poet
stringclasses 137
values | category
stringclasses 21
values | poem
stringlengths 9
18.7k
|
---|---|---|
রেদোয়ান মাসুদ
|
প্রেমমূলক
|
যে চোখ দেখেছে তোমায়
ভালবাসার নজরে,
সে চোখ কি করে তোমায়
ভুলতে পারে?
দু’চোখ ভাসবে শুধু বন্যায়
আকাশের দিকে চেয়ে,
ভুলবোনা কোনদিন তোমায়
যতক্ষণ এ দেহে প্রাণ থাকে।
কাঁদতে কাঁদতে যদি শুন্য হয়
চোখের জলাধারে,
তবুও ভুলবোনা তোমায়
বাঁধবো আশা বুকে।
অন্ধ চোখে খুঁজবো তোমায়
হৃদয়ের আয়না দিয়ে,
ভাসাবো তোমায় ভালবাসায়
বুক ভরা ভালবাসা দিয়ে।
বল তুমি যাবে কোথায়
আমাকে ছেড়ে,
থাকবো আমি তোমার আশায়
নদীর কুলে বসে।
যেদিন মৃত্যু হাতছানি দিবে আমায়
নিয়ে যাবে ওপারে,
সেখানেও থাকবো তোমার আশায়
অনন্ত কাল ধরে।
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
প্রেমমূলক
|
যে জন আসে নির্জনে
নিরবে কাছে টানে,
নিরবে ভালোবেসে আবার
নিরবেই যায় চলে।
সে জনের কথা
কে বা ভুলতে পারে?
কে বা থাকতে পারে
কাছে থকে দূরে
দূর থেকে সমুদ্দুরে?
পারিনি তোমার থেকে
দূরে সরে যেতে।
আজো আছি আমি
নির্জনে নিভৃতে
তোমার হৃদয়ের অতল তলে
ভালোবেসে কাছে টেনে
সমুদ্দুর থেকে আমার
অশ্রুভেজা চোখের জলে।
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
প্রেমমূলক
|
আর কত ভালবাসলে
ভালবাসবে তুমি আমায়?
আর কত কাঁদলে
গলবে তোমার হৃদয়?
আর কত রাত জাগলে
বুঝবে তুমি আমায়?
আর কত অপেক্ষা করলে
শেষ হবে অপেক্ষা আমার?
আর কত দিন কাটলে
আসবে তুমি কাছে আমার?
আর কত পোড়ায়ে
খাটি করবে আমার হৃদয়?
আর কত সাগরে ভাসলে
দেখা দিবে তুমি আমায়?
আর কত পরীক্ষার পর
শেষ হবে আমাকে জানার?
আর কত ভালবাসলে
ভালবাসবে তুমি আমায়?
আর কত কাঁদলে
গলবে তোমার হৃদয়?
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
প্রেমমূলক
|
ভালোবাসা মানে নতুন কোন কষ্টে জড়ানো
সুখের আশায় দুঃখের সাগরে ঝাপ দেওয়ানো
উত্তাল ঢেউ এর মধ্যে দু’জন একসাথে সাঁতরানো
একজনের সুখে অন্য জনের ভাগ বসানো
একজনের দুঃখে অন্য জনের কাতর হওয়ানো।।
ভালোবাসা মানে দুঃখের মাঝে সুখের ঘ্রাণ নেওয়ানো
সুখের মাঝে দুঃখকে লুকানো
হাসির মাঝে মধু মাখানো
চোখের জলে বুক ভাসানো
কারো জন্য নির্ঘুম রাত কাটানো।।
ভালোবাসা মানে তুমুল ঝড়ের মাঝে পথ পেরোনো
বৃষ্টির মাঝে শরীর ভিজানো
মেঘের মাঝে মুখ লুকানো
গহীন অরণ্যে রাত কাটানো
দুর্গম পাহাড়ে পা আটকানো।।
ভালোবাসা মানে সুখের আশায় দূর আকাশে তাকানো
শত অপবাদের সাথে নিজেকে জড়ানো
জ্যোৎস্না রাতে ছাদে বসে রাত কাটানো
বিরহের ব্যাথায় বুক ফাটানো
দু’জনের মাঝে দুজনকে হারানো।।
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
প্রেমমূলক
|
শুভ জন্মদিন, শুভেচ্ছা তোমায়
সারাক্ষণ মুখখানি থাকুক হাসিময়,
একবিন্দু জলও না আসুক চোখের কোনায়
স্বপ্নআঁকা হৃদয়টি থাকুক গতিময়,
ভালো থাকুক প্রিয়জন সবসময়
এই কথা লিখে দিলাম প্রার্থনার খাতায়।
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
চিন্তামূলক
|
জীবন এক বহমান নদী
আঁকাবাঁকা পথ,
কখনও বা উজানে, কখনও বা ভাটায়,
আমরা শুধু বেয়ে যাই,
সেই বিশাল পথ।
ভাঁটায় যেতে নাহি ঝড়ে শরীরের ঘাম
পানিতে বৈঠা ফেলে শুধু আরাম আর আরাম।
উজানে যেতে বৈঠা নিতে হয় শক্ত হাতে,
করতে হয় কঠিন উদ্যম।
কেউ যেতে পারে, কেউবা হারে
এটাই জীবনের পথ।
জীবন এক বহমান নদী
আঁকাবাঁকা পথ।
কখনও আকাশে মেঘ জমে
কখনও নদীতে ঢেউ উঠে,
স্রোতের বিপরীতে ঢেউয়ের কবলে
কেউ বা উঠে পাড়ে
আবার কেউ ওখানেই পরে মরে।
এরাই পরে কঠিন বাস্তবে
তবুও না পারে এড়িয়ে যাতে সেই পথ।
জীবন এক বহমান নদী
আঁকাবাঁকা পথ।
সময়ের, অসময়ের তরে নদীর রূপ ধরে
আনে যেমন ভিন্নতা
তেমনি মানুষের জীবনেও আনে
রিক্ততা, তিক্ততা আবার পরিপূর্ণতা
কারো জন্য ভাগ্যের ইতিহাস
কারো জন্য নির্মম পরিহাস।
জীবন এক বহমান নদী
আঁকাবাঁকা পথ,
কখনও বা উজানে, কখনও বা ভাটায়,
আমরা শুধু বেয়ে যাই,
সেই বিশাল পথ।
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
প্রেমমূলক
|
আমার কষ্টগুলো আমারি থাক
বৃষ্টিগুলো আমার চোখ দিয়েই ঝরুক
ঝর্ণার জলগুলো শুধু আমার হৃদয় দিয়েই বের হোক
সকল জল মিলে ঢেউ উঠলে আমার মনেই উঠুক
আর সেই ঢেউয়ে ভেসে গেলে আমিই যাই।
এ কষ্টের জীবনে অন্যকে জড়িয়ে কি লাভ?
চোখ দিয়ে ঝরা জলের মূল্য যে কত
তা হয়তোবা কোনদিন কল্পনাও করতে পারবেনা
তাই আমিও চাইনা এ নিয়ে ভেবে কারো মাথার উপর
আবার পুরো আকাশটা ভেঙ্গে পড়ুক,
মেঘে ঢেকে চোখ দুটি অন্ধ হোক।
.
সুখের নরম ছোঁয়ায় তোমার হৃদয়ে আবেগের ঝর্ণা বহুক
মুখে চাঁদের হাসিতে চারিদিকে আলোকিত হোক
আমি সব সময় তোমার হৃদয়ে আনন্দের বন্যা দেখতে চাই
যা ছড়িয়ে তোমার পুরো শরীরে ভালবাসার ছোঁয়া লাগুক
পাখিদের গানে গানে মনটা আনন্দে ভরে উঠুক
হাসনাহেনার গন্ধে তোমার চারিপাশ শুভাসিত হোক
জ্যোৎস্না রাতের আলোতে চোখ দু’টি পুলকিত হোক।
.
আর দুনিয়ার যত হতাশা এসে আমাকে জাপটে ধরুক
নষ্ট লোকের মস্ত অপবাদ আমার উপরই লাগুক
রাস্তার যত আবর্জনা এসে আমার শরীরে লাগুক
আমি চাইনা এ আবরণ আমাকে ছাড়িয়ে অন্য কারো শরীরে
স্পর্শ করুক, ব্যাকটেরিয়া লেগে পচন ধরুক,
গোধূলি লগণের আন্ধকারের আবহন চোখে পড়ুক।
.
রংধনুর সাত রঙে তোমার হৃদয়ে ভালবাসার রঙ লাগুক
তবুও তুমি সুখেই থাক, সুখ নিয়েই ভাব
কখনও কষ্টে জর্জরিত এই নষ্ট মনে হানা দিও না।
আমার কষ্টগুলো আমারি থাক
বৃষ্টিগুলো সব আমার চোখ দিয়েই ঝরুক
ঝর্ণার জলগুলো আমার হৃদয় দিয়েই বের হোক
তবুও তোমার হৃদয়ে বিন্দুমাত্র কালো ছায়া স্পর্শ না করুক।
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
প্রেমমূলক
|
আমার শব্দ ঐখানে পৌছেনা
আমার ছায়া নদীতে পরেনা
ঐখানে বলতে কোথায় বুঝাচ্ছি
তা আমি নিজেও জানিনা !
আমি জানিনা তুমি
কোথায় থাক
আমি জানিনা তোমার ছায়া
কোন নদীতে পড়ে
আমি জানিনা কেন তুমি আজ স্তব্দ !
কেন তোমার কথা আমি শুনিনা
কেন তোমার ছায়া আমি দেখিনা
আমি বারবার কত চেষ্টা করি
শুধুমাত্র একটি বার কথা বলার জন্য
কিন্তু সবই নিয়তির খেলা
জানিনা জীবনে কোন দিন সে ভাগ্য
আমার হবে কিনা ।
আমার মুখের কোন শব্দই কি তোমার
কানে পৌছবে না
আমার হৃদয়ের যত দুঃখ গাথা
তোমার হৃদয়টাকে কি এতটুকু ও
নাড়াচাড়া দেয় না ?
এটাই কি মানবতা ?
এটাই কি ভালবাসা ?
আজ আমি ভালবাসার সংজ্ঞা ভুলে গেছি
আজ আমি সেই পরিচিত ডাকটাও ভুলে গেছি
কারন ভালবাসা কি জিনিস বা কাকে বলে
তা আর খুজে পাচ্ছিনা
হয়তবা কালের গর্ভে
ভালবাসার সঠিক সংজ্ঞাটি হারিয়ে গেছে।
যে ডাকে আমি তোমাকে ডাকতাম
যে নামে তুমি আমার ডাকে সাড়া দিতে
সে ডাক ও সাড়া দেওয়া ভাষাটি আজ
আমার হৃদয়টাকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে
কারন যখন আমি মনে মনে ডাকি
আর উত্তরে সেই শব্দটি অনুভব করি।
তখন আমার হৃদয়টা ফেটে চুরমার হয়ে যায়
আমি ডাকতে চাই, কিন্তু কাকে ডাকব?
চোখের সামনে তো আর কাউকে দেখিনা
আর ডাকলেই বা কি হবে?
কে দিবে আমার সেই ডাকের উত্তর ?
কেউ নেই, আজ কেউ নেই
আমার মায়াভরা ডাকটি শুনার মত।
শুধু চারিদিকে অন্ধকার আর অন্ধকার
আর তার মাঝে একটি দেয়াল
যে দেয়ালটি আজ আমার থেকে তোমাকে
বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে ।
যার কারনেই আমার হৃদয়ের ডাক
তোমার হৃদয়ে পৌছানা
জানিনা এ দেয়াল কি ভাঙ্গা সম্ভব?
হ্যা সম্ভব তবে দেয়াল ভাঙ্গার জন্য
শুধু একটি জিনিস প্রয়োজন
সেটি কোন টাকা পয়সা বা হীরার টুকরো নয়।
যা ভাঙ্গতে তোমাকে কোন্য রাজ্য ও হারাতে হবে না।
দেশের সংবিধান ও পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই
শুধু একটি জিনিস দরকার
যা অনেক সহজ আবার অনেক কঠিন
আজ আমি সেই জিনিসটির নাম
না বলে পারছিনা
কারন যারা এখন আমার কবিতাটি পড়েছে
তারা সেই জিনিসটির নাম শুনতে
অধির আগ্রহে বসে আছে
তাই আমি বলে দিচ্ছি
দুনিয়াতে বিবেক বলে একটি কথা আছে
আর সেই বিবেক টির কারনেই
আজ আমি তোমার হৃদয় থেকে বিচ্ছিন্ন
একটু ভেবে দেখ, নিজের কাছে প্রশ্ন করে দেখ
আসলে কি আমি ঠিক বলছি
না মিথ্যে বলছি
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তুমি উত্তর পেয়ে যাবে।
আর সেই সত্য মিথ্যা বের করার জন্যেও
প্রয়োজন একটি বিবেক।
পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আদালত হল
মানুষের বিবেক
আর সেই আদালতে যদি তুমি নিজেই
নিজের বিচার কর তাহলেই ভেঙ্গে যেতে পারে
সেই দেয়ালটি
যে দেয়ালটি আজ দুজনকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে
আমি আর পারছিনা
প্রতিটি মুহুর্তই যে এক এক কোটি বছরের মত লাগে
কিভাবে আমি পাড় করব বাকিটা জীবন?
যে জীবন ভীষণ দুঃখময়
যে জীবন মরুভূমির মত
রোদ্রের তাপে আজ দাউ দাউ করে পুড়ছে
জানি আমার একথা গুলো তোমার কানে পৌছাচ্ছেনা
তারপরও যদি তুমি কখনও
সামান্য একটুকু সময় পাও
তোমার বিবেকের কাছে প্রশ্ন কর?
আমাকে এই আবদ্ধ পৃথিবী থেকে মুক্ত কর
আমি পাথরের ঘরে এখন আর
নিঃশ্বাস নিতে পারছি না।
মৃত্যুই আমাকে বার বার তাড়া করে ফিরছে
হয়তোবা কোন দিন আমি মৃত্যুকে আপন করে নিব
তোমাকেই রেখে যাব এই স্বর্গ রাজ্যে
স্বাধীনভাবে চলার জন্য
চোখ খুলে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াতে
যেখানে তোমাকে সেই পরিচিত ডাকটি
আর শুনতে হবেনা
তোমার চারিদিক তোমাকে মুক্ত করে দিব
তোমাকে আর কেই বাধা দিবেনা
তুমি থাকবে আবার সেই স্বাধীনরাজ্যে।
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
প্রেমমূলক
|
রাতগুলো নির্ঘুম আমার কাটে শুধু একেলা
পথ আমার অফুরন্ত হয় না শেষ এবেলা।
হাটতে হাটতে চলেছি আমি গন্তব্য অজানা
ঝোপ ঝাড়ে নেই আলো, অন্ধকারের ছায়া।
পাখিগুলো কেন আজ বসে আছে নিরালা
গান কেন গায়না তারা আজ সন্ধ্যা বেলা।
আকাশটি যেন আজ আছে মেঘে ঢাকা
কাছে থেকেও কিছুই তাই যায় না দেখা।
নিভু নিভু আলো দিত অন্ধকারে জোনাকিরা
কেন যেন আজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তারা।
নদীর কুলে বসেছিলাম শুনতে সূরের মূর্ছনা
হঠাৎ ঢেউ এসে কেড়ে নিলো সেই বাসনা।
এ বুকের মাঝে দুঃখগুলো বেধেছে বাসা
বলার মত নেই কিছু হারিয়ে গেছে ভাষা।
মনেতে নেই কোন শান্তি,নেই কোন সান্ত্বনা
সবকিছু হারিয়ে গেছে, আছে শুধু দুঃখমালা।
বুকের মাঝে সাগর ছিল উঠেছে ঝড় এবেলা
চোখের জলে ভাসিয়েছে সব বিদায় বেলা।
ঢেউয়ে ঢেউয়ে কাপি আমি সেথায় একেলা
চারিদিকে কি হলো আজ কিছুই বুঝি না।
সাগরের জলে মিশবে আজ সকল ভালোবাসা
মুছে যাবে হৃদয়ে জমে থাকা যত দুঃখ গাথা।
রেখে গেলাম তোমার জন্য গোলাপের থোকা
নিয়ে গেলাম যন্ত্রণার মত বিঁধে থাকা কাটা।
বুকের মাঝে গেঁথে গেলাম নতুন কোন আশা
পর জনমে হয় যেন তোমার সাথে দেখা।
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
প্রেমমূলক
|
বেঁচে থেকেও মরে গেছি
মরবার নেই কোন ভয়,
হেরে গিয়েও বেঁচে আছি
হারবার আর কিছু নেই।
যা হারাবার তাই হারিয়েছি
দুঃখগুলো রয়েছে পাশে,
ভালোবাসা হৃদয়ে ছিল
হৃদয়েই যতনে আছে।
চোখ দুটো তাকিয়ে ছিল
এখনও তাকিয়েই আছে,
ঘুমের ঘরে স্বপ্নগুলো
শুধু দুঃস্বপ্ন হয়ে আছে।
মেঘের আড়ালে চাঁদটি
এখনও লুকোচুরি খেলে,
বৃষ্টিগুলো হঠাৎ করে
চোখ ভাসিয়ে মারে।
বাগানের ফুলগুলো সব
এখনও বাতাসে দোলে,
ভোমরা আসেনা বলে
মধুগুলো শুকিয়ে মরে।
তীর্থের কাক চেয়ে থাকে
শুন্য কলসির দিকে,
জল ছাড়া নদী যেমন
শুকিয়ে শুকিয়ে মরে।
ঝাকে ঝাকে পাখি আসে
সন্ধায় ফিরে নীড়ে,
দুঃখগুলো এভাবেই আসে
যায় নাকো আর ফিরে।
পথের ধারে পথিক যেমন
হাটে আকাবাকা পথ ধরে,
আমি হাটতেছি সেভাবে
কোন এক অচেনা গন্তব্যে।
যদি দেখা হয় কোনদিন
জীবনের কোন এক বাকে,
বলবো কথা সেদিন আমি
তোমার শনে কানে কানে।
তোমার মুখের হাসিতে আমি
হারিয়ে যাব অতি গোপনে,
হৃদয়ের সাথে হৃদয় মিলাবো
ভাসাবো অশ্রুর প্লাবনে।
মরে গিয়েও বেঁচে থাকবো
তোমার হৃদয়ের গভীরে,
যতন করে রেখো তুমি
জনমের পর জনম ধরে।
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
প্রেমমূলক
|
মায়া ভরা হৃদয়টি যার
সে আমার মা।
কত স্নেহ করতো আমায়
মনে পড়ে তা।
মনে কোন কষ্ট থাকলেও
বুঝতে দিত না।
হাসি ভরা মুখটি তার
দেখলে জুড়াত গা।
হাত এগিয়ে বলত আমায়
আয়রে কোলে খোকা।
মুখে দু’টি চুমো দিয়ে
বলত কত কথা।
অসুখ-বিসুখ হলে কোন সময়
টিপে দিত হাত-পা।
সরিষার তেল মেখে আমার
গরম করত গা।
ছেলের কোন কষ্ট দেখলে মায়ের মুখে
হাসি থাকত না।
সারা রাত পাশে বসে থাকত
ঘুম আসত না।
সারা দিন কত পরিশ্রম
করত আমার মা।
শত পরিশ্রমের পরেও মায়ের
ক্লান্তি আসত না।
এত কাজের পরেও মা
নামাজ মিস করত না।
নামাজ পড়ে আবার কাজে
ভিজে যেত সমস্ত গা।
কোথায় গেলি আয়রে খোকা
ভাত খেয়ে যা।
যতক্ষণ না আসতাম খেতে
ডাক থামতো না।
পাশে বসে খাওয়াত ভাত
আর একবার কর হা।
পেট ভরে খেলে ভাত
অসুখ করবে না।
হাটে থেকে ফিরত বাবা
বাজারের ব্যাগ নিয়ে।
সকল বাজার রেখে আবার
বাবাকে বাতাস করত মা।
হাত মুখ ধুয়ে এসো
ক্ষুধা লাগছে না?
বাবাকে ভাত খেতে দিয়ে আবার
ফিরেতে বসে থাকত মা।
যতক্ষণ না ভাত খাওয়া হত বাবার
কোথাও যেত না।
কান্নায় যখন চোখ ভিজাতাম
দৌড়ে আসত মা।
আচল দিয়ে চোখ মুছে দিয়ে বলত
কি হয়েছে খোকা?
হাসি ভরা মুখে তখন
চুমো দিত মা।
মায়ের আদর পেয়ে তাই
কান্না থাকত না।
আজকে শুধু পরছে মনে
মায়ের সকল কথা।
এত আদর কোথায় পাব
মায়ের হাত ছাড়া।
মায়ের কথা লিখব কত আর
শেষ হবে না।
পুরো শরীরের চামড়া উঠিয়ে দিলেও
শোধ হবে না।
যাহার কাছে এত ঋণী
সে আমার মা।
চোখ ভেসে যায় জলে আমার
কান্না থামে না।
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
প্রেমমূলক
|
আমি চাইনি এভাবে বিদায় নিতে
চাইনি মায়া ভরা ঐ দু চোখে অশ্রু ঝরাতে
চাইনি বেচে থেকে দূরে থাকতে
এক পলক দেখার জন্য আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে
চেয়েছি সকাল বেলা শিশির ভেজা ঘাসে পা ভিজাতে।আমি চাইনি এভাবে অপেক্ষা করতে
চাইনি বাশ বাগানের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া
অচেনা পথের দিকে চেয়ে থাকতে
ধুসর কোন ওড়না জরানো নারীর জন্য বসে থাকতে
চেয়েছি বৃষ্টিভেজা দুপুর বেলা আনন্দে ভিজতে।আমি চাইনি মরা কোন নদীর বুকে হাটতে
চাইনি গরম বালিতে পা পুড়তে
চাইনি গলা শুকিয়ে মরতে
জলের তৃষ্ণায় হাহাকার করতে
চেয়েছি ঝর্ণায় ফুলে ফেপে ওঠা পানিতে হাবুডুবু খেতে।আমি চাইনি দুঃখের সঙ্গি হতে
চাইনি রাতের বেলা কপালে হাত দিয়ে বসে থাকতে
চাইনি মনে মনে দুঃস্বপ্ন দেখতে
ঘুমের মধ্যে হঠাৎ জেগে উঠতে
চেয়েছি আলত ভিজা ঠোটে ঠোট মিলাতে।আমি চাইনি চাঁদনী রাতে একা একা বসে থাকতে
চাইনি আলো ভরা জ্যোৎস্নার মাঝে নিরবে কাঁদতে
চাইনি রাত জাগা পাখির মত জেগে থাকতে
অন্ধকারের মাঝে তোমাকে খুজতে
চেয়েছি মরুভুমির বুকে বৃষ্টি নামাতে।আমি চাইনি পথ হারা পথিক হতে
চাইনি বাকা পথে হাটতে
চাইনি পাথর দিয়ে বুক চাপা দিতে
কাটা তারে আবদ্ধ থাকতে
চেয়েছি পাথরের বুকে ফুল ফুটাতেআমি চাইনি নদীর মাঝ থেকে ফিরে আসতে
চাইনি হেরে গিয়ে বেচে থাকতে
চাইনি ব্যর্থতার লজ্জায় মুখ ঢেকে রাখতে
না বলা কথাগুলো বুকে চেপে রাখতে
চেয়েছি শুধু দুটি নদীর মোহনায় একসাথে ভাসতেআমি চাইনি গোলাপের কাটায় রক্তাক্ত হতে
চাইনি শুকনো পাতার মরমর শব্দ শুনতে
চাইনি রোদেলা দুপুরে রোদে পুরতে
তীব্র শীতে ঠোঁট ফাটাতে
চেয়েছি নিশি রাতে এক সূরে গান গাইতে।আমি চাইনি তোমার পথের কাটা হতে
চাইনি দুজন দুদিকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে
চাইনি কোন দিন তোমাকে হারাতে
নিরবে বুক ফেটে কাঁদতে
চেয়েছি শুধু দুটি হৃদয়ের মাঝে ঝর্ণা ঝরাতে।।
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
মানবতাবাদী
|
যে জাতি একবার জ্বলে বার বার নিভে না
সে জাতি কেমন করে সহে সন্তান হারা,
সাদা শাড়ি পড়া ধর্ষিতা মায়ের বেদনা?
এ জাতি কি ভুলে গেছে স্বাধীনতার কথা
এ জাতি কি ভুলে গেছে ত্রিশ লক্ষ শহীদের
রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বীরত্ব গাঁথা?
জাতির কাছে প্রশ্ন যে মায়ের চিৎকারে সেদিন
ভারি হয়ে উঠেছিল বাংলার আকাশ বাতাস
কেঁপে উঠেছিল সমস্ত পাখীদের আবাস
কি করে আজ সেই মায়ের ধর্ষিতারা
মাথা উচু করে চুষে খাচ্ছে দেশের যত রস?
ইতিহাসের সাক্ষী বাংলার আকাশ বাতাস
ইতিহাসের সাক্ষী বাংলার উর্বর পলি মাটি
যে মাটিতে মিশে আছে আজ বাংলার
ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের দাগ,হাড়,মাংস
এর চেয়ে আর কি প্রমাণ দিব বিবেকের কাছে?
টাকা আর ক্ষমতার কাছে মলিন হয়ে গেছে
এ দেশের ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের দাগ।
রাজাকার আর আলবদরদের গাড়িতে ভাসে
ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত আর দু লক্ষ মা বোনের
সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার পতাকা
আমি আর লজ্জায় মাথা তুলতে পারছিনা
এ মুখ কি করে দেখাব সেই মা বোনদের কাছে?
যে স্বাধীনতার জন্য একদিন আমার দেশের
ধর্ষিতা মায়েরা আবার মাথা তুলে দাড়িয়েছিল
পৃথিবীর মাঝে জেগে উঠা রক্তের দাগ মিশানো
একটি লাল সবুজ পতাকার মাঝে
সেই পতাকা আজ কি করে গেল
সেই লজ্জাহীন কুলাঙ্গার মানুষের হাতে?
ওদের জানিয়ে দাও এদেশ ওদের জন্য নয়
যাদের নেই কোন বংশ পরিচয়
ওরা কোথায় জন্মেছে?যে মায়ের গর্ভে জন্মে
আবার কেড়ে নিয়েছে সেই মায়ের সম্ভ্রম
ওরা মানুষ নয়, ওদের নেই কোন পরিচয়
ওরা পশু ওরা মানুষের রক্ত পিপাশু।
এ দেশের মাটিতে জন্মে আবার
এ দেশের মাটির সাথে বেঈমানি
কি করে এ দেশের মাটি আবার ওদের গ্রহন করবে
এ দেশের মাটি ওদের প্রিয় নয়
মায়ের চেয়ে প্রিয় যে দেশ ওদের
সে দেশে পাঠিয়ে দাও ওরা সেখানে মরলে
গর্বিত হবে ওদের আত্মা
ওদের সেই দেশে পাঠিয়ে দাও
ওরা বাংলার শত্রু ওরা ধর্মের শত্রু
ওরা ধর্ম কে দাড় করিয়েছে অস্ত্র হিসেবে।
সে দিন বাংলার মায়ের সন্তানের লাশের গন্ধে
ভারি হয়ে উঠেছিল এ দেশের আকাশ বাতাস
শুকুন আর কুকুরের মুখে ছিল আমার ভাইয়ের
পচে যাওয়া দুর্গন্ধ লাশ
নগ্ন শরীরে মাটিতে মিশেছিল আমার বোনের সম্ভ্রম
কোথায় ছিল সেদিন এই ধর্মের কথা?
ধর্ম কি কখনও বলেছে আমার মা বোনের
সম্রম মাটিতে লুটিতে দিতে?
ওদের লজ্জা নেই ওরা মানুষ নয়
ওরা মানুষ নামে পশুর নামান্তর।
ওদের যদি মানুষ বলা হয় তাহলে আমি মানুষ নই
মানুষ কখনও মানুষের শরীরের মাংস কে
কুকুর আর শুনুনের খাদ্য বানাতে পারে না।
ওরা পেরেছিল, ওরা এখনও পারে
কারন ওরা মানুষ নয়, ওরা জানোয়ার।
আমি আর পারছি না, আমার বিবেক প্রশ্ন করে
আমার পুরো শরীর কথা বলে
আমি আজ সেই স্বামী হারা, সন্তান হারা
বিধবা মা বোনদের কাছে কি জবাব দেব?
নর পশুদের বীর্যে সেদিন জন্ম হয়েছিল জারজ সন্তান
ওদের কাছে আমি আজ কি উত্তর দিব
ওরা যদি জানতে চায় ওদের বাবা মায়ের পরিচয়?
ওরা যদি জানতে চায় ওদের জন্ম কোথায়।
আজ ওরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিশ্বের
কিছু উদার মানুষের মাঝে , যারা সেদিন
গ্রহন করেছিল ধর্ষিতা মা বোনের গর্ভে
জন্ম হওয়া সন্তানের পরিচয়।
এ দেশের মানুষ কে বলি,
এ দেশের কিছু শিক্ষিত বিবেক কে বলি
কি করে সেই দানবেরা আবার আঁকড়ে আছে
আমার সেই ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে ঝারা
পবিত্র মাটির সাথে ?
আমি চিৎকার করে বলতে পারি ওরা কোন দিন
এ দেশকে দাবিয়ে রাখতে পারবেনা
ওরা পরাজিত ওরা,ওরা আমার বোনের শত্রু
ওরা আমার জন্মধাত্রী মায়ের শত্রু, ওরা দেশের শত্রু।
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
প্রেমমূলক
|
তুমি ফিরে এসো
ঐ দূর আকাশের রোদ্র হয়ে
চারিদিকে আলোকিত করে
এই হ্নদয়ের সকল ধোয়াশা দূর করে।
.
তুমি ফিরে এসো
ঐ দূর আকাশে কুয়াশা হয়ে
নির্জন অন্ধকারে অতি গোপনে
আমায় ছুয়ে দিতে।
.
তুমি ফিরে এসো
ঐ দূর আকাশের বৃষ্টি হয়ে
চারিদিকে ভিজিয়ে দিয়ে
আমার হ্নদয় খানি সতেজ করে।
.
তুমি ফিরে এসো
ঐ অথৈই সাগরের জল হয়ে
চারিদিক প্লাবিত করে
আমার পুরো হ্নদয় ভরে।
.
তুমি ফিরে এসো
ঐ রাত্রি বেলার অন্ধকার হয়ে
নির্জনে বলব কথা
অতি গোপনে গোপনে।
.
তুমি ফিরে এসো
দূর বিদেশের অতিথি পাখি
কত আপ্যায়ন করবো তোমায়
অনেক দিন পরে পেয়ে।
.
তুমি ফিরে এসো
বসন্তের কোকিলের গানের সূরে
শুনব তোমার মধুর সূর
হ্নদয় মন পুলকিত করে।
.
তুমি ফিরে এসো
ঐ দূর আকাশে চাঁদ হয়ে
সারা রাত দেখব তোমায়
আকাশের দিকে তাকিয়ে।
.
তুমি ফিরে এসো
ঐ জ্যোৎস্না রাতের জোনাকি হয়ে
দু’হাত দিয়ে ধরে রাখব তোমায়
জীবন জীবনের তরে।
.
তুমি ফিরে এসো
ঐ দূর বন-জঙ্গলের পাখি হয়ে
মনের খাঁচায় রাখব তোমায়
আজীবন বন্দি করে।
.
তুমি ফিরে এসো
ঐ ফুলের বাগানের গন্ধ হয়ে
সুভাষিত গন্ধে আমার
হ্নদয় খানি যাবে ভরে।
.
তুমি ফিরে এসো
চুর্ন বিচূর্ন এই হ্নদয়ে
ভাঙ্গা মনে লাগবে জোড়া
কোন দিনও যাবেনা ছিড়ে।
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
প্রেমমূলক
|
একটা ছেলে যখন একটা মেয়েকে নক দেয়, প্রথম দুই একদিন মেয়েটি কিছু না বললেও কয়েকদিন যেতেই মেয়েটি ছেলেটির সাথে খারাপ ব্যবহার শুরু করে দেবে, অপমান করবে, রাগ দেখাবে অথবা ছেলেটির কোনো কথার আর কোনো উত্তর দেবে না। একটা ভদ্র ছেলে কোনোভাবেই এই অপমান সহ্য করতে পারবে না। সে রাগে ঐ মেয়েকে আর জীবনেও নক দেবে না। কিন্তু একটা বাউলা ছেলে বলবে, ‘মেয়েরা প্রথম প্রথম এমনই করে, কয়েকদিন গেলে ঠিক হয়ে যাবে’। সে নিয়মিত নক করেই যাবে। প্রতিদিন নানান রকমের অভিনয় করে কথা বলবে। নানানভাবে ভালোবাসার কথা বলবে। আর সেই অভিনয়গুলো মেয়েটির কাছে দারুণ লাগবে। মনে মনে বলবে, ‘এমন একটি ছেলেই তো চেয়েছিলাম জীবনে। টাকা-পয়সা, যোগ্যতা দিয়ে কি হবে যদি আমাকেই ভালো না বাসে। এরকম ভালোবাসাইতো আমি চেয়েছিলাম। বন্ধু বান্ধবদের কাছে গর্ব করে বলবে, ‘জানিস সে অনেক কেয়ারিং, আমাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না। সারাক্ষণ ফোন দেয়। ঐদিন একটা নীল পাঞ্জাবী পড়ে এসেছিল। কত যে ভালো লেগেছিল। আমিও একটি লাল শাড়ি পড়েছিলাম সেদিন। আমার কাছে মনে হয়েছিল আমরা দুজন যেন স্বামী স্ত্রী। জানিস আমার জন্য কি সুন্দর একটি গিফট এনেছিল। আমিতো দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ঠিক যেন আমার পছন্দের জিনিসটা আমাকে এনে দিয়েছে। হ্যাঁ ওই আমার জীবনের সব, ওই আমার হৃদয়ে বয়ে যাওয়া নদীর কলরব। অন্য কেউ কি আমার মন কি চায় তা বুঝতে পারে’।আরও জানিস ঐদিন আমি শয়তানি করে বলেছিলাম, ‘করিমের বিরিয়ানি’ আমার খুব প্রিয়। কি অবাক কান্ড, বিকেল বেলা হঠাৎ দেখি ও ফোন দিয়েছে। বলল, ‘একটু নিচে আসো’। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন’? সে বলল, ‘আসোনা একটু, আসলেই বুঝতে পারবে’। মোবাইলটা টেবিলে রেখে আব্বু-আম্মুর রুমে গেলাম দেখি আব্বু বাসায় আছে কিনা। দেখলাম আম্মু একা আর আব্বু বাইরে গিয়েছে। আম্মুকে বললাম, ‘আম্মু খুব খুধা লাগছে একটু নিচে যাই কিছু খেয়ে আসি’। আম্মু বলল, ‘ঠিক আছে যা, তাড়াতাড়ি আসিস। তোর আব্বু বাসায় এসে তোকে না দেখলে খুব রাগ করবে’। আমি আম্মুকে বলল, ‘ঠিক আছে আম্মু আমি এখনই চলে আসবো’।ওয়াশরুমে গিয়ে কোনোরকম ড্রেস পাল্টিয়ে অনিকাকে নিয়ে নিচে গেলাম। দূরে থেকেই দেখি নীল পাঞ্জাবী পড়া রহিমের হাতে একটি ব্যাগ। আরও একটু সামনে গিয়ে আমিতো রীতিমতো অবাক। দেখি প্যাকেটের গায়ে লেখা ‘করিমের বিরিয়ানি’। আনন্দে মনটি যেন একবারে ভরে উঠল, হৃদয়ের মাঝে জমে থাকা সকল ভালোবাসা সন্ধ্যা প্রদীপের মতো জ্বলে উঠল। হ্যাঁ এমন একটা বরই তো চেয়েছিলাম আমি। এ যেন আমার স্বপ্নের পুরুষ, নীল পাঞ্জাবীওয়ালা। এর মধ্যেই হঠাৎ আমার মনে হচ্ছিল, আমি পাতায়া সুমুদ্র সৈকতে আছি রহিমের সাথে। রহিম সাগরের জল ছিটিয়ে দিচ্ছে আমার গায়ে আর আমিতো আনন্দে আত্মহারা। যেন স্বর্গে আছি। মনের ঘোর না কাটতেই হঠাৎ রহিম বলল, ‘এ কি তুমি ঐদিকে তাকিয়ে কি ভাবছ’? আমি রহিমের দিকে তাকিয়ে চোখটি একটু বাঁকা করে বললাম, ‘দাও দাও প্যাকেট দাও’। বাহ! ব্যাগের মধ্যে দু’টি বিরিয়ানি। জিজ্ঞেস করলাম, ‘দুটি কেন’? রহিম অনিকার দিকে বাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘কেন? অনিকার জন্য একটা’। অনিকা যেন খুশিতে নাই। অনিকা নিচের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলছে, ‘আল্লাহ আমার জন্যও যেন এমন একটা বর রাখে’। হঠাৎ লক্ষ করলাম অনিকা নিচের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে। সাথে সাথে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিরে অনিকা কি ভাবছিস মনে মনে? বিরিয়ানির প্যাকেটা নে’। আমি এবার রহিমের দিকে তাকিয়ে আবার বললাম দুইটা কেন’? রহিম একটু বিরক্তিসুরে বলল’ ‘বললাম তো আনিকার জন্য একটা’। আমি একটু করুনসুরে বললাম, ‘তোমারটা’? কথাটি শুনে রহিমের মুখটি কেমন যেন মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেল। কিন্তু কিছু বুঝতে না দিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই হেসে দিয়ে বলল, ‘আমি একটু আগেই বাসা থেকে খেয়ে এসেছি’। ও বুঝতে দিতে না চাইলেও ওর চেহারা দেখেই আমি বুঝতে পারলাম ওর পকেটে হয়তো টাকা কম ছিল। টাকা নেই পকেটে তারপরেও একটি নয় দুটি বিরিয়ানি এনেছে। খুব মায়া হলো রহিমের জন্য। ভালোবাসায় হৃদয়টি ভরে গেল। মন চেয়েছিল বিরিয়ানির প্যাকেটটি খুলে নিজের হাত দিয়ে ওকে একটু খাইয়ে দেই। কিন্তু বাসার নিচে দাঁড়িয়ে খাওয়াতে গেলে কেউ দেখে ফেললে সমস্যা হবে। আম্মুতো ওর কথা জানে না তাই ওকে বাসায়ও আসতে বলতে পারলাম না। নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। কপালে কুয়াশার মতো কয়েকফোটা ঘাম জমে গেল। বাম হাতের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে সেই ঘাম মুছতে মুছতে তাকিয়ে রইলাম রহিমের মুখের দিকে। রহিমও তাকিয়ে রইল আমার দিকে। দুজনের মায়াভরা চারটি চোখের মিলন কোনোভাবেই যেন বিচ্ছেদের সুর শুনতে চাচ্ছে না। কিন্তু চারদিকের পরিবেশ হাত নেড়ে বলছে, যে যার মতো বাসায় চলে যাও। জীবনে মনে হয় কোনোদিন এত অসহায় লাগে নি। যেকোনো মুহুর্তে বাবা চলে আসতে পারে তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও রহিমকে বিদায় দিয়ে বাসায় ঢুকতে হলো। ফেরার সময় বারবার পিছনের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম আমার বাবুটিও যেন যেতে চাচ্ছে না। তার চোখমুখ লাল হয়ে গেছে। জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আসলে রহিমকে বাবু বলে ডাকার অন্য একটি কারণ আছে তা পরে বলবো। বাসায় ঢুকে বারান্দায় গিয়ে আবার বাইরের দিকে তাকালাম দেখলাম রহিম এমনভাবে হাটছে যেন ১০৫ ডিগ্রী জ্বরে আক্রান্ত কোনো যুবক হেঁটে যাচ্ছে। রহিমের চেহারা এখন আর তেমন বুঝা যাচ্ছে না। হেঁটে হেঁটে যেন ভোরবেলার কুয়াশার মতো রাস্তার সাথে মিলিয়ে যাচ্ছে। তবে মাঝে মাঝেই আমাদের বাসার দিকে তাকায়। এসময় আমি আমার ডান হাতে একটু চুমু দিয়ে হাতটি রহিমের দিকে ছুড়ে দিলাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম হাতের উপর কয়েকফোটা জল। এরমধ্যেই আম্মু রুমে এসে বলল, ‘তোর চোখে জল কেন’? আমিতো থতমত খেয়ে গেলাম। সাথে সাথে ওড়না দিয়ে চোখের জল মুছে একটি হাচি দিয়ে বললাম, ‘হাচি আসছিল আম্মু’। কিন্তু আমার বুবুটার জন্য বুকের মধ্যে কেমন যেন চিনচিন করছিল। পদ্মা মেঘনার ঢেউ যেন আছরে পরে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছিল আমার হৃদয়ের সকল অবয়ব।প্রায় পাঁচ ছয় মাস পরে প্রিয়তি তার সেই বান্ধবী সাগরীকাকে বলল, ‘দোস্ত একটা কথা’। সাগরীকা বলল, ‘কি কথা বল’। প্রিয়তির মুখে মেঘের ভার, কপালে বিন্দু বিন্দু জল। সাগরীকা প্রিয়তির মুখের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আর মনে মনে বলল, ‘যেই প্রিয়তির সাথে দেখা হলে রহিমের কথা বলতে বলতে হাসিতে মেতে উঠত, আর আজ কি অসহায় তার চোখ, কি অসহায় তার মুখ’। সাগরীকা প্রিয়তিকে জিজ্ঞেস করলো, ‘কি রে তোর মন খারাপ কেন? তোর চেহারার এমন অবস্থা কেন’? এসময় প্রিয়তি সাগরীকাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। সাগরীকাও আর নিজের চোখের জল ধরে রাখতে পারলো না। এরপর সাগরীকা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে নিজের ওড়না দিয়ে প্রিয়তির চোখ মুখ মুছে দিয়ে বলল, ‘কি হয়েছে বল’। প্রিয়তি ভাঙ্গা কন্ঠে করুন সুরে বলল, ‘কিছু হয়নিরে সাগরীকা তবে অনেক কিছুই হয়ে গেছে, আজ আর তোর সহায়তা ছাড়া আমার মুক্তি নেই’। সাগরীকা বলল, ‘তোর সেই বাবুটা কই’? এই কথাটি প্রিয়তির বুকের মধ্যে যেন তিরের মতো বিদ্ধ হলো। প্রিয়তির ঠোঁট কাঁপছে। কিছু বলতে চায় কিন্তু আবার ফিরিয়ে নেয়। এরপর অনেক কষ্টে মুখ খুলল প্রিয়তি, ‘তুই বুজি আজ আমাকে কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিচ্ছিস’। সাগরীকা বলল, ‘এই কথা কেন বলছিস? এতদিন তো আমাদের একটু সময়ও দিতি না। ক্লাশ শেষ না হতেই বাবুকে নিয়ে বের হয়ে যেতি। আগেতো বাসায় গিয়েও অনেক ফোন দিতি। বলতে পারবি তিন চার মাসের মধ্যে ভুলেও একবার আমাকে ফোন দিয়েছিস’? সাগরীকার কথায় প্রিয়তির বুকটি যেন ঝাজড়া হয়ে রক্ত বের হয়ে যাচ্ছে। সাথে প্রিয়তির পেটের মধ্যে জন্ম নেওয়া তিন চার মাসের ভ্রুনটিও যেন বের হয়ে যেতে চাচ্ছে। প্রিয়তি মনে মনে বলছে, ‘বের হয়ে যাক পেটের মধ্যে থেকে, তাহলে সকল আপদ মুক্ত হতো’। প্রিয়তির চোখে আবার ঝর্নার মতো জল দেখে সাগরীকা নিজের ভুল বুঝতে পেরে বলল, ‘সরি দোস্ত আসলে আমি বুঝতে পারিনি তোর মনে এত কষ্ট। আমাকে ক্ষমা করে দিস। কি হয়েছে তোর, আমাকে সব খুলে বল’।প্রিয়তি কাপাকাপা কন্ঠে বলল, ‘আমাকে একজন গাইনি ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবি? আমার খুব লজ্জা করছেরে সাগরীকা, তুই আর আমাকে লজ্জা দিছ না’। এই বলে প্রিয়তি তার সামান্য উঁচু হওয়া পেটটিতে হাত দিয়ে দেখালো। সাগরীকার আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না। শুধু মনে মনে বলল, ‘আহারে প্রিয়তির সেই আদরের বাবুটিও আজ বাবুর বাবা হতে চলছে’। এরপর সাগরীকা প্রিয়তিকে বলল, ‘তোর সেই বাবুটিকেও ডাক একসাথে যাই ডাক্তারের কাছে’। প্রিয়তি একটি দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল, ‘তুই আর বাবু বাবু ডেকে আমাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিছ না। বাবু এখন আর বাবু নেই। আমাকে একটি বাবু দিয়ে সে চলে গিয়েছে। সে এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। তাকে এখন বাবু ডাকলে অপমান করা হবে। এখন অন্য কেউ তাকে বাবু ডাকে না, বর বলে ডাকে। আর সে এত তাড়াতাড়ি বর না হলেও বাবু বাবু ডাকার মতো নারীর এখন কি তার অভাব আছে’? সাগরিকা বলল, ‘আর তুই’? প্রিয়তি বাম হাত দিয়ে চোখের জল মুছছে আর ডান হাত সেই উচু পেটে রেখে বলল, ‘আমি এখন আর আমার বুকের সন্তানকে নষ্ট করবো না। আমি এই বুকের সন্তানকে নিয়েই স্বপ্ন দেখবো। ওকেই আমি বাবু বাবু ডেকে জীবনটা পাড় করে দেবো। এটাই আমার সান্ত্বনা’। সাগরীকা প্রিয়তির কথা যতই শুনছে ততই অবাক হয়ে হচ্ছে। কিছুক্ষন নীরব থেকে বলল, ‘তোর আসল বাবুরই খবর নেই আর এই নতুন বাবুকে বুকে নিয়ে কি কলঙ্কের ভার আরো ভারী করতে চাস? সাগরীকার কথায় প্রিয়তির লাল চোখ আরো লাল হতে লাগল। রক্তাক্ত চোখেই সাগরীকার দিকে তাকিয়ে প্রিয়তি বলল, ‘এটা আমার ভালোবাসার ফসল, ভালোবাসার ক্ষেত্রে কলঙ্ক বলতে কিছু নেই। আর কলঙ্ক যদি হয়েই থাকে হোক তাতে কি আমি এই কলঙ্ক মাথায় নিয়েই বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিতে চাই। আমি যে জীবনে কাউকে ভালোবেসছিলাম, কারো কাছে ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছিলাম তার একটু স্মৃতি বা চিহ্ন হলেও থাক আমার বুকে। স্মৃতির মাঝেতো একটু ক্ষত থাকবেই। সাগরীকা প্রিয়তিকে অনেক বোঝালো তারপর প্রিয়তি রাজী হলো অনাগত সন্তানটি এবরশন করার জন্য। এর কয়েকমাস পর নিউজ পেপারে একটি হেডলাইন হলো, “রাস্তার উপর ব্যাগে মোড়ানো জীবন্ত শিশু”। খবরটি মুহূর্তের মধ্যেই ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেল। সেই নীল পাঞ্জাবীওয়ালা বাবুটিও খবরটি তার নিজ আইডিতে শেয়ার করে লিখলো, ‘কিয়ামত খুবই সামনে চলে আসছে’। তার এই স্ট্যাটাস দেখে প্রিয়তীর বান্ধবী সাগরীকা হাহা রিএ্যাক্ট দিলো। কিন্তু নীল পাঞ্জাবীওয়ালা বাবুটি কিছুই বুঝতে পারলো না। আর প্রিয়তি তো তার সেই প্রিয় বাবুটির ব্লক লিস্টেই আছে। সাগরীকা প্রিয়তিকে নীল পাঞ্জাবীওয়ালার স্ট্যাটাস স্কীনসট দিয়ে দেখালো। প্রিয়তি স্কীনসট দেখে চোখে একফোটা জলও আনলো না। শুধু তাকিয়ে রইল স্কীনসটের উপরে গোলাকার ছোট্ট একটি ছবির (প্রোফাইল পিকচার) উপর। এই সেই নীল পাঞ্জাবীপড়া ছবি যা দেখে সে বাবুটিকে নিজের বর হিসেবেই ভেবে নিয়েছিল। এসময় প্রিয়তিও তার প্রোফাইলে লাল শাড়ি পড়া ছবিটি দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
প্রেমমূলক
|
আমার ভাবনার মাঝে তোমার ছায়া
প্রতি ছায়া হয়ে থাকে।
আমার চোখের মাঝে তোমার ছবি
অবিরাম ভেসে উঠে।
আমার কানের মাঝে তোমার সূর
এখনও বেঝে উঠে।
আমার হাতের সাথে তোমার স্পর্শ
এখনও শিহরন জাগে।
আমার আকাশ তোমার জন্য এখনও
মেঘে ঢাকা থাকে।
আমার চলার পথ তোমার আশায়
এখনও থেমে থাকে।
আমার হৃদয়ে তোমার জন্য এখনও
ঝর্ণা বয়ে আছে।
আমার দেহের রক্ত মাংস তোমার জন্য
এখনও জমে আছে।
আমার মুখখানি তোমার জন্য এখনও
মলিন হয়ে আছে।
আমার সাগরের জল তোমার জন্য
বৃষ্টি হয়ে ঝরে।
আমার চারিদিক তোমার জন্য এখনও
অন্ধকারে ঘিরে রেখেছে।
আমার প্রতিটা সকাল তোমার আশায়
বুক বেঁধে থাকে।
আমার প্রতিটা দিন তোমার জন্য
অন্ধকার হয়ে থাকে।
আমার প্রতিটা সন্ধ্যা পাখির মত
নীড়ের আশায় থাকে।
আমার প্রতিটা রাত তোমার জন্য
এখনও নির্ঘুম কাটে।
আমার সকল স্বপ্ন তোমাকে নিয়েই
এখনও বুনে আছে।
আমার বুকের শূন্য জমি তোমার জন্য
এখনও পড়ে আছে।
আমার মনের সমস্ত চিন্তা তোমাকে নিয়েই
এখনও ঘিরে আছে।
আমার হৃদয়ের সকল কথা তোমার জন্য
এখনও জমে আছে।।
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
প্রেমমূলক
|
এত রূপ তোমার কি করে তোমায় ভুলি?
সারাক্ষণ তাই দু’চোখ মেলে তোমায় দেখি।
হৃদয়ের ডায়রিতে রঙ তুলি দিয়ে তোমারি ছবি আঁকি
যেন যেতে নাহি পার কোন দিন আমায় ছাড়ি।
যেদিকে তাকাই সেদিকেই দেখি তোমারি ছবি
মনের জানালা খুলে তোমারি কথা ভাবি।
তুলসী পাতার মত নরম তোমার ঐ হাত খানি
মন চায় সারাক্ষণ হাতটি ধরে রাখি।
বল কি করে তোমায় ভুলতে পারি?
যখনি দেখি তোমার কাজল কাল আঁখি
পারিনা সরাতে চোখের নজর, বল কি করি আমি?
সারারাত এই ভেবে টলমল করে আখি
বুকভরা ভালবাসা নিয়ে তাই তোমারি আশায় থাকি।
দুনিয়ার যত মায়া মমতা নিয়ে তোমারি কাছে আসি
বল কি করে ছেড়ে যাবে আমায় তুমি।
তোমার মিষ্টি মাখা কোমল ঠোঁট দুটি
কেড়েছে নজর আমার, ভরেছে হৃদয়খানি।
যতদিন বেঁচে থাকি পারবোনা ভুলতে তোমায় আমি
তাইতো হৃদয়ের ডোরে বেধে রাখব তোমায় চিরদিনি।
যতদূর চোখ যায় তোমাকে ছাড়া কি ই বা দেখি
বল কি করে তোমায় ভুলতে পারি?
মায়া ভরা মন জুড়ানো তোমার সেই হাসি
মন চায় বারে বারে তোমারি কাছে চলে আসি।
তুমি আমার মনের বাগানে ফুটে থাকা গোলাপগুলি
সুভাসিত ঘ্রাণে তাই হয়েছি পাগল আমি।
এত রূপ তোমার কি করে তোমায় ভুলি?
সারাক্ষণ তাই দু’চোখ মেলে তোমায় দেখি।
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
প্রেমমূলক
|
যদি কখনও জোৎস্না রাতে
আমার কথা মনে পড়ে
এত তাঁরার মাঝে আমায়
কিভাবে খুজে নিবে?
আমি তখন মিশে যাবো
সকল তারার মাঝে,
শত চেষ্টা করেও তুমি
আমাকে পাবেনা কো খুজে।
যদি হন্য হয়ে ঘুর তুমি
অন্য কোন গ্রহে,
যেথায় যাও সেথায় তুমি
পাবেনা কো খুজে।
যদি যাও মঙ্গল গ্রহে
আমার দেখা পেতে
আমি তখন মিশে যাবো
মঙ্গল গ্রহের সাথে।
মঙ্গল গ্রহে না পেয়ে যদি
চলে যাও চাঁদে,
চাঁদেও আমায় পাবেনা কো
ফিরবে খালি হাতে।
পৃথিবীতে ফিরে আবার তুমি
আমায় খুজতে থাক
খবর পাবে আমি নেই আর
এই পৃথিবীর মাঝে।
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
প্রেমমূলক
|
নিরিবিলি বলছি কথা
তোমার পাশে বসে
একা একা বলছি কথা
তোমার কানে কানে। নিরিবিলি ভাবছি একা
তোমার হৃদয়ে বসে
একা একা বলছি কথা
তোমায় ভালবেসে।নদীর ধারে বসে একা
আঁকছি তোমার ছবি
মনে মনে ভাবি তোমায়
পরান ভরে দেখি।জ্যাৎস্না রাতে চেয়ে আছি
দূর আকাশের দিকে
তোমায় খুজি ঐ আকাশে
লক্ষ তাঁরার মাঝে।পুকুরে পরছে গাছের ছায়া
তাকিয়ে থাকি সেখানে
তোমায় খুজি ঐ ছায়াতে
শাড়ীর আঁচলে।কোকিল ডাকে বন-জঙ্গলে
কুহুকুহু করে
তোমায় খুজি সুরের মাঝে
জাইগো হারিয়েমেঘ জমেছে দূর আকাশে
যায়যে এদিক-ওদিক চলে
তোমার খুজি মেঘের মাঝে
তাকিয়ে অবুঝ চোখে।
|
রেদোয়ান মাসুদ
|
প্রেমমূলক
|
মনে পড়ে তোমাকে
চোখের প্রতিটি পলকে
নিঃশ্বাসে, বিশ্বাসে
এ দেহের প্রতিটি রক্ত বিন্দুতে।মনে পড়ে তোমাকে
চলার পথে
প্রতিটি কাইকে কাইকে
এ দেহের প্রতিটি হাড়ের সন্ধিতে।মনে পড়ে তোমাকে
হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে
আবেগে, অনুভবে
চোখের প্রতি ফোটা অশ্রু বিন্দুতে।মনে পড়ে তোমাকে
আকাশে বাতাসে
মেঘের ঘর্ষণে তৈরি
বিদ্যুৎ চমকানো বিকট শব্দতে।মনে পড়ে তোমাকে
জলে স্থলে
সাগর থেকে উঠে আসা
প্রতিটি ঘূর্ণি বাতাসে ।মনে পড়ে তোমাকে
ঘরে বাহিরে
আলো অন্ধকারে
দিবা রাত্রির প্রতিটি গোধূলি লগনে।মনে পড়ে তোমাকে
রক্তের প্রতিটি কম্পনে
হাসি কান্নাতে
এ দেহের প্রতিটি পরোতে পরোতে।মনে পড়ে তোমাকে
ভোর রাত্রির পাখির কলকাকলিতে
দূর্বা ঘাসের উপর পরা
প্রতি ফোটা শিশির বিন্দুতে।
|
কৃষ্ণা বসু
|
চিন্তামূলক
|
ব্যস্ত সমাজের থেকে কবিতার নির্বাসন হয়ে গেছে কবে।
সফল ও সুখী মানুষেরা আজকাল কবিতার ধারও ধারে না,
তারা সকলেই সবকিছু বোঝে, বোঝে জীবনবীমার গল্প;
বোঝে হাসিখুশি, সুড়সুড়ি-মাখা, টিভি সিরিয়াল;
বোঝে ঝোপ বুঝে কোপ মারা, বোঝে হর্ষদ মেহেতা,
বোঝে কতখানি ধান থেকে জন্ম নেয় ঠিক কতখানি চাল,
শুধু কবিতা বোঝে না, বোঝে না যে তার জন্য
লজ্জা নেই কোনও,
সুপ্রাচীন সুতীব্র আর্তিতে ভরা মায়াবী শিল্পের দিক থেকে
সম্পূর্ণ ফিরিয়ে পিঠ বেশ আছে সুসভ্য প্রজাতি।
শুধু মাঝে মাঝে খুবই নির্জনে কোনও এক পবিত্র মুহূর্তে
প্রাণের ভিতর দিকে বেজে ওঠে বাশিঁ, অলৌকিক সেই বাশিঁ।
রন্ধনে ব্যসনে ব্যস্ত সুখী গৃহকোণ কেঁপে ওঠে,
বিস্মৃতা রাধার সমস্ত হৃদয় জুড়ে কোটালের বান ডাকে
উথাল পাথাল, খুব মাঝে মাঝে এরকম হয়, হয় নাকি?
ভুলে যাওয়া অতিপূর্ব প্রপিতামহের মতো রক্তের
ভিতরে ঢুকে পড়ে
কবিতার অসম্ভব বীজগুলি প্রতিশোধ নেয়।
সব কিছু সমস্ত অর্জন সুখ-স্বস্তি-স্বচ্ছলতা অর্থহীন মনে হয়।
বাশিঁ ডাকে, বাশিঁ বাজে, সেই বাশিঁ বাজে,
জীবন আচ্ছন্ন করা বাশিঁ বাজে যমুনা-পুলিনে।
|
বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
|
প্রেমমূলক
|
দাঁড়িয়ে থাকে পাহাড়-চাপা দিন
চাঁদের মতো স্বপ্ন সরে যায়
রোপওয়ে ধরে পৌঁছে যাই আমি
মোহনা থেকে অন্য মোহনায়লবণহ্রদে মিষ্টি ঘর বাড়ি
আকাশে উড়ে ল্যাংড়া কোনো ঘোড়া
বাঁকুড়া থেকে কিনেছি কম দামে
হাত-পা-মাথা শিল্প দিয়ে মোড়াশিল্প দিয়ে ধুয়েছি চোখ মুখ
শিল্প মেখে খেয়েছি কত ভাত
মধ্যিখানে শিল্প ছিল বলে
এড়িয়ে গেছি অনেক সংঘাতঅহিংসাই গর্ভ থেকে তাও
পায়ের নীচে জন্ম নিল ঘাস
আমাকে তুমি জন্তু ভেবেছিলে
তোমাকে আমি ভাবিনি মিনিবাসকখনো তাই দেইনি রুট ম্যাপ
বলেছি—যাও, ইচ্ছে মতো ঘোরো
শুধু তাই নয় যৌন কাতরতা
কাতর হয়ে রয়েছে অন্তরওশূন্য মুখে চুমু খাওয়ার স্মৃতি
তাকেও তাড়া করছে নিশিদিন
ক্লান্ত ভেবে দিয়েছি যাকে জল
তৃষ্ণা তাকে করেছে ক্ষমাহীনচেয়েছি চাল ক্ষমার মতো করে
পেয়েছি পোকামাকড়, লতাপাতা
দেয়াল ছুঁয়ে বুঝেছি ইঁটগুলো
কয়েদিদের ভাগ্য নির্মাতাবন্দিদশা কামড়ে ধরো দাঁতে
প্রণাম করো নির্মাতার পায়ে
তোমাকে আমি বিস্কুটের মতো
ডুবিয়ে নেব ডাবল-হাফ চায়েচামচে দিয়ে তুলব তারপরে
দেখব তুমি নরম নাকি শক্ত
ভালোবাসার অন্য মানে নেই
রক্তে শুধু মিশতে থাকে রক্তরক্তবীজ তোমারই সন্তান
সম্পর্কে আমারও কেউ হয়
চালালে ছুরি ফিনকি দিয়ে ধারা
গড়িয়ে যায়…তবুও অব্যয়আমাকে তুমি খরচা করে তােড়ে
ফুরিয়ে ফেল ভীষণ অপচয়ে
রক্ত, এত রক্ত দেখে আমি
বোবার মতাে সিঁটিয়ে আছি ভয়েগর্ত খুঁড়ে বেরিয়ে আসা সার
ঢুকতে হবে অন্য কোনও ঘােরে
পাহাড় থেকে উপচে ওঠা জল
ঝরনা শুষে নিচ্ছে প্রাণভরেহিংসে, বড় হিংসে করি ওকে
ত্রিভুজ থেকে একটা কোনও বাহু
সরিয়ে নিয়ে লাঠির মতাে ধরি
আমাকে ধরে আদর করে রাহুকেতুর কথা বলাও লােকসান
অনুভূতির অন্ধকার ঘরে
ও এতখানি নিঃস্ব, বেপরােয়া
যতটা পারে শ্লীলতাহানি করেবানিয়ে ছাড়ে সমাজচ্যুত ঢপ
ছাড়ার আগে ধরিয়ে দেয় নেশা
রাস্তা, এঁদোগলিতে, ফুটব্রিজে
কুকুর ডাকে, শুনতে পাই হ্রেষাচাবুক কোনও চাবুক চাই না তাে
পক্ষীরাজ, আমি তােমার ডানা
আমাকে তুমি মিশিয়ে দাও মেঘে
তুমি তাে নও বাঁকুড়া থেকে আনানা যদি তবে মাটিতে ঠোকো ক্ষুর
তুমি তাে নও কেবলই ভঙ্গিমা
বিশ্বরূপ দেখতে চাইছি না
দেখাও অনুতাপের পরিসীমাযেখানে জলদস্যুগুলাে সব
দাঁড়িয়ে থাকে যেন বা জলঘট
মাংস আর চর্বি মিলেমিশে
চেতনা, চৈতন্য, যানজটমুক্তিপথে সাধক নয় একা
বাঁ পাশে তার সাধনসঙ্গিনী
চিনিনি চোখে কুয়াশা ছিল বলে
কুয়াশা, আমি তোমার কাছে ঋণীধার বাকির ভিতরও হুল্লোড়
ছুটছে কাঁচা শ্যাম্পেনের মতাে
আকাশ থেকে বাতিল হওয়া তারা
মাটিতে নেমে এসেও বিব্রতবোঝে না লোকে কি ভাবে মুখ বুজে
সহ্য করে প্রেমের অপমান
ভাষার চক্রান্তে মেনে নেয়
দানের পাশে বসানো প্রতিদানমানি না, আমি মানিনি কোন দিন
কল্পতরু—নিজেও কল্পনা
ছিনিয়ে নেবে হ্যাঁচকা টান দিয়ে
দিও না কানে অন্য কারও সােনালাগুক রং মাটির মূর্তিতে
পলকে জ্বলে উঠুক ত্রিনয়ন
খয়েরি, নীল, গোলাপি মিথ্যায়
সত্য শুধু—ভবতারিণী মাহারিয়ে যারা ফেলেছে—পাক পথ
প্রশ্ন যারা করেছে—উত্তর
বরফ যদি ডুবতে চায় মদে
মৃত্যু তুমি হয়ো না তৎপরপাথর মেলে ধরুক বিষদাঁত
তুলুক ফণা নিথর কালাে জলও
বর্তমান তবুও ঘটমান
আমাকে প্রভু শিকাগো যেতে বলাে…পরবর্তী অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন
|
বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
|
প্রেমমূলক
|
পালটে যাবে দৃষ্টি সেটা বুঝেছিলাম লেখার আগে
তবুও আমি লিখেছি আর পড়েছে কিছু লোক
মহাভারত শুদ্ধ ছিল, শুদ্ধ আছে, শুদ্ধ থাকে
অসুখ যাও রাজ্য ছেড়ে, রাজার ভালো হোক।।ভালই যদি হবে তাহলে রাজার কেন একলা হবে।
রানী কেন হবে না কোনো ভালো?
আমি তো তাকে কাঁদতে দেখে এগিয়ে গিয়েছিলাম কাছে
বলেছিলাম, তোমার চোখে সূর্য রেখে জ্বালোআড়াল শুধু চিকের নয়, অবিশ্বাসও আড়াল ছিল
বোঝাতে আমি পারিনি তাকে তাই
রূপকথার প্রতিটি দেশে রয়েছে রাক্ষসের বাড়ি।
কিন্তু তার ভিতরে ঢোকা চাই।সে পথ বড় ঝুঁকির পথ, পাথর পড়ে মাথায়, নেই,
পাথরে নেই সোনার মতো ভার।
তোমাকে ভালবেসেছি বলে বিকিয়ে দিয়ে এসেছি নাকি
নিজেকে ভালবাসার অধিকার?
|
কুসুমকুমারী দাশ
|
প্রকৃতিমূলক
|
উত্সব গান, মধুময় তান
আকাশ ধরণী-তলে
কুঞ্জে কুঞ্জে বিহগ কণ্ঠে
লতায় পাতায় ফুলে |
হৃদয়ে সবার দিয়েছে রে দোল
নাচিয়া উঠিছে প্রাণ,
(এ যে) নূতন দেশের মোহন ঝঙ্কার
নূতন দেশের গান |
এ বসন্ত কার, দিতেছে বাহার
চেতনার ঢেউ খুলি
কেবা আপনার, কেবা পর আর
ব্যবধান গেছে খুলি
আজ সে এসেছে দেবদূত হয়ে
জাগাতে সহস্র প্রাণ,
কে আসিবি আয়, ওই শোনা যায়
আনন্দময়ের গান |
কে বাঁচিবি আয়, বাতাসে বাতাসে
পরশে চেতনা জাগে ;
কে বাঁচিবি আয়, হৃদয়ে হৃদয়ে,
আজি নব অনুরাগে |
|
কুসুমকুমারী দাশ
|
ভক্তিমূলক
|
বিশ্ব আঁধার ভেদিয়া করে বন্দনা
নবীন রক্ত তপন মহান আলোকে |
গরজি গভীর স্বননে ধায় পারাবার
চুমিতে চরণতল অতুল পুলকে!
বনে উপবনে ফোটে কত ফুল
শিশিরসিক্ত নব-লাবণ্যে ভরিয়া
পরিমল শোভা সকলি বিকশি উঠে
তব মধুর পরশ লাগিয়া
দিগ্ দিগন্তে চুমিয়া বহে সমীরণ
কাহারে খুঁজিছে সে দিশেহারা ?
শান্ত উদার গগনে, অযুত অযুত তারকা
কৌতুকভরে নেহারে কাহারে তারা ?
কুলকুলু নাদে তটিনী ছুটিছে
তার বক্ষে বিপুল বাসনা
প্রেম-পাগল হিয়াখানি আজি
ওই চরণে করিবে লগনা |
গীতগন্ধ ছন্দোময় বিশ্ব
কত বন্দন পাঠায় তোমারি কাছে |
ওগো গম্ভীর, ওগো সুন্দর, ভূবনবাঞ্ছিত
কি দিবে দীন, শুধু করুণা যাচে |
|
কুসুমকুমারী দাশ
|
ছড়া
|
সোনার ছেলে খোকামণি, তিনটি বিড়াল তার,
একডণ্ড নাহি তাদের করবে চোখের আড় |
খেতে শুতে সকল সময় থাকবে তারা কাছে,
না হ’লে কি খোকামণির খাওয়া দাওয়া আছে?
এত আদর পেয়ে বিড়াছানাগুলি,
দাদা, দিদি, মাসি, পিসি সকল গেছে ভুলি |
সোনামুখী, সোহাগিনী, চাঁদের কণা ব’লে
ডাকে খোকা, ছানাগুলি যায় আদরে গলে |
“সোনামুখী” সবার বড় খোকার কোলে বসে,
“সোহাগিনী” ছোটো যেটি বসে মাথার পাশে |
মাঝখানেতে মানে মানে বসে’ “চাঁদের কণা”,
একে একে সবাই কোলে করবে আনাগোনা |
|
কুসুমকুমারী দাশ
|
মানবতাবাদী
|
আমাদের দেশে সেই ছেলে কবে হবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে?
মুখে হাসি বুকে বল, তেজে ভরা মন
‘মানুষ হইতে হবে’- এই তার পণ।
বিপদ আসিলে কাছে হও আগুয়ান
নাই কি শরীরে তব রক্ত, মাংস, প্রাণ?
হাত পা সবারই আছে, মিছে কেন ভয়?
চেতনা রয়েছে যার, সে কি পড়ে রয়?
সে ছেলে কে চাই বল, কথায় কথায়
আসে যার চোখে জল, মাথা ঘুরে যায়?
মনে প্রাণে খাট সবে, শক্তি কর দান,
তোমরা ‘মানুষ’ হলে দেশের কল্যাণ।আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে ?
মুখে হাসি, বুকে বল তেজে ভরা মন
“মানুষ হইতে হবে” — এই তার পণ,
বিপদ আসিলে কাছে হও আগুয়ান,
নাই কি শরীরে তব রক্ত মাংস প্রাণ ?
হাত, পা সবারই আছে মিছে কেন ভয়,
চেতনা রয়েছে যার সে কি পড়ে রয় ?
সে ছেলে কে চায় বল কথায়-কথায়,
আসে যার চোখে জল মাথা ঘুরে যায় |
সাদা প্রাণে হাসি মুখে কর এই পণ —
“মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন” |
কৃষকের শিশু কিংবা রাজার কুমার
সবারি রয়েছে কাজ এ বিশ্ব মাঝার,
হাতে প্রাণে খাট সবে শক্তি কর দান
তোমরা মানুষ হলে দেশের কল্যাণ
|
কুসুমকুমারী দাশ
|
স্বদেশমূলক
|
বঙ্গের ছেলে-মেয়ে জাগো, জাগো, জাগো,
পরের করুণা কেন শুধু মাগো—
আপনারে বলে নির্ভর রাখো
হবে জয় নিশ্চয়—
চারিদিকে হেরো কী দুঃখ-দুর্দিন,
কত ভাই বোন অন্ন-বস্ত্র-হীন,
সোনার বাংলা হয়েছে মলিন
কী দীরুণ বেদনায়—
তোমরা জাগিয়া দুঃখ ঘুচালে,
সকলের ব্যথা সকলে বুঝিলে
ত্যাগ, একতায় জাগিয়া উঠিলে,
তবে বঙ্গ রক্ষা পায় |
পৃথিবী জুড়িয়ে যত অভিযান
সকলেই চায় দেশের কল্যাণ (সম্মান)
জননী জন্মভূমির উত্থান,
মানুষ যে সে-ই চায় |
|
কুসুমকুমারী দাশ
|
স্বদেশমূলক
|
তোমার বন্দিনী মূর্তি ফুটিল যখন,
দীপ্ত দিবালোকে,
সহস্র ভায়ের প্রাণ উঠিল শিহরি,
ঘৃণা, লজ্জা, শোকে |
পবিত্র বন্দনমন্ত্রে কম্পিত বাংলা
দূর আর্য ভূমি!
মুক্তকণ্ঠে যুক্তকরে ডাকিছে তোমায়,
হে লজ্জাবারিণী— |
সাধনার ধন তুমি ভারতবাসীর,—
সহস্র পীড়নে,
উপবাসে, অনশনে ভোলে নাই তোমা |
দুর্বল সন্তানে
দিব্য মন্ত্রে দিব্য স্নেহে দাও স্থান আজি
মন্দিরে তোমার ;
যায় যাক্ থাক্ প্রাণ, সে মন্ত্র শুনিয়া
জাগিব আবার— |
হিমাচল হবে দূর কুমারিকা পার
কাননে, প্রান্তরে,
নগরে-নগরে ক্ষুদ্র প্রল্লীতে-পল্লীতে,
প্রাসাদে কুটিরে,
কোটি কোটি মৃত প্রাণ, হোমাগ্নির প্রায়
উঠুক জ্বলিয়া,
মা তোর তাপসী-মূর্তি পূজিবে সন্তান
হিয়া রক্ত দিয়া |
|
কুসুমকুমারী দাশ
|
ভক্তিমূলক
|
রূপসিন্ধু মাঝে হেরি অরূপ তোমায়,
হৃদয় ভরিয়া গেল সুধার ধারায়!
কোন্ মৃত্তিকায় খুঁজি কোন তীর্থ-নীরে,
স্ব-প্রকাশ বিরাজিত বিশ্বের মন্দিরে—
উদার আকাশ তল, সিন্ধুর সুনীল জল,
ওই গিরি নির্ঝরিনী অশ্রান্ত উচ্ছল |
প্রান্তর দিগন্ত-লীন শ্যামা মধুরিমা,
প্রকৃতির অঙ্গে অঙ্গে কার এ সুষমা?
হায়রে সম্বলহীন, কুণ্ঠা ছিল মনে—
তাঁর দেখা পাবি তুই কবে কোনখানে?
শত হস্ত বাড়ায়ে যে ধরিবারে চায়,
“পাই নাই” বলে তারে দিবি কি বিদায়?
অন্তরে বাহিরে হের অপূর্ব্ব আলোকে
তাঁরি জ্যোতির্ময় রূপ, দ্য়ুলোকে ভূলোকে!
|
কুসুমকুমারী দাশ
|
ছড়া
|
আয়রে মনা, ভুতো, বুলী আয়রে তাড়াতাড়ি,
দাদার চিঠি এসেছে আজ, শুনাই তোদের পড়ি |
“কলকাতাতে এসেছি ভাই কালকে সকাল বেলা,
হেথায় কত গাড়ি, ঘোড়া, কত লোকের মেলা |পথের পাশে সারি সারি দু’কাতারে বাড়ি
দিন রাত্তির হুস্ হুস্ করে ছুটেছে রেল গাড়ি |
আমি কি ভাই গেছি বুলে তোদের মলিন মুখ,
মনে পড়লে এখনও যে কেঁপে ওঠে বুক |সেই যে মায়ের জলে ভরা স্নেহের নয়ন দু’টি
সেই যে আমার হাতটি ছেড়ে দিতে চায় নি পুঁটি—
ভূতি মনার আবদারে ভাব, দাদা, কোথায় যাবে?
যদি তুমি যেতে চাও তো সঙ্গে মোদের নেবে |”সেই যে বুলী ঠোঁট কাপায়ে চুলের গোছা ছেড়ে
“যেতে নাহি দিব” ব’লে দাঁড়িয়েছিল দোরে—
সেই যে নলিন ষ্টেশন ঘরে চোখে কাপড় দিয়ে
কাঁদছিলি তুই হাতখানি মোর তোর হাতেতে নিয়ে |সে সব কথা মনে প’ড়ে চোখে আসছে জল
দিনে দিনে কমে যাচ্ছে ভরা বুকের বল |
এসব কথা মায়ের কাছে বলো নাক’ ভাই,
আজকে আমি এখান হ’তে বিদায় হ’তে চাই |আর এক কথা, নিয়মমত লিখো আমায় চিঠি
কেমন আছে ভূতি, মনা, বুলী, ছোট পুঁটি?
মা বাবাকে প্রণাম দিয়ে বলবে আমার কথা,
সিটি কলেজ খুললে আমি ভর্তি হব তথা |
দু’চার দিন আর আছে বাকি, ভাল আছি আমি
আমার হ’য়ে ভাইবোনদের চুমু দিও তুমি |
বিদেশ এলে বুঝতে পারবে কেমন করে প্রাণ,
বুঝেছি ভাই কাকে ব’লে এক রক্তের টান |এখন আমার চোখের কাছে যেন জগত্খানা
ভাসছে নিয়ে ভূতো, পুঁটি, বুলী, ননী, মনা |’
|
কুসুমকুমারী দাশ
|
মানবতাবাদী
|
একদিন লিখেছিনু আদর্শ যে হবে
“কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে” |
আজ লিখিতেছি বড় দুঃখ লয়ে প্রাণে
তোমরা মানুষ হবে কাহার কল্যাণে ?
মানুষ গড়িয়া ওঠে কোন্ উপাদানে ;
বাঙালি বোঝেনি তাহা এখনো জীবনে—
পুঁথি হাতে পাঠ শেখা—দু-চারটে পাশ
আজিকার দিনে তাহে মিলে না আশ্বাস,
চাই শৌর্য, চাই বীর্য, তেজে ভরা মন
“মানুষ হইতে হবে” হবে এই পণ—
বিপদ আসিলে কাছে হবে আগুয়ান
দুই খানি বাহু বিশ্বে সবারি সমান—
দাতার যে দান তাহা সকলেই পায়
কেউ ছোট কেউ বড় কেন হয়ে যায়!
কেন তবে পদতলে পড়ি বারবার ?
“মনুষ্যত্ব” জাগাইলে পাইব উদ্ধার— |
যত অপমান, যত লাঞ্ছনা পীড়ন
একতার বলে সব হইবে দমন!
তেজীয়ান, বলীয়ান সেই ছেলে চাই
সোনার বাংলা আজি হারায়েছে তাই |
আবার গড়িতে হবে বীর শিশুদল,
বাংলার রূপ যাহে হবে সমুজ্জ্বল—
|
কুসুমকুমারী দাশ
|
ভক্তিমূলক
|
এক বিন্দু অমৃতের লাগি
কি আকুল পিপাসিত হিয়া,
এক বিন্দু শান্তির লাগিয়া
কর্মক্লান্ত দুটি বাহু দিয়া—
কাজ শুধু করে যায়
অন্তরেতে দুরন্ত সাধনা,
তুমি তার দীর্ঘ পথে
হবে সাথী একান্ত ভাবনা |
সে জানে এ আরাধনা
কবে তার হইবে সফল ;
তব বাণী যেই দিন তারি
ভাষা হয়ে ঘুচাবে সকল
অন্তরের অহঙ্কার,
স্তুতি, নিন্দা, ভয়
সেদিন লভিবে শান্তি,
সংগ্রামে বিজয় |
তোমার স্বরূপে তার রূপ হবে লীন!
সেই তার সাধনার পরম সুদিন |
|
সুব্রত পাল
|
প্রেমমূলক
|
॥ ১ ॥
যদি বসন্ত পলাশ খোঁজে, খুঁজুক। তুমি খুঁজো না
রাঙামাটির পথে হাঁটতে ইচ্ছে করলে, হেঁটো না
শুধু আমাকে খুঁজোআমি তো দুরন্ত ফাল্গুন গোটা গায়ে মেখে
তোমার জন্য বসে আছি
মনে মনে মাদল বাজাচ্ছি আর
গোধূলির রঙ দেখছি দিগন্তেযদি বসন্ত তোমাকে ডাকে, ডাকুক। তুমি যেয়ো না
আঙুল ছুঁতে ইচ্ছে করলে, ছুঁয়ো না। কথা বোলো না
শুধু আমাকে ছুঁয়োআমি তো পাতায় পাতায় লুকিয়ে রেখেছি
সব ঢেউ, দ্বীপ, দ্বীপপুঞ্জগহন অরণ্য হয়েছি
কুয়াশায় সেজেছি কখনোতবু যদি বসন্ত আসে তোমার কৃষ্ণচূড়া ডালে
আর কোকিল ডাকে, তবে অপেক্ষা কোরো।
আমি আবির নিয়ে আসছি, থেকো…॥ ২ ॥
নিজেকে দেখাতে গিয়ে শুধু তোমাকেই দেখছিএই বসন্তসন্ধ্যায়
সমস্ত আড়াল, অভিমান, সমস্ত সীমারেখা
উপেক্ষা করে আজ তোমারই সামনে এসেছিএই আনমনা মন, মনের ভেতর তরঙ্গ
এই ভ্রূভঙ্গি, এই ঠোঁটের উচ্চারণ
সব যদি আলাদা মনে হয়
এসো, তাহলে স্পর্শে বুঝি দুরন্ত অস্থিরতাএসো, ক্রমাগত আঁকড়ে ধরি
আর ক্রমাগতই বাঁচার চেষ্টা করিহে আমার কাঙ্খিত প্রেম
আগে তো বলো নি কখনো
ভালোবাসায় এত কষ্ট থাকে
এত আলোড়ন, এত নিঃসঙ্গতাকখনো কিছু তো বুঝে নিও
কিছু অনুচ্চারিত শব্দ, কিছু সমুদ্র ফেনায়
ছিটেফোঁটা যন্ত্রণা, বুঝে নিওআজ পূর্ণিমা নাকি অমাবস্যা
আকাশে চাঁদ আছে কি নেই, কিচ্ছু জানি না আমি
শুধু বসন্ত জানি আর জানি তোমাকে
তাই তো তোমারই সামনে এসেছি
তোমাকেই দেখছি
দেখছি ভরসার মত করে, কান্নার মত করে
স্পর্ধার মত করে, ইচ্ছের মত করে
শুধু তোমাকেই দেখছিঅথচ আমি নিজেকেই দেখাতে এসেছিলামএই বসন্তসন্ধ্যায়।
|
সুব্রত পাল
|
মানবতাবাদী
|
তোমার দুর্গা মহালয়া ভোরে শরৎ মাখছে গায়
আমার দুর্গা এখনো দেখছি ফুটপাতে জন্মায়।তোমার দুর্গা অকালবোধন একশো আটটা ফুল
আমার দুর্গা দূর থেকে দ্যাখে খিচুড়ির ইস্কুল।তোমার দুর্গা আগমনী গান গিরিরাজ কন্যার
আমার দুর্গা ঘর দোর ভাসা বাঁধ ভাঙা বন্যার।তোমার দুর্গা প্রতিবার আসে বাবা মা’র বাড়িতেই
আমার দুর্গা মা’র কোলে পিঠে, বাবার খবর নেই।তোমার দুর্গা টেক্কা দিয়েছে এবার থিমের পুজো
আমার দুর্গা ইট বয়ে বয়ে এক্কেবারেই কুঁজো।তোমার দুর্গা হুল্লোড়ে মাতে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে
আমার দুর্গা বাঁচতে শিখছে অতীতকে ছুঁড়ে ফেলে।তোমার দুর্গা আলো ঝলমল চেনে না অন্ধকার
আমার দুর্গা রোজ সেজে গুজে খোঁজে তার সংসার।তোমার দুর্গা শপিং মলের কফির ধোঁয়ায় ওড়ে
আমার দুর্গা চা বানাচ্ছে, তিন রাস্তার মোড়ে।তোমার দুর্গা বহুজাতিকের বহুজনহিতায়চ
আমার দুর্গা কালকে যেমন, আজো তথৈবচ।তোমার দুর্গা ছবির ফ্রেমের শিউলি এবং কাশে
আমার দুর্গা এখনো আশায় কেউ যদি ভালোবাসে।তোমার দুর্গা ধুনুচি নাচের ঢ্যাম্ কুড় কুড় ঢাকে
আমার দুর্গা ঘুরেই মরছে দশচক্রের পাকে।তোমার দুর্গা অঢেল খাবার অঢেল নষ্ট হয়
আমার দুর্গা দিন আনাআনি কিছু নেই সঞ্চয়।তোমার দুর্গা কুলকুল নদী, স্নেহের প্রথম পাঠ
আমার দুর্গা নখের আঁচড়ে ভয়েই শুকিয়ে কাঠ।তোমার দুর্গা অস্ত্র শানায় সিংহবাহিনী রূপ
আমার দুর্গা কাঁদতে কাঁদতে নির্বাক, নিশ্চুপ।তোমার দুর্গা দশভুজা হয়ে অসুরের মাথা কাটে
আমার দুর্গা অপুষ্টি নিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে হাঁটে।আমার দুর্গা কবে বলো আর তোমার দুর্গা হবে ?
আমার আকাশ ভরবে তোমার উৎসবে উৎসবে !!
|
সুব্রত পাল
|
প্রেমমূলক
|
পাগলা, সমুদ্দুর ! ভাসবি যদি চল্ –
মেঘ ভাবলে মেঘ। জল ভাবলে জল।জ্বলতে এত সুখ চোখ জ্বলছে আজ –
রূপ ভাবলে রূপ। সাজ ভাবলে সাজ।পাগলা, খালি গায় আছড়ে পড়ে চাঁদ –
যোগ ভাবলে যোগ। বাদ ভাবলে বাদ।খেলতে মানা নেই সাজিয়ে নিয়ে ছক –
চুপ ভাবলে চুপ। বক্ ভাবলে বক্।পাগলা, হট্টগোল ! শান্ত হয়ে বোস্ –
গুণ ভাবলে গুণ। দোষ ভাবলে দোষ।সকালে তাজা প্রাণ সন্ধ্যে বেলা লাশ –
দূর ভাবলে দূর। পাশ ভাবলে পাশ।পাগলা, হাতের পাঁচ ধরবি যদি ধর –
প্রেম ভাবলে প্রেম। ঘর ভাবলে ঘর।আদর ছুঁয়ে মন শরীর পেতে চায় –
বুক ভাবলে বুক। আয় ভাবলে আয়।পাগলা, ফাঁদে পা, এবার কিস্তিমাৎ –
দিন ভাবলে দিন। রাত ভাবলে রাত।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
যার যেখানে জায়গা, যেন সেইখানে সে থাকে।
যা মনে রাখবার, যেন রাখে
নিতান্ত সেইটুকু।
খুকু,
ঘরে একটা জানলা চাই, বাইরে একটা মাঠ।
উঠোনে একটিইমাত্র কাঠ-
গোলাপের চারা
আস্তেসুস্থে বড় হোক, কিচ্ছু নেই তাড়া।
একদিন সকালে
নিশ্চয় দেখব যে, তার ডালে
ফুল ধরেছে। খুকু,
তার-কিছু তো চাইনি, আমি চেয়েছি এইটুকু।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
এক-একটা কবিতা যেন সুতানুটি-গোবিন্দপুরের
রাত্রিকে ফিরিয়ে আনে।
এক-একটি কবিতা যেন অকস্মাৎ
টান্ মেরে হটিয়ে দেয় ময়দানের সবুজ গালিচা।
গঙ্গাসাগরের দিকে অগ্রসরমান যাত্রিবোঝাই নৌকাকে
এক-একটি কবিতা যেন রমনীর নখে, ওষ্ঠে, জঙ্ঘাদেশে, হাতের মুদ্রায়
বিষাক্ত ফুলের মতো ফোটে।
এক-একটি কবিতা যেন ঝড়ের ভিতরে হয়ে ওঠে
নিয়তির কণ্ঠস্বর।
কয়েকটা দিনের জন্য মফস্বল-বাংলায় সফর
সেরে নিয়ে
কবিতা আবার এই নগরের কেন্দ্রে ফিরে আসে।
দুলে ওঠে ঘর-দুয়ার।
যাদুঘর, রঙ্গালয়, ফুটবল-গ্যালারি, স্কাইস্ক্রেপারের পাশে
এক-একটি কবিতা গিয়ে হানা দেয়, আর
আতঙ্ক ঘনিয়ে ওঠে চারিধারে।
এক-একটি কবিতা গিয়ে ফেটে পড়ে চৌরঙ্গিপাড়ায়।
বৃক্ষেরা আমূল কাঁপে, ভয়ার্ত পাখিরা
ঝঁকে-ঝাঁকে
বিপন্ন আশ্রয় ছেড়ে রাত্রির আকাশে উড়ে যায়।
ভিতরে তাকাই, ভাবি
যা হলে সবাই খুব খুশি হত, যা হলে সমস্ত দিক রক্ষা পেত, আজ
কালবৈগুণ্যের ফলে
এক-একটি কবিতা যনে কিছুতেই তেমন হচ্ছে না।
বাহিরে তাকাই, দেখি
হলুদ-সবুজ-লাল হলুদ-সবুজ-লাল
ট্রাফিক-বাতির ত্রিনয়ন
জ্বলছে নিবছে জ্বলছে নিবছে। অথচ কোথাও
কোন যানবাহনের চিহ্ন নেই।
ফুটপাতে ভিখারি নেই। রাস্তাগুলি খাঁখাঁ করছে। প্রধান গির্জার
গা বেয়ে জ্যোৎস্নার ধারা নেমেছে ফুটপাথে।
তারই মধ্যে একদিকে নিরস্তর
ট্রাফিক-বাতির দণ্ড চৌমাথায় চোখ মারে। অন্য দিকে
বঙ্গোপসাগর থেকে হুহু করে ছুটে আসে হাওয়া;
মধ্যরাতে
আচমকা কাঁপিয়ে দেয় কলকাতার বুকের পাঁজর।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
কবিকে তারাই বানিয়ে তুলেছিল, এই
ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে
তারা এখন
ছেনি ও হাতুড়ি নিয়ে
কবির মূর্তির পাদদেশে এসে দাঁড়িয়েছে।
ভাদ্রমাস ফুরিয়ে আসছে।
এক পশলা বৃষ্টি হয়ে যাবার পরে টলটলে নীল আকাশকে এখন
সমুদ্র বলে ভ্রম হয়।
কিন্তু ঠিক এই সময়েই নীচের মাটিতে জমেছে তাদের
ভ্রান্তির খেলা।
কবি যে তাদের হুকুম মানতে রাজি হয়নি,
তাঁর এই অমার্জনীয় অপরাধের
শাস্তি হিসেবে
তারা বলছে, “আমরাই তাঁকে বানিয়েছিলুম, এখন
আমরাই তাঁকে ভাঙব।”
কিন্তু, তারা যদি না-ই বানাবে, তবে
কে বানিয়েছিল এই কবিবে?
বানিয়েছিল তাঁরই সময়।
তাঁরই প্রস্তুতিপর্বের নিরন্তর ব্যর্থতা ও গ্লানি,
অপমান ও যন্ত্রণা।
আজ যারা তাঁর মূর্তি ভাঙবার জন্যে
হাতুড়ি তুলেছে,
প্রাতিষ্ঠানিক সেইসব বর্বরের
অন্তহীন প্রতিরোধ ও ধিক্কারও অন্তত খানিক পরিমাণে তাঁকে
তৈরী করে তুলেছিল।
মূর্তির পাদদেশে দাঁড়িয়ে তারা আজ আস্ফালন করছে।
কিন্তু তাদের জানা নেই যে,
তাদের অনিচ্ছার আগুনে ঢালাই হয়ে
তৈরী হয়েছে ওই মূর্তি।
কোনো হাতুড়িই ওই মূর্তিকে আর এখন ভাঙতে পারবে না।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
শোকমূলক
|
ওকে বড় সুন্দর দেখাচ্ছে, ওকে আজ
শ্বেতচন্দনের ফোঁটা দাও,
ওকে পট্টবসনে সাজাও;
ওকে বলো, এইখানে সমাপ্ত ওর কাজ,
ও এখন যেতে পারে।
ও যাবে কোথায়, কার উদ্যানের ঝাড়ে
ওর জন্যে ফুটেছে গোলাপ?
এর মধ্যে উঠল কেন গোলাপের কথা?
ও খুব ভালই জানে, কারও
উদ্যানে গোলাপ নেই, আছে তার ধারণা কেবল;
আছে মাটি, আছে রৌদ্র, এবং আঁজলায় কিছু জল।
তা হলে ছলনা ছাড়ো,
ওকে যেতে দাও।
ও যাবে কোথায়? ও কি সত্যিই কোথাও
যেতে চায়?
হায়,
তুমিও জানো না কিছু? সর্প অভিমান
থেকে ও বিমুক্ত আজ, তাই বিশ্বজোড়া
সাম্রাজ্য এখন ওকে ডাকে।
ওই দ্যাখো, সূর্য ওরই প্রশস্তি রচনা করে রাখে,
সমুদ্রের তরঙ্গে পা ঠোকে ওর ঘোড়া।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
আবার সহজে তারা ফিরে আসে আষাঢ়-সন্ধ্যায়।
তারা ফিরে আসে। কাগজের
সানন্দ তরণী, সাদা মাটির বিড়াল–
মুখে মস্ত ইলিশের পেটি। ফিরে আসে
কাঠের জিরাফ, সিংহ, কাকাতুয়া, আহ্লাদী পুতুল;
উড়ন্ত কিন্নরী; খড়কুটা ও কাপড়ে
ফাঁপানো ভীষণ মোটা শাশুড়ি, তরুণী বধু, ফুল, লতাপাতা;
কুরুশ-কাঁটার পদ্ম। একদা ফিরতেই হবে
জেনে সকলেই তারা আষাঢ়-সন্ধ্যায়
সহজ খুশিতে ফেরে ‘মনে-রেখো’-ছবির শৈশবে।
সবাই সহজে ফেরে। সময়ের কাঁটা
ঘুরিয়ে আবার যেন শৈশব-দিবসে ফেরা বড়ই সহজ।
কাঠের আলমারি কিংবা কলি-না-ফেরানো
দেওয়ালের শূণ্য জমি আষাঢ়-দিবসে
আবার সহজে তাই ভরে ওঠে, উপ্সরা-কিন্নরী-
জিরাফ-শাশুড়ি-বউ-সিংহ-কাকাতুয়ার বিভায়।
যেন অনায়াসে কোনো প্রাচীন জনতা
সমস্ত আইন ফাঁকি দিয়ে
সন্ধ্যার চৌরঙ্গি রোড একে-একে নির্বিকার পার হয়ে যায়–
সহজ আনন্দে, হাতে হ্যারিকেন-লণ্ঠন ঝুলিয়ে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
থাকা মানে কিছু বই, থাকা মানে লেখার টেবিল,
থাকা মানে আকাশের নীল,
পুকুর পড়েছে রোদ, গাছের সবুজ
ছাতের কার্নিসে দুটি পাখি,
জলের ভিতর কিছু চোরা টান, সায়ংকালীন
স্তব্ধতার মধ্যে ধীরে-ধীরে
একা-নৌকাটির ক্রমে দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়া।
ভাদ্রের গুমট ভেঙে বৃষ্টির খবর নিয়ে ছুটে আসে হাওয়া,
যা এসে বুকের মধ্যে লাগে।
থাকা মানে মানুষের মুখ, ঘাম, ক্লান্তি ও বিষাদ,
যা নিয়ে সংসার, তার সবই।
থাকে মানে দুঃখ-সুখে, সংরাগে-বিরাগে
সবকিছুকে হাতের মুঠোয় ধরে রাখা।
থাকা মানে আলোতে-কালোতে আঁকা ছবি,
যে-ছবি তাৎপর্যে ভরা, অথচ সম্পূর্ণ অর্থহীন।
থাকা মানে তারই মধ্যে বেঁচেবর্তে থাকা।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
সারাদিন আলোর তরঙ্গ থেকে ধ্বনি জাগে :
দূরে যাও।
সারারাত্রি অন্ধকার কানে-কানে মন্ত্র দেয় :
দূরে যাও!
বাল্যবয়সের বন্ধু, পরবর্তী জীবনে তোমরা
কে কোথায়
কর্মসূত্রে জড়িয়ে রয়েছ, আমি খবর রাখি না।
কেউ কি অনেক দূরে রয়ে গেলে?
কৈশোর-দিন্র সঙ্গী, তোমরা কেউ কি
দূর-ভুবনের মৃত্তিকায়
সংসার পেতেছ, তবু
কৈশোর-দিনের কথা ভুলতে পারোনি?
কিংবা যারা প্রথম-যৌবনে কাছে এসেছিলে,
তারাই কেউ কি
অজ্ঞাত বিদেশে আজ অবেলায়
পর্বতচূড়ায় উঠে অকস্মাৎ পূর্বাস্য হয়েছ?
তোমরা কেউ কি
উন্মাদের মতো ঢিল ছুঁড়ে যাচ্ছ স্মৃতির অতলে?
আলোর অক্লান্ত ধ্বনি প্রাণে বাজে : দূরে যাও।
কেন বাজে?
অন্ধকার কানে-কানে মন্ত্র দেয় : দূরে যাও।
কেন দেয়?
অন্য জীবনের মধ্যে ডুব দিয়ে তবুও কেউ কি
পরিপূর্ণ ডুবতে পারোনি?
কেউ কি নিঃসঙ্গ দূর দ্বীপ থেকে উদ্ধার চাইছ?
বুঝতে পারি, স্মরণ করছ কেউ রাত্রিদিন।
বুঝতে পারি, নিরুপায় সংকেত পাঠাচ্ছ কেউ
আলোর তরঙ্গে, অন্ধকারে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
হাজার শব্দ মাথায় ছিল,
হাজার শব্দ বুকে,
আর তা ছাড়া বাপ-পিতেমোর
জং-ধরা সিন্দুকে
শব্দ ছিল দু-তিন হাজার–
খরচা করে সবই
দেখছি তবু হয়নি আঁকা
তোমার মুখচ্ছবি।
দোষ ছিল না শব্দে, শুধু
দোষ ছিল জোড় বাঁধায়,
ভুল-বিবাহের বর-কনে তাই
গড়ায় ধুলো-কাদায়।
এখন ভূমিশয্যা থেকে
কুড়িয়ে তাদের তুলি;
নতুন করে জোড় মিলিয়ে
মেটাচ্ছি ভুলগুলি।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
একবার…দু’বার…আমি তিনবার ভীষণ জোরে
তোমাকে ডেকেছি :
ইন্দিরা…ইন্দিরা…ইরা!
বৃদ্ধের শ্লেষ্মার বেগ সামলে নিয়ে উৎকর্ণ হলেন।
শিশুরা ঘুমের মধ্যে কেঁদে উঠল।
একতলায় দোতলায় তিনতলায়
অন্ধকারে তৎক্ষণাৎ খুলে গেল অসংখ্য জানাল।
কী ঘুম তোমার, তুমি বাড়িতে ডাকাত পড়লে তবু
ঘুমে অচেতন থাকতে পারো।
মধ্যরাতে পৃথিবীর তীব্রতম ডাক তাই দেওয়ালে-দেওয়ালে
প্রতিহত হতে-হতে
অর্থহীন হয়ে যায়।
যাকে ডাকা, সে আসে না,
অনর্থক অন্যেরা ঘরের থেকে ছুটে এসে বারান্দায়
ঝুঁকে পড়ে!
একবার…দু’বার…আমি তিনবার ভীষণ জোরে
তোমাকে ডেকেছি।
কিন্তু তার পরে আর প্রতীক্ষা করিনি।
মধ্যরাতে, ঘুমন্ত শহরে
সবাইকে চমকে দিয়ে ফিরে -যেতে-যেতে আমি
দেখতে পাই,
সারি-সারি
বাতিস্তম্ভ দাঁড়িয়ে রয়েছে, কিন্তু পৌর ধর্মঘটের কারণে
তাতে আলো নেই।
রাস্তার দু’ধারে ছিটকে সরে যাচ্ছে আলিঙ্গনে বদ্ধ নরনারী।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
মানবতাবাদী
|
দুটি কিংবা তিনটি বাচ্চা, ব্যস!
সভ্যতার সায়ংকালীন এই স্লোগানের অর্থ বুঝে নিয়ে,
চতুর্থ সন্তান, তুমি ঘরের ভিতরে
দেওয়ালের দিকে মুখ রেখে
গুম হয়ে বসে আছ।
ক্রোধে, নাকি দুঃখে, নাকি অবজ্ঞায়?
আয়ত চক্ষুর মধ্যে কখনও বিদ্যুত-জ্বালা খেলে যায়,
কখনও মেঘের ছায়া নেমে আসে।
তোমার বিরুদ্ধে আজ জোটবদ্ধ সমস্ত সংসার,
তবুও চেয়েছ তুমি তাকে,
যে তোমাকে চায়।
কে তোমাকে চায়?
পথে-পথে নিষেধাজ্ঞা, দিকে দিকে নিরুদ্ধ দুয়ার।
অবাঞ্ছিত ফল,
অসতর্ক মুহূর্তের ভ্রান্তির ফসল,
চতুর্থ সন্তান, তুমি কার?
দুটি কিংবা তিনটি বাচ্চা, ব্যস!
অপমানে বিকৃত মুখের রেখা, সভ্যতার চতুর্থ সন্তান,
হঠাৎ কখন তুমি ঘর থেকে উন্মাদের মতো
রাজপথে
বেরিয়ে এসেছ,
বন্দুক তুলেছ ওই বিদ্রুপের দিকে
জনতা ও যানবাহন থেমে যায়, প্রতিষ্ঠানগুলি
আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে।
হয়তো বুঝেছে তারা,
আসন্ন দিনের যুদ্ধে তুমিই তাদের
সব থেকে ক্ষমাহীন প্রতিদ্বন্দ্বী;
হয়তো জেনেছে,
যে-পৃথিবী তোমাকে চায়নি,
তুমিও অক্লেশে তাকে ঘাড়ে ধরে জাহান্নমে ঠেলে দিতে পারো।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
পঁয়তাল্লিশ বছর বাদে দেখা, তবু কারও
ভুলভাল হল না।
এসপ্ল্যানেডে বর্ষার সন্ধ্যায়
এক-নজরে দুজনেই দুজনকে চিনলুম। পক্ককেশ
পৌঢ় পরক্ষণে
বালকের মতো হাসল, প্রশ্ন করল, “কী রে,
আজকাল কোত্থেকে ঘুড়ি কিনিস? আবদুল
মৌলালির মোড়ে
এখনও লাটাই ঘুড়ি টানা-মাঞ্জা বিক্রি করে নাকি?”
শুনে আমি হতভম্ব হয়ে চেয়ে থাকি
ইস্কুকের বন্ধু কালীপদ
মল্লিকের দিকে। আমি তিন বছর বাদে
চাকরি থেকে অবসর নেব, কিন্তু দু-দুটো মেয়ের
একটাও পাত্রস্থ হয়নি, বাড়ির বাবদে
ঘাড়ে দেনা, পেটে অম্লশূল,
সাংসারিক দায়-দায়িত্ব বাড়ছে শুধু, কমছে না একটাও,
উপরন্তু গিন্নির হাঁপানি।…আমি আর
একাদশবর্ষীয় বালক নই, তবু কেন হতচ্ছাড়া কেলো
ঘুড়ি ওরাবার কথা বলে?
ডাইনে বাঁয়ে নেভে আর জ্বলে
বিজ্ঞাপনী বর্ণমালা। সম্ভবত সাঁওতালডিহির
প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা প্ল্যাণ্টের
উৎপাদনে আজকে কোনো বিভ্রাট ঘটেনি।
আকাশে পুজোর গন্ধ, গঙ্গ থেকে ছুটে আসে হাওয়া
এইরকম সন্ধ্যালগ্নে ভিক্ষারিও স্বপ্ন দেখে, আর
যেন জাদুদণ্ডের ছোঁয়ায়
পালটে যায় কলকাতার মুখচ্ছবি।
চৌরঙ্গির মোড়া মেট্রো-রেলের দেওয়ালে
প্যাণ্টের বোতাম খুলে যারা ভারমুক্ত হচ্ছে, তাদেরও এখন
বালকের মতো
সুখী ও নিশ্চিন্ত বলে মনে হয়।
তাই বলে সময়
বসে থাকে নাকি? কালী, হয় তুই উন্মাদ কিংবা গাধা।
এই কথাটা বলতে গিয়ে পরক্ষণে ভাবি,
পাগল কি নির্বোধ নয়, যেখানে একদিন
ছেড়েছিল, কালী হয়তো হার-না-মানা গোঁয়ারের মতো
মধ্যবর্তী বছরগুলিকে
অস্বীকার করতে চাইছে, আর
একদম সেইখান থেকে ধরতে চাইছে পুরনো বন্ধুকে।
ধরা যায় না, কে না জানে, ইঁদারায় ঝুঁকে
কোনো-কিছু ধরতে গেলে খালি
বেদনাই বাড়ে।
তবুও অস্ফুট কণ্ঠে বলি তাকে, “জয় কালী, জয় কালী!”
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
জীবন যখন রৌদ্র-ঝলোমল,
উচ্চকিত হাসির জের টেনে,
অনেক ভালোবাসার কথা জেনে,
সারাটা দিন দুরন্ত উচ্ছ্বল
নেশার ঘোরে কাটল। সব আশা
রাত্রি এলেই আবার কেড়ে নিও,
অন্ধকারে দু-চোখ ভরে দিও
আর কিছু নয়, আলোর ভালোবাসা।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
পাতাগুলি উল্টেপাল্টে নিজেকে দেখায়
যখনই বাতাস এসে নাড়া দিয়ে যায়
বৃক্ষের বাড়িতে
অশ্বত্থের পাতা
এক্ষুনি সবুজ, কিন্তু পরক্ষণে সাদা।
হাক্লান্ত দৌড়চ্ছে গাড়ি, মস্ত একটা ফিতে
খুব দ্রুত গুটিয়ে তুলছে কেউ,
রোদ্দুরে ঝিমোচ্ছে শক্ত লালমাটির ঢেউ
দিগন্ত অবধি।
এইবারে কপালক্রমে রোগা ও তিরতিরে একটা নদী
পেয়ে গেলে ছবিটা সম্পূর্ণ হতে পারে।
বলতে-না-বলতেই গাড়ি পৌঁছে গেল নদীর কিনারে।
নদী তো ভাবনায় ছিল, সামনে এসে দাঁড়াল কখন!
পাথরে পা রেখে জলে তক্ষুনি দুইজন
নেমে গেল। রৌদ্র ঝরে, হাওয়া ঘুরে যায়।
দুটি পাতা উল্টেপাল্টে নিজেকে দেখায়।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
বিঘের পর বিঘে এখন
সাদা, সটান
রজনীগন্ধার চাষ চলেছে।
খাল, বিল আর
হাজা-মজা পুকুরের ইজারা নিয়ে
ফোটানো হচ্ছে পদ্ম।
অভদ্রা বর্ষাকাল,
শেয়ালে চাটে বাঘের গাল,
উঠোনে এক-হাঁটু কাদা।
অল্প-একটু রোদ উঠতেই
গালফোলা গোবিন্দ সামন্তের বুড়ি-ঠাক্মা তাই
পিচঢালা
হাইওয়ের উপরে তার
সাড়ে তিন কাঠা জমির ধান শুকিয়ে নিচ্ছে।
গোবিন্দ কোথায়?
জিজ্ঞেস করে জানা গেল যে,
যেহেতু এখন ‘জমিতে আর কিছুই নাই, বাবু’, তাই
হাওড়ার ছেলে গোবিন্দ গিয়ে
মেদিনীপুরের দেউলিয়াবাজারের চায়ের দোকানে
কাজ নিয়েছে।
নদী পেরুলে কোলাঘাট,
কোলাঘাট ছাড়ালে দেউলিয়াবাজার।
সেখানে
বাস থেকে নেমে
উইকএণ্ডের শৌখিন বাবুরা
গোবিন্দ সামন্তের মালিকের দোকান থেকে
একঠোঙা মুড়ি,
বিটনুন-ছেটানো দু-দুটো আলুর চপ, আর
একভাঁড় চা খেয়ে ফের বাসে ওঠে।
তারপর
কেউ ঝাড়গ্রাম, কেউ টাটানগর, কেউ
জুনপুট কি দিঘার দিকে
চলে যায়।
রজনীগন্ধা আর পদ্মগুলো
ঝুড়ি-বোঝাই হয়ে ট্রাকে ওঠে; তারপর
ট্রাক-বোঝাই হয়ে
বিয়েবাড়ি, জয়ন্তী-অনুষ্ঠানের মঞ্চ আর মড়ার খাটিয়ে
সাজাবার জন্যে
হাওড়া ব্রিজ আর নতুনবাজারের ফুলের দোকানে চলে আসে।
কিন্তু বুড়ি-ঠাক্মা তার ধান কিছুতেই
ছাড়তে চায় না।
এন. এইচ. সিক্সের উপরে সারা দুপুর সে তার
ধান আগলে বসে থাকে।
আর
তেরপলে-ঢাকা ট্রাক দেখলেই
লাঠি উঁচিয়ে
কাক তাড়াবার ভঙ্গিতে বলে–হুশ্!
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
হরেক রাস্তা ঘুরতে-ঘুরতে
ভরদুপুরে পুড়তে-পুড়তে
কোথার থেকে কোথায় যাওয়া।
আকাশ থেকে জলের ঝাড়ি
হয়নি উপুড়, গুমোট ভারী,
কোত্থাও নেই কিচ্ছু হাওয়া।
এই, তোরা সব চুপ কেন রে?
আয় না হাসিঠাট্টা করে
পথের কষ্ট খানিক ভুলি।
কেউ হাসে না। ভরদুপুরে
আমরা দেখি আকাশ জুড়ে
উড়ছে সাদা পায়রাগুলি।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
ফুটেছ গোলাপ তুমি কলকাতার কিচেন গারডেনে।
বিলক্ষণ অন্যায় করেছ। তুমি জানো,
এখন খাদ্যের খুব অনটন।
এখন চিচিঙ্গে, লাউ, ঢ্যাঁড়শের উদ্দেশে ধাবিত
জনতাকে ফেরানো যাবে না।
অন্য দিকে।
বাড়ির হাতায়, শীর্ষে, বারান্দায়, ঝুলন্ত কারনিসে
যেখানে যেটুকু ফালতু জায়গা ছিল–
ইনচি-সেণ্টিমিটারের চৌখুপি বিন্যাসে সব বুঝে নিয়ে
এখন সবাই
বাতিল কড়াই, গামলা, কাঠের বারকোষে
পালং, বরবটি, শিম, ধানিলঙ্কা
ইত্যাদি বসিয়ে যাচ্ছে।
তারই মধ্যে নিঃশব্দে দিয়েছ তুড়ি, ফুটেছ গোলাপ।
অন্যায় করেছ।
“আরেব্বাস, কত বড় গোলাপ ফুটেছে!”
কে যেন উদ্ভ্রান্ত স্বরে বলেছিল; কিন্তু তার ভোটার জোটেনি।
জনতা হুড়মুড় করে প্রাইভেট বাসের
বাম্পারে দাঁড়িয়ে গিয়ে হুলুধ্বনি দিয়ে উঠল : গোলদিঘি চলো হে।
শুধুই গোলদিঘি বলে কথা নেই। উত্তরে দক্ষিণে
সমস্ত কলকাতা
জুড়ে আজ চমৎকার সবজির বাগান
জমে উঠছে।
শুধুই গোলাপ বলে কথা নেই। সমস্ত ফুলের
বোঁটাসুদ্ধ খেয়ে ফেলছে চ্যাপলিনি তামাসা।
সবাই টোমাটো, উচ্ছে, ধুঁদুলের মধ্যে ডুবে গিয়ে
মনে মনে
অঙ্ক কষছে, কোথায় কতটা জমি এক লপ্তে চষে ফেলা যায়–
গঙ্গার জেটিতে, ডকে, নির্বাচনী মিটিঙে, সন্ধ্যার
ময়দানে অথবা শতবার্ষিকী ভবনে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
একটাই মোমবাতি, তুমি তাকে কেন দু’দিকে জ্বেলেছ?
খুব অহঙ্কারী হলে তবেই এমন কাণ্ড করা যায়।
তুমি এত অহঙ্কারী কেন?
চোখে চোখ রাখতে গেলে অন্য দিকে চেয়ে থাকো,
হাতে হাত রাখলে গেলে ঠেলে দাও,
হাতের আমলকী-মালা হঠাৎ টান মেরে তুমি ফেলে দাও,
অথচ তারপরে এত শান্ত স্বরে কথা বলো, যেন
কিছুই হয়নি, যেন
যা কিছু যেমন ছিল, ঠিক তেমনি আছে।
খুব অহঙ্কারী হলে তবেই এমন কাণ্ড করা যায়।
অথচ এমন কাণ্ড করবার এখনই কোনো দরকার ছিল না।
অন্য কিছু না থাক, তোমার
স্মৃতি ছিল; স্মৃতির ভিতরে
ভুবন-ভাসানো একটা নদী ছিল; তুমি
নদীর ভিতরে ফের ডুবে গিয়ে কয়েকটা বছর
অনায়াসে কাটাতে পারতে। কিন্তু কাটালে না;
এখনই দপ করে তুমি জ্বলে উঠলে ব্রাউজের হলুদে।
খুব অহঙ্কারী হলে তবেই এমন কাণ্ড করা যায়।
তুমি এত অহঙ্কারী কেন?
একটি মোমবাতি, তবু অহঙ্কারে তাকে তুমি দু’দিকে জ্বেলেছ।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
আশা ছিল শান্তিতে থাকার,
আহা, ব্যর্থ হল সেই আশা,
যেহেতু মস্তিষ্কে ছিল তার
মস্ত একটা ভিমরুলের বাসা।
এবং সাদা যে কালো নয়,
কালো নয় নীল কিংবা লাল,
যেহেতু সে তাতেও সংশয়
লালন করেছে চিরকাল…
বন্ধুদের পরামর্শ শুনে
মীমাংসার বারিবিন্দুগুলি
অবিলম্বে চিন্তার আগুনে
ছিটোটে পারলেই তার খুলি
ঠাণ্ডা হয়ে আসত। সে যেহেতু
সাধ্য আর সাধনার সেতু
বেঁধে নিতে চায়নি, বারবার
পরাস্ত হয়েও প্রাণপণে
নৌকা খুলে দিয়েছিল তার
অনির্দিষ্ট লক্ষ্যের পিছনে…
এবং যেহেতু তার মনে
ইথে কোনো সন্দেহ ছিল না,
যা-কিছু ঝলসায় ক্ষণে-ক্ষণে,
সমস্তই নয় তার সোনা…
সুতরাং শান্তিতে থাকার,
আহা, ব্যর্থ হল সব আশা
মস্তিষ্কে অবশ্য ছিল তার
মস্ত একটা ভিমরুলের বাসা।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
কনেকটিকাট অ্যাভেনিউয়ের উপরে আমি দাঁড়িয়ে ছিলুম।
তখন সেপটেমবর মাস,
নতুন বিশ্বে গাছের পাতা তখন হলুদ হয়ে যাচ্ছে।
শেষ রাত্তিরে বৃষ্টি হয়েছিল,
রাস্তার উপরে তার চিহ্ন তখনও মুছে যায়নি।
ইতস্তত জলের বৃত্ত,
তার মধ্যে ঝিকিয়ে উঠছে সকালবেলার রোদ্দুর।
দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে আমি দেখছিলুম।
কাফেটেরিয়ায় গান বাজছিল:
কাম্ সেপটেমবর।
আমি দেখেছিলুম যে, উত্তর গোলার্ধে শরৎ এসেছে,
গাছের পাতা অগ্নিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে,
এলোমেলো হাওয়া দিচ্ছে,
হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে মেপ্ল আর সাইপ্রিসের পাতা।
আমি ভাবছিলুম যে, এখন শরৎকাল,
পৃথিবীর এখন সাজ ফেরাবার সময়।
কনেটিকাট অ্যাভেনিউয়ের উপরে আমি দাঁড়িয়ে ছিলুম,
বুক ভরে আমি নিশ্বাস নিচ্ছিলুম,
কাফেটেরিয়ায় গান বাজছিল:
কাম্ সেপটেমবর।
আমার চতুর্দিকে কালো মানুষের ভিড়।
আমার ভীষণ ভাল লাগছিল।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
ভুলে গেলে ভাল হত, তবু ভোলা গেল না এখনও।
পঁয়ত্রিশ বছর পার হয়ে গেছে, তবু কোনো-কোনো
মুহূর্তে তোমাকে মনে পড়ে।
স্রোতের গোপন টানে ভেসে যায় পিতলের ঘড়া।
অথচ বেদনা তার থেকে যায়। তাই বসুন্ধরা
কেঁপে ওঠে ফাল্গুনের ঝড়ে।
মনে পড়ে, মনে পড়ে, এখনও তোমাকে মনে পড়ে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
নাকারা নাকারা কারা কারা…
ঘুমের গহ্বর থেকে মধ্যরাতে জেগে উঠল পাড়া
অরণ্যের অন্দর-মহলে।
আকাশ নির্মল নয়, কিছু জ্যোৎস্না ছড়াবার ছলে
জলেস্থলে চতুর্গুণ রহস্য ছড়ায়
হলুদ বর্ণের চাঁদ। কে যায়, কে মধ্যরাতে
দ্রুত হাতে
বিপদের সংকেত বাজিয়ে দিয়ে চলে যায়?
সমগ্র সত্তায় খেয়ে নাড়া
উৎকর্ণ অরণ্য শোনে : নাকারা নাকারা কারা কারা…
কিসের বিপদ? আজও অগ্নির বলয় দেখে হটে যেতে যেতে
পর্বতসানুর ভুট্টাক্ষেতে
ফিরে এসেছিল নাকি হাতির দঙ্গল?
অথবা ঝরনার জল
খেতে এসেছিল ধূর্তবাঘ?
জ্যোৎস্না ও আঁধার ষড়যন্ত্র করে ফুটিয়েছে হল্দে-কালো দাগ
বাংলোর উঠোনে। রাংচিতের জানলায়
একবার দাঁড়িয়ে ফের ক্ষিপ্র পায়ে কারা নেমে যায়
নীচের জঙ্গলে? সারা
অরণ্যের চিত্তে বাজে : নাকারা নাকারা কারা কারা…
কিছু কি জানাচ্ছে কেউ? কী জানাচ্ছে? পালাও-পালাও…
শত্রু আসছে, সরে যাও–
এই কথা? ধূমল আকাশে
কুয়াশায় আচ্ছন্ন সমুদ্রজলে ভাসে
হলুদ বর্ণের চাঁদ! খাদের স্যাঁতস্যাঁতে মাটি, পচা ঘাসপাতার জঞ্জাল
পায়ের তলায় চেপে দীর্ঘ শাল
দাঁড়িয়ে রয়েছে স্থির অন্ধকারে। হান্টিং পয়েন্ট থেকে দেখা যায়,
চল্লিশ মেইল দূরে নিয়নের প্রগল্ভ ঝঞ্চায়
হাসছে কিরিবুরু, বিশ্বকর্মার শহর।
কিছু স্তব্ধতার পরে বাতাসে আবার শুকনো ডালপালার স্বর
জেগে ওঠে। আবার ঝরনার জলধারা
খাদের ভিতরে বুনো খরগোশের পিপাশা মেটায়।
জানি না কে এসেছিল, স্বপ্নের ভিতরে শুধু দোলা দিয়ে যায়
নাকারা নাকারা কারা কারা…
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
এখনও তোমার সেই ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনতে পাই;
এখনও তোমার সেই দারুন বিলাপ
কানে বাজে।
গগণবিহারী চিল,
খর দীপ্র দুপুরবেলায়
তুমি এক আকাশের থেকে অন্য আকাশের দিকে
তেজস্বী ও স্বভাবত-সঙ্গিবিহীন সম্রাটের মত
সহজ উল্লাসে
বাতাসে সাঁতার কেটে চলেছিলে।
যেতে যেতে,
শূণ্যের মেখলা থেকে যে-রকম উল্কা খসে যায়,
তুমিও সহসা সেইরকম
ঊর্ধাকাশ থেকে এই গৃহস্থবাড়ির বারান্দায়
ছিটকে পড়েছিলে।
মুহূর্তে কাকের মেলা বসে গেল ছাতের কার্নিসে।
কা-কা-অট্টহাসির বিদ্রুপে
ভরে উঠল দ্বিপ্রহর।
তখনও মরোনি তুমি। দুই চক্ষু
ঘোলাটে ও ঘূর্ণমান, বাদামি শরীর
কেঁপে কেঁপে উঠছে, ফের আকাশে উঠবার
শক্তি নেই, তবু তুমি
শরীরের শেষ বিন্দু সামর্থ্য সংগ্রহ করে
প্রাণপণে ঝাপটাচ্ছ ডানা, কখনও-বা
বাঁকিয়ে উদ্ধত গ্রীবা
ঘৃণাভরে দেখে নিচ্ছ
অদূরে অপেমাণ শত্র“দের।
গগণবিহারী চিল! যারা ঊর্ধে উঠতে পারে না, আর
পারে না বলেই যারা
পৃথিবীর
ভাগাড়ে ও আস্তাকুড়ে কাপুরুষ মস্তানের মত
দঙ্গল পাকিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তাদের
হাতে কি কখনও আমি ঊর্ধাচারী মানুষের
লাঞ্ছনা দেখিনি?
দেখেছি অসংখ্যবার। বুঝেছি যে, লাঞ্ছনাই স্বাভাবিক।
এমন কী, লাঞ্ছনা আর নিগ্রহের ফলে
মানুষের দীপ্তি ও মহিমা আরও বেড়ে যায়।
অথচ সমস্ত দেখে, সমস্ত বুঝেও- মূ্র্খ আমি-
দলবব্ধ কাকের গুন্ডামি থেকে
তোমাকে বাঁচাতে গিয়েছিলুম। তোমকে
বারান্দার থেকে তুলে এনে
স্নানঘরের মধ্যে আটকে রেখে
স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ভাবতে পেরেছিলুম, তোমার
মর্যাদা বাঁচানো গেল।
এখন বুঝতে পারি, বস্তুত তোমাকে
এক বিদ্রুপের থেকে আরও ক্রুর, আরও ভয়ংকর
বিদ্রুপের ভিতরে নিক্ষেপ করেছিলুম সেদিন।
গগণবিহারী চিল,
বৈদুর্যমণির তীব্র দাহনে উজ্জ্বল খর দুপুর বেলায়
সম্রাটের মতো তুমি সমস্ত আকাশ ঘুরে এসে
তারপর
শহরতলির এক গৃহস্থের
ছয় বাই তিন ফুট ওই কলঘরের অন্ধকারে বন্দি হয়েছিলে।
সারারাত্রি ঝাপটা মেরেছ তুমি
কাঠের দরজায়,
নখরে আঁচড়েছ মেঝে, সারারাত
আপন সাম্রাজ্য থেকে নির্বাসিত, বিচ্যুত হবার
অপমানে, গ্লানিতে ও যন্ত্রণায়
চিৎকার করেছ।
অমন ধারালো, শুকনো, বুকফাটা আর্তনাদ আমি
কখনও শুনিনি।
এনে হয়েছিল, যেন পাখি নয়, বিশ্ব-চরাচর
আজ রাত্রে ওই
কলঘরের অন্ধকারে বন্দি হয়ে চিৎকার করছে।
গগনবিহারী চিল,
সকালে তোমাকে আমি মুক্তি দিব বলে
দরজা খুলে যখন দেখলুম,
মেঝের উপর তুমি স্থির ও নিঃশব্দ হয়ে পড়ে আছ,
তখন আবার মনে হয়েছিল,
তুমি পাখি নও, তুমি অফুরন্ত আকাশের প্রাণমূর্তি, যেন
সমস্ত আকাশ আজ
নিতান্ত ছাপোষা এক গৃহস্থের
কলঘরের
ক্লিন্ন অন্ধকারে
মরে পড়ে আছে।
১৯ ফাল্গুন, ১৩৭৬
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
স্বদেশমূলক
|
এ কী স্নেহ! এ কী মায়া! এ কী নিজদেশেও নিয়ত
উদ্বেগে আতঙ্কে যন্ত্রণায়
প্রহর যাপন! এ কী চতুর্দিকে গর্জমান
বৈরী জনতার মধ্যে বন্ধুদের মুখের আদল
উদয়াস্ত
উন্মাদের মতো খুঁজে ফেরা!
মেহেদির বেড়া
কালকেও করেছে রক্ষা উদ্যানের গোলাপগুলিকে।
কালকেও গোলাপ ছিল,
অজস্র টগর জুঁই মল্লিকা ও গন্ধরাজ ছিল।
আজ নেই। অথচ, আশ্চর্য কাণ্ড,
সমূহ শূন্যতা ঘিরে আজকেই বসেছে কাঁটাতার।
ওরা বলে, তুমি তো ভিনদেশি, তুমি আর
এইখানে থেকো না, তুমি যাও।
না-গিয়ে নিষ্কৃতি নেই, কে না জানে।
যেতে-যেতে তবু তুমি পিছনে তাকাও।
ভাবে, কেন যাবে?
এ কি মোহ, এ কি জানো ভূমি যে কখনও
নিজস্ব হবার নয়, এই কথা
মেনে নিতে না-পারার বিড়ম্বনা?
হৃৎপিণ্ডে মোচড় লাগে, চোখ ফেটে সহসা ঝরে পড়ে
নিরুদ্ধ আবেগ।
কোথাও জমে না কিছু মেঘ।
শুধু তাসা-বাদ্য শুনে চমকে ওঠে এ-পাড়া ও-পাড়া,
কঠিন ভ্রুভঙ্গি দেখে মায়ের আঁচলে
মুখ লুকায় শিশু।
এ কী ভ্রান্তি! এ কী অহোরাত্র শুধু অর্থহীন বিসর্জন
স্বদেশে আমার!
কোনোদিকে বোধনের চিহ্ন নেই, কোনো
ঘরে নেই আমন্ত্রণ;
কেউ এসে দাঁড়ায় না কারও পাশে।
তারই মধ্যে আমি দেখছি তোমাকে, যে-তুমি
হাত রেখেছ কাঁটাতারে, চোখ রেখেছে উন্মুক্ত আকাশে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
দুয়ারে হলুদ পর্দা। পর্দার বাহিরে ধুধু মাঠ
আকাশে গৈরিক আলো জ্বলে।
পৃথিবী কাঞ্চনপ্রভ রৌদ্রের অনলে
শুদ্ধ হয়।
কারা যেন সংসারের মায়াবী কপাট
খুলে দিয়ে ঘাস, লতা, পাখির স্বভাবে
সানন্দ সুস্থির চিত্তে মিশে গেছে। শান্ত দশ দিক।
দুয়ারে হলুদ পর্দা। আকাশে গৈরিক
আলো কাঁপে। সারাদিন কাঁপে।
আকাশে গৈরিক আলো। হেমন্ত-দিনের মৃদু হাওয়া
কৌতুকে আঙুল রাখে ঘরের কপাটে,
জানালায়। পশ্চিমের মাঠে
মানুষের স্নিগ্ধ কণ্ঠ। কে জানে মানুষ আজও মেঘ
হতে গিয়ে স্বর্ণাভ মেঘের স্থির ছায়া
হয়ে যায় কি না। তার সমস্ত আবেগ
হয়তো সংহত হয় রোদ্দুরের হলুদ উত্তাপে।
আলো কাঁপে। সারাদিন কাঁপে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
তোমাকে বলেছিলাম, যত দেরীই হোক,
আবার আমি ফিরে আসব।
ফিরে আসব তল-আঁধারি অশথগাছটাকে বাঁয়ে রেখে,
ঝালোডাঙার বিল পেরিয়ে,
হলুদ-ফুলের মাঠের উপর দিয়ে
আবার আমি ফিরে আসব।
আমি তোমাকে বলেছিলাম।
আমি তোমাকে বলেছিলাম, এই যাওয়াটা কিছু নয়,
আবার আমি ফিরে আসব।
ডগডগে লালের নেশায় আকাশটাকে মাতিয়ে দিয়ে
সূর্য যখন ডুবে যাবে,
নৌকার গলুইয়ে মাথা রেখে
নদীর ছল্ছল্ জলের শব্দ শুনতে-শুনতে
আবার আমি ফিরে আসব।
আমি তোমাকে বলেছিলাম।
আজও আমার ফেরা হয়নি।
রক্তের সেই আবেগ এখন স্তিমিত হয়ে এসেছে।
তবু যেন আবছা-আবছা মনে পড়ে,
আমি তোমাকে বলেছিলাম।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
হুশ করে নক্ষত্রলোকে উঠে যেতে চাই
কিন্তু তার জন্য, মহাশয়,
স্প্রিং লাগানো দারুণ মজবুত একটা শব্দের দরকার।
সেইটের উপরে গিয়ে উঠতে হবে।
প্রাণপণে বাতাস টেনে ফুসফুস ফুলিয়ে
নক্ষত্রলোকের দিকে গর্বিত ভঙ্গিতে একবার
চোখ রাখতে হবে।
তারপরে প্রাণপণ জোরে লাথি মারতে হবে সেই শব্দের পাঁজরে!
আসলে কী ব্যাপার জানেন,
রক্তের ভিতরে একটা বিপরীত বিরুদ্ধ গতিকে
সঞ্চারিত করা চাই।
একটা শব্দ চাই, একটা শব্দ চাই, মহাশয়।
নক্ষত্রজয়ের শব্দ কিছুতে পাচ্ছি না। তাই
আপাতত
কুকুরের মতো একটা বশংবদ শব্দ দিন,
যেটাকে পায়ের কাছে কিছুক্ষণ ইচ্ছেমতো নাচিয়ে খেলিয়ে,
ঘাড়ে ধরে, ঘরের বাইরে বারান্দায়
ছুড়ে দিতে পারি।
সুপুরির মতো একটা শব্দ দিন,
যেটাকে দাঁতের মধ্যে ভেঙে পিষে ছাতু করে দিয়ে
থুতুতে মিশিয়ে আমি ঘৃণাভরে চারদিকে ছিটিয়ে দিতে পারি।
কিংবা–কিংবা–
বুঝতেই পারছেন, সব নাট-বল্টু একে-একে খুলে যাচ্ছে;
বুঝতেই পারছেন, নৌকো ফেঁসে যাচ্ছে;
বুঝতেই পারছেন, আমি ক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছি, মহাশয়।
‘খ্যাপা খুঁজে-খুঁজে ফেরে পরশপাথর।’
আমি একটা শব্দ খুঁজছি, মহাশয়।
নক্ষত্রলোকের দিকে যাব বলে আমি
চল্লিশ বছর ধরে হাটেমাঠে টই-টই রোদ্দুরে
বিস্তর শব্দের ঘাড় মটকালুম। অথচ দেখুন,
‘আচমন’-এর তুল্য কোনো সুলক্ষণ শব্দ আমি এখনও পাইনি।
দুই কশে গড়াচ্ছে রক্ত, চক্ষু লাল, বুকের ভিতরে
গনগনে আগুন জ্বেলে
চল্লিশ বছর ধরে শুধু আমি হাতের চেটোর উলটো পিঠে
কপাল ঘষছি।
অথচ ভাবুন,
কিছু সুলক্ষণ শব্দ হাতের সামনেই ছিল কি না।
বহু সুলক্ষণ শব্দ হাতের সামনেই ছিল, কিন্তু আমি আজ
আচমকা তাদের দেখলে চিনতে পারি না।
একদা-দুর্দান্ত-কিন্তু-রকবাজের-হাতে-পড়ে-নষ্ট-হয়-যাওয়া
সমুন্নত সুন্দর-ললাট বহু শব্দ ইদানীং
হাড্ডিসার, রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিড়ি ফোঁকে।
জাহাজ, পতন, মৃত্যু, মাস্তুল প্রমুখ
পরাক্রান্ত শব্দগুলি
এখন ক্রমেই
ইঁদুরের মতন ছুঁচলো-মুখ হয়ে যাচ্ছে, মহাশয়।
পাউডার-পমেড-মাখা যে-কোনো ছোকরার
পুরনো কম্বলে লাথি ঝাড়লেই ‘পতন’ ‘মৃত্যু’ ‘মাস্তুল’ ইত্যাদি
ইঁদুর কিচকিচ করে ওঠে।
কিচকিচ কিচকিচ, শুধু কিচকিচ কিচকিচ ছাড়া ইদানীং
অন্য-কোনো ধ্বনি
শুনতে পাই না!
শুধুই লোভের ধূর্ত মার্কামারা মুখ ভিন্ন অন্য-কোনো মুখ
দেখতে পাই না।
বুঝতেই পারছেন, সব নাট-বল্টু একে-একে খুলে যাচ্ছে;
বুঝতেই পারছেন, নৌকো ফেঁসে যাচ্ছে,
বুঝতেই পারছেন, আমি ক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছি, মহাশয়।
অথচ এখনও আমি সুলক্ষণ একটা-কোনো শব্দের উপরে
সওয়ার হবার জন্যে বসে আছি।
অথচ এখনও আমি নক্ষত্রলোকের দিকে যেতে চাই।
অথচ এখনও আমি মেঘের পৈঠায় মা ঝুলিয়ে
জ্যোৎস্নায় কুলকুচো করব, এইরকম আশা রাখি।
একটা শব্দ দিন, একটা শব্দ দিন, মহাশয়।
রক্তের ভিতরে ঘোর জলস্তম্ভ ঘটিয়ে যা মুহূর্তে আমাকে
শূণ্যলোকে ছুড়ে দেবে–
চাঁদমারি-খসানো আমি এমন একটাই মাত্র শব্দ চাই।
নেই নাকি?
তবে দিন,
বুলেটের মতো একটা শব্দ দিন। আমি
যেটাকে বন্দুকে পুরে, ট্রিগারে আঙুল রেখে–কড়াক পিং–
নকল বুঁদির কেল্লা ভেঙে দিয়ে ফাটা কপালের রক্ত মুছে
হেসে উঠতে পারি।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
স্বদেশমূলক
|
যেখানে পা ফেলবি, তোর মনে হবে, বিদেশে আছিস।
এই তোর ভাগ্যলিপি।
গাছপালা অচেনা লাগবে, রাস্তাঘাট
অন্যতর বিন্যাসে ছড়ানো,
সদরে সমস্ত রাত কড়া নাড়বি, তবু
বাড়িগুলি নিদ্রার গভীর থেকে বেরিয়ে আসবে না।
এই তোর ভাগ্যলিপি।
সকলে বলবে না কথা; যারা বলবে,
তারা পর্যটন বিভাগের কর্মী মাত্র,
যে-কোনো টুরিস্ট্কে তারা দুটি-চারটি ধোপদুরস্ত কথা
উপহার দিয়ে থাকে,
তার জন্যে মাসান্তে মাইনে পায়।
এই তোর ভাগ্যলিপি।
যেখানি যাবি, তোর মনে হবে, এইমাত্র উড়োজাহাজের
পেটের ভিতর থেকে ভিন্ন-কোনো ভূমির উপরে
নেমে এসেছিস।
এই তোর ভাগ্যলিপি।
কাপড় সরিয়ে কেউ বুকের রহস্য দেখবে না।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
যৌবনে আনন্দ নেই, যদি তার সমস্ত সম্ভার
আমৃত্যু অক্ষয় থাকে। ক্ষয়ে তার শান্তি, জীবনের
প্রার্থনা পূরণ। এই অপরূপ প্রথম-গ্রীষ্মের
আলস্যের ভারে নম্র আদিগন্ত রৌদ্র-হাওয়া-নীলে
সামান্যই সুখ, দুঃখ অসামান্য : সে-ঐশ্বর্যে তার
শুধু ব্যর্থ সঞ্চয়ের বিড়ম্বনা বাড়ে। এ-যৌবন
রিক্তই না হয় যদি, বঞ্চনায় বাঁচে তিলে তিলে,–
শাস্তিও সান্ত্বনা তার, মৃত্যু তার সন্তাপহরণ।
সে-মৃত্যু যখনই নামে বিদ্যুৎবিদীর্ণ ঘন মেঘে
বৃষ্টির ধারায়, তুচ্ছ যৌবনজড়িমা লজ্জা সব;
প্রাণের সমস্ত পাপড়ি মেলে তার দেবতাদুর্লভ
আলিঙ্গনে সংকোচের বৃন্ত থেকে খসে পড়ে যাওয়া–
সে-ই তো আমার স্বর্গ। প্রত্যাশায় সারারাত্রি জেগে
হাওয়ার হাততালি শুনি; হাওয়া, হাওয়া–অফুরন্ত হাওয়া!
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
আমি বললুম, “এটা কিছু নয়।”
তিনি বললেন, “এটাই
মন্দাকিনীর ধারা নিশ্চয়,
এতেই তৃষ্ণা মেটাই।”
আমি বললুম, “মন্দাকিনী কি
এত কাছে? এটা ছল।”
তিনি বললেন, “না, না, এটা ঠিকই
স্বর্গঙ্গার জল।”
আমি বললুম, “পিছনের টানে
ঠিক নয় বসে যাওয়া।”
তিনি বললেন ,”বইছে এখানে
অতি পবিত্র হাওয়া।”
আমি বললুম, “বসুন তা হলে,
স্নান করে হাওয়া খান,–
পাথরে পা রেখে আমি যাই চলে।”
তিনি বললেন, “যান।”
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
কবিতার পাণ্ডুলিপি ধীরে-ধীরে তৈরী হয়ে ওঠে।
বন্ধু ও স্বজনবর্গ
ক্রমে আরও দূরে সরে যায়।
ক্রমশ অস্পষ্ট হয় যৌবনের আনন্দ-যন্ত্রণা।
মনে হয়,
যৎপরোনাস্তি যে-শব্দনিচয় একদা খুবই অর্থবহ ছিল,
আজ তিলমাত্র অর্থ বহন করে না।
দিন দীর্ঘ হয়, রাত্রি
আরও দীর্ঘ, স্মৃতির ভিতরে
পোকা হাঁটে, হাওয়া ঘুরে যায়।
পুড়ে যায়
প্রাচীন পুঁথি ও পান্থশালা। একদিকে
ঝরিয়ে সমস্ত পুষ্প, পল্লবিত সমস্ত দুরাশা
বৃক্ষগুলি রিক্ত হয়, ঘাসে
মাকড়সা চালায় মাকু, সন্ন্যাসীরা
সংসার সাজিয়ে ক্রমে আরও
অধিক সংসারী হয়। অন্যদিকে ভুবন-ভাসানো
তরঙ্গিত নদী
নিজেরই বুকের মধ্যে কুমড়ো, শসা, তরমুজ ফলিয়ে
মরে যেতে থাকে।
তারই মধ্যে শিল্পী তার ছবি আঁকে,
তারই মধ্যে দিনে-দিনে তৈরী হয়ে ওঠে
আর-একটি কবিতা।
কী থেকে তৈয়ার হয়? অপমান থেকে?
এমন প্রত্যাশা থেকে, যা শুধুই বিদ্রুপ কুড়ায়?
স্থিরত্বলোলুপ স্মৃতিসৌধের চূড়ায়,
বাজারে, ফুটপাথে, ইস্টিশানে,
নিত্যযাত্রিবাহী ট্রেনে, স্নানঘাটের চৌচির পাথরে,
হাটে, মাঠে,
ময়দানের মিটিংয়ে, মজলিসে,
কাগুজে বাঘের পাঁজরা-কাপানো গম্ভীর ঘোষণায়,
বাসে, ট্রামে, মফস্বলে রথের মেলায়
যত না প্রত্যাশা তার চতুর্গুণ বিদ্রুপ ছড়ানো।
কবিতা কি
সেই প্রত্যাশার থেকে জন্ম নেয়? নাকি সেই প্রত্যাশার প্রতি
নিক্ষিপ্ত বিদ্রুপ থেকে?
মুদ্রণযন্ত্রের মধ্যে তপ্ত হৃৎপিণ্ডগুলি রেখে
ফিরে যায়
বিভিন্নবয়সী কিছু উন্মাদ বালক।
আমরা সেই ক্রান্ত ও পরাস্ত প্রত্যাবর্তনের রূপ
দেখতে থাকি। দেখি,
চতুর্দিকে ছড়িয়ে রয়েছে নষ্ট ভাষা।
দেখি,
মুণ্ডহীন প্রত্যাশার উপরে পা রেখে
আকাশে তুলেছে মাথা যূথবদ্ধ প্রকাণ্ড বিদ্রুপ।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
অমলকান্তি আমার বন্ধু,
ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম।
রোজ দেরি করে ক্লাসে আসতো, পড়া পারত না,
শব্দরূপ জিজ্ঞেস করলে
এমন অবাক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকতো যে,
দেখে ভারী কষ্ট হত আমাদের।
আমরা কেউ মাষ্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।
অমলকান্তি সে-সব কিছু হতে চায়নি।
সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল!
ক্ষান্তবর্ষণ কাক-ডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুর,
জাম আর জামরুলের পাতায়
যা নাকি অল্প-একটু হাসির মতন লেগে থাকে।
আমরা কেউ মাষ্টার হয়েছি, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।
সে এখন অন্ধকার একটা ছাপাখানায় কাজ করে।
মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে;
চা খায়, এটা-ওটা গল্প করে, তারপর বলে, “উঠি তাহলে।”
আমি ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।
আমাদের মধ্যে যে এখন মাষ্টারি করে,
অনায়াসে সে ডাক্তার হতে পারত,
যে ডাক্তার হতে চেয়েছিল,
উকিল হলে তার এমন কিছু ক্ষতি হত না।
অথচ, সকলেরই ইচ্ছেপূরণ হল, এক অমলকান্তি ছাড়া।
অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।
সেই অমলকান্তি–রোদ্দুরের কথা ভাবতে-ভাবতে
ভাবতে-ভাবতে
যে একদিন রোদ্দুর হতে চেয়েছিল।
১৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৯৫
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
“ফুলেও সুগন্ধ নেই। অন্ততঃ আমার
যৌবনবয়সে ছিল যতখানি, আজ তার অর্ধেক পাই না।
এখন আকাশ পাংশু, পায়ের তলায় ঘাস
অর্ধেক সবুজ, নদী নীল নয়। তা ছাড়া দেখুন,
স্ট্রবেরি বিস্বাদ, মাংস রবারের মতো শক্ত। ভীষণ সেয়ানা
গোরুগুলি। বালতি ভরে দুধ
দেয় বটে, কিন্তু খুব জোলো দুধ। নির্বোধ পশুও
দুগ্ধের ঘনতা আজ চুরি করে কী অবলীলায়।
এদিকে মদ্যও প্রায় জলবৎ। আগে
দু-তিনটে বিয়ার টেনে অক্লেশে মাতাল হওয়া যেত।
ইদানিং কম করেও পাঁচ বোতল লাগে।”
বার্মিংহামের সেই বুড়োটার লাগে। যে সেদিন
ফুল নদী ঘাস মেঘ আকাশ স্ট্রবেরি
মাংস দুধ ইত্যাদির বিরুদ্ধে ভীষণ
অভিযোগ তুলেছিল। যার বিধ্বস্ত মুখের ভাঁজে তিলমাত্র করুণা ছিল না,
উদরে সক্রিয় ছিল পাঁচ বোতল ঘোলাটে বিয়ার।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
জলের কল্লোলে যেন কারও কান্না শোনা গেল,
অরণ্যের মর্মরে কারও দীর্ঘনিশ্বাস।
চকিত হয়ে ফিরে তাকাতেই দেখা গেল
নির্বান্ধব সেই বাবলা গাছটাকে।
আর আর তাকে গাছ বলে মনে হল না;
মনে হল,
সংসারের সমস্ত রহস্য জেনে নিয়ে
কেউ যেন জলের ধারে এসে দাঁড়িয়েছে।
ফলত, যা হয়,
অত্যন্ত বিব্রত বোধ করল সেই মানুষটি।
কেননা, জীবনের কাছে মার খেয়ে
প্রকৃতির কাছে সে তার দুঃখ জানাতে এসেছিল।
প্রকৃতি নিজেরই এত দুঃখ
সে তা জানত না।
জলের কল্লোলে যে কারও কান্না ধ্বনিত হতে পারে,
অরণ্যের মর্মরে কারও নিশ্বাস,
সে তা বোঝেনি।
এবং ভাবেনি যে নদীর ধারের বাবলা গাছটাকে আজ
বিষণ্ণ একটা মানুষের মত দেখাবে।
নদীকে সে তার দুঃখ জানাতে এসেছিল;
জানাল না।
সন্ধ্যার আগেই সে তার ঘরে ফিরে এল।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
ওই যে গোলাপ দুলছে, ও কি
ফুল না আগুন, ঠিক বুঝি না।
এগিয়ে গিয়ে পিছিয়ে আসি,
ভাবতে থাকি ধরব কি না।
ভাবতে থাকি, ঠিক কতবার
ফুলের বনে ভুল দেখেছি।
ভরদুপুরে গোলাপ ভেবে
অগ্নিশিখায় হাত রেখেছি।
গোলাপ, তুমি গোলাপ তো ঠিক?
হও যদি সেই আগুন, তবে
এই অবেলায় ফুলের খেলায়
ফের যে আমায় পুড়তে হবে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
আংটিটা ফিরিয়ে দিও ভানুমতী, সমস্ত সকাল
দুপুর বিকেল তুমি হাতে পেয়েছিলে।
যদি মনে হয়ে থাকে, আকাশের বৃষ্টিধোয়া নীলে
দুঃখের শুশ্রূষা নেই, যদি
উন্মত্ত হাওয়ার মাঠে কিংশুকের লাল
পাপড়িও না পেরে থাকে রুগ্ণ বুকে সাহস জাগাতে,
অথবা সান্ত্বনা দিতে বৈকালের নদী,–
আংটিটা ফিরিয়ে দিও সন্ধ্যার সহিষ্ণু শান্ত হাতে।
আংটিটা ফিরিয়ে দিও, এ-আংটি যেহেতু তারই হাতে
মানায়, যে পায় খুঁজে পত্রালির ভিড়ে
ফুলের সুন্দর মুঘ, ঘনকৃষ্ণ মেঘের শরীরে
রৌদ্রের আলপনা। কোনো ক্ষতি
ফেরাতে পারে না তাকে তীব্রতম দুঃখের আঘাতে।
আংটিটা ফিরিয়ে দিও, তাতে দুঃখ নেই, ভানুমতী।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
জলের উপরে ঘুরে ঘুরে
জলের উপরে ঘুরে ঘুরে
ছোঁ মেরে মাছরাঙা ফের ফিরে গেল বৃক্ষের শাখায়।
ঠোঁটের ভিতরে তার ছোট্ট একটা মাছ ছিল।
কে জানে মাছরাঙা খুব সুখী কি না।
রোদ্দুরে ভীষণ পুড়ে পুড়ে
রোদ্দুরে ভীষণ পুড়ে পুড়ে
সন্ধ্যায় অনন্তলাল ফিরেছে অভ্যস্ত বিছানায়।
মস্তিষ্কে তখনও তার রূপকথার গাছ ছিল;
গাছের উপরে ছিল হিরামন পাখি।
কে জানে অনন্তলাল সুখী কি না।
শব্দের পাথরে মাথা খুঁড়ে
শব্দের পাথরে মাথা খুঁড়ে
কেউ কি কখনও মাছ, বৃক্ষ কিংবা পাখির কঙ্কাল পেয়ে যায়?
ভাবতেই ভীষণ হাসি পাচ্ছিল।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
১.
তোমরা পুরানো বন্ধু। তোমরা আগের মতো আছ।
আগের মতোই স্থির শান্ত স্বাভাবিক।
দেখে ভাল লাগে।
প্রাচীন প্রথার প্রতি আনুগত্যবশত তোমরা
এখনও প্রত্যহ দেখা দাও,
কুশল জিজ্ঞারা করো আজও।
দেখে ভাল লাগে।
তোমরা এখনও সুস্থ অনুগত আলোকিত আছ।
তোমরা পুরনো বন্ধু। অমিতাভ স্নেহাংশু অমল।
তোমরা এখনও
সুস্থির দাঁড়িয়ে আছ আপনি জমিতে।
সাঁইত্রিশ বছর তোমরা আপন জমিতে
দাঁড়িয়ে রয়েছ সুস্থ মাননীয় বৃক্ষের মতন।
দেখে ভাল লাগে।
আমি নিজে সুস্থ নই, সূর্যালোকে সুন্দর অথবা।
২.
আমি নিজে সুস্থ নই, আলোকিত সুন্দর অথবা।
আমি এক সুদূর বিদেশে,
অতি দূর অনাত্মীয় আঁধার বিদেশে
বৃথাই ঘুরেছি
দীর্ঘ দশ বছর, অমল।
অমল, তুমি তো রৌদ্র হতে চেয়েছিলে;
স্নেহাংশু, তোমার লক্ষ্য আকাশের অব্যয় নীলিমা;
তুমি অমিতাভ, তুমি জলের তরঙ্গ ভালবাসো।
আমি দীর্ঘ এক যুগ রোদ্দুরের ভিতরে যাইনি।
আকাশ দেখিনি।
সমুদ্র দেখিনি।
কী করে আকাশ তার মুখ দেখে সমুদ্রে–দেখিনি।
আমি এক আঁধার বিদেশে
চোখের সমস্ত আলো, বুকের সাহস,
দেহের সমস্ত স্বাস্থ্য তিলে-তিলে বিসর্জন দিয়ে,
দিনকে রাত্রির থেকে পৃথক জা-জেনে
দিন কাটিয়েছে।
৩.
আঁধার বিদেশ থেকে কখনও ফেরে না কেউ। আমি
আবার ফিরেছি।
ফ্যাকাশে চামড়া, চোখে মৃত মানুষের দৃষ্টি নিয়ে
ফিরেছি আবার আমি অমিতাভ, স্নেহাংশু, অমল।
এবং দেখেছি তোমাদের।
তোমার পুরানো বন্ধু। তোমরা আগের মতো আছ।
দেখে ভাল লাগে।
তোমরা এখনও সুস্থ অনুগত আলোকিত আছ।
দেখে ভাল লাগে।
আমিও আবার স্থির সুস্থ স্বাভাবিক হতে চাই।
আতি আমি ফিরেছি আবার
অমিতাভ, স্লেহাংশু, অমল।
তাই তোমাদের কাছে আবার এসেছি।
তিনটি জীবন্ত চেনা মানুষের কাছে
এসে দাঁড়িয়েছি।
উপরে আকাশ, নীচে অনন্ত সুন্দর জলরাশি,
পিছনে পাহাড়,
শোণিতে দৃশ্যের আলো জ্বলে।
আমি এইখানে এই বান-ডাকা রৌদ্রের বিভায়
অবিকল মাননীয় বৃক্ষের মতন
দু’ দণ্ড দাঁড়াব।
স্বাস্থ্য ফিরাবার জন্য এখন খানিক পথ্য প্রয়োজন হবে।
আমি এইখানে এই সমুদ্রবেলায়
অফুরন্ত নীলিমার নীচে
প্রত্যহ এখন যদি একগ্লাস টাট্কা রোদ খেয়ে যেতে পারি,
তবে আমি সুস্থ হয়ে যাব।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
এই তো আমার অঞ্জলিতেই মস্ত পুকুর,
কেউ আচম্কা ছুঁড়লে ঢেলা
দেখতে থাকি কেমন করে প্রকাশ্য হয়
খুব নগণ্য ছেলেবেলা।
দর্পণে মুখ লগ্ন রেখে ছোট্ট খুকুর
এখন দিব্যি কাটে সময়।
কাটুক, এখন হাওয়ায় উড়ছে অনভ্যস্ত শাড়ির আঁচল,
অঞ্জলিতে টলটলে জল।
পৌঢ় বোঝে পৌঢ়তা কী, বৃদ্ধ বোঝে
বয়স বলতে কী ঝামেলা,
কিন্তু খুকু, এখন তুমি এতই অল্পবয়স্ক যে,
তোমার উপলব্ধিতে নেই ছেলেবেলা।
যখন থাকবে, তখন তুমি অনেক বড়,
কিন্তু, তখন আর-এক শীতে
নজর করলে দেখতে পাবে, কেমনতরো
জলের বর্ণ পালটে গেছে অঞ্জলিতে।
কেউ বলে জল, কেউ-বা স্মৃতি, কেউ-বা সময়,
কেউ আচম্কা ছুঁড়লে ঢেলা
হঠাৎ যেন একটু-একটু প্রকাশ্য হয়
খুব নগণ্য ছেলেবেলা।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
লালবাতির নিষেধ ছিল না,
তবুও ঝড়ের বেগে ধাবমান কলকাতা শহর
অতর্কিতে থেমে গেল;
ভয়ঙ্করভাবে টাল সামলে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল
ট্যাক্সি ও প্রাইভেট, টেমপো, বাঘমার্কা ডবল-ডেকার।
‘গেল গেল’ আর্তনাদে রাস্তার দুদিক থেকে যারা
ছুটে এসেছিল—
ঝাঁকামুটে, ফিরিওয়ালা, দোকানি ও খরিদ্দার—
এখন তারাও যেন স্থির চিত্রটির মতো শিল্পীর ইজেলে
লগ্ন হয়ে আছে।
স্তব্ধ হয়ে সবাই দেখছে,
টালমাটাল পায়ে
রাস্তার এক-পার থেকে অন্য পারে হেঁটে চলে যায়
সম্পূর্ণ উলঙ্গ এক শিশু।
খানিক আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে চৌরঙ্গিপাড়ায়।
এখন রোদ্দুর ফের অতিদীর্ঘ বল্লমের মতো
মেঘের হৃৎপিণ্ড ফুঁড়ে
নেমে আসছে;
মায়াবী আলোয় ভাসছে কলকাতা শহর।
স্টেটবাসের জানালায় মুখ রেখে
একবার আকাশ দেখি, একবার তোমাকে।
ভিখারি-মায়ের শিশু,
কলকাতার যিশু,
সমস্ত ট্রাফিক তুমি মন্ত্রবলে থামিয়ে দিয়েছ।
জনতার আর্তনাদ, অসহিষ্ণু ড্রাইভারের দাঁতের ঘষটানি,
কিছুতে ভ্রুক্ষেপ নেই;
দু’দিকে উদ্যত মৃত্যু, তুমি তার মাঝখান দিয়ে
টলতে টলতে হেঁটে যাও।
যেন মূর্ত মানবতা, সদ্য হাঁটতে শেখার আনন্দে
সমগ্র বিশ্বকে তুমি পেয়ে চাও
হাতের মুঠোয়। যেন তাই
টাল্মাটাল পায়ে তুমি
পৃথিবীর এক-কিনার থেকে অন্য-কিনারে চলেছ।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
অরণ্য, আকাশ, পাখি, অন্তহীন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে–
আকাশ, সমুদ্র, মাটি, অন্তহীন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে–
সমুদ্র, অরণ্য, পাখি, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে
যতই ঘোরাও, আমি কী নতুন দেখব জাদুকর?
যেন দূরদেশে কোন্ প্রভাতবেলায়
যেতে গিয়ে আবার ফিরেছি
আজন্ম নদীর ধারে, পরিচিত বৃষ্টির ভিতর।
যেন সব চেনা লাগে। ফুল, পাতা, কিউমুলাস মেঘের জানালা,
সটান সহজ বৃক্ষ, গ্রামের সুন্দরী, আর
নানাবিধ গম্বুজ মিনার।
যেন যত দৃশ্য দেখি আয়নার ভিতরে,
উদ্ভিদ, মানুষ, মেঘ, বিকেলবেলার নদী–
বৃষ্টির ভিতরে সব দেখা হয়, সব
নিজের মুখের মতো পরিচিত। আমি
এই পরিচিত দৃশ্য করবার দেখবে জাদুকর?
আয়নায় জলের স্রোত, অন্তহীন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে
উদ্ভিদ, মানুষ, মেঘ, অন্তহীন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে–
হাতের আমলকীমালা, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে
যতই ঘোরাই, আমি কী নতুন দেখব জাদুকর?
বৃষ্টির ভিতরে সব দেখি যেন, আমি
আজন্ম নদীর ধারে, প্রাচীন ছায়ায়
পাহাড়, গম্বুজ, মেঘ, গ্রামের বালিকা,
দেবালয়, নদীজলে বশংবদ দৃশ্যের গাগরি–
দেখে যাই, যেন সব বৃষ্টির ভিতরে দেখে যাই।
যখন প্রত্যকে আজ দ্বিতীয় স্বদেশে
চলেছে, তখনও দেখি আয়নার ভিতরে জলধারা
নেমেছে রক্তের মতো। যাবতীয় পুরানো দৃশ্যের
ললাটে রক্তের ধারা বহে যায়। আমি
পুরানো আয়নায় কাঁচ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে
নিজের রক্তাক্ত মুখ কত আর দেখব জাদুকর?
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
স্বদেশমূলক
|
পেটে-আসছে-মুখে-আসছে না, সেই কথাটা, সেই
হঠাৎ-শুনতে-পাওয়া কথাটা আমি
ভুলে গিয়েছি।
যে-কথা অস্ফুট স্বরে তুমি একদিন
যে-কথা অর্ধেক রাত্রে তুমি একদিন
সে-কথা স্বপ্নের মধ্যে তুমি একদিন বলেছিলে।
স্বপ্নের মধ্যে কেউ যখন কথা বলে,
তখন তাকে খুব অচেনা মানুষ বলে মনে হয়।
তখন তার নিদ্রিত মুখের দিকে তাকালে আমার মনে হয়,
অনেক বড়-বড় সমুদ্র পেরিয়ে, তারপর
অনেক উঁচু-উঁচু পাহাড় ডিঙিয়ে, তারপর
সুদীর্ঘ প্রবাস-জীবনের শেষে সে তার স্বদেশে ফিরেছে।
একমাথা রুক্ষ চুল, পায়ে ধুলো,
ঘুমের মধ্যে সে তার স্বদেশে ফিরেছে।
ঘুমের মধ্যে সে তার আপন ভাষায় কথা বলছে।
প্রিয় গাভীটির গলকম্বলে হাত বুলোতে-বুলোতে
খুব গভীর স্বরে সে তার বাড়ির লোকজনদের জিজ্ঞেস করছে,
সে যখন বিদেশে ছিল, তখন তার
আঙুল-বাগানোর পরিচর্যা ঠিকমতো হত কি না, তখন তার
খেতের আগাছা ঠিকমতো নিড়িয়ে দেওয়া হত কি না, তখন তার
গ্রামে কোনও বড়-রকমের উৎসব হয়েছিল কি না।
ঘুমের মধ্যে কি এসব প্রশ্ন করেছিলে তুমি?
আমার মনে নেই।
পেটে-আসছে-মুখে-আসছে না, সেই কথাটা, সেই
হঠাৎ-শুনতে পাওয়া কথাটা আমি
ভুলে গিয়েছি।
যে-কথা অস্ফুট স্বরে তুমি একদিন
যে-কথা অর্ধেক রাত্রে তুমি একদিন
যে-কথা স্বপ্নের মধ্যে তুমি একদিন বলেছিলে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
নদী গ্রাস করে নিচ্ছে সাজানো-গোছানো ঘরবাড়ি।
নিকোনো উঠোন থেকে ঠাকুরদালানে,
ঘরে, বারান্দায়, সবখানে
এখন দিনে ও রাত্রে শুনে যাই তারই
তরঙ্গের ছলোচ্ছল শব্দ। আমি ঘুমের ভিতরে
ডুবে গিয়ে যে-শব্দ শুনেছি চিরকাল,
বিনিদ্র প্রহরে আজ উথালপাথাল
সেই শব্দ চতুর্দিকে ঘোরে।
নদী কিছু চেয়েছিল, চেয়েও পায়নি, তাই তার
জল উঠে এসেছিল সীমানা ছাড়িয়ে।
সবকিছু ভেঙেচুরে পেটের ভিতরে টেনে নিয়ে
সে তাই আবার
ফিরে গেছে নিজের নির্দিষ্ট সীমানায়।
শুধুই দেয় না নদী, কিছু চায়, চিরকাল চায়।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
বৃষ্টি থেমে গেছে, কিন্তু বাতাসে জলের গন্ধ রয়েছে এখনও।
আকাশের ভাবগতিক দেখে মনে হয়,
খানিকটা জিরিয়ে নিয়ে সে আবার কাজে লেগে যাবে।
পাখিরা তা জানে, তাই কোনো
উৎসাহ তাদেরও নেই এই মুহূর্তে ডানা ছড়াবার।
দিকচিহ্নহীন
যে-বিশ্বে রঙের স্পর্শ এতক্ষণ কোথাও ছিল না,
মেঘের আড়াল থেকে সূর্যদেব বিদায়ের ক্ষণে
সেখানে সামান্য রঙ ছড়িয়ে দিলেন।
জানালায় বসে দেখি শেষ হল আরও একটি দিন
অন্তিম শ্রাবণে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
আকাঙ্ক্ষা তাকে শান্তি দেয়নি,
শান্তির আশা দিয়ে বার বার
লুব্ধ করেছে। লোভ তাকে দূর
দুঃস্থ পাপের পথে টেনে নিয়ে
তবুও সুখের ক্ষুধা মেটায়নি
দিনে দিনে আরও নতুন ক্ষুধার
সৃষ্টি করেছে; সুখলোভাতুর
আশায় দিয়েছে আগুন জ্বালিয়ে।
এই যে আকাশ, আকাশের নীল,
এই যে সুস্থসবল হাওয়ার
আসা-যাওয়া, রূপরঙের মিছিল,
কোনোখানে নেই সান্ত্বনা তার।
বন্ধুরা তাকে যেটুকু দিয়েছে,
শত্রুরা তার সব কেড়ে নিয়ে
কোনো দূরদেশে ছেড়ে দিয়েছিল
কোনো দুর্গম পথে। তারপর
যখন সে প্রায় ফুরিয়ে গিয়েছে,
শোকের আগুনে পুড়িয়ে পুড়িয়ে
প্রেম তাকে দিল সান্ত্বনা, দিল
স্বয়ংশান্তি তৃপ্তির ঘর।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
যে যেখানে পারে, সেইখানে থোয়
কেড়েকুড়ে আনে যা সে,
কিছু থাকে তার হাতের মুঠোয়,
কিছু ঝরে যায় ঘাসে।
যে সে রেখেছিল লোহার খাঁচায়,
হয়েছে পাখির দানা
কিছুটা মোরগে ঠুকরিয়ে খায়,
কিছু শালিখের ছানা।
সিঁদকাঠি হাতে গর্ত খুঁড়ছে
এই রাত্রে যে, তার
জানা নেই তারই পিছনে ঘুরছে
তিন জোড়া বাটপার।
যে সেখানে পারে, রাখে সেইখানে
কেড়ে-আনা টাকাকড়ি,
তাই দেখে হাসে বাবুর বাগানে
শ্বেতপাথরের পরি।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
সে যেমন আসে, ঠিক তেমনি চলে যায়।
গল্পে, গানে, ঠোঁট-ফোলানো অভিমানে, প্রকাণ্ড ঠাট্টায়
সব-কিছু ভাসিয়ে তার যাওয়া।
ভোরবেলার হাওয়া
দৌড়তে-দৌড়তে নিয়ে আসে
বৃষ্টির খবর। ঘাসে
দোলা লাগে, চর্তুদিকে বেজে ওঠে অশথ-পাতার
ঝর্ঝর গানের শব্দ, জানালার
পর্দাটা সরালে
দেখা যায় জামরুলের ডালে
খেলা করছে তিনটে-চারটে-পাঁচটা-ছটা পাখি।
আমি তাকে ডাকি,
বলি, চলো, কলকাতায় যাই,
পাতাল-রেলের জন্যে মাটি খুঁড়ি, সুরঙ্গ বানাই,
রাস্তা করি চওড়া, তাতে ছাড়ি
আরও পাঁচশো বাঘমার্কা দোতলা হাওয়াগাড়ি,
পরিচ্ছন্ন করে তুলি মানিকতলার খাল,
হটাই জঞ্জাল
রাস্তা ও ফুটপাথ থেকে,
সদর-দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ি, গৃহস্থকে ডেকে
প্রত্যেকটা বাড়ির কলি
ফেরাই, প্রত্যেকটা কানাগলি
দৃষ্টি পাক,
সন্ধ্যায় প্রত্যেকে তার নিজস্ব নারীর কাছে ফিরে যাক
নিরুদ্বেগ শান্ত মনে।
এখনও নিতান্ত অকারণে
গঙ্গার কিনারে আছে দ্বিধাগ্রস্ত ভঙ্গিতে যে ঝুঁকে,
চলো, সেই দ্বিতীয় সেতুকে
ঘাড়ে ধরে হাওড়ায় পৌঁছিয়ে দিয়ে আসি।
চুরাশি-অষ্টাশি
অব্দি কে অপেক্ষা করবে। ধেত্তেরিকা, অদ্দিন কি বাঁচব নাকি?
স্পষ্ট করে এক্ষুণি জানিয়ে রাখি,
পঞ্চাশ পেরুলে
দেখা যায়, মাথার কলকব্জা গেছে খুলে,
কাঠ খেয়েছে ঘুণে আর ইঁট খেয়েছে নোনা।
তোমরা থাকো, আমি আর অপেক্ষা করব না।
পুরনো বিশ্বাসগুলি ধুঁকে মরছে,
পুরনো ঘরবাড়িগুলি মুহুর্মুহু ধসে পড়ছে,
কয়লা পুড়তে পুড়তে হচ্ছে ছাই।
আমার যা-কিছু চাই, এই মুহূর্তে চাই।
যেটা প্রাপ্য, এক্ষুনি তা পাব,
যা-কিছু বানানো হয়নি, এক্ষুনি বানাব।
শুধুই কি রাস্তা, সেতু, ঘড়বাড়ি ও যানবাহন?
তিপান্ন কাহন
সমস্যার খুলতে হবে জট।
চতুর্দিকে আমূল পাল্টাতে হবে দৃশ্যপট।
বৃদ্ধ যাতে ভোলে শোক,
হাসতে-হাসতে খেলতে-খেলতে বেড়ে ওঠে সমস্ত বালক,
ভিটেবাড়ি কোত্থাও না-করে যাতে খাঁ-খাঁ,
না-ভাঙে কোত্থাও কারও শাঁখাঁ,
আর মাছি না-পড়ে কারও ভাতে,
তারই জন্যে দিনে-রাতে
ছুটতে হবে গ্রামে, গঞ্জে, সমস্ত জায়গায়।
আয়,
এই আমার শেষবারের মতো ছুটে যাওয়া।
ভোরবেলার হাওয়া
পাগলা-ঘণ্টি বাজাতে-বাজাতে এসে বলল, তুমি কাকে
ডাকছ, সে তো সুবর্ণরেখার বাঁকে
কাল রাতে মিলিয়ে গেছে, আমরাই ক’জন
তাকে নিয়ে তরঙ্গে দিয়েছি বিসর্জন,
তার প্রগল্.ভ হাসি আর বাজবে না কক্ষনো কোনোখানে।
শ্রাবণের বৃষ্টিধারা আনে
অশত্থ-পাতার
ঝর্ঝর গানের শব্দ, জানালার
পর্দাটা সরালে
দেখা যায় জামরুলের ডালে
খেলা করছে তিনটে-চারটে-পাঁচটা-ছ’টা পাখি।
তবু ডাকি। আজও ডাকি। আসবে না জেনেও তাকে ডাকি।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
কেউ কি শহরে যাবে? কেউ যাবে? কেউই যাব না।
বরং ঘনিষ্ঠ এই সন্ধ্যার সুন্দর হাওয়া খাব,
বরং লুণ্ঠিত এই ঘাসে-ঘাসে আকণ্ঠ বেড়াব
আমি, অমিতাভ আর সিতাংশু।
সিতাংশু, এই ভাল,
শহরে ফিরব না। দ্যাখো, অমিতাভ, কতখানি সোনা
ডুবে গেল নদীর শরীরে। দ্যাখো, তরঙ্গের গায়ে
নৌকার লণ্ঠন থেকে আলো পড়ে, আলো কাঁপে, আলো
ভেঙে-ভেঙে যায়।
কেউ কি শহরে যাবে? কেউ যাবে? কেউই যাব না।
শহরে প্রচণ্ড ভিড়, অকারণ তুমিল চিৎকার,
লগ্ন নিয়নের বাতি। শহরে ফিরব না কেউ আর।
বরং চুপ করে দেখি, অন্ধকারে নদী কত কালো
হতে পারে, অপচয়ী সূর্য তার সবটুকু সোনা
কী করে ওড়ায়; দেখি মৃদুকণ্ঠ তরঙ্গমালায়
নৌকার লণ্ঠন থেকে আলো পড়ে, আলো কাঁপে, আলো
ভেঙে-ভেঙে যায়।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
এ যেন আরণ্য প্রেত-রাত্রির শিয়রে এক মুঠো
জ্যোৎস্নার অভয়।
অন্তত তখন তা-ই মনে হয়েছিল
সুন্দরী হেলং, সেই পাহাড়িয়া বৃষ্টির তিমিরে।
সকাল থেকেই সূর্য নিখোঁজ। দক্ষিণে
স্পর্ধিত পাহাড়। বাঁয়ে অতল গড়খাই
উন্মাদ হাওয়ার মাতামাতি
শীর্ণ গিরিপথে।
যেন কোনো রূপকথার হৃতমণি অন্ধ অজগর
প্রচণ্ড আক্রোশে তার গুহা থেকে আথালি-পাথালি
ছুটে আসে; শত্রু তার পলাতক জেনে
নিজেকে দংশন হানে, আর
মৃত্যুর পাখসাট খায় পাথরে-পাথরে।
উপরে চক্রান্ত চলে ক্রূর দেবতার। ত্রস্ত পায়ে
নীচে নেমে আর-এক বিস্ময়।
এ কেমন অলৌকিক নিয়মে নিষ্ঠুর
ঝঞ্চা প্রতিহত, হাওয়া নিশ্চুপ এখানে।
নিত্যকার মতোই দোকানি
সাজায় পসরা, চাষি মাঠে যায়, গৃহস্থ-বাড়ির
দেয়ালে চিত্রিত পট, শান্ত গাঁওবুড়া
গল্প বলে চায়ের মসলিসে।
দুঃখের নেপথ্যে স্থির, আনন্দের পরম আশ্রয়
প্রাণের গভীরে মগ্ন, ক্ষমায় সহাস্য গিরিদরি–
সুন্দরী হেলং।
অন্তত তখন তা-ই মনে হয়েছিল
তোমাকে, হেলং, সেই পাহাড়িয়া বৃষ্টির তিমিরে।
এবং এখনও মনে হয়,
তীব্রতম যন্ত্রণার গভীরে কোথাও
নিত্য প্রবাহিত হয় সেই আনন্দের স্রোতস্বিনী
যে জাগায় দারুণ ভয়ের
মর্মকষে শান্ত বরাভয়।।
মনে হয়, রক্তরং এই রঙ্গমঞ্চের আড়ালে
রয়েছে কোথাও
নেপথ্য-নাটকে স্থির নির্বিকার নায়ক-নায়িকা,
দাঁড়ে টিয়াপাখি, শান্তি টবের অর্কিডে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
কলিং বেল বেজে উঠতেই
দরজার আই-হোল্-এ উঁকি মেরে যাকে দেখতে পেলুম,
তার চোখের কোনো চামড়া নেই, আর
গায়ের চামড়া ছাইবর্ণ।
চিনতে একটুই অসুবিধে হল না; কেননা
এর আগে আরও
সাত-আটবার এই লোকটিকে আমি দেখেছি।
শেষ দেখি ছিয়াত্তর সালে, যমুনোত্রীর পথে।
আলগা একটা পাথরে ঠোকর খেয়ে আমার ঘোড়াটা যখন
খাদের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে,
সামনের পাহাড়ের চূড়ায় তখন ওকেই আমি
দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলুম।
পথের উপরে ঝুঁকে-পড়া একটা গাছের ডাল আঁকড়ে ধরে
সেবারে আমি বেঁচে যাই।
মুখটা আমি চিনে রেখেছি। তাই ওকে
দেখবামাত্র আমার বুকের রক্ত ছল্কে ওঠে। আমি বুঝতে পারি
মৃত্যু আমার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।
আজও কি ওকে আমি ফিরিয়ে দিতে পারব?
কথাটা ভাবতে-ভাবতেই আমি
ঘুরে দাঁড়াই, এবং জীবনের হাত-দু’খানা আঁকড়ে ধরে বলি,
“সময় বড় কম,
এসো, আর দেরি না-করে আমাদের ঝগড়াটাকে এবারে
মিটিয়ে নেওয়া যাক।”
জীবন বলতে যে ঝগড়ুতে প্রেমিকার কথা আমি বোঝাচ্ছি,
স্পর্শ করবামাত্র তার মুখের উপরে এক
টকটকে রক্তাভা ছড়িয়ে যায়। আর
চোখের তারায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে ভোরবেলাকার রহস্যময় আলো।
মুখ নামিয়ে সে বলে,
“কিন্তু কলিং বেল যে বেজেই যাচ্ছে।”
তৎক্ষণাৎ তার কথার কোনো জবাব আমি দিই না।
জীবনকে আমি আমার বুকের মধ্যে টেনে নিই।
তারপর তার শরীরের
উষ্ণ আর্দ্রতার মধ্যে ডুবে যেতে-যেতে বলি,
“বাজুক।
এখন আর আমার কোনো তাড়া নেই।”
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
গীতিগাথা
|
ঠাকুমা বলতেন, “দাদা, খুব বেশি তো আর
বাঁচব না, এখন তাই সাধ্যমতো আল্গা দিয়ে থাকি।
যে অল্প সময় আছে বাকি,
দেখতে-দেখতে কেটে যাবে, তোমরা থাকো ভাল।
আমি দেখি কী করে আমার
আঁচলের গিঁটগুলোকে ধীরেসুস্থে খুলে ফেলা যায়।”
(যখনই বলতেন, বড় নম্র একটা আলো
ভেসে উঠত শান্ত দুটি অনচ্ছ চক্ষুর জানালায়।)
দিদি তো তক্ষুনি রেগে টং
বলত, “তুমি যাবে কোথা? দিচ্ছে বা কে যেতে?
আমরা চাইছি গল্প শুনতে, আমরা চাইছি খেতে।
নাড়ু, বড়ি, আম-কাসুন্দি খেয়ে দিব্যি আছি,
বুঝলে তো ঠাকুমা? তুমি বাজে কথা বাদ দিয়ে বরং
গল্প বলো, কিংবা সেই বিখ্যাত লাউয়ের-ঘণ্ট রাঁধো
মুগডাল ছড়িয়ে, আমরা চাট্টি খেয়ে বাঁচি।
মোট কথা গিঁটগুলি তুমি শক্ত করে বাঁধো।”
ঠাকুমা বলতেন, “দিদি, যে-লোকটা সব-কিছু ছেড়ে একা
চলে গেছে, তার কথা যে বড্ড মনে পড়ে।
সে-ও তো বলত, কলকাতা-শহরে
চিত্তসুন্দরীর থেকে সুন্দরী যদি-বা থাকে, তার
অর্ধেক সুন্দর রান্না কোত্থাও পাবে না।…যার দেখা
স্বপ্নে রোজ পাচ্ছি, দিদি, তাকে ছেড়ে আর কি থাকা যায়?”
(বলতে-বলতে হাসি ফুটে উঠত ঠাকুমার
মুখে, আলো ভাসত দুটি অনচ্ছ চক্ষুর জানালায়।)
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
ব্যঙ্গাত্মক
|
তিনি না-জানেন রাম, না-জানেন গঙ্গা।
না-চেনেন মাটি, না-চেনেন মানুষ।
মাটি বলতে তিনি নির্বাচনকেন্দ্র বোঝেন, এবং
মানুষ বলতে ভোটার।
রামপুরের মাটি যে
সাত ফুট জলের তলায় শুয়ে আছে,
এ খবরে তাঁর
সুনিদ্রার কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি,
কেননা
রামপুর তাঁর নির্বাচনকেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত নয়।
কিন্তু
গঙ্গানগরের গুটি-তিন বাচ্চা এবং জনাকয় থুত্থুড়ে বুড়োবুড়ি যে
বানের জলে ভেসে গিয়াছে,
এই খবর পেয়ে তাঁকে ঘুমের বড়ি খেতে হয়েছিল।
কিন্তু ঘুম ভাঙবার পরে
এখন আবার তাঁর শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে।
কেননা তিনি জানেন যে,
বাচ্চাদের ভোটাধিকার নেই, বেওং
যে গ্রাম থেকে
নিকটতম পোলিং বুথটিও অন্তত আড়াই মাইল দূরে,
পারতপক্ষে
বুড়োরা সেখানে ভোট দেয় না।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
মানবতাবাদী
|
পুকুর, মরাই, সবজি-বাগান, জংলা ডুরে শাড়ি,
তার মানেই তো বাড়ি।
তার মানেই তো প্রাণের মধ্যে প্রাণ,
নিকিয়ে-নেওয়া উঠোনখানি রোদ্দুরে টান্-টান্।
ধান খুঁটে খায় চারটে চড়ুই, দোলমঞ্চের পাশে
পায়রাগুলো ঘুরে বেড়ায় ঘাসে।
বেড়ালটা আড়মোড়া ভাঙছে; কুকুরটা কান খাড়া
করে শুনছে, কথা বলছে কারা।
পুবের সূর্য পাশ্চিমে দেয় পাড়ি,
দুপুরবেলার ঘুমের থেকে জেগে উঠছে বাড়ি।
লাঠির ডগায় পুঁটলি বাঁধা, অনেকটা পথ ঘুরে
লোকটা যাচ্ছে দূরের থেকে দূরে।
ওর চোখেও কি এমন একটা বাড়ির স্বপ্ন টানা?
ওর মনেও কি গন্ধ ছড়ায় গোপন হাস্নুহানা?
ও বড়বউ, ডাকো, ওকে ডাকো,
ওই যে লোকটা পার হয়ে যায় কাঁসাই নদীর সাঁকো।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
স্বদেশমূলক
|
ভাবতে ভাল লেগেছিল, এই ঘর, ওই শান্ত উঠোন,
এই খেত, ওই মস্ত খামার–
সবই আমার।
এবং আমি ইচ্ছে হলেই পারি
ইচ্ছেমতন জানলা-দরজা খুলতে।
ইচ্ছেমতন সাজিয়ে তুলতে
শান্ত সুখী একান্ত এই বাড়ি।
ভাবতে ভাল লেগেছিল, চেয়ার টেবিল,
আলমারিতে সাজানো বই, ঘোমটা-টানা নরম আলো,
ফুলদানে ফুল, রঙের বাটি,
আলনা জুড়ে কাপড়-জামার
সুবিন্যস্ত সমারোহ, সবই আমার।
এবং আমি ইচ্ছে হলেই পারি
দেয়ালে লাল হলুদ রঙের কাড়াকাড়ি
মুছে ফেলতে সাদার শান্ত টানে।
এই যে বাড়ি, এই তো আমার বাড়ি।
ভাবতে ভাল লেগেছিল, এই ঘর, ওই ঠাণ্ডা উঠোন,
এই খেত, ওই মস্ত খামার,
আলমারিতে সাজানো বই,
ফুলদানে ফুল, রঙের বাটি,
টবের গোলাপ, নরম আলো,
আলনা জুড়ে কাপড়-জামার
শৃঙ্খলিত সমারোহ, সবই আমার, সব-ই আমার।
ভাবতে ভাল লেগেছিল, কাউকে কিছু না জানিয়ে
হঠাৎ কোথাও চলে যাব।
ফিরে এসে আবার যেন দেখতে পারি,
যে-নদী বয় অন্ধকারে, তারই বুকের কাছে
বাড়িটা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।
ওই যে বাড়ি, ওই তো আমার বাড়ি।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
আমার তিন বন্ধু অমিতাভ, হরদয়াল আর পরমেশের সঙ্গে
আজকাল একটু
ঘনঘনই আমার দেখা হয়ে যাচ্ছে।
কখনও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের বাগানে
কখনও বালিগঞ্জের লেকে,
কখনও বা
উত্তর কলকাতার দেশবন্ধু পার্কের সেই
দেহাতি চা’ওয়ালার দোকানে,
গরম জলে চায়ের বদলে যে রোজ
হোগলা আর শালপাতার সঙ্গে এক-টুকরো
আদাও ফুটিয়ে নেয়।
ভিক্টোরিয়ার বাগানে হাঁটতে হাঁটতে আমাদের
গল্প হয়।
বালিগঞ্জের লেকের ধারে ছন্নমতি
বালক-বালিকাদের কাণ্ডকারখানা দেখতে-দেখতে আমাদের গল্প হয়।
দেশবন্ধু পার্কের ঘাসের উপরে উবু হয়ে বসে
ভাঁড়ের চা খেতে-খেতে আমাদের
গল্প হয়।
তবে যে-সব বিষয়বস্তু নিয়ে আমাদের গল্প হয়,
তার তাৎপর্য এখনকার মানুষরা ঠিক
বুঝবে না।
আমাদের গল্প হয়
মধ্য-কলকাতার সেই গলিটাকে নিয়ে,
গ্যাসের বাতির সবুজ আলোর মধ্যে
সাঁতার কাটতে-কাটতে
রাত বারোটায় যে হরেক রকম স্বপ্ন দেখত।
আমাদের গল্প হয়
এই শহরের অঘ্রাণের সেই ঘোলাটে আকাশটাকে নিয়ে,
শীলেদের বাড়ির মেঝো-তরফের বড় ছেলের
বিয়ের রাত্তিরে
চিনে কারিগর ডাকিয়ে যাবে
মস্ত-মস্ত আলোর নেকলেস পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
আমাদের গল্প হয়
কাঞ্চন থিয়েটারের প্রম্টারের সেই মেয়েটিকে নিয়েও,
আমরা প্রত্যেকেই যাকে একদিন
একটি করে গোড়ের মালা উপহার দিয়েছিলুম।
শেষের এই গল্পটা চলবার সময়ে আমরা
কেউই যে কিছুমাত্র
ঈর্ষার জ্বালায় জলিনা, বরং চারজনেই চার
উজবুকের মতো
হ্যা হ্যা করে হাসতে থাকি,
তার কারণ আর কিছুই নয়, আমরা প্রত্যেকেই খুব
বুড়িয়ে গেছে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
সর্বদা দেখি না, শুধু মাঝে-মাঝে দেখতে পাই।
যেমন গভীর রাত্রে, অন্ধকারে,
ক্বচিৎ কখনো
দুঃখের তাপিত বুক, বুকের উন্মত্ত ওঠানামা
করতলে ধরা পড়ে,
যেমন সমস্ত কিছু আঙুলের চক্ষু দিয়ে দেখা যায়!
সেইমতো।
যে-শরীর কোথাও দেখিনি, তার নতজানু অর্পিত ভঙ্গিমা;
যে-ওষ্ঠ কোথাও নেই, তার নিমন্ত্রণ;
যে-কঙ্কণ কোথাও ছিল না, তার রিনিঠিনি;
যে-আতর কোথাও বাসিনি, তার মাতাল সুবাস–
সব দেখা যায়।
সর্বদা শুনি না, শুধু মাঝে-মাঝে শুনতে পাই।
যেমন বধির তার কব্জির ঘড়িকে
কপালে ঠেকায়;
ঠেকিয়ে, যন্ত্রের হৃৎপণ্ডের ধুকধুক ধ্বনি
শুনে নেয়;
যেমন ললাট-লিপি তা-ই তার।
সেইমতো
শ্রবণে পড়ে না ধরা যত কিছু, যা-কিছু। রাত্রির
খরস্রোত প্রতীক্ষার
বিশাল ধুকধুক। ঘন অন্ধকারে
নয়নের তরল আগুন। যেন আগুলের মধ্যে যে বাসনা
পুড়ে যাচ্ছে, এই মাত্র তার
শব্দহীন অথচ বুকের-রক্ত-জমানো ভীষণ আর্তনাদ
শোনা গেল।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
শিম্পাঞ্জি, তোমাকে আজ বড় বেশি বিমর্ষ দেখলুম
চিড়িয়াখানায়। তুমি ঝিলের কিনারে।
দারুণ দুঃখিতভাবে বসে ছিলে। তুমি
একবারও উঠলে না এসে লোহার দোলনায়;
চাঁপাকলা, বাদাম, কাবলি-ছোলা–সবকিছু
উপেক্ষিত ছড়ানো রইল। তুমি ফিরেও দেখলে না।
দুঃখী মানুষের মতো হাঁটুর ভিতরে মাথা গুঁজে
ঝিলের কিনারে শুধু বসে রইলে একা।
শিম্পাঞ্জি, তোমাকে কেন এত বেশি বিমর্ষ দেখলুম?
কী দুঃখ তোমার? তুমি মানুষের মতো
হতে গিয়ে লক্ষ-লক্ষ বছরের সিঁড়ি
ভেঙে এসেছিলে, তুমি মাত্রই কয়েকটা সিঁড়ি টপকাবার ভুলে
মানুষ হওনি। এই দুঃখে তুমি ঝিলের কিনারে
বসে ছিলে নাকি?
শিম্পাঞ্জি, তোমাকে আজ বড় বেশি দুঃখিত দেখলুম।
প্রায় হয়েছিলে, তবু সম্পূর্ণ মানুষ
হওনি, হয়তো সেই দুঃখে তুমি আজ
দোলনায় উঠলে না; তুমি ছেলেবুড়ো দর্শক মজিয়ে
অর্ধমানবের মতো নানাবিধ কায়দা দেখালে না।
হয়তো দেখনি তুমি, কিংবা দেখেছিলে,
দর্শকেরা পুরোপুরি বাঁদুরে কায়দায়
তোমাকে টিট্কিরি দিয়ে বাঘের খাঁচার দিকে চলে গেল।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
মানবতাবাদী
|
এখন অস্ফুট আলো । ফিকে ফিকে ছাড়া অন্ধকারে
অরণ্য সমুদ্র হ্রদ, রাত্রির শিশির-শিক্ত মাঠ
অস্থির আগ্রহে কাঁপে, আসে দিন, কঠিন কপাট
ভেঙে পড়ে । দুর্বিনীত দুরন্ত আদেশ শুনে কারো
দীর্ঘরাত্রি মরে যায়, ধসে পড়ে শীর্ণ রাজ্যপাট ;
নির্ভয়ে জনতা হাঁটে আলোর বলিষ্ঠ অভিসারে ।
হে এশিয়া, রাত্রিশেষ, “ভস্ম অপমান শয্যা” ছাড়,
উজ্জীবিত হও রূঢ় অসংকোচ রৌদ্রের প্রহারে ।
শহরে বন্দরে গঞ্জে, গ্রামাঞ্চলে, ক্ষেতে ও খামারে
জাগে প্রাণ, দ্বীপে দ্বীপে মুঠিবদ্ধ অহ্বান পাঠায় ;
অগণ্য মানবশিশু সেই ক্ষিপ্র অনিবার্য ডাক
দুর্জয় আশ্বাসে শোনে, দৃঢ় পায়ে হাঁটে । তারপরে
ভারতে, সিংহলে, ব্রহ্মে, ইন্দোচীনে, ইন্দোনেশিয়ায়
বীত-নিদ্র জনস্রোত বিদ্যুত্-উল্লাসে নেয় বাঁক ।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
হারে-রে রঙ্গিলা, তোর কথার টানে টানে
পাগল হয়ে ঘুরে বেড়াই, সমস্ত রাতভোর
কোন্ কামনার আগুন ছুঁয়ে স্বপ্ন দেখি তোর,
কোন্ দুরাশার, রঙ্গিলা? তুই হঠাৎ কোনোখানে
না ভাঙলে না-দেখার দেয়াল, মিথ্যে এ তোর খোঁজে
দিন কাটানোল বাঁধন খোলার স্বপ্নে দিয়ে ছাই
ঘর ছাড়িয়ে পরিয়ে দিলি পথের বাঁধন,
তাই ব্যর্থ হল রঙ্গিলা তোর সমস্ত রঙ্গ যে।
হারে-রে রঙ্গিলা, তোর গানের টানে টানে
পার হয়েছি দুঃখ, তবু কেমন করে ভুলি
আজও আমার জীর্ণ শাখায় সুখের কুঁড়িগুলি
পাপড়ি মেলে দেয়নি, আমার শুকনো মরা গাঙে
তরঙ্গ নেই, হৃদয়ধনুর দৃপ্ত কঠিন ছিলা
দিনে দিনে শিথিল হল; রঙ্গিলা, এইবার
অন্ধকারকে ছিন্ন করে ফুলের মন্ত্র আর
ঢেউয়ের মন্ত্র শেখা আমায়, রঙ্গিলা রঙ্গিলা!
হারে-রে রঙ্গিলা, তোর সময় নিরবধি
রঙ্গও অনন্ত, আমার সময় নেই যে আর,
কে আমাকে শিখিয়ে দেবে পথের হাহাকার
কী করে হয় শান্ত, আমার প্রাণের শুকনো নদী
উজান বইবে কেমন করে, অমর্ত্য কোন্ গানে
ফুল ফুটিয়ে ব্যর্থ করি শীতের তাড়নায়,–
তুই যদি না শেখাস তবে চলব না আর, না,
রঙ্গিলা তোর কথার টানে, টানের টানে টানে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
হাতখানা যার শক্ত করে
আঁকড়ে ধরে রেখেছিলাম,
হঠাৎ কখন ছিটকে গিয়ে
এই মাঠে সে হারিয়ে গেছে!
এখন তাকে খুঁজব কোথায়!
কোত্থেকে যে কোন্খানে যায়
নিরুদ্দিষ্ট লোকজনেরা
ভিড়ের মধ্যে ভাসতে-ভাসতে।
হাসতে-হাসতে যাচ্ছে সবাই,
কেউ কিনেছে বেলুন-চাকি,
কেউ ঝুড়ি, কেউ কাঁসার বাসন,
কেউ নিতান্ত কাঠের পাখি।
সকাল থেকেই মেঘলা আকাশ,
বৃষ্টি পড়ছে ছিপছিপিয়ে।
শুকনো যে খাল, হয়তো তাতেও
একগলা জল দাঁড়িয়ে গেছে।
মেলায় তবু প্রচণ্ড ভিড়,
পিছল পথে যায় না হাঁটা,
হাজার দোকান, অজস্র লোক,
খুব জমেছে বিক্রিবাটা।
তার ভিতরেই বন্বনাবন্
নাগরদোলা ঘুরছে ভীষণ,
তার ভিতরেই আর-এক-কোণে
যুদ্ধ চলছে রাম-রাবণে।
মুড়কি, মুড়ি, তিলেখাজা,
কদ্মা এবং পাঁপড়ভাজা,
তার ভিতরেই অনেকটা পথ
এতক্ষণ সে ছাড়িয়ে গেছে।
অথচ খুব শক্ত করে
হাতখানা তার ধরে ছিলাম,
তবুও সে এই মেলার মাঠে
হঠাৎ কখন হারিয়ে গেছে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
আমি বললুম, সুন্দর।
এই আশ্বিন মাসে
রহস্য তার লেগেছে অপার
বিমুক্ত নীলাকাশে।
আমি বললুম, এসো।
সে তবু আসে না কাছে।
মায়া দিয়ে গড়া
জ্যোৎস্না অধরা
দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি ভাবি, এ কি বিভ্রম?
দাঁতে ঠোঁট চেপে হেসে
তখুনি সে ঘরে
ধুলোর উপরে
ঝাঁপিয়ে পড়ল এসে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
কে কতটা নত হব, যেন সব স্থির করা আছে।
যেন প্রত্যেকেই তার উদ্বৃত্ত ভূমিকা অনুযায়ী
উজ্জ্বল আলোর নীচে নত হয়।
সম্রাট, সৈনিক, বেশ্যা, জাদুকর, শিল্পী ও কেরানি,
কবি, অধ্যাপক, কিংবা মাংসের দোকানে
যাকে নির্বিকার মুখে মৃত ছাগলের চামড়া ছাড়াতে দেখেছি,
এবং গর্দানে-রাংয়ে যে তখন মগ্ন হয়ে ছিল,
তারা প্রত্যেকেই আসে উজ্জ্বল আলোর নীচে একবার।
কপালে স্বেদের বিন্দু, সানন্দ সুঠাম ঘুরে গিয়ে
তারা প্রত্যেকেই নত হয়।
কেউ বেশি, কেউ কম, কিন্তু প্রত্যেকেই নত হবে
উজ্জ্বল আলোর নীচে একবার।
না-কেনা না-বেচা পণ্য, স্বর্গের তটিনী
সারাদিন জ্বলে;
এবং সৈনিক, বেশ্যা, কলাবিৎ, ভাড়াটিয়া গুণ্ডা, কারিগর
একবার সেখানে যায়, যে-যার ভূমিকা অনুযায়ী
নত হয়; স্বর্গ থেকে প্রলম্বিত আলোর সলিলে
মুখ প্রেক্ষালন করে নেয়।
ঘরের বাহিরে জ্বলে দৈব জলধারা;
দ্যাখো আলো জ্বলে, দ্যাখো আলোর তরঙ্গ জ্বলে, আলো–
সকালে দুপুরে সারাদিন।
স্বর্গের তটিনী জ্বলে, আলো জ্বলে, আলো,
যেখানে দাঁড়াও।
কে বড়বাজারে যাবে, দু’ গজ মার্কিন এনে দিয়ো;
কে যাও পারস্যে, এনো সুন্দর গালিচা;
কে যাও তটিনীতীরে স্বর্গের পুতুল,
কিছুই এনো না, তুমি যাও।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
হা-রে হা-রে হা-রে, দ্যাখো, হা-রে,
কী জমাট সান্ধ্য তামাশায়
আকাশের পশ্চিম দুয়ারে
সূর্য তার ডুগডুগি বাজায়।
টকটকে আগুনে জ্বেলে দিয়ে
আকাশের শান্ত রাজধানী
শূন্যে ও কে দিয়েছে উড়িয়ে
রক্তরং সতরঞ্জখানি।
দ্যাখো রে পুঞ্জিত মেঘে-মেঘে
চিত্রিত অলিন্দে ঝরোকায়
রঙের সংহত ছোঁয়া লেগে
সারি বেঁধে ও কারা দাঁড়ায়।
হা-রে হা-রে হা-রে, দ্যাখো, হা-রে,
কী জমাট সান্ধ্য তামাশায়…
ও কারা কৌতুকে ঠোঁট চেওএ
সায়াহ্নের সংবৃত আবাগে
দ্যাখে ভেল্কিবাজের চাতুরি;
কী করে সে শূন্যে জাল বেয়ে
নিখিল সন্ধ্যায় করে চুরি
নানাবর্ণ মাছের সম্ভার।
দর্শকেরা রয়েছে তাকিয়ে,
তবু কিছু লজ্জা নেই তার।
অন্তিম তামাশা ছিল বাকি।
অকস্মাৎ চক্ষের নিমেষে
নিঃসঙ্গ বিহ্বল এক পাখি
বিদ্যুত-গতিতে ছুটে এসে
যেন মায়ামন্ত্রবলে প্রায়
ডুবেছে অথই লাল জলে।
গেল, গেল!–মেঘেরা দৌড়ায়
নিঃশব্দ ভীষণ কোলাহলে।
হা-রে হা-রে হা-রে, দ্যাখো, হা-রে,
কী জমাট সান্ধ্য তামাশায়
আকাশের পশ্চিম দুয়ারে
সূর্য তার ডুগডুগি বাজায়।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
অন্ধকারের মধ্যে পরামর্শ করে
গাছগাছালি,
আজ এই রাত্রে কার ভাল আর
মন্দ কার।
হাওয়ার ঠাণ্ডা আঙুল গিয়ে স্পর্শ করে
ঠিক যেখানে
বুকের মধ্যে নদী, নদীর বুকের মধ্যে
চোরাবালি।
স্রোতের টানে
আশিরনখ শিউরে ওঠে অন্ধকার।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
সাধারণ, তুমি সাধারণ, তাই
অসাধারণের গানে
উতলা হয়ো না হয়ো না, তোমার
যা কিছু স্বপ্ন সীমা টানো তার,
তুলে দাও খিল হৃদয়ে, নিখিল
বসুধার সন্ধানে
যেয়ো না, তোমার নেই অধিকার
দুর্লভ তার গানে।
সাধারণ, তুমি সাধারণ, তাই
ছোট আশা ভালবাসা—
তা-ই দিয়ে ছোট হৃদয় ভরাও,
তার বেশি যদি কিছু পেতে চাও
পাবে না, পাবে না, যাকে আজও চেনা
হল না, সর্বনাশা
সেই মায়াবীর গান ভুলে যাও,
ভুলো তার ভালবাসা।
সাধারণ, তুমি সাধারণ, তবু
অসাধারণের গানে
ভুলেছ; পুড়েছে ছোট ছোট আশা,
পুড়েছে তোমার ছোট ভালবাসা,
ছোট হাসি আর ছোট কান্নার
সব স্মৃতি সেই প্রাণে
বুঝি মুছে যায় যে-প্রাণ হারায়
সেই অমর্ত্য গানে।
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.