poet
stringclasses
137 values
category
stringclasses
21 values
poem
stringlengths
9
18.7k
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রেমমূলক
তর্জনী দেখিয়ে কেন কথা বলো…কখনও বলবে না… কাকে…তুমি ভয় দেখাও কাকে… আমি অনায়াসে সব ভেঙে ফেলতে পারি… মুহূর্তে তছনছ করে দিতে পারি সবকিছু… বাঁ পায়ের নির্দয় আঘাতে আমি সব মুছে ফেলতে পারি… তর্জনী দেখিয়ে কেন কথা বলো…কখনও বলবে না… ভীষণ চমকিয়ে দিয়ে দশটার এক্সপ্রস চলে গেল। পরক্ষণে পৃথিবী নীরব। তারের উপরে বাজে হাওয়ার শাণিত ভাষা, আর মিলায় চাকার শব্দ…তর্জনী দেখিয়ে কেন… তর্জনী দেখিয়ে কেন… যেন-বা হুড়মুড় শব্দে স্বপনের বাড়িটা ভেঙে পড়তে গিয়ে টাল সামলে নিয়ে এখন আবার অতল নয়নজলে জেগে রয়।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
চিন্তামূলক
আমিপাহাড় থেকে পড়তে পড়তে তোমাকে ধরে বেঁচে রয়েছি, কবিতা। আমিপাতালে ডুবে মরতে মরতে তোমাকে ধরে আবার ভেসে উঠেছি। আমিরাজ্যজয় করে এসেও তোমার কাছে নত হয়েছি, কবিতা। আমিহাজার দরজা ভালবেসেও তোমার বন্ধ দুয়ারে মাথা কুটেছি। কখনও এর, কখনও ওর দখলে গিয়েও ফিরি তোমারই টানে, কবিতা। আমাকে নাকি ভীষণ জানে সকলে, তোমার থেকে বেশি কে জানে, কবিতা? আমিভিড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াই, গোপন রাখি সকল শোক, কবিতা। আমিশ্মশানে ফুল ঘটাব, তাই তোমার বুকে চেয়েছি ঢেউ রটাতে। আমিসকল সুখ মিথ্যে মানি, তোমার সুখ পূর্ণ হোক, কবিতা। আমিনিজের চোখ উপড়ে আনি, তোমাকে দিই, তোমার চোখ ফোটাতে। তুমিতৃপ্ত হও, পূর্ণ হও, জ্বালো ভূলোক, জ্বালো দ্যুলোক, কবিতা।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
চিন্তামূলক
আশ্বিন বলতেই চোখে ভেসে ওঠে রোদ্দুরের ছবি, চক্রাকারে চিল মাথার উপর দিয়ে ডানা মেলে উড়ে যায় মেঘের জানলার দিকে। আশ্বিন বলতেই আলোর-তরঙ্গে-ধোয়া দৃশ্যাবলি চোখের সমুখে দেখতে পাই। দেখি নদী, দেখি নৌকা, গেরুয়া বাদাম স্রোতের দুরন্ত টানে ঘুরে যায়। এমন আশ্বিন ছিল একদা, এখন বাহির-পৃথিবী থেকে তাড়া খেয়ে ভিতরে ঢুকেছে। বাহিরে আঁধার। লোভী, জেদি, কবন্ধ রজনী তার সীমানা বাড়িয়ে চলে আশ্বিন-দিনেও। আমি নিরুপায় তার মধ্যে বসে থাকি, আমি ঠিকই টের পাই বুকের ভিতর দৃশ্যাবলি পুড়ে যায়।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রেমমূলক
কিছু কথা অন্ধকারে বিদেশে ঘুরছে, কিছু কথা বাতাসে উড়ছে, কিছু কথা আটকে আছে পাথরের তলে, কিছু কথা ভেসে যাচ্ছে কাঁসাইয়ের জলে, পুড়তে-পড়তে শুদ্ধ হয়ে উঠছে কিছু কথা। হেমলতা, তুমি কথা দিয়েছিলে, আমি দিতে এখনও পারিনি, তাই বলে ছাড়িনি আজও হাল। বাতাসে আগুনে জলে উদয়াস্ত আজও মায়াজাল টেনে যাচ্ছি, জোড়-মেলানো কথা যদি পাই, তোমাকেই দেব। হেমলতা, এক্ষুনি ভেঙে না তুমি ঘর। ধৈর্য ধরো, ভিক্ষা দাও আর মাত্র কয়েকটি বছর।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রকৃতিমূলক
স্নানের পাট চুকিয়ে মেঘের শাড়িখানাকে খুলে রেখে আশ্বিনের খটখটে রোদ্দুরে নিজেকে শুকিয়ে নিচ্ছিল আকাশ। হঠাৎ চোখে পড়লে যে, লালদিঘির মধ্যে তার ছবি দুটেছে, আর হাঁ করে সেই বেআব্রু ছবির দিকে তাকিয়ে আছে বেহায়া একদল মানুষ। কী ঘেন্না! কী ঘেন্না! রাগে, অপমানে নিমেষে আবার কালো হয়ে গেল আকাশের মুখ। চড়চড় করে বৃষ্টি নামল তক্ষুনি। আর মাথা বাঁচাবার জন্যে পালাতে-পালাতেই লোকগুলো দেখতে পেল যে, বৃষ্টি ছর্‌রায় জলের স্থির আয়নাখানা ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রেমমূলক
অন্ধকারের মধ্যে জ্বলে ভালবাসা, পাখিটা সব বুঝতে পারে। কেন যাওয়া, গিয়েও কেন ফিরে আসা, নিষেধ কেন চার দুয়ারে। এবং কেন ফোটাও আলোর পরিভাষা খাঁচার মধ্যে, অন্ধকারে। পাখি জানে, ঘরের বাইরে নদী পাহাড় লুঠ করে নেয় সকল সোনা, দূরের দর্জি মেঘে বসায় রূপালি পাড়; দূরে তোমার সায় ছিল না। কিন্তু এই যে চাবির গোছা, এও তো তোমার মস্ত বড় বিড়ম্বনা। পাখিটা সব বুঝতে পারে, চালাক পাখি তাই আসে ফের খাঁচার ধারে। আমিও তেমনি রঙ্গমঞ্চে ঘুরতে থাকি স্বর্গেমর্তে বারে-বারে। দূরে গিয়েও সেইমতো হাত বাড়িয়ে রাখি বুকের মধ্যে, অন্ধকারে।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রেমমূলক
যেন কাউকে কটুবাক্য বলবার ভীষণ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু না, তোমাকে নয়; কিন্তু না, তোমাকে নয়। যেন যত দুঃখ আমি পেয়েছি, এবারে চতুর্গুণ করে তাকে ফিরিয়ে দেবার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু না, তোমাকে নয়; কিন্তু না, তোমাকে নয়। দুই চক্ষু ভেসে গেল রক্তের ধারায়। দমিত আক্রোশে খুঁড়ি নিজের পাতাল। দ্যাখো আমি যন্ত্রণায় দাউ-দাউ আগুনে জ্বলে যাচ্ছি, নেমে যাচ্ছি হিংসার নরকে। যেন আত্মনিগ্রহের নরকে না-গিয়ে সমস্ত যন্ত্রণা আজ ফিরিয়ে দেবার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু না, তোমাকে নয়; কিন্তু না, তোমাকে নয়…
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রকৃতিমূলক
যা গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া, লাউমাচাটার পাশে। ছোট্ট একটা ফুল দুলছে, ফুল দুলছে, ফুল সন্ধ্যার বাতাসে। কে এইখানে এসেছিল অনেক বছর আগে, কেউ এইখানে ঘর বেঁধেছে নিবিড় অনুরাগে। কে এইখানে হারিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে, এই মাটিকে এই হাওয়াকে আবার ভালবাসে। ফুরয় না্‌ তার কিছুই ফুরয় না, নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না! যা গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া, লাউমাচাটার পাশে। ছোট্ট একটা ফুল দুলছে, ফুল দুলছে, ফুল, সন্ধ্যার বাতাসে। ফুরয় না তার যাওয়া এবং ফুরয় না তার আসা, ফুরয় না সেই একগুঁয়েটার দুরন্ত পিপাসা। সারাটা দিন আপনে মনে ঘাসের গন্ধ মাখে, সারাটা রাত তারায়-তারায় স্বপ্ন এঁকে রাখে। ফুরয় না, তার কিছুই ফুরয় না, নাটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না। যা গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া, লাউমাচাটার পাশে। ছোট্ট একটা ফুল দুলছে, ফুল দুলছে, ফুল, সন্ধ্যার বাতাসে। নেভে না তার যন্ত্রণা যে, দুঃখ হয় না বাসী, হারায় না তার বাগান থেকে কুন্দফুলের হাসি তেমনি করেই সূর্য ওঠে, তেমনি করেই ছায়া নামলে আবার ছুটে আসে সান্ধ্য নদীর হাওয়া ফুরয় না, তার কিছুই ফুরয় না, নাটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না। যা গিয়ে ওই উঠানে তোর দাঁড়া, লাউমাচাটার পাশে। ছোট্ট একটা ফুল দুলছে, ফুল দুলছে, ফুল, সন্ধ্যার বাতাসে।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রেমমূলক
ও পাখি, তুই কেমন আছিস, ভাল কি? এই তোমাদের জিজ্ঞাসাটাই মস্ত একটা চালাকি। শূন্যে যখন মন্ত্রপড়া অস্ত্র হানো, তখন তোমরা ভালই জানো, আকাশটাকে-লোপাট-করা দারুণ দুর্বিপাকে পাখি কেমন থাকে। কিন্তু তোমরা সত্যি-সত্যি চালাক কি? তাও নও। নইলে বুঝতে, এই ব্যাপারটা বস্তুত দুর্বহ যেমন আমার, তেমনি তোমার পক্ষে, নীল জ্বলন্ত অনাদ্যন্ত আকাশকে তার সখ্যে বাঁধতে যে চায়, সে কি পাখি, সে কি শুধুই পাখি? খাঁচায় বসে এই কথাটাই ভাবতে থাকি। অন্যদিকে, তুমিও জানো, সত্যি-অর্থে বাঁচার বিঘ্ন ঘটায়, তৈরি হয়নি এমন কোনো খাঁচা। দুই নয়নের অতিরিক্ত একটি যদি নয়ন জ্বালো, তবেই বুঝবে, এই না-ভালর অন্ধকারেও আছি ভাল। বুঝবে, সে কোন্‌ মন্ত্রে নিজের চিত্তটাকে মুক্ত রাখি। মৃত্তিকাকে মেঘের সঙ্গে যুক্ত রাখি।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রেমমূলক
বাহিরে দেখি না, শুধু স্থির জানি ভিতরে কোথাও চৌকাঠে পা রেখে তুমি দাঁড়িয়ে রয়েছ, চিরমায়া। দাঁতে-চাপা অধরে কৌতুক স্থির বিদ্যুতের মতো লগ্ন হয়ে আছে, ভুরু বিদ্রুপের ভঙ্গিতে বাঁকানো, জ্বলে কোমল আগুন সিঁথি ও ললাটে। স্থির সরসীর মতো দুই চোখে চক্ষু রেখে জগৎ-সংসার অকস্মাৎ তার কার্যকারণের-সূত্রে গাঁথা মাল্যখানিকে ঘোরাতে ভুলে যায়। বাহিরে দেখি না, কিন্তু ভিতরে এখনও ওই মূর্তি জাগিয়ে রেখেছ, চিরমায়া! বুঝি না কী মন্ত্রে তুমি জয়ে-বিপর্যয়ে লগ্ন আজও রয়েছ হৃদয়ে। কী রয়েছে ওই চোখে, অধরে অথবা ওই যুগ্ম ভুরুতে তোমার? প্রত্যাশা, না পরিহাস? নাকি যুদ্ধশেষে ফের যুদ্ধঘোষণার অভিপ্রায়? কিছুই বুঝি না, চিরমায়া, এক অর্থ উদ্ধার না-হতে যেন সহসা আর-এক অর্থ খুলে যায়। বেঁধেছ অলক্ষ্য ডোরে। যে-রকম উড্ডীন পাখীও বস্তুত অরণ্যে বাঁধা, কিংবা দিগ্বিজয়ীও যেমন অদৃশ্য সুতোয় টান পড়বামাত্র তার একমাত্র-নারীর জঙ্ঘা অবলোকনের জন্য বড় ব্যস্ত হয়ে ওঠে, চিরমায়া, আমিও তেমন ফিরি, নতজানু হয়ে নিরীক্ষণ করি ওই জঙ্ঘা ও জঘন, স্তনসন্ধির গোপনে রাখি মুখ। আমিও তেমন বুঝে নিতে চেষ্টা করি দাঁতে-চাপা ওষ্ঠের ইঙ্গিত। এবং দেখি যে, স্থির সরসীর মতো দুই চোখে পলকে পলকে স্বর্গ-মর্ত-পাতালের ছায়া দুলে যায়।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রেমমূলক
না এলে না-ই বা এলে, তাই বলে কি এ-জন্মে আমার পরিত্রাণ নেই? তুমি যত ধোঁকা দাও, তুমি যত চালাক মাছের মতো দূরে-দূরে ঘোরাফেরা করো, আমারও ততই জেদ বেড়ে যায়, আমি শব্দনির্বাচনে তত সতর্ক হবার চেষ্টা করি। ডাইনে-বাঁয়ে জমে আছে শব্দের পাহাড়। আমি একদিকে থেকে একটি ইচ্ছুক পাথর তুলে এনে– যে-রকম জুতো জামা ইত্যাদির মিলন ঘটানো হয় সেইরকম– অন্য পাথরের সঙ্গে তার জোড় মেলানোর চেষ্টা করি, ক্রমাগত ক্রমাগত চেষ্টা করি। কিন্তু জোড় কিছুতে মেলে না। তুমি একবার মাত্র হাতের মুঠোয় এসেছিলে সুদূর শৈশবে; তারপর একবারও এলে না। যেমন আকাশ থেকে কবুতর মাটিতে, অথবা দূর অরণ্যের ফুল বারান্দার টবের চারায় দৈব নিয়মের মতো প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ফিরে আসে, সেইরকম আর একবারও এলে না তুমি। না এলে না-ই বা এলে, তাই বলে কি বিকল্পে আমার পরিত্রাণ নেই? সম্প্রতি দু’বার আমি দূর থেকে তোমাকে দেখলুম। একবার আগ্রার এক ভগ্ন মিনারের শীর্ষে সন্ধ্যার আগুনে, একবার পুরীর দীপ্র মকরক্রান্তি তরঙ্গমালায়। দেখলুম, এখনও তুমি একাধারে হরিচন্দনের মত জলন্ত এবং জলজ পুষ্পের মতো কমনীয় রয়ে গেছ। সেই মুখশ্রী আমি শব্দের ভিতর ধরে রাখতে চাই, আমি শব্দে-শব্দে তাই জোড় বাঁধতে চাই, তবু বাঁধতে পারি না। অথচ নিশ্চিত জানি, রক্ত ও মাংসের সেই মূর্তিকে যদি না হাতে পাই, তবে তাকে শব্দের ভিতরে সমূহ ফোটাতে হবে, না-ফোটালে এ-জন্মে আমার পরিত্রাণ নেই।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রকৃতিমূলক
নেই তার রাত্রি, নেই দিন। প্রাণবীণার ঝংকারে সুরের সহস্র পদ্ম ফুটে ওঠে অতল অশ্রুর সরোবরে, যন্ত্রণার ঢেউয়ের আঘাতে। সেই সুর খুঁজে ফিরি রাত্রিদিন। হৃদয়ের বৃন্তে নিরবধি মুদিতনয়ন পদ্মে যদি না সে শতলক্ষধারে মন্ত্রবারি ঢালে, তার পাপড়িতে-পাপড়িতে যদি না সে জেগে থাকে নিষ্পলক তবে সে নিষ্ফল, না-ই যদি ঝড়ের ঝংকার তোলে এই মেঘডম্বরু আকাশে। আকাশ স্তম্ভিত। মন গম্ভীর। কখন গুরুগুরু গানের উদ্দাম ঢেউ সমবেত কণ্ঠের আওয়াজে ভেঙে পড়ে! পুঞ্জীভূত মেঘের মৃদঙ্গে পাখোয়াজে বাজে তার সংগতের বিলম্বিত ধ্বনি। বারে বারে জীবন লুন্ঠিত যার, গানে তার উজ্জীবন শুরু; প্রাণ তার পরিপূর্ণ মন্ত্রময় গানের ঝংকারে।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রেমমূলক
দৌড়তে দৌড়তে দিন যায়, অতর্কিতে রাত্রি নেমে আসে, তারপরে সে যেতে চায় না আর। কবে যেন সকালবেলায় দেখেছিলি কার নয়নে ভাসে উন্মীলিত পদ্মের বাহার। সে কি গতকল্যের, না গত- জন্মের স্মৃতির একটি কণা? প্রশ্ন করে বিষন্ন সানাই। সামনে রাত্রি, পিছনে নিহত ঘরবাড়ি ও অজস্র ঘটনা, অর্থ তারই বুঝে নিতে চাই।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রেমমূলক
বাইরে এসো …কে যেন বুকের মধ্যে বলে ওঠে… বাইরে এসো… এখুনি আমার বুকের ভিতরে কার স্নান সমাপন হল! সারাদিন ঘুরেছি অনেক দূরে দূরে। তবুও বাইরে যাওয়া হলো না। ঘরের ভিতরে অনেক দূরে দূরে পা ফেলেছি। ঘরের ভিতরে দশ-বিশ মাইল আমি ঘুরেছি! এখন সন্ধ্যায় কে যেন ফের বুকের ভিতরে বলে উঠল : এসো। বাইরে এসো… কে যেন বুকের ভিতর ঘড়ির ঘন্টায় বলে যাচ্ছে। এখুনি আমার বুকের ভিতর যেন কার অবগাহনের পালা সমাপন হল।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
চিন্তামূলক
ঠাট্টা, হাসি, গান, কলরব যেই থেমেছে, দূরে কাছে দেখছি পথের সঙ্গীরা সব স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাপার কী, আর গল্প কি নেই? রাস্তাটা যে অনেক বাকি। চোখ তুলে কালপুরুষ দেখেই ফুরিয়ে গেল সব কথা কি? সত্যি ছিল সঙ্গীরা? ধুস্‌। মধ্যরাতে পথের ধারে এই তো আমি একলা মানুষ দাঁড়িয়ে আছি অন্ধকারে।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
চিন্তামূলক
কবি, তুমি গদ্যের সভায় যেতে চাও? যাও। পা যেন টলে না, চোখে সবকিছুকে-তুচ্ছ-করে-দেওয়া কিছুটা ঔদাস্য যেন থাকে। যেন লোকে বলে, সভাস্থলে আসবার ছিল না কথা, তবুও সম্রাট এসেছেন।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রেমমূলক
কী করলে হাততালি মেলে, বিলক্ষণ জানি; কিন্তু আমি হাততালির জন্য কোনোদিন প্রলুব্ধ হব না। তোমার চারদিকে বহু কিঙ্কর জুটেছে, মহারানি। ইঙ্গিত করলেই তারা ক্রিরিরিং ঘড়িতে বাজিয়ে ঘণ্টি অদ্ভুত উল্লাসে গান গায়! আমিও দু-একটা গান জানি, কিন্তু আমি কোরাসের ভিতরে যাব না। মহারানি, যেমন জেনেছি, ঠিক সেইরকম উচ্চারণে বাজাব তোমাকে। তুমি সিংহাসনে খুব চমৎকার ভঙ্গিতে বসেছ। দেখাচ্ছ ধবল গ্রীবা, বুকের খানিক; ধরেছ সুমিষ্ট ইচ্ছা চক্ষুর তারায়, বাঁ হাতে রেখেছ থুতনি, ডান হাতে খোঁপা থেকে দু-একটা নির্মল জুঁই খুঁটে নিচ্ছ, ছুড়ে দিচ্ছ সভার ভিতরে। কিন্তু, মহারানি, আমি তোমাকে আর-একটু বেশি জানি। ইঙ্গিত করলেই তার ক্রিরিরিং ঘড়িতে ঘণ্টির তাল বাজাতে পারি না। বাজিয়ে দেখেছি, তবু বুকের ভিতরে বহু জমিজমা অন্ধকার থাকে। সভাকক্ষ থেকে তাই কিছু দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছি। মহারানি, অন্তত একদিন তুমি অনুমতি দাও, যেমন জেনেছি, ঠিক সেইরকম উচ্চারণে বাজাব তোমাকে।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রকৃতিমূলক
উদ্যানে গিয়েছি আমি বারবার। দেখেছি, উদ্যান বড় শান্ত ভূমি নয়। উদ্যানের গভীর ভিতরে ফুলে-ফুলে তরুতে-তরুতে লতায়-পাতায় ভীষণ চক্রান্ত চলে; চক্ষের নিমেষে খুন রক্তপাত নিঃশব্দে সমাধা হয়। উদ্যানের গভীর ভিতরে যত না সৌন্দর্য, তার দশ গুণ বিভীষিকা। উদ্যানে গিয়েছি আমি বারবার। সেখানে কখনও কেহ যেন শান্তির সন্ধানে আর নাহি যায়। যাওয়া অর্থহীন; তার কারণ সেখানে কিছু ফুল নিতান্ত নিরীহ বটে, কিন্তু বাদবাকি ফুলেরা হিংসুক বড়, আত্মরূপরটনায় তারা যেমন উৎসাহী, তত বলবান, হত্যাপরায়ণ। উদ্যানে গিয়েছি আমি বারবার। সেখানে রূপের অহঙ্কার ক্ষমাহীন। সেখানে রঙের দাঙ্গায় নিহত হয় শত-শত দুর্বল কুসুম। আজ প্রত্যুষেই আমি উদ্যানের বিখ্যাত ভিতরে মল্লিকার মৃতদেহ দেখতে পেয়েছি। চক্ষু বিস্ফোরিত, দেহ ছিন্নভিন্ন, বুক তখনও কি উষ্ণ ছিল মল্লিকার? কার নখরের চিহ্ন মল্লিকার বুকে ছিল, কে হত্যা করেছে তাকে, কিছুই জানি না। কিন্তু গোপালের লতা অতখানি এগিয়ে তখন পথের উপরে কেন ঝুঁকে ছিল? এবং রঙ্গন কেন আমাকে দেখেই অত্যন্ত নীরবে হঠাৎ ফিরিয়ে নিল মুখ? আমার বাগানে আরও কতগুলি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হবে?
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
রূপক
গাঢ় নীল মেঘের এলো খোঁপাটাকে খুলে ফেলতেই নীচের মাটিতে লাফিয়ে নামল নদী। লোহার-হৃদপিণ্ড-নিংড়ানো তার রক্তবর্ণ জলের মধ্যে পোচড়া ডুবিয়ে জঙ্গলের গায়ে ছিটিয়ে দিতেই ফুটে উঠল টকটকে লাল মোরগ-ফুল। জঙ্গলের মধ্যে ছিল ধূমল-বর্ণ হাতির পাল। ক্যানেস্তারা পেটাতে-পেটাতে দিগন্তের দিকে তাদের তাড়িয়ে দেওয়া হল। আর সঙ্গে-সঙ্গেই আকাশের গায়ে জেগে উঠল পাহাড়। ছবিটা আমার সাধ্যমত সাজিয়ে দিয়েছি। তোমরা যারা ছুটিতে এবার সিংভূমে বেড়াতে যাবে, দু’চোখ ভরে দেখে নিয়ো।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
চিন্তামূলক
কক্ষনো কি তোমাদের কাউকে এমন কথা বলেছিলুম যে, আমি পৌঁছে গেছি? তা হলে তোমরা ধরেই নিয়ো যে, কথাটা মিথ্যে, কিংবা আমার বিশ্বাসে অনেক ভেজাল ছিল। আমি শুধু যাবার কথাই বলি, পৌঁছবার কথা বলি না। আসলে, পৌঁছনোটা যে খুব জরুরী ব্যাপার, এমন বিশ্বাসই আমার নেই। যাওয়াতে যারা বিশ্বাস করো, তারা আমার সঙ্গে চলো। যারা পৌঁছতে চাও, তারা এসো না।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রেমমূলক
এক-একবার মনে হয় যে এই জীবনের যাবতীয় ভ্রমণ বোধহয় ফুরিয়ে এসেছে। কিন্তু ঠিক তখনই আমার চোখের সামনে হঠাৎ খুলে যায় সেই রাস্তা, যার ধুলো উড়িয়ে আমি কখনও হাঁটিনি। এক-একবার মনে হয় যে, যাবতীয় ভালবাসাবাসির ঝামেলা বোধহয় মিটিয়ে ফেলতে পেরেছি। কিন্তু ঠিক তখনই আবার হৃৎপিণ্ড মুচড়ে দিয়ে হঠাৎ জেগে ওঠে অভিমান। যাদের চিনি না, তাদের কথা আমি কী করে বলব? কিন্তু যাদের চিনেছিলুম, তাদের কথাও যে বলতে পারিনি, মধ্যরাতে এই কথাটা ভাবতে-ভাবতে আমি বিছানা ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। আমি দেখতে পাই যে, আধডোবা জাহাজের মতো এই শহরটা ঘুমের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে, আর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঝুপ্‌সি যত গাছ। অথচ ঠিক তখনই আকাশ জুড়ে ঝড় বইছে, আর হাওয়ার ঝাপটে কেঁপে উঠছে লক্ষ-লক্ষ তারা। কলকাতার এক রাজপথে যাকে একদিন দেখতে পেয়েছিলুম, ভাদ্রমাসের আকাশ জুড়ে উলঙ্গ সেই দৈবশিশুর মুখচ্ছবি তখন আমার চোখের সামনে ভাসতে থাকে।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
প্রকৃতিমূলক
একটুখানি কাছে এসেই দূরে যায় নোয়ানো এই ডালের 'পরে একটু বসেই উড়ে যায়। এই তো আমার বিকেলবেলার পাখি। সোনালি এই আলোর বৃত্তে থেমে থাকি, অশথ গাছের কচি পাতায় হাওয়ার নৃত্যে দৃষ্টি রাখি। একটু থামি, একটু দাঁড়াই, একটু ঘুরে আসি আবার। কখন যে সেই দূরে যাবার সময় হবে, জানি না তা। রৌদ্রে ওড়ে পাখি, কাঁপে অশথগাছের কচি পাতা। দুপুরবেলার দৃশ্য নদী হারিয়ে যায় বারে বারে সন্ধ্যাবেলার অন্ধকারে। তবু আবার সময় আসে নদীর স্বপ্নে ফিরে যাবার। নদীও যে পাখির মতোই, কাছের থেকে দূরে যায়, মনের কাছে বাঁক নিয়ে সে ঘুরে যায়। একটুখানি এগিয়ে তাই আলোর বৃত্তে থেমে থাকি, অশথখানি কচি পাতায় হাওয়ার নৃত্যে দৃষ্টি রাখি।
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
চিন্তামূলক
কাঁচ-রোদ্দুর, ছায়া-অরণ্য, হ্রদয়ের স্বপ্ন। আকণ্ঠ নিস্তেজ তৃপ্তি, ডোরাকাটা ছায়া সরল’– বনে-বাদাড়ে শত্রু ঘোরে, তাজা রক্ত,–শয়তান অব্যর্থ। ঝানু আকাশ ঝুঁকে পড়ে অবাক। কাঁচা চামড়ার চাবুক হেনে ছিঁড়ে টেনে খেলা জমছে: এরা কারা, এ কী করছে? লোহা-গলানো আগুন জ্বলছে, সাঁড়াছি- যন্ত্রণার দুঃস্বপ্ন। আপ্রাণ চেষ্টায় জলের উপর রাখা জাগিয়ে আকাশ! আকাশ! বাতাস টেনে শ্বাসযন্ত্র আড়ষ্ট। এখন আবার মনে পড়ছে। প্রান্তরে জরায়ু-ভাঙা রক্তভ্রূণ, শকুন! শকুন! কয়েকবার পাখ্‌সাট মেরে ফেল আকাশে উঠল। করোটি, হাড়পোড়া, ধুলো– চাপ-চাপ জমাট রক্ত। ছায়ামূর্তি কে দাঁড়িয়ে? ধুলো, ধুলো। আমি ইয়াসিন, পুরব-চটির হাটে যাব; লাহেরিডাণ্ডা ছাড়িয়ে সে কত দূর, সেই এক ভাবনা ঘুরছে। জল! জল! মরচে-পড়া চুল উড়ছে। লোহামুঠিতে ট্রাক্‌টরের হাতল চেপে তবু কখন ঝিমিয়ে পড়ল মন; কে গো তুমি মধ্যাহ্নের স্বপ্ন কাড়ো? আগুন-বাতাসে সূর্য কাঁপে, সন্ধ্যা নামবে কখন। মস্তিষ্কের নিখুঁত ছাপ উঠল প্লাস্‌টারে। রাত করেছে, এলোমেলো চিন্তা নিস্পন্দ। পাহাড়ের শীত-হাওয়ায় চিন্তা নিস্পন্দ। তারা চলছে। ঘুমিয়ে পথ, যাত্রী। আকাশ ভিজিয়ে অন্ধকার জ্বলছে, আর মরা অরণ্যে হঠাৎ-আগুন-লাগা ফানুসের চাঁদ উঠল, রাত্রি।
মোহাম্মদ কামাল
স্বদেশমূলক
কুড়ালের ছায়া দুলে উঠে যদি বলে যায় আর ফাল্গুনে পলাশ না ফোটে, শিমুল নাফোটে, না ফোটে ডালিম উস্কানির আলো কোন লাল ফুল! দীর্ঘদেহী কুড়ালের ছায়া দুলে ওঠে বাঙলায়.. ইতিহাস আছে, কোন কুড়াল শাসন ভীত ইতিহাস? বাঙালি রক্তের মত লাল ফুল ফুটবেই অনন্ত ফাল্গুন.
মোহাম্মদ কামাল
স্বদেশমূলক
রক্তের আলকাতরা অন্ধকারে বধ্যরাত্রিদালি’র চোয়ানো ঘড়ির মত মহাকালে জমাটধ্বংস চমকে উজ্জ্বলন্ত পলকের লোমহর্ষ লাল! গলনাঙ্কে হিমালয় এত ফিনকি ধারা কখনো দ্যাখেনিকখনো দ্যাখেনি এত জল বঙ্গোপসাগরকখনো মাখেনি কোন মুক্তিযুদ্ধ এত সংশপ্তকের হৃৎপিণ্ডের লাভা৤লক্ষপ্রাণের ঘনীভূত একছোপ চোয়ানো রক্তের মতমহাকালের প্রকাশ্য দিবালোকে জমাটবাংলাদেশের মানচিত্রঅনন্তে একছোপ চোয়ানো রক্তের মত মহাকালে জমাট৤ অগ্নিচেতনার লালনিজস্ব তাজা ক্ষতের মত লালস্বাধীনতা বাঙালি রক্তের মত লাল৤
খান মুহাম্মদ মইনুদ্দীন
ছড়া
ঐ দেখা যায় তাল গাছ ঐ আমাদের গাঁ। ঐ খানেতে বাস করে কানা বগীর ছা। ও বগী তুই খাস কি? পানতা ভাত চাস কি? পানতা আমি খাই না পুঁটি মাছ পাই না একটা যদি পাই অমনি ধরে গাপুস গুপুস খাই।
নাজিম হিকমত
প্রেমমূলক
১প্রিয়তমা আমার তেমার শেষ চিঠিতে তুমি লিখেছ ; মাথা আমার ব্যথায় টন্ টন্ করছে দিশেহারা আমার হৃদয়।তুমি লিখেছ ; যদি ওরা তেমাকে ফাঁসী দেয় তেমাকে যদি হারাই আমি বাঁচব না।তুমি বেঁচে থাকবে প্রিয়তমা বধু আমার আমার স্মৃতি কালো ধোঁয়ার মত হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে তুমি বেঁচে থাকবে, আমার হৃদয়ের রক্তকেশী ভগিনী, বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ূ বড় জোর এক বছর।মৃত্যু…… দড়ির এক প্রান্তে দোদুল্যমান শবদেহ আমার কাম্য নয় সেই মৃত্যু। কিন্তু প্রিয়তমা আমার, তুমি জেনো জল্লাদের লোমশ হাত যদি আমার গলায় ফাসীর দড়ি পরায় নাজিমের নীল চোখে ওরা বৃথাই খুঁজে ফিরবে ভয়।অন্তিম ঊষার অস্ফুট আলোয় আমি দেখব আমার বন্ধুদের,তোমাকে দেখব আমার সঙ্গে কবরে যাবে শুধু আমার এক অসমাপ্ত গানের বেদনা।২ বধু আমার তুমি আমার কোমলপ্রাণ মৌমাছি চোখ তোমার মধুর চেয়েও মিষ্টি। কেন তোমাকে আমি লিখতে গেলাম ওরা আমাকে ফাঁসী দিতে চায় বিচার সবে মাত্র শুরু হয়েছে আর মানুষের মুন্ডুটা তো বোঁটার ফুল নয় ইচ্ছে করলেই ছিঁড়ে নেবে ।ও নিয়ে ভেবনা ওসব বহু দূরের ভাবনা হাতে যদি টাকা থাকে আমার জন্যে কিনে পাঠিও গরম একটা পাজামা পায়ে আমার বাত ধরেছে। ভুলে যেও না স্বামী যার জেলখানায় তার মনে যেন সব সময় ফুর্তি থাকেবাতাস আসে, বাতাস যায় চেরির একই ডাল একই ঝড়ে দুবার দোলে না।গাছে গাছে পাখির কাকলি পাখাগুলো উড়তে চায়। জানলা বন্ধ: টান মেরে খুলতে হবে।আমি তোমাকে চাই ;তোমার মত রমনীয় হোক জীবন আমার বন্ধু,আমার প্রিয়তমার মত……..।আমি জানি,দুঃখের ডালি আজও উজাড় হয়নি কিন্তু একদিন হবে।৩ নতজানু হয়ে আমি চেয়ে আছি মাটির দিকে উজ্জল নীল ফুলের মঞ্জরিত শাখার দিকে আমি তাকিয়ে তুমি যেন মৃন্ময়ী বসন্ত,আমার প্রিয়তমা আমি তোমর দিকে তাকিয়ে।মাটিতে পিঠ রেখে আমি দেখি আকাশকে তুমি যেন মধুমাস,তুমি আকাশ আমি তোমাকে দেখছি প্রিয়তমা।রাত্রির অন্ধকারে,গ্রামদেশে শুকনো পাতায় আমি জ্বালিয়েছিলাম আগুন আমি স্পর্শ করছি সেই আগুন নক্ষত্রের নিচে জ্বালা অগ্নিকুন্ডের মত তুমি আমার প্রিয়তমা, তোমাকে স্পর্শ করছি।আমি আছি মানুষের মাঝখানে,ভালবাসি আমি মানুষকে ভালবাসি আন্দোলন, ভালবাসি চিন্তা করতে, আমার সংগ্রামকে আমি ভালবাসি আমার সংগ্রামের অন্তস্থলে মানুষের আসনে তুমি আসীন প্রিয়তমা আমার আমি তোমাকে ভালবাসি। ৪ রাত এখন ন’টা ঘন্টা বেজে গেছে গুমটিতে সেলের দরোজা তালা বন্ধ হবে এক্ষুনি। এবার জেলখানায় একটু বেশি দিন কাঁটল আট্টা বছর।বেঁচে থাকায় অনেক আশা,প্রিয়তমা তোমাকে ভালবাসার মতই একাগ্র বেঁচে থাকা। কী মধুর কী আশায় রঙ্গীন তোমার স্মৃতি….। কিন্তু আর আমি আশায় তুষ্ট নই, আমি আর শুনতে চাই না গান। আমার নিজের গান এবার আমি গাইব।আমাদের ছেলেটা বিছানায় শয্যাগত বাপ তার জেলখানায় তোমার ভারাক্রান্ত মাথাটা ক্লান্ত হাতের ওপর এলানো আমরা আর আমাদের এই পৃথিবী একই সুচ্যগ্রে দাঁড়িয়ে। দুঃসময় থেকে সুসময়ে মানুষ পৌঁছে দেবে মানুষকে আমাদের ছেলেটা নিরাময় হয়ে উঠবে তার বাপ খালাস পাবে জেল থেকে তোমার সোনালী চোখে উপচে পড়বে হাসি আমার আর আমাদের এই পৃথিবী একই সুচ্যগ্রে দাঁড়িয়ে ! ৫ যে সমুদ্র সব থেকে সুন্দর তা আজও আমরা দেখিনি। সব থেকে সুন্দর শিশু আজও বেড়ে ওঠে নি আমাদের সব থেকে সুন্দর দিনগুলো আজও আমরা পাইনি। মধুরতম যে-কথা আমি বলতে চাই। সে কথা আজও আমি বলি নি। ৬ কাল রাতে তোমাকে আমি স্বপ্ন দেখলাম মাথা উঁচু করে ধুসর চোখে তুমি আছো আমার দিকে তাকিয়ে তোমার আদ্র ওষ্ঠাধর কম্পমান কিন্তু তোমার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম না।কৃষ্ণপক্ষ রাত্রে কোথাও আনন্দ সংবাদের মত ঘড়ির টিক্ টিক্ আওয়াজ বাতাসে গুন্ গুন্ করছে মহাকাল আমার ক্যানারীর লাল খাঁচায় গানের একটি কলি, লাঙ্গল-চষা ভূঁইতে মাটির বুক ফুঁড়ে উদগত অঙ্কুরের দুরন্ত কলরব আর এক মহিমান্বিত জনতার বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত ন্যায্য অধিকার তোমার আদ্র ওষ্ঠাধর কম্পু কিন্তু তোমার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম না।আশাভঙ্গে অভিশাপ নিয়ে জেগে উঠলাম। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বইতে মুখ রেখে। অতগুলো কণ্ঠস্বরের মধ্যে তোমার স্বরও কি আমি শুনতে পাই নি ?অনুবাদ : সুভাষ মুখোপাধ্যায়
হুমায়ূন আহমেদ
রূপক
টেবিলের চারপাশে আমরা ছ’জন চারজন চারদিকে ; দু’জন কোনাকুনি দাবার বোড়ের মত খেলা শুরু হলেই একজন আরেকজনকে খেয়ে ফেলতে উদ্যত । আমরা চারজন শান্ত, শুধু দু’জন নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে আছে । তাদের স্নায়ু টানটান। বেড়ালের নখের মত তাদের হৃদয় থেকে বেরিয়ে আসবে তীক্ষ্ম নখ । খেলা শুরু হতে দেরি হচ্ছে, আম্পায়ার এখনো আসেনি। খেলার সরঞ্জাম একটা ধবধবে সাদা পাতা আর একটা কলম । কলমটা মিউজিক্যাল পিলো হাতে হাতে ঘুরবে আমরা চারজন চারটা পদ লিখবো । শুধু যে দু’জন নখ বের করে কোনাকুনি বসে আছে তারা কিছু লিখবে না । তারা তাদের নখ ধারালো করবে লেখার মত সময় তাদের কোথায় ? প্রথম কলম পেয়েছি আমি, আম্পায়ার এসে গেছেন। পিস্তল আকাশের দিকে তাক করে তিনি বললেন, এ এক ভয়ংকর খেলা, কবিতার রাশান রোলেট – যিনি সবচে ভালো পদ লিখবেন তাকে তৎক্ষণাৎ মেরে ফেলা হবে । আমার হাতে কলম কম্পমান সবচে সুন্দর পদ এসে গেছে আমার মুঠোয়।
হুমায়ূন আহমেদ
রূপক
একটা ঝকঝকে রঙিন কাচপোকা হাঁটতে হাঁটতে এক ঝলক রোদের মধ্যে পড়ে গেল। ঝিকমিকিয়ে উঠল তার নকশাকাটা লাল নীল সবুজ শরীর। বিরক্ত হয়ে বলল,রোদ কেন? আমি চাই অন্ধকার ।চির অন্ধকার আমার ষোলটা পায়ে একটা ভারি শরীর বয়ে নিয়ে যাচ্ছি- অন্ধকার দেখব বলে। আমি চাই অন্ধকার ।চির অন্ধকার একটা সময়ে এসে রোদ নিভে গেল বাদুড়ে ডানায় ভর করে নামল আঁধার। কি গাঢ়,পিচ্ছিল থকথকে অন্ধকার ! কাচপোকার ষোলটা ক্লান্ত পা বার বার সেই পিচ্ছিল আঠালো অন্ধকারে ডেবে যাচ্ছিল। তার খুব কষ্ট হচ্ছিল হাঁটতে তবু সে হাঁটছে- তাকে যেতে হবে আরও গভীর অন্ধকারে। যে অন্ধকার-আলোর জন্মদাত্রী।
হুমায়ূন আহমেদ
চিন্তামূলক
এক জরাগ্রস্থ বৃদ্ধ ছিলেন নিজ মনে আপন ভুবনে। জরার কারণে তিনি পুরোপুরি বৃক্ষ এক। বাতাসে বৃক্ষের পাতা কাঁপে তাঁর কাঁপে হাতের আঙ্গুল। বৃদ্ধের সহযাত্রী জবুথবু- পা নেই,শুধু পায়ের স্মৃতি পড়ে আছে। সেই স্মৃতি ঢাকা থাকে খয়েরি চাদরে। জরাগ্রস্থ বৃদ্ধ ভাবে চাদরের রঙটা নীল হলে ভাল ছিল। স্মৃতির রং সব সময় নীল।
হুমায়ূন আহমেদ
প্রেমমূলক
আমি যাচ্ছি নাখালপাড়ায়। আমার বৃদ্ধ পিতা আমাকে পাঠাচ্ছেন তাঁর প্রথম প্রেমিকার কাছে। আমার প্যান্টের পকেটে সাদা খামে মোড়া বাবার লেখা দীর্ঘ পত্র। খুব যত্নে খামের উপর তিনি তাঁর প্রণয়িনীর নাম লিখেছেন। কে জানে চিঠিতে কি লেখা - ? তাঁর শরীরের সাম্প্রতিক অবস্থার বিস্তারিত বর্ণনা ? রাতে ঘুম হচ্ছেনা, রক্তে সুগার বেড়ে গেছে কষ্ট পাচ্ছেন হাঁপানিতে - এইসব হাবিজাবি। প্রেমিকার কাছে লেখা চিঠি বয়সের ভারে প্রসঙ্গ পাল্টায় অন্য রকম হয়ে যায়। সেখানে জোছনার কথা থাকে না, সাম্প্রতিক শ্বাসকষ্ট বড় হয়ে উঠে। প্রেমিকাও একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর রোগভুগের কথা পড়তে ভালবাসেন। চিঠি পড়তে পড়তে দরদে গলিত হন – আহা, বেচারা ইদানিং বড্ড কষ্ট পাচ্ছে তো ...
হুমায়ূন আহমেদ
প্রকৃতিমূলক
প্রতি পূর্নিমার মধ্যরাতে একবার আকাশের দিকে তাকাই গৃহত্যাগী হবার মত জ্যোৎস্না কি উঠেছে ? বালিকা ভুলানো জ্যোৎস্না নয়। যে জ্যোৎস্নায় বালিকারা ছাদের রেলিং ধরে ছুটাছুটি করতে করতে বলবে- ও মাগো, কি সুন্দর চাঁদ ! নবদম্পতির জ্যোৎস্নাও নয়। যে জ্যোৎস্না দেখে স্বামী গাঢ় স্বরে স্ত্রীকে বলবেন- দেখ দেখ নীতু চাঁদটা তোমার মুখের মতই সুন্দর ! কাজলা দিদির স্যাঁতস্যাতে জ্যোৎস্না নয়। যে জ্যোৎস্না বাসি স্মৃতিপূর্ন ডাস্টবিন উল্টে দেয় আকাশে। কবির জ্যোৎস্না নয়। যে জ্যোৎস্না দেখে কবি বলবেন- কি আশ্চর্য রূপার থালার মত চাঁদ ! আমি সিদ্ধার্থের মত গৃহত্যাগী জ্যোৎস্নার জন্য বসে আছি। যে জ্যোৎস্না দেখামাত্র গৃহের সমস্ত দরজা খুলে যাবে- ঘরের ভেতরে ঢুকে পরবে বিস্তৃত প্রান্তর। প্রান্তরে হাঁটব, হাঁটব আর হাঁটব- পূর্নিমার চাঁদ স্থির হয়ে থাকবে মধ্য আকাশে। চারদিক থেকে বিবিধ কন্ঠ ডাকবে- আয় আয় আয়।
হুমায়ূন আহমেদ
প্রেমমূলক
আমাকে ভালবাসতে হবে না, ভালবাসি বলতে হবে না. মাঝে মাঝে গভীর আবেগ নিয়ে আমার ঠোঁট দুটো ছুয়ে দিতে হবে না. কিংবা আমার জন্য রাত জাগা পাখিও হতে হবে না. অন্য সবার মত আমার সাথে রুটিন মেনে দেখা করতে হবে না. কিংবা বিকেল বেলায় ফুচকাও খেতে হবে না. এত অসীম সংখ্যক “না”এর ভিড়ে শুধু মাত্র একটা কাজ করতে হবে আমি যখন প্রতিদিন এক বার “ভালবাসি” বলব তুমি প্রতিবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু খানি আদর মাখা গলায় বলবে “পাগলি”
হুমায়ূন আহমেদ
চিন্তামূলক
তিনি শায়িত ছিলেন গাঢ় কব্বরে যার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বেঁধে দেয়া, গভীরতা নয়। কব্বরে শুয়ে তাঁর হাত কাঁপে পা কাঁপে গভীর বিস্ময়বোধ হয়। মনে জাগে নানা সংশয়। মৃত্যু তো এসে গেছে, শুয়ে আছে পাশে তবু কেন কাটে না এ বেহুদা সংশয়?
হুমায়ূন আহমেদ
প্রেমমূলক
যদি মন কাঁদে তুমি চলে এসো চলে এসো এক বরষায় এসো ঝরো ঝরো বৃষ্টিতে জল ভরা দৃষ্টিতে এসো কমলো শ্যামলো ছায় চলে এসো এক বরষায়যদিও তখনো আকাশ থাকবে বৈরি কদমও গুচ্ছ হাতে নিয়ে আমি তৈরী উতলা আকাশ মেঘে মেঘে হবে কালো ঝলকে ঝলকে নাচিবে বজলি আলো তুমি চলে এসো চলে এসো এক বরষায়নামিবে আঁধার বেলা ফুরাবার পরে মেঘমল্লার বৃষ্টিরো মনে মনে কদমও গুচ্ছ খোপায় জড়ায়ে নিয়ে জল ভরা মাঠে নাচিব তোমায় নিয়ে চলে এসো তুমি চলে এসো এক বরষায় ।
হুমায়ূন আহমেদ
প্রেমমূলক
শোন মিলি। দুঃখ তার বিষমাখা তীরে তোকে বিঁধে বারংবার। তবুও নিশ্চিত জানি,একদিন হবে তোর সোনার সংসার ।। উঠোনে পড়বে এসে একফালি রোদ তার পাশে শিশু গুটিকয় তাহাদের ধুলোমাখা হাতে – ধরা দেবে পৃথিবীর সকল বিস্ময়।
হুমায়ূন আহমেদ
শোকমূলক
আমার বন্ধুর বিয়ে উপহার বগলে নিয়ে আমি আর আতাহার, মৌচাক মোড়ে এসে বাস থেকে নামলাম দু’সেকেন্ড থামলাম।। টিপটিপ ঝিপঝিপ বৃষ্টি কি পড়ছে? আকাশের অশ্রু ফোঁটা ফোঁটা ঝরছে?আমি আর আতাহার বলুন কি করি আর? উপহার বগলে নিয়ে আকাশের অশ্রু সারা গায়ে মাখলাম।। হি হি করে হাসলাম।।
হুমায়ূন আহমেদ
রূপক
কপাটহীন একটা অস্থির ঘরে তার সঙ্গে দেখা । লোহার তৈরি ছোট্ট একটা ঘর । বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে কোন যোগ নেই । ঘরটা শুধু উঠছে আর নামছে । নামছে আর উঠছে । মানুষ ক্লান্ত হয় – এ ঘরের কোন ক্লান্তি নেই। এ রকম একটা ঘরেই বোধহয় বেহুলার বাসর হয়েছিল । নিশ্ছিদ্র লোহার একটা ঘর । কোন সাপ সেখানে ঢুকতে পারবে না । হিস হিস করে বলতে পারবে না, পাপ করো। পৃথিবীর সব আনন্দ পাপে । পুণ্য আনন্দহীন । উল্লাসহীন । পুণ্য করবে আকাশের ফিরিশতারা । কারণ পুণ্য করার জন্যেই তাদের তৈরি করা হয়েছে । লোহার সেই ঘরে ঢোকার জন্য সাপটা পথ খুঁজছিলো । সেই ফাঁকে বেহুলা তাঁর স্বামীকে বললেন, কি হয়েছে, তুমি ঘামছ কেন ? আর তখন একটা সুতা সাপ ঢুকে গেলো। ফিসফিস করে কোন একটা পরামর্শ দিতে গেলো । বেহুলা সেই পরামর্শ শুনলেন না বলেই কি লখিন্দরকে মরতে হল ? তার সঙ্গে আমার দেখা কপাটহীন একটা অস্থির ঘরে । ঘরটা শুধু ওঠে আর নামে । আমি তাকে বলতে গেলাম - আচ্ছা শুনুন, আপনার কি মনে হচ্ছে না এই ঘরটা আসলে আমাদের বাসর ঘর ? আপনি আর কেউ নন, আপনি বেহুলা । যেই আপনি ভালবেসে আমাকে কিছু বলতে যাবেন ওম্নি একটা সুতা সাপ এসে আমাকে কামড়ে দেবে । আমাকে বাঁচিয়ে রাখুন । দয়া করে কিছু বলবেন না ।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
হয়তো কোথাও কোনোভাবে এখন বাঁধা পড়ে গেছি, বাঁধা পড়ে গেছি তাই পা কাঁপে তাই দ্বিধাগ্রস্ত এমন সহজে পারি না। তিন ফুট বাই দেড় ফুট একটা ছো‌ট্ট মশারির ভিতর আমার এখন সামান্য দুর্বলতা, আমি বুঝতে পারি খুব দূর থেকেও সেদিকে তাকিয়ে থাকি। এমন মাইল- মাইল ব্যবধান, এমন দুরত্ব সেই ছোট্ট হাল্কা হলুদ একটা মশারির ভিতর আমার এই চোখ আমার এই ইন্দ্রিয় বড়ো আবদ্ধ রয়েছে হয়েছি আমি এখন কিছুটা স্নেহপ্রবল, কিছুটা পিতৃতুল্য এতোদিন বুঝতে পারিনি একটা হাল্কা হলুদ এতোটুকু মশারির ভিতর এতোটা রহস্য ছিলো আমার জন্য এই সামান্য বুকের ভিতর কোথায় ছিলো এই পিতৃত্ব, কোথায় ছিলো এই জলগড়ানো কান্না, এই ব্যাপ্তি, বুঝতে পারিনি মাত্র একটা মশারির জন্য এখন আমি অনেক বেশি ক্ষমাপ্রবণ, অনেক স্নেহকাতর এমনটি কাঁটার ভয়ে ফুল তুলতে পারি না আঙুল কেমন গুটিয়ে আসে কোথাও আমার তেমন কিছুই নেই, এই তিন ফুট বাই দেড় ফুট একটা মশারির ভিতর একটা পাখির বাসা হচ্ছে, ফুল ফুটছে, পাথর ভেঙে একটা নদী হচ্ছে তার ঘ্রাণ, তার শব্দ, আমি আভাস পাচ্ছি এইখানে এই লোহার শিকের অস্থায়ী একটা মশারির ভিতর আমি বাঁধা পড়েছি যাকে কোনো মায়া, কোনো মৃত্যু কোনোদিন স্পর্শ করেনি, স্পর্শ করেনি সেই হাওয়ার মতো স্বাধীন আমি হয়তো কোথাও কোনোভাবে এখন বাঁধা পড়ে গেছি, বাঁধা পড়ে গেছি তাই পা কাঁপে তাই দ্বিধাগ্রস্ত, সহজে পারি না এতোটা আসক্তি ছিলো, এতোটা পিতৃত্ব ছিলো বুঝতে পারিনি, এতোটা বন্ধন ছিলো এই বুকে!
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
তোমরা কেমন আছো হে আমার গভীর রাতের আহত করিয়া তোমরা কেমন আছো কেমন আছো আমার ফেলে আসা কবিতা তুমি কেমন আছো, কেমন আছো তোমরা সুখ দুঃখ, তোমরা তোমরা? আমি বহুদিন তোমাদের ফেলে এসেছি, মধ্যরাতের চাঁদ তোমাদের তোমরা কেমন আছো, সবাই কেমন আছো, তোমরা সব্বাই? আমি বেশ কিছুকাল তোমাদের সঙ্গছাড়া, বেশ কিছুকাল অলস নিদ্রায়, অসুখে, আচ্ছন্নতায় শুয়ে আছি, শুয়ে আছি তোমাদের সকলের স্নান, সন্ধ্যালাপ, প্রত্যুষের উপাসনা মন্ত্র আমার মনে পড়ে, হে পাখি, বসন্তরাত্রির একলা কোকিল তোমাদের শহরের সব নার্সারীর প্রত্যহ দর্শক তোমরা, পানশালার নিমগ্ন প্রেমিক ভবঘুরে, ছন্নছাড়া, ভাই, তোমরা কেমন আছো নারী তুমি কেমন আছো, বৃক্ষ তুমি কেমন আছো, কেমন, শস্য তুমি আছো, নদী তুমি আছা, তোমাদের নিজস্ব স্বভাবে আজো তোমরা কবি। তবু একবার বলো, তুমি বলো, তোমরা বলো, বলো নারী তোমরা কেমন আছো, বৃক্ষ তোমরা কেমন আছো, তোমরা কেমন আছো, মানুষ?
মহাদেব সাহা
স্বদেশমূলক
কেবল তোমারই দেখা পাই না কোথাও। যেন তুমি অদৃশ্য অলীক কিছু; স্বপ্নও জানে না কোনো খোঁজ তারও রুপালি পর্দায় কখনো ওঠে না ভেসে তোমার ইমেজ তুমি আছো এতোদূরে স্পর্শগন্ধহীন স্বপ্নেরাও সূক্ষ্ম অগোচরে কেবল তোমারই দেখা পাই না এখন। জনারণ্যে এভেন্যুর উদ্দীপনাময় ভিড়ে কোথাও তোমার দেখা নাই। তুমিই কি সেই অদৃশ্য স্বপ্নের পাখি কিংবা মায়াবী হরিণ ছিলে, আর কোনোখানে নেই, তুমি কি সেই গ্রীক পুরাণকাহিনী? না হলে পাই না কেন কোথাও তোমার দেখা? যদিও প্রত্যহ এ শহর জনসংখ্যার চাপেই অস্থির তার বাহুতে গ্রীবায় গণ্ডে কেবল চলেছে বেয়ে অবিরাম মানুষের ধারা; ফুটপাত, রাজপথ কিংবা বিপণি সিক্ত ও ব্যাকুল এই লোকের বন্যায় তবু তোমার একটি মুখ এ শহরে একান্ত দুর্লভ এমনকি কোনো মনোরম চিত্রশালা কিংবা মিউজিয়াম ঘুরেও কখনো তোমার একটি মুখ হয়নি তো নয়নগোচর শাগালের সুসমৃদ্ধ ঐশ্বর্যশালীন প্রদর্শনী জুড়ে সবার অজান্তে আমি খুঁজেছি তোমার মুখ; তোমারই দুটি চোখ পিকাসোর চিত্রময় অ্যালবাম ব্যেপে করেছি প্রত্যাশা যামিনী কি জয়নুল-কামরুলেও তন্নতন্ন খুঁজেছি তোমায় কি জানি হয়তো তুমি লোকচক্ষুর আড়ালে হয়ে আছো এ-রকমই কোনো মুগ্ধ শিল্পের ব্যঞ্জনা; আমারই ব্যর্থ চোখ দেখতে অক্ষম। হয়তোবা আর সকলেই অতি সহজেই তোমাকে দেখতে পায় কারো ঘরে অনিবার্যভাবে তুমি সন্ধ্যাদীপের মহিমা তাও জানি কিংবা কারো কাতানের কাতর প্রশংসা এমনকি হয়তোবা ফুটে আছো এইরূপই কোনো সংসারের পাশে লোকায়িত টবে, কেবল আমার জানা বা চেনা চাই কি স্বপ্নেরও অন্তরালে! কিছুই দেখতে চাই না তবু সবকিছু দেখি আর কেবল তোমারই পাই না দেখা। কেন যে আমার কাছে তুমি হলে এ-রকমই রূপহীন, বর্ণহীন, এই অবয়বহীন! হঠাৎ পথের মোড়ে দুপুরে কি পড়ন্ত সন্ধ্যায় এই অসংখ্য মুখে একটি মুখও কি রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে না তোমার মুখে অজস্র চোখের একটি চোখও কি অকস্মাৎ আমার সম্মুখে তোমার দুষ্প্রাপ্য চোখ হয়ে উঠতে পারে না তেমন? বলো একটি গোলাপও কি রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে না তোমার মৃদু ঠোঁটে? কিংবা মেঘও কি তোমার মূর্তি পেতে পারে না সহসা সব চিত্রশালা আর ভাস্কর্যের মেলা মুহূর্তে কি তোমার দিব্যদেহ নিয়ে একবারও জানাতে পারে না সম্ভাষন? জলাশয়ে বিচরণরত একটি মরাল তোমার গ্রীবার ভঙ্গি আমাকে কি পারে না দেখাতে? তার অর্থ তুমি কি বলতে চাও তোমার সাক্ষাৎলাভ স্বপ্নেও সম্ভব নয় আর! কিন্তু আমি তো ভালোই জানি তুমি যে মিশেই আছো এ-দেশেরই চিরন্তর শিল্পের ঐতিহ্যে, স্থাপত্য ও দেশজ কলায় তাই না দেখেও হয়তো প্রত্যহ আমি তোমাকেই প্রিয়তমা মানি।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
এই জীবনে হবে না আর মূলে যাওয়া, চুড়োয় ওঠা- কাটবে জীবন পাদদেশে, পাদমূলে; খুব ভেতরে প্রবেশ করা হবে না আর এই জীবনে হবে না আর ভেতর মধু ফের আহরণ, হবে শুধুই ওপর ছোঁয়া, ওপর দেখা। এই জীবনে হবে না আর তোমার নিবিড় স্পর্শ পাওয়া, হবে না এই নদী দেখা, জলাশয়ের কাছে যাওয়া, একটিবার তোমায় নিয়ে হ্রদের জলে একটু নামা- হবে না আর পৌঁছা মোটেই ডুব-সাঁতারে জলের গহীন তলদেশে, জলে নামা, সাঁতার শেখা; মূলের সঙ্গে হবে না আর ঠিক পরিচয় মাত্র এখন অনুবাদের অর্ধ স্বাদেই তৃপ্ত থাকা, এই জীবনে হবে না আর আকাশ দেখা, চিবুক ছোঁয়া- তোমায় নিয়ে নীল পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়া; এই জীবনে হবে না আর তোমার গোপন দেখা পাওয়া, একন শুধু চোখের জলে দুঃখ পাওয়া, নিজের মাঝেই ফুরিয়ে যাওয়া, ফুরিয়ে যাওয়া। এই জীবনে হবে না আর দুঃখ কারো মোচন করা, কারো অশ্রু মুছিয়ে দেয়া সাঁকো বাঁধা, কারো ক্ষত সারিয়ে তোলা; এই জীবনে হবে না আর মুগ্ধ ভ্রমণ, মূলে যাওয়া- তোমায় ছোঁয়া।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
কী করে বলো না করি অস্বীকার এখনো আমার কাছে একটি নারীর মুখই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দর্শনীয়, তার চেয়ে অধিক সুন্দর কিছু অদ্যাবধি দেখিনি কোথাও; অন্তত আমার কাছে নারীর মুখের চেয়ে অনবদ্য শিল্প কিছু নেই তাই নারীর মুখের দিকে নির্বোধের মতো চেয়ে রই, মাঝে মাঝে বিসদৃশ লাগে তবু চোখ ফেরাতে পারি না নিতান্ত হ্যাংলা ভেবে পাছে করে নীরব ভর্ৎসনা তাই এই পোড়া চোখে অনিচ্ছা সত্ত্বেও দেখি কোনো পার্শ্ববর্তী শোখা, লেক কিংবা জলাশয় আসলে নারীর মুখই একমাত্র দর্শনীয় এখনো আমার! এখনো নারীর মুখের দিকে চেয়ে হতে পারি প্রকৃত তন্ময় সময়ের গতিবিধি, প্রয়োজন একমাত্র নারীর মুখের দিকে চেয়ে ভুলে যেতে পারি; তা সে যতোক্ষণই হোক নারীর মুখের দৃশ্য ছাড়া পৃথিবীতে বাস্তবিকই অভিভূত হওয়ার যোগ্য শিল্প কি স্থাপত্য কিছু নেই। মিথ্যা বলবো না এখনো আমার কাছে একটি নারীর মুখই সর্বাপেক্ষা প্রিয় তার দিক থেকে এখনো ফেরাতে চোখ সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়, শহরের দর্শনীয় বস্তু ফেলে তাই আমি হাবাগোবা নির্বোধের মতো নারীর মুখের দিকে অপলক শুধু চেয়ে রই মনে হয় এই যেন পৃথিবীতে প্রথম দেখেছি আমি একটি নারীর মুখ; নয়ন জুড়ানো এতো শোভা আর কোনো পত্রপুষ্পে নেই- সেসব সুন্দর শুধু পৃথিবীতে নারী আছে বলে। তাই নারীর মুখের দৃশ্য ছাড়া মনোরম বিপণিও কেমন বেখাপ্পা লাগে যেন অপেরা বা সিনেমা নিষপ্রাণ, পার্কের সকল দৃশ্য অর্থহীন বিন্যাস কেবল নারীর সান্নিধ্য ছাড়া দর্শনীয় স্থানের মহিমা কিছু নেই ; তাই তো এখনো পথে দুপাশের দৃশ্য ফেলে নারীর মুখের দিকে ব্যগ্র চেয়ে থাকি লোকে আর কি দেখে জানি না আমি শুধু দেখি এই সৌন্দর্যের শুদ্ধ শিল্পকলা, নারীর সুন্দর মুখ। এর চেয়ে সম্পূর্ণ গোলাপ কিংবা অনবদ্য গাঢ় স্বর্ণচাঁপা আমার মানুষ জন্মে আমি আর কোথাও দেখিনি, এর চেয়ে শুদ্ধ শিল্প, সম্যক ভাস্কর্য কিংবা অটুট নির্মাণ মিউজিয়াম, চিত্রশালা আর ইতিহাস-প্রসিদ্ধ কোথাও আমি তো পাইনি খুঁজে ; কী করে বলবো বলো নারীর মুখের চেয়ে দর্শনীয় ক্রিসানথিমান কী করে বলবো আমি নারীর মুখের চেয়ে স্মরণীয় অন্য কোনো নাম!
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
লেনিন, এই নাম উচ্চারিত হলে রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে প্রাণ; দেখি ভলগা থেকে নেমে আসে মানবিক উৎসধারা আমাদের বঙ্গোপসাগরে আমাদের পদ্মা-মেঘনা ছেয়ে যায় প্রাণের বন্যায়; লেনিন নামের অর্থ আমি তাই করি শোষণহীন একটি গোলাপ লেনিন নামের অর্থ আমি তাই করি শোষণমুক্ত একঝাঁক পাখি, লেনিন নামের অর্থ আমি তাই করি শোষণহীন একটি সমাজ। ভালোবাসা ছাড়া আর কোনো যোগ্য প্রতিশব্দ আমি দেখিনি কোথাও যা হতে পারে লেনিন শব্দের ঠিক স্বচ্ছ অনুবাদ, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা কখনো যে হতে পারে সীমাহীন আকাশের মতো কখনো যে মানুষের এই হাত এতোটা উপরে উঠতে পারে তোমার আগে কখনো তা কেউ দেখায়নি, কমরেড লেনিন। তুমিই প্রথম পৃথিবীর মাটিতে উড়িয়ে দিলে সাম্যের পতাকা এই মাটিতেই মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কাজ এভারেস্ট জয়ের চেয়েও যে কঠিন, কঠিন যে উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে কোনো নতুন দেশের সন্ধান লাভের চেয়েও কিংবা কোনো অজ্ঞাত দ্বীপ আবিস্কারের চেয়েও যে দুরূহ তু তুমি জানতে বলেই এই কাজই বেছে নিয়েছিলে; তাই তুমি পৃথিবীর মাটিতে উড়ালে প্রথম এই মানুষের মুক্তির পতাকা। এর আগে মানুষ কোথাও আর প্রকৃতই স্বাধীন ছিলো না মানুষ তোমারই হাতে এই পেলো প্রথম স্বীকৃতি তার আগে মেহনতী মানুষের ছিলো না কিছুই; এবার শস্য তার, শস্যের খামার তার, শিল্প-কারখানাও এবার তাদেরই। সমরেড লেনিন, এই নাম উচ্চারিত হলে রক্তে খেলে যায় প্রত্যাশার কী যে বিদ্যুৎ ঝিলিক ইতিহাস হয়ে ওঠে সচকিত গভরি উজ্জ্বল দেখতে পাই মানুষের কাছে কীভাবে খুলে যাচ্ছে সম্ভাবনার একেকটি দুয়ার; লেনিনের নামে মুহূর্তে শূন্যে ওঠে মানুষের মুষ্টিবদ্ধ হাত লেনিনের নামে উড়ে যায় একঝাঁক শান্তি কপোত, লেনিন নামের, সেদিন মানুষের দেহে ছিলো শোষকের নিষ্ঠুর দাঁতের চিহ্ন সেই চিহ্ন সুদুর বাংলায় আজো মানচিত্রের শরীরে ব্যাপক আরো বহু দেশে মানুষের এই চরম নিগ্রহ ; তাই যখন তোমার দিকে ফিরে চাই কমরেড লেনিন মনে হয় আর কোনো ভয় নেই- শোষণের দিন শেষ পৃথিবীতে মেহনতী মানুষ জেগেছে! লেনিন এনেছে পৃথিবীতে নবযুগ কাস্তে-হাতুড়ি সাম্যের সংবাদ, লেনিন এনেছে ঐক্যের মহামন্ত্র মানুষের মানুষে মৈত্রীর সেতুবন্ধন কমরেড লেনিন এই নাম উচ্চারিত হলে হৃদয়ে হৃদয়ে ওঠে গঢ় শিঞরন, খুলে যায় মানবিক সকল উৎসধারা ভলগা এসে মোশে এই গৈরিক পদ্মায়- আকাশ হঠাৎ যেন নিচু হয়ে মাটিকেই জানায় সেলাম, মানুষের অফুরন্ত প্রাণের জোয়ারে ভেসে ওঠে তোমার মুখ, কমরেড লেনিন আমি আর কিছুই দেখি না, সেইদিকে শুধু চেয়ে থাকি।
মহাদেব সাহা
স্বদেশমূলক
আমি তো তোমাকে ফেলে চাই না কোথাও যেতে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা মনোরম স্থানে, সমুদ্র-সৈকতে, স্বর্ণদ্বীপে- স্বপ্নেও শিউরে উঠি যখন দেখতে পাই ছেড়ে যাচ্ছি এই মেঠো পথ, বটবৃক্ষ, রাখালের বাঁশি, হঠাৎ আমার বুকে আছড়ে পড়ে পদ্মার ঢেউ আমার দুচোখে শ্রাবণের নদী বয়ে যায়; যখন হঠাৎ দেখি ছেড়ে যাচ্ছি সবুজ পালের নৌকো, ছেড়ে যাচ্ছি ঘরের মেঝেতে আমার মায়ের আঁকা সারি সারি লক্ষ্মীর পা বোবা চিৎকারে আর্তকণ্ঠে বলে উঠি হয়তো তখনই- তোমার বুকের মধ্যে আমাকে লুকিয়ে রাখো আমি এই মাটি ছেড়ে, মাটির সান্নিধ্য ছেড়ে, আকাশের আত্মীয়তা ছেড়ে, চাই না কোথাও যেতে, কোথাও যেতে।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
আমার ভেতর কেমন পাতা থর থর হাওয়া কাঁপছে কাউকে বলবো না আমি কিছুকে বলবো না আমার এখন ইচ্ছে জাগছে! নিজের দিকে চাইলে আমি ধরতে পারি এই রহস্য কোথাও ওলটপালট হচ্ছে কোথাও কোমল মাটি কাঁপছে বুকে কঠিন হাওয়া লাগছে, হাওয়া লাগছে কী রহস্যে জড়িয়ে এমন মেঘ করেছে বৃষ্টি হবে, আমার ধানী জমি জুড়ে রহস্য মেঘ বৃষ্টি হবে আমার এখন ইচ্ছে জাগছে!
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
এই মানুষকে ছাড়া আর কাউকে কখনো আমি এতো অসহায় হয়েছে দেখিনি শীতে ভিজে প্রাণিকুল, পাখিরাও কাঁপে কিন্তু মনস্তাপে শুধু জ্বলে ভগবান, তোমার মানুষ! আর কেউ কখনো এমন গভীর কুয়াশা পিঠে চেপে একা ঘরে ফেরে নাই মানুষের মতো! কিংবা তাদের বেদনা আমি কতোখানি জানি, এই পশুপ্রাণী পাখিরা তো পাখিদের জীবনী লেখেনি গাছের জীবনকথা কিছু লিখেছেন জগদীশ বসু তাতে যতোটুকু জানা যায় কোনো পাখি, কোনো গাছ রাখেনি কোথাও কোনো তাদের ব্যথিত শিলালিপি! শিকারীর গুলিবিদ্ধ বাঘ কী কাতর হয়ে পড়ে কতোখানি অসহায় হয় এই গাছ ঘাতকের কুঠারের ঘায়ে কিংবা কখনো প্রকৃতি কতো রুক্ষ কি বিষণ্ন হয়, আবহাওয়াবিদের ব্যাখ্যা কিংবা জিম করবেট যা কিছু বলেন আপাতত তাতেই সন্তুষ্ট হয়ে থাকি বাকি মানুষের মুখ দেখে বুঝি! দেখি এই মানুষ ব্যতীত আর কেউ এতো অসহায় হয়নি কখনো কখনো কখনো তারা এতো অসহায় সেই শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যে যেমন ছিলো এখনো তেমনি আছে কিংবা তারও বেশি; কখনো কখনো একেকটি মানুষ এতোই নির্জন শূন্য প্রাণের অস্তিত্বহীন গ্রহ যেন অধিবাসীহীন কোনো দ্বীপ, হিমমণ্ডলের সমস্ত তুষার তার কাঁধে একটি বিশাল ব্যাগ-চাপা! এই মানুষকেই কখনো দেখেছি কতো স্বেচ্ছাচারী কখনো দাম্ভিক তাকে হিংসাপরায়ন আরো বহুবার কখনো সে নিমর্ম ঘাতক! তবু এই মানুষকে ছাড়া আর কাউকে কখনো আমি এতো অসহায় হয়েছে দেখিনি এতো ভাবান্তর শুধু তার, এমন কাতর শুধু ভগবান, তোমরা মানুষ!
মহাদেব সাহা
স্বদেশমূলক
ভিতরমহলে খুব চুনকাম, কৃষ্ণচূড়া এই তো ফোটার আয়োজন বাড়িঘর কী রকম যেন তাকে হলুদ অভ্যাসবশে চিনি, হাওয়া একে তোলপাড় করে বলে, একুশের ঋতু! ধীরে ধীরে সন্ধ্যার সময় সমস্ত রঙ মনে পড়ে, সূর্যাস্তের ন্নি সরলতা হঠাৎ আমারই জামা সূর্যাস্তের রঙে ছেয়ে যায়, আর আমার অজ্ঞাতে কারা আর্তনাদ করে ওঠে রক্তাক্ত রক্তিম বলে তাকে! আমি পুনরায় আকাশখানিরে চেয়ে দেখি নক্ষত্রপুঞ্জের মৌনমেলা, মনে হয় এঁকেবেঁকে উঠে যাবে আমাদের ছিন্নভিন্ন পরাস্ত জীবন, অবশেষে বহুদূরে দিগন্তের দিকচিহ্ন মুছে দিয়ে ডাক দেবে আমরাই জয়ী!
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
কতোদিন কোথাও ফোটে না ফুল, দেখি শুধু অস্ত্রের উল্লাস দেখি মার্চপাস্ট, লেফট রাইট, কুচকাওয়াজ ; স্বর্ণচাঁপার বদলে দেখি মাথা উঁচু করে আছে হেলমেট ফুলের কুঁড়ির কোনো চিহ্ন নেই, গাছের আড়ালে থেকে উঁকি দেয় চকচকে নল, যেখানে ফুটতো ঠিক জুঁই, বেলি, রঙিন গোলাপ এখন সেখানে দেখি শোভা পাচ্ছে বারুদ ও বুলেট ; প্রকৃতই ফুলের দুর্ভিক্ষে আজ বিরান এদেশ কোথাও সামান্য কোনো সবুজ অঞ্চল নেই, খাদ্য নেই, শুধু কংক্রিট, পাথর আর ভয়ল আগুন এখানে কারফিউ-ঘেরা রাতে নিষিদ্ধ পূর্ণিমা ; আজ গানের বদলে মুহুর্মুহু মেশিনগানের শব্দ- সারাক্ষণ বিউগল, সাইরেন আর বিকট হুইসিল বুঝি কোথাও ফুলের কোনো অস্তিত্বই নেই। ফুলের শরীর ভেদ করে জিরাফের মতো আজ অস্ত্রই বাগয়েছে গ্রীবা পাতার প্রতীক তাই ভুলে গেছি দেখে দেখে অস্ত্রের মডেল! খেলনার দোকানগুলিতে একটিও গিটার, পুতুল কিংবা ফুল পাখি নেই শিশুদের জন্য শো-কেসে সাজানো শুধু অস্ত্রের সঞ্চার বাইরেবাতাস শ্বাসদুদ্ধকর, রাজপথে সারি সারি বুট, সব কিছু চেয়ে আছে অস্ত্রেরই বিশাল ডালপালা ; কোথাও ফোটে না ফূল, কোথাও শুনি না আর হৃদয়ের ভাষা, কেবল তাকিয়ে দেখি মার্চপাস্ট, কুচকাওয়াজ, লেফট রাইট এই রক্তাক্ত মাটিতে আর ফুল কই, শুধু অস্ত্রের উল্লাস।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
বেশিদিন থাকবো না আর চলে যাবো গোলাপের গাঢ় গিঁট খুলে চলে যাবো পিঁড়ির গহন স্নেহ ভেঙে, চলে যাবে, অনেক বসেছি বেশি তো থাকবো না আর চলে যাবো মেঘ রেখে, মমতাও রেখে মন্ময় কাঁথাটি রেখে চলে যাবো বেশি দেরি নেই! কুশন ও কার্পেটের নিবিড় গোধূলি ফেলে চলে যাবো চাই কি ফুলের শুশ্রূষা আর ফুলদানিরও আদর, চলে যাবো এখাবে বসার সুখ ফেলে, চলে যাবে বেত, বাঁশ, বস্তুকে মাড়িয়ে, বেশি দেরি নেই চলে যাবো জমাট মঞ্চেরও মোহ ভেঙে মেধাকেও পরাবো বিরহ, আত্মাকেও অনন্ত বিচ্ছেদ। বেশিদিন থাকবো না চলে যাবো এই তীব্র টান ভেদ করে, ফেলে রেখে এই আন্তরিকতার জামা, হাতের সেলাই অধিক থাকবো না আর অনেক জড়িয়ে গেছি চলে যাবো আসর ভাঙার আগে, আচ্ছন্নতা উন্মেষেরও আগে চলে যাবো চোখের জলেরও আগে না হলে পারবো না।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
কতোটা সতর্ক হয়ে জল হয় মেঘের শরীর, ক নিয়মে মুয়ে থাকে পাখি ঘাসে, পুরু বাতাসের ভাঁজে, খোলা পুষ্প পল্লবের ছাদে এই তো পাখিরা বেশ, হিংসা দ্বেষ কিছু নেই তার। পাখি বড়ো স্বভাব সজ্জন মেলে আছে শরীরের সীমা কেমন উদাস নগ্ন ওরা পাখি, তাই মানে অরণ্য-আবাস এমনটি শব্দ আছে পাখির শয়ন বলো ভেঙে যাবে ভয়ে! পাখি তো শয়ন করে যেভাবে জলের বেগ কোনোখানে হয়ে যায় নম্র নতজানু যে নিয়মে বৃক্ষের শরীর ফেটে জন্ম নেয় ফুল দেহের সমস্ত লজ্জা খুলে দিয়ে সেভাবে শয়ন করে পাখি। ওরা তো শয়ন জানে, শয়নের লজ্জা তাই নেই! কীভাবে চোখের নিচে অনায়াসে ধরে রাখে ঘুমের কম্পন ওরা পাখি, সুখূ ওরা সবুজ শব্দের চিহ্ন পান করে চলে যায় কুয়াশার গাঢ় কোলাহলে এই তো শয়ন এই পাকিরই শয়ন আমার চেয়েও ভালো শুয়ে থাকে পাখি! এই তো শয়ন শিল্পরীতি, পাখিরাই জানে!
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তোমাদের কথায় কথায় এতো ব্যকরণ তোমাদের উঠতে বসতে এতো অভিধান, কিন্তু চঞ্চল ঝর্ণার কোনো ব্যাকরণ নেই আকাশের কোনো অভিধান নেই, সমুদ্রের নেই। ভালোবাসা ব্যাকরণ মানে না কখনো হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনো সংবিধান নেই হৃদয় যা পারে তা জাতিসঙ্ঘ পারে না গোলাপ ফোটে না কোনো ব্যাকরণ বুঝে। প্রেমিক কি ছন্দ পড়ে সম্বোধন করে? নদী চিরছন্দময়, কিন্তু সে কি ছন্দ কিছু জানে, পাখি গান করে কোন ব্যাকরণ মেনে? তোমারাই বলো শুধু ব্যাকরণ, শুধু অভিধান! বলো প্রেমের কি শুদ্ধ বই, শুদ্ধ ব্যাকরণ কেউ কি কখনো সঠিক বানান খোঁজে প্রেমের চিঠিতে কেউ কি জানতে চায় প্রেমালাপ স্বরে না মাত্রায়? নীরব চুম্বনই জানি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ছন্দরীতি।
মহাদেব সাহা
প্রকৃতিমূলক
পাল্টে যায় পটভূমি, কবিতার থীম, মর্মতল কেঁপে ওঠে, নামে বর্ষা, হিম। রৌদ্র-আলো নিভে যায় নেমে আসে মেঘ হঠাৎ আগুন জ্বলে, ফুরায় আবেগ, ফুলদানি ভেঙে যায় নামে অন্ধকার অনন্ত শূন্যতা ছাড়া কিছু নাই আর। সামান্য আগেও ছিলো এইখানে ফুল মুহূর্তে বর্ষণ-মেঘে ভাসলো দুকূল, আবার কখন দেখি জেগে ওঠে চর ভালোবেসে মানুষেরা বাঁধে এসে ঘর। কিন্তু ফের ঘর ভাঙে, ঘনায় বিচ্ছেদ গোলাপের বনে দেখি জমে ওঠে ক্লেদ, বুকভরা ভালোবাসা হয়ে যায় হিম কেঁদে ওঠে মর্মতল, পাল্টে যায় থীম।
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
আমি আজ প্রাণখোলা অট্টহাসি চাই বৈশাখের ঝড় চাই, উদ্দামতা চাই। ফিসফিস কানাকানি চাই না মোটেও, যার যা বলার খুবই স্পষ্টাস্পষ্টিভাবে বলা চাই। অশ্রু ও আর্দ্রতা নয় আজ আমি খর চৈত্র চাই সেতু ভেঙে আজ চাই দীর্ঘ ব্যবধান, আজ শুধু দূরত্ব চাই নৈকট্য চাই না চাই না শীতল ছায়া, চাই দগ্ধ রৌদ্রের দুপুর। আজ চাই শক্ত মাটি, ইট-কাঠ, লোহা কাদামাটি, ঘাস্তফুল, এসব চাই, আজ আমি সমুদ্রগর্জন চাই, জলোচ্ছ্বাস চাই ওলটপালট-করা ভূমিকম্প চাই। আকাশের মতো খোলা বুক চাই দুরন্ত সাহস আর অফুরন্ত প্রাণাবেগ চাই, পাহাড়ী নদীর সেই তুমলি ক্ষিপ্রতা চাই উত্তাল তরঙ্গ চাই, বিস্ফোরণ চাই। আমি চাই অধিক বিরহ আজ, মিলন চাই না বন্ধন চাই কোনো, মনপ্রাণে স্বাধীনতা চাই, কোনো ঘোমটা চাই না আর, খোলামেলা দেখাশোনা চাই চাই না সামান্য স্থিতি, আজ চাই অনন্ত সাঁতার।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তোমার শরীরে হাত আকাশ নীলিমা স্পর্শ করে ভূমণ্ডল ছেয়ে যায় মধ্যরাতে বৃষ্টির মতন মুহূর্তে মিলায় দুঃখ, দুঃখ আমাকে মিলায় জলের অতল থেকে জেগে ওঠে মগ্ন চরাচর দেশ হয় দেশ, নদী হয় পূনর্বার নদী নৈঃশব্দ্য নিরুণ হাতে করতালি দেয় নিসর্গ উন্মুক্ত করে সারাদেহে নগ্ন শরীর কোন খানে রাখি তুলে দেহের বিস্তার তোমার শরীরে হাত দীর্ঘতর আমার শরীর; তোমার শরীরে হাত সূর্যোদয়, মেঘে রৌদ্র জন্মান্তর আমার আবার; তোমার শরীরে হাত একদিন, এই জন্মে শুধু একবার!
মহাদেব সাহা
প্রকৃতিমূলক
পাহাড় যেন ট্রাফিক পুলিশ গায়ে মেঘের জামা জেলগেটে ওই ঘন্টা বাজে পড়ায় শপথনামা; ঝড়জলে তাই ঘুমিয়ে যাই- আলস্যে এই মেঘনাঘাটে হয় না দেখি নামা, আকাশ যেন বিরহী এক গায়ে মেঘের জামা। আকাশ বুঝি বলিভিয়ার গভীর ঘন ঘন জেলগেটে ট্রাফিক পুলিশ দাঁড়ানো একজন। কে সে প্রিয়ংবদা তিস্তা কি নর্মদা; তার কাছে কে পৌছে দেবে সোনার সিংহাসন, মেঘের জামা পরেছে ওই বলিভিয়ার বন।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
যাই হোক, কুসুম ঝরিয়া যাক, খুলে যাক শিশুর পালক উজ্জ্বলতা তাহাও নিভিয়া যাক, জলরাশি হয়ে যাক খাঁখাঁ বালিযাড়ি যাই হোক তাহার বিশ্বাস রাখো, একদিন পরিত্রাণ হবে পরিশুদ্ধ হবে মাটি, জল, জলের কুচ্ছিত মুখচ্ছবি, ছায়া, সেই পীত নষ্ট জরে ফিরে পাবে বণৃহীন ঘ্রাণ তাহার বিশ্বাস রাখো চক্ষুষ্মান হবে সভ্যতার এই অন্ধ রাজা বিবর্ণ গোলাপ পুনরায় আয়ুষ্মতী হবে তখন সুবর্ণ হবে ঘাস, ঘাসের মহল। যাই হোক চারদিক ছেয়ে যাক ক্রূর অভিশাপে পাহাড় টলিয়া যাক, যাই হোক, রাখো, শুদ্ধ বিশ্বাস রাখো একদিন অন্ধকার ভেদ করে আশাতীত সূর্যোদয় হবে পরিশুদ্ধ হবে জল, মাটি, তারও মধ্যকার মজা প্রাণ তাহার বিশ্বাস রাখো, অভিভূত আদিম মানব হয়ে দেখো, দেখো তিনি তো আগুন, তাহাকে বিশ্বাস করো, অগ্নিকে বিশ্বাস করো, নতজানু হও তাহাকে বিশ্বাস করো তিনি জল, বৃক্ষকে বিশ্বাস করো, আগুনে বিশ্বাস রাখো, জলে রাখো, জলের অতীত আরো সুদর্শন তাহাকে বিশ্বাস রাখো শুদ্ধ বিশ্বাস রাখো একদিন শাপমুক্ত হবে।
মহাদেব সাহা
স্বদেশমূলক
চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি কফিন একজন বললো দেখো ভিতরে রঙিন রক্তমাখা জামা ছিলো হয়ে গেছে ফুল চোখ দুটি মেঘে মেঘে ব্যথিত বকুল! চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে এক শবদেহ একজন বললো দেখো ভিতরে সন্দেহ যেমন মানুষ ছিলো মানুষটি নাই মাটির মানচিত্র হয়ে ফুটে আছে তাই! চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি শরীর একজন বললো দেখো ভিতরে কী স্থির মৃত নয়, দেহ নয়, দেশ শুয়ে আছে সমস্ত নদীর উৎস হৃদয়ের কাছে! চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি কফিন একজন বললো দেখো ভিতরে নবীন হাতের আঙুলগুলি আরক্ত করবী রক্তমাখা বুক জুড়ে স্বদেশের ছবি!
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
একলা আমি কীভাবে এই আকাশ বলো ছুই, কীভাবে এই পাতালে যাই স্পর্শ করি ভুঁই। একলা আমি কীভাবে এই দুঃখ করি জয়- কীভাবে এই মরণ রুধি দূর করি এই ভয়! একলা আমি কীভাবে এই ঠেকাই চোখের জল,’ কীভাবে এই রক্ষা করি দগ্ধ বনাঞ্চল; একলা আমি কীভাবে এই বাঁচাই কিশলয় কীভাবে এই বাঁচিয়ে রাখি স্বপ্নসমুদয়!
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
করুণা করে হলে চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও আঙুলের মিহিন সেলাই ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও, এটুকু সামান্য দাবি চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি। চুলের মতন কোনো চিহ্ন দিও বিস্ময় বোঝাতে যদি চাও সমুদ্র বোঝাতে চাও, মেঘ চাও, ফুল, পাখি, সবুজ পাহাড় বর্ণনা আলস্য লাগে তোমার চোখর মতো চিহ্ন কিছু দিও! আজো তো অমল আমি চিঠি চাই, পথ চেয়ে আছি আসবেন অচেনা রাজার লোক তার হাতে চিঠি দিও, বাড়ি পৌঁছে দেবে। এক কোণে শীতের শিশির দিও একফোঁটা, সেন্টের শিশির চেয়ে তৃণমূল থেকে তোলা ঘ্রাণ এমন ব্যস্ততা যদি শুদ্ধ করে একটি শব্দই শুধু লিখো, তোমার কুশল! ওই তো রাজার লোক যায় ক্যাম্বিসের জুতো পায়ে,কাঁধে ব্যাগ, হাতে কাগজের একগুচ্ছ জীজন ফ্লাওয়ার কারো কৃষ্ণচূড়া, কারো উদাসীন উইলোর ঝোপ, কারো নিবিড় বকুল এর কিছুই আমার নয় আমি অকারণ হাওয়ায় চিৎকার তুলে বলি, আমার কি কোনো কিছু নাই? করুণা করেও হলে চিঠি দিও, ভুলে গিয়ে ভুল করে একখানি চিঠি দিও খামে কিছুই লেখার নেই তবু লিখো একটি পাখির শিস একটি ফুলের ছোটো নাম, টুকিটাকি হয়তো হারিয়ে গেছে কিছু হয়তো পাওনি খুঁজে সেইসব চুপচাপ কোনো দুপুরবেলার গল্প খুব মেঘ করে এলে কখনো কখনো বড়ো একা লাগে, তাই লিখো করুণা করেও হলে চিঠি দিও, মিথ্যা করে হলে বলো, ভালোবাসি।
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
আমার ফেলতে হবে আরো অশ্রুজল, আমাকে ভাঙতে হবে আরো দীর্ঘ পথ আমি জানি আমার ঝরাতে হবে আরো রক্ত ঘাম; অন্য কারো কথা আমি বলতে পারি না, তবে আমার ঠিকই জানি আরো অনেক মোছাতে হবে নগ্ন পদতল, সবার পায়ের নিচে আরো বহু হতে হবে ঘাস আমাকে সরাতে হবে আরো অনেক পথের তীক্ষ্ণ কাঁটা; আমি জানি না হলে আমার এই ব্যর্থ হাতে ফুটবে না কোনো তুচ্ছ ফুল, আমাকে সরাতে হবে অনেক পাথর, আমাকে খুলতে হবে অনেক দরোজা আমার পেরুতে হবে অনেক বন্ধুর গিরি-খাত, আমার করতে হবে একা জেগে অনেক দুঃখের রাত্রি ভোর; আর কারো কথা আমি বলতে পারি না তবে এ ছাড়া আমার কোনো পরিত্রাণ নেই গহীন জঙ্গলে হিংস্র বাঘের সামনে কতো আমাকে পড়তে হবে আরো ভয়াল দৈত্যের মুখে বুক বেঁধে সাহসে দাঁড়াতে হবে জানি, না হলে আমার হাতে ফুটবে না একটি কমল। আমাকে মাড়াতে হবে আরো অনেক দুয়ার, পথে পথে আমাকে ছড়াতে হবে চেরি আরো আমাকে মোছাতে হবে চোখ, আমার করতে হবে আরো বহু ক্ষতের শুশ্রূষা, আরো আমাকে ছড়াতে হবে পথে পথে, আরো নিঃশেষে পোড়াতে হবে নিজের জীবন আমার সইতে হবে আরো কঠিন আঘাত, আমার বইতে হবে আরো দুঃখভার, আমার ফেলতে হব আরো অশ্রুজল, আমার করতে হবে আরো লণ্ডভণ্ড ঘর ও সংসার আরো ছিন্নভিন্ন করতে হবে এই গেরস্থালি, ভিতর-বাহির। আমার তাহলে ছেড়ে ছুঁড়ে নেমে যেতে হবে সব ফেলে, বুদ্ধের মতন চলে যেতে হবে সব ফেলে, যদি একটিও তুচ্ছ ফুল ফোটাতে চাই তাহলে ফেলতে হবে আরো অশ্রু তাহলে আমার তুলে নিতে হবে হাতে ভিক্ষাপাত্র, ছিড়ে ফেলতে হবে সব প্রিয় আকর্ষণ, সব স্নেহমায়ার বন্ধন ভুলে যেতে হবে সন্তানের অশ্রুভেজা চোখ তাহলে আমার আর একবারও পেছন ফিরে তাকালে চলবে না, চলে যেতে হবে।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
এখন শুধু মনে পড়ে আর মনে পড়ে মনে পড়ে মেঘ, মনে পড়ে চাঁদ, জলের ধারা কেমন ছিলো- সেসব কথাই মনে পড়ে; এখন শুধু মনে পড়ে, নদীর কথা মনে পড়ে, তোমার কথা মনে পড়ে, এখন এই গভীর রাতে মনে পড়ে তোমার মুখ, তোমার ছায়া, তোমার বাড়ির ভেতর-মহল, তোমার উঠোন, সন্ধ্যাতারা এখন শুধু মনে পড়ে, তোমার কথা মনে পড়ে; তোমার কথা মনে পড়ে অনেক কথা মনে পড়ে, এখন শুধু মনে পড়ে, এখন শুধু মনে পড়ে; এখন শুধু মনে পড়ে আর মনে পড়ে আকাশে মেঘ থেকে থেকে এখন বুঝি বৃষ্টি ঝরে।
মহাদেব সাহা
ভক্তিমূলক
আমার টেবিলের সামনে দেয়ালে শেখ মুজিবের  একটি ছবি টাঙানো আছে কোন তেলরঙ কিংবা বিখ্যাত স্কেচ জাতীয় কিছু নয় এই সাধারণ ছবিখানা ১৭ মার্চ- এ বছর শেখ মুজিবের জন্ম দিনে একজন মুজিব প্রেমিক আমাকে উপহার দিয়েছিলো কিন্তু কে জানতো এই ছবিখানা হঠাৎ দেয়াল ব্যপে একগুচ্ছ পত্র পুষ্পের মতো আমাদের ঘরময় প্রস্ফুটিত হয়ে উঠবে রাত্রিবেলা আমি তখন টেবিলের সামনে বসেছিলাম আমার স্ত্রী ও সন্তান পাশেই নিদ্রামগ্ন সহসা দেখি আমার ছোট্ট ঘরখানির দীর্ঘ দেয়াল জুড়ে দাঁড়িয়ে আছেন শেখ মুজিব; গায়ে বাংলাদেশের মাটির ছোপ লাগানো পাঞ্জাবি হাতে সেই অভ্যস্ত পুরনো পাই চোষে বাংলার জন্য সজল ব্যাকুলতা এমনকি আকাশকেও আমি কখনো এমন গভীর ও জলভারানত দেখিনি। তার পায়ের কাছে বয়ে যাচ্ছে বিশাল বঙ্গোপসাগর আর তার আলুথালু চুলগুলির দিকে তাকিয়ে আমার মনে হচ্ছিলো এই তো বাংলার ঝোড়ো হাওয়ায় কাঁপা দামাল নিসর্গ চিরকাল তার চুলগুলির মতোই অনিশ্চিত ও কম্পিত এই বাংলার ভবিষ্যৎ! তিনি তখনো নীরবে তাকিয়ে আছেন, চোখ দুটি স্থির অবিচল জানি না কী বলতে চান তিনি, হঠাৎ সারা দেয়াল ও ঘর একবার কেঁপে উঠতেই দেখি আমাদের সঙ্কীর্ণ ঘরের ছাদ ভেদ করে তার একখানি হাত আকাশে দিকে উঠে যাচ্ছে- যেমন তাকে একবার দেখেছিলাম ৬৯-এর গণআন্দোলনে তিনি তখন সদ্য ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বেরিয়ে এসেছেন কিংবা ৭০-এর পল্পনে আর একবার ৭১-এর ৭ই মার্চের বিশাল জনসভায়; দেখলাম তিনি ক্রমে উষ্ণ, অধীর ও উত্তেজিত হয়ে উঠছেন একসময় তার ঠোঁট দুটি ঈষৎ কেঁপে উঠলো বুঝলাম এক্ষুনি হয়তো গর্জন করে উঠবে বাংলার আকাশ, আমি ভয়ে লজ্জায় ও সঙ্কোচে নিঃশব্দে মাথা নিচু করে দাঁড়ালাম। আমার মনে হেলা আমি যেন মুখে হাত দিয়ে অবনত হয়ে আছি বাংলাদেশের চিরন্তন প্রকুতির কাছে, একটি টলোমলো শাপলা ও দিঘির কাছে, শ্রাবণের ভরা নদী কিংবা অফুরন্ত রবীন্দ্রসঙ্গীতের কাছে কিন্তু তার মুখ থেকে কোনো অভিযোগ নিঃসরিত হলো না; তবু আমি সেই নীরবতার ভাষা বুঝতে চেষ্টা করলাম তখন কী তিনি বলতে চেয়েছিলেন, কী ছিলো তার ব্যাকুল প্রশ্ন ব্যথিত দুটি চোখে কী জানার আগ্রহ তখন ফুটে উঠেছিলো! সে তো আর কিছুই নয় এই বাংলাদেশের ব্যগ্র কুশলজিজ্ঞাসা কেমন আছে আট কোটি বাঙালী আর এই বাংলা বাংলাদেশ! কী বলবো আমি মাথা নিচু করে ক্রমে মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিলাম- তবু তাকে বলতে পারিনি বাংরার প্রিয় শেখ মুজিব তোমার রক্ত নিয়েও বাংলায় চালের দাম কমেনি তোমার বুকে গুলি চালিয়েও কাপড় সস্তা হয়নি এখানে, দুধের শিশু এখনো না খেয়ে মরছে কেউ থামাতে পারি না বলতে পারিনি তাহলে রাসেলের মাথার খুলি মেশিনগানের গুলিতে উড়ে গেল কেন? তোমাকে কিভাবে বলবো তোমার নিষ্ঠুর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে জয়বাংলা, তারপরে একে একে ধর্মনিরপেক্ষতা একুশে ফেব্রুয়ারী ও বাংলাভাষাকে হত্যা করতে উদ্রত হলো তারা, এমনকি একটি বাঙালী ও বাংলাভাষাকে হত্যা করতে উদ্যত হলো তারা,  এমনকি একটি বাঙালী ফুল ও একটি বাঙালী পাখিও রক্ষা পেলো না।  এর বেশি আর কিছুই তুমি জানতে চাওনি বাংলার প্রিয়  সন্তান শেখমুজিব!  কিন্তু আমি তো জানি ১৫ই আগষ্টের সেই ভোরবেলা  প্রথমে এই বাংলার কাক, শালিক ও খঞ্জনাই  আকাশে উড়েছিলো  তার আগে বিমানবাহিনীর একটি বিমানও ওড়েনি,  তোমার সপক্ষে একটি গুলিও বের হয়নি কোনো কামান থেকে  বরং পদ্মা-মেঘনাসহ সেদিন বাংলার প্রকৃতিই একযোগে  কলরোল করে উঠেছিলো।  আমি তো জানি তোমাকে একগুচ্ছ গোলাপ ও স্বণৃচাঁপা  দিয়েই কী অনায়াসে হত্যা করতে পারতো,  তবু তোমার বুকেই গুলির পর গুলি চালালো ওরা  তুমি কি তাই টলতে টলতে টলতে টলতে বাংলার ভবিষ্যৎকে  বুকে জড়িয়ে সিঁড়ির উপর পড়ে গিয়েছিলে?  শেখ মুজিব সেই ছবির ভিতর এতোক্ষণ স্থির তাকিয়ে থেকে  মনে হলো এবার ঘুমিয়ে পড়তে চান আর কিছুই জানতে চান না তিনি;  তবু শেষবার ঘুমিয়ে পড়ার আগে তাকে আমার বলতে ইচ্ছে করছিলো  সারা বাংলায় তোমার সমান উচ্চতার আর কোনো  লোক দেখিনি আমি।  তাই আমার কাছে বার্লিনে যখন একজন ভায়োলিন্তবাদক  বাংলাদেশ সম্বন্ধে জানতে চেয়েছিলো আমি  আমার বুক-পকেট থেকে ভাঁজ-করা একখানি দশ  টাকার নোট বের করে শেখ মুজিবের ছবি দেখিয়েছিলাম  বলেছিলাম, দেখো এই বাংলাদেশ;  এর বেশি বাংলাদেশ সম্পর্কে আমি আর কিছুই জানি না!  আমি কি বলতে পেরেছিলাম, তার শেষবার ঘুমিয়ে পড়ার  আগে আমি কি বলতে পেরেছিলাম?
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
বিষাদ ছুঁয়েছে আজ, মন ভালো নেই, মন ভালো নেই; ফাঁকা রাস্তা, শূন্য বারান্দা সারাদিন ডাকি সাড়া নেই, একবার ফিরেও চায় না কেউ পথ ভুলকরে চলে যায়, এদিকে আসে না আমি কি সহস্র সহস্র বর্ষ এভাবে তাকিয়ে থাকবো শূন্যতার দিকে? এই শূন্য ঘরে, এই নির্বসনে কতোকাল, আর কতোকাল! আজ দুঃখ ছুঁয়েছে ঘরবাড়ি, উদ্যানে উঠেচে ক্যাকটাস্ কেউ নেই, কড়া নাড়ার মতো কেউ নেই, শুধু শূন্যতার এই দীর্ঘশ্বাস, এই দীর্ঘ পদধ্বনি। টেলিফোন ঘোরাতে ঘোরাতে আমি ক্লান্ত ডাকতে ডাকতে একশেষ; কেউ ডাক শোনে না, কেউ ফিরে তাকায় না এই হিমঘরে ভাঙা চেয়ারে একা বসে আছি। এ কী শান্তি তুমি আমাকে দিচ্ছো ঈশ্বর, এভাবে দগ্ধ হওয়ার নাম কি বেঁচে থাকা! তবু মানুষ বেঁচে থাকতে চায়, আমি বেঁচে থাকতে চাই আমি ভালোবাসতে চাই, পাগলের মতো ভালোবাসতে চাই- এই কি আমার অপরাধ! আজ বিষাদ ছুঁয়েছে বুক, বিষাদ ছুঁয়েছে বুক মন ভালো নেই, মন ভালো নেই; তোমার আসার কথা ছিলো, তোমার যাওয়ার কথা ছিল- আসা-যাওয়ার পথের ধারে ফুল ফোটানো কথা ছিলো সেসব কিছুই হলো না, কিছুই হলো না; আমার ভেতরে শুধু এক কোটি বছর ধরে অশ্রুপাত শুধু হাহাকার শুধু শূন্যতা, শূন্যতা। তোমার শূন্য পথের দিকে তাকাতে তাকাতে দুই চোখ অন্ধ হয়ে গেলো, সব নদীপথ বন্ধ হলো, তোমার সময় হলো না- আজ সারাদিন বিষাদপর্ব, সারাদিন তুষারপাত- মন ভালো নেই, মন ভালো নেই।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
একা হয়ে যাও, নিঃসঙ্গ বৃক্ষের মতো ঠিক দুঃখমগ্ন অসহায় কয়েদীর মতো নির্জন নদীর মতো, তুমি আরো পৃথক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাও স্বাধীন স্বতন্ত্র হয়ে যাও খণ্ড খণ্ড ইওরোপের মানচিত্রের মতো; একা হয়ে যাও সব সঙ্গ থেকে, উন্মাদনা থেকে আকাশের সর্বশেষ উদাস পাখির মতো, নির্জন নিস্তব্ধ মৌন পাহাড়ের মতো একা হয়ে যাও। এতো দূরে যাও যাতে কারো ডাক না পৌঁছে সেখানে অথবা তোমার ডাক কেউ শুনতে না পায় কখনো, সেই জনশূন্য নিঃশব্দ দ্বীপের মতো, নিজের ছায়ার মতো, পদচিহ্নের মতো, শূন্যতার মতো একা হয়ে যাও। একা হয়ে যাও এই দীর্ঘশ্বাসের মতো একা হয়ে যাও।
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
তোমরা কেউ আমার সজল চোখ বুঝলে না, বুঝলে পেরেক বুঝলে ডলার-পাউণ্ড, বিমানবন্দুর, যুদ্ধজাহাজ তোমরা কেউ একটি খোঁপা-খোলা মেঘ বুঝলে না, বুঝলে রক্ত বুঝলে ছুরি, বুঝলে দংশন, তোমরা কেউ বন্ধুর পবিত্র মুখ বুঝলে না, বুঝলে হিংসা বুঝলে রাত্রি, বুঝলে অন্ধকার, বুঝলে ছোবল; তোমরা কেউ আমার সজল চোখ বুঝলে না, বুঝলে আঘাত তোমরা কেউ বন্ধুর কোমল বুক বুঝলে না, বুকে মাটির ঘ্রাণ বুঝলে না, বুঝলে অস্ত্র; তোমরা কেউ বুঝলে না, বুঝলে না, বুঝলে না। তোমরা একটি বকুলফুল বুঝলে না, কেনইবা কাঁদবে? তোমরা একটি শস্যক্ষেত্র বুঝলে না, কেনইবা দাঁড়াবে? তোমরা একটি মানুষ বুঝলে না, কেনইবা নত হবে? তোমরা বুঝলে না মায়ের চোখের অশ্রু, পিতার বুকের দুঃখ বুঝলে না শেশব, বাউল, ভাটিয়ালি তোমরা বুঝলে না, এসব কিছুই বুঝলে না। গ্রামের মেঠো পথ, ফুলের গন্ধ, ঝিঁঝির ডাক তোমরা কোনোদিন বুঝলে না, বুঝলে না নদরি গান, পাতার শব্দ বুঝলে না সজনে ডাঁটা, পুঁইশাক, কুমড়োলতা তোমরা হৃদয় বুঝলে না, বুঝলে লোহার আড়ত, তোমরা কিছু বুঝলে না, কিছু বুঝলে না, কিছু বুঝলে না শুধু বুঝলে চোরাগোপ্তা, বুঝলে রক্তপাত।
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
তারা আমাদের কেউ নয় যারা মসজিদ ভাঙে আর মন্দির পোড়ায়, তাদের মুখের দিকে চেয়ে সমস্ত আবেগরাশি হয়ে যাও বরফের নদী- অনুভূতির সবুজ প্রান্তর তুমি হয়ে যাও উত্তপ্ত সাহারা। তাদের পায়ের শব্দ শুনে রুদ্ধ হয়ে যাও তুমি চঞ্চল উদ্দাম ঝর্নাধারা, মেঘ হও জলশূন্য, নীলিমা বিদীর্ণ ধ্বংসস্তপ। তারা আমাদের কেউ নয়, কখনো ছিলো না, যারা মানুষের বাসগৃহে জ্বালায় আগুন, শস্যক্ষেত্র করে ছত্রখান লুট করে খাদ্য, বস্ত্র, যা কিছু সম্বল- তাদের কণ্ঠস্বর শুনে ঘৃণায় কুঞ্চিত হও সুন্দর গোলাপ, শুস্ক হও সব স্রোতস্বিনী, ফলবান বৃক্ষ হও ছায়াহীন, নিষ্ফলা, নিষ্পত্র, তারা আমাদের কেউ নয়, কোনোকালেও ছিলো না, যারা এইভাবে শত শত ঘরে অনায়াসে আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে কিংবা করতে পারে এইভাবে মানুষকে ভিটেমাটি ছাড়া, যারা এভাবে বুনতে পারে হিংসার বীজ করতে পারে দাঙ্গা-হানাহানি, রক্তপাত, সম্ভ্রম লুণ্ঠন, তারা আমাদের কেউ নয়, কখনো ছিলো না; মানুষের নামের তালিকা থেকে মুছে ফেলো তাদের এ কলঙ্কিত নাম- তাদের মুখের দিকে চেয়ে চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যাও মাতৃস্নেহ, প্রেমিকার পবিত্র আবেগ, মাদার তেরেসার অপার স্নেহের হাতখানি; তাদের উদ্দেশ্যে একেবারে স্তব্ধ হয়ে যাও তুমি পাখিদের গান, মোনাজাত, মীরার ভজন।
মহাদেব সাহা
স্বদেশমূলক
তোমার ভালোবাসার দূরত্বের চেয়ে এমন আর কি দূরত্ব আছে আমার, এমন আর কি মাইল মাইল দূরত্ব সে তো একখানি মাত্র টিকিটের ব্যবধান তারপরই উষ্ণ অভর্থ্যনা, তোমার আঁচলে ঘাম মুছে ফেলা। সে-কথা জানি বলেই তো তোমার ভালোবাসার দূরত্বকেই কেবল বলি বিচ্ছেদ। না হলে যতো দূরেই বলো যেতে পারি মাইল মাইল নীলিমা, মাইল মাইল সমুদ্র- তার আগে শুধু সঙ্গে নিতে চাই তোমার ভালোবাসা; এই মূলধনটুকু পেলে আমিও বাণিজ্যে যেতে পারি বলো তো দেশভ্রমণে বের হয়ে যেতে পারি এইমাত্র কিন্তু তার আগে আমার ছাড়পত্রে তোমার ভালোবাসার স্বচ্ছ সীলমোহর আঁকা থাকা চাই- বিদেশ মানেই তো আর দূরত্‌ নয়, দূরত্ব তোমার ভালোবাসার কয়েক হাত ব্যবধান, তোমার ভালোবাসা থেকে দুই পা সরে দাঁড়ানো তার চেয়ে কোনো দূরত্ব আমার জানা নেই, আমার জানা নেই। আমি যাকে দূরত্ব বলি তা একই কার্নিশের নিচে দাঁড়ানো বিচ্ছেদ কিংবা একই কার্পেটের উপর দাঁড়ানো তীব্র শীত আমাদের মাঝে প্রবাহিত এই হিমবাহকেই আমি বলি বিদেশ, আমি বলি দূরত্ব। না হলে সব দূরত্বই তো তোমার চোখের পলকমাত্র তুমি ফিরে তাকাতেই আমি দেখতে পাবো ঢাকা এয়ারপোর্টে চক্কর দিচ্ছে আমার বিমান হ্যালো বাংলাদেশ! আমার চিরসবুজ বাংলাদেশ!
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
এতোটুকু স্নেহ আর মমতার জন্য আমি কতোবার নিঃস্ব কাঙালের মতো সবুজ বৃক্ষের কাছে যাই- হে বৃক্ষ আমাকে তুমি এতোটুকু ভালোবাসা দাও, বনস্পতি আমাকে দেখিয়ে দেয় তোমার দুচোখ বলে, ওই দুটি নিবিড় চোখের কাছে যাও। কতোবার এতোটুকু ভালোবাসা চেয়ে আমি নির্জন নদীর কাচে যাই- বলি, পুণ্যতোয়া নদী, আর কিছু নয়, আমাকে একটু তুমি সহানুভূতির স্পর্শ দাও, নদী আমাকে দেখিয়ে দেয় তোমার ঠিকানা বলে, গাছপালা, নদী বন রেখে তার কাছে যাও। আমি এই ভালোবাসা চেয়ে বহুবার চঞ্চল ঝর্নার কাছে যাই হাত পেতে তার কাছে চাই এই তৃষ্ণার শীতল জলধারা, সে আমাকে বলে, তোমার শুস্ক বুক যদি একটু ভেজাতে চাও- সজল বর্ষার মেঘ কিংবা ওই স্নিগ্ধ জলাশয় ফেলে ছুটে যাও তার কাছ, পাবে জল ক্লানি-, পিপাসার। ভেবো না যাইনি আমি আর কোনোখানে বৃক্ষ, পত্র, অরণ্য, উদ্ভিদ, পাখি, প্রকৃতির কাছে এতোটুকু ভালোবাসা চেয়ে কতোদিন করেছি অপেক্ষা অবশেষে এসেছি তোমার কাছে- তুমি যদি না দাও আশ্রয়, যদি না হয় আর্দ্র তোমার হৃদয় তোমার এমন অনুভূতিশীল দুটি চোখ যদি না বোঝে আমার দুঃখ- তাহলে কীভাবে বলো নদী আর বৃক্ষের কাছে স্নেহচ্ছায়া পাবো!
মহাদেব সাহা
ভক্তিমূলক
শুনুন রবীন্দ্রনাথ এ যুগে ভীষণ দায় বাঁচা, বড়ো অসহায় আমারা কজন যাবা আপনার শান্তিনিকেতনে প্রত্যহ প্রার্থনা করি হে ঈশ্বর, আমাদের শান্তি দাও, প্রত্যহ প্রার্থনা করি মঠে ও গির্জায় আমাদের শান্তি দাও, দাও মহান ঈশ্বর, তবু সর্বত্র আজ অনাবৃষ্টি, রৌদ্রে পোড়ে মাঠ, বোমায় শহর পোড়ে, লোকালয় উচ্ছন্নে যায় মারী ও মড়কে কাঁপে দেশ, শুনুন রবীন্দ্রনাথ এ যুগে আমরা বড়ো অসহায় কজন যুবকও বিশেষত আমরা কজন যুবা ব্যক্তিযত নিখোঁজ সংবাদ যারা ঢেকে রাখি সর্বক্ষণ আস্তিনের পুরু ভাঁজে, বড়োই রুগ্ন আমরা এ যুগে নিঃশ্বাস নেবো প্রকৃতিতে বৃষ্টিতে বা উদার অনণ্যে দাঁড়াবো এমন জো নেই কোনো, আমাদের সন্নিকটে বনভূমি নেই। এখণ ভীষণ রুগ্ন আমরা, সারা গায়ে কালোশিরা, চোখ ভর্তি নিঃশেব্দ আঁধার, যেখনে যাই আমরা কজন যুবা যেন বড়ো বেশি ম্লাম ফ্যাকাশে বৃদ্ধ, চোখমুখে স্পষ্ট হয়ে লেগে থাকে যাবতীয় অনাচার, নিজের কাছেও আজ নিজেদের লুকাবার রাস্তা খোলা নেই, এ যুগে আমরা কড়ো অসহায় কজন যুবক ; শুনান রবীন্দ্রনাথ তবু আমরা কজন যুবা আজো ভালোবাসি গান, তবু আমরা কজন যুবক বড়ো ভালোবাসি মাধবীকে, ভালোবাসি মাধবীর বাংলাদেশ তার নিজস্ব বর্ণমালা রবীন্দ্রসঙ্গীত। শুনুন রবীন্দ্রনাথ আমরা কজন যুবা, বড়ো বেশি অসহায় কজন যুবা, তখন তাকিয়ে দেখি সূর্যাস্ত অস্তিত্বে রৌদ্র ওঠে, পাখি নাচে, আমরা কজন এই ভয়ানক রুগ্ন যুবা পুনরায় মাঠে যাই আমরা নিঃশ্বাস নিই সঙ্গীতের উদার নিসর্গে, আমরা যেন ধীরে ধীরে বেঁচে উঠি তখন মনে হয় এমনি করেই বুঝি এদেশে বিপ্লব আসে, একুশে ফেব্রুয়ারি আসে, নববর্ষ আসে; আমরা কতিপয় যুবা তাই আর সব পরিচয় যখন ভুলে যাই এমনকি ভুলে যাই নিজেদের নাম, তখনো মনে রাখি রবীন্দ্রনাথ আমাদের আবহমান বাংলাদেশ আমাদের প্রদীপ্ত বিপ্লব, রবীন্দ্রনাথ আমাদের চিরদিন একুশে ফেব্রুয়ারি।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তুমি চলে যাবে বলতেই বুকের মধ্যে পাড় ভাঙার শব্দ শুনি- উঠে দাঁড়াতেই দুপুরের খুব গরম হাওয়া বয়, মার্সির কাঁচ ভাঙতে শুরু করে; দরোজা থেকে যখন এক পা বাড়াও আমি দুই চোখে কিছুই দেখি না- এর নাম তোমার বিদায়, আচ্ছা আসি, শুভরাত্রি, খোদা হাফেজ। তোমাকে আরেকটু বসতে বললেই তুমি যখন মাথা নেড়ে না, না বলো সঙ্গে সঙ্গে সব মাধবীলতার ঝোপ ভেঙে পড়ে; তুমি চলে যাওয়ার জন্যে যখন সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকো তৎক্ষণাৎ পৃথিবীর আরো কিছু বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যায়, তুমি উঠোন পেরুলে আমি কেবল শূন্যতা শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই দেখি না আমার প্রিয় গ্রন্থগুলির সব পৃষ্ঠা কালো কালিতে ঢেকে যায়। অথচ চোখের আড়াল অর্থ কতোটুকু যাওয়া, কতোদূর যাওয়া- হয়তো নীলক্ষেত থেক বনানী, ঢাকা থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট তবু তুমি চলে যাবে বলতেই বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে সেই থেকে অবিরাম কেবল পাড় ভাঙার শব্দ শুনি পাতা ঝরার শব্দ শুনি- আর কিছুই শুনি না।
মহাদেব সাহা
প্রকৃতিমূলক
অঘ্রানে আমার জন্ম হবে যদি মরে যাই ঠিক ঠিক গালের জরুল নিয়ে চেয়ে দেখো এসেছি অঘ্রানে এক আমিআগন্তুক! তোমাদের স্থির মানব্‌ স্থিতির মাঝখানে এসে দাঁড়াবো আদ্যন্ত এক মানুষী সংবিৎ শস্যের সুঘ্রাণ লেগে রবে এই সারা চক্ষুময় সারাদেহ রোমাঞ্চিত হবে যদি মরে যাই ফিরে এসে ঠিক চিনে নেবো তাকে প্রাক্তন প্রেমিকা পায়রার খোপ এই, শস্যক্ষেত্র, উদাসীন আবাল্য বাউল, অঘ্রানে আমার জন্ম হবে আমার চুলের গন্ধ শুঁকে দেখো, নখ দেখো গায়ে গেঁয়ো জনি-পাতার রস লেগে রবে তখনো আদিম বন্য ঘ্রাণ কিছু পাবে আমি সেই সনাতন মানুষী সংবিৎ দেখো এসেছি অঘ্রানে এক আমি আগন্তুক!
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
আমার শরীর চুলের অরণ্যে ছায়া, রৌদ্র তোমার আমি দেহের সীমায়। তুমি চোখ খোলো তোমার চোখের কালো জলে দেখো আমি খেলা করি মাছ কোথায় ভাসাবে তুমি কোথায় খুঁড়বে কালো গোর সমগ্র মাটিতে দেখো ছেয়ে যাবে আমার শরীর; যা চাও আমাকে তুমি পাখি বলো পাখি মেঘ বলো মেঘ তুমি যদি মেলে ধরো তোমার শরীর আমরা দুজনে হই পাথর খোদাই।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
শহরের চৌদিকে ওরা খুলে দেয় সুবিখ্যাত জলসত্র সব তবু কানে আসে কলরব ভীষণ পিপাসা এইখানে, জলচাই মানুষের পিপাসার জল নাই মিউনিসিপ্যালিটির এই বড়ো বড়ো ট্যাঙ্কের তলায় বালি আর কঠিন কাঁকর সব জমে আছে। আমাদের বিশুষ্ক গলায় একবিন্দু শীতল জলের স্বাদ দিতে পারে এমন প্রকৃত কোনো হ্রদ নেই কাছে কিংবা যেখনেই তাকাই কেবল আজ চোখে পড়ে ধোঁয়ার কফিন সগর আর নদীর জল প্রতিদিন বাষ্পীয় জাহাজে চড়ে চলে যায় দূরবর্তী চাঁদের শহরে সেইসব প্রাণশূন্য ঘরে বসে পৃথিবীর শ্যামল জলের বাজার থরে থরে গজায় বৃক্ষবাড়ি, লোকালয় এখানে হাজার মরে পিপাসায়, জল নেই শহরে কোথাও শহরে কোথাও আজ শান্তি নেই, যদিও অনর্গল শান্তির ডঙ্কা পেটাও খুলে দাও জলসত্র, তবু হায় এ শহরে মরে লোক ভয়ে জলশূন্যতায় আর পিপাসায়।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
এমনও অরণ্য তাকে উদ্দাম মর্মর মূর্তি ধরে নেয়া যায়, বাতাসের অতি দম্ভ বৃক্ষের সমান উঁচু মেঘ, আরো উঁচু অরণ্যের সীমা এও শুধু অরণ্যেরই শোভা পায় এতো উঁচু এমন বিশাল তাই তো মর্মরমূর্তি অরণ্যকে নিঃশব্দ প্রস্তর বলে ভ্রম হয়, মনে হয় এ নৈঃশব্দ্য প্রস্তরেরই প্রাণ। অরণ্যও অনেকাংশে জলেরই মতন আস্থাবান অথবা এ জঙ্গমতা মানুষেরই মতো জন্মগত মানুষেরই মতো এই স্থিতিগ্রাহ্য পার্থিবতা অরণ্যকে দেখে মনে হয় চতুর্দিকে হাত তুলে আমাদেরই আদি কোনো পিতা কোনো আদিম পুরুষ রয়েছেন সম্পূর্ণ স্বাধীন সমাসীন, তারই কায়া এজন্যই অরণ্যকে অনেকাংশে পার্থিব মানুষ যেন লাগে কখনো কখনো তাহার ভিতরে বসে দুঃখের গভীর চলাফেরা দীর্ঘ করুণ নিঃশ্বাস টের পাই এমন নিশ্চিত ব্যস্ত এতো শব্দহীন এমন নির্জন কোলাহল, ঘুমিয়ে পড়ার শব্দ পাথরেরও ঘুম পায়, অরণ্যেরও অবসাদ লাগে, বৃক্ষের উলঙ্গ মূর্তি আরো গূঢ় অধিক সংযম আরো খাদ্য পানীয়ের টান এই অবিচ্ছিন্ন বিশুদ্ধ যৌনতা যা কিনা স্বভাবে বদ্ধ অতি গূঢ় সুদৃঢ় যৌবন, মনে হয় অরণ্যেতে আছে, অরণ্যের অধিক অরণ্য সেও হয়তোবা একদিন সৃষ্টি হয়ে যাবে কিংবা তাও নির্মাণ হয়েই আছে মানুষের সভ্যতার স্বপ্নের ভিতর সেই তো প্রস্তর, সেই তাম্র, প্রস্তর যুগের অস্ত্র, অরণ্য প্রস্তরময়, অরণ্যও আমাদের লোক, তাকেও এভাবে চিনি মাথায় জড়ানো সাপ পাগড়ির মতোই শাদামাঠা কখনো পশ্চাৎ থেকে দেখে একান্তই ভিন্ন কেউ এসেছেন তাও মনে হতে পারে, আমি জানি আমি এই অরণ্যের খুব বেশি কিছুই জানি না যতোখানি মানুষেরও জানি নিশ্চিতই অরণ্যেরও ততোটুকু মাত্র জানা যায় প্রকৃতই অরণ্য কি অধিক হৃদয়গম্য, পারি, ততোটুকু পারি অধিক পারি না, ইহার অধিক কোনো কিছুই পারি না। অরণ্য কি একদিন মানুষেরই মূর্তি ফিরে পবে, এমন শোকার্ত হবে, দুঃখশীল হবে তার মন অরণ্যের মনুষ্য স্বভাব মানুষের অরণ্য প্রকৃতি এও কি সম্ভব অর্থাৎ যা অরণ্য ও আমাদের উভয়েরই সমান অংশে ভাগ! এই দেখে অরণ্যের নিকট আত্মীয় কেউ অথবা প্রস্তর আরো মৌন ম্লান হয়ে যাবে যেতে যেতে ইচ্ছে করে অরণ্যকে একদিন একথা শুধাই, চলে যেতে যেতে।
মহাদেব সাহা
রূপক
এই মরুভুমি মধ্যে দুই একজন মানুষ আছেন স্নিদ্ধ ছায়াময়- তাদের নিকটে গেলে মনে ছয় এই গাছের ছায়ায় আরো কিছুক্ষণ বসি। দুই একজন মানুষ আছেন এই রুক্ষ মরুর মধ্যেও স্বচ্ছ জলাশয়, তাদের নিকটে গেলে সাধ হয় এই নদীর সান্নিধ্যে জীবন কাটাই। এই মরুভুমিতেও আছেন এমন মানুষ কেউ কেউ স্মিত হাস্যময়- তাদের নিকটে গেলে মনে হয় এই মনীষার আলোয় উদ্ভাসিত হই।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
এ জীবন আমার নয়, আমি বেঁচে আছি অন্য কোনো পাখির জীবনে, কোনো উদ্ভিদের জীবনে আমি বেঁচে আমি লতাগুল্ম-ফুলের জীবনে; মনে হয় চাঁদের বুকের কোনো আদিম পাথার আমি ভস্মকণা, ভাসমান একটু শ্যাওলা আমি; এই যে জীবন দেখছো এ জীবন আমার নয় আমি বেঁচে আছি বৃক্ষের জীবনে, পাখি, ফুল, ঘাসের জীবনে। আমি তো জন্মেই মৃত, বেঁচে আছি অন্য এক জলের উদ্ভিদ- আমার শরীর এইসব সামদ্রিক প্রাণীদের সামান্য দেহের অংশ, আমি কোটি কোটি বছরের পুরাতন একটি বৃক্ষের পাতা একবিন্দু প্রাণের উৎস, জীবনের সামান্য একটি কোষ; এ জীবন আমার নয় আমি সেইসব অন্তহীন জীবনের একটি জীবন, আমি বেঁচে আছি অন্য জীবনে, অন্য স্বপ্ন-ভালোবাসায়।
মহাদেব সাহা
প্রকৃতিমূলক
আকাশে ওই মেঘের ভরা নদী- নীল সরোবর বইছে নিরবধি; আকাশে মেঘ স্নিগ্ধ জলাশয় আজ জীবনে কেবল দুঃসময়; আকাশে ওই স্বর্ণচাঁপার বন, দূর পাহাড়ে মেঘের সিংহাসন; নদীর তলায় চাঁদের বাড়িঘর একলা কাঁদে বিরহী অন্তর। আকাশে ওই পাখির ডাকঘর ভালোবাসায় জড়ায় পরস্পর; জলের বুকে চাঁদের ছায়া পড়ে ডাক শুনি কার বাহিরে অন্তরে; আকাশে মেঘ অথই জলাশয় এবার গেলে ফিরবো না নিশ্চয়!
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
তোমাকে ধরবে না এই কালো পাটকেলে কামিজে খুলে এই অস্থায়ী পোশাক পঁচিশ-বছর-ভেজা জরাজীর্ণ পাখা আঁধারে রোদ্দুরে জমা শ্লেষ্মা-বসা বুকের ভিতরে অন্য বুক তুলে নিয়ে অন্য স্তব্ধ বিস্মিত হৃদয়, হৃদয়হরণ ভালোবাসা ও প্রত্যয়ে তোমাকে ধরবো এই মেদমজ্জা মাংসের ভিতরে, অন্য পারে। এই হাত হবে না তখন আর স্থুল মাংসের প্রতীক পাবে স্বতন্ত্র আকৃতি তারও অধিক ব্যঞ্জনা, কোনো শুভার্থী সন্ন্যাসী, কোনো কামমুক্ত স্বতন্ত্র পুরুষ কোনো সৃষ্টিস্পর্শ মর্মমুখরতা, কোনো আদিম সন্ন্যাস! ততো দিন শুধু ভ্রমণের কাল অর্থাৎ ততোদিন তোমার অপেক্ষা। এই অপেক্ষায় অপেক্ষায় পাখা আরো জীর্ণ হবে চোখ আরো হবে অন্ধ অনুজ্জ্বল আরো ক্ষীণ অবসন্ন হবে প্রাণ হবে অধিক বিবর্ণ ওষ্ঠাগত, শৈশব থেকে এ যৌবন অর্থাৎ বন্দী থেকে এ বাউল এক স্বপ্ন থেকে জাগরণ চালাক চতুর ভিন্ন এক দেশের বাসিন্দা ; সেও কালো পাটকেলে কামিজ এই যৌবনের ঘামমাখা কাঁথা এও বদলাতে হবে, এই পঁচিশ-বছর-ভেজা জরাজীর্ণ পাখা যৌবনের ছেঁড়া এই বেশবাস ফেলে পুনরায় শৈশবের দিকে যাত্রা, শস্যারম্ভ তুমুল সন্ন্যাসী তবু শুভার্থী স্বাধীন, তখন তোমার চুলে সমস্ত শরীরে এই সোনালি শস্যের স্পর্শ এঁকে দেবো আর দেখো নারী বাঘ ঈশ্বর ও স্বর্গীয় বিষ নিঃসঙ্কোচে মানুষের মতন খেয়েছি।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তোমার দুহাত মেলে দেখিনি কখনো এখানে যে ফুটে আছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গোলাপ, তোমার দুহাত মেলে দেখিনি কখনো এখানে যে লেখা আছে হৃদয়ের গঢ় পঙক্তিগুলি। ফুল ভালোবাসি বলে অহঙ্কাল করেছি বৃথাই শিল্প ভালোবাসি বলে অনর্থক বড়োই করেছি, মূর্খ আমি বুঝি নাই তোমার দুখানি হাত কতো বেশি মানবিক ফুল- বুঝি নাই কতো বেশি অনুভূতিময় এই দুটি হাতের আঙুল। তোমার দুখানি হাত খুলে আমি কেন যে দেখিনি, কেন যে করিনি পাঠ এই শুদ্ধ প্রেমের কবিত। গোলাপ দেখেছি বলে এতোকাল আমি ভুল করেছি কেবল তোমার দুইটি হাত মেলে ধরে লজ্জায় এবার ঞাকি মুখ। তোমার দুইটি হতে ফুটে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ গোলাপ, তোমার দুইটি হতে পৃথিবীর একমাত্র মৌলিক কবিতা।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তোমার কাছে আমি যে কবিতা শুনেছি এখন পর্যন্ত তা-ই আমার কাছে কবিতার সার্থক আবৃত্তি; যদিও তুমি কোনো ভালো আবৃত্তিকার নও, মঞ্চেও তোমাকে কেউ কখনো দেখেনি, তোমার কণ্ঠস্বরও এমন কিছু অসাধারণ নয় বরং তুমি অনেক সাধারণ শব্দই হয়তো এখনো ভুল উচ্চারণ করো যেমন …… না থাক, সেসব তালিকা এখানে নিষপ্রয়োজন, অনেক কথাতেই আঞ্চলিকতার টান থাকাও অস্বাভাবিক নয় কিন্তু তাকে কিছু এসে যায় না, তোমার এসব ত্রুটি সত্ত্বেও তোমার কাছেই আমি কবিতার উৎকৃষ্ট আবৃত্তি শুনেছি। এমনকি ভুল উচ্চারণ ও আঞ্চলিক টানেও কবিতা যে কখনো এমন অনবদ্য ও হৃদয়গ্রাহী হতে পারে তা আমি এই প্রথম তোমার কাছে কবিতা শুনেই বুঝলাম।কবিতা যে কতোটা আবৃত্তিযোগ্য শিল্প আর কতোখানি মন্তআকুল-করা ভাষা তাও আমি এই প্রথম প্রত্যক্ষ করলাম যেদিন তুমি আমার কানের কাছে মুখ এনে একটি কবিতা শোনালে। সেদিন থেকেই বুঝলাম কবিতার সার্থক আবৃত্তি আসলে বুকের ভিতর কেবল তুমিই সেই আবৃত্তি করতে পারো।কোনো কবিতার এর চেয়ে ভালো আবৃত্তি আর কিছুই হতে পারে না যদি সেই কবিতা তোমার মতো কোনো সহৃদয় পাঠিকা আবৃত্তি করে কবির কানে কানে তখন একসঙ্গে দশ লক্ষ মৌমাছি বুকের মাঝে ওঠে গুঞ্জন করে এক লক্ষ প্রজাপতি এসে ঋড়ে বসে কঁঅধে আর বাহুতে আরো এক লক্ষ পাখি একসাথে ওঠে গান গেয়ে, এর চেয়ে ভালো আবৃত্তি আমি আর কোথাও শুনিনি যদিও তুমি কোনো ভালো আবৃত্তিকার নও সেদিন খুব ভয়ে ভয়ে আর সঙ্কোচ ধীরে ধীরে আবৃত্তি করেছিলে আমার একটি ছোট্ট কবিতা তার সবটিুকু শেষ করেছিলে কি না তাও আজ আর ঠিক মনে নেই, কিন্তু এটুকু মনে আছে এর চেয়ে ভালো আবৃত্তি আর কিচু হতে পারে না তোমার সেই সলজ্জ গোপন আবৃত্তির মধ্যেই সম্পূর্ণ ও সফল হয়েছিলো কবিতাটি; কবিতা বাঁচে ভালোবাসায়, কেবল ভালোবাসায়।
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
তুমি ভয় পাবে, ভয়ে ভীত হবে বলে কোনোদিন মৃত্যুর বর্ণনা করি নাই, কোনো দুঃখের প্রসঙ্গ উত্থাপন করি নাই, মুতি ম্লান হবে, তুমি অশ্রুসিক্ত হবে তাই কোন রাজার দুলাল গেলো বনে, কোন বৃক্ষের মাথায় হলো বজ্রপাত, কোনখানে ভূমিকম্পে কতো মানুষের প্রাণহানি হলো এসব কিছুই ব্যক্ত করি নাই, ব্যাখ্যা করি নাই। তুমি লজ্জায় হেঁট হবে তাই বলি নাই কুৎসিত কাহাকে বলে, পথের ভিক্ষুক, অন্ধ, অশ্লীল মাতাল এসবের নামোল্লেখ করি নাই- বলি নাই পৃথিবীর তিনভাগ জল মাত্র এক ভঅগ স্থল। তুমি ভীত হবে, আতঙ্কিত হবে বলে বলি নাই দোজখ কেমন সংসারের নিষ্ঠুরতা, নৃশংসতা কি কি তুমি দুঃখ পাবে, মর্মাহত হবে বলে বলি নাই পৃথিবীর তিন ভাগ জল মাত্র এক ভাগ স্থল। সর্বদাই গোলাপের প্রতি চেয়ে তোমাকে বলেছি এই পৃথিবী এমন নির্দোষ পূর্নিমার প্রতি অঙ্গুলি নিদেৃশ করে বলেছি এই পৃথিবী এমনি শিশুর দিকে চেয়ে, সুন্দরের দিকে চেয়ে বলেছি পৃথিবী এই এমন এমন; তুমি ভয় পাবে, ভীত হবে বেল কোনো মৃত্যু, শোক ও দুঃখের উচ্চারণ করি নাই, এই সত্য কোনোদিন বলি নাই পৃথিবীর তিনভাগ জল মাত্র একভাগ স্থল।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তোমাকে লিখবো বলে একখানি চিঠি কতোবার দ্বারস্ত হয়েছি আমি গীতিকবিতার, কতোদিন মুখস্ত করেছি এই নদীর কল্লোল কান পেতে শুনেছি ঝর্ণার গান, বনে বনে ঘুরে আহরণ করেছি পাখির শিস্ উদ্ভিদের কাছে নিয়েছি শব্দের পাঠ; তোমাকে লিখবো বলে একখানি চিঠি সংগ্রহ করেছি আমি ভোরের শিশির, তোমাকে লেখার মতো প্রাঞ্জল ভাষার জন্য সবুজ বৃক্ষের কাছে জোড়হাতে দাঁড়িয়েছি আমি- ঘুরে ঘুরে গুহাগাত্র থেকে নিবিড় উদ্ধৃতি সব করেছি চয়ন; তোমাকে লিখবো বলে জীবনের গূঢ়তম চিঠি হাজার বছর দেখো কেমন রেখেছি খুলে বুক।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
আর কিছুই হই বা না হই হই যেন ঠিক হৃদয়বোধ্য এই যে বুকে অশ্রু-আবেগ, জলের ধারা অপ্রতিরোধ্য; আকাশে এই মেঘ জমে আর পাতায় জমে শিশির কণা, এই জীবনে তুমি আমার যা কিছু এই সম্ভাবনা। সব ছেড়েছি তুমিই কেবল এখন আমার অগ্রগণ্য, আর কী চাই হই যদি এই তোমার ভালোবাসায় ধন্য! সব মুছে যাই, সব ঝরে যায় কালের ধারা অপ্রতিরোধ্য, থাকবে না আর অন্য কিছুই কেবল যা এই হৃদয়বোধ্য।
মহাদেব সাহা
রূপক
শুভাশিস, তোমাকে খুঁজছি আমি হরিচরনের যতার্থ বানানে লিখে নাম, উচ্চারণ অভিধান ঘেঁটে সঠিক মাত্রায় ডেকে ডেকে তোমাকে খুঁজছি আমি শুভাশিস, এই দুঃসময়ে যখন সকল মানবিক স্রোতদারা মুস্ক হয়ে যায়, নেমে আসে দিবসে-নিশীথে দীর্ঘ জিরাফের গ্রীবা। তোমাকে খুঁজছি আমি যেন সেই শৈশবের নদী আমার মায়ের দুটি স্নেহময় হাত, যেন একটি প্রাচীন বৃক্ষ, তুলসীমঞ্চ, সন্ধ্যাদীপ সুফী দরবেমের ধ্যানী দৃষ্টি; তোমাকে খুঁজছি আমি শুখাশিস সমস্ত জীবন। শুভাশিস, তোমাকে খুঁজছি আমি সকালের চোখে নক্ষত্রের নিপুণ মুদ্রায়, মানুষের গাড় কণ্ঠস্বরে, শ্রাবণের অঝোর বর্ষণে আর চৈত্রের উদাস জ্যোৎ্লায় তোমাকে খুঁজছি আমি কতো লক্ষ সহস্র বছর। তোমাকে খুঁজছি আমি শুভাশিস, সবখানে লোকালয়ে, বৃক্ষপত্রে- শহরের কংক্রিটের মাঠে এই দুঃসময়ে কোথায় তোমার দেখা পাই; শুভাশিস, তুমি নিরুদ্দেশ সেই কবে থেকে।
মহাদেব সাহা
শোকমূলক
বলেছিলে চিঠি দিও, চিঠি দিই নাই তোমাকে না-লেখা চিঠি প্রত্যহ পাঠাই! তুমি কি পাও না তবে, বোঝো না কি ভাষা, লেখা কি অস্পষ্ট খুবই! কিন্তু ভালোবাসা তাও কি যায় না পড়া? বানান কি ভুল? নদী বয় পাখি গায় তবু ফোটে ফুল! তুমি কি এতোই দূরে এইসব স্মৃতি তোমাকে দেয় না কভু অনন্ত উদ্ধৃতি? লোকে বলে মৃত তুমি আমি দেখি নাই আমার না-দেখা দিয়ে তোমাকে সাজাই বন্ধু প্রিয়, জীবনের সঙ্গী প্রতিদিন, আমাদের কোনো স্মৃতি হয়নি মলিন। তোমার রুপালি মুদ্রার রেখে গেছো জমা তাতে যতো জল ঢালি জন্ম নেয় ক্ষমা প্রেম সুরভিত হয়; উদ্যানে উদ্ভিদ মেঘ নামে, বষ্যা হয়, ফিরে আসে শীত! তোমাকে যে চিঠি লিখি রাত্রি তার খাম আকাশ রঙিন প্যাড তাতে লিখি নাম !
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অর্থ-পদ চায় বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণসিংহাসন জয়ের শিরোপা আর খ্যাতির সম্মান, কে চায় সোনার খনি তোমার বুকের এই স্বর্ণচাঁপা পেলে? তোমার স্বীকৃতি পেলে কে চায় মঞ্চের মালা কে চায় তাহলে আর মানপত্র তোমার হাতের চিঠি পেলে, তোমার স্নেহের ছায়া পেলে বলো কে চায় বৃক্ষের ছায়া তোমার শুশ্রূষা পেলে কে চায় সুস্থতার ছাড়পত্র বলো, বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ চায় শ্রেষ্ঠ পদ কে চায় তাহলে বলো স্বীকৃতি বা মিথ্যা সমর্থন, তোমার প্রশ্রয় পেলে কে চায় লোকের করুণা বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণমুদ্রা কিংবা রাজ্যপাট? বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অন্য কিছু চায়, কে আর তোমার বুকে স্থান পেলে অন্যখানে যায়!
মহাদেব সাহা
ভক্তিমূলক
নখরে জ্বালিয়ে রাখি লক্ষ্যের দীপ্র ধনুক যেন এক শব্দের নিষাদ এই নির্মল নিসর্গে বসে কাঁদি, তবু সেই নির্মম শব্দাবলী ছিঁড়ে আনতে পারি না বলে সুতীক্ষ্ণ অনুযোগ হতে অব্যাহতি দিন; এই শোকের শহরে আমি যার কাছে চাই ফুল, কিছু মনোরম শোভা, যেসবের বিসতৃত বর্ণনা আমি আপনাকে লিখতে পারি, সে আমার হাতে শুধু তুলে দেয় দুঃখের বিভিন্ন টিকিট। আমি চাই প্রত্যহ আপনাকে লিখতে চিঠি, আমি চাই প্রতিদিন লিখতে এই রক্তের গভীর ইচ্ছে, মর্তান্তিক অনুভবগুলি আমার সবুজ সুখ, কোমল আনন্দ, নির্জন কান্নার স্বর একাকী হাঁটতে পথে যেসব দুঃখ দিয়ে ভরে নিই যমজ পকেট ঢাকার এইসব রঙিন দোকান হতে কিনতে পারিনে আমি একেকটি সুখের সংসার, কাঠের ঘোড়া, সোনালি চাবুক, তাই কাঁদি শৈশবের শ্যামল নদীর উপাখ্যান ভেবে, যে স্বরে কাঁদি আমি সঙ্গিহীন মধ্যরাতে সরকারী গোরস্থানে কিংবা আমার গোপন ঘরে ফিরে এসে জ্বালাই দিব্যমোম, শোকের গর্তে শুয়ে কাঁদি, কিংবা যখন পার্কের বেঞ্চে বসে ফেরেববাজ আড্ডা দিই, ফালতু ফক্কর মিলে অনেকক্ষণ অযথা হাসি, টিটকিরি দিই, অনগৃল বিদ্রূপের থুথু ছুঁড়ে উল্লসিত হই, তবু কিছুতেই পারিনে আমি এইসব সুখদুঃখে আপনাকে লিখতে চিঠি ; শুনুন জনক, আমি চিরদিন শব্দের কাঙাল। আজীবন তাই আপনাকে লিখি শুধু একই চিঠি, ভালো আছি, ইত্যাকার কুশল সংবাদ অথচ প্রতিদিন ভুগি শিরপীড়া, বুকে কাশি, অবিরাম জ্বর- আমার রুক্ষ চুলে বিলি কাটে দুঃস্বপ্নের হাত, এসব খবর কি দৈনন্দিন লেখা যায়! কী করে লিখবো বলুন, ঘরে একা দুঃসংবাদে কাঁদবে জননী। আজীবন লিখেছি তাই একই চিঠি, সেই মিথ্যে মর্মহীন একই চিঠি! হে জনক, সেই নির্র্মম শব্দ নেই এখানে, যা দিয়ে বাজাতে পারি কান্নার করুণ কণ্ঠ, নক্ষত্রবীথির সুদূর নীলিমা হতে আমি তুলে আনতে পারিনে অমল শব্দের বিভা, অন-রঙ্গ ধ্বনি আত্মার নিঃসঙ্গ স্বর তাই আমি বোঝাতে পারিনে, হে জনক, পূজনীয় জনক আমার, ইচ্ছের একটি চিঠি আজো আমি লিখতে পারিনি।
মহাদেব সাহা
প্রকৃতিমূলক
ফুটেছে ফুল ঠোঁটের মতো লাল আকাশে চাঁদ- বিরহী চিরকাল; কে যেন একা গাইছে বসে গান সন্ধ্যা নামে, দিনের অবসান। দুর পাহাড়ে শান্ত মৃদু পায়ে রাত্রি নামে স্তব্ধ নিঝুম গাঁয়ে; শূন্যে ভাসে মেঘের জলাশয় এই জীবনে সবকিছুইতো সয়। বিরহী চাঁদ মোমের মতো গলে বুকের মাঝে কিসের আগুন জ্বলে; মন পড়ে রয় কোন অজানালোকে নিজেকেই সে পোড়ায় নিজের শোকে। ফুটেছে ফুল ঠোঁটের মতো লাল বিরহী চাঁদ বিরহী চিরকাল; ফুটেছে ফুল বিরহী তবু চাঁদ, বাইরে আলো, ভেতরে অবসাদ
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
সবখানে ব্যর্থ হয়ে যদি যাই তুমিও ফেরাবে মুখ স্নিগ্ধ বনভূমি ক্ষুধায় কাতর তবু দেবে না কি অনাহারী মুখে দুটি ফল? বড়োই ব্যথিত যদি কোনো স্নেহ ঝরাবে না অনন্ত নীলিমা! সবাই ফেরাবে মুখ একে একে, হয়তোবা শুষ্ক হবে সব সমবেদনার ধারা তুমিও কি চিরপ্রবাহিণী নদী দেবে না এ-তৃষিত অঞ্জলি ভরে জল? আমার মাথায় যদি ঝরবে না কোনো শান্তিবারি তবে কেন মেঘদল! সব সেবাশ্রম, স্বাস্থ্যনিবাস যদি করে অবহেলা, রোগে একফোঁটা না দেয় ওষুধ তোমার ভেষজবিদ্যা দিয়ে আমাকে কি সুস্থ করে তুলবে না প্রকৃতি? খোলা রাখবে না স্যান্যাটোরিয়াম? উদ্ভিদ দেবে না ঘ্রাণ নাকে মুখে যাতে পুনরায় জ্ঞান ফিরে আসে। উৎসবের সব বাঁশি যদি থেমে যায়, কেউ দয়াপরবশ হয়ে আর না শুনায় গান পাখি তুমি শোনাবে না তোমার কূজন কলগীতি পাতার মর্মরে বেজে উঠবে না ভৈরবী বেহাগ! যদি সবার লাঞ্ছনা পাই, সকলের রুক্ষ আচরণ তুমিও কি মোছাবে না মুখ, তোমারও আঁচলখানি হবে নাকি দয়ার্দ্র রুমাল? সবাই ফেরলে মুখ তুমি ফেরায়ো না, দুঃখ পাবো!
মহাদেব সাহা
স্বদেশমূলক
কখন যে এভাবে তোমার ব্যাকুলতাগুলি ভরে দিয়োছো আমার বাক্সে হয়তো মনের ভুলে শীতবস্ত্রের সাথে এ-কনকচাঁপার ঝাড় আর সঙ্গোপনে চোখের জলের এই উদাত্ত ফোয়ারা! বার্লিনে তোমার এই ব্যাকুলতাগুলি দিয়ে আমি কী করবো! এতো মনোযোগ দিয়ে তুমি কিনা শেষে সব ভুল দ্রব্যে ভরে দিলে এই বাক্স কোথায় শীতের জামা দেবে কিছু এতো দেখি কেবল আমার বাক্সভর্তি দাউদাউ করছে সবুজ, ডালা খুলে তাকাতেই একঝাঁক রাঙা মেঘ আর শাদা জুঁই আমাকে বিহ্বল করে তোলে। কোথায় তোমার টুথব্রাশ আরে শেভিং ক্রীম কোথায় সেন্টের শিশি সোপকেস জুড়ে কী শাদা গোলাপ ফুটে আছে, কোথাও তোমার আশঙ্কায় আঙুল কেঁপেছে কোথাও উলের গেঞ্জিটির পাশে পড়ে আছে একগুচ্ছ ভীরু চুল কতোবার যে লুকাতে চেয়েছো তোমার কান্না আর তুমি তো জানো না তখনই যে কীভাবে শিশিরসিক্ত হয়ে উঠেছে রুমাল! বার্লিনে তোমার এই ব্যাকুলতাগুলি নিয়ে আমি কী করি! আমার এ-উদাসীন বাক্সের ভিতর কখন যে তুমি এই প্রজাপতিটিকে বসিয়ে রেখেছো জামার ভাঁজের নিচে দেখি গুনগুন করছে মৌমাছি, বাক্সে হাত দিতে সাহস করিনে আর পাছে বিজন ঘুঘুর কণ্ঠে কোনো উদাস দুপুর বেজে ওঠে তুমি আর কিছুই পেলে না খুঁটে খুঁটে এইসব বেদনায় ভরে দিয়েছো আমার বাক্স! আর একি বিদেশী মুদ্রাই বা কই তোমার ভালোবাসার ব্ল্যাঙ্ক চেকখানি বাক্সের তলায় এককোণে কেমন অযত্নে পড়ে আছে! অবশেষে তুমি কখন যে একখানি বাংলাদেশের আকাশ এমন নিখুঁত ভাঁজ করে ভরে দিয়েছো আমার বাক্সে আর তোমার এ-ব্যাকুলতাগুলি, বলো তো বার্লিনে এই নিয়ে আমি কী করবো!
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তোমার বিষণ্ন মুখ দেখে মনে হয় সব ফুল ঝরে গেছে পৃথিবীতে বড়ো দুঃসময়!
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তোমাকে বিশদ ব্যাখ্যা করবো কি বর্ণনায়ই বুঝেছি অক্ষম নাই সে কিঞ্চিৎ ভাষাজ্ঞান, মাত্রাবোধ এমনকি শব্দেরও শৃঙ্খলা সে-বিদ্যা আয়ত্তে নাই অনায়াসে পাঠ করি তোমার চিবুক কিংবা ধরো প্রসিদ্ধ নগর দেখে দেয় কেউ যে-রকম গাঢ় বিবরণ, দর্শনীয় বস্তু আর সুপ্রাচীন স্থানের তালিকা, সে-রকম তোমার বিশদ ব্যাখ্যা জানি আমি পারবো না কখনো। তোমাকে বিশদ ব্যাখ্যা করবো কি এখনো তো হয়নি অক্ষর- জ্ঞানই কিছু শব্দার্থ হয়নি জানা কি তোমার ঠোঁট কিংবা চোখের আভাস এমন যোগ্যতা নাই তোমার সামান্য অংশ অনুবাদ করি কিংবা একটি উদ্ধৃতি দিই যে-কোনো বিশেষ অংশ থেকে এখনো হয়নি পড়া তোমার যুগল ভুরু, সূক্ষ্ম তিল একগুচ্ছ চুলের বানান। হয়নি মুখস্ত জানি একটি আঙুল তোমাকে বিশদ ব্যাখ্যা করবো কি এখনো তো হয় নাই বর্ণমালা চেনা, কি তোমার অনুভূতি কি তোমার বিশুদ্ধ আবেগ, সেসবের জানার তো প্রশ্নই ওঠে না, এখনো শিখিনি উচ্চারণ। তোমাকে বিশদ ব্যাখ্যা করবো কি এখনো তো খুলি নাই পুঁথি পাঠাভ্যাসই হয় নাই কীভা করবো বলো নিখুঁত তুলনা কীভাবে দেখাবো মিল, অনুপ্রাস, শব্দের ব্যঞ্জনা তোমার দেহের কাছে মূখ্য ছাড়া আর কিছু নই! তেমন যোগ্যতা নাই তোমাকে সামান্যতম মর্মোদ্ধার করি এখনো হয়নি পড়া কাদামাটি, পাঁচটি আঙুল রহস্যের কথা থাক তোমার সরল অর্থ তাই খুঁজে পাইনি কোথাও, এখনো হয়নি শেখা বাস্তবিকই মূর্তি নয় পোড়ামাটি কিংবা অঙ্গার তোমাকে বিশদ ব্যাখ্যা করবো কি আদিঅন্ত নিয়ত আঁধার।
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
আমি যে এখন কী করি না করি আর কখন কোথায় যাই কিছুই জানি না হয়তোবা পিপাসায় মুখে দেই কঠিন পাথর, জল দেখে আমার দুচোখে শুধু রক্তস্রোতের দৃশ্য ভাসে তাই তো এখন আমি সূর্যোদয় হলে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যাই, সারারাত আতঙ্ক ও আশঙ্কায় কাঁপি। দেখি আমার চোখের সামনে পুড়ে যায় শত শত মানুষের ঘর সেই নির্দয় আগুনে পোড়ে শস্য, দুগ্ধবতী গাভী, অসহায় মানবসন্তান আর সেই সঙ্গে পুড়ে খাক হয় মনুষ্যত্ব, বিবেক ও শুভ মূল্যবোধ। আমার চোখের সামনে দেখি খসে পড়ে তারা, শীতের দেশের অতিথি পাখির মতো দেখি তীরবিদ্ধ হয় মানুষের বুক। আমি কবিতারর খাতায় এখন তাই চেয়ে দেখি সারা পাতা জুড়ে সেই কুতুবদিয়ার অগ্নিদগ্ধ শিশুদের লাশ পড়ে আছে, পড়ে আছে দূর হিমাচল প্রদেমের কোনো কিশোরের রক্তাপ্লুত দেহ কিংবা বসনিয়ার কোনো ধর্ষিতা নারীর ছিন্নবস্ত্র, একগোছা চুল- এখানে ঘাসের বুকে শিশিরের পরিবর্তে তাই বসনীয় কোনো জননীর অশ্রুবিন্দু জমে আছে; এইখনে এই ধ্বংস, মৃত্যু, বিভীষিকা ও নিহত আত্মার পাশে, আগুন জ্বালিয়ৈ ভস্মসাৎ করা মানুষের এই ভণ্ডুল সংসার আর দুঃখের পাশে কীইবা করতে পারি আমি, ফেলতে পারি ক’ফোটা চোখের জল, মোছাতে পারে কয়টি মুখের ব্যথিত বিষাদঅশ্রু ক’জনের অনাহারী মুখে দিতে পারি ক্ষুধার দুমুঠো অন্ন! আমি আজ কী যে করি, কখন কোথায় যাই সন্ধ্যায় হয়তো করি প্রাতঃরাশ, মধ্যাহ্নে জ্বালাই ঘরে আলো- মনে মনে ভাবি প্রকৃতই সুস্থ হলে এইসব দেখে অনেক আগেই সুতার ওপারে চলে যাওয়া স্বাভাবিক ছিলো, কেবল উন্মাদই পারে পৃথিবীর এই ছিন্নভিন্ন রূপ দেখে সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকতে এখনো।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
ফুলের পাশেই আছে অজস্র কাঁটার পথ, এই তো জীবন নিখুঁত নিটোল কোনো মুহূর্ত পাবো না, এখন বুঝেছি আমি এভাবেই সাজাতে হবে অপূর্ণ সুন্দর; একেবারে মনোরম জলবায়ু পাবো না কখনো থাকবে কুয়াশা-মেঘ, ঝড়েরআভাস কখনো দুলবে ভেলা কখনো বিরুদ্ধ স্রোতে দিতে হবে সুদীর্ঘ সাঁতার, কুয়াশা ও ঝড়ের মাঝেই শীতগ্রীষ্মে বেয়ে যেতে হবে এই তরী; যতোই ভাবি না কেন সম্পূর্ণ উজ্জল কোনো সুসময় পেলে ফলাবো সোনালি ধান্য, সম্পন্ন করবো বসে শ্রেষ্ঠ কাজগুলি- কিন্তু এমন নিটোল কোনো জীবন পাবো না।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তুমি যদি আমাকে না ভালোবাসো আর এই মুখে কবিতা ফুটবে না, এই কণ্ঠ আবৃতি করবে না কোনো প্রিয় পঙ্‌ক্তিমালা তাহলে শুকিয়ে যাবে সব আবেগের নদী। আমি আর পারবো না লিখতে তাহলে ...অনবদ্য একটি চরণ, একটিও ইমেজ হবে না রচিত, তুমি যদি আমাকে না ভালোবাসো তবে কবিতার পান্ডুলিপি জুড়ে দেখা দেবে ঘুরে ঘুরে অনাবৃষ্টি, খরা। তুমি যদি না তাকাও এই চোখ দেখবে না কিছু উজ্জ্বল আলোর ভোর ঘন অন্ধকারে ঢেকে যাবে, সন্ধ্যাতারা মনে হবে মৃত নিষ্পলক চোখ যদি ফিরে না তাকাও মর্মে আর পল্লবিত হবে না কবিতা। তুমি যদি না দাও চুম্বন এই মুখে ফুটবে না ভাষা মরা গাঙে জাগবে না ঢেউ, দুই তীরে প্রাণের স্পন্দন, হবে না শস্যের মাঠে শ্রাবণের ব্যাপক বর্ষণ হৃদয়ে হৃদয়ে আর অঙ্কুরিত হবে না কবিতা, বাজবে না গান। তুমি যদি আমাকে না ভালোবাসো আর প্রকৃতই আমি আগের মতন পারবো না লিখতে কবিতা আমার আঙুলে আর খেলবে না জাদুর ঝিলিক, এই শাদা পৃষ্ঠা জুড়ে ফুটবে না জুঁই আর চাঁপা। একবার ভালোবেসে দেখো, একবার কাছে ডেকে দেখো আবার আগের মতো কীভাবে ফুটাই এক লক্ষ একটি গোলাপ অনায়াসে কীভাবে আবার অনুভূতি করি সঞ্চারিত, একবার ভালোসেবে দেখো আবার কীভাবে লিখি দুহাতে কবিতা।
মহাদেব সাহা
প্রকৃতিমূলক
দক্ষিন সমুদ্রে যাবো একা যাবো, সমুদ্র সান্নিধ্যে যাবো একা যাবো, একাকীই যাবো সেখানে সমুদ্র গড়ে মাটির ত্রিপল খুলে ছাউনি বিছাবো জলেরই বিছানা হবে, কাঁথা হবে, পাড়সুদ্ধ হবে হাতের মুদ্রায় ওই সবুজ বর্ষাতি তাও হবে আঙুলেই বাড়ির নকশা হবে, চৌচাল মেলানো ওই দেয়াল কার্ণিশ হবে সমুদ্র্লানের আগে হাতের মুষ্টি খুলে ঝরোকা বানাবো। দক্ষিণ সমুদ্রে যাবো কি কি আমি জাদু জানি সমস্ত দেখাবো সাগরবালিকা আসবে, উড়ন্ত মাছেরা আসবে জলের মূর্তিও আসবে, ওরা আসবে, সেখানে রঙিন জলে সকলের শরীর ধোয়াবো ওই জলে গা ধুয়ে রমণী পুরুষ হবে, পুরুষ রমণী আহা সে কেমন হবে? বেশ হবে! ভালোই তো হবে। আমি কি কি জাদু জানি ওসব দেখাবো, আঙুলে আরশি করে চাঁদের চেয়েও ভালো চন্দ্রিমা দেখাবো নারীর চেয়েও নারী প্রতিমা দেখাবো দক্ষিণ সমুদ্রে যাবো, সমুদ্রেই যাবো।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
আমাদের সেই কথোপকথন, সেই বাক্যালাপগুলি টেপ করে রাখলে পৃথিবীর যে-কোনো গীতি কবিতার শ্রেষ্ঠ সঙ্কলন হতে পারতো; হয়তো আজ তার কিছুই মনে নেই আমার মনে সেই বাক্যালাপগুলি নিরন্তর শিশির হয়ে ঝরে পড়ে, মৌমাছি হয়ে গুনগুন করে স্বর্ণচাঁপা আর গোলাপ হয়ে ঝরতে থাকে; সেই ফুলের গন্ধে, সেই মৌমাছির গুঞ্জনে আর কোকিলের গানে আমি সারারাত ঘুমাতে পারি না, নিঃশ্বাস ফেলতে পারি না, আমাদের সেই কথোপকথন, সেই বাক্যালাপগুলি আমার বুকের মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকার সমস্ত সোনার খনির চেয়েও বড়ো স্বর্ণখনি হয়ে আছে- আমি জানি এই বাক্যালাপগুলি গ্রথিত করলে পৃথিবীর একটি শ্রেষ্ঠ প্রেমের কবিতা হতে পারতো; সেইসব বাক্যালাপ একেকটি হীরকখণ্ড হয়ে আছে, জলপ্রপাতের সঙ্গীত মূর্ছনা হয়ে আছে, আকাশে বুকে অনন্ত জ্যোৎ্লারাত্রির স্নিগ্ধতা হয়ে আছে; এই বাক্যালাপের কোনো কোনো অংশ কোকিল হয়ে গেয়ে ওঠে, কেনো কোনো অংশ ঝর্না হয়ে নেচে বেড়ায় আমি ঘুমাতে পারি না, জেগে থাকতেও পারি না, সেই একেকটি তুচ্ছ শব্দ আমাকে কেন যে এমন ব্যাকুল করে তোলে, আপাদমস্তক আমকে বিহ্বল, উদাসীন, আলুথালু করে তোলে; এই কথোপকথন, এই বাক্যালাপগুলি হয়তো পাখির বুকের মধ্যে পেট করা আছে, নদীর কলধ্বনির মধ্যে ধরে রাখা আছে এর চেয়ে ভালো প্রেমের কবিতা আর কী লেখা হবে!
মহাদেব সাহা
প্রকৃতিমূলক
এই প্রকৃতি একদিন আমাদের গ্রাস করবে জিরাফের মতো গ্রীবা বড়িয়ে অকস্মাৎ, কাঁঠালিচাপার বন, এই জ্যোৎস্নারাত অমলিন নিসর্গের শোভা হানাদার দস্যুর মতো ভয়ঙ্করভাবে ছুটে আসবে আমাদের দিকে,অবরোধ করবে ঘরবাড়ি, শস্যের গোলা খাদ্যভান্ডার লুট করে নিয়ে যাবে আমাদের মুখের গ্রাস ভেঙে ফেলবে যাতায়াতযোগ্য স্থলপথ, এই শান্ত চুপচাপ জলরাশি একদিন ধেয়ে আসবে আমাদের দিকে নিশিডাকাতের মতো ডাক ছেড়ে হামলা করবে চারদিক থেকে ঘিরে হত্যা করবে আমাদের , কেড়ে নেবে নগরকোটালের হাতের বাঁশি, বর্ম, মাথার টুপি, শাদা পোশাক সরল চাষার লণ্ডভণ্ড করবে খামার, শস্যক্ষেত নিশিরাতে গোয়াল থেকে খেদিয়ে নেবে গরুর পাল কালো খোঁয়াড়ে বন্দী করবে একে একে, লুটপাট করবে স্থানীয় মুদির দোকান, সারাগ্রাম কাঠমিন্ত্রির সাজসরঞ্জাম তছনঝ করবে, জলের স্বেচ্ছাচার ছিনিয়ে নেবে গৃহবাসী ভালোবাসা গোঁয়ার ট্রাকচালকদের মতো নিসর্গ আমাদের একদিন ফেলে দেবে গভীর খাদে যেখানে ধসে পড়বে আমাদের এই দিনরাত্রি শক্ত প্রাচীর, বড়ো বড়ো অট্টপালিকা মহেঞ্জোদাড়োর মতো ধ্বংস হবে আমাদের নগরসভ্যতা শাদা হাসপাতাল, পৌরসভা, পার্ক ও খেলার মাঠ বাঁধ ও সেতু ভেঙে আমাদের ভসিয়ে নেবে দুর্ধর্ষ প্লাবন, আকাশ আমাদের বিরুদ্ধে একদিন ষড়যন্ত্র করবে এই কাঁঠালিচাঁপার বন, জ্যোৎস্নারাত, পাখিডাকা নিসর্গ সমুদ্রের বেলাভূমি সবাই, এই আক্রমণকারী প্রকৃতির হাতে একে একে ধ্বংস হবো আমরা শিশু, বৃদ্ধ, যুবা নিসর্গের প্লানে ভাসবো অন্তহীন লাশ!
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
তোমরা সবাই ভয় পাও এই বাইরে যেতে দুয়ার খুলে বাইরে যেতে পথ পেরোতে গাড়ির ভিড়ে বড়ো রাস্তা পার হতে যেই পা বাড়ালে ভয় পাও এই আগুন দেখে বারুদ দেখে দোজখ দেখে ভীষণ রকম গজব দেখে খোদাতালার তোমরা সবাই ভয় পাও এই দাঙ্গা দেখে মড়ক লাগলে মহামারী এমনি কিছুর ভয় পাও ঠিক রাত-বিরেতে অন্ধকারে যাকে তাকে দেখলে হঠাৎ হয় পাও এই সাপের বাঘের চোর-ডাকাতের দৈত্যদানা জলপুলিশের অনেক কিছুর ভয় তোমাদের ভয় তোমাদের বাইরে কেবল চেখের ওপার, আমার এ-ভয় অন্যরকম অন্য কিছুর আমার কিছুর আমার এ-ভয় বাইরে তো নয় ঘরের ভিতর নিজের ভিতর আমার এ-ভয় নিজেকে ভয় আমার এ-ভয় শোবার ঘরে বাথরুমটির ঠাণ্ডা জলের টবের ভিতর দাড়ি কাটার লম্বা ক্ষুরে চায়ের কাপে কাঁটা-চামচে আমার এ-ভয় আলমারিতে বইয়ের তাকে ফুলদানিতে মুখ দেখবার আয়না খুলে ড্রয়ার খুলে আমার এ-ভয় আমার এ-ভয় শত্রুকে নয় প্রিয়ার চোখে নরম ঠোঁটে নিজের দুটি করে মাঝে নখের ভিতর আমার এ-ভয় অন্যরকম অন্যরকম।