বর্ধনা মঞ্চ । যে অধ্যাপক তার অনুগত ছাত্রদের বলেছিলেন, – “আগুন জ্বালো।” তিনি তার সদ্য বিবাহিত দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে এইমাত্র চলে গেলেন সাচ্ছন্দ মধুচন্দ্রিমা যাপনে । তুমি কেমন আছো যুবক ? তুমি কি মশাল জ্বেলেছো ?
রুদ্র গোস্বামী
প্রেমমূলক
ভীষণ একলা হয়ে যাচ্ছি আরও দূর আমি একলা হেঁটে যাচ্ছি সমুদ্দুরআয় একটিবার তুই সন্ধ্যা নামার আগে আয় একটিবার তুই বুকের বারান্দায় আয় একটি বার তুই অভিমানে রাগে আয় একটিবার তুই বাকবিতণ্ডায়তোকে বুঝতে থাকার চেষ্টায় আমি পেরুচ্ছি রোদ্দুর আমি একলা হেঁটে যাচ্ছি সমুদ্দুরআমার চোখে বৃষ্টি ভিজছে খুব ক্লান্ত পাতায় ঘুমের আফসোস আয় একটিবার তুই স্বপ্ন দেখার রঙ আয় একটিবার তুই ঠোঁটের শব্দকোষএকলা আমার লাগছে ভীষণ ভয় আমি নিজের কাছেই বাড়াচ্ছি বিস্ময়তোকে ভুলতে থাকার চেষ্টা আমার হারিয়ে দিচ্ছে সুর আমি একলা হেঁটে যাচ্ছি সমুদ্দুর
রুদ্র গোস্বামী
প্রেমমূলক
একা ফুটপাথ আলো ককটেল ভিজে নাগরিক রাত পদ্য।তুই হেঁটে যাস কাঁচ কুয়াশায় জল ভ্রূণ ভাঙা চাঁদ সদ্য।আমি প্রশ্ন তুই বিস্ময় চোখ চশমার নীচে বন্ধ।ঠোঁট নির্বাক চাওয়া বন্য আমি ভুলে যাই দ্বিধা দ্বন্দ্ব।জাগা রাত্রি ঘুম পস্তায় মোড়া রূপকথা পিচ রাস্তাপোষা স্বপ্ন ছিঁড়ে ছারখার প্রিয় রিংটোন লাগে সস্তা।তুই সত্যি আরও সত্যি তুই শিশিরের কুঁড়ি পদ্ম।বাকি মিথ্যে সব মিথ্যে চেনা চার দেয়ালের গদ্য।
রুদ্র গোস্বামী
প্রেমমূলক
মেয়েটা পাখি হতে চাইল আমি বুকের বাঁদিকে আকাশ পেতে দিলাম।দু-চার দিন ইচ্ছে মতো ওড়াওড়ি করে বলল, তার একটা গাছ চাই। মাটিতে পা পুঁতে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। এ ডাল সে ডাল ঘুরে ঘুরে , সে আমাকে শোনালো অরণ্য বিষাদ।তারপর টানতে টানতে একটা পাহাড়ি ঝর্ণার কাছে নিয়ে এসে বলল, তারও এমন একটা পাহাড় ছিল। সেও কখনো পাহারের জন্য নদী হোতো।আমি ঝর্ণার দিকে তাকিয়ে মেয়েটিকে বললাম, নদী আর নারীর বয়ে যাওয়ায় কোনও পাপ থাকে না।সে কিছু ফুটে থাকা ফুলের দিকে দেখিয়ে জানতে চাইল, কি নাম ? বললাম গোলাপ।দুটি তরুণ তরুণীকে দেখিয়ে বলল, কি নাম ? বললাম প্রেম।তারপর একটা ছাউনির দিকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো, কি নাম ? বললাম ঘর।এবার সে আমাকে বলল, তুমি সকাল হতে জানো ? আমি বুকের বাঁদিকে তাকে সূর্য দেখালাম ।
রুদ্র গোস্বামী
প্রেমমূলক
একা ফুটপাথ আলো ককটেল ভিজে নাগরিক রাত পদ্য।তুই হেঁটে যাস কাঁচ কুয়াশায় জল ভ্রূণ ভাঙা চাঁদ সদ্য।আমি প্রশ্ন তুই বিস্ময় চোখ চশমার নীচে বন্ধ।ঠোঁট নির্বাক চাওয়া বন্য আমি ভুলে যাই দ্বিধা দ্বন্দ্ব।জাগা রাত্রি ঘুম পস্তায় মোড়া রূপকথা পিচ রাস্তাপোষা স্বপ্ন ছিঁড়ে ছারখার প্রিয় রিংটোন লাগে সস্তা।তুই সত্যি আরও সত্যি তুই শিশিরের কুঁড়ি পদ্ম।বাকি মিথ্যে সব মিথ্যে চেনা চার দেয়ালের গদ্য।
রুদ্র গোস্বামী
প্রেমমূলক
ওই যে ছেলেটাকে দেখছ, পছন্দ মতো ফুল ফুটল না বলে মাটি থেকে উপড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলো গাছটাকে ? ছেলেটার ভীষণ জেদ , ও কখনও প্রেমিক হতে পারবে না । এই তো সেদিন কাঁচের জানালা দিয়ে রোদ ঢুকছিল বলে কাঁচওয়ালার বাড়িতে গিয়ে তাঁকে কী বকা ! কাঁচওয়ালাতো থ’ ! সাদা কাঁচে রোদ ঢুকবে না এমন আবার হয় ! ছেলেটার খুব জেদ, ও শুধু দেখে আর চেনে বুঝতে জানে না । প্রেমিক হতে গেলে ঋতু বুঝতে হয় যেমন কোন ঋতুটার বুক ভরতি বিষ কোন ঋতুটা ভীষণ একা একা, কোন ঋতুটা প্লাবন কোন ঋতুতে খুব কৃষ্ণচূড়া ফোটে ছেলেটা ঋতুই জানে না ও শুধু দেখে আর চেনে, বুঝতে জানে না । ছেলেটা কখনো প্রেমিক হতে পারবে না প্রেমিক হতে গেলে গাছ হতে হয় । ছায়ার মতো শান্ত হতে হয় । বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করতে হয় । জেদি মানুষেরা কখনও গাছ হতে পছন্দ করে না । তারা শুধু আকাশ হতে চায় ।
রুদ্র গোস্বামী
প্রেমমূলক
বৃষ্টি বৃষ্টি জলে জলে জোনাকি আমি সুখ যার মনে তার নাম জানো কী ?মেঘ মেঘ চুল তার অভ্রের গয়না নদী পাতা জল চোখ ফুলসাজ আয়না। বৃষ্টি বৃষ্টি কঁচুপাতা কাঁচ নথ মন ভার জানালায় রাতদিন দিনরাত।ঘুম নেই ঘুম নেই ছাপজল বালিশে হাঁটুভাঙা নোনা ঝিল দুচোখের নালিশে।বৃষ্টি বৃষ্টি জলেদের চাঁদনি দে সোনা এনে দে মন সুখ রোশনি।
রুদ্র গোস্বামী
প্রেমমূলক
ইচ্ছে হলে চলেই যাবি জানি তবু মিথ্যে নাহয় হাত বাড়িয়ে দিস তোর কাছে যে ইচ্ছে গুলো রাখা আর একটিবার ছুঁয়ে দেখতে দিসএকটু না হয় ভিজতে দিলি তুই অবাধ্য সেই নোনতা জলের ছাঁটে ভালবাসা যেমনি করে রোজ প্রেমিক ছেলের আঙুল ছুঁয়ে হাঁটেহারিয়ে যাবো এমন বোকা নই তুই বলবি, এটাই আমার দোষ অন্য হাতের টান পড়লে সুতোয় তুইও জানি মন্দ প্রেমিক নোস।
রুদ্র গোস্বামী
প্রেমমূলক
বৃষ্টি বৃষ্টি জলে জলে জোনাকি আমি সুখ যার মনে তার নাম জানো কী ?মেঘ মেঘ চুল তার অভ্রের গয়না নদী পাতা জল চোখ ফুলসাজ আয়না।বৃষ্টি বৃষ্টি কঁচুপাতা কাঁচ নথ মন ভার জানালায় রাতদিন দিনরাত।ঘুম নেই ঘুম নেই ছাপজল বালিশে হাঁটুভাঙা নোনা ঝিল দুচোখের নালিশে।বৃষ্টি বৃষ্টি জলেদের চাঁদনি দে সোনা এনে দে মন সুখ রোশনি।
রুদ্র গোস্বামী
প্রেমমূলক
ওই যে ছেলেটাকে দেখছ, পছন্দ মতো ফুল ফুটল না বলে মাটি থেকে উপড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলো গাছটাকে? ছেলেটার ভীষণ জেদ , ও কখনও প্রেমিক হতে পারবে না।এই তো সেদিন কাঁচের জানালা দিয়ে রোদ ঢুকছিল বলে কাঁচওয়ালার বাড়িতে গিয়ে তাঁকে কী বকা! কাঁচওয়ালাতো থ’! সাদা কাঁচে রোদ ঢুকবে না এমন আবার হয়!ছেলেটার খুব জেদ, ও শুধু দেখে আর চেনে বুঝতে জানে না। প্রেমিক হতে গেলে ঋতু বুঝতে হয় যেমন কোন ঋতুটার বুক ভরতি বিষ কোন ঋতুটা ভীষণ একা একা, কোন ঋতুটা প্লাবন কোন ঋতুতে খুব কৃষ্ণচূড়া ফোটে ছেলেটা ঋতুই জানে না ও শুধু দেখে আর চেনে, বুঝতে জানে না।ছেলেটা কখনো প্রেমিক হতে পারবে না প্রেমিক হতে গেলে গাছ হতে হয়। ছায়ার মতো শান্ত হতে হয়। বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। জেদি মানুষেরা কখনও গাছ হতে পছন্দ করে না। তারা শুধু আকাশ হতে চায়।আরও পড়ুন… রুদ্র গোস্বামীর সকল কবিতা 
রুদ্র গোস্বামী
প্রেমমূলক
আজকাল কি যে উল্টোপাল্টা বায়না শিখেছে ও যখন তখন এসে বলবে, ওর একটা আকাশ চাই। আর আমিও বোকার মতো সব কাজ ফেলে ওর চোখের মাপের আকাশ খুঁজতে থাকি! শুধু কী তাই! তাতেও আবার ওর আপত্তি। এটাতে বলে মেঘ ভরতি তো ওটাতে একঘেয়ে আলো। গোধূলি আকাশ দেখলেই ও আবার লজ্জায় মরে যায়। আমার হয়েছে জ্বালা, মেঘ থাকবে না রোদ থাকবে না এমন একটা আকাশ, আমি কোত্থেকে খুঁজে আনব? গোলাপ হবে অথচ কাঁটা হবে না! রঙটাও আবার লাল? এমন আবার হয় নাকি! একটা কথা আমি কিছুতেই বুঝতে পারি না, ভালবাসা বুকে এসে বসলেই মানুষ কেন পাখি হতে চায়!
ভাস্কর চক্রবর্তী
প্রেমমূলক
আমি দেখেছি ডানা ভাসিয়ে এগিয়ে আসছে মরুভূমি__ আমি দেখেছি বিষণ্ণ ট্রেন আলো জ্বালিয়ে, ঝলমল, ছুটে যাচ্ছে জংশনের দিকে। এবার যখন আবার ফিরে এলো ক্লান্তির দিন তোমার অনুরোধে আবার আমি চিঠি লিখতে শুরু করলাম তোমাকে। __সেদিন, যখন চারিদিকে সন্ধে, তোমার চিঠি আমি বিছানায় ছড়িয়ে পড়তে-পড়তে দেখি, আমার ঘুম নামছে তোমার চিঠিপত্রের ওপর__আমার ঘুমের ভেতরে তুমি ঘুমিয়ে আছ, তোমার দিদিও ঘুমিয়ে আছে দেখি, দেখি, আমার সমস্ত লেখালেখির ভেতর মৃত্যু তার ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে আছে।
ভাস্কর চক্রবর্তী
প্রেমমূলক
যদি ভালোবাসা, প্রিয়, আমাকে বাঁচাতে পারে বাঁচবো তাহলে- খসে পড়া তারাগুলো নাহলে আমাকে নিয়ে মৃত তারাদের দেশে চলে যাবে- সেখানে সমাধি হবে আমারও বা লেখা হবে, আজব বিচিত্র এক নীল তারা, চশমাধারী প্রজাপতি, এখানে ঘুমোচ্ছে সারা জীবনের ঘুমে, যে তারাটি একা একা ছাতে বসে বুঝতে চেয়েছিল ভালোবাসা আজো কেন বিক্রি হবে চড়া দামে ভালোবাসা, রাজারহাটের তিন বেডরুমের মোলায়েম ফ্ল্যাট নাকি কোনো? শাদা কোনো টাটা সুমো? হলুদ বালিতে যায় ভরে যায় দেশ-বিদেশ, যাকে তোমরা মরুভূমি বলো সে মরুবালিও পথ শুঁকে শুঁকে এসে গেছে আমাদের ঘরে এসো তুমি ধবধবে বিছানায় দুঘন্টায় ধন্য হও পথের কুটীরে তিন গ্লাস স্বাধীনতা সঙ্গে পাবে শুধু তুমি, এখনো কেন যে ভাবো, ভালোবাসা ভালোবাসা মৃতসঞ্জীবনী
ভাস্কর চক্রবর্তী
চিন্তামূলক
শুধু ফোটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরে পড়ে রক্ত। এক মুহূর্তের রক্ত অন্য মুহূর্তের গায়ে ঝরে পড়ে। …চশমা পরিষ্কার করে আমি ইতিহাস পড়ি। ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরে পড়ে বিছানার ওপর রক্ত ঝরে পড়ে সমস্ত জীবন বেয়ে
ভাস্কর চক্রবর্তী
মানবতাবাদী
আমরা বেঁচে থাকি কিংবা মরে যাই, দাশবাবু, এসে যায় না কিছু যে যার ঘামাচি নিয়ে সবাই ব্যস্ত এখন। যা কিছু দেখেছি তা কি বলতে পেরেছি ঠিকঠাক যা লিখেছি, দশ বিশ বাইশ বছর, বোঝাতে পেরেছি কিছু? শুধু বেঁচে থাকা নিয়ে বেঁচে থাকা শুনতে পাই শিল্পময় খুব সেসব আমার জন্য নয় কবিতার জন্য দাদা আমাদের রঘুনাথ রইল, আমি বেরিয়ে পড়লাম।
ভাস্কর চক্রবর্তী
প্রেমমূলক
পঁচিশ বছর আগেকার মুখ যেন জাপানী অক্ষর বাজুবন্ধ মৃদু বেজে ওঠে গান গান গান শুধু গান ছোট এক ঘরে শুয়ে আজ মনে পড়ে প্রেমিক ছিলাম
ভাস্কর চক্রবর্তী
প্রেমমূলক
কালো কালির ওপর লাল কালির মর্মান্তিক কাটাকুটি। ব্যাপারটা কিছুই নয়। ব্যাপারটা সত্যি তেমন কিছুই নয় যদি না মনে পড়ে কালো একটা ছেলে রক্তাক্ত ধানক্ষেতে শেষঘুমে ঘুমিয়ে আছে।
ভাস্কর চক্রবর্তী
প্রেমমূলক
না কেন, উন্মাদ করে না ভালোবাসা__ আমি শুধু, নতুন কাগজ কিনি__ খালি গায়ে ঘুরে বেড়াই ঘরের মধ্যে__চারপাশ থেকে, কেশে ওঠে মানুষ__চারপাশ থেকে কতশত ব্যর্থ দিন বহে গেল__লাল মোটরগাড়িতে, আমার হাসা হলো না__বিয়েবাড়িতে, যথাযথ হাসা হলো না আমার__চিহ্ণহীন বছরগুলো, ওই, পড়ে আছে পেছনে__ প্রত্যেক জানলার পর্দা সরিয়ে, আমি বাড়িয়ে দিই মুখ__আমি দেখি একটা দিন, আরেকটা দিনের মতো আরেকটা দিন, আরেকটা দিনের মতো একইরকম, অস্থিসার, ফাঁকা
ভাস্কর চক্রবর্তী
প্রেমমূলক
যে বিকেলে জ্বর আসে সেই বিকেলের মতো তুমি এসে দাঁড়িয়ে রয়েছো। ঘড়ির ভেতর দিয়ে রক্তের রেখার মতো সময় চলেছে। -আমি কি অসুখ থেকে কোনোদিন উঠে দাঁড়াব না?আজো রাত জাগাজাগি হয়। শরীর মিলিয়ে যায় নরম শরীরে।-আমি শুধু আমার প্ থিবী দেখে যাই…। চারপাশে কেমন হাজারো আলো জ্বলে আছে,তবু এমন আঁধার আমি জীবনে দেখিনি।
ভাস্কর চক্রবর্তী
প্রেমমূলক
শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব – প্রতি সন্ধ্যায় কে যেন ইয়ার্কি করে ব্যাঙের রক্ত ঢুকিয়ে দেয় আমার শরীরে – আমি চুপ করে বসে থাকি – অন্ধকারে নীল ফানুস উড়িয়ে দেয় কারা, সারারাত বাজি পোড়ায় হৈ-হল্লা – তারপর হঠাত্ সব মোমবাতি ভোজবাজির মতো নিবে যায় একসঙ্গে – উত্সবের দিনহাওয়ার মতো অন্যদিকে ছুটে যায়, বাঁশির শব্দ আর কানে আসে না – তখন জল দেখলেই লাফ দিতে ইচ্ছে করে আমার মনে হয় – জলের ভেতর – শরীর ডুবিয়ে মুখ উঁচু করে নিশ্বাস নিই সারাক্ষণ – ভালো লাগে না সুপর্ণা, আমি মানুষের মতো না, আলো না, স্বপ্ন না – পায়ের পাতা আমার চওড়া হয়ে আসছে ক্রমশ – ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ শুনলেই বুক কাঁপে, তড়বড়ে নিশ্বাস ফেলি, ঘড়ির কাঁটা আঙ্গুল দিয়ে এগিয়ে দিই প্রতিদিন – আমার ভালো লাগে না – শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকবএকবার ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই মেঘ ঝুঁকে থাকতে দেখেছিলাম জানলার কাছে – চারিদিকে অন্ধকার নিজের হাতের নখও স্পষ্ট দেখা যচ্ছিল না সেদিন – সেইদিন তোমার কথা মনে পড়তেই আমি কেঁদে ফেলেছিলাম – চুলে দেশলাই জ্বালিয়ে চুল পোড়ার গন্ধে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আবার – এখন আমি মানুষের মতো না – রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাত্ এখন লাফ দিতে ইচ্ছে করে আমার – ভালোবাসার কাছে, দীর্ঘ তিনমাস আর মাথা নিচু করে বসে থাকতে ভালো লাগে না – আমি মানুষের পায়ের শব্দ শুনলেই তড়বড়ে নিশ্বাস ফেলি এখন – যে-দিক দিয়ে আসি, সে-দিকেই দৌড় দিই কেন এই দৌড়ে যাওয়া? আমার ভালো লাগে না শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব- প্রতি সন্ধ্যায় কে যেন ইয়ার্কি করে ব্যাঙের রক্ত ঢুকিয়ে দেয় আমার শরীরে- আমি চুপ করে বসে থাকি- অন্ধকারে নীল ফানুস উড়িয়ে দেয় কারা, সারারাত বাজি পোড়ায় হৈ-হল্লা- তারপর হঠাৎ সব মোমবাতি ভোজবাজীর মত নিবে যায় একসঙ্গে- উৎসবের দিন হাওয়ার মত ছুঁতে যায়, বাঁশির শব্দআর কানে আসে না- তখন জল দেখলেই লাফ দিতে ইচ্ছে করে আমার মনে হয়- জলের ভেতর- শরীর ডুবিয়ে মুখ উঁচু করে নিঃশ্বাস নিই সারাক্ষণ- ভালো লাগে না সুপর্ণা, আমি মানুষের মত না, আলো না, স্বপ্ন না- পায়ের পাতা আমার চওড়া হয়ে আসছে ক্রমশঃ- ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনলেই বুক কাঁপে, তড়বড়ে নিঃশ্বাস ফেলি, ঘড়ির কাঁটা আঙুল দিয়ে এগিয়ে দিই প্রতিদিন- আমার ভালো লাগে না- শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকবএকবার ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই মেঘ ঝুঁকে থাকতে দেখেছিলাম জানলার কাছে- চারদিক অন্ধকার নিজের হাতের নখও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না সেদিন- সেইদিন তোমার কথা মনে পড়তেই আমি কেঁদে ফেলেছিলাম- চুলে, দেশলাই জ্বালিয়ে চুল পোড়ার গন্ধে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আবার- এখন আমি মানুষের মত না- রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ এখন লাফ দিতে ইচ্ছে করে আমার- ভালোবাসার কাছে, দীর্ঘ তিনমাস আর মাথা নীচু করে বসে থাকতে ভালো লাগে না- আমি মানুষের পায়ের শব্দ শুনলেই তড়বড়ে নিঃশ্বাস ফেলি এখন- যে দিক দিয়ে আসি, সে দিকেই দৌড় দি কেন এই দৌড়ে যাওয়া? আমার ভালো লাগে না শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা আমি তিনমাস ঘুমিয়ে থাকব।
মদনমোহন তর্কালঙ্কার
নীতিমূলক
সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি , সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি। আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে , আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে। ভাইবোন সকলেরে যেন ভালোবাসি , এক সাথে থাকি যেন সবে মিলেমিশি। ভালো ছেলেদের সাথে মিশে করি খেলা , পাঠের সময় যেন নাহি করি হেলা। সুখী যেন নাহি হই আর কারো দুখে , মিছে কথা কভু যেন নাহি আসে মুখে। সাবধানে যেন লোভ সামলিয়ে থাকি , কিছুতে কাহারে যেন নাহি দেই ফাঁকি। ঝগড়া না করি যেন কভু কারো সনে , সকালে উঠিয়া এই বলি মনে মনে।
মদনমোহন তর্কালঙ্কার
নীতিমূলক
লেখা পড়া করে যেই। গাড়ী ঘোড়া চড়ে সেই।। লেখা পড়া যেই জানে। সব লোক তারে মানে।। কটু ভাষী নাহি হবে। মিছা কথা নাহি কবে।। পর ধন নাহি লবে। চিরদিন সুখে রবে।। পিতামাতা গুরুজনে। সেবা কর কায় মনে।।
মদনমোহন তর্কালঙ্কার
প্রকৃতিমূলক
বার মাস তিথি যত। একে একে হয় গত।। বার মাস সাত বার। আসে যায় বার বার।
মদনমোহন তর্কালঙ্কার
প্রেমমূলক
মনে করি বারে বারে, আর না হেরিব তারে, নিষেধ না মানে আঁখি, তারি পানে ধায় লো।মনে মনে করে থাকি, কথা না কহিব ডাকি, না দেখিতে আগে কোড়া, মুখে হাসি পায় লো।।তবু যদি সহচরী, মন কে কঠিন করি, সে জানে দেখিবা মাত্র, রোমাঞ্চিত কায় লো।অতএব তারে দেখে, আপনা বজায় রেখে, কি রূপে সাধিব মান, বল না আমায় লো।
মদনমোহন তর্কালঙ্কার
প্রকৃতিমূলক
পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল। কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিল।। শীতল বাতাস বয় জুড়ায় শরীর। পাতায়-পাতায় পড়ে নিশির শিশির।। ফুটিল মালতী ফুল সৌরভ ছুটিল। পরিমল লোভে অলি আসিয়া জুটিল ॥গগনে উঠিল রবি সোনার বরণ। আলোক পাইয়া লোক পুলকিত মন ॥ রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে। শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে ॥ উঠ শিশু মুখ ধোও পর নিজ বেশ। আপন পাঠেতে মন করহ নিবেশ ॥
তসলিমা নাসরিন
প্রেমমূলক
আবার আমি তোমার হাতে রাখবো বলে হাত গুছিয়ে নিয়ে জীবনখানি উজান ডিঙি বেয়ে এসেছি সেই উঠোনটিতে গভীর করে রাত দেখছ না কি চাঁদের নীচে দাঁড়িয়ে কাঁদি দুঃখবতী মেয়ে ! আঙুলগুলো কাঁপছে দেখ, হাত বাড়াবে কখন ? কুয়াশা ভিজে শরীরখানা পাথর হয়ে গেলে ? হাত ছাড়িয়ে নিয়েছিলাম বর্ষা ছিল তখন, তখন তুমি ছিঁড়ে খেতে আস্ত কোনও নারী নাগাল পেলে। শীতের ভারে ন্যুব্জ বাহু স্পর্শ করে দেখি ভালবাসার মন মরেছে, শরীর জবুথবু, যেদিকে যাই, সেদিকে এত ভীষণ লাগে মেকি। এখনও তুমি তেমন আছ। বয়স গেল, বছর গেল, তবু। নিজের কাঁধে নিজের হাত নিজেই রেখে বলি : এসেছিলাম পাশের বাড়ি, এবার তবে চলি।
তসলিমা নাসরিন
প্রেমমূলক
কোথাও না কোথাও বসে ভাবছো আমাকে, আমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তোমার, মনে মনে আমাকে দেখছো, কথা বলছো, হাঁটছো আমার সঙ্গে, হাত ধরছো, হাসছো। এমন যখন ভাবি, এত একা আমি, আমার একা লাগে না, ঘাসগুলোকে আগের চেয়ে আরও সবুজ লাগে, গোলাপকে আরও লাল, স্যাঁতস্যাঁতে দিনগুলোকেও মনে হয় ঝলমলে, কোথাও না কোথাও আমার জন্য কেউ আছে এই ভাবনাটি আমাকে নির্ভাবনা দেয়, ঘোর কালো দিনগুলোয় আলো দেয়, আর যখন ওপরে ওপরে দেখাই যে পায়ের তলায় খুব মাটি আছে, আসলে নেই, আসলে পা তলিয়ে যাচ্ছে, তখন মাটি দেয়। যখন মনে হয় ভীষণ এক ঝড়ো হাওয়ায় উল্টে যাচ্ছি, যেন একশ শকুন আমার দিকে উড়ে আসছে, হিংস্র হিংস্র মানুষ দৌড়ে আসছে আমাকে খুবলে খাবে — অসহায় আমিটিকে ভাবনাটি নিরাপত্তা দেয়। কেউ ফিরে তাকায় না, কেউ স্পর্শ করে না, ভালোবাসে না দেখেও আমি যে ভেঙে পড়ি না, আমি যে ভেসে যাই না, আমি যে কেঁদে ভাসাই না– সে তো তোমার কারণেই, কোথাও না কোথাও তুমি আছো বলে। আছো, কোথাও আছো যে কোনওদিন আমি ইচ্ছে করলে তোমাকে পেতে পারি, এই ভাবনাটি তোমার কাছ থেকে দূরে রাখতে পারছে আমাকে, আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারছে।
তসলিমা নাসরিন
প্রেমমূলক
আপনার মুখটি দেখলে আপনাকে কলকাতা বলে মনে হয় আপনি কি জানেন যে মনে হয়? আপনি কি জানেন যে আপনি খুব অসম্ভব রকম খুব আস্ত রকম কলকাতা? জানেন না তো! জানলে মুখটি বারবার আপনি ফিরিয়ে নিতেন না। একটা কথা শুনুন _ আপনার মুখে তাকালে আমি আপনাকে দেখি না, দেখি কলকাতাকে, কপাল কুঁচকে আছে রোদে, চোখের কিনারে দুর্ভাবনার ভাঁজ, গালে কালি, ঠোঁটে বালি, দৌড়োচ্ছেন আর বিশ্রি রকম ঘামছেন, অনেকদিন ভালো কোনও খাবার নেই, অনেকদিন মেজে স্নান হয় না, ঘুম হয় না! আপনি কি ভেবে বসে আছেন আপনার প্রেমে পড়েছি আমি যেহেতু আপনাকে আমি কাছে টেনে আনছি, সামনে বসাচ্ছি, চিবুক ধরে মুখটি তুলছি, তন্ময় তাকিয়ে আছি, আর আমার চোখের কোণে বিন্দু বিন্দু স্বপ্ন জমা হচ্ছে! আপনার ঠোঁটের দিকে যখন আমি আমার ভেজা ঠোঁটড়োড়া এগিয়ে নিচ্ছি, আপনি কেঁপে উঠছেন সুখে! আপনি তো জানেন না কেন আমার ঠোঁট বারবার যেতে চাইছে আপনার ঠোঁটে গালে আপনার কপালে চোখের কিনারে। কেন আমার আঙুল আপনার মুখটি স্পর্শ করছে, ধীরে ধীরে চুলগুলো গুছিয়ে দিচ্ছে, কুঁচকে থাকাগুলোকে মিলিয়ে দিচ্ছে ভাঁজগুলোকে নিভাঁজ করছে, ঘাম মুছে দিচ্ছে, কালি বালি সব তুলে নিচ্ছে! কেন চুমু খাচ্ছি এত মুখটিকে, জানেন না। আপনি তো জানেন না যখন আপনাকে বলি যে আপনাকে ভালোবাসি আসলে আমি কাকে বাসি ভালো, জানেন না বলে এখনও আশায় আশায় আছেন। আহ, তুমি আশায় থেকো না তো! কাউকে এমন কাঙালের মত তাকিয়ে থাকতে দেখতে ভাল লাগে না, এত বোকা কেন তুই! কেন দেখিস না যে আমার হাতটি নিয়ে যতবার অন্য কোথাও রাখতে চাস, আমি রাখি না এত যে দৃষ্টি আমার সরাতে চাস, আমি যে তবু স্থির থাকি মুখে, মুখেই। আমি যে পুরো রাত্তির কেবল জেগে কাটিয়ে দিই পুরো জীবন কাটিয়ে দিতে পারি তোর মুখে চেয়েই, তোর মুখ চেয়েই!
তসলিমা নাসরিন
প্রেমমূলক
তোমার হৃদয়টা জমে পাথর হয়ে আছে, পাথরটা দাও আমাকে, স্পর্শ করি, ওকে গলতে দাও। ভালোবাসা নামের পাখিটাকে তোমার বন্ধ খাঁচা থেকে উড়তে দাও, নাহলে ও তো মরে যাবে।
তসলিমা নাসরিন
প্রেমমূলক
তোমার কপালের ভাঁজগুলোকেও আমি লক্ষ করছি যে আমি ভালোবাসি, ভালোবাসি কারণ ওগুলো তোমার ভাঁজ, তোমার গালের কাটা দাগটাকেও বাসি, যেহেতু দাগটা তোমার আমার দিকে ছুঁড়ে দেওয়া তোমার বিরক্ত দৃষ্টিটাকেও ভালোবাসছি, যেহেতু দৃষ্টিটা তোমারই। তোমার বিতিকিচ্ছিজ্ঞর টালমাটাল জীবনকেও পলকহীন দেখি, তোমার বলেই দেখি। তোমাকে দেখলেই আগুনের মত ছুটে যাই তোমার কাছে, তুমি বলেই, হাত বাড়িয়ে দিই, তুমি বলেই তো, হাত বাড়িয়ে রাখি, সে হাত তুমি কখনও স্পর্শ না করলেও রাখি, সে তুমি বলেই তো।
তসলিমা নাসরিন
মানবতাবাদী
তাদের জন্য আমার করুণা হয় যারা নারী নয় দুর্ভাগাদের জন্য আমার দুঃখ হয়, যারা নারী নয়। অবিশ্বাস্য এই শিল্প, অতুলনীয় শিল্প এই নারী, বিশ্বের বিস্ময়, বিচিত্রিতা। আমি নারী, বারবার চাই, শতবার চাই নারী হতে, নারী হয়ে জন্ম নিতে। সহস্র জন্ম চাই আমি, নারী জন্ম চাই। নারীর প্রেম চাই, তার কামরসে স্নান চাই, মৈথুন চাই। মৈথুনে মোহাচ্ছত হতে হতে মরিয়া হয়ে চাই একটি শিশু, আমার তীব্র প্রচণ্ড চাওয়া তীব্রতর হতে থাকে যতক্ষণ না আমার নারী-শরীরটিই শুক্রাণুর জন্ম দিচ্ছে। একটি ভ্রূণ আমার জরায়ুতে। নারী-শিশু জন্ম দেব আমি, আমি নারী, জন্ম দেব নারী-শিশু। আমি ভালোবাসছি সর্বদর্শী সর্বময়ী সর্বব্যাপিনী শাশ্বতী নারীশক্তি। ভালোবাসছি নারীশিশু, কিশোরী, তরুণী, যুবতী, বৃদ্ধা। হিরন্ময়ী ইচ্ছাময়ী প্রাণবতী হৃদয়বতী আবর্তিত হতে হতে বিবর্তিত হতে হতে সম্রাজ্ঞী হতে হতে গোটা ব্রম্মাণ্ডের ঈশ্বরী হচ্ছে। ভালোবাসছি আমাকে! নারীকে। নারী-জন্মকে।
তসলিমা নাসরিন
মানবতাবাদী
তিনকূলে কেউ নেই, ডাঙর হয়েই মেয়ে টের পেয়ে যায় অভাবের হিংস্র দাঁত জীবন কামড়ে ধরে ছিঁড়েখুঁড়ে খায়। যুবতী শরীর দেখে গৃহিনীরা সাধ করে ডাকে না বিপদ বেসুমার খিদে পেটে, নিয়তি দেখিয়েদেয় নারীকে বিপথ। দুয়ারে ভিক্ষার হাত বাড়ায়ে বেকার নারী তবু বেঁচে থাকে স্টেশনে কাচারি পেলে গুটিশুটি শুয়ে পড়ে মানুষের ফাঁকে এইসব লক্ষ করে ধরিবাজ পুরুষেরা মুখ টিপে হাসে দেখাতে ভাতের লোভ আঁধার নিভৃতে তারা ফন্দি এঁটে আসে। তিনকূলে কেউ নেই, কোথাও কিছুই নেই, স্বপ্ন শুধু ভাত শরমের মাথা খেয়ে এভাবেই ধরে নারীদালালের হাত।
তসলিমা নাসরিন
মানবতাবাদী
রবীন্দ্রসদনে আজ গান হচ্ছে, নন্দনে বাজাচ্ছে আমজাদ, শিশির মঞ্চে নাটক হচ্ছে, অ্যাকাডেমিতেও কিছু একটা কলকাতার গরম গরম কালচার-পাড়ায় দাঁড়িয়ে এখন গরম গরম চা খাও ইতিউতি দেখ, চেনা মুখ খোঁড়ো, পেলে মাথাটা ঝাঁকাও, এই কী খবর বল, এমনভাবে দাঁড়াও সিঁড়িতে বা গাছটার তলে যেন সকলেই দেখে তোমাকে, তুমি যে কালচার পাড়ায় নিয়মিত, দেখে। তুমি যে দশটা পাঁচটা করেও কালচার নিয়ে আছো, দেখে সংসারের সাত রকম ঝামেলা সয়েও কালচারটা যে রেখেছো, দেখে যেন তোমার সুতোর কাজের পাঞ্জাবি দেখে, শাড়ির নেশা নেশা রঙ দেখে, তোমার গান-গান কবিতা-কবিতা মুখ দেখে যেন তোমার থিয়েটারি চুল দেখে, ফিল্মি ভাবসাব দেখে কালচার শালার বাপের বাপ যে তুমি, যেন দেখে। এমনভাবে হাঁটো কথা বলো যেন দর্শক শ্রোতারা জেনে যায় নিদেনপক্ষে একটা অ্যামবাসাডার বা মারুতি তোমার থাকতেও পারে। এমনভাবে হাসো যেন লোকে বোঝে মনে কোনও দুঃখ নেই তোমার, যেন বোঝে, তুমি একটা বড়লোকের পাড়ায় বাস করো, তুমি ওইসব বিচ্ছিরি বস্তিতে বাস করো না, শহরের দশ লক্ষ মানুষ যেখানে করে। আরেকটু পা বাড়াও, কারও পাশে ঘন হয়ে দাঁড়াও, মনে মনে চুমু খাও খেয়ে পুলকে পুরুষ্টু হয়ে বোঝাও যে তুমি ওই দুর্ভাগা দশ লক্ষের কেউ নও।
তসলিমা নাসরিন
প্রেমমূলক
প্রেম আমাকে একেকবারে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে, আমি আর আমি নেই, আমাকে আমি আর চিনতে পারি না, আমার শরীরটাকে পারি না, মনটাকে পারি না। হাঁটাচলাগুলোকে পারি না, দৃষ্টিগুলোকে পারি না, কী রকম যেন অদ্ভুত হয়ে যাচ্ছি, বন্ধুদের আড্ডায় যখন হাসা উচিত আমি হাসছি না, যখন দুঃখ করা উচিত, করছি না। মনকে কিছুতেই প্রেম থেকে তুলে এনে অন্য কোথাও মুহূর্তের জন্য স্থির করতে পারি না। পুরো জগতটিতে এখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে, চাঁদ সুর্যের ঠিক নেই, রাত দিনের ঠিক নেই, আমার জীবন গেছে, জীবন-যাপন গেছে, নাশ হয়ে গেছে। এখন শত্রুর জন্য যদি অভিশাপ দিতে হয় কিছু, আমি আর বলি না যে তোর কুষ্ঠ হোক,তুই মরে যা, তুই মর। এখন বড় স্বচ্ছন্দে এই বলে অভিশাপ দিয়ে দিই —- তুই প্রেমে পড়।
তসলিমা নাসরিন
প্রেমমূলক
জানি না কেন হঠাৎ কোনও কারণ নেই, কিছু নেই, কারও কারও জন্য খুব অন্যরকম লাগে অন্য রকম লাগে, কোনও কারণ নেই, তারপরও বুকের মধ্যে চিনচিনে কষ্ট হতে থাকে, কারুকে খুব দেখতে ইচ্ছে হয়, পেতে ইচ্ছে হয়, কারুর সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে বসতে ইচ্ছে হয়, সারাজীবন ধরে সারাজীবনের গল্প করতে ইচ্ছে হয়, ইচ্ছে হওয়ার কোনও কারণ নেই, তারপরও ইচ্ছে হয়। ইচ্ছের কোনও লাগাম থাকে না। ইচ্ছেগুলো এক সকাল থেকে আরেক সকাল পর্যন্ত জ্বালাতে থাকে। প্রতিদিন। ইচ্ছেগুলো পুরণ হয় না, তারপরও ইচ্ছেগুলো বেশরমের মত পড়ে থাকে, আশায় আশায় থাকে। কষ্ট হতে থাকে, কষ্ট হওয়ার কোনও কারণ নেই, তারপরও হতে থাকে, সময়গুলো নষ্ট হতে থাকে। কারও কারও জন্য জানি না জীবনের শেষ বয়সে এসেও সেই কিশোরীর মত কেন অনুভব করি। কিশোরী বয়সেও যেমন লুকিয়ে রাখতে হত ইচ্ছেগুলো, এখনও হয়। কি জানি সে, যার জন্য অন্যরকমটি লাগে, যদি ইচ্ছেগুলো দেখে হাসে! সেই ভয়ে লুকিয়ে রাখি ইচ্ছে, সেই ভয়ে আড়াল করে রাখি কষ্ট। হেঁটে যাই, যেন কিছুই হয়নি, যেন আর সবার মত সুখী মানুষ আমিও, হেঁটে যাই। যাই, কত কোথাও যাই, কিন্তু তার কাছেই কেবল যাই না, যার জন্য লাগে। কারও কারও জন্য এমন অদ্ভুত অসময়ে বুক ছিঁড়ে যেতে থাকে কেন! জীবনের কত কাজ বাকি, কত তাড়া! তারপরও সব কিছু সরিয়ে রেখে তাকে ভাবি, তাকে না পেয়ে কষ্ট আমাকে কেটে কেটে টুকরো করবে জেনেও তাকে ভাবি। তাকে ভেবে কোনও লাভ নেই জেনেও ভাবি। তাকে কোনওদিন পাবো না জেনেও তাকে পেতে চাই।
তসলিমা নাসরিন
প্রেমমূলক
ভুল প্রেমে কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত, তবু এখনো কেমন যেন হৃদয় টাটায়- প্রতারক পুরুষেরা এখনো আঙুল ছুঁলে পাথর শরীর বয়ে ঝরনার জল ঝরে। এখনো কেমন যেন কল কল শব্দ শুনি নির্জন বৈশাখে, মাঘ-চৈত্রে- ভুল প্রেমে কেটে গেছে তিরিশ বসন্ত, তবু বিশ্বাসের রোদে পুড়ে নিজেকে অঙ্গার করি। প্রতারক পুরুষেরা একবার ডাকলেই ভুলে যাই পেছনের সজল ভৈরবী ভুলে যাই মেঘলা আকাশ, না-ফুরানো দীর্ঘ রাত। একবার ডাকলেই সব ভুলে পা বাড়াই নতুন ভুলের দিকে একবার ভালোবাসলেই সব ভুলে কেঁদে উঠি অমল বালিকা। ভুল প্রেমে তিরিশ বছর গেল সহস্র বছর যাবে আরো, তবু বোধ হবে না নির্বোধ বালিকার।
তসলিমা নাসরিন
মানবতাবাদী
মেয়েটি আসছে মুখটি পোড়া মুখটি এখন আর মুখের মত দেখতে নয়, এক তাল কাদার ওপর দিয়ে যেন দৈত্য হেঁটে গেল, বীভৎস মুখটি। মুখ বলতে আসলে কিছু আর নেই। সে কোনও অ্যাসিড হাতে নিয়ে আসছে না, কোনও অ্যাসিড সে ছুঁড়বে না তোমার মুখে, সে এত নিষ্ঠুর নয়, এত নিষ্ঠুর সে হতে পারে না, তোমার মুখটিকে তোমার মুখ থেকে সে খামচে তুলবে না। কিন্তু সে তোমার দিকে হেঁটে আসছে, তার চোখদুটো ইলেকট্রিক তারে ঝুলে থাকা মরা বাদুরের মত ঝুলে আছে কোটর থেকে, তার নাকটা সম্পূর্ণই থেতলে গেছে, কোনও কপাল নেই, গাল নেই, কোনও ঠোঁট নেই। কিন্তু তার সবগুলো দাঁত এখনও আছে, দাঁতগুলো পুড়ে যায় নি, দাঁতগুলো এখনও সাদা, এখনও ধারালো, দাঁতগুলো তোমাকে কামড় দেওয়ার জন্য। সে তোমার মুখে কামড় দিচ্ছে না, বাহু তে বা বুকে কামড় দিচ্ছে না, পেটে দিচ্ছে না, পিঠে দিচ্ছে না। কিন্তু সে কামড় দিচ্ছে, সে তোমার পুরুষাঙ্গে কামড় দিচ্ছে, সি বাইটস ইওর ডিক-অফ। (কবিতাটি প্রথম ইংরেজিতে লেখা হয়েছিল। এটি তার বাংলা অনুবাদ)
তসলিমা নাসরিন
প্রেমমূলক
অনেকবার ফোন বাজলো, কেউ ধরলো না কথা বলতে চাইলাম, কেউ বললো না সারাদিন কোনও চিঠি নেই, কেউ লিখলো না কেউ ভাবলো না মনে করলো না কেউ জাগালো না ভালোবাসলো না। কী জানি, হয়ত এই ফোন করা, কথা বলা, চিঠি লেখা সবকিছুকে এখন বড় অকাজ বলে মনে হচ্ছে কারও কাছে! ধীরে ধীরে ভুলে যায় মানুষ, ভুলেই তো যায়, কেউ হয়ত ভুলে যাচ্ছে। আমার কিন্তু কখনও এসবের কিছুকে অকাজ বলে মনে হবে না, সকলে ভুলে যাক, আমি ভুলবো না, ভালো কেউ না বাসুক, নিভৃতে আমিই বাসবো, এ জগতটিকে, জগতের হৃদয়বান মানুষগুলোকে ভালোবেসে আমি তো অন্যকে নয়, নিজেকেই ধন্য করি, এর চেয়ে বড় কাজ আর কী আছে জীবনে? আমি আছি, দূরে বহুদূরে, কোথাও, কোনওখানে এখনও শ্বাস নিচ্ছি, নিঝুম চরাচরে নিজের শ্বাসের শব্দে হঠাৎ হঠাৎ চমকে উঠি, স্বপ্নটাকে রেখে দিয়েছি খুব যত্ন করে নেপথলিনে মুড়ে যাবো কলকাতায় যাবো আবার দেখা হবে প্রিয় প্রিয় মানুষের সঙ্গে হাতে হাত রেখে হাঁটা হবে, রাতের কলকাতাকে কোনও কোনও রাতে ঘুম থেকে তুলে পালিয়ে যাওয়া যাবে, সারারাত অকাজ করে ভোর হলে আবার অকাজে মন দেব, সারাদিন অকাজে দিন যাবে, রাজি?
তসলিমা নাসরিন
মানবতাবাদী
আর ধর্ষিতা হয়ো না, আর না আর যেন কোনও দুঃসংবাদ কোথাও না শুনি যে তোমাকে ধর্ষণ করেছে কোনও এক হারামজাদা বা কোনও হারামজাদার দল। আমি আর দেখতে চাই না একটি ধর্ষিতারও কাতর করুণ মুখ, আর দেখতে চাই না পুরুষের পত্রিকায় পুরুষ সাংবাদিকের লেখা সংবাদ পড়তে পড়তে কোনও পুরুষ পাঠকের আরও একবার মনে মনে ধর্ষণ করা ধর্ষিতাকে। ধর্ষিতা হয়ো না, বরং ধর্ষণ করতে আসা পুরুষের পুরুষাঙ্গ কেটে ধরিয়ে দাও হাতে, অথবা ঝুলিয়ে দাও গলায়, খোকারা এখন চুষতে থাক যার যার দিগ্বিজয়ী অঙ্গ, চুষতে থাক নিরূপায় ঝুলে থাকা অণ্ডকোষ, গিলতে থাক এসবের রস, কষ। ধর্ষিতা হয়ো না,পারো তো পুরুষকে পদানত করো, পরাভূত করো, পতিত করো, পয়মাল করো পারো তো ধর্ষণ করো, পারো তো ওদের পুরুষত্ব নষ্ট করো। লোকে বলবে, ছি ছি, বলুক। লোকে বলবে এমন কী নির্যাতিতা নারীরাও যে তুমি তো মন্দ পুরুষের মতই, বলুক, বলুক যে এ তো কোনও সমাধান নয়, বলুক যে তুমি তো তবে ভালো নও বলুক, কিছুতে কান দিও না, তোমার ভালো হওয়ার দরকার নেই, শত সহস্র বছর তুমি ভালো ছিলে মেয়ে, এবার একটু মন্দ হও। চলো সবাই মিলে আমরা মন্দ হই, মন্দ হওয়ার মত ভালো আর কী আছে কোথায়!
তসলিমা নাসরিন
চিন্তামূলক
মানুষের চরিত্রই এমন বসলে বলবে না, বসো না দাঁড়ালে, কি ব্যাপার হাঁটো আর হাঁটলে, ছি: বসো। শুয়ে পড়লে ও তাড়া – নাও উঠো, না শুলে ও স্বষ্তি নেই, একটু তো শুবে ! ওঠ বস করে করে নষ্ঠ হচ্ছে দিন এখনো মরতে গেলে বলে ওঠে – বাঁচো না জানি কখন ও বাঁচতে দেখলে বলে উঠবে – ছি: মরো বড় ভয়ে গোপনে গোপনে বাঁচি।
তসলিমা নাসরিন
প্রেমমূলক
আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তুই কোথায় আমার খুব তোকে স্পর্শ করতে ইচ্ছে করছে তোর সঙ্গে আমার খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে অনেকক্ষণ ধরে কথা, সারাদিন ধরে কথা, সারারাত ধরে কথা আমার জানতে ইচ্ছে করছে অনেক কিছু আমাকে একটু একটু করে, আমার খুব কাছে বসে, চোখে তাকিয়ে চোখে না তাকিয়ে, হেসে, না হেসে, চুলে বিলি কেটে কেটে না কেটে কেটে তুই বলবি সব, যে কথাগুলো বলার তোর কথা ছিল। আমারও তো শোনার কথা ছিল শেফালি। তুই কোথায় শেফালি? যেখানে আছিস, সেখানে কি তোকে এখন দুবেলা খেতে দেয়? তোকে জামা কাপড় দেয়, টাকা পয়সা দেয়? নাকি তোকে কাপড় ধুতে পাঠিয়ে জলকলের মেশিনে হাত দিতে বলে, যেন তুই জ্বলে যাস, যেন তুই ছাই হয়ে যাস! যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তারা তোর আর্তনাদ শোনে, যেন হাত না বাড়ায়, যেন না বাঁচায়! যেন দাঁডিয়ে দাঁড়িয়ে তারা তোর মরে যাওয়া দেখে! তোর কিছু গোপন স্বপ্ন ছিল, সেই স্বপ্নের কথা তুই বলবি বলেছিলি, একটি ঘরের স্বপ্ন ছিল তোর, তোর নিজের ঘরের, জন্মে তো কখনও নিজের কোনও ঘর দেখিসনি! সেই স্বপ্ন, নিজেই নিজের জীবনের কর্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন। খুব গোপন স্বপ্ন। আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তোকে, কাছে বসে, আমাকে ছুঁয়ে না ছুঁয়ে, কেঁদে না কেঁদে তুই সেইসব সর্বনাশা স্বপ্নের কথা, বেহায়া বেশরম সুরে বলবি, সারাদিন বলবি চারদিকে কোথাও তুই নেই কেন, হাত শুধু ফিরে ফিরে আসে, আমাকে পেতে দে তোকে, পেতে দে, ফিরিয়ে দিস না শেফালি!
তসলিমা নাসরিন
প্রেমমূলক
কতটুকু ভালোবাসা দিলে, ক তোড়া গোলাপ দিলে, কতটুকু সময়, কতটা সমুদ্র দিলে, কটি নির্ঘুম রাত দিলে, ক ফোঁটা জল দিলে চোখের — সব যেদিন ভীষণ আবেগে শোনাচ্ছিলে আমাকে, বোঝাতে চাইছিলে আমাকে খুব ভালোবাসো, আমি বুঝে নিলাম তুমি আমাকে এখন আর একটুও ভালোবাসো না। ভালোবাসা ফুরোলেই মানুষ হিসেব কষতে বসে, তুমিও বসেছো। ভালোবাসা ততদিনই ভালোবাসা যতদিন এটি অন্ধ থাকে, বধির থাকে, যতদিন এটি বেহিসেবী থাকে।
তসলিমা নাসরিন
প্রেমমূলক
আমি তুমুল প্রেমে পড়েছি তোমার, শুনছো, শুনতে পাচ্ছে!? এমন প্রেমে অনেককাল আমি পড়িনি এমন করে কেউ আমাকে অনেককাল আচ্ছন্ন করে রাখেনি। এমন করে আমার দিনগুলোর হাত পা রাতের পেটে সেঁধিয়ে যায়নি এমন করে রাতগুলো ছটফট করে মরেনি! গভীর ঘুম থেকে টেনে আমাকে তুমি বসিয়ে দিলে– এভাবে কি হয় নাকি? আমি হাত বাড়াবো আর এখন তোমাকে পাবো না, রাতের পর রাত পাবো না! আমি ঘুমোবো না, একফোঁটা ঘুমোবো না, কোথাও যাবো না, কিছু শুনবো না, কাউকে কিছু বলবো না, স্নান করবো না, খাবো না! শুধু ভাববো তোমাকে, ভাবতে ভাবতে যা কিছুই করিনা কেন, সেগুলো ঠিক করা হয়না– ভাবতে ভাবতে আমি বই পড়ছি, আসলে কিন্তু পড়ছি না, বইয়ের অক্ষরে চোখ বুলোনো ঠিকই হবে, পড়া হবে না ভাবতে ভাবতে আমি সেন্ট্রাল স্কোয়ারে যাচ্ছি, যাচ্ছি কিন্তু যাচ্ছি না, ঘণ্টা দুই আগে পেরিয়ে গেছি স্কোয়ার, আমি কিন্তু হাঁটছিই, কিছুই জানি না কী পেরোচ্ছি, কোথায় পৌঁচোচ্ছি, এর নাম হাঁটা নয়, কোথাও যাওয়া নয়, এ অন্য কিছু, এ কারও তুমুল প্রেমে পড়া। কিছু একটা করো, স্পর্শ করো আমাকে, চুমু খাও শুধু ঠোঁটে নয়, সারা শরীরে চুমু খাও, তুমুল চুমু খাও অত দূরে অমন করে বসে থেকো না, উড়ে চলে এসো, উড়ে এসে চুমু খাও। আমার ঠোঁটজোড়া ঠাণ্ডায় পাথর হয়ে আছে, তোমার উষ্ণতা কিছু দাও, তুমি তো আগুন, আমার অমল অনল, এসো তোমাকে তাপাবো, তোমাকে তাপাতে দাও। শুনছো, তুমুল প্রেমে তুমিও পড়ো না গো!
তসলিমা নাসরিন
প্রেমমূলক
খালি চুমু চুমু চুমু এত চুমু খেতে চাও কেন? প্রেমে পড়লেই বুঝি চুমু খেতে হয়! চুমু না খেয়ে প্রেম হয় না? শরীর স্পর্শ না করে প্রেম হয় না? মুখোমুখি বসো, চুপচাপ বসে থাকি চলো, কোনও কথা না বলে চলো, কোনও শব্দ না করে চলো, শুধু চোখের দিকে তাকিয়ে চলো, দেখ প্রেম হয় কি না! চোখ যত কথা বলতে পারে, মুখ বুঝি তার সামান্যও পারে! চোখ যত প্রেম জানে, তত বুঝি শরীরের অন্য কোনও অঙ্গ জানে!