poet
stringclasses 137
values | category
stringclasses 21
values | poem
stringlengths 9
18.7k
|
---|---|---|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
।।১।।
জলের খানিক নীচে রয়েছে শৈবাল,
সামান্য ঝুঁকলেই দেখা যায়;
কিন্তু সে দেখে না, তার দৃষ্টিকে সে লাল
গোলাপের সন্ধানে পাঠায়।
আমি দেখি, উদয়াস্ত আমি দেখি তাকে,
বিরহ-ভাবনার মতো নিরন্তর দুলে যেতে থাকে
জলজ শৈবাল।
।।২।।
মর্মমূলে বিঁধে আছে পঞ্চমুখী তীর,
তার নাম ভালবাসা।
কেটেছে গোক্ষুরে যেন, নীল হয়ে গিয়েছে শরীর,
তার নাম ভালবাসা।
ঠাকুমা বলতেন, ওই সূর্যতাকে ছিঁড়ে
এনে যে লণ্ঠন জ্বালে দুঃখীর কুটিরে
তার নাম ভালবাসা।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
তুমি তোমার ছেলেকে
অহোরাত্রি অসংখ্য মিথ্যার বিষ গলিয়েছ।
শৈশবে সে হাসেনি,
কেননা
সমবয়সীদের সে শত্রু বলে জানত।
যৌবনে সে নারীকে ভালবাসেনি,
কেননা
নারীকে সে নরক বলে জানে।
ধীরে-ধীরে সেই অকালবার্ধক্যের দিকে সে এখন
এগিয়ে যাচ্ছে,
চুলগুলিকে যা সাদা করে দেয়,
কিন্তু চিত্তের মালিন্য যা মোচন করতে পারে না।
তোমার জন্য আমার কোনো ভাবনা নেই,
কিন্তু
তোমার ছেলের জন্য আমার বড় দুঃখ হয়।
তুমি তোমার মেয়েকে
অহোরাত্রি অসংখ্য কুৎসার কালি
গিয়িয়েছ।
শৈশবে সে ফুল কুড়ায়নি,
কেননা সে শুনেছিল
প্রত্যেকটা গাছেই আছে একানড়ের বাসা।
যৌবনে তার জানলা দিয়ে বাতাস বয়ে যায়নি,
কেননা
প্রতিবেশীর পুত্রকে সে লম্পট বলে জানে।
ধীরে-ধীরে সে এখন সেইদিকে এগিয়ে যাচ্ছে,
যেখানে
দুপুরগুলি বিকেলের মতো বিষণ্ণ তার
বিকেলগুলি রাত্রির মতো অন্ধকার।
তোমার জন্য আমার কোনো ভাবনা নেই,
কিন্তু
তোমার মেয়ের জন্য আমার বড় দুঃখ হয়।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
ভালবাসলে শান্তি হয়, কিন্তু আমি কাকে আজ ভালবাসতে পারি?
কবিতাকে? কবিতার অর্থ কী? কবিতা
বলতে কি এখনও আমি কল্পনালতার ছবি দেখে যাব?
যে-ছবি সকলে দেখে, যে-ছবি দেখবার জন্যে অনেকে এখনও,
এখনও অর্থাৎ এই উনিশ শো পঁয়ষট্টি সনে
হরেক অদ্ভুত কর্মে সারা দিন আঙুল বাঁকিয়ে তবু বসে থাকে
অচিরে কুয়াশা কাটবে এই নাবালক প্রতীক্ষায়?
আমিও কি বসে থাকব? আমিও কি একবার বুঝব না
কুয়াশার অন্তরালে অন্য কোনো মূর্তি নেই?
এই অবয়বহীন ধবধবে দৃশ্যের আড়ালে
অন্য কোনো দৃশ্য নেই?
থাকলেও দ্বিতীয় এক কুয়াশার দৃশ্য পড়ে আছে,
জেনে কি একেই আমি কবিতার সম্মান দেব না?
কবিতা মানে কি আজও কল্পনালতায় কিছু কুসুম ফোটানো?
কবিতা মানে এই কুয়াশার ভিতরে একবার
বাঘ সিংহ হায়েনা ইত্যাদি
পশুর দাঁতের শক্তি বুঝে নেওয়া নয়?
স্পষ্ট কথাটাকে আজ অন্তত একবার খুব স্পষ্ট করে বলে দেওয়া ভাল।
অন্তত একবার আজ বলা ভাল,
যা-কিছু সামনে দেখছি, ধোঁয়া বা পাহাড় কিংবা পরস্পর-আলাপনিরত
ক্ষিপ্র পশু–
হয়তো এ ছাড়া কোন দৃশ্য নেই।
বলা ভাল,
কল্পনালতায় ফুল কুয়াশা কাটলেও কেউ দেখতে পাবে না
কেননা কুয়াশা আজ প্রত্যেকের মগজে ঢুকেছে। তাই
কবিতাকে ভালবেসে, ক্রমাগত ভালবেসে-বেসে
তোমাকে আমাকে আজ অন্তত একবার
ভিতরে-বাহিরে ব্যাপ্ত এই অন্তহীন কুয়াশায়
আলাপে-উৎসুক ধূর্ত বাঘের খাঁচার মধ্যে হেঁটে যেতে হবে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
আজকের মতো খেলা তো প্রায়
খতম হতে চলল।
আর মাত্র মিনিট পাঁচেক বাকি।
যাও বাছা, মাঠে গিয়ে
এই পাঁচটি মিনিট তুমি কোনোক্রমে দাঁড়িয়ে থাকো।
চেয়ে দ্যাখো,
আলো পড়ে এসেছে।
চেয়ে দ্যাখো,
ওদের বোলারদের চোখ।
লোভে চকচক করছে।
মনে হচ্ছে, ওদের তেষ্টা এখনও মেটেনি।
মনে হচ্ছে,
এই শেষবেলায় ওরা অন্তত আর-একজনের
রক্ত না-দেখে ছাড়বে না।
বলো, আমার নামজাদা ব্যাটসম্যানদের
কাউকেই কি এখন আমি
মাঠে পাঠাতে পারি?
আজকের মতো তারা বেঁচেবর্তে থাক।
সকাল হোক
রোদ্দুর উঠুক,
তখন তারা খেলা দেখাবে।
তুমি যাও।
তুমি গিয়ে ওদের তেষ্টা মেটাও।
তুমি আমার এগারো-নম্বর খেলোয়াড়;
কিন্তু প্রমোশন দিয়ে তোমাকে আমি
তিন-নম্বরে তুলে আনলুম।
তোমার স্বার্থে নয়,
দলের স্বার্থে।
বাছা, তুমি ধরেই নাও যে, এই পড়ন্ত বেলায়
দলের স্বার্থে তোমাকে আমরা
খুন হতে পাঠাচ্ছি।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
একদিন সমস্ত যোদ্ধা বিষণ্ণ হবার মন্ত্র শিখে যাবে।
একদিন সমস্ত বৃদ্ধ দুঃখহীন বলতে পারবে, যাই।
একদিন সমস্ত ধর্ম অর্থ পাবে ভিন্ন রকমের।
একদিন সমস্ত শিল্পী কল্পনার প্রতিমা বানাবে।
একদিন সমস্ত নারী চোখের ইঙ্গিতে বলবে, এসো।
একদিন সমস্ত ধর্মযাজকের উর্দি কেড়ে নিয়ে
নিষ্পাপ বালক বলবে, হাহা।
একদিন এইসব হবে বলেই এখনও
সূর্য ওঠে, বৃষ্টি পড়ে, এবং কবিতা লেখা হয়।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
বুঝতে পারিনি আমি তার কথা
সে তবু রয়েছে দাঁড়িয়ে।
যেন-বা মূর্ত্তিময়ী সরলতা
চেনা ঘরবাড়ি ছাড়িয়ে
স্বপ্নে অন্য জগতে দিয়েছে পাড়ি,
যেখানে ভিন্ন রকমের ঘরবাড়ি,
ভিন্ন বর্ণ-গন্ধের কাড়াকাড়ি
দেয় মানবিক নানা বৃত্তি ও
নানা বিশ্বাস নাড়িয়ে,
যেখানে চল্তি অর্থগুলিও
অনর্থে যায় হারিয়ে।
চিত্রার্পিত ভঙ্গিটি তার,
সে আছে দাঁড়িয়ে দরজায়,
যেন ছোঁয়া লাগে চিরায়মানার
অচির জীবনচর্যায়।
এত যে বয়স, তবু এই সংসারে
যা আমাকে আজও হাড়ে-মজ্জায় মারে,
কে তাকে ডোবাল জ্যোৎস্নার পারাবারে।
শেষের পরিচ্ছেদে আরবার
শুরু হল কোন্ পর্যায়।
ঘরে চন্দ্রমা, বাহিরে আঁধার
আক্রোশে ওই গর্জায়।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
“বাতাসি ! বাতাসি !”—লোকটা ভয়ংকর চেঁচাতে চেঁচাতে
গুমটির পিছন দিকে ছুটে গেল ।
ধাবিত ট্রেনের থেকে এই দৃশ্য চকিতে দেখলুম ।
কে বাতাসি ? জোয়ান লোকটা অত ভয়ংকরভাবে
তাকে ডাকে কেন ? কেন
হাওয়ার ভিতরে বাবরি-চুল উড়িয়ে
পাগলের মতো
“বাতাসি ! বাতাসি !” ব’লে ছুটে যায় ?
টুকরো টুকরো কথাগুলি ইদানিং যেন বড় বেশি—
গোঁয়ার মাছির মতো
জ্বালাচ্ছে । কে যেন কাকে বাসের ভিতরে
বলেছিল, “ভাবতে হবে না,
এবারে দুদ্দাড় করে হেমাঙ্গ ভীষণভাবে উঠে যাবে, দেখে নিস” ।
কে হেমাঙ্গ ? কে জানে, এখন
সত্যিই দুদ্দাড় ক’রে কোথাও উঠে যাচ্ছে কিনা ।
কিংবা সেই ছেলেটা, যে ট্রাম-স্টপে দাঁড়িয়ে পাশের
মেয়েটিকে অদ্ভুত কঠিন স্বরে বলেছিল,
“চুপ করো, না হলে আমি
সেই রকম শাস্তি দেব আবার—” কে জানে
“সেইরকম” মানে কি রকম । আমি ভেবে যাচ্ছি,
ক্রমাগত ভেবে যাচ্ছি, তবু—
গল্পের সবটা যেন নাগালে পাচ্ছি না ।
গল্পের সবটা আমি পাব না নাগালে ।
শুধু শুনে যাব । শুধু এখানে ওখানে,
জনারণ্যে, বাতাসের ভিতরে, হাটেমাঠে,
অথবা ফুটপাথে, কিংবা ট্রেনের জানলায়
টুকরো টুকরো কথা শুনবো, শুধু শুনে যাব । আর
হঠাত্ কখনো কোনো ভুতুড়ে দুপুরে
কানে বাজাবে “বাতাসি ! বাতাসি !”
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
রাত্রি হলে একা-একা পৃথিবীর ভিতর-বাড়িতে
যেতে হয়।
সারাদিন দলবদ্ধ, এখানে-ওখানে ঘুরি-ফিরি,
বাজারে বাণিজ্যে যাই;
মাঝে-মাঝে রোমাঞ্চিত হবার তাগিদে
সামান্য ঝুঁকিতে বসি তাসের আড্ডায়;
কেউ বা তিন-আনা যেতে; কেউ হারে।
রাত করলে সবাই উঠে যায়।
মাথায় কান-ঢাকা, টুপি, পায়ে, মোজা, বারোটা-রাত্তিরে
জানি না কোথায় যায় দুরি তিরি রাজা ও রমণী।
আমি যাব ভিতর-বাড়িতে।
ভিতর-বাড়ির রাস্তা এখনও রহস্যময় যেন।
এত যে বয়স হল, তবুও অচেনা লাগে।
কোথায় কবাট-জানালা, উঠোন, মন্দির, কুয়োতলা,
কুলুঙ্গি, ঘোরানো সিঁড়ি, বারান্দা, জলের কুঁজো।
কোথায় ময়নাটা ঠায় রাত্রি জাগে।
বুঝবার উপায় নেই কিছুই, অন্তত আমি কিছুই বুঝি না।
বাড়িটা ঘুমের মধ্যে হানাবাড়ি। তবু
দুয়ার ঠেললেই কেউ ভীষণ চেঁচিয়ে উঠবে, এখন আশঙ্কা হয়।
দুয়ার ঠেলি না, আমি সারা রাত্রি দেখি
খরস্রোত অন্ধকার বয়ে যায় ভিতর-বাড়িতে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
যেখানেই যাই, যে-বাড়িতে কড়া নাড়ি,
কেউই দেয় না সাড়া,
সব রাস্তাই ফাঁকা, সাত-তাড়াতাড়ি
ঘুমিয়ে পড়েছে পাড়া।
সেখানেই যাই, ঘুমিয়ে রয়েছে আজ
সবার কাছে ও দূরে,
অথচ আমার কড়া নাড়বারই কাজ
পাড়ায়-পাড়ায় ঘুরে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
সবকিছুরই শেষে থাকে
একটা মস্ত
ধপধপে আর খুব প্রশস্ত
সাদা বাড়ি।
কেউ সেখানে জ্যোৎস্না-রাতের গন্ধবহ সাবান মাখে,
কেউ একাগ্র দেউল-চূড়ার ছবি আঁকে,
কেউ সেখানে জলের ঝারি
হাতে নিয়ে গোলাপ-বনে ঘুরে বেড়ায়।
বুকের মধ্যে শব্দগুলি জমতে-জমতে হারিয়ে যায়,
শেষ হয়ে যায় সকল কথা।
বুঝতে পারি এখন ক্লান্ত
গয়নাগাঁটির ভিতর থেকে খুব প্রশান্ত
অন্যরকম ঘরসংসার মাথা তুলেছে।
বুঝতে পারি, এই মুহূর্তে জানলা এবং দরজা খুলছে
স্তব্ধ বিশাল সাদা বাড়ি।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
মুঠি খোলো,
কী আছে দেখাও।
কিছু নেই,
পথে-পথে শিশুরা যা কুড়িয়ে বেড়ায়
বারো মাস,
তা ছাড়া কিছুই নেই।
মুঠি খোলো,
কী আছে গোপন, দেখতে দাও।
এই দ্যাখো,
পথে-পথে যা-কিছুতে উড়িয়ে বেড়ায়
খেয়ালি বাতাস,
তা ছাড়া কিছুই নেই।
কিছু ধুলো, কিছু বালি, কিছু-বা শুকনো পাতা ঘাস।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
শিয়রে মৃত্যুর হাত। সারা ঘরে বিবর্ণ আলোর
স্তব্ধ ভয়। অবসাদ। চেতনার নির্বোধ দেয়ালে
স্তিমিত চিন্তার ছায়া নিভে আসে। রুগ্ণ হাওয়া ঢালে
ন্যাসপাতির বাসী গন্ধ। দরজার আড়ালে কালো-টুপি
যে আছে দাঁড়িয়ে, তার নিষ্পলক চোখ, রাত্রি ভর
হলে সে হারাবে।
সিঁড়ি-অন্ধকারে মাথা ঠুকে ঠুকে
কে যেন উপরে এল অনভিজ্ঞ হাতে চুপিচুপি
ভিজিট চুকিয়ে দিয়ে ম্রিয়মাণ ডাক্তারবাবুকে।
শিয়রে মৃত্যুর হাত। স্তব্ধীভূত সমস্ত কথার
মন্থর আবেগে জমে অস্বস্তির হাওয়া। সারা ঘরে
অপেক্ষা নিঃশ্বব্দ জটলা। যেন রাত্রির জঠরে
মানুষের সব ইচ্ছা-অনিচ্ছা ভাসিয়ে শূন্য সাদা
থমথমে ভয়ের বন্যা ফুলে ওঠে। ওদিকে দরজার
আড়ালে আবছায়া-মূর্তি সারাক্ষণ যে আছে দাঁড়িয়ে,
নিষ্পলক চোখ তার। নিরুচ্চার মায়ামন্ত্রে বাঁধা
ক্লান্তির করুণ জ্যোৎস্না নেমেছে শয্যার পাশ দিয়ে।
শিয়রে মৃত্যুর হাত। জরাজীর্ণ ফুসফুসে কখন
নিশ্বাস টানার দীর্ঘ যন্ত্রণার ক্লান্তি ধীরে-ধীরে
স্তব্ধ হয়ে গেছে কেউ জানে না তা। ভোরের শিরশিরে
হাওয়ায় জানলার পর্দা কেঁপে উঠে তারপর আবার
শান্ত হয়ে এল। ছায়া অন্ধকার। মাঠ-নদী-বন
পেয়েছে নিদ্রার শান্তি। এদিকে রাত্রির অবসানে
সে-ও নেই। শান্তি! শান্তি! সে চলে গিয়েছে। সঙ্গে তার
কে গেছে জানে না কেউ, শুধু এই অন্ধকার জানে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
অন্যমনে যেতে যেতে হঠাৎ যদি
মাঠের মধ্যে দাঁড়াই,
হঠাৎ যদি তাকাই পিছন দিকে,
হয়তো দেখতে পাওয়া যাবে বিকেলবেলার নদীটিকে।
ও নদী, ও রহস্যময় নদী,
অন্ধকারে হারিয়ে যাসনে, একটু দাঁড়া;
এই যে একটু-একটু আলো, এই যে ছায়া ফিকে-ফিকে,
এরই মধ্যে দেখে নেব সন্ধ্যাবেলার প্রথম তারাটিকে।
ও তারা, ও রহস্যময় তারা,
একটু আলো জ্বালিয়ে ধর, দেখে রাখি
আকাশী কোন্ বিষণ্ণতা ছড়িয়ে যায় দিকে-দিকে,
দেখে রাখি অন্ধকারে উড়ন্ত ওই ক্লান্ত পাখিটিকে।
ও পাখি, ও রহস্যময় পাখি।
হারিয়ে গেল আকাশ-মাটি, কান্না পাওয়া
এ কী করুণ সন্ধ্যা! এ কোন্ হাওয়া লেগে
অন্ধকারে অদৃশ্য ওই নদীর দুঃখ হঠাৎ উঠল জেগে।
ও হাওয়া, ও রহস্যময় হাওয়া!
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
যে যার জিজ্ঞাসাগুলি এবারে গুছিয়ে নাও।
কেননা, আর সময় নেই।
বিকেল-পাঁচটায় আমরা নিয়ন-মণ্ডলে যাব।
সেখানে সেই পৌঢ় পালোয়ানের সঙ্গে আমাদের
খুব জরুরি একটা অ্যাপয়েণ্টমেণ্ট আছে,
তিন বছর আগে যাঁর শেষ প্রেস-কনফারেন্সে
আমরা উপস্থিত ছিলাম। এবং
নরম ডাঁটা দিয়ে ইলিশমাছের পাতলা ঝোল খেতে তাঁর ভাল লাগে কি না
এই প্রশ্নের উত্তরে যিনি বলেছিলেন,
“দিবারাত্রি কবিতা লেখাই আমার হবি।”
ঢোলা-হাতা মলমলের কামিজ পরনে
নিয়ন-মণ্ডলে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন।
আমাদের দেখেই তিনি ভীষণভাবে ডানা ঝাপটাতে লাগলেন এবং
তৎক্ষণাৎ সেই মুরগির উপমা আমাদের মাথায় এল,
যে কিনা এক্ষুনি একটা ডিম পাড়তে ইচ্ছুক।
কিন্তু ডিম না-পেড়েই তিনি বললেন,
“আগে কি তোমরা একটা ওমলেট খেতে চাও?”
আমরা বললুম, “না।
তার চাইত আপনার উপলব্ধির কথাটাই বরং বলুন।”
শুনে তিনি হাস্য করলেন। এবং
বুকের ভিতরে তাঁর চতুর্দশ উজ্জ্বল বাতিটা
জ্বালিয়ে তিনি জানালেন,
“চিরকাল নিয়ন-মণ্ডলে
অনেক কঠিন কাণ্ড দেখা যায়। তবু
পাতলুনের দক্ষিণ পকেটে
বাঁ হাত ঢোকাবার চাইতে
কঠিন সার্কাস কিছু নেই।”
বাতিগুলি তখন দপদপ করে নিভে গেল।
দেখে তিনি চেঁচিয়ে উঠলেন,
আর্ত গলায় বললেন, “আমাকে একটা আয়না দাও,
এক্ষুনি আমি আমার মুখ দেখব।”
কিন্তু তাঁর পিসিমা তাঁকে বলে দিয়েছিলেন যে,
অন্ধকারে কখনও নিজের মুখ দেখতে নেই।
তাই তিনি মুখ দেখলেন না;
তার বদলে একটি কবিতা প্রসব করলেন।
তার আরম্ভটা এই রকম :
‘অন্ধকারে কোথায় অশ্রুর
ধারা বহে যায়।
কে যেন নিজের মুখ চিরকাল দেখতে চেয়েছে
নিয়ন-মণ্ডলে, অন্ধকারে!’
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
লোভ আমাকে অরণ্যের দিকে টেনে আনে।
তারপর
অচেনা সেই অরণ্যের মধ্যে
ভয় আমাকে দিগ্বিদিকে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়ায়।
আমি ঠিক করেছিলুম,
আমার এই যুগল-শত্রুকে আমি শেষ না করে ছাড়ব না।
আগে আমি লোভের মরামুখ দেখব।
তারপর ভয়ের।
কিন্তু দ্যাখো, কী আশ্চর্য,
লোভের গলায়
আমার দীর্ঘ ও শাণিত ছুরিখানাকে আমূল বিঁধিয়ে দিয়ে
যেই আমি চেঁচিয়ে বলে উঠেছি,
“কিছুই আমি চাই না,”
ভয়ও অমনি, চুপসে-যাওয়া একটা বস্তার মতো, আমার পায়ের তলায়
লুটিয়ে পড়ল।
কখন আলো ফুটেছে, আমি জানি না।
আমি শুনতে পাচ্ছি,
দূর থেকে ভেসে আসছে সূর্যোদয়ের গান।
উদ্দীপক সুরার মতো
সেই গানের সুর ছড়িয়ে যাচ্ছে আমার রক্তে।
শরীরটা খুব হালকা লাগছে।
মনে হচ্ছে,
একটা মস্ত বড় ব্যাধির থেকে আমি মুক্ত হয়ে উঠলুম।
আমার সামনে ছিল লোভ।
আমার পিছনে ছিল ভয়।
আমি ভেবেছিলুম,
একে-একে আমি তাদের মোকাবিলা করব।
কিন্তু তার আর দরকার হল না,
একজনকে আক্রমণ করবার সঙ্গে-সঙ্গেই দেখতে পেলুম,
অন্যজনও ফতুর হয়ে গেছে।
আবিরের থালা হাতে নিয়ে আকাশ আমার মুখ দেখছে।
পাখিরা আমার বন্দনা গাইছে।
বৃক্ষ ও লতা বাতাসে নত হয়ে
নমস্কার করছে আমাকে।
জোড়া খুনের সমাধা করে, বাঁ পা এর লাথি মেরে
আমার দুই জন্মশত্রুর মৃতদেহকে একটা নালার মধ্যে ঠেলে দিয়ে
শিস দিতে দিতে
অরণ্য থেকে আমি বেরিয়ে এলুম।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
রাস্তাগুলি ক্রমে আরও তপ্ত হয়।
স্বজন, সঙ্গীর সংখ্যা
ক্রমে আরও কমে আসে।
হাতের মুদ্রায় তবু জাইয়ে রেখেছ বরাভয়
হাওয়ার ভিতরে তবু ভাসে
তোমার সৌরভ।
আর তাই
চতুর্দিকে ছত্রাকার ধড়মুণ্ড-আলাদা-করা শব
দেখেও আমাকে
এগিয়ে যেতেই হয়, আগুনের দিকে
এগিয়ে যেতেই হয়।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
সনেট
|
তবে ব্যর্থ হোক সব। উৎসব-উজ্জ্বল রজনীর
সমস্ত সংগীত তবে কেড়ে নাও, নিত্য-সহচর
ব্যর্থবীর্য শয়তানের আবির্ভাব হোক। তারপর
পাতালের সর্বনাশা অন্ধকার গাঢ় হয়ে এলে
দৃঢ় হাতে টেনে দাও যবনিকা। নির্মম অস্থির
পদক্ষেপে আনো ভয়, বিস্বাদ বেদনা ঢেলে দাও;
ঢালো গ্লানি, ঢালো মৃত্যু, শিল্পীর বেহালা ভেঙে ফেলে
অন্ধকার রঙ্গমঞ্চে অট্টহাসি দু’হাতে ছড়াও।
কেননা আমি তো শিল্পী। যে-মন্ত্রে সমস্ত হাহাকার
ব্যর্থ হয়। মজ্জামাংস জোড়া লাগে ছিন্নভিন্ন হাড়ে,
যে-মন্ত্রে উজ্জ্বল রক্ত নেমে আসে অস্থি-র পাহাড়ে
প্রাণের রক্তিম ফুল ফুটে ওঠে মৃত্যুহীন গাছে,
সে-মন্ত্র আমার জানা,–তাই মৃত্যু হানো যতবার
যে জানে প্রাণের মন্ত্র, কতটুকু মৃত্যু তার কাছে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
চলন্ত ট্রেনের থেকে ধুধু মাঠ, ঘরবাড়ি এবং
গাছপালা, পুকুর, পাখি, করবীর ফুলন্ত শাখায়
প্রাণের উচ্ছ্বাস দেখে যতটুকু তৃপ্তি পাওয়া যায়,
সেইটুকুই পাওয়া। তার অতিরিক্ত কে দেবে তোমাকে।
দুই চক্ষু ভরে তবে দ্যাখো ওই সূর্যাস্তের রঙ
পশ্চিম আকাশে; দ্যাখো পুঞ্জিত মেঘের গাঢ় লাল
রক্ত-সমারোহ; দ্যাখো উম্মত্ত উল্লাসে ঝাঁকে-ঝাঁকে
সবুজ ভুট্টার খেতে উড্ডীন অসংখ্য হরিয়াল।
চলন্ত ট্রেনের থেকে ধুধু মাঠ, ঘরবাড়ি অথবা
ঘরোয়া স্টেশনে আঁকা চিত্রপটে করবীর ঝাড়,
গাছপালা, পুকুর, পাখি, গৃহস্থের সচ্ছল সংসার,
কর্মের আনন্দ দুঃখ দেখে নাও; আকাশের গায়ে
লগ্ন হয়ে আছে দ্যাখো প্রাণের প্রকাণ্ড লাল জবা।
সমস্ত পৃথিবী এসে দাঁড়িয়েছে ট্রেনের জানলায়।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
ঈশ্বরের সঙ্গে আমি বিবাদ করিনি।
তবুও ঈশ্বর
হঠাৎ আমাকে ছেড়ে কোথায় গেলেন?
অন্ধকার ঘর।
আমি সেই ঘরের জানলায়
মুখ রেখে
দেখতে পাই, সমস্তা আকাশে লাল আভা,
নিঃসঙ্গ পথিক দূর দিগন্তের দিকে চলেছেন।
অস্ফুট গলায় বলে উঠি :
ঈশ্বর! ঈশ্বর!
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
প্রকৃতিমূলক আঁচড়িয়ে কামড়িয়ে ফেঁড়ে কাণ্ডটাকে ফুলন্ত গাছের
তখনও দাউ-দাউ জ্বলে রাগ।
চিত্রিত বিরাট বাঘ।
ফিরে যায় ঘাসের জঙ্গলে। থেকে-থেকে
শরীরে চমকায় জ্বালা। দূরের কাছের
ছবিগুলি স্থির পাংশু! ত্রিজগৎ নিশ্বাস হারায়
চলন্ত হলুদ-কালো চিত্রখানি দেখে।
বাঘ যায়। বনের আতঙ্ক হেঁটে যায়।
বাঘ যায়। অন্ধকার বনের নিয়তি।
চিত্রিত আগুনখানি যেন ধীরে-ধীরে
হেঁটে যায়। প্রকাণ্ড শরীরে
চমকায় হলুদ জ্বালা। বড় জ্বালা। শোণিতে শিরায়
যেন ঝড়-বিদ্যুতের গতি
সংবৃত রাখার জ্বালা বুঝে নিতে-নিতে
বাঘ যায়। বনের আতঙ্ক হেঁটে যায়।
আমরা নিশ্চিন্ত বসে বাঘ দেখি ডিস্নির ছবিতে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
মানবতাবাদী
|
তবু সে হয়নি শান্ত। দীর্ঘ অমাবস্যার শিয়রে
যে-রাত্রে নিঃশব্দে ঝরে পড়ে
মলিনলাবণ্য স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নার মমতা,
যে-রাত্রে সমস্ত তুচ্ছ অর্থহীন কথা
গানের মূর্ছনা হয়ে ওঠে,
শোক শান্ত হয়, দুঃখ নিভে আসে, যে-রাত্রে শীতার্ত মন ফোটে
কল্পনার সুন্দর কুসুম, নামে সান্ত্বনার জল
চিন্তার আগুনে, আর আকন্যাকুমারীহিমাচল
কপালে জ্যোৎস্নার পঙ্ক মেখে
জেগে ওঠে অতলান্ত অন্ধকার সমুদ্রের থেকে,–
তখনও দেখলাম তাকে, কী এক অশান্ত আশা নিয়ে
সে খোঁজে রাত্রির পারাপার,
দুই চোখে তার
স্বপ্নের উজ্জ্বলশিখা প্রদীপ জ্বালিয়ে।
সে এক পরম শিল্পী। সংশয়-দ্বিধার অন্ধকারে
সে-ই বারে-বারে
আলোকবর্তিকা জ্বালে, দুঃখ তার পায়ে মাথা কোটে,
তারই তো চুম্বনে ফুল ফোটে,
সে-ই তো প্রাণের বন্যা ঢালে
তুঙ্গভদ্রা, গঙ্গায় কি ভাক্রা-নাঙালে।
সে এক আশ্চর্য কবি, পাথরের গায়ে
সে-ই ব্রহ্মকমল ফোটায়।
কী যে নাম, মনে নেই তা তো–
আবদুল রহিম কিংবা শংকর মাহাতো,
অথবা অর্জুন সিং। মাঠে মাঠে প্রদীপ জ্বালিয়ে
সে জাগে সমস্ত রাত স্বপ্নের কোরক হাতে নিয়ে।
আমার সমস্ত সুখ, সকল দুঃখের কাছাকাছি
সে আছে, আমিও তাই আছি।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
কে কোন্ ভূমিকা নেব, কে কার বান্ধব হব, এইবারে সব
জানা যাবে বেতার-বার্তায়।
পুরনো বন্ধু ও পুঁথি, ইজের-কামিজ-ধুতি-প্যাণ্টের করুণ কলরব
শেষ হয়ে যায়
এখন মরিচা-পড়া সমস্ত পুরনো তালাচাবির গরব
মৎস্যের আহার হতে চায়।
এখন আমরা এক ভিন্ন লোকালয়ে
দাঁড়িয়ে রয়েছি।
এখন আমরা যেন আর-এক-সময়ে
দাঁড়িয়ে রয়েছি।
এখন আমরা যেন ভয়ে-ভয়ে
দাঁড়িয়ে রয়েছি।
আমাদের বন্ধুগুলি ক্রমে যেন আমাদের কনিষ্ঠ ভ্রাতার
বন্ধু হয়ে যায়।
ক্রমেই আঁটসাঁট হয় আমাদের পাতলুন-পাঞ্জাবি।
নামের অক্ষরগুলি মুছে দিয়ে আদি নির্মাতার
আমাদের পুঁথিপত্র ধীরে-ধীরে যেন সব তাৎপর্য হারায়।
এখন মরিচা-পড়া আমাদের তোরঙ্গের চাবি
শুয়ে আছে মৎস্যের পাড়ায়।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
না, সে নয়, অন্য কেউ এসেছিল; ঘুমো, তুই ঘুমো।
এখনো রয়েছে রাত্রি, রোদ্দুরে চুমো
লাগেনি শিশিরে। ওরে বোকা,
আকাশে ফোটেনি আলো, দরজায় এখনো তার টোকা
পড়েনি! টগর-বেল-গন্ধরাজ-জুঁই
সবাই ঘুমিয়ে আছে, তুই
জাগিসনে আর! তোর বরণডালার মালাগাছি
দে আমাকে, আমি জেগে আছি।
না রে মেয়ে, নারে বোকা মেয়ে,
আমি ঘুমোবো না। আমি নির্জন পথের দিকে চেয়ে
এমন জেগেছি কত রাত।
এমন অনেক ব্যথা-আকাঙ্ক্ষার দাঁত
ছিঁড়েছে আমাকে! তুই ঘুমো দেখি, শান্ত হ’য়ে ঘুমো।
শিশিরে লাগেনি তার চুমো,
বাতাসে ওঠেনি তার গান। ওরে বোকা,
এখনও রয়েছে রাত্রি, দরজায় পড়েনি তার টোকা ।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
কেহই কিংখাবে আর ঢাকে না বিরহ;
দাঁত নখ ইত্যাদি সবাই আজ
অনায়াসে দেখতে দেয়। পৃথিবীর নিখিল সন্ধ্যায়
গোপন থাকে না কিছু। যত কিছু
দেখিনি, এবারে সব দেখা হয়।
যেন পশুলোমে সব ঢাকা ছিল। গোলাপি কম্বল
তুলে নিলে স্পষ্ট হয় কিছু রক্ত, আর
পিত্তের সবুজ, পুঁজ, কফ, লালা,
গয়ের ইত্যাদি। সব গোলাপি কম্বলে চাপা দিয়ে
প্রত্যেকে দেখিয়েছিল এতকাল
গাঞী, গোত্র, মেল।
অর্থাৎ মার্জিত পরিভাষার সুন্দর যবনিকা।
যবনিকা কম্পমান। দেখে যান বার্ট্রাণ্ড রাসেল।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
তার মূর্তিখানি আজ গলে যায় রক্তের ভিতরে।
কাদায় বানানো মূর্তি; ললাট, নাসিকা,
চোয়াল, ওষ্ঠের ডৌল, নাভিমূল
ধীরে গলে যায়। চক্ষু গলে যায়। সব নির্মাণের
জোড় একে-একে আজ খুলে আসে। দম্ভের, ক্ষমার,
চতুর ফন্দির, শান্ত করুণার, হিংসার, প্রেমের
সমস্ত কড়ি ও বর্গা খসে পড়ে। যতনে যোজিত
উপাদানগুলি আজ পাতালগঙ্গায়
ভেসে যেতে থাকে। তার কাদার শরীর
মেদ মাংস ধীরে ধীরে রক্তের ভিতরে গলে যায়।
স্মৃতির ভিতরে কেউ পা ঝুলিয়ে কখনও বোসো না।
স্মৃতি বড় ভয়াবহ। স্মরণের গভীর পাতালে
লেগেই রয়েছে দাঙ্গা, খুন, রাহাজানি। নিশিদিন
স্মরণের গভীর পাতালে
রক্তের ভীষণ ঢেউ বহে যায়। পাহাড়প্রমাণ ঢেউ
স্মৃতির পাতাল থেকে উঠে আসে।
উঠে এসেছিল আজ। চোখের সমুখ থেকে
আর-একটি মূর্তিকে তারা লুফে নিয়ে গেল।
কাদায় বানানো মূর্তিখানি আজ পাতালগঙ্গায়
ভেসে চলে। ললাট, নাসিকা,
চোয়াল, কণ্ঠার হার, নাভিমূল, যতনে যোজিত
মাটির পেরেক-বল্টু রক্তের ভিতরে গলে যায়।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
হাটের গণ্ডগোল থেকে মানুষ যেমন তার
ঘরের পথে পা বাড়ায়,
কথাগুলিও এমন তেমনি পা বাড়িয়েছে
শব্দ থেকে
শব্দহীনতার দিকে।
চতুর্দিকে এখন ফিরে যাবার, ফিরিয়ে নেবার পালা।
ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত অনুতপ্ত সন্তানের মতো
গন্ধ দিরে যাচ্ছে ফুলের মধ্যে,
আর
এতক্ষণ যা আলোয় ঝলমল করছিল, সেই
মন্দিরচূড়া থেকে তাঁর
শেষ হিরণ্ময় বল্লমকে ফের
ফিরিয়ে নিচ্ছে সূর্যদেব।
অন্ধকার থেকে দৃশ্যগুলি একে-একে
আলোর বৃত্তে নেমে এসেছিল।
যে যেমন দেখতে চায়,
দিনভর
সে তেমন দেখেছে।
কিন্তু আর নয়,
হাওয়ায় উড়িয়ে দেওয়া যাবতীয় টুপি যেভাবে
খেলোয়াড়ের মাথায় ফিরে আসে,
ঠিক তেমনিভাবে সব দৃশ্য এখন আবার
মিছিল বেঁধে
অন্ধকারের মধ্যে ফিরবে।
মাস্তুল থেকে নেমে আসছে বাদাম,
দুর্গশীর্ষের লৌহদণ্ড থেকে ঝুলে পড়ছে পতাকা,
স্তনসন্ধির অন্ধকারে মুখ ঢাকবার জন্যে
রণক্ষেত্র থেকে
সৈনিকও এখন ফিরে যাচ্ছে তার
নিজস্ব নারীর কাছে।
চতুর্দিকেই এখন ফিরে যাবার, ফিরিয়ে নেবার
শব্দহীন আয়োজন।
মেলার মাঠে ছড়িয়ে রাখা তার
খেলাগুলিকে আবার
বাক্সে তুলে রাখছে দোকানি।
রাত হয়েছে,
তারও এখন ঘরে ফেরার পালা।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
অকস্মাৎ কে চেঁচিয়ে উঠল রক্তে ঝাঁকি দিয়ে
“নিলাম, নিলাম, নিলাম!”
আমি তোমার বুকের মধ্যে উঁকি মারতে গিয়ে
চমকে উঠেছিলাম।
অথচ কেউ কোথাও নেই তো, খাঁ-খাঁ করছে বাড়ি,
পিছন দিকে ঘুরে
দেখেছিলাম, রেলিং থেকে ঝাঁপ দিয়েছে শাড়ি
একগলা রোদ্দুরে।
বারান্দাটা পিছন দিকে, ডাইনে-বাঁয়ে ঘরে,
সামনে গাছের সারি।
দৃশ্যটা খুব পরিচিত, এখনও পর-পর
সাজিয়ে নিতে পারি।
এবং স্পষ্ট বুঝতে পারি, বুকের মধ্যে কার
বুকের শব্দ বাজে।
হায়, তবু সেই দ্বিপ্রাহরিক নিলাম-ঘোষণার
অর্থ বুঝি না যে।
“নিলাম নিলাম!” কিসের নিলাম? দুপুরে দুঃসহ
সকাল বেলার ভুলের?
এক বেণীতে ক্ষুব্ধ নারীর বুকের-গন্ধবহ
বাসী বকুল ফুলের?
“নিলাম নিলাম!” ঘণ্টা বাজে বুকের মধ্যে, আর
ঘণ্টা বাজে দূরে।
“নিলাম নিলাম।” ঘণ্টা বাজে সমস্ত সংসার
সারা জীবন জুড়ে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
সংসার ছড়িয়ে গেছে ইস্টিশানে, পথে ও ফুটপাতে,
আমরা আসতে-যেতে দেখতে পাই।
আকাশে গোধূলি-লগ্নে বর্ণের সানাই
বেজে যায়।
মাঝে-মাঝে মধ্যরাতে
জানালায় মুখ রেখে ভাবি যে, ভাষায়
ফোটাতে পারিনি কোনো-কিছু।
এবং দেখি যে, কাঁথাখানিতে নিজেকে ঢেকে নিয়ে
সংসার চলেছে তার চৌহদ্দি ছাড়িয়ে।
মানুষ চলেছে পিছু-পিছু।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
আমার শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের দিনগুলি আজ
হাজার টুকরো হয়ে
হাজার জায়গায় ছড়িয়ে আছে।
আমার বালিকাবয়সী কন্যা যেমন
নতজানু হয়ে
তার ছিন্ন মালার ভ্রষ্ট পুঁতিগুলিকে
একটি-একটি করে কুড়িয়ে নেয়,
আমিও তেমনি
আমার ছত্রখান সেই বিগত-জীবনের হৃত্প্রদেশে
নতজানু হয়ে বসি,
এবং নতুন করে আবার মালা গাঁথবার জন্যে
তার টুকরোগুলিকে
যত্ন করে কুড়িয়ে তুলতে চাই।
কিন্তু পারি না।
আমারই জীবনের কয়েকটি অংশ আমার
হঠাৎ কেমন অচেনা ঠেকতে থাকে,
এবং কয়েকটি অংশ আমাকে চোখ মেরে আরও
দূরে গড়িয়ে যায়।
আমি বুঝতে পারি,
গঙ্গাতীরের তীর্থের দিকে পা বাড়ালেই এখন
বৃত্রাসুর আমার সামনে এসে দাঁড়াবে। এবং
মাসির-কান-কামড়ানো সেই ছেলেটা আর কিছুতেই
বাদুড়বাগানে পৌঁছতে দেবে না।
স্তব্ধ হয়ে আমি বসে থাকি।
উইয়ে-খাওয়া বইয়ের পাতা হাওয়ায় উড়তে থাকে।
আমি চিনে উঠতে পারি না যে,
এ কেমন হেমচন্দ্র, আর
এ কেমন বিদ্যাসাগর।
তখন পিছন থেকে আমি আবার
সামনের দিকে চোখ ফেরাই।
এবং আমি নিশ্চিত হয়ে যাই যে,
অতীতের সঙ্গে সম্পর্কহীন
বর্তমানের এই কবন্ধ কলকাতাই আমার নিয়তি ;
যেখানে
‘কবিতীর্থ’ বলতে কোনো কবির কথা কারও মনে পড়ে না,
এবং ‘বিদ্যাসাগর’ বলতে–
তেজস্বী কোনো মানুষের মুখচ্ছবির বদলে–
ইশকুল, কলেজ, থানা, বস্তি,
অট্টালিকা, খাটাল, পোস্ টার, ও পয়ঃপ্রণালী-সহ
আস্ত একটা নির্বাচনকেন্দ্র
আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
অতঃপর সে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
জুঁইয়ের গন্ধে বাতাস যেখানে মন্থর হয়ে আছে;
এবং রেলিংয়ে ভর দিয়ে,
সেখান থেকে অল্প-একটু আকাশ দেখা যায়।
আকাশ!
এতক্ষণে তার মনে পড়ল,
সারাটা সকাল, সারাটা বিকেল আর সন্ধ্যা
কাজের পাথরে মাথা ঠুকতে-ঠুকতে, মাথা ঠুকতে-ঠুকতে
মাথা ঠোকাই তার সার হয়েছে।
কোনো-কিছুই সে শুনতে পায়নি;
না একটা গান, না একটু হাসি।
এখন শুনবে।
কোনো-কিছুই সে দেখতে পায়নি;
আন একটা ফুল, না একটু আকাশ।
এখন দেখবে।
রুগ্ণ স্ত্রীকে মেজার-গ্লাসো-মাপা ওষুধ খাইয়ে,
কুঁচকে-যাওয়া বালিশটাকে গুছিয়ে রেখে,
ঘুমন্ত ছেলের ইজেরের দড়িটাকে আর-একটু আলগা করে দিয়ে,
সে তাই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
মাঝে-মাঝে মনে হয়, রক্তের ভিতরে আর ঝাঁকি নেই।
তাই বলে কি বাকি নেই
কোনো কাজ?
সভাকক্ষে গিয়ে কি পরাস্ত কণ্ঠে বলব, “মহারাজ,
বিস্তর উদ্যম, ঘর্ম, এবং সময়
দিয়েছি আপনাকে, আর নয়,
এইবারে সম্যক্ ছুটি দিয়ে দিন?”
ময়দানের বিশাল মিটিং
ফুঁড়ে উর্দ্ধে উঠে যায় সুন্দর সুঠাম ছায়াতরু,
গাছতলায় চাঁদকপালি গোরু
ঘাস খায়। কিচিমিচি
তিনটে-চারটে-পাঁচটা-ছ’টা চড়ুইয়ের ঝগড়া চলে মিছিমিছি।
অশ্বত্থের জানালায়
আলো এসে ছায়াকে ডাক দিয়ে দূরে সরে যায়।
তা ছাড়া কোথাও কোনো ডাকাডাকি নেই।
রক্তের ভিতরে আর ঝাঁকি নেই।
কিংবা আছে। যে-লোকটা রাত্তিরে তারা গোনে,
তার দ্বিতীয় কর্মক্ষেত্র তৈরী হচ্ছে গোপনে-গোপনে
ধুলোর ভিতরে
হাটেমাঠে, গ্রীষ্মে ও বর্ষায়, খোড়োঘরে
যে-রকম।
একদিকে বিশ্রাম নিচ্ছি, সেরে উঠছে সমস্ত জখম,
অন্যদিকে
যা যা দেখছি, চিত্তে সবই রাখছি লিখে,
ডাক্তার সম্মত হেসে মাথা নাড়ছে,
সে জানে, বর্ষার জলে নদীর নাব্যতা বাড়ছে,
খলখল
হাততালি বাজিয়ে ছুটছে জল,
বিশ্রামের অবসরে তৈরী হচ্ছে কাজ।
মহারাজ,
জ্ঞাতার্থে জানাই, রক্তে ঝাঁকি মেরে আবার জাহাজ
জলে নামবে। আজ না হোক তো কাল
ডেকের উপরে তার উড়তে থাকবে অজস্র রুমাল,
ঘণ্টা বাজবে ঢং ঢং।
হাসপাতালে আজকে তার আমূল ফেরানো হচ্ছে রঙ।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
নীতিমূলক
|
বরং দ্বিমত হও, আস্থা রাখ দ্বিতীয় বিদ্যায়।
বরং বিক্ষত হও প্রশ্নের পাথরে।
বরং বুদ্ধির নখে শান দাও, প্রতিবাদ করো।
অন্তত আর যাই করো, সমস্ত কথায়
অনায়াসে সম্মতি দিও না।
কেননা, সমস্ত কথা যারা অনায়াসে মেনে নেয়,
তারা আর কিছুই করে না,
তারা আত্মবিনাশের পথ
পরিস্কার করে।
প্রসঙ্গত, শুভেন্দুর কথা বলা যাক।
শুভেন্দু এবং সুধা কায়মনোবাক্যে এক হতে গিয়েছিল।
তারা বেঁচে নেই।
অথবা মৃন্ময় পাকড়াশি।
মৃন্ময় এবং মায়া নিজেদের মধ্যে কোনো বিভেদ রাখেনি।
তারা বেঁচে নেই।
চিন্তায় একান্নবর্তী হতে গিয়ে কেউই বাঁচে না।
যে যার আপন রঙ্গে বেঁচে থাকা ভাল, এই জেনে-
মিলিত মৃত্যুর থেকে বেঁচে থাকা ভাল, এই জেনে-
তা হলে দ্বিমত হওঁ। আস্থা রাখো দ্বিতীয় বিদ্যায়।
তা হলে বিক্ষত হও তর্কের পাথরে।
তা হলে শানিত করো বুদ্ধির নখর।
প্রতিবাদ করো।
ঐ দ্যাখো কয়েকটি অতিবাদী স্থির
অভিন্নকল্পনাবুদ্ধি যুবক-যুবতী হেঁটে যায়।
পরস্পরের সব ইচ্ছায় সহজে ওরা দিয়েছে সম্মতি।
ওরা আর তাকাবে না ফিরে!
ওরা একমত হবে, ওরা একমত হবে, ওরা
একমত হতে-হতে কুতুবের সিঁড়ি
বেয়ে উর্ধ্বে উঠে যাবে, লাফ দেবে শূন্যের শরীরে।
২৪ ফাল্গুন, ১৩৬৭
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
সিতাংশু, আমাকে তুই যতো কিছু বলতে চাস, বল।
যতো কথা বলতে চাস, বল।
অথবা একটাও কথা বলিসনে, তুই
বলতে দে আমাকে তোর কথা।
সিতাংশু, আমি যে তোর সমস্ত কথাই জেনে গেছি।
আমি জেনে গেছি।
কী বলবি আমাকে তুই, সিতাংশু ? বলবি যে,
ঘরের ভিতরে তোর শান্তি নেই, তোর
শান্তি নেই, তোর
ঘরের ভিতরে বড়ো অন্ধকার, বড়ো
অন্ধকার, বড়ো
বেশি অন্ধকার তোর ঘরের ভিতরে।
(সিতাংশু, আমি যে তোর সমস্ত কথাই জেনে গেছি।
আমি জেনে গেছি।)
কী বলবি আমাকে তুই, সিতাংশু ? বলবি যে,
দৃশ্যের সংসার থেকে তুই
(সংসারের যাবতীয় অস্থির দৃশ্যের থেকে তুই)
স্থিরতর কোনো-এক দৃশ্যে যেতে গিয়ে
গিয়েছিস স্থির এক দৃশ্যহীনতায়।
অনন্ত রাত্রির ঠাণ্ডা নিদারুণ দৃশ্যহীনতায়।
দৃশ্যের বাহিরে তোর ঘরে।
জানিরে, সিতাংশু, তোর ঘরের চরিত্র আমি জানি।
ওখানে অনেক কষ্টে শোয়া চলে, কোনোক্রমে দাঁড়ানো চলে না।
ও-ঘরে জানালা নেই, আর
ও-ঘরে জানালা নেই, আর
মাথার দু’ইঞ্চি মাত্র উর্ধ্বে ছাত। মেঝে
স্যাঁতস্যাঁতে। দরোজা নেই। একটাও দরোজা নেই। তোর
চারদিকে কাঠের দেয়াল।
এবং দেয়ালে নেই ঈশ্বরের ছবি।
এবং দেয়ালে নেই শয়তানের ছবি।
(তা যদি থাকত, তবে ঈশ্বরের ছবির অভাব
ভুলে যাওয়া যেত।) নেই, তা-ও নেই তোর
নির্বিকার ঘরের ভিতরে।
না, আমি যাব না তোর ঘরের ভিতরে।
যাব না, সিতাংশু, আমি কিছুতে যাব না।
যেখানে ঈশ্বর নেই, যেখানে শয়তান নেই, কোনো-কিছু নেই,
প্রেম নেই, ঘৃণা নেই, সেখানে যাবো না।
যাব না, যেহেতু আমি মূর্তিহীন ঈশ্বরের থেকে
দৃশ্যমান শয়তানের মুখশ্রী এখনো ভালোবাসি।
না, আমি যাব না তোর ঘরের ভিতরে।
সিতাংশু, তুই-ই বা কেন গেলি ?
অস্থির দৃশ্যের থেকে কেন গেলি তুই
স্থির নির্বিকার ওই দৃশ্যহীনতায় ?
সিতাংশু, আমি যে তোর সমস্ত কথাই জেনে গেছি।
আমি জেনে গেছি।
দৃশ্যের ভিতর থেকে দৃশ্যের বাহিরে
প্রেম-ঘৃণা-রক্ত থেকে প্রেম-ঘৃণা-রক্তের বাহিরে
গিয়ে তোর শান্তি নেই, তোর
শান্তি নেই, তোর
ঘরের ভিতরে বড়ো অন্ধকার, বড়ো
অন্ধকার, বড়ো
বেশি অন্ধকার তোর ঘরের ভিতরে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
সকলে মিলিত হয়ে যেতে চাই আজ
পৃথিবীর মিশকালো ঘরে।
গিয়ে স্থিত হতে চাই, কাঠের জাহাজ
যেমন সুস্থির হয় জলের জঠরে।
কেননা আলোয় যারা করে চলাচল,
ডাঙায় তাদের কাছে বিশ বাঁও জল।
যেন সব ভুলে যাই, কোন্খান থেকে
কত দূরে কোথায় এলাম।
আলোকিত দেবতার মুখ যায় বেঁকে,
প্রেমিক জানে না তার প্রেমিকার নাম।
জীবনে কোথাও ছিল এত বড় দহ,
জানত না মানুষের বাপ-পিতামহ।
অথচ আকাশ নীল। ফুলের প্রণয়
হাওয়ায় সলিলে ওই ভাসে।
ছোঁবার সাহস নেই, যেন খুব ভয়
শিরদাঁড়া বেয়ে উঠে আসে।
যদিও সবাই জানে, খুঁজতে গেলেই
দেখা যাবে, কারও আজ শিরদাঁড়া নেই।
ফলত সবাই যেন যেতে চাই আজ
পৃথিবীর মিশকালো ঘরে।
সবাই লুকোতে চাই; কাঁকড়া কি মাছ
যেমন লুকিয়ে থাকে জলের জঠরে।
এদিকে ডাঙায় যারা করে চলাচল,
ডাঙাই তাদের কাছে বিশ বাঁও জল।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
পিতামহ, আমি এক নিষ্ঠুর নদীর ঠিক পাশে
দাঁড়িয়ে রয়েছি। পিতামহ,
দাঁড়িয়ে রয়েছি, আর চেয়ে দেখছি রাত্রির আকাশে
ওঠেনি একটিও তারা আজ।
পিতামহ, আমি এক নিষ্ঠুর মৃত্যুর কাছাকাছি
নিয়েছি আশ্রয়। আমি ভিতরে বাহিরে
যেদিকে তাকাই, আমি স্বদেশে বিদেশে
যেখানে তাকাই–শুধু অন্ধকার, শুধু অন্ধকার।
পিতামহ, আমি এক নিষ্ঠুর সময়ে বেঁচে আছি।
এই এক আশ্চর্য সময়।
যখন আশ্চর্য বলে কোনো কিছু নেই।
যখন নদীতে জল আছে কি না-আছে
কেউ তা জানে না।
যখন পাহাড়ে মেঘ আছে কি না-আছে
কেউ তা জানে না।
পিতামহ, আমি এক আশ্চর্য সময়ে বেঁচে আছি।
যখন আকাশে আলো নেই,
যখন মাটিতে আলো নেই,
যখন সন্দেহ জাগে, যাবতীয় আলোকিত ইচ্ছার উপরে
রেখেছে নিষ্ঠুর হাত পৃথিবীর মৌলিক নিষাদ–ভয়।
পিতামহ, তোমার আকাশ
নীল–কতখানি নীল ছিল?
আমার আকাশ নীল নয়।
পিতামহ, তোমার হৃদয়
নীল–করখানি নীল ছিল?
আমার হৃদয় নীল নয়।
আকাশের, হৃদয়ের যাবতীয় বিখ্যাত নীলিমা
আপাতত কোনো-এক স্থির অন্ধকারে শুয়ে আছে।
পিতামহ, আমি সেই ভয়ের দরুণ অন্ধকারে
দাঁড়িয়ে রয়েছি! পিতামহ,
দাঁড়িয়ে রয়েছি, আর চেয়ে দেখেছি, রাত্রির আকাশে
ওঠেনি একটাও তারা আজ।
মনে হয়, আমি এক অমোঘ মৃত্যুর কাছাকাছি
নিয়েছি আশ্রয়। আমি ভিতরে বাহিরে
যেদিকে তাকাই, আমি স্বদেশে বিদেশে
যেখানে তাকাই–শুধু অন্ধকার, শুধু অন্ধকার
অন্ধকারে জেগে আছে মৌলিক নিষাদ–এই ভয়।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
অষ্টপ্রহর কাছাকছি
ভনভনাচ্ছে হাজার মাছি,
তোর সেদিকে না-দিয়ে কান
সব সময়ে সিধে-সটান
দাঁড়িয়ে এখন থাকতে হবে।
তেমনভাবে দাঁড়িয়ে আমি থাকলুম কই।
পাল্লা যখন যে-দিক ঝোঁকে
সেইদিকে ব্যাঙ-লাফায় লোকে।
লাফাক গে, তুই শক্ত থাকিস
সব সময়ে মনে রাখিস
নিজের শপথ রাখতে হবে।
কিন্তু আমি সকল শপথ রাখলুম কই।
বর্ষা কাটছে, এখন আকাশ
বলছে, আসছে আশ্বিন মাস।
হিসেবপত্র ফেলে রেখে
ফিরছে সবাই বিদেশ থেকে–
এই ছবিটাই আঁকতে হবে।
কিন্তু আমি এমন ছবি আঁকলুম কই।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
আমার পিছনে কোনো দল নেই, আমার ভিতরে
দলবদ্ধ হবার আকাঙ্ক্ষা নেই, আমি
সাদা কালো লাল নীল গাং-গেরুউয়া জাফরান বাদামি
হরের রঙের খেলা দেখে যাই।
একলা-পথে হাঁটতে-হাঁটতে একলা আমি ঘরে
ফিরে যাব। যেতে-যেতে ধুলোবালি জঞ্জালে ও ঘাসে
খানিকটা প্রশংসা আমি রেখে যাই।
দেখি শুকনো পাতা উড়ছে হিলিবিলি সন্ধ্যার বাতাসে।
আমার পিছনে কেউ নেই এখানে। কস্মিনকালেও
কাউকে আমি ডাক দিয়ে বলিনি,
চলো যাই, রোদ্দুরে গলিয়ে নেব গিনি,
হাত বাড়িয়ে টেনে আনব অহঙ্কারী বটগাছের মাথা।
আমি বলি, দশজনে পঁচিশটা পথে যেয়ো,
প্রত্যেকে আড়াইটে করে পেয়ে যাবে শুকনো শালপাতা।
তার মানে কি এই যে, আমি রাখিনি বিশ্বাস
সঙ্ঘবদ্ধ কাজে?
দেখিনি কীভাবে কলে-কারখানায় বাঁধে ও ব্যারাজে
কিংবা পূর্তবিভাগীয় নির্মিতিমালায়
সভ্যতা নিষ্পন্ন হয়? বালিহাঁস
সরে গিয়ে জায়গা দেয় পৌরহিতসাধিনী সভাকে;
জলা ও জঙ্গল হটে যায়।
চৌষট্টি ফ্লাটের হর্ম্য মেঘের বালিশে মাথা রাখে।
সমস্ত দেখেছি আমি, বুঝেছি যে, মানুষের মিলিত উদ্যম
ব্যতিরেকে
এমন সহস্রফণা
উপরন্তু একই সঙ্গে এমন বিষাক্ত-মনোরম
উল্লাসের আবির্ভাব সম্ভব হত না।
কিন্তু এই সম্ভবপরতা তাকে কী দেয়, কতটা
দেয়, যে সভ্যতা অর্থে অন্য-কিছু বোঝে?
সভ্যতার ভিতরে যে খোঁজে
অন্য চরিতার্থতা, সে অন্য পথে যায়।
দলবদ্ধতার ঘটাপটা
দুই পায়ে মাড়িয়ে তাকে একবার নিজের মধ্যে উঁকি
দিয়ে কথা বলতে হয় নিজস্ব ভাষায়,
একবার দাঁড়াতে হয় নিজস্ব ইচ্ছার মুখোমুখি।
আমার ভিতরে কোনো দল নেই, দলবদ্ধতার
আনন্দ অথবা গ্লানি, কোনোটাই নেই।
আকাশে অজস্রবর্ণ খেলাধুলো সমাপ্ত হলেই
ফিরতি-পথে জঞ্জালে ও ঘাসে
খানিকটা প্রশংসা রেখে আমি দেখি, এন্তার…এন্তার
হিলিবিলি পাতা উড়ছে সন্ধ্যার বাতাসে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
এ কোন্ যন্ত্রণা দিবসে, আর
এ কোন্ যন্ত্রণা রাতে;
আকাশী স্বপ্ন সে ছুঁয়েছে তার
মাটিতে গড়া দুই হাতে।
বোঝেনি, রাত্রির ঝোড়ো হাওয়ায়
যখন চলে মাতামাতি,
জ্বলতে নেই কোনো আকাঙ্ক্ষায়
জ্বালাতে নেই মোমবাতি।
ভেবেছে, সবখানে খোলা দুয়ার
দ্যাখেনি দেয়ালের লেখা;
এবং বোঝেনি যে বারান্দার
ধারেই তার সীমারেখা।
তবু সে গিয়েছিল বারান্দায়,
কাঁপেনি তবু তার বুক;
তবু সে মোমবাতি জ্বেলেছে, হায়,
দেখেছে আকাশের মুখ।
এখন যন্ত্রণা দিবসে, আর
এখন যন্ত্রণা রাতে।
আকাশী স্বপ্ন সে ছুঁয়েছে তার
মাটিতে গড়া দুই হাতে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
নীতিমূলক
|
বলেছিলে, দেবেই দেবে।
আজ না হোক তো কাল, না হোক তো পরশু দেবে।
আলোর পাখি এনে দেবে!
তবে কেন এখন তোমার এই অবস্থা?
কথা রাখো, উঠে দাঁড়াও,
আবার দীর্ঘ বাহু বাড়াও আলোর দিকে।
আকন্দ ফুল মুখে রেখে ধুলোর মধ্যে শুয়ে আছ,
এই কি তোমার কথা রাখা?
আমি তোমার দুই জানুতে নতুন শক্তি ঢেলে দিলাম,
আবার তুমি উঠে দাঁড়াও।
আমি তোমার ওষ্ঠ থেকে শুষে নিলাম সমস্ত বিষ,
আবার তুমি বাহু বাড়াও আলোর দিকে।
রাখো তোমার প্রতিশ্রুতি।
যে-দিকে চাই, দৃশ্যগুলি এখন একটু ঝাপসা দেখায়;
জানলা তবু খোলা রাখি।
যে-দিকে যাই, নদীর রেখা একটু-একটু পিছিয়ে যায়।
বুঝতে পারি, অন্তরিক্ষে জলে-স্থলে
পাকিয়ে উঠছে একটা-কোনো ষড়যন্ত্র।
বুঝতে পারি, কেউ উচাটন-মন্ত্র পড়ছে কোনোখানে।
তাই আগুনের জিহ্বা এখন লাফ দিয়ে ছোঁয় আকাশটাকে।
একটা-কিছু ব্যাপার চলছে তলে-তলে,
তাই বাড়িঘর খাঁখাঁ শূন্য, শুকিয়ে যাচ্ছে তরুলতা।
বুঝতে পারি ক্রমেই এখন পায়ের তলায়
বসে যাচ্ছে আল্গা মাটি,
ধসে যাচ্ছে রাস্তা-জমি শহরে আর মফস্বলে।
তাই বলে কি ধুলোর মধ্যে শয্যা নেব?
বন্ধ করব চক্ষু আমার?
এখন আরও বেশিরকম টান্-বাঁধনে দাঁড়িয়ে থাকি।
দৃষ্টি ঝাপসা, তবুও জানি, চোখের সামনে
আজ না হোক তো কাল, না হোক তো পরশু আবার
ফুটে উঠবে আলোর পাখি।
বলেছিলে, দেবেই দেবে।
যেমন করেই পারো, তুমি আলোর পাখি এনে দেবে।
তবে কেন ধুলোর মধ্যে শুয়ে আছ?
আবার তুমি উঠে দাঁড়াও।
তবে কেন আনন্দ ফুল মুখে তোমার?
আবার দীর্ঘ বাহু বাড়াও আলোর দিকে।
আজ না হোক তো কাল, না হোক তো পরশু তুমি
পাখিটাকে ধরে আনবে, কথা ছিল।
এই কি তোমার কথা রাখা?
উঠে দাঁড়াও, রাখো তোমার প্রতিশ্রুতি।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
আপনি তো জানেন, শুধু আপনিই জানেন, কী আনন্দে
এখনও মূর্খের শূন্য অট্টহাসি, নিন্দুকের ক্ষিপ্র
জিহ্বাকে সে তুচ্ছ করে নিতান্তই অনায়াসে; তীব্র
দুঃখের মুহূর্তে আজও কী পরম প্রত্যয়ের শান্তি
শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখে; সন্ধ্যামালতীর মৃদু গন্ধে
কেন তার স্বপ্ন হয়ে সমুদ্রের মতো নীলকান্তি;
উপরে যন্ত্রণা যার, অন্তরালে সুধা অতলান্ত।
আপনি তো জানেন, শুধু আপনিই জানেন, মায়ামঞ্চে
কেউ বা সম্রাট হয়, কেউ মন্ত্রী, কেউ মহামাত্য;
শিল্পীর ভূমিকা তার, সাময়িক সমস্ত দৌরাত্ম্য
দেখার ভূমিকা। তাতে দুঃখ নেই। কেননা, অনন্ত
কালের মৃদঙ্গ ওই বাজে তার মনের মালঞ্চে।
ত্রিকালী আনন্দ তার; নেই তার আদি, নেই অন্ত।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
বায়বীয় চাঁদকে নিয়ে
এই আমাদের
শেষ কবিতা, আমরা লিখে দিলাম।
সময়ের জল-বিভাজিকায় দাঁড়িয়ে
মানবীয় চাঁদকে নিয়ে
এই আমাদের প্রথম কবিতা।
দূর থেকে চাঁদকে যাঁরা ভালবেসেছিলেন,
সেই প্রাচীন কবি ও প্রেমিকদের আমরা
শেষ বংশধর।
কাছে গিয়ে তার মৃত ওষ্ঠে যাঁরা
প্রেমে-প্রত্যয়ে-সংশয়ে-দ্বিধায় আলোড়িত
জীবনের
তপ্ত চুম্বন স্থাপনা করবেন,
সেই নবীন কবি ও প্রেমিকদের আমরা
জনক।
আমরাই সমাপ্তি, এবং
আমরাই সূচনা।
একটা কল্প শেষ হয়ে গেল
(কল্প, ন কল্পনা?),
আজ
আর-এক কল্পের আরম্ভ।
একটা ভাবনা শেষ হয়ে গেল,
আজ
আর-এক ভাবনার শুরু।
দুই কল্পের, দুই ভাবনার, একই জন্মে দুই জীবনের
মিলন-লগ্নে আমরা দাঁড়িয়ে আছি।
দেখতে পাচ্ছি–
আমাদের একদিকে আজ পূর্ণগ্রাস,
অন্যদিকে পূর্ণিমা
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
মানবতাবাদী
|
নিশির ডাক শুনে
মাঝরাত্তিরে যারা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল,
এখন আবার
খুব শান্ত আর খুব সুন্দর এই সকালবেলায়
একে-একে সেই ছেলেগুলো যে যার
ঘরে ফিরে আসছে।
ওদের ছেঁড়া জামাকাপড়, ওদের
রক্তাক্ত হাত-পা, আর সেইসঙ্গে ওদের
ভাষাহীন চাউনি দেখেই
বোঝা যায় যে, যা পাবে বলে ওরা
রাস্তায় গিয়ে নেমেছিল,
তা ওরা পায়নি।
মাথা নিচু করে ওরা এখন ফিরে আসছে।
অথচ, রাত্তিরের অন্ধকারে
অনেক-অনেক কাঁটাঝোপ ওরা পেরিয়ে গিয়েছিল,
অনেক-অনেক পথ।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
মানবতাবাদী
|
কালো অ্যাম্বাসাডরের প্রসঙ্গ উঠতেই তাঁর কথা
অকস্মাৎ ঘুরে যায়
খুন, দাঙ্গা, রাহাজানি ইত্যাদির দিকে।
অতঃপর
কান টানলে যেমন মাথা আসে,
তেমনি করে এসে গেল
রাষ্ট্রনীতি, ইমার্জেন্সি, আইন-শৃঙ্ক্ষলা।
ভদ্রলোক অত্যন্ত আবেগ দিয়ে বলে যাচ্ছিলেন,
“অন্ন চাই, বস্ত্র চাই, আশ্রয়, চিকিৎসা চাই, অবশ্যই চাই!
আরে বাবা,
এইসব উত্তম বস্তু কে না চায়? আমি কি চাই না?
চাই, চাই, একশো বার চাই।
কিন্তু তার আগে
ল অ্যাণ্ড অর্ডার চাই, সেইটেই এখন
সবচেয়ে জরুরি।”
কার জন্যে জরুরি, আমি প্রশ্ন করে উত্তর পাই না।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
হাতে ভীরু দীপ, পথে উন্মাদ হাওয়া,
ভ্রুকুটিকুটিল সহস্র ভয় মনে।
কেন ভয়? কেন এমন সঙ্গোপনে
পথে নেমে তোর বারে-বারে ফিরে চাওয়া?
এ কী ভয় তোর সকল সত্তা কাঁপায়?
আমি যে এসেছি, সে যেন জানতে না পায়।
দূরে হেলঙের পাহাড়, পাহাড়তলি
ছাড়িয়ে পিপলকোঠির চড়াই, আর
তারপর সাঁকো। বাঁয়ে গেলে গঙ্গার
ধারে সেই গ্রাম, অমৌঠি রঙ্কোলি।
সেইখানে যাব। সামনের শীতে যদি
পাওয়া যায় জমি ঢালু সিয়াসাঙে, তাই
চলেছি। এ ছাড়া, জানেন গঙ্গামাঈ,
কোনো আশা নেই। বরফের তাড়া খেয়ে
নির্জন পাকদণ্ডির পথ বেয়ে
নীচে নেমে যাই। কী ভয়ে আমাকে কাঁপায়–
জানে মানাগাঁও, জানে পাহাড়িয়া নদী।
আমি যে এসেছি, সে যেন জানতে না পায়।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
শুভ সংবাদ লোক মারফত আসবে ভেবে
সন্ধ্যা রাত থেকে
হাত দুখানা মাথার পিছনে রেখে
এতক্ষণ তুমি।
স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন, এবারে।
দরজায় টোকা পড়তেই সেই মানুষটি
ঘর ছেড়ে।
বারান্দায় বেরিয়ে আসেন। কিন্তু না,
কোন জন মনীষী তার
চোখে পড়ে না।
তার বদলে যা দেখেন, তাতেই যেন
চোখ জুড়িয়ে যায়।কী দেখেন তিনি? না আষাঢ় মাসের আকাশ জুড়ে
সারাটা দিন যে ছিচকাঁদুনে।
মেঘের জটলা চলছে, তাকে।
ধুয়ে মুছে সাফ করে দিয়ে এখন মস্ত একটা
চাদ উঠেছে, আর চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে তার
দুগ্ধফেননিভ শুভ্র জ্যোৎস্না ধারা।।দেখে তিনি বোঝেন যে, শুভ সংবাদ
লোক মারফত নয়, সরাসরি।
আকাশ থেকে আসার কথা ছিল, আর ঠিক
তাই এসেছে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
ভীষণ প্রাসাদ জ্বলে, যেন চিরকাল জ্বলে সায়াহ্নবেলায়।
অলিন্দ, ঝরোকা, শ্বেতমর্মরের সমস্ত নির্মাণ
জ্বলে ওঠে। আগুনের সুন্দর খেলায়
দাউদাউ জ্বলে হর্ম্য, প্রমোদ-নিকুঞ্জ। কিংবা সাধের তরণী
অনিচ্ছাসত্ত্বেও যেন অন্যপথে ধীরে আগুয়ান
হতে গিয়ে অগ্নিবয়লয়ের দিকে ঘুরে যায়।
মুহূর্তে মাস্তুলে, পালে, পাটাতনে প্রচণ্ড হলুদ
জ্বলে ওঠে।
সাধের তরণী জ্বলে, যেন চিরকাল জ্বলে সায়াহ্নবেলায়।
জানি না কখনও কেউ এমন জ্বলেছে কি না সায়াহ্নবেলায়।
যেমন প্রাসাদ জ্বলে, অলিন্দ, ঝরোকা কিংবা শ্বেতমর্মরের
বিবিধ নির্মাণ। যথা সহসা দাউদাউ
প্রমোদ-নিকুঞ্জ, ঝাউ-বীথিকা, হ্রদের জল, জলের উপরে
সাধের তরণীখানি জ্বলে ওঠে।
যেমন কুটির কিংবা অট্টালিকা কিছুকাল চিত্রের মতন স্থির থেকে তারপর
অগ্নিবলয়ের দিকে চলে যায়।
যেমন পর্বত পশু সহসা সুন্দর হয় বাহিরে ও ঘরে।
যেমন সমস্ত-কিছু জ্বলে, চিরকাল জ্বলে সায়াহ্নবেলায়।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
মানবতাবাদী
|
সবাই দেখছে যে, রাজা উলঙ্গ, তবুও
সবাই হাততালি দিচ্ছে।
সবাই চেঁচিয়ে বলছে; শাবাশ, শাবাশ!
কারও মনে সংস্কার, কারও ভয়;
কেউ-বা নিজের বুদ্ধি অন্য মানুষের কাছে বন্ধক দিয়েছে;
কেউ-বা পরান্নভোজী, কেউ
কৃপাপ্রার্থী, উমেদার, প্রবঞ্চক;
কেউ ভাবছে, রাজবস্ত্র সত্যিই অতীব সূক্ষ্ম , চোখে
পড়ছে না যদিও, তবু আছে,
অন্তত থাকাটা কিছু অসম্ভব নয়।
গল্পটা সবাই জানে।
কিন্তু সেই গল্পের ভিতরে
শুধুই প্রশস্তিবাক্য-উচ্চারক কিছু
আপাদমস্তক ভিতু, ফন্দিবাজ অথবা নির্বোধ
স্তাবক ছিল না।
একটি শিশুও ছিল।
সত্যবাদী, সরল, সাহসী একটি শিশু।
নেমেছে গল্পের রাজা বাস্তবের প্রকাশ্য রাস্তায়।
আবার হাততালি উঠছে মুহুর্মুহু;
জমে উঠছে
স্তাবকবৃন্দের ভিড়।
কিন্তু সেই শিশুটিকে আমি
ভিড়ের ভিতরে আজ কোথাও দেখছি না।
শিশুটি কোথায় গেল? কেউ কি কোথাও তাকে কোনো
পাহাড়ের গোপন গুহায়
লুকিয়ে রেখেছে?
নাকি সে পাথর-ঘাস-মাটি নিয়ে খেলতে খেলতে
ঘুমিয়ে পড়েছে
কোনো দূর
নির্জন নদীর ধারে, কিংবা কোনো প্রান্তরের গাছের ছায়ায়?
যাও, তাকে যেমন করেই হোক
খুঁজে আনো।
সে এসে একবার এই উলঙ্গ রাজার সামনে
নির্ভয়ে দাঁড়াক।
সে এসে একবার এই হাততালির ঊর্ধ্বে গলা তুলে
জিজ্ঞাসা করুক:
রাজা, তোর কাপড় কোথায়?
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
“কাল থেকে ঠিক পালটে যাব
দেখে রাখিস তোরা,”
বলতে-বলতে ঘুমিয়ে পড়ল অশ্বমেধের ঘোড়া
পথের মধ্যিখানে ।
ভেবেছিলুম, যে দিকে যাই, জ্বালতে-জ্বালতে যাব
শহর-গঞ্জ কারখানা-কল, কিন্তু এখন প্রাণে
অন্যরকম ভুজুং দিচ্ছে অন্যরকম হাওয়া ।
“এই নে, তোকে দিলুম বাড়ি, নতুন খড়ে ছাওয়া,
দিলুম আগরতলার শীতলপাটি।
কৃষ্ণা গাভীর দুগ্ধ দিলুম, বড্ডরকম মিঠে,
এবং সোঁদরবনের মধু, চোদ্দ-আনা খাঁটি ।”
শুনেই আমি চমকে উঠি, পথের শক্ত ইঁটে
লাথি কষাই, হাওয়ার মধ্যে কোড়া
ঘুরিয়ে বলি, “আয় রে আমার অশ্বমেধের ঘোড়া;
আয়, যে রকম কথা ছিল, তেমনি করে বাঁচি ।”
তেমনি করে কেউ বাঁচে না, নেই-কুসুমের তোড়া
কেউ বাঁধে না, কোথেকে জল কোথায় চলে যাচ্ছে ।
নজর করলে দেখতে পাবি, রক্ত শুষে খাচ্ছে
অশ্বমেধের ঘোড়ার পিঠে রাক্ষুসে এক মাছি ।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
মাঝ-রাত্রে ঘুম ভেঙে যায়।
হঠাৎ ধড়মড় করে উঠে বসি।
মনে হয়,
ঘণ্টা পড়ে গেছে, ট্রেন আসতে আর দেরি নেই।
অথচ বিছানাপত্র, তোরঙ্গ, জলের কুঁজো–সব কিছু
ছত্রখান হয়ে আছে।
আমি দ্রুত হাতে ওয়েটিং রুমের সেই ছড়ানো সংসার
গুছিয়ে তুলতে থাকি।
বাইরে হুলুস্থুলু চলছে, ইনজিনের শানটিং, লোহার-
চাকাওয়ালা গাড়ি ছুটছে, হাজার পায়ের শব্দ,
আলো ছায়া আলো ছায়া
উন্মাদের মতন কে যেন
তারই মধ্যে
পরিত্রাহি ডেকে যাচ্ছে : কুলি, কুলি, এই দিকে, এ-দিকে।
মাঝ-রাত্রে ঘুম ভেঙে যায়।
হঠাৎ ধড়মড় করে উঠে বসি, চারদিকে তাকিয়ে
কিচ্ছুই বুঝি না।
আমি কেন ওয়েটিং রুমের মধ্যে, প্রাচ্যের সুন্দরী ভীরু বালিকার মতো,
সংসার গুছিয়ে তুলছি মধ্য-রাতে?
আমি কেন ছিটকিয়ে-ছড়িয়ে-যাওয়া পুঁতিগুলি
খুঁটে তুলছি।
আমি কি কোথাও যাব? কোনোখানে যাব?
আমি কি ট্রেনের জন্য প্রতীক্ষায় থাকতে থাকতে
ঘুমিয়ে পড়েছি?
ইদানীং এই রকম ঘটছে। ইদানীং
শব্দে-শব্দে তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। মধ্যরাতে
টুপটাপ শিশির ঝরলে চমলে উঠি; মনে হয়,
দেড় কাঠা উঠোন, তার স্বত্ব নিয়ে
স্বর্গে-মর্তে ঘোরতর সংঘাত চলেছে।
অন্ধকারে
বৃষ্টির ঝর্ঝর শুনলে মনে হয়,
দুদিকে পাহাড়, তার হৃৎপ্রদেশে
আচম্বিতে ট্রেনের চাকার শব্দ বেজে উঠল।
অথচ কোথায় ট্রেন, উদ্ধারের-সম্ভাবনাহীন
যাত্রীদের বুকে নিয়ে কোনখানে চলেছে, আমি
কিচ্ছুই বুঝি না–
সূর্যকে পিছনে রেখে
পূর্ব গোলার্ধের থেকে পশ্চিম গোলার্ধে কোন্ নরকের দিকে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
না, আমাকে তুমি শুধু আনন্দ দিয়ো না,
বরং দুঃখ দাও।
না, আমাকে সুখশয্যায় টেনে নিয়ো না,
পথের রুক্ষতাও
সইতে পারব, যদি আশা দাও দু-হাতে।
ভেবেছিল, এই দুঃখ আমার ভোলাবে
আনন্দ দিয়ে; হায়,
প্রেম শত জ্বালা, সহস্র কাঁটা গোলাপে,
কে তাতে দুঃখ পায়,
যদি আশা জ্বলে মনের গোপন গুহাতে।
যে আমাকে চায় তন্দ্রার থেকে জাগাতে,
মোহ যে ভাঙাতে চায়
প্রবল পুরুষ আশার বিপুল আঘাতে,
কঠিন যন্ত্রণায়,
আমি তারই, তুমি দিয়ো না মমতা, গৃহ না!
হয়তো বুঝিনি, হয়তো বোঝাতে পারিনি,
তবে শুধু মনে হয়,
প্রেমের প্রকৃতি হয়তো উপচারিণী,
যদিচ অসংশয়।
না, আমাকে তুমি করুণা দিয়ো না, দিয়ো না।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
রাজপথে ছিন্ন শব, ভগ্নদ্বার প্রাসাদে কুটিরে
নির্জন বীভৎস শান্তি, দলভ্রষ্ট আহত অশ্বের
চকিত খুরের শব্দ, মুমূর্ষুর আর্তকণ্ঠ, ফের
ভৌতিক স্তব্ধতা। শূন্য মসজিদের গম্বুজে খিলানে
রাত্রির নিঃসঙ্গ ছায়া নামে। প্রাণ-যমুনার তীরে
মৃত্যুর উৎসব সাঙ্গম বিহঙ্গ-হৃদয় ছিন্নপাখা।
নগরে গ্রামে ও গঞ্জে মসজিদে মন্দিরে সর্বখানে
দুরন্ত তাতার-দস্যু তৈমুরের পদচিহ্ন আঁকা।
তৈমুর এখানে আসে দস্যুর মতন, জীবনের
কামনাকে হত্যা করে, একটানা অদ্ভুত আহ্বানে
মৃত্যুকে সে ডাকে, তার লোভাতুর অতর্কিত টানে
ছিঁড়ে আসে প্রাণের মৃণাল, ত্রস্ত জীবনের সুর।
দুরন্ত আঘাতে থেমে যায়–ভয়বিহ্বব মনের
সমস্ত কপাট বন্ধ, এসে পড়ে কখন তৈমুর।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
কাঁচের বাসন ভাঙে চতুর্দিকে–ঝন্ঝন্ ঝন্ঝন্!
মাথার ভিতরে সেই শব্দ শুনি,
রক্তের ভিতরে শব্দ বহে যায়।
আলো নেই ঘরে।
এইমাত্র কাছে ছিলে, অকস্মাৎ গিয়েছ কোথায়,
আমি কিছু বুঝতে পারি না।
শুধু শুনি,
চতুর্দিকে শব্দ বাজে ঝন্ঝন্ ঝন্ঝন্;
শুধু দেখি,
পেয়ালা পিরিচ
ভয়ার্ত পাখির মতো ছুটে যায় জ্যোৎস্নার ভিতরে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
‘সামনে রিফুকর্ম চলছে,
পিছন দিকে রাস্তা বন্ধ!’
এই, ওরা কী যা-তা বলছে!
বকুল, তোমার বুকের গন্ধ
এই অবেলায় মনে পড়ে।
এই অবেলায় বকুল ঝরে
শ্যামবাজারে, ধর্মতলায়,
এবং আমরা তাকেই ধরছি
ফাঁদ পেতে চৌষট্টি কলায়।
এবং আমরা রাস্তাঘাটে
ফুটপাতে আর গড়ের মাঠে
কুড়িয়ে নিচ্ছি ছেলেবেলা।
‘সন্ধ্যারাতে এ কোন্ খেলা?’
এই, ওরা কী যা-তা বলছে!
মাথার মধ্যে ফুলের গন্ধ।
সামনে সেলাই-ফোঁড়াই চলছে,
পিছন দিকে রাস্তা বন্ধ।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
আমি কি তোমার কাছে সনন্দ দিয়েছি কবিতার,
যে আমি তোমার জন্যে যাব
পাতালে, অথবা ঊর্ধ্বে আকাশে ফোটাব
তোমারই আলেখ্য? ঝানু বুড়ো,
আমি কি তোমার কাছে সনন্দ নিয়েছি কবিতার?
যে যার নিজস্ব শিল্প সমূহ অর্জন করে নেয়।
নির্ভয়ে যে যার
কবিতার হস্তপদমুড়ো
অর্থাৎ শব্দকে ঘোর চুল্লির ভিতরে ঠেলে দেয়
চিরকাল। আদ্যন্ত এইভাবে হয়ে খাঁটি
বর্ষার বিরুদ্ধে লড়ে মন্দিরগাত্রের পোড়ামাটি।
আমি কি তোমার কাছে সনন্দ নিয়েছি কবিতার,
যে আমি তোমার কীর্তি গেয়ে
ধন্য হবে? তুমি কি জিহ্বায়
জেনেছ অগ্নির স্বাদ? শব্দের সংসারে তুমি কে হে?
কিছু শব্দ অগ্নিকুণ্ডে ঝরে গিয়েছিল্ম তা-ই যায়।
কিছু যায় ভিখারির পাত্রে। কিছু ফোটে
রমণীর জঙ্ঘাদেশে। কিছু হরিচন্দনের ফোঁটা
হয়ে নিদ্রাহীন গ্রীষ্মরাত্রির আকাশে জ্বলে ওঠে
দুই লহমার জন্যে। কিছু শব্দ আর-একটু দীর্ঘায়ু হতে চায়।
এবং তখনই
শব্দের হৃদপিণ্ডে ছেনি-হাতুড়ির ধ্বনি
লাগে, শব্দে জেগে ওঠে বিষ্ণুমন্দিরের টেরাকোটা।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
“এককালে আমিও খুব মাংস খেতে পারতুম, জানো হে;
দাঁত ছিল, মাংসে তাই আনন্দ পেতুম।
তোমার ঠানদিদি রোজ কব্জি-ডোবা বাটিতে, জানো হে,
না না, শুধু মাংস নয়, মাংস মাছ ইত্যাদি আমায়
(রান্নাঘর নিরামিষ, তাই রান্নাঘরের দাওয়ায়)
সাজিয়ে দিতেন। আমি চেটেপুটে নিত্যই খেতুম।
সে-সব দিনকাল ছিল আলাদা, জানো হে,
হজমের শক্তি ছিল, রাত্তিরে সুন্দর হত ঘুম।”
মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি, রোগা ঢ্যাঙা বৃদ্ধ এক তার
পাতের উপরে দিব্য জমিয়েছে মাংসের পাহাড়।
যদিও খাচ্ছে না। শুধু মাংসল স্মৃতির তীব্র মোহে
ক্রমাগত বলে যাচ্ছে–‘জানো হে, জানো হে’!
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
মানবতাবাদী
|
মস্ত বড় মিরগেলটাকে বঁড়শিতে গাঁথবার জন্যে
ফাতনার উপরে চোখ রেখে
শ্রীমন্ত সেই সকাল থেকে
ঘাটের রানায় বসে আছে।
আসলে ওই মাছটাই যে তাকে টোপ গিলিয়ে গেঁথে রেখেছে,
শ্রীমন্ত তা জানে না।
সকাল ছ’টা অব্দি খুনের আসামি রামদেও কাহারকে
পাহারা দেবার জন্যে
রাত-দশটায় যে-লোকটা
থানা-হাজতের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছিল,
পাথুরে করিডরে যতই না কেন বুট বাজাক,
সেই মহেশ্বরপ্রসাদও জানে না যে,
পুরোপুরি আট ঘণ্টার জন্যে সে নিজেই এখন বন্দি।
টেকো-কালোয়ার ঘনশ্যামের দ্বিতীয় পক্ষের বউ ইদানিং আর
কারণে-অকারণে
জানলায় গিয়ে দাঁড়ায় না। কিন্তু
ঘনশ্যামের লোহার কারবারও ওদিকে প্রায়
বেহাত হবার উপক্রম।
অষ্টপ্রহর ঘরে মধ্যে ঘুরঘুর করছে যে ঘনশ্যাম,
সে জানে না যে, তার
জোয়ান বউকে জানলা থেকে হটাতে গিয়ে
সে নিজেই এখন তার কারবার থেকে হটে গিয়েছে।
লোডশেডিং, লিফ্ট বন্ধ, তবু
চটপট তাঁর চাকরি-জীবনের সাততলায়
উঠতে চেয়েছিলেন
জায়াণ্ট ট্রান্সপোর্টের ছোট-সাহেব শ্রীহেরম্বনাথ বিশ্বাস।
হায়, তিনিও জানতেন না যে,
এক-এক লাফে সিঁড়ির তিন-ধাপ টপকাতে গিয়ে তাঁর
মাথাটা হঠাৎ ঝন্ করে ঘুরে উঠবে, এবং
তৎক্ষণাৎ গন্তব্য স্থানের ঠিকানা পাল্টে তিনি
সাততলার বদলে
পার্ক স্ট্রিটের এক নার্সিং হোমে পৌঁছে যাবেন।
সিঁড়ি ভাঙা বন্ধ। ডাক্তারবাবু জানিয়ে দিয়েছেন যে, বাড়িতেও তাঁর
শোবার খাটটাকে এবারে
দোতলা থেকে একতলায় নামিয়ে আনলে ভাল হয়।
আমাদের পাড়ার গোষ্ঠবাবু সেদিন বলেছিলেন যে,
তাঁর গুরু যা বলেন, ঠিকই বলেন।
গুরু কী বলেন, সান্ধ্য আড্ডার সঙ্গীরা তা জানবার জন্যে
হামলে পড়ায়
খুব একচোট হেসে নিয়ে, তারপর
হঠাৎ ভীষণ গম্ভীর হয়ে গিয়ে
গোষ্ঠবাবু বললেন, “কাউকে আবার বোলো না যেন,
এমনিতে তো এ-সব কথা কাউকে বলতে নেই,
নেহাত তোমরা জানতে চাও তাই বলছি।
আমার গুরু বলেন যে,
শুয়োরের বাচ্চারা কেউ কিস্সু জানে না।”
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
মানবতাবাদী
|
দেখুন মশায়,
অনেকক্ষণ ধরে আপনি ঘুরঘুর করছেন,
কিন্তু আর নয়, এখন আপনার সরে পড়াই ভাল।
এই আমি থেকে হলফ করে বলছি,
কলকাতা থেকে কৈম্বাটুর অব্দি একটা
প্যাসেঞ্জার বাস-সারভিস খুলবার সত্যিই খুব দরকার আছে কি না,
তা আমি জানি না।
আপনার যদি মনে হয়, আছে,
তা হলে বেশ তো, যান,
যেখানে-যেখানে সিন্নি দেবার, দিয়ে,
জায়গামতন ইনফ্লুয়েনস খাটিয়ে
লাইসেন্স পারমিট ইত্যাদি সব জোগাড় করুন,
যাঁকে যাঁকে ধরতে হয়, ধরুন,
আমাকে আর জ্বালাবেন না। আমি
নেহাতই একজন ছাপোষা লোক,
টাইমের ভাত খেয়ে আপিস যাই,
অবসর-টবসর পেলে ছোট মেয়েটাকে নামতা শেখাই,
কৈম্বাটুর যে কোথায়,
মাদ্রাজে না পাঞ্জাবে, তা-ই আমি জানি না।
আপাতত তাড়াতাড়ি
শ্যামবাজারে যাওয়া দরকার, ভাগ্যবলে যদি একটা
শাট্ল-বাস পাই,
তা হলেই আমি আজকের মতন ধন্য হতে পারি।
দেখুন মহাশয়,
সেই থেকে আপনি আমার সঙ্গে সেঁটে আছেন।
কিন্তু আর নয়, এখন আপনার সরে পড়াই ভাল। আপনি
বিশ্বাস করুন চাই না-করুন,
দুই হাতের পাতা উল্টে দিয়ে এই আমি
শেষবারের মতো জানালুম, কেন
কৃষ্ণমাচারী গেলেন এবং
শচীন চৌধুরী এলেন,
তার বিন্দুবিসর্গও আমি জানি না।
আমি একজন ধিনিকেষ্ট,
কলম পিষতে বড়বাজারে যাই,
পিষি,
সাবান কিংবা তরল আলতার শিশি
কিনে বাড়ি ফিরি, গিন্নি
কলঘরে ঢুকলে বাচ্চা সামলাই।
আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করা না-করা সমান,
ভোটারদের আল্জিভ না-দেখিয়ে যাঁরা বক্তৃতা দিতে পারেন না
আপনি বরং তাঁদের কাছে যান।
আমার এখন তাড়াতাড়ি
শ্যামবাজারে যেতে হবে। সঙ্গে যদি আসতে চান, আসুন,
লজ্জা-টজ্জা না-করে একটু শব্দ করে কাসুন,
তা হলেই আপনার বাসভাড়াটা চুকিয়ে দিতে পারি।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
ভাঙো হাঁটু, দাঁতের ভিতর ধরো ঘাস
অন্নদাস,
এই তোমার খুলেছে চেহারা।
কারা
ঢাক-পিটিয়ে ঢাক-পিটিয়ে ঢাক-পিটিয়ে জঙ্গলের ভূমি
কাঁপাচ্ছে দুপুরে, তুমি
জানো।
আসলে ব্যাপারটা খুবই চমৎকার কৌশলে সাজানো।
কাঁটা
দিয়ে কাঁটা তুলবার খেলাটা
কে না জানে?
হাতিও হাতিকে টেনে আনে।
অন্নদাস,
ভাঙো হাঁটু, দাঁতের ভিতরে ধরে ঘাস।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
মাটিতে চোখ রেখে ঘুরে বেড়াত লোকটা,
কখনও আকাশ দেখেনি।
এখন
খাটিয়ার উপরে
চিতপটাং হয়ে সে শুয়ে আছে, আর
আশ মিটিয়ে আকাশ দেখছে।
জীবনে কখনও ফুলের স্বপ্ন দেখেনি লোকটা,
অষ্টপ্রহর শুধু
ভাতের গন্ধে হন্যে হয় ঘুরত।
এখন তার
তেলচিটে বালিশের দু’দিকে দুটো
রজনীগন্ধার বাণ্ডিল ওরা সাজিয়ে দিল।
এতকাল সে অন্যের বোঝা হয়ে বেড়াত।
আর আজ
তারই নীচে কোমরে-গামছা চার বেহারা।
আকাশ দেখতে-দেখতে,
ফুলের গন্ধ শুঁকতে-শুঁকতে
লোকটা এখন গঙ্গার হাওয়া খেতে যাচ্ছে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
কী দেখলে তুমি? রৌদ্রকঠিন
হাওয়ার অট্টহাসি
দু’হাতে ছড়িয়ে দিয়ে নিষ্ঠুর
গ্রীষ্মের প্রেত-সেনা
মাঠে-মাঠে বুঝি ফিরছে? ফিরুক,
তবু তার পাশাপাশি
কৃষ্ণচূড়ার মঞ্জরী তুমি
একবারও দেখলে না?
একবারও তুমি দেখলে না, তার
বিশীর্ণ মরা ডালে
ছড়িয়ে গিয়েছে নম্র আগুন,
মৃত্যুর সব দেনা
তুচ্ছ সেখানে, নবযৌবনা
কৃষ্ণচূড়ার গালে
ক্ষমার শান্ত লজ্জা কি তুমি
একবারও দেখলে না
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
“দিনমান তো বৃথাই গেল, এখন আমার যুদ্ধ;
এখন আমার অস্ত্রসজ্জা সব কিছুর বিরুদ্ধে।”
বলেই তিনি হাত বাড়িয়ে নিলেন পদ্মফুল।
এটা কেমন যুদ্ধ? সাদা পদ্মফুলের কান্তি
যে-বস্তুটার প্রতীক, সেটা নিতান্তই যে শান্তি!”
দ্বিতীয় জন তন্মুহূর্তে ধরিয়ে দিলেন ভুল।
“তবে বৃথাই বর্ম আঁটো, সাজাও চতুরঙ্গ,
এখন আমি সন্ধি করব ঈশ্বরের সঙ্গে।”
বলেই তিনি পদ্ম ফেলে গোপাল তুলে নিলেন।
“এটা কেমন সন্ধি? জানে সবাই জগৎ সুদ্ধ
গোলাপ ঝরায় রক্তধারা, গোলাপ মানেই যুদ্ধ।”
দ্বিতীয় জন পুনশ্চ তাঁর ভুল ধরিয়ে দিলেন।
আমরা দেখছি খেলায় মত্ত প্রতীকী উদ্ভ্রান্তি।
রৌদ্রে ভাসে চবুতরা, ছায়ায় ভাসে খিলেন।
ভুল ঠিকানায় ঘুরে বেড়ায় যুদ্ধ এবং শান্তি।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
অন্যমনে যেতে যেতে হঠাৎ যদি
মাঠের মধ্যে দাঁড়াই,
হঠাৎ যদি তাকাই পিছন দিকে,
হয়তো দেখতে পাওয়া যাবে বিকেলবেলার নদীটিকে।ও নদী, ও রহস্যময় নদী,
অন্ধকারে হারিয়ে যাসনে, একটু দাঁড়া;
এই যে একটু-একটু আলো, এই যে ছায়া ফিকে-ফিকে,
এরই মধ্যে দেখে নেব সন্ধ্যাবেলার প্রথম তারাটিকে।ও তারা, ও রহস্যময় তারা,
একটু আলো জ্বালিয়ে ধর, দেখে রাখি
আকাশী কোন্ বিষণ্ণতা ছড়িয়ে যায় দিকে-দিকে,
দেখে রাখি অন্ধকারে উড়ন্ত ওই ক্লান্ত পাখিটিকে।ও পাখি, ও রহস্যময় পাখি।
হারিয়ে গেল আকাশ-মাটি, কান্না-পাওয়া
এ কী করুণ সন্ধ্যা! এ কোন্ হাওয়া লেগে
অন্ধকারে অদৃশ্য ওই নদীর দুঃখ হঠাৎ উঠল জেগে।
ও হাওয়া, ও রহস্যময় হাওয়া!
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
দেশ দেখাচ্ছ অন্ধকারে :
এই যে নদী, ওই অরণ্য, ওইটে পাহাড়,
এবং ওইটে মরুভূমি।
দেশ দেখাচ্ছ অন্ধকারের মধ্যে তুমি,
বার করেছ নতুন খেলা।
শহর-গঞ্জ-খেত-খামারে
ঘুমিয়ে আছে দেশটা যখন, রাত্রিবেলা
খুলেছ মানচিত্রখানি।
এইখানে ধান, চায়ের বাগান, এবং দূরে ওইখানেতে
কাপাস-তুলো, কফি, তামাক।
দম-লাগানো কলের মতন হাজার কথা শুনিয়ে যাচ্ছ।
গুরুমশাই,
অন্ধকারের মধ্যে তুমি দেশ দেখাচ্ছ।
কিন্তু আমরা দেশ দেখি না অন্ধকারে।
নৈশ বিদ্যালয়ের থেকে চুপি চুপি
পালিয়ে আসি জলের ধারে।
ঘাসের পরে চিত হয়ে শুই, আকাশে নক্ষত্র শুনি,
ছলাত-ছলাত ঢেউয়ের টানা শব্দ শুনি।
মাথার মধ্যে পাক খেয়ে যায় টুকরো-টুকরো হাজার ছবি;
উঠোন জুড়ে আলপনা, আল-পথের পাশে
হিজল গাছে সবুজ গোটা,
পুণ্যি-পুকুর, মাঘমণ্ডল, টিনের চলে হিমের ফোঁটা।
একটু-একটু বাতাস দিচ্ছে, বাতাস আনছে ফুলের গন্ধ;
তার মানে তো আর-কিছু নয়,
ছেলেবেলার শিউলি গাছে
এই আঁধারেও ফুলের দারুন সমারোহ।
গুরুমশাই,
অন্ধকারে কে দেখাবে মানচিত্রখানা?
মাথার মধ্যে দৃশ্য নানা,
স্মৃতির মধ্যে অজস্র ফুল,
তার সুবাসেই দেশকে পাচ্ছি বুকের কাছে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
চুলের ফিতায় ঝুল-কাঁটাতারে আরও একবার
শেষবার ঝাঁপ দিতে আজ
বড় সাধ হয়। আজ দুর্বল হাঁটুতে
আরও একবার, শেষবার,
নবীন প্রতিজ্ঞা, জোর অনুভব করে নিয়ে ধ্বংসের পাহাড়
বেয়ে টান উঠে যেতে ইচ্ছা হয়
মেঘলোক। মনে হয়, স্মৃতির পাতাল কিংবা অভ্রভেদী পাহাড়ের চূড়া
ব্যতীত কোথাও তার ভূমি নেই।
প্রেমিকের নেই। তাই অতল পাতালে
অথবা পাহাড়ে তার দৃষ্টি ধায়।
মনে হয়, অন্ধকারে কোটি জোনাকির শবদেহ
মাড়িয়ে আবার ঝুল-কাঁটাটারে চুলের ফিতায়…
ভীষণ লাফিয়ে পড়ি। অথবা হাঁটুতে
নবীন রক্তের জোর অনুভব করে নিয়ে যুগল পাহাড়
ভেঙে উঠে যাই মেঘলোকে।
আরও একবার যাই, আরও একবার, শেষবার।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
যদি এ চোখের জ্যোতি নিভে যায়, তবে
কী হবে, কী হবে!
দূর পথে ঘুরে ঘুরে ঢের নবীবন
খুঁজে যাকে এই রাতে নিয়ে এলে মন,
এখনও দেখিনি তাকে, দেখিনি, এখন
যদি এ চোখের জ্যোতি নিভে যায়, তবে
কী হবে, কী হবে!
যে-ও চলে যেতে পারে, যদি যায়, তবে
কী হবে, কী হবে!
এই যে চোখের আলো, ব্যথা-বেদনার
আগুনে রেখেছি তাকে জ্বেলে আমি, তার
দেখা পাওয়া যাবে, তাই। সে যদি আবার
চলে যায়, চোখভরা আলো নিয়ে তবে
কী হবে, কী হবে!
কখনও হারাই প্রাণ, কখনও প্রাণের
থেকেও যে প্রিয়তর, তাকে। সারাদিন
কথা মনে ছিল কোনো মায়াবী গানের,
সুর খুঁজে পেয়ে তার বিষাদমলিন
কথাগুলি যদি ফের ভুলে যাই, তবে
কী হবে, কী হবে!
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
মানবতাবাদী
|
ঘাটশিলার কাছে
এন. এইচ. সিক্সের কুচকুচে কালো পিঠের উপর থেকে তার
দিনভর-রোদ্দুর-খেয়ে-গরম-হয়ে-ওঠা
শস্যের
শেষ কয়েকটি দানাকে খুব যত্নভরে
খুঁটে তুলতে-তুলতে
সাড়ে পাঁচ কাঠা জমির মালিক এক চাষি আমাকে বলেছিল,
হাইওয়ে হয়ে ইস্তক
এই তাদের একটা মস্ত উপকার হয়েছে যে,
রাস্তার উপরেই
দিব্যি এখন ধান শুনোনো যায়।
সূর্যদেব তখন
সারা আকাশে তার খুনখারাবি রঙের বালতি উপুড় করে দিয়ে
দিগন্ত-রেখার ঠিক নীচেই তাঁর
রক্তবর্ণ মুখখানাকে
আধাআধি লুকিয়ে ফেলেছেন।
সরকার বাহাদুরের কোনো প্রতিনিধি তখন
অকুস্থলে হাজির ছিলেন না।
থাকলে নিশ্চয়ই সরকারি সড়কের এই
অচিন্ত্যপূর্ব উপকারিতার কথা শুনে
তাঁর মুখও সেদিন লজ্জায় লাল হয়ে উঠত।
কিন্তু এন. এইচ. থার্টিওয়ানের উপর দিয়ে যখন আমরা
গয়েরকাটার দিকে এগোচ্ছিলাম,
তখন ধান শুকোবার সময় নয়।
পাশের গাঁয়ের এক চাষি তখন তাই খুব মনোযোগ সহকারে
শাবল দিয়ে খুঁড়ে তুলছিল
হাইওয়ের পিচ।
পিচ দিয়ে কী হবে, জিজ্ঞেস করতেই একগাল হেসে
সে আমাকে জানায় যে,
হাইওয়ে হয়ে ইস্তক আর রাংঝালের দরকার হয় না;
গোটা-গাঁয়ের ফুটো-বালতি আর ফাটা-গামলা এখন
পিচ গলিয়েই দিব্বি মেরামত হয়ে যাচ্ছে।
সরকার বাহাদুরের কোনো প্রতিনিধি সেদিনও
অকুস্থলে হাজির ছিলেন না।
একমাত্র সূর্যদেবই আমাদের কথোপকথনের সাক্ষী।
কিন্তু সূর্যদেব সেদিনও খুব লজ্জা পেয়েছিলেন নিশ্চয়।
গয়েরকাটার আকাশে তিনি আর তাই
খুনখারাবির খেলা দেখাননি।
গাঁয়ের চাষির সঙ্গে যখন আমার কথাবার্তা চলছে,
ফাঁক বুঝে তখন
টুক করে একসময় তিনি আংরাভাসা নদীর জলে তলিয়ে যান।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
নীতিমূলক
|
কিছু পেলে কিছু দিয়ে দিবি,
তা নইলে পৃথিবী
চলতে-চলতে একদিন চলবে না।
আকাশে ঘনিয়ে আসবে ঘোর
অন্ধকার, তোর
ঘরে-বাইরে কেউ কথা বলবে না।
দরজায় লাগানো ছিল তালা,
বেলকুঁড়ির মালা
পড়ে ছিল রজ্জুর সমান।
লুণ্ঠন করেছ পুষ্প সব,
অথচ সৌরভ
এক-কণা করোনি কাউকে দান।
কিছু যত পাচ্ছে, প্রতিদিন
জমছে তত ঋণ।
একটু তার শোধ করো এবারে।
নইলে খসে পড়বেই ঘরবাড়ি,
সূর্য দেবে আড়ি
বিশ্ব ডুবে যাবে অন্ধকারে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
কিছুটা আলো কালো মেঘের
রেলিঙে ছিল ঝুঁকে।
কিছুটা ছিল আড়ালে, আর
কিছুটা সম্মুখে।
ছবিটা তবু পূর্ণ নয়,
খানিক ছিল বাকি,
পৃথিবী থেকে আকাশে তাই
উড়াল দেয় পাখি।
সারাটা দিন বৃষ্টি আর
বাতাসি আস্ফোটে
ছিল না যার চেতনা, যেন
ধীরে সে জেগে ওঠে।
দিনাবসানে মাঠকোঠার
দরজা ধরে ঠায়
দ্যাখো সে ওই দাঁড়িয়ে আছে
শ্রাবণ-সন্ধ্যায়।
যা কিছু দ্যাখে তাতেই যেন
ভারী অবাক মানে,
বোঝে না ছিল কোথায়, আর
এল সে কোনখানে।
এ যদি সেই পোড়া শহর
তা হলে বলো হেন
অঙ্গে তার এত বাহার
ঝলমলায় কেন।
পৃথিবী যেন পৃথিবী নয়,
আলোর সরোবর;
আলোয় ভাসে বৃক্ষলতা
সমূহ বাড়িঘর।
অবাক হয়ে আকাশে চেয়ে
দাঁড়িয়ে আছে একা,
বোঝে না কেন এমন ছবি
হঠাৎ দিল দেখা।
আকাশে আলো ছড়িয়ে যায়,
বাতাস মধুময়।
নিরুচ্চার কে যেন বলে
চলছে : জয়, জয়!
যেখানে যায়, যেদিকে চায়,
আলোয় মাখামাখি।
সাঁজবেলায় আলোর জলে
সাঁতার কাটে পাখি।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
মানবতাবাদী
|
একদিন যাকে তছনছ করে দেওয়া হয়েছিল,
ছেঁড়া ফাটা সেই মানচিত্রগুলিকে
এখন আবার
একটু-একটু করে জোড়া লাগানো হচ্ছে।
উঠে যাচ্ছে কাঁটাতারের বেড়া,
ধরে পড়ছে দেওয়াল
তার ইটের টুকরো এখন
কিউরিও-শপে সওদা করা যায়।
চেকপোস্টের খুপরি-ঘরে ঝাঁপ ফেলে দিয়ে
উর্দি-পরা লোকজনেরা
অনেক আগেই যে যার বাড়ি চলে গেছে।
একদিন যা সীমান্ত বলে চিহ্নিত ছিল, সেখানে কোনও
রক্তচক্ষু এখন আর দপদপ করে না।
কোথাও কোনো বাধা নেই।
মানুষগুলি ইচ্ছেমতো এদিক থেকে ওদিকে যাচ্ছে, আর
ওদিক থেকে আসছে এদিকে।
তারা জেনে গেছে যে,
মানচিত্রকে ভেঙে ফেলার খেলা আর কেউ
জমাতে পারবে না। যা
ভাঙা হয়েছিল, নতুন করে এখন আবার তাকে
জোড়া লাগাবার দিন।
২৪ ভাদ্র, ১৩৯৭
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
এখানে ঢেউ আসে না, ভালবাসে না কেউ, প্রাণে
কী ব্যথা জ্বলে রাত্রিদিন, মরুকঠিন হাওয়া
কী ব্যথা হানে জানে না কেউ, জানে না, কাছে পাওয়া
ঘটে না। এরা কোথায় যায় জটিল জমকালো
পোশাকে মুখ লুকিয়ে, দ্যাখো কত না সাবধানে
আঁচলে কাচ বাঁধে সবাই, চেনে না কেউ সোনা;
এখানে মন বড় কৃপণ, এখানে সেই আলো
ঝরে না, ভেঙে পড়ে না ঢেউ—এখানে থাকব না।
যে-মাঠে সোনা ফলানো যায়, আগাছা জমে ওঠে
সেখানে। এরা জানে না কেউ—কী রঙে ঝিলমিল
জীবন,—তাই বাঁচে না কেউ; দুয়ারে এঁটে খিল
নিজেকে দূরে সরায়, দিন গড়ায়। সেই সোনা
ঝরে না, ভেঙে পড়ে না ঢেউ—দুয়ারে মাথা কোটে,
এখানে মন বড় কৃপণ—এখানে থাকব না।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
রাস্তা পেরোলেই বাড়ি
কিন্তু বাড়ি তখনও অনেক দূর।
বাবা তাঁর কাজের টেবিলে মগ্ন, এ-ঘরের থেকে অন্য ঘরে
দিদির চঞ্চল ছায়া সরে যায়,
রেলিঙে মায়ের নীল শাড়ি।
দৃশ্যগুলি একে-একে ভেসে উঠছে চোখের উপরে।
যেন সব হাতের মুঠোয়। চতুর্দিকে
শব্দ, গন্ধ, রঙের ফোয়ারা,
ফুল, লতা, অগ্নিবর্ণ পাখির পালক,
ফুটপাথের ঝক্ঝকে রোদ্দুর,
অর্থাৎ যা-কিছু এই ভুবনের বৃন্তে ফুটে আছে,
যা দিয়ে কবি ও শিল্পী বানিয়ে তোলেন গান, ভালবাসা,
তাকেই ব্যাকুল হাতে তুলে নিয়ে
কে তুই, নিতান্ত শিশু, বাড়িতে ফিরবার তীব্র তাড়নায়
ছুটে যাস?
রাস্তা বেরোলেই বাড়ি,
কিন্তু বাড়ি তখনও অনেক দূর।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
মানবতাবাদী
|
আমরা আগাপাস্তলা সব বুঝতে পারি
ভক্তেরা সামান্য পারে।
কিন্তু তারা আদ্যোপান্ত দীন-ভিখারি,
যা কও, তাতেই মাথা নাড়ে।
নাড়ুক, ভক্তিভাবের জোয়ার
কাটলে তারা থাকবে না আর;
কেউ বা যাবে বিন-টিকিটে ঝালুকবাড়ি,
কেউ জশিডি-কর্মাটারে।
ছু-মন্তরের ম্যাজিক তুমি অনেক জানো,
জলের পাত্রে অগ্নিশিখা
জ্বালিয়ে লোভী লোকগুলোকে জুটিয়ে আনো
প্রসাদ দিয়ে এক-কণিকা।
কিন্তু আমরা তোমায় চিনি,
এমন স্বপ্ন তাই দেখিনি
তুলব ধুধু মাঠের মধ্যে চক-মিলানো
ময়দানের অট্টালিকা।
স্বপ্ন আছে আর-এক রকম। আমরা মাখি
তার সুগন্ধ জীবন জুড়ে।
অন্ধকারের বুকেও স্বপ্ন লুকিয়ে রাখি
নৈশ ভয়ের ভিত্তি খুঁড়ে।
ধ্বস্ত বাড়ির বিশাল কামরা
যখন খোলে, তখন আমরা
স্বপ্ন আঁকি, তার ভিতরেও স্বপ্ন আঁকি
পায়রা-ডাকা ভরদুপুরে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
কখন যে একদল মানুষ আমাকে ঘিরে ফেলেছে,
তা আমি বুঝতে পারিনি।
হাত ধরে যিনি আমাকে আজ এই হাটের মধ্যে এনে
ছেড়ে দিয়েছিলেন,
চোখের পলক ফেলতে-না-ফেলতেই তিনি
ভ্যানিশ।
বুঝতে পারছিলুম যে, আমারও এখন
সরে পড়া দরকার। কিন্তু
মানুষের বলয়ের বাইরে যেই আমি আমার
পা পাড়িয়েছি, অমনি
কেউ একজন বলে উঠল, ‘যাবেন না।’
যাবেন না, যাবেন না, যাবেন না!
হাটের ধারেই
বিশাল বটগাছ।
জোলো হাওয়ায়
গা ভাসিয়ে সে তার
পাতার ঝাঁঝর বাজাচ্ছে তো বাজিয়েই যাচ্ছে।
দুপুরবেলায় খুব বৃষ্টি হয়েছিল,
বিকেলে তাই
যেমন লোকজন, তেমন দেখছি চারপাশের
গাছপালা, খেতখামার আর
বাড়িঘরগুলোর চেহারাও এখন একটু
অন্যরকম।
ছেঁড়া-ছেঁড়া মেঘগুলোও তাদের ভোল ইতিমধ্যে
পালটে ফেলেছে।
বোঝা যাচ্ছে, আজ আর বৃষ্টি হবে না।
গা ধুয়ে নিয়ে
প্রকৃতি এখন একেবারে পটের বিবির মতো
আপাদমস্তক ফিটফাট্।
যেন ছবিটাকে সম্পূর্ণ করে তুলবার জন্যেই
খানি কাগে
আকাশ থেকে সেই আলোর ধারা নেমে এসেছে,
যে-আলোয় শুধু বিয়ের কনে নয়,
যে-কোনও মানুষকেই ভারী
সুন্দর দেখায়।
আমার চোখে আর পলক পড়ছে না। আমি
দাঁড়িয়ে আছি তো দাঁড়িয়েই আছি। আর
তারই মধ্যে
চতুর্দিকে ধ্বনিত হচ্ছে সেই মন্ত্র,
যে-মন্ত্র একমাত্র মানুষই উচ্চারণ করতে পারে।
যাবেন, যাবেন না, যাবেন না!
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
আমার হাতের মধ্যে টেলিফোন;
আমার পায়ের কাছে খেলা করছে
সূর্যমণি মাছেরা।
পিচ-বাঁধানো সড়কের উপর দিয়ে
নৌকো চালিয়ে আমি
পৃথিবীর তিন-ভাগ জল থেকে এক-ভাগ ডাঙায় যাব।
সেই নৌকোর জন্যে আমি বসে আছি;
আর, পাঁচ মিনিট পরপর
ডায়াল ঘুরিয়ে চিৎকার করছি:
হ্যালো দমদম…হ্যালো দমদম…হ্যালো…
আমার মাথার উপরে জ্বলছে নিয়ন-বাতি;
আর আমার গোড়ালির চারপাশে চক্কর মেরে
হাঁটুর কাছে উঠে আসছে
মোহেনজোদড়োর নর্দমা থেকে উপচে-পড়া নোংরা কালো জলস্রোত।
আমার দেওয়ালে ফুটেছে সাইকেডেলিক ছবি।
সেই ছবির দিকে তাকিয়ে আমি ভাবতে থাকি যে,
আমার জুঁইলতা এখন
পাঁচ ফুট জলের তলায় ফুল ফোটাচ্ছে।
কিন্তু খুব-বেশি ভাবনা-চিন্তার সময় আমি পাই না।
আচমকা
আমার মনে পড়ে যায় যে,
দমদম-থানা থেকে একটা রেস্ক্যু-বোট আসবে।
সেই প্রতিশ্রুত উদ্ধারের জন্য পুনশ্চ আমি চেঁচাতে থাকি;
হ্যালো দমদম…হ্যালো দমদম…হ্যালো…
জল ঠেলে আমি শোবার ঘরে আসি।
জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে আমার মেয়ের গা।
তার টেম্পারেচার নিয়ে, জল ঠেলে, আমি আবার
টেলিফোনের কাছে ফিরে যাই।
সেই অবসরে, দরজা খোলা পেয়ে,
রাজ্যের কচুরিপানা ও একটা নেড়িকুত্তা
সাঁতার কেটে
আমার ড্রইংরুমে এসে ঢোকে।
আমি বিস্মিত হই না।
কচুরিপানার ফুলগুলিকে আমি ফ্লাওয়ার-ভাসে সাজিয়ে রাখি,
এবং নেড়িকুত্তাটিকে খুব যত্ন করে আমার
সোফার উপরে বসাই।
তারপর টেলিফোনের মাউথপিসটাকে
তার মুখের কাছে এগিয়ে দিয়ে বলি,
“যদি বাঁচতে চাস হারামজাদা
তা হলে আয়, আমার সঙ্গে গলা মিলিয়ে বল:
হ্যালো দমদম…হ্যালো দমদম…হ্যালো…”
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
মাঝে-মাঝে একটু জিরিয়ে নিতে হয়।
ঘুরে-দাঁড়িয়ে মাঝে-মাঝে একবার
দেখতে হয়
পিছনের মানুষজন, ঘরবাড়ি আর
খেতখামার।
মাঝে-মাঝে ভাবতে হয়
এই যে আমি পাথরের ধাপে
পা রেখে-রেখে
পাহাড়-চূড়ার ওই দেবালয়ের দিকে উঠে যাচ্ছি,
এর কি কোনও দরকার ছিল?
আমার মুঠোর মধ্যে খুব শক্ত করে আমি
ধরে রেখেছি সেই নিশান,
পাথরে পা রেখে-রেখে উপরে উঠে গিয়ে
মন্দিরের ওই চূড়ার যা আমি
উড়িয়ে দেব।
কিন্তু ঘুরে দাঁড়িয়ে এখন আমি
পাহাড়তলির
ঘরবাড়ি দেখছি,
খেতখামার দেখছি,
আর দেখছি মানুষজনের মেলা।
ঘুরে দাঁড়াবার এই হচ্ছে বিপদ।
মনে হচ্ছে,
কোথাও কিছু ভুল হয়ে গেল।
মানুষের ওই মেলার মধ্যেই এই
নিশানটা আমি রেখে আসতে পারতুম।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
প্রতীক্ষার শেষ নেই, ওরা তাই নদীর কিনারে
বসে আছে উদয়াস্ত। ওরা
কয়েকটি বৃদ্ধ ও যুবা, বৃদ্ধা ও যুবতী।
দু’তিনটি শিশুও ছিল। তারা কালীমন্দিরের ধারে
কাঠের জিরাফ, হাতি, ঘোড়া,
ছাঁচের মাটির দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী
দেখে নিয়ে মন্দির-চত্বরে গেছে প্রসাদ ভিক্ষায়।
শুধু ওরা নদীর কিনারে প্রতীক্ষায়
স্থিত বসে আছে।
দূরে গিয়েছিল নদী, জোয়ারে এসেছে ফিরে কাছে।
ঝিঁ ঝিঁ ডাকে, অনেকজনের-মধ্যে-একা
কয়েকটি মানুষকে ঘিরে জমে ওঠে গাঢ় অন্ধকার।
নির্বাক তবুও ওরা বসে আছে, অথচ নৌকার
নেই দেখা।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
চেনা আলোর বিন্দুগুলি
হারিয়ে গেল হঠাৎ–
এখন আমি অন্ধকারে, একা।
যতই রাত্রি দীর্ণ করি দারুণ আর্তরবে,
এই নীরন্ধ্র নিকষ কালোর কঠিন অবয়বে
যতই করি আঘাত,
মিলবে না আর, মিলবে না আর,
মিলবে না তার দেখা।
হারিয়ে গেল হঠাৎ আমার
আলোকলতা-মন,–
নেই, এখানে নেই;
হারিয়ে গেল প্রথম আলোর হঠাৎ-শিহরণ,–
নেই।
চার-দেয়ালে বন্ধ হয়ে চার দেয়ালের গাতে
যতই হানি আঘাত, আমার আর্ত আকাঙ্ক্ষায়
যতই মুক্তিলাভের চেষ্টা করি,
ততই কঠিন পরিহাসের রাত্রি নামে, আর
ততই ভয়ের উজান ঠেলে মরি।
চেনা আলোর বিন্দুগুলি
হারিয়ে গেল হঠাৎ–
এখন আমি অন্ধকারে, একা।
চারদিকে চার-দেয়াল, চোখের দৃষ্টি নিবে আসে,
শিউরে উঠি অন্ধকারের কঠিন পরিহাসে;
এই নীরন্ধ্র অন্ধকারে যতই হানি আঘাত,
আসবে না আর, আসবে না কেউ,
মিলবে না তার দেখা।
ভাঙো আমার দেয়াল, আমার দেয়াল।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
সূর্য ডুবে যাবার পর
হাসির দমকে তাদের মুখের চামড়া কুঁচকে গেল,
গালের মাংস কাঁপতে লাগল,
বাঁ চোখ বুঁজে, ডান হাতের আঙুল মটকে
তারা বলল,
“শত্রুরা নিপাত যাক।”
আমি দেখলাম, দিগন্ত থেকে গুঁড়ি মেরে
ঠিক একটা শিকারি জন্তুর মতন
রাত্রি এগিয়ে আসছে।
বললাম, “রাত্রি হল।”
তারা বলল, “হোক।”
বললাম, “রাত্রিকে যেন একটা জন্তুর মতন দেখাচ্ছে।”
তারা বলল, “রাত্রি তো জন্তুই।
আমরা এখন উলঙ্গ হয়ে
ওই জন্তুর পূজায় বসব।
তুমি ফুল আনতে যাও।”
আমি ফুল আনতে যাচ্ছিলাম।
পিছন থেকে তারা আমাকে ডাকল।
বলল, “ফুলগুলিকে ঘাড় মুচড়ে নিয়ে আসবে।”
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
সারাটা দিন ছায়া পড়ে।
যত দূরে যেখানে যাই,
পাহাড় ভাঙি, তাঁবু ওঠাই–
ছায়া পড়ে।
দৃশ্য অনেক, নেবার পাত্র
পৃথিবীতে একটা মাত্র–
ছায়া পড়ে।
সারা সকাল, সারা দুপুর,
সারা বিকেল, সারাটা রাত
মনের মধ্যে হলুদ-কালো চতুর একটা ছায়া পড়ে।
সারাটা দিন ছায়া পড়ে।
এই যে বসি, এই যে উঠি,
থেকে-থেকে বাইরে ছুটি–
ছায় পড়ে।
পিছন-পিছন ঘুরেছি যার,
সেই নিয়েছে পিছু আমার–
ছায়া পড়ে।
সারা সকাল, সারা দুপুর,
সারা বিকেল, সারাটা রাত
মনের মধ্যে হলুদ-কালো চতুর একটা ছায়া পড়ে।
সারাটা দিন ছায়া পড়ে।
সকল কাজে, সকল কথায়,
জলেস্থলে তরুলতায়–
ছায়া পড়ে।
এখন আমি বুঝব কিসে
শিকার কিংবা শিকারি সে–
ছায়া পড়ে।
সারা সকাল, সারা দুপুর,
সারা বিকেল, সারাটা রাত
মনের মধ্যে হলুদ-কালো চতুর একটা ছায়া পড়ে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
মন্দির না মসজিদ না বিতর্কিত কাঠামো, এই
ধুন্ধুমার তর্কের ভিতর থেকে
কানা-উঁচু পিতলের থালা বাজাতে-বাজাতে
বেরিয়ে এল
পেটে-পিঠে এক হয়ে যাওয়া, হাড়-জিরজিরে দুটি
নেংটি-পরা মানুষ।
তাদের পাথার উপরে দাউদাউ করে জ্বলছে মধ্যদিনের সূর্য।
তবে পরপর কয়েকটা দিন যেহেতু বৃষ্টি হয়েছে, তাই
তাদের ফুটিফাটা পায়ের তলায়
আর্যাবর্তের ঘাস এখনও হল্দে হয়ে যায়নি।
ভিড়ের মধ্যেই ছিল বটে, আর মাঝেমধ্যে তালিও বটে
বাজিয়েছিল, তবে
ধোপদুরস্ত জামাকাপড় পরা লোকগুলোর এই
তর্কটা যে ঠিক কী নিয়ে,
তার বিন্দুবিসর্গও তারা জানে না।
সভাস্থলের একটু দূরে
ঝাঁকড়ামাথা একটা তেঁতুলগাছের তলায় বসে
পিতলের থালায় এক চিমটি নুন ছিটিয়ে
ছাতু ঠাসতে-ঠাসতে
তবুও যে তারা হাসছে, তার কারণ, তাদের
একজনের নাম হতেই পারত সিকান্দর শাহ্ আর
অন্যজনের সেলুকাস
ভিড়ের ভিতর থেকে
পিতলের থালা বাজাতে-বাজাতে বেরিয়ে এসেছে দুই
লেংটি-পরা ঐতিহাসিক পুরুষ।
তাদের মাথায় উপরে জ্বলছে অনাদি ভারতবর্ষের আকাশ, আর
ইতিমধ্যে কয়েকটা দিন যেহেতু বৃষ্টি হয়েছে, তাই তাদের
ফুটিফাটা পায়ের তলায়
আর্যাবর্তের ঘাস এখনও হল্দে হয়ে যায়নি।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
মানবতাবাদী
|
চতুর্দিকে অন্ধকার, তারই মধ্যে এখানে-ওখানে
কয়েকটি বাড়িতে
আলো জ্বলে,
টিভি চলে,
হাস্যমুখে ভাষ্যকার বলে–
বিদ্যুতের উৎপাদন আজ বিকেলে যথেষ্ঠ ছিল না।
যারা শোনে, তারা ভাবে, বটে?
যেমন সংবাদপত্রে, তেমনি দেখছি টিভিতেও রটে
উল্টাপাল্টা গুজব!–তাদের
ফ্রিজের ভিতরে
ল্যাংড়া আমি, মাখন, সন্দেশ, ডিম, ব্রয়লার চিকেন
টাটকা থেকে যায়।
চতুর্দিকে অন্ধকার, তারই মধ্যে একটি-দুটি শৌখিন পাড়ায়
আলোর বন্যায় ভাসতে থাকে
বাড়িঘর।
ঐগুলি কাদের বাড়ি? সম্ভবত ঈশ্বরের তৃতীয় পক্ষের
পুত্র ও কন্যার।
কে যেন বলতেন, “আগে সম্পদ বাড়াও,
তা নইলে দারিদ্র্য ছাড়া আর
কিচ্ছুই দেখছি না…ইয়ে…
বণ্টন করবার মতো।”
তখন বক্তৃতা শুনে হাততালি দিতুম,
প্রত্যেকে ভাবতুম,
এ-সবই যৎপরোনাস্তি যুক্তিযুক্ত কথা।
সত্যিই তো, দেশে
সম্পদ যদি না বাড়ে, কী হবে দারিদ্র্য বেঁটে দিয়ে।
হিসেবে গরমিল ছিল, সেইটে বুঝে শেষে
ইদানীং আমরা কিন্তু তাতেই সম্মত।
তেত্রিশ বছর ধরে প্রতীক্ষায় থাকতে-থাকতে হাড়ে
দুব্বো গজাবার বেশি বাকি নেই।
সেই কারণে বলছি, আপাতত
যা বণ্টন করা যায়, তা-ই করুন, এই
দারিদ্র্যই বাঁটা হোক, তার সঙ্গে অন্ধকারও হোক।
অবস্থা যা দেখছি, তাতে সর্বাঙ্গীণ সেটাই মানাবে।
চতুর্দিকে অন্ধকার, তারই মধ্যে ইতস্তত আলো
দেখতে-দেখতে ইদানীং
একটাই ভাবনা জাগে; মনে হয়,
এর চেয়ে বরং
সবাই একসঙ্গে অমবস্যার ভিতরে ঢোকা ভাল।
একসঙ্গে আনন্দ করা ভাগ্যে যদি না-ই থাকে তো শোক
সবাই একসঙ্গে করা যাবে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
'এ-কন্যা উচ্ছিষ্ট, কোনো লোলচর্ম বৃদ্ধ লালসার
দ্বাবিংশ সন্ধ্যার প্রণয়িনী।
ধিক্, এরে ধিক্!'
বলে সেই সত্যসন্ধ নিষ্পাপ প্রেমিক
বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন।
সেখানে টগর জুঁই হাস্নাহেনা রজনীগন্ধার
সহৃদয় সান্নিধ্যে এবং
সন্ধ্যার হাওয়ায় তাঁর ক্লিষ্ট স্নায়ুমন
শান্ত হয়ে এলে ফের অরিন্দম সেন
দু-দণ্ড তন্ময় বসে থেকে
পুনরায় নেই একই চিন্তার হাঁটুতে মাথা রেখে
নবতর সিদ্ধান্তে এলেন :
তা বলে কি প্রেম নেই? প্রেমে শান্তি নেই? আছে, আছে।
বিবৃতজঘন্য এই কন্যাদের কাছে
সে-প্রেম যাবে না পাওয়া। কিংবা পাওয়া গেলেও বিস্তর
মূল্য দিতে হবে। আমি ততটা শাঁসালো
প্রেমিক যখন নই, অনিবার্য এই পরাজয়ে
শোকার্ত হব না। অতঃপর
আমার আশ্রয় নেওয়া ভাল
মেঘ-নদী-বৃক্ষলতাপাতার প্রণয়ে।'
অপিচ পরম রঙ্গে টবের গোলাপে
মগ্ন হয়ে দেখা যায়, সে এক আশ্চর্য প্রণয়িনী!
ঘনিষ্ট, তবুও শান্ত। এবং পাপড়িতে তার কাঁপে
সেই একই অপার্থিব অমর্ত্য পিপাসা,
যাকে বলি প্রেম।
তাই সমস্ত প্রগল্ভ ছিনিমিনি
শেষ হয়ে গেলে সেই প্রেমিক আবারও বুঝি পারে
হৃদয়ে জ্বালিয়ে নিতে আর-এক প্রসন্ন ভালবাসা
বারান্দার এই মৌন বসন্তবাহারে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
মানবতাবাদী
|
রাস্তার দুইধারে আজ সারিবদ্ধ দাঁড়িয়েছে অন্ধ সেনাদল;
আমি চক্ষুষ্মান হেঁটে যাই
প্রধান সড়ক। দেখি, বল্লমের ধাতু
রোদ্দুরের প্রেম পায়, বন্দুকের কুঁদার উপরে
কেটে বসে কঠিন আঙুল।
যে-কোনো মুহূর্তে ঘোর মারামারি হতে পারে, তবু
অস্ত্রগুলি উল্টানো রয়েছে আপাতত।
পরস্পরের দিকে পিঠ দিয়ে সকলে এখন
সম্মান রচনা করে। আমি দেখি,
অযুত নিযুত অন্ধ সারিবদ্ধ দাঁড়িয়েছে রাস্তার উপরে।
আমি চক্ষুষ্মান হেঁটে যাই।
আমি সেনাপতি। আমি সৈন্য-পরিদর্শনে এসেছি।
কিন্তু তার সেনাপতি, কাহাকে সমরে নেব, কিছুই জানি না।
আমি শুধু দেখতে পাই, দশ লক্ষ যোদ্ধার সভায়
কাহারও কপালে অক্ষিতারকার শোভা নেই;
কপালে গভীর দুই গর্ত নিয়ে সবাই দাম্ভিক দাঁড়িয়েছে।
আমি একা দেখতে পাই, আমি একা দেখতে পাই, আমি
দশ লক্ষ যুযুধান অন্ধের সভায় আজ একা।
অথচ অন্ধের দেশে একা চক্ষুষ্মান হওয়া খুব ভয়াবহ।
প্রধান সড়কে তাই সৈন্য-পরিদর্শনের কালে
বারবার চমকে উঠি। মনে হয়,
অন্ধের সমাজে একা চক্ষুষ্মান হবার অধিক
বিড়ম্বনা কিছু নেই, কখনও ছিল না।
রাস্তার দুই ধারে আজ সারিবদ্ধ দাঁড়িয়েছে যুদ্ধে সমুৎসুক
অন্ধ সেনাদল।
আমি হেঁটে যাই। আমি হেঁটে যেতে-যেতে
গুরুবন্ধনার ছলে দেখে যাই, বল্লমের ধাতু
রোদ্দুরে হতেছে সেঁকা, বন্দুকের কুঁদার উপরে
কেটে বসে কঠিন আঙুল।
আপাতত রণাঙ্গন নিস্তব্ধ যদিও,
আমি তবু বুঝতে পারি, নিকুম্ভিলা যজ্ঞের আগুনে
সর্বত্র ভীষণ ধুমধাড়াক্কার উদ্যোগ চলেছে।
আমি সেনাপতি। আমি প্রধান সড়ড়ে হেঁটে যাই।
অথচ কখন যুদ্ধ শুরু হবে, কার যুদ্ধ, কিছুই জানি না।
কাহাকে সমরে নেব, কিছুই জানি না!
(আমি কার সেনাপতি, আমি কার সেনাপতি) আমি
অন্ধের সমাজে একা চক্ষুষ্মান হবার বিপদ
টের পেতে-পেতে আজ গুরুবন্দনার ছলে ভাবি,
এবার পালানো ভাল দৌড়িয়ে। নতুবা
যদি ভীমরবে সেই বিস্ফোরণ ঘটে যায়, তবে–
যেহেতু নিদানকালে চক্ষুলজ্জা ভয়াবহ, তাই–
নিজের চক্ষুকে হয়তো নিজেরই নখরাঘাতে উপড়ে ফেলে দিয়ে
অন্ধের সমাজে আজ মিশে যেতে হবে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
রাগী ভিমরুলের মতো কয়েকটি বালক ওই দৌড়ে চলে যায়।
কাল সারা রাত খুব বৃষ্টি হয়েছিল।
এখন আকাশে মেঘমুক্ত, তার কোত্থাও দেখি না
কোনো কলঙ্কের দাগ, চিল
অনেকটা উঁচুর নীলে ফিরে গিয়ে ডানা ছড়িয়েছে।
এমন সুন্দর ভোর শ্রাবণে ও ভাদ্রে মাঝে-মাঝে
অলীক দৃশ্যের মতো দেখা দেয়।
দেখা দিলে আবার নতুন করে নিজস্ব নিয়মে
বাঁচতে সাধ জাগে।
সকলে ডেকে-ডেকে বলতে ইচ্ছা করে:
ভাল থাকো।
আদিত্যবর্ণের ছোঁয়া লাগুক সমস্ত বাসনায়।
তবু তারই মধ্যে ছন্দ-পতনের মতো
রাগী ভিমরুলের ঝাঁক দৌড়ে চলে যায়।
এত যে বয়স হল, তবু আজও এমন যাওয়ার
তাৎপর্য বুঝি না।
বুঝতে গিয়ে চোখ ফিরিয়ে ভিতরে তাকাই।
দেখি যে, সেখানে আজও মেঘমুক্ত আকাশের মতো
আরও একটা সকাল হয়েছে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
যে যায়, সে যায়
যে থাকে, সে টেনেবুনে পাঁচ-দশ বছর আরও থাকে।
সেও যেত, কিন্তু তার রয়েছে বেজায়
পিছুটান, কেউ-কেউ রহস্য করে যাবে
বলে মিছুটান।
সে বলে, “ও বড়বউ, শেষকালে যে দফতরে গর্দান
কাটা পড়বে, ভাজাভুজি-চচ্চরি যা হয়
তা-ই দিয়েই খেতে দাও, আটটা বাজে, কালকে হয়েছিল
বড্ড দেরি, আজ যেন না হয়।”
কালকে সে সমস্ত রাস্তে ভয়ে-ভয়ে ছিল।
সে খুব দুঃখিত নয়, সে খুব সুখীও নয়। তার একদিকে
বড়বউ, অন্যদিকে বড়বাবু। মধ্যিখানে ক্রমাগত দেরি
করতে-করতে প্রাণ-ভ্রমরা আছে তার টিঁকে।
পাঁচ-দশ বছর আরও মাঝেমধ্যে বলবে সে, “ধেত্তেরি!”
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
তুমি বলেছিলে ক্ষমা নেই, ক্ষমা নেই।
অথচ ক্ষমাই আছে।
প্রসন্ন হাতে কে ঢালে জীবন শীতের শীর্ণ গাছে।
অন্তরে তার কোনো ক্ষোভ জমা নেই।
তুমি বলেছিলে, তমিস্রা জয়ী হবে।
তমিস্রা জয়ী হলো না।
দিনের দেবতা ছিন্ন করেছে অমারাত্রির ছলনা;
ভরেছে হৃদয় শিশিরের সৌরভে।
তুমি বলেছিলে, বিচ্ছেদই শেষ কথা।
শেষ কথা কেউ জানে?
কথা যে ছড়িয়ে আছে হৃদয়ের সব গানে, সবখানে;
তারও পরে আছে বাঙময় নীরবতা।
এবং তুষার মৌলি পাহাড়ে কুয়াশা গিয়েছে টুটে,
এবং নীলাভ রৌদ্রকিরণে ঝরে প্রশান্ত ক্ষমা,
এবং পৃথিবী রৌদ্রকে ধরে প্রসন্ন করপুটে।
দ্যাখো, কোনোখানে কো্নো বিচ্ছেদ নেই।
আছে অনন্ত মিলনে অমেয় আনন্দ, প্রিয়তমা।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
এখন নিজস্ব শ্রমে যাবতীয় উদ্যানের বেড়া
বেঁধে দিতে ইচ্ছা হয়।
স্নেহের চুম্বনখানি এঁকে দিতে ইচ্ছা হয়
সমস্ত শিশুর গালে।
সমস্ত দেওয়ালে
এখন নিজস্ব হাতে নিজস্ব ভাষায় গিয়ে লিখবার সময়:
কে ভালবাসার দিকে তুলেছ বন্দুক,
দূরে যাও।
ভালবাসা ছাড়া কি দ্বিতীয় কোনো উচ্চারণ
মানায় কবির কণ্ঠে?
অস্ত্র নিয়েছিলে হাতে, এই দৃশ্য দেখেছি সবাই।
কিন্তু কে না জানে,
লক্ষ্যের বিচারে সেও শুদ্ধ ভালবাসারই সংগ্রাম।
ভালবাসা কবিতারই অন্য নাম।
যে-নাম হৃদয়ে তুমি উৎকীর্ণ করেছ, তাই জানো:
এখন সমস্ত মিথ্যা
কদর্য-অক্ষরে-লেখা সব গ্লানি ভুলবার সময়।
এখন নিজস্ব হাতে সকলকে সুশ্রী করে তুলবার সময়।
নিজস্ব ভাষায়
অঙ্কুরিত প্রতিটি বীজের কাছে নতজানু হয়ে
এখন বলবার লগ্ন:
গোপন থেকো না বৃক্ষ, তোমার নিজস্ব আলো নিজস্ব হাওয়ায়
নিজস্ব নিয়মে বেড়ে ওঠো।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রেমমূলক
|
দু’ দণ্ড দাঁড়াই ঘাটে। এই স্থির শান্ত জলে তার
আয়াত দৃষ্টির মৌন রহস্য বিম্বিত হয় যদি।
দু’ দণ্ড দাঁড়াই এই আদি অন্ধকারে। বলি, ‘নদী,
কে তার ব্যর্থতাগুলি ক্ষিপ্ত হাতে নিয়েছে কুড়িয়ে
সন্ধ্যার আকাশ, অস্ত-সূর্য আর নিঃসঙ্গ হাওয়ার
বিষণ্ণ মর্মর থেকে, শীতের সন্ন্যাসী বনভূমি
থেকে? তুমি নাকি? তার আকাঙ্ক্ষার ক্লান্ত পথ দিয়ে
কে ফিরে এসেছে এই অপরূপ অন্ধকারে,–তুমি?’
দু’ দণ্ড দাঁড়াই ঘাটে। তরঙ্গের অস্ফুট কল্লোলে
কান পাতি। যদি তার কণ্ঠের আভাস পাওয়া যায়।
যদি এই মধ্যরাতে শীত-শীত সুন্দর হাওয়ায়
নদীর গভীরে তার কান্না জেগে ওঠে। হাত রাখি
জলের শরীরে। বলি, ‘নদী, তোর নয়নের কোলে
এত অন্ধকার কেন, তুই তার অশ্রুজল নাকি?’
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
আমরা দেখি না, কিন্তু অসংখ্য মানুষ একদিন
পূর্বাকাশে সেই শুদ্ধ উদ্ভাস দেখেছে,
যাকে দেখে মনে হতো, নিহত সিংহের পিঠে গর্বিত পা রেখে
স্বর্গের শিকারী দাঁড়িয়েছে।
আমরা এখন সেই উদ্ভাস দেখি না।
এখন রোদ্দুর দেখে মনে হয়, রোদ্দুরের পেটে
এখন আঁধার রয়ে গেল।
যেহেতু উদরে অম্ল, রক্তে বমনের ইচ্ছা নিয়ে
তবুও সহাস্যে হাঁটে সুবেশ যুবক,
যেহেতু শয়তান তার শখ
মেটাবার জন্য পারে ঈশ্বরের মুখোশ ভাঙাতে,
অতএব অন্ধকার রাতে
মায়াবী রোদ্দুর দেখা অসম্ভব নয়।
রৌদ্রের বাগানে রক্তকরবী নিশ্চয়
ফুটেছে, ফুটুক।
আমি রক্তকরবীর লজ্জাহীন প্রণয়ে যাব না।
এখন যাব না।
রৌদ্র যে মুখোশ নয়, ঈশ্বরের মুখ,
আগে তা সুস্থির জেনে নেব।
না-জেনে এখনই আমি বাহির-দুয়ারে দাঁড়াব না।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
নিতান্তই ক্লান্ত লোকটা শুধু
ছোট্ট একটা ঘরের কাঙাল।
দক্ষিণের জানলা দিয়ে ধুধু
অফুরন্ত মাঠ দেখবে। আর
পশ্চিমের জানলা দিয়ে লাল
সূর্য-ডোবা সন্ধ্যার বাহার।
নিতান্তই ক্লান্ত লোকটা। শুধু
ছোট্ট একটা ঘরের কাঙাল!
নিতান্তই ক্লান্ত লোকটা। তাই
মিষ্টি একটা মেয়ের কাঙ্গাল।
যে তাকে খুনসুটি করে প্রায়ই
রাত জাগাবে। বলবে, ‘কোন দিশি
লোক তুমি তা বোঝা শক্ত। কাল
আনতে হবে আলতা এক শিশি।’
নিতান্তই শান্ত লোকটা। তাই
মিষ্টি একটা মেয়ের কাঙ্গাল।
নিতান্তই ভ্রান্ত লোকটা। হায়,
অল্প-একটু সুখের কাঙাল।
রৌদ্রে, জলে, উদ্দাম হাওয়ায়
ঢের ঘুরেছে। বুঝল না এখনও
ইচ্ছার আগুনে খেয়ে জ্বাল
একটু-সুখে তৃপ্তি নেই কোনো!
নিতান্তই ভ্রান্ত লোকটা। হায়,
অল্প-একটু সুখের কাঙাল।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
নীতিমূলক
|
সকলকে জ্বালিয়ে কোনো লাভ নেই।
তার চেয়ে বরং
আজন্ম যেমন জ্বলছ ধিকিধিকি, একা
দিনরাত্রি
তেমনি করে জ্বলতে থাকো,
জ্বলতে-জ্বলতে ক্ষয়ে যেতে থাকো,
দিনরাত্রি
অর্থাৎ মুখের
কশ বেয়ে যতদিন রক্ত না গড়ায়।
একদিন মুখের কশ বেয়ে
রক্ত ঠিক গড়িয়ে পড়বে।
ততদিন তুমি কী করবে?
পালিয়ে-পালিয়ে ফিরবে নাকি?
পালিয়ে-পালিয়ে কোনো লাভ নেই।
তার চেয়ে বরং
আজন্ম যেমন আছ, একা
পৃথিবীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে
দিনরাত্রি
তেমনি করে জ্বলতে থাকো,
জ্বলতে-জ্বলতে ক্ষয়ে যেতে থাকো,
দিনরাত্রি
অর্থাৎ নিয়তি
যতদিন ঘোমটা না সরায়।
নিয়তির ঘোমটা একদিন
হঠাৎ সরবে।
সরে গেলে তুমি কী করবে?
মুখে রক্ত, চোখে অন্ধকার
নিয়ে তাকে বলবে নাকি “আর যে না-জ্বলি”?
না না, তা বোলো না।
তার চেয়ে বরং
বোলো, “আমি দ্বিতীয় কাউকে
না-জ্বালিয়ে একা-একা জ্বলতে পেরেছি,
সে-ই ভাল;
আগুনে হাত রেখে তবু বলতে চেয়েছি,
‘সবকিছু সুন্দর’–
সে-ই ভাল।”
বোলো যে, এ ছাড়া কিছু বলবার ছিল না।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
প্রত্যেকটা প্রসাদ কিছু শূন্যতা রচনা করে যায়,
আলোকিত মঞ্চের পিছনে থাকে অন্ধকার,
ট্রেন চলে যাবার পরে প্ল্যাটফর্মটা আবার
খাঁখাঁ করতে থাকে,
নিঃশব্দে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে খোলা জানালায়
চক্ষু রাখে
মালবাবুর বউ,
এই ছোট্ট শহর ছেড়ে তার কখনও দিল্লি বা লখনউ যাওয়া হয়নি।
খানিকটা এগিয়েছিল, তারপর–কে জানে কেন–এগোয়নি
জেলা-বোর্ডের রাস্তাটা,
ছায়ায়-ছায়ায় হাঁটতে হাঁটতে লোকটা গিয়ে ঠাঠা-
রোদ্দুরের মধ্যে নেমে পড়ে,
চক্রাকারে ঘুরতে-ঘুরতে কিছু-একটা নির্ভুল তাক করে
নেমে আসে চিল।
চার-পাঁচ দশক ধরে এই সমস্ত দৃশ্যের মিছিল
দেখে যাচ্ছে কবি।
কিছু দেখছে, কিছু-বা-কল্পনা করছে। তার বাগানের সমস্ত করবী
সাদা নয়, কিছু হলদে, কিছু লাল।
সে তার সকাল
থেকে কিছু ফুল কুড়িয়ে আস্তেসুস্থে হেঁটে চলে যায়
পড়ন্ত সূর্যের দিকে। আমরা তার যাওয়া দেখতে থাকি। রৌদ্র নেই, এখন ছায়ায়
তার পাকা চুলের মধ্যে খেলা করছে বিকেলের হাওয়া।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
রূপক
|
।।১।।
কথা ছিল, ঘরে যাব; ‘ঘর হৈল পর্বত প্রমাণ’।
চেয়ে দেখি দিগন্ত অবধি
দুপুরেই এঁকে দিচ্ছ সমস্ত স্বপ্নের অবসান।
বয়সের নদী–
আঁজলায় সামান্য জল তুলে ধরে। বুকের ভিতরে
যতখানি জল, তার চতুর্গুণ নুড়ির ছলনা।
খরায় শুকিয়ে ওঠে ধান।
।।২।।
সারা দুপুর খরায় তোমার ধান পুড়েছে।
বিকেলবেলা
হঠাৎ শুরু উথালপাতাল জলের খেলা।
জল ঘুরে যায়, জল ঘুরে যায় নিখিলবিশ্বচরাচরে–
আমার ঘরে, তোমার ঘরে!
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
হঠাৎ হাওয়া উঠেছে এই দুপুরে
আকাশী নীল শান্তি বুঝি ছিনিয়ে নিতে চায়।
মালোঠিগাঁও বিমূঢ়, হতবাক্।
মেঘের ক্রোধ গর্জে ওঠে ঝড়ের ডঙ্কায়।
এখনই এল ডাক।
মন্দাকিনী মিলায় তাল তরঙ্গের নূপুরে।
এ যেন হরধনুর টান ছিলাতে
হেনেছে কেউ প্রবল টংকার।
চিনের চোখ মীলিত। কার ভীষণ জটাজাল
আকাশে পড়ে ছড়িয়ে, শোনো বাতাসে বাজে তার
সঘন করতাল।
ত্রিলোক কোটিকণ্ঠে চায় গানের গলা মিলাতে।
এ যেন কোন্ শিল্পী তার খেয়ালে
উপুড় করে দিয়েছে কালো রঙ
আকাশময়। পাখিরা ত্রাসে কুলায়ে ফিরে যায়।
কে যেন তার ক্রোধের কশা দারুণ নির্মম
হানে হাওয়ার গায়ে।
অট্টহাসি ধ্বনিত তার গিরিগুহার দেয়ালে।
এবং, দ্যাখো, নিমেষে যেন কী করে
মিলিয়ে যায় খামার-ঘরবাড়ি,
মিলিয়ে যায় নিকট-দূর পর্বতের চূড়া।
খেতের কাজ গুছিয়ে মাঠ-চটিতে দেয় পাড়ি
ত্রস্ত গাঁওবুড়া।
বিদ্যুতের নাগিনী ধায় মেঘের কালো শিখরে।
হঠাৎ হাওয়া উঠেছে এই দুপুরে,
আকাশী নীল শান্তি যেন ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
মালোঠিগাঁও বিমূঢ়, হতবাক্।
মেঘের ক্রোধ গর্জে ওঠে ঝড়ের ডঙ্কায়।
এসেছে তার ডাক।
মন্দাকিনী মিলায় তাল তরঙ্গের নূপুরে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
আরও কত কাল এ-ভাবে কলম ঠেলতে বলো,
আরও কত কাল সন্ধ্যাসকাল লেখা-লেখা খেলতে বলো?
কত কাল, বলো, আরও কত কাল
দূরে থেকে আমি দেখব লুকিয়ে
রাতের প্রগাঢ় পর্দা সরিয়ে উঁকিঝুঁকি মারে সোনালি সকাল,
হিজলের ফ্রেমে ফুটে ওঠে শিশুসূর্যের মুখ?
আলোর স্নিগ্ধ ঘ্রাণে উন্মন দু-একটা ছোট পাখি উড়ে যাউ
মৃদু উৎসুক
চঞ্চল দুটি ছোট পাখা নেড়ে;
মানুষেরা নামে মাঠে। পথেঘাটে বাড়ে কলরব ব্যস্ত হাওয়া।
বাড়ে রোদ্দুর, ডানা ঝাপটিয়ে
তেঁতুলের ডাল থেকে উড়ে যায় লোভী মাছরাঙা,
হঠাৎ ছোঁ মেরে
নীল জলে তোলে ঢেউয়ের কাঁপন,
কাঁপে ঝিরিঝিরি বাতাসের শাড়ি, যেন ঘুমভাঙা
করুণকান্না বেদনার মতো; অলস দুপুর
ধীরে ধীরে চলে গড়িয়ে, ছড়িয়ে
ক্লান্তির সুর।
চেয়ে দ্যাখো মন,
এই ক্লান্তি এ-শ্রান্তিকে ঘিরে আবার কখন
মন-কেড়ে-নেওয়া মায়াবী বিকেল বিছিয়েছে জাল
নিপুণ নেশায়। গেল গেল সব, ভেঙে গেল সন, উল্লাসে ঢালা
এই অরণ্য আবার, আবার; শেষবার বুঝি
ভালবেসে নেবে। শিরীষে শিমূলে কথা চলে, আর
ডালে-ডালে নামে লজ্জার লাল,
লাগে থরোথরো শিহরন, তার
কপালে তীব্র সিঁদুরের জ্বালা
জ্বলে ওঠে। দ্যাখো জ্বলে ওঠে সাদা ঝরোঝরো-শাখা ঝাউয়ের শিয়রে
তৃতীয়ার তনুতন্বী চাঁদের বঙ্কিম ভুরু
আকাশের কালো হৃদয়ে হঠাৎ।
মাঠে-মাঠে নামে ছায়াছায়া ঘুম, সারারাত ধরে
আধো তন্দ্রার গলিঘুঁজি দিয়ে ম্নান ঝুরুঝুরু
হাওয়া হেঁটে যায়,
শিরশিরে শীতে কাঁপানো হাওয়ায়
চাঁদের তীক্ষ্ণ বঙ্কিম ভুরু কেঁপে ওঠে; যেন এই ধুধু মাঠ
মাঠ নয়, নদী নদী নয়, ঘুম ঘুম নয়, এই
মাঠ-নদী-বন যেন মিছিমিছি শুয়ে আছে, কেউ ফিরে তাকালেই
ডানা ঝাপটিয়ে একসার সাদা বকের মতন
উড়ে যাবে এরা। ভাবি, আর মনে ভয় নামে, নামে ধুধু সাদা ভয়
সারা মন জুড়ে; মায়াবী কপাট
প্রাণপণে ঠেলি, পালাব। কোথায় পালাব? ধবল ছায়াছায়া ভয়
নেমে আসে, আর ম্নান চোখ নিয়ে চেয়ে থাকে মন,
মনের দীর্ঘ ছায়া বড় হয়!
এই-যে প্রথম সূর্যের সাড়া, উদাস দুপুর,
বিকেলের মধুমালঞ্চমায়া, রাত্রির থরোথরো শিহরণ,
ছায়াছায়া ভয়, ঝরোঝরো-শাখা ঝাউয়ের শিয়রে
বাতাসের ছড়ে টেনে-যাওয়া ম্লান কান্নার সুর,--
বলো, এ কি শুধু নিজেকে লুকিয়ে
শুধু চোখে-দেখা দেখে যাব, আমি সকালের মন, দুপুরের মন,
রাত্রির মন খুঁজে দেখব না? শুধু ফাঁকি দিয়ে
চোখে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে যাব সব?
তা হলে আমি কি
কেউ নই? আমি সকালের নই, দুপুরের নই,
রাত্রিরও নই? তা হলে, তা হলে
এই যে আকাশে প্রগাঢ় সূর্য সারাদিন জ্বলে,
এই-যে রাত্রে লক্ষ হিরার চোখ-ঝিকিমিকি--
আমি তো এদের চিনি না। তা হলে
আরও কত কাল এভাবে কলম ঠেলতে বলো,
আরও কত কাল সন্ধ্যাসকাল লেখা-লেখা খেলা খেলতে বলো?
কত কাল, বলো আরও কত কাল
পারানির কড়ি ফাঁকি দেওয়া যাবে, সারাদিনমান
খেয়াঘাটে বসে এই মূঢ় আশা লালন করব?
এখনও যায়নি সময়, এখনও মন তুমি বলো--
নিজেকে গোপন রাখবার যত উদ্ধত আশা,
যা-কিছু গর্ব
সব গেল কিনা ভেঙেচুরে? হায়, হৃদয়ের সুরে
ম্লান ছলোছলো
কান্নাকরুণ মিনিতির ভাষা
ফুটলা না তবু, ফুটে উঠল না, তবু আজীবন
জীবনের সাথে, মৃত্যুর সাথে,
সকালের সাথে, রাত্রির সাথে
যে-মায়ারঙ্গে
মেতেছিলে তুমি, উচ্ছল ছয় ঋতুর সঙ্গে
নিজেকে লুকিয়ে যে-খেলায় তুমি মেতেছিলে, মন,
এখনও তাতেই মত্ত? জানো না সে-খেলায় কার
জয় হল, কার শুধু পরাজয়?
সকল অঙ্গে তীক্ষ্ণ প্রহার
ম্লান ছলোছলো ঢেউ ভেঙে পড়ে, মনের দীর্ঘ ছায়া বড় হয়।।
আমি তো রয়েছি নিজেকে নিয়েই মুগ্ধ, যাইনি
কোনোখানে, আমি বাড়াইনি হাত,
আলুথালু যত শিশুরা হঠাৎ
দু-হাতে আমাকে জড়াল, আমি তো তাদের চাইনি--
তারাই চাইলে আমাকে। কে জানে
দুটি প্রসারিত কোমল মুঠিতে সবকিছু এরা
কেন পেতে চায়, হেসে ওঠে কেন; সে-হাসির মানে
কী, আমি কখনও ভাবিনি; ভেবেছি
এই হাসিটুকু--
একে আমি গানে বেঁধে নেব, তার সুর নিয়ে সারাদিন কাটাছেঁড়া
করেছি, ভরেছি গানে তাকে,--আজ
সে-গানের কী-যে মানে, তা তো আমি নিজেই জানি না।
জানি না হৃদয় চেয়েছিল কি না
কখনও কাউকে। কোন্ সমুদ্রে গানের জাহাজ
সাধ করে ভরাডুবি হতে চায়, সে-কার কান্না
সারারাত ভরে শুনেছি, আমার মনে নেই তা তো।
কার রুক্ষ-রুক্ষ
ম্লান চুলে যেন বিষন্ন আশা ঝরে পড়েছিল, মনে পড়ে না তা।
তখন ভেবেছি, আমার গান না
যদি এই ঝরা হাহাকারটুকু
সুরে সুরে পারে বেঁধে নিতে, তবে ব্যর্থ, ব্যর্থ
সবকিছু; সেই হাহাকার--তার সুর নিয়ে সারাদিন কাটাছেঁড়া
করেছি, ভরেছি গানে তাকে,--আজ
যত গান তারা কোন্ কথা বলে,
সে-কথার কী-যে মানে, তা তো আমি নিজেই জানি না।
সারাদিন গান বাঁধবার ছলে
কিছু না চাইতে
জীবনের কাছে যেটুকু পেলাম,
ফাঁকি দিয়ে পাওয়া যাবে না, হৃদয়, তারও পুরো দাম
দিয়ে যেতে হবে, নইলে সে-দেখা
কিছু না, সে-পাওয়া কিছু না। তা হলে
আরও কত কাল এভাবে কলম ঠেলতে বলো,
আরও কত কাল সন্ধ্যাসকাল লেখা-লেখা খেলা খেলতে বলো?
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
রাত্রে নেমে আসে দুগ্ধধবল পাহাড়
জানলার উপরে।
ঘরে আলো নেই, কিন্তু সমস্ত আকাশে খেলা করে
শুক্লা যামিনীর জ্যোৎস্না। মনে হয়,
কস্মিনকালেও কোনো ইঁদুরের ঘাড়
বেড়ালের দাঁতে
ছিন্ন হয়নি, অথবা সময়
কখনও খণ্ডিত হয়নি দণ্ড-মাস-বর্ষের করাতে।
এ কি ছবি? রোয়েরিখ যেমন আঁকতেন? তা তো নয়।
কার্পাসের মতো লঘু মেঘ
জ্যোৎস্নার ভিতরে দিব্য ভেসে যায়। একটুও উদ্বেগ
জমে না দিগন্তে। আমি শীতে
জানলায় বিনিদ্র বসে ভাবি যে, নিশ্চয়
যুদ্ধ নিরর্থক বলে বুঝে গেছে ঝর্না ও পাহাড়
মাটির খানিকটা ঊর্ধ্বে, জানকী-চটিতে।
আরও ঊর্ধ্বে রাত্রি জাগে ত্রিকাল-বিধৃত গ্লেসিয়ার।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
‘লাস্ট টাইম! লাস্ট টাইম!’–যেন বুকের ভিতরে
ভীষণ শোরগোল ওঠে। শুনতে পাই
‘লাস্ট টাইম! লাস্ট টাইম!’–যেন
তটভূমি ধসে পড়ছে, ছলোচ্ছল ছলোচ্ছল
ঢেউ লাগছে নিরুপায় নৌকায়। রক্তের
পাতালবাহিনী নদী হঠাৎ ভীষণভাবে
ফুলে ফেঁপে ওঠে।–আমি বালকবয়সে
ট্রেনের কামরায় কোনো বৃদ্ধ ফিরিঅলাকে একবার
আশ্চর্য মলম হাতে দারুণ বাঘের মতো চেঁচাতে শুনেছি
‘লাস্ট টাইম! লাস্ট টাইম!’–আমি
ঘাটশিলার হাটে এক লালাকে একবার
‘লাস্ট টাইম! লাস্ট টাইম!’ বলে অসম্ভব পুরনো পেঁয়াজ
বিক্রি করে হাসতে দেখেছি!–আমি
মফস্বল-শহরে একবার
ঘণ্টা-হাতে সার্কাসের তাঁবুর বাইরে কাকে গম্ভীর গলায়
অন্ধকারে বলতে শুনেছি
‘লাস্ট টাইম! লাস্ট টাইম!’–আমি গঙ্গার জেটিতে
সন্ধ্যায় লঞ্চের দড়ি তুলে নিতে-নিতে এক প্রাবীণ মাল্লাকে যেন জীবনে একবার
ভয়ঙ্কর আত্মমগ্ন বলতে শুনেছি
‘লাস্ট টাইম! লাস্ট টাইম!’–কিন্তু বুকের ভিতরে
এই যে প্রলয়রোল শুনতে পাওয়া গেল–কোনো বৃদ্ধ ক্যানভাসার,
ধূর্ত লালা, সার্কাসের দালাল অথবা
মাল্লার গলার সঙ্গে এর কোনো তুলনা হয় না।
জীবনে একবারমাত্র। রক্তের ভিতরে
জীবনে একবারমাত্র ‘লাস্ট টাইম! লাস্ট টাইম!’ এই বন্য মহারোল
শুনতে পাওয়া যায়, আমি শুনতে পাচ্ছি
‘লাস্ট টাইম! লাস্ট টাইম!’–যেন
নিরুপায় নৌকার শরীরে
ছলোচ্ছল ছলোচ্ছল ঢেউ লাগছে। যেন
রক্তের পাতালগঙ্গা, দাঁড়ি-মাঝি-বৈঠা-হাল ইত্যাদি সমেত,
ভীষণ পাক খেতে-খেতে, ভীষণ পাক খেতে-খেতে
জলস্তম্ভ হয়ে গিয়ে ফুলে-ফেঁপে হঠাৎ স্বর্গের দিকে
দৌড়ে উঠে যায়।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
কেন আর কান্নার ছায়ায়
অস্ফুট ব্যথার কানে কানে
কথা বলো, বেলা বয়ে যায়,
এসো এই রৌদ্রের বাগানে।
এসো অফুরন্ত হাওয়ায়,–
স্তবকিত সবুজ পাতার
কিশোর মুঠির ফাঁকে ফাঁকে
সারাটা সকাল গায়ে গায়ে
যেখানে টগর জুঁই আর
সূর্যমুখীরা চেয়ে থাকে।
এসো, এই মাঠের উপরে
খানিক সময় বসে থাকি,
এসো, এই রৌদ্রের আগুনে
বিবর্ণ হলুদ হাত রাখি।
এই ধুধু আকাশের ঘরে
এমন নীরব ছলোছলো
করুণাশীতল হাসি শুনে
ঘরে কে ফিরতে চায় বলো।
এই আলো-হাওয়ার সকাল–
শোনো ওগো সুখবিলাসিনী,
কতদিন এখানে আসিনি,
কত হাসি কত গান আশা
দূরে ঠেলে দিয়ে কতকাল
হয়নি তোমায় ভালোবাসা।
কেন আর কান্নার ছায়ায়
অস্ফুট ব্যথার কানে কানে
কথা বলো, বেলা বয়ে যায়,
এসো এই রৌদ্রের বাগানে।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
চিন্তামূলক
|
রাত্রিগুলি
এখনও বাঘের মতো পিছু নেয়।
স্বপ্নগুলি
এখনও নিদ্রার পিঠে
ছুরি মেরে হেসে ওঠে।
সতর্ক ছিলাম, তবু কিছু চিহ্ন এখানে-ওখানে
থেকে গিয়েছিল।
পেট্রোলে-ভিজোনো ন্যাকড়া, দেশলাই-কাঠির টুকরো, এইসব।
স্মৃতিগুলি
তারই সূত্র ধ’রে হাওয়া শুঁকতে শুঁকতে, পা টিপে পা টিপে
হেঁটে আসে; জানালার ধারে
নিঃশব্দে দাঁড়ায়।
অতর্কিতে
হো-হো শব্দ ছুটে যায় অন্ধকার থেকে অন্ধকারে।
অর্থাৎ এখনও মরে যাইনি। এখনও
বাতাসে পুরনো যুদ্ধ
হানা দেয়।
রাত্রিগুলো স্বপ্নগুলি স্মৃতিগুলি
চতুর্দিকে
কখনও জন্তুর মতো, কখনও দস্যুর মতো, কখনও-বা
ধূর্ত জেদি গোয়েন্দার মতো
ঘোরাফেরা করে।
অন্ধকারে
চোরাগোপ্তা আক্রমণ চলতে থাকে সারাক্ষণ।
অর্থাৎ এখনও আমি বেঁচে আছি। চৌমাথায়
যে-লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, বস্তুত আমাকে
সে-ও চোখে-চোখে রাখছে, আমি তার
হিংসার ভিতরে বেঁচে আছি।
এবং তুমিও আছ, নারী।
আছ, তাই অসংখ্য শত্রুর সঙ্গে এই যুদ্ধ
কিছুটা তাৎপর্য পায়,
তাই যুদ্ধক্ষেত্রে আমি এখনও সহজে
বিদ্রুপের ভঙ্গিতে হাওয়ায়
শব্দ করে চুম্বন রটিয়ে দিতে পারি।
|
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
|
প্রকৃতিমূলক
|
উপর থেকে নীচে তাকাও, দ্যাখো,
ছায়াছবির মতোই হঠাৎ
চোখের সামনে থেকে
এরোড্রমটা দৌড়ে পালায়
পৃথিবী যায় বেঁকে।
রইল পড়ে দশটা-পাঁচটা,
ঝাঁকড়া-মাথা মেপ্ল গাছটা,
চওড়া-ফিতে রাস্তাটা আর
নদীর নীলচে শাড়ি,
ফুলের বাগান, গির্জে, খামার,
ছক-কাটা ঘরবাড়ি।
উপর থেকে নীচে তাকাও, দ্যাখো,
লক্ষ লক্ষ টুকরো দৃশ্য
নতুন করে ভেঁজে
একটি অসীম রিক্ততাকে
তৈরি করল কে যে।
নোত্রদামের গির্জেটা আর
হোটেল, ক্যাফে, মস্ত টাওয়ার
মিলিয়ে দিচ্ছে মেঘের শান্ত
হাল্কা নীলের তুলি।
মিলায় মিলায় পারির প্রান্ত-
রেখার দৃশ্যগুলি।
উপর থেকে নীচে তাকাও, দ্যাখো,
দৃশ্যহারা দীর্ঘ দুপুর
সমস্ত দিক ধুধু,
জুনের আকাশ আপন মনে
রৌদ্র পোহায় শুধু।
কোথায় ফাটছে আগুন-বোমা,
কোথায় কাইরো, কোথায় রোমা!
শূন্য মোছায় দেখার ভ্রান্তি
নিত্যদিনের চোখে।
বিশ্ববিহীনতার শান্তি অসীম ঊর্ধ্বলোকে।
|
Subsets and Splits
No community queries yet
The top public SQL queries from the community will appear here once available.