poet
stringclasses
137 values
category
stringclasses
21 values
poem
stringlengths
9
18.7k
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
ভুলে-ভরা আমার জীবন, প্রতিটি পৃষ্ঠায় তার অসংখ্য বানান ভুল এলোমেলো যতিচিহ্ন; কোথাও পড়েনি ঠিক শুদ্ধ অনুচ্ছেদ আমার জীবন সেই ভুলে-ভরা বই, প্রুফ দেখ হয়নি কখনো। প্রতিটি পাতায় তাই রাশি রাশি ভুল, ভুল কাজ, ভুল পদক্ষেপ আমার জীবন এ আগাগোড়া ভুলের গণিত, এই ভুল অঙ্ক আমি সারাটি জীবন ধরে কষে কষে মেলাতে পারিনি ফল তার শুধু শূন্য, শুধু শূন্য, শুধু শূন্য। আমি সব মানুষেল মতো মুখস্ত করিনি এই জীবনের সংজ্ঞা, সূত্র আর ব্যাকরণ রচনা বইয়ে পড়া মহৎ জীবনী দেখে আমি কোনোদিন শুরু করিনি জীবন, দেখেছি প্রত্যহ আমি সকালের কাজ বিকেলে কীভাবে পুরোপুরি ভুল হয়ে যায় বিকেলের কাজ রাতের আগেই মনে হয় ভুলের ধুলোতে ছেয়ে গেছে। আমার জীবন এই ভুলে-ভরা দিনরাত্রির কবিতা অসংখ্যা ভুলের নুড়ি ও পাথর হয়েছে থলিতে তার জমা আমার জীবন একখানি স্বরচিত ভুলের আকাশ আমি তার কাছ থেকে কুড়াই দুহাত ভরে কেবল স্বপ্নের হাড়গোড়।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
কেউ জানেনা একেকটি মানুষ বুকের মধ্যে কী গভীর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বেড়ায়- কোনো বিষন্ন ক্যাসেটেও এতো বেদনার সংগ্রহ নেই আর, এই বুকের মধ্যে দীর্ঘশ্বাসের পর দীর্ঘশ্বাস যেন একখানি অন্তহীন প্রগাঢ় এপিক! পাতায় পাতায় চোখের জল সেখানে লিপিবদ্ধ আর মনোবেদনা সেই এপিকের ট্রাজিক মলাট; মানুষের বুকে এতো দীর্ঘশ্বাস, এতো দীর্ঘশ্বাস, কে জানতো!দীর্ঘশ্বাসভরা এই বুকের চেয়ে শীতপ্রধান বিপন্ন অঞ্চল আর কোথাও নেই, এমন হলুদ, ধূসর আর তুষারবৃত! একেকটি মানুষ বুকের মধ্যে কী গভীর দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বেড়ায়, কেউ জানে না।হঠাৎ একসঙ্গে অসংখ্য দুঃখ যদি কখনো কেঁদে ওঠে কিংবা যদি প্রাচীন শিলালিপি থেকে সব শোকের গান সশব্দে বেজে যায়, তাহলে যেমন মধ্যাহ্নের আকাশ সহসা দুঃখে ম্লান হয়ে যাবে গোলাপ হবে কৃষ্ণবর্ণ, তার চেয়েও বিষন্নতা নেমে আসবে মানুষের বুক থেকে এই দীর্ঘশ্বাস যদি বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে। তেমন সম্ভাবনা আছে বলেই মানুষ বুকের মধ্যে দীর্ঘশ্বাস চেপে রাখে তার চোখে নিয়তই জল ঝরে তবু দেখা যায় না;মানুষের ভেতর কতো যে দীর্ঘশ্বাস, জমাট বেঁধে আছে কতো যে ক্রন্দন, পাতা ঝরার শব্দ, মৃত্যুসংবাদ মানুষের বুকের মধ্যে ব্যথিত ব্যাকুল ইতিহাস আর আহত সভ্যতা মেঘের মতো ঘনীভূত হতে হতে একেকটি মর্মান্তিক দীর্ঘশ্বাস হয়ে আছে মানুষ তাকে বয়ে বয়ে দগ্ধ বেঁচে থাকে।একেকটি মানুষ বুকের মধ্যে কী গভীর দীর্ঘশ্বাস বয়ে বেড়ায়, কেউ জানে না। একেকটি মানুষ নিজের মধ্যে কীভাবে নিজেই মরে যায়, হায়, কেউ জানে না!আরও পড়তে – www.kobitacocktail.wordpress.com
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
আমি যখন বলি ভালোবাসি তখন শুদ্ধ হয় জীবন তখন ভাঙা ঘর আবার জোড়া লাগে, শিশুদের কচি মুখের ঘ্রাণে বাতাস ভরে যায় হলুদ চোখ সব সবুজ দেখতে শুরু করে নদীতীরে জেগে ওঠে নতুন চর; খরাশেষে বৃষ্টি নামে, আমি যখন বলি ভালোবাসি। আমি যখন বলি ভালোবাসি তখন শান্তি- আন্দোলন শুরু হয় জাতিসঙ্ঘের প্রাসাদচূড়ায় গলতে থাকে বরফ, লেবাননে বোমা বর্ষণ বন্ধ হয়, প্যালেস্টাইনে ওঠে উল্লাসধ্বনি রুশ-মার্কিন দীর্ঘ বৈঠকে গৃহীত হয় ক্ষেপণাস্ত্র হ্রাসের সিদ্ধান্ত তখনই সবচেয়ে নিরাপদ হয়ে ওঠে মানুষের ভবিষ্যত; বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা কমে আসে, আমি যখন বলি ভালোবাসি। আমি যখন বলি ভালোবাসি তখন শীতের দেশে আসে বসন্ত তখন মরা গাঙে ডাকে জোয়ার, চৈত্রের মাঠে শস্যের হাতছানি, তখন দুকূল-ছাপানো-বর্ষায় চলে পাল তোলা নৌকা অনেকদিন পর ব্ল্যাক আউটের নিষিদ্ধ শহরে আসে পূর্ণিমা সব কাঁটাতারের বেড়া হয়ে ওঠে মাধবীলতার বন; ঘাতকের হাত থেকে ছিটকে পড়ে অস্ত্র, আমি যখন বলি ভালোবাসি। আমি যখন বলি ভালোবাসি তখন পৃথিবীতে সব যুদ্ধ থেমে যায় দুর্ঘটনায় পতিত বিমানের যাত্রীরা নিরাপদে ফিরে আসে, বড়ো বড়ো শহরগুলোর সবচেয়ে কন্টকিত যানজট মুহূর্তে খুলে যায় বিবাহ-বিচ্ছেদের সমস্ত মামলা প্রত্যাহার করে নেয় সব দম্পতি মা শিশুর গালে চুমু খায়, ব্যর্থ প্রেমিক-প্রেমিকারা আবার ঘর বাঁধে; নবজাতকের কান্নায় ভরে ওঠে পৃথিবী, আমি যখন বলি ভালোবাসি।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
ভালোবাসা মরে গেছে গত গ্রীষ্মকালে উদ্যত বাহুর চাপে, ধুলোমাটি কাদা লেগে গায়ে শীতেতাপে ঝরে গেছে তার বর্ণ, মেধা স্পর্শ করে আশি এই প্রেমহীন নারীর শরীর মৃত চুল, উত্তাপবিহীন কিছু বয়সের ধুলো, নীলাঞ্জনশোভিত নারীর মুখ ফিকে থির পলকবিহীন দুই চোখ খেয়ে গেছে পৌষের দুই বুড়ো কাক তাহাকেই ধরে আছি, বেঁধে আছি অসহায় স্তব্ধ আলিঙ্গনে ; সহু বছরের এই রোদবৃষ্টিজলে, ঝড়ে, কুয়াশায় নষ্ট হয়ে গেছে প্রেম, মুখের গড়ন তার, দেহের বাঁধন অজন্তা মূর্তি লাস্য, শিল্পের মতন সেই গূঢ় সম্ভষণ তার কতোখানি বাকি আছে?অবশিষ্ট আছে? তাহারা কি থাকে কেউ অনাদরে উপেক্ষায় সারাদিনে একবেলা জলঢালা মৌন কেয়ারিতে অজ্ঞাত নফর, তাহারা কি থাকে? স্পর্শহীন, পরিচর্যহীন একাকী নিঃসঙ্গ আর কতোকাল দগ্ধ হবে প্রেম।
মহাদেব সাহা
প্রকৃতিমূলক
ভিতর থেকে হয়ে উঠছে তাকেই বলি প্রকৃতি। বাইরে মেঘবৃষ্টি ঝড়ো হাওয়া কেমন শিশুর হাতে কাদামাটিতে গড়া, তার কোনো গ্রহস্ত চেহারা সেই তারই এক ডাকে কেন আমি এমন ঘর ছেড়ে আসবো! আমি এখনো মাঝে মাঝেই তৃষ্ণার্ত, নদীর কাছে করুণা চাইতে যাই, ব্যথিত আমি পাহাড়ের কাছে করুণা চাইতে যাই হয়তো তাদেরও ভিতরে কোথাও এই মানুষের মতো একটা মন আছে, সেই মনটাই প্রকৃতি। না হলে এই সবুজ ঘাস কেন জাজিমের মতো মনে হবে, এই মেঘ মনে হবে মখমলের মতো পাখির ভিতর যা পাখিত্ব নদীর ভিতর যা শুদ্ধতা এর একটা পরিচ্ছন্ন রূপ আছে তাকেই বলি প্রকৃতি। প্রকৃতি এই কাদামাটিতে গড়া, আঁতুড়ঘরের আবেশ মাখানো গন্ধ তবু এই উলুকঝুলুক নয়, কোনো কিছু নয় আরো একটা কিছু ভিতর থেকে গড়ে উঠছে জলমাটি হাওয়া সব মিলেই এই প্রকৃতি কখনো এই গাছ, বিদেশী পাম ট্রী, কখনো শাদা আরো সম্পন্ন শরীর সেইসব ভিন্ন যুবতিরা তাদের সোনালী চুলের স্বাস্থ্যকেই বলি প্রকৃতি তবু এশিয়া ও ইওরোপে তেমন ভিন্ন কোনো প্রকৃতি নেই হয়তো নারীরা এখানে শীতপ্রধান, হয়তো বৃক্ষ কোথাও চিরহরিৎ এই গাছ-পাথর প্রকৃতি নয় আমি অন্য কারো ডাকে ঘর ছেড়ে এসেছি। বাইরে এই মেঘবৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া, এই গাছ-পাথর বহু বছর তাদের পাশাপাশি বেঁচে আছি, তাদের কৃতজ্ঞতা জানানোর কিছু নেই আমার হাতে মেঘ পেয়েছে মহিমা, জল পেয়েছে অবয়ব, পাথর পেয়েছে পূর্ণতা এতোদিন এই কাদামাটির সংসারে এই ঝড়ো হাওয়ায় ভিতর থেকে হয়ে উঠছে এই কাদামাটিতে এই ভালোবাসায় তাকেই বলি প্রকৃতি, এই বেদনাবিধুর!
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
মর্মমূল ছুঁয়ে যায় পুরনো সেই গান, হঠাৎ যেন ঝলসে ওঠে গোপন অভিমান; পথের ধারে কখন ফোটে অচেনা সেই ফুল হয়তো তাকে চিনতে আজো তেমনি করি ভুল; মর্মমূল ছুঁয়ে যায় হারানো সেই মুখ, স্মৃতি আর স্বপ্নে তাই কাঁপছে আমার বুক।
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
এর আগে আর কোনোদিন আমি হইনি এমন মর্মাহত যেদিন তোমার চোখে প্রথম দেখেছি আমি জল, অকস্মাৎ মনে হলো নিভে গেলো সব পৃথিবীর আলো গোলাপবাগান সব হয়ে গেলো রুক্ষ কাঁটাবন। সত্যি এর আগে আর কোনোদিন আমি মর্মাহত হইনি এমন যেদিন প্রথম পথে দেখলাম অনাথ কিশোর এক ক্ষুধায় কাতর কেঁদে মরে, তখনই আমার মনে হলো পৃথিবীতে কোথাও তেমন আর সুখ কিছু নেই ফুলের দোকানগুলি হয়ে গেছে অস্ত্রের গুদাম।আমি আর কোনোদিন মর্মাহত হইনি এমন যেদিন প্রথম দেখি ইতিহাসের প্রতিটি পৃষ্ঠায় রক্ত লেগে আছে, যেদিন প্রথম সবুজ বৃক্ষের দিকে চেয়ে দেখলাম সেখানে লুকিয়ে আছে বিষধর সাপ, নদীর গভীরে চোখ ফেলে দেখি এই জলে দূষণের বিষ, হাঙর-কুমির তখনই দুহাতে ঢেকে মুখ বুঝলাম কতোখানি দুঃখী এই কাছের পৃথিবী। যেদিন প্রথম আমি আকাশেল দিকে চেয়ে দেখলাম মেঘে বজ্র, ক্রূর ঘূর্ণিঝড় অরণ্যে ভীষণ সব পশু, লোকালয়ে খুনী আততায়ী তখনই আমার মনে হলো পৃথিবীর আলো অস্তমিত। এর আগে আমি আর কোেেনাদিন মর্মাহত হইনি এমন যেদিন প্রথম শুনি প্রেমিক অক্লেশে বসিয়েছে ছুরি প্রেমিকার বুকে তখন বুঝেছি পৃথিবীতে দুঃখ ছাড়া চাষবাস হবে না কিছুই। এর আগে কোনোদিন এমন হইনি মর্মাহত যেদিন বৃক্ষের কাছে গিয়ে দেখলাম রক্ত ঝরে বৃক্ষের শরীরে নদীর নিকটে গিয়ে দেখি নেই তার বুকে এতোটুকু তৃষ্ণারও জল তখনই বুঝেছি কতোটা নির্দয় হতে পারে এই ভালোবাসার পৃথিবী। সত্যি এর আগে আর কোনোদিন আমি হইনি এমন মর্মাহত যেদিন দেখেও তুমি চোখ তুলে ফিরে তাকালে না।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
সেদিন সন্ধ্যার কিছু আগে হঠাৎ উঠলো বেজে আমার নিথর টেলিফোন রিসিভার তুলে শুনলাম খুব মৃদু স্বরে যখন একটি ছোটো নাম… মনে হলো এই সূর্যাস্ত উঠলো ভরে ফের ভোরের আলোয় প্রায় অস্তমিত আমি পুনরায় হয়ে উঠলাম যেন উদিত সকাল; কতোকাল নিথর নীরব পড়ে থাকা এই ব্যর্থ টেলিফোন কানায় কানায় ভরে গেলো, হয়ে উঠলো মুহূর্তে যেন চঞ্চল হরিণ; মনে হলো এই টেলিফোনে একসঙ্গে বেজে ওঠে হাজার তারের বীণা বিসমিল্লা খাঁর স্পন্দিত সানাই, হেমন্তের সব অপূর্ব লাবণ্যময গান সহসা আমার মাথার ওপরে মনে হলো এক দিব্য ছায়াময় স্নিগ্ধ নীলাকাশ। বুঝি আর কখনো আমার বুকে ওঠেনি এমন তোলপাড় করা ঝড় চারদিক ঢেকে অঝোর ধারায় নামেনি বর্ষণ। টেলিফোন তুলে শুনি এ যে স্বপ্নপুরীর রহস্যবার্তা একে একে কবিতার অপরূপ শব্দরাজি সদ্যফোটা শিউলির মতো টেলিফোন বেয়ে টুপটাপ শুধু ঝরে পড়ে- কিংবা বর্ষার অজস্র কদমফুলের মতো মনে হয় দূর থেকে ভেসে আসা সেই শব্দগুলি; এইখানে টেলিফোনের সামনে বসে আমি তাই কেবলই আড়ষ্ট হয়ে পড়ি পাই না মোটেও খুঁজে একটিও যোগ্য শব্দ বলি খুব সাধারণ দু’একটি কুশল সংবাদ- অসহায় তোতলার মতো দুটি জড় ঠোঁটে কেবল আটকে যায় কথা মনে হয় জীবনে কখনো আর ধরিনি কারুর টেলিফোন। টেলিফোন হাতে নিয়ে হঠাৎ আমার মনে হলো বুঝি নিঃশ্বাস এক্ষুনি বন্ধ হয়ে যাবে আর একটিও শব্দ বেরুবে না এই নির্বাক নিস্পন্দ কণ্ঠ দিয়ে আমি বুঝি চিরতরে বোবা হয়ে যাবো; আর কেবল আমার বুকের ভেতর বেজে যাবে অন্তহীন এই গাঢ় টেলিফোন। আমি তাই টেলিফোনে কী বলতে কী যে বলেছি কিংবা যা বলা উচিত ছিলো তার কিছুই বলিনি হায় বোকা, টেলিফোনে কেউ কি কখনো এমন সুখের কথা বলে, এমন দুঃখের কথা বলে!
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
আমি কেউ নই, আমি শরীরের ভেতরে শরীর গাছের ভেতরে গাছ, এই অনন্ত দিনরাত্রির মধ্যে একটি বুদ্বুদ; আমি মানুষের মতো কিন্তু মানুষ নই শুধু মুখচ্ছবি মানুষের একটি আদল ছায়ার মানুষ; আমি কেউ নই, কোনোকিছু নই আমি মানুষের মতো এক মুখোশ মানুষ হয়তো জন্মেই মৃত আমি, হয়তো এখন কেবল ছায়া, মানুষের মতো এই ছায়া-মানুষ; আমি কেউ নই, আমি কোনোকিছু নই, আমি ছায়ার ভেতরে শরীর আমি কেউ নই, আমি মানুষের ভেতরে মানুষ, ভেতর-মানুষ।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তোমাকে দুচোখ মেলে দেখেছি যে মাত্র একবার সমস্ত জীবনের শুধু এইটুকু সাফল্য আমার!
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
আমাদের কোনো ফুলের বাগান নেই, তবু পৃথিবীর এই দুঃসময়ে নীলা তার টবটিতে ফুটিয়েছে রজনীগন্ধার কটি কলি, বারান্দার সঙ্কীর্ণ আলোক আর অপ্রচুর বাতাস সত্ত্বেও কেমন ফুটেছে তার হাসি, সজীব ডালটি যেন মনেহয় স্বচ্ছেন্দে উঠেছে বেড়ে হৃদয়ের উর্বর মাটিতে; দুবেলা আমাকে সে দেখায় তার রজনীগন্ধার এই চারা, বলে-আলো ও বাতাসহীন প্রতিকূল পরিবেশেও দেখো কেমন ফুটেছে এই প্রকৃতির ফুল! প্রত্যুত্তরে আমি আজো বলিনি কিছুই শুধু নীরবে তাকিয়ে থাকা ছাড়া; তাই আমার মুখের দিকে চেয়ে রজনীগন্ধার ভীরু ডালটির মতো সেও যেন হয়ে পড়ে খুবই সঙ্কুচিত, কেননা নীলা তো জানে আমার ফুলের প্রতি চিরকালই সীমাহীন দুর্বলতা আছে তবু রজনীগন্ধার দিকে চেয়ে আমার মুখে একটিও কেন প্রশংসা ফুটলো না? কী করে বোঝাই আমি অন্তহীন নীরবতা ছাড়া এর যোগ্য কী প্রশংসা হতে পারে, কী করে বোঝাই তাকে এই ফুল ফোটানো সাফল্য কতোটা! যখন সে বারান্দায় তার মাটির টবটি জুড়ে ফুটিয়েছে এই হার্দ্য, অনবদ্য ফুল তখন পৃথিবী জুড়ে তৈরি হচ্ছে মানুষ বিধ্বংসী বোমা, ক্ষেপনাস্ত্র, ভয়াল বারুদ এই রজনীগন্ধার পাশাপাশি একই সাথে পৃথিবীতে অঙ্কুরিত হচ্ছে মারণাস্ত্রের ভীষণ নখর, রজনীগন্ধার চেয়ে আরো দ্রুত চোখের নিমিষে ছেয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর অস্ত্রশালা দাঁত, নখ ও হিংস্র থাবায় সেজন্যই এমন ফুলের দিকে চেয়ে একটিও প্রশংসার বাক্য স্ফোটে না, শুধু মনে হয় সমস্ত পৃথিবীময় মানুষের হৃদয়ে যদি জন্ম নিতো রজনীগন্ধার এই কলি! তাই নীলাকে বলিনি পৃথিবীর এই দুঃসময়ে আজ এরূপ একটি ফুল ফোটানো যে কতোটা কঠিন আর তার সার্থকতা বিজ্ঞান ও মেধার কৃতিত্বের চেয়েও মহৎ!
মহাদেব সাহা
প্রকৃতিমূলক
তোমাকে যাইনি ছেড়ে আম-জাম কাঁঠালের বন, অশ্বত্থ-হিজল-বট, ঘুঘু-ডাকা চৈত্রের দুপুর- এই খেয়াঘাট পার হয়ে কতো আত্মীয়-বান্ধব চলে গেছে, এই গাঁয়ের হালট ধরে চলে গেছে নয়াদা ও রাঙা বৌদি আঁচলে চোখের জল মুছতে মুছতে কাকিমা ও তার কিশোরী মেয়েটি; সেই কবে মামাদের এতো বড়ো রায়বাড়ি শূন্য হয়ে গেছে- শিশুদি ও উষা পিসিমার কথা আজকাল বড়ো মনে পড়ে যায়- তারা কে এখন কোথায় আছেন, শুনেছি কয়েক বছর আগে শিলিগুড়িতে গত হয়েছেন আমার জেঠতুতো বড়ো ভাই, শৈশবের সেইসব সঙ্গী, কতো প্রিয় মুখ এভাবে এখন দূর স্মৃতি হয়ে গেছে; তবু তোমাকে কেমন করে ছেড়ে যাই, কার ভয়ে, কার রক্তচক্ষু দেখে, লোমশ নখর দেখে বলো- একুশের বইমেলা, শহীদ মিনার, পয়লা বৈশাখের বটমূল, রমনার মাঠ- আমার কতো যে প্রিয় তুমি এই বঙ্গোপসাগর, করতোয়া, ফুলজোড়, অথই উদাস বির, পুকুরের শাদা রাজহাঁস, নিবিড় বটের ছায়া, ঘন বাঁশবন। তোমাকে কেমন করে ছেড়ে যাই পিতার সমাধি বন্ধুর কবর, আজানের ধ্বনি বাউলের ভজন্তকীর্তন্ত তোমাকে কেমন করে ছেড়ে যাই ধানক্ষেত, মেঠোপথ, স্বদেশের সবুজ মানচিত্র, তোমাকে কেমন করে ছেড়ে যাই প্রিয় নদী, প্রিয় ঘাস, ফুল।
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
সব তো আমারই স্বপ্ন মাথার উপরে এই যে কখনো উঠে আসে মরমী আকাশ কিংবা স্মৃতি ভারাতুর চাঁদ মেলে ধরে রূপকাহিনীর গাঢ় পাতা। কোনো এক কিশোর রাখাল কী করে একদা দেখা পেয়ে গেলো সেই রাজকুমারীর আর পরস্পর ভাসালো গন্ডোলা। সেও তো আমারই স্বপ্ন রূপময় এই যে ভেনিস কী যে সিক্ত বাষ্পাকুল ছিলো একদিন রঙিন বর্ষণে শিল্পের গৌরবে তার মুখচ্ছবি উদ্ভাসিত আর থেকে থেকে জ্যোৎস্নখচিত সারা দেহে খেলে যেতো চিত্রের মহিমা! এসব তো আমার স্বপ্নের মৃত শিশু এই যে কখনো দেখি শৈশবের মতো এক স্মৃতির সূর্যাস্ত, অনুভূতিশীল মেঘ যেন রাত্রি নামে নক্ষত্রের নিবিড় কার্পেটে বুঝি যামিনী রায়ের কোনো সাতিশয় লোকজ মডেল। সব তো আমারই স্বপ্ন তবে, মাঝে মাঝে উদ্যান, এভেন্যু, লোকালয় মনে হয় অভ্রভেদী অব্যক্ত ব্যাকুল এই গাছগুলি কেমন মিষ্টিক আর প্রকৃতি পরেছে সেই বাউল বর্ণের উত্তরীয়! এও তো আমারই স্বপ্ন আঙিনায় একঝাঁক মনোহর মেঘ আর উন্মুক্ত কার্নিশে দোলে নীলিমা, নীলিমা! কিংবা টবে যে ব্যাপক চারাগুলি তাতে ফুটে ওঠে মানবিকতার রাঙা ফুল; এখনো যে কোনো কোনো অনুতপ্ত খুনী রক্তাক্ত নিজের হাত দেখে ভীষণ শিউরে ওঠে ভয়ে আর প্রবল ঘৃণায় নিজেই নিজের হাত ছিঁড়ে ফেলে সেখানে লাগাতে চায় স্নিগ্ধ গোলাপের ডালপালা। সেও তো আমারই স্বপ্ন এই যে চিঠিতে দেখি ভালোবাসারই তো মাত্র স্বচ্ছ অনুবাদ কিংবা একটি কিশোরী এখনো যে বকুলতলায় তার জমা রাখে মৃদু অভিমান; এখনো যে তার গণ্ডদেশ পেকে ওঠে পুঞ্জীভূত মাংসের আপেল। এসব তো আমার স্বপ্নের মৃত শিশু, বিকলাঙ্গ, মর্মে মর্মে খঞ্জ একেবারে! যেন আমি বহুকাল-পোষা একটি পাখির মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে আছি। আমি জানি সবই তো আমার স্বপ্ন নীলিমায় তারার বাসর আর এভেন্যুতে গূঢ় উদ্দীপনা- এইগুলি সব তো আমারই স্বপ্ন, সব তো আমারই স্বপ্ন।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
ভালো আছি বলি কিন্তু ভালো নেই চেয়ে দেখো আমার ভিতরে কোথায় নেমেছে ধস, কোথায় নেমেছে ঘোর কালো! দেখো আমার ভেতরে এখন প্রবল গ্রীষ্মকাল খরা আর খাদ্যের অভাব; ভালো করে চেয়ে দেখো আমার ভিতরে সমস্ত কেমন তন্দ্রাচ্ছন্ন, ভগ্ন ও ব্যথিত ঠিক যে আঁধার তাও নয় মনে হয় মধ্যাহ্নে অকালসন্ধ্যা অস্তমিত সকল আলোর উৎস; ভালো আছি বলি কিন্তু ভিতরে যে লেগেছে হতাশা লেগেছে কোথাও জং আর এই মরচে-পড়া লোহার নিঃশ্বাস গোলাপ ফুটতে গিয়ে তাই দেখো হয়েছে ক্রন্দন, হয়েছে কুয়াশা! আমি কি অনন্তকাল বসে আছি, কেন তাও তো জানি না চোখে মুখে উদ্বেগের কালি, থেকে থেকে ধূলিঝড় আতঙ্কের অন্তহীন থাবা; ভিতরে ভীষণ গোলযোগ ভালো আছি বলি কিন্তু ভালো নেই চেয়ে দেখো ভিতরে কেমন কোলাহল উদ্যত মিছিল ঘন ঘন বিক্ষুব্ধ শ্লোগান, ডাক-তার-ব্যাঙ্ক ধর্মঘট হরতালপ্লাবিত দেখো আমার ভিতরে এই এভেন্যু ও পাড়া, হঠাৎ থমকে আছে ব্যস্ত পথচারী যেন কারফিউতাড়িত আমার ভিতরে এই ভাঙাচোরা, দ্বন্দ্ব ও দুর্যোগ; দেখো অনাহারপীড়িত শিশু দেখো দলে দলে দুর্ভিক্ষের মুখ ভালো আছি বলি কিন্তু ভালো নেই চেয়ে দেখো ভিতরে কী অস্থির উন্মাদ, ভিতরে কী নগ্ন ছেঁড়া ফাড়া!
মহাদেব সাহা
প্রকৃতিমূলক
আমার জীবনী আমি লিখে রেখে যাবো মাটির অন্তরে, ধুলোর পাতায় লিখে রেখে যাবো মেঘের হৃদয়ে, বৃষ্টির ফোঁটায়, হাঁসের নরম পায়ে হরিণশিশুর মায়াময় চোখে; ফুলের নিবিড় পাপড়িতে আমি লিখে রেখে যাবো আমার জীবনী- লিখে রেখে যাবো বৃক্ষের বুকের মধ্যে পাহাড়ী ঝর্নার ওষ্ঠে, সবুজ শস্যের নগ্নদেহে। আমার জীবনী আমি লিখে রেখে যাবো শিশিরে, ঘাসের বুকে, নদীর শরীরে, পদচিহ্ন আঁকা এই পথের ধুলোয় লিখে রেখে যাবো সংসারের হাসি-কান্নার গভীরে; আমার জীবনী আমি গেঁথে দিয়ে যাবো ঝরা বকুলের বিষন্ন মালায়, বর্ষার উদ্দাম ঢেউয়ে, সবুজ জমিতে, আমার জীবনী আমি লিখে রেখে যাবো বিরহীর দুচোখের জলের ধারায়; আমার জীবনী আমি লিখবো না দূর নীহারিকালোকে, নক্ষত্রের উজ্জ্বল অক্ষরে, আমার জীবনী আমি রেখে দিয়ে যাবো ভোরের পাখির কন্ঠে, উদাসীন বাউলের গানে, পথিকের পথের দু’ধারে; লিখে রেখে যাবো আমার জীবনী আমি ব্যথিত কবির শ্লোকে, দুঃখীর সজল আঁখিতে, আমার জীবনী আমি লিখে রেখে যাবো স্বপ্নের খাতায় সমুদ্র-সৈকতে, অশ্রুজলে-ধোয়া প্রেমিকের জীবনপঞ্জিতে।
মহাদেব সাহা
স্বদেশমূলক
তোমরা কি জানো এ শহর কেন হঠাৎ এমন মৌনমিছিলে হয়ে ওঠে ভারী, অশ্রুসিক্ত? কেন বয়ে যায় শোকার্ত মেঘ আর থোকা থোকা শিশিরবিন্দু পথে কেন এতো কৃষ্ণচূড়ার গাঢ় সমাবেশ; আমি জানি এতো মেঘ নয়, নয় শীতের শিশির; প্রিয়হারা এ যে একুশে রাজপথ জুড়ে এতো রঙিন আল্পনা আঁকা তোমরা কি জানো সে তো নয় কোনো রঙ ও তুলির ব্যঞ্জনা কিছু এই আল্পনা, পথের শিল্প শহীদেরই তাজা রক্তের রঙ মাখা!
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
এই কবিতাটি ছিলো যে নিঝুম ঘুমের পুরীতে অলস নিদ্রা ছিলো কারো চোখে সুদূর স্বপ্ন রোমাঞ্চকর গাঢ় শিহরন, দূর নীলিমায় এই কবিতাটি ছিলো ভাসমান উদাসীন মেঘ স্বর্ণচাঁপার বুকে থরো থরো হয়তোবা কোনো শুভ্র শিশির; এই কবিতাটি ছিলো পাহাড়ের মৌনতাভরা গূঢ় উদ্ধৃতি ছিলো গোলাপের হার্দ্য আলাপ অনুভূতিময় পাখিদের শিস আকাশের ছিলো মন্ময় ভাষা এই কবিতাটি নদীর ভাষ্য, এই কবিতাটি ছিলো কোনো এক শিশুর হুদয়ে মৃদু স্পন্দন মধ্যরাতের ঘুমহীন চোখে এই কবিতাটি জেগে ছিলো একা এই কবিতাটি ছিলো কৃষকের মাটির শানকি-ভরা শাদা ভাত; এই কবিতাটি ছিলো মিছিলেতে উদ্দীপনার গনগনে ভাষা বস্তিতে ছিলো এই কবিতাটি মাথা গুঁজে-থাকা কাতর দুঃখ! এই কবিতাটি ব্যথিত মায়ের কতো যে গভীর করুন অশ্রু উবু হয়ে পথে জলপানরত এই কবিতাটি দারুণ তৃষ্ণা, এই কবিতাটি মারীমড়কের মাঝখানে ছিলো ক্ষীণতম আশা হানাহানি আর রক্তপাতের বিরুদ্ধে ছিলো এই কবিতাটি; এই কবিতাটি ছিলো একখানি সবুজ গ্রামের স্বচ্ছ ইমেজ এই কবিতাটি মানবিকতার একটিমাত্র সহজ উৎস, অনাহারী সব শিশুর মুখে তো এই কবিতাটি দুমুঠো অন্ন এই কবিতাটি ছিলো বা কখনো দূরে ভাসমান মেঘের রাজ্যে কখনোবা ছিলো খুব কাছাকাছি আমাদের এই মাটির উঠোনে, এই কবিতাটি কখনোবা ছিলো চাঁদের কিরণে অধিক সিক্ত কখনোবা ছিলো এই কবিতাটি খর দুপুরের তাপে কী দগ্ধ এই কবিতাটি কোথায় যে ছিলো উধও স্বপ্নে দূর কল্পনা, এই কবিতাটি পেয়েছি এখানে ধুলো ও মাটিতে রূঢ় বাস্তবে।
মহাদেব সাহা
ভক্তিমূলক
আমার প্রেমিকা- নাম তার খুব ছোটো দুইটি অক্ষরে নদী বা ফুলের নামে হতে পারে এই দ্বিমাত্রিক নাম, হতে পারে পাখি, বৃক্ষ, উদ্ভিদের নামে কিন্তু তেমন কিছুই নয়, এই মৃদু সাধারন নাম সকলেরই খুব জানা। আমার প্রেমিকা প্রথম দেখেছি তাকে বহুদূরে উজ্জয়নীপুরে, এখনো যেখানে থাকে সেখানে পেঁৗছতে এক হাজার একশো কোটি নৌমাইল পথ পারি দিতে হয়; তবু তার আসল ঠিকানা আমার বুকের ঠিক বাঁ পাশে যেখানে হৃৎপিন্ড ওঠানামা করে পাঁজরের অস্থিতে লেখা তার টেলিফোন নম্বরের সব সংখ্যাগুলি; আমার চোখের ঠিক মাঝখানে তোলা আছে তার একটিমাত্র পাসর্পোট সাইজের শাদাকালো ছবি; আমার প্রেমিকা তার নাম সুদূর নীলিমা, রক্তিম গোধূলি, নক্ষত্রখচিত রাত্রি, উচ্ছল ঝর্ণার জলধারা উদ্যানের সবচেয়ে র্নিজন ফুল, মন হুহু করা বিষন্নতা সে আমার সীমাহীন স্বপ্নের জগৎ; দু'চোখে এখনো তার পৃথিবীর সর্বশেষ রহস্যের মেঘ, আসন্ন সন্ধ্যার ছায়া _ আমার প্রেমিকা সে যে অন্তহীন একখানি বিশাল গ্রন্থ আজো তার পড়িনি একটি পাতা, শিখি নাই এই দু'টি অক্ষরের মানে ।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
শুধাই বৃক্ষের কাছে, ‘বলো বৃক্ষ, কীভাবে চলতে হয় কঠিন সংসারে? তুমি তো দেখেছো এই পৃথিবীতে অনেক জীবন; বৃক্ষ বলে, শোনো, এই সহিষ্ণুতাই জীবন’। বলি আমি উদ্দাম নদীকে, বলো, পুণ্যতোয়া নদী, কেমন দেখেছো তুমি মানুষের জীবনযাপন? তুমি তো দেখেছো বহু সমাজ সভ্যতা’; মৃদু হেসে নদী বলে, দুঃখের অপর নাম জীবনযাপন’। যাই আমি কোনো দূর পাহাড়ের কাছে বলি, শোনো, হে মৌন পাহাড়, তুমি তো কালের সাক্ষী, বলো না বাঁচতে হলে কীভাবে ফেলতে হয় এখানে চরণ’? কেবল দেখায় তার নিজের জীবন। অবশেষে একটি শিশুকে আমি বুকে নিয়ে বলি, ‘তুমি এই জীবনের কতেটুকু জানো, কোথায় নিয়েছো তুমি জীবনের পাঠ’? কেবল শিশুটি বলে, ‘এসো খেলা করি আমরা দুজনে’।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
আমার স্বপ্নকে কারা রাত্রিদিন এমন পাহারা দিয়ে ফেরে মনে হচ্ছে এই একগুচ্ছ স্বপ্নকে নিয়ে তারা অধিক চিন্তিত শলা-পরামর্শে ব্যস্ত, গেরিলারও চেয়ে বেশি ভীত আমার স্বপ্নকে নিয়ে তারা; মাইনেরও চেয়ে বেশি ক্ষতিকর একগুচ্ছ সোনালি স্বপ্নের ডালপালা তাই তারা সর্বদা শঙ্কিত এই বক্ষলগ্ন স্বর্ণচাঁপাগুলিকে নিয়েই। তারাও কি জানে এই স্বপ্নগুচ্ছ হয়তো একদা নকশীকাঁথার মতো দেশজুড়ে আঁকবে একটি নাম, তৃণগুল্ম ধীরে ধীরে হবে সেই স্বপ্নের আহার মেঘে মেঘে নবীন মল্লার বুনে দিয়ে আসবে গোপনে নক্ষত্রপুঞ্জের খোলা বিশাল তোরণ অনায়াসে করবে রচনা, আমার স্বপ্নকে তাই রাত্রিদিন এমন করছে কেউ তাড়া মাঝে মাঝে হঠাৎ চড়াও হয়ে করছে প্রবল আক্রমণ আমার স্বপ্নকে নিয়ে মনে হয় ওরা আজ সর্বাধিক ভীত। ওরাও কি জানে এই স্বপ্নের ভিতর রাবণের মৃত্যুবরণ লুক্কায়িত আছে এই শাদামাঠা স্বপ্নের ভিতরে জ্যোতিমৃয় ভবিষ্যৎ আছে মুখ গুঁজে কি রঙমহল, মিনার, গম্বুজ, পাথরের প্রাণবন্ত পাখি প্রজ্বলিত প্রকোষ্ঠে কোথাও দাউ দাউ দরুণ আগুন এই স্বপ্নের ভিতরে কী যে রৌদ্রকরোজ্জ্বল সবুজাভ দিন আর কি জেনেছে তাও? তাই আমার স্বপ্নের পিছে লেলিয়ে দিয়েছে এতো সশস্ত্র প্রহরী বুটের আওয়াজ ঘন ঘন কানে এলে যাতে এই স্বপ্ন অন্তর্হিত হয়; কিন্তু ওরা তো জানে না এই স্বপ্নকে আমি কতোদিন শত্রু ছাউনির পাশে রেখে কতোদিন সশব্দ কামানের মুখে ফেলে কতোদিন যুদ্ধের মহড়া দিয়ে তাকে করেছি প্রস্তত এতোখানি। আমার স্বপ্ন তো আজ নিজেই সইতে পারে সব শোকাবহ ঘটনার বেগ, বিদ্যুৎ কি অগ্নির ছোবল আমার স্বপ্নের মধ্যে কখন ঢুকেছে এই বিশাল বেদনা তাই তাকে দিয়েছে ব্যঞ্জনা সেই একটি নামের স্বপ্নেরও অধিক সেই স্বপ্নভেদী নাম, স্বপ্ন ভেদ করে আমার হৃদয়ও ভেদ করে সেই মৌন মগ্ন এপিটাফ!
মহাদেব সাহা
প্রকৃতিমূলক
তোমাদের সাথে কথা হয়েছিলো কচি লাউপাতা, ঘাসফুল, ভোরের শিশির বর্ষার স্রোতের ঘূর্ণি, ফুলজোড় নদী, রাতজাগা চাঁদ, শ্রাবণের উদাস আকাশ দুকূল ছাপানো জল, ঘন মেঘ, বর্ষনের রাত কথা হয়েছিলো আমি তোমাদের কথা লিখে রেখে যাবো; যে কৃষাণ প্রত্যহ সকালে উঠে মাঠে যায় একা বউটিকে ফেলে, রাখাল সজল চোখ গাভীগুলো চড়ায় একাকী ভাটিয়ালি গান গেয়ে যে মাঝি যায় দূর দেশে যে বাউল রোজ ভোরে আমাদের আঙিনায় গেয়ে যেতো গান, তোমাকের কারো কথা লিখতে পারিনি, আঁকতে পারিনি তোমাদের হৃদয়ের অনবদ্য ছবি; কথা হয়েছিলো আমি তোমাদের কাছে ফিরে যাবো রঙিন গোধূলি, উদার আকাশ, ধানক্ষেত কচি দূর্বাঘাস শৈশবের পরিচিত প্রিয় মুক, আলতা-পরা আমার মায়ের সেই পদচিহ্ন কাঁসার বাসন, উঠোনের শুভ্র আলপনা কথা হয়েছিলো, ঠিকই আমাদের কথা হয়েছিলো আমি তোমাদের কাছে ফিরে যাবো প্রিয় নদী, প্রিয় দানক্ষেত ক্ষমা করো লাউপাতা, ভোরের শিশির আমার মায়ের হাতে চাল-ধোয়া জলের সুগন্ধ আমি তোমাদের কথা রাখতে পারিনি, আমি কথা রাখতে পারিনি।
মহাদেব সাহা
রূপক
তুলে যে এখান থেকে তরতাজা এই কালো ঘ্রান আমি নিয়ে যাবো উঠোনে রোপণ করা পুঁইশাক, সবজির গাঢ় সজীবতা তুলে দে একটু মাটি, একটু মমতা দে, মমতা তুলে দে আমি নিয়ে যাবো আমি অভিমান ভুলে এসেছি মানুষ তোর কাছে আমাকে তুই তুলে দে একটু মাটি, মাটি দে মাটি দে আমাকে মন্ত্র দে, ধুলোয় ছড়ানো বীজ তুলে দে তুলে দে আমি নিয়ে যাবো করাঞ্জলি পেতে আছি বুক ভরে তুলে দে তৃষ্ণার জল জলবন্দী অজ্ঞাত বর্ণের মাছ আমি নিয়ে যাই আমাকে তুই তুলে দে তুলে দে তুলে দে একটু মাটি, মাটিতে ছড়ানো বীজ, কালো ঘাম, কালো কৃষকের শ্রম, আবার এসেছি ফিরে তোর কাছে মধুর মানব আমাকে তুই মাটি দে মাটি দে মাটির মমতা দে, মন্ত্র দে তুলে দে তুলে দে!
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
কাছে আসো, সম্মুখে দাঁড়াও খুব কাছে, যতোখানি কাছে আসা যায়, আমি আপাদমস্তক দেখি তোমার শরীর যেভাবে মানুষ দেখে, প্রথম মানুষ। দেখি এই কাণ্ড আর ডালপালাখানি, ভিতর-বাহির কতোটা পেয়েছে মাটি, কতোটা বা এই জলবায়ু পায়নি শিকড়খানি, পেয়েছে কি তোমার প্রকৃতি? কাছে আসো আরো কাছে, সহজেই যেন চোখে পড়ে তোমার সূক্ষ্ম তিল, আঙুলের সামান্য শিশির যেন দেখি তোমার সজল চোখ, তোমার মদির সলজ্জতা দূরদৃষ্টি নেই মোটে, কেবল কেবল সন্নিকটে। তুমি খুব কাছে আসো, খুব কাছে, ঠিকই খুব কাছে যতোখানি কাছে এলে আর কোনো আড়াল থাকে না; সকলেই দূরে আজ, তুমি খুব কাছে চলে আসো দূর থেকে দেখে আমি কিছুই বুঝি না, বুঝি না। এবার দেখতে চাই কাছে থেকে খুব কাছে থেকে যেন ডালপালা, কাণ্ড, ফুল কিচুই না ফেলি, দেখি সব আলো, সব অন্ধকার, সব, কিন্তু যতোই নিকটে আসো অন্ধের কী আসে যায়।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তার বুকে আছে স্বর্ণচাঁপার গাছ, আকাশের মতো বড়ো নীল পোষ্টাপিস সব যোগাযোগ, নিরুদ্দেশ মানুষের তারবার্তা, জরুরী খবর বৃষ্টির কালো জামা পরে সেখানে লুকিয়ে থাকে তাড়িত ফেরারী তার বুকে ট্যুরিষ্টের নিশ্চিত শেল্টার আছে, অসুখী লোকের আছে সবুজ শুশ্রূষা বনের চোখের নিচে যারা পাখির পারক খোঁজে, আসে বনবিভাগের লোকজন জেনে নিতে গাছের বয়স, উদ্ভদ কীভাবে বাড়ে- অথচ সবাই তারা ফির যায় প্রকৃতির জড় ব্যবহার দেখে এইসব হন্যে মানুষ এসে তার বুকে খুঁজে পায় সমস্ত পাখির বাসা, নিসর্গের নীল টেলিফোন শোনে দেখে উদ্ভিদের নিজস্ব হস্তাক্ষরে লেখা চিঠি, পাখির পালক দিয়ে নির্মিত গার্মেন্ট তার বুকে আছে অরণ্যের চিত্রকলা, গোপন স্টুডিও ; তার বুকে আছে দেরি করে ঘরে ফিরে ডাক দিলে যে দেয় দুয়ার খুলে সেই ভালোবাসা, যে এসে ভীষণ জ্বরে মাথায় কোমল হাত রাখে সেই দুঃখবোধ তার বুকের মধ্যে বাস করে রাজদম্পতির সুখ, দুঃখী বালকের কান্নার সঙ্গী যখন শহরে বাধে গোলযোগ, ধর্মঘট হরতাল চলে যানবাহন বন্ধ থাকে, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় ঝাঁপ-ফেলা দোকানপাট দেখে মনে হয় সমস্ত শহর যেন মৃত রবিবার তখনো দাঁড়িয়ে দেখি তার বুকে খোলা জুয়েলারী শপ, ফুলের দোকান, আকশের মতো সেই বড়ো নীল পোস্টাপিস, তার বুকে আছে গোপনীয় খাম হাতে সোনালি পিয়ন।
মহাদেব সাহা
প্রকৃতিমূলক
আমি কবিতা লিখবো বলে এই আকাশ পরেছে নক্ষত্রমালা, পরেছে রঙধনু-পাড় শাড়ি, অপরূপ চন্দ্রহার নদীর গহনা পরে আছে গ্রামগুলি, শুধু আমি কবিতা লিখবো তাই এই প্রকৃতি পরেছে পুষ্পশোভা, কানে পরেছে ফুলের দুল, হাতে ঝিনুকের চুড়ি। মন হুহু-করা এমন উদাস বাতাস, এমন স্নিগ্ধ বৃষ্টিধারা এই ঝর্নার মুখর গান, ফুলের সৌরভ কেবল আমার কবিতার মধ্যে, আমি কবিতা লিখবো তাই। আমি কবিতা লিখবো বলে ঘাসে এমন শিশির মুক্তো গাছের পাতায় এই ঘন সবুজ রঙ- রাজহাঁসগুলির এমন আলতা-পরা পা, শাদা বকের পাখার মতে এই নদীর জল ফাল্গুনে এমন অগ্নিবর্ণ পলাশ-শিমুল; আমি কবিতা লিখবো বলে মাছের দুচোখ এমন রহস্যময়, জলের শুভ্রতা এমন হৃদয়গ্রাহী। আমি কবিতা লিখবো তাই শূন্যতার নাম আকাশ জলের বিস্তারের নাম সমুদ্র, গাছপালা, জঙ্গলের নাম অরণ্য জলরেখার ভালো নাম নদী; আমি কবিতা লিখবো বলে এই আকাশ ও প্রকৃতি জুড়ে এতো সাজসজ্জা, এতো আয়োজন, চিরবসন্তোৎসব।
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
যে-কোনো বিষয় নিয়েই হয়তো এই কবিতাটি লেখা যেতো পিকনিক, মর্নিং স্কুলের মিসট্রেস কিংবা স্বর্নচাঁপার কাহিনী; হয়তো পাখির প্রসঙ্গ গত কয়েকদিন ধরে টেলিফোনে তোমার কথা না শুনতে পেয়ে জমে থাকা মেঘ, মন ভালো নেই তাই নিয়েও ভরে উঠতে পারতো এই পঙ্‌ক্তিগুলো অর্কিড কিংবা উইপিঙ উইলোও হয়ে উঠতে পারতো স্বচ্ছন্দে এই কবিতাটির বিষয়; কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্রমত দেশের একজন কবির মনু মিয়ার হাঁড়ির খবর ভুললে চলে না, আমি তাই চোয়াল ভাঙা হারু শেখের দিকে তাকিয়ে আন্তর্জাতিক শোষণের কথাই ভাবি, পেটে খিদে এখন বুঝি কবিতার জন্য কি অপরিহার্য জুঁইফুলের চেয়ে কবিতার বিষয় হিসেবে আমার কাছে তাই শাদা ভাতই অধিক জীবন্ত- আর এই ধুলোমাটির মানুষ; এই কবিতাটি তাই হেঁটে যায় অন্ধ গলির নোংরা বস্তিতে হোটেলের নাচঘরের দিকে তার কোনো আকর্ষণ নেই, তাকে দেখি ভূমিহীন কৃষকের কুঁড়েঘরে বসে আছে একটি নগ্ন শিশুর ধুলোমাখা গালে অনবরত চুমো খাচ্ছে আমার কবিতা, এই কবিতাটি কখনো একা-একাই চলে যায় অনাহারী কৃষকের সঙ্গে জরুরী আলাপ করার জন্য, তার সঙ্গে কী তার এমন কথা হয় জানি না পর মুহূর্তেই দেখি সেই ক্ষুধার্ত কৃষক শোষকের শস্যের গোলা লুট করতে জোট বেঁধে দাঁড়িয়েছে; এই কবিতাটির যদি কোনো সাফল্য থাকে তা এখানেই। তাই এই কবিতার অক্ষরগুলো লাল, সঙ্গত কারণেই লাল আর কোনো রঙ তার হতেই পারে না- অন্য কোনো বিষয়ও নয় তাই আর কতোবার বলবো জুঁইফুলের চেয়ে শাদা ভাতই অধিক সুন্দর।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
এই এটুকু জীবন আমি দিওয়ানার মতো ঘুরেই কাটিয়ে দিতে পারি দিগ্‌ভ্রান্ত নাবিকের মতো অকূল সমুদ্রে পারি ভাসাতে জাহাজ; আমার সমগ্র সত্তা পারি আমি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দিতে কোনো সুফী আউলিয়ার মতো ধ্যানের আলোয়, ঝরা বকুলের মতো পথে পথে নিজেকে ছড়াতে পারি আমি ছেঁড়া কাগজের মতো এমনকি যত্রতত্র ফেলে দিতে পারি, এইভাবে ফেলতে ফেলতে ছড়াতে ছড়াতে এই এটুকু জীবন আমি পাড়ি দিতে চাই- এই এটুকু জীবন আমি হেসে খেলে দুচোখের জলে ভালোবেসে, ভালোবাসা পেয়ে কিংবা না পেয়ে এভাবে কাটিয়ে দিতে চাই; এই ছোট এটুকু জীবন আমি বংশীবাদকের মতো এভাবে কাটাতে পারি পথে পথে ঘুরে উদাস পাখির মতো ভেসে যেতে পারি দূর নীলিমায় সুদূরের স্বপ্ন চোখে নিয়ে, পারি আমি এটুকু জীবন নিশ্চিত ডুবিয়ে দিতে গানের নদীতে আনন্দধারায়, এই তপ্ত এটুকু জীবন আমি স্বচ্ছন্দে ভিজিয়ে নিতে পারি পানপাত্রে- ধুয়ে নিতে পারি এই জীবনের সব দুঃখ, অপমান, গ্লানি, এই পরাজয়, এই অপর ব্যর্থতা, এই অখণ্ড বিরহ, এই উপেক্ষার অনন্ত দিবসরাত্রি, এই একা একা নিভৃত জীবন; এই এটুকু জীবন আমি নির্ঘাত কাটিয়ে দিতে পারি এভাবে ট্রেনের হুইসেল শুনে উদাসীন পথিকের মতো পথে, পর্বতারোহীর অদম্য নেশায় আকাশে ঘুড়ির পানে চেয়ে; এই মগ্ন জীবন আমি নাহয় নিঃসঙ্গ কয়েদীর মতো এভাবে কাটিয়ে দিয়ে যাই অন্ধকারে, অন্ধকারে।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অর্থ-পদ চায় বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণসিংহাসন জয়ের শিরোপা আর খ্যাতির সম্মান, কে চায় সোনার খনি তোমার বুকের এই স্বর্ণচাঁপা পেলে? তোমার স্বীকৃতি পেলে কে চায় মঞ্চের মালা কে চায় তাহলে আর মানপত্র তোমার হাতের চিঠি পেলে, তোমার স্নেহের ছায়া পেলে বলো কে চায় বৃক্ষের ছায়া তোমার শুশ্রূষা পেলে কে চায় সুস্থতার ছাড়পত্র বলো, বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ চায় শ্রেষ্ঠ পদ কে চায় তাহলে বলো স্বীকৃতি বা মিথ্যা সমর্থন, তোমার প্রশ্রয় পেলে কে চায় লোকের করুণা বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণমুদ্রা কিংবা রাজ্যপাট? বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অন্য কিছু চায়, কে আর তোমার বুকে স্থান পেলে অন্যখানে যায়!
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
সব মানুষেরই মধ্যে কিছু অভিমান থাকে, এইটুকু থাক, এইটুকু থাকা ভালো এই অভিমান জমে জমে মানুষের বুকে হবে নক্ষত্রের জল। মমতা মমতা বলো অভিমান তারই তো আকার তারই সে চোখের আঠালো টিপ, জড়োয়া কাতান, মমতা মমতা বলো অভিমান তারই একনাম একদিন অভিমান জমে জমে সব বুকে স্বর্ণখনি হবে ; মানুষের মধ্যে কিছু অভিমান থাকে, চোখের ভিতরে থাকে, হৃৎপিণ্ডে থাকে তাহাকেই গোপনতা বলে, মানুষের মধ্যে আরো মানুষের অবস্থান বলে, কেউ কেউ ইহাকেই মানুষের বিচ্ছিন্নতা বলে আমি তা বলি না আমি বলি অভিমান, মানুষের প্রতি মানুষের শুধু অভিমান, আর কিছু নয়, এই অভিমানই একদিন মানুষকে পরস্পর কাছে এনে দেবে। সব মানুষেরই মধ্যে কিছু অভিমান থাকে অভিমান থাকা ভলো, এইটুকু থাক, একটি নারীর প্রতি পুরুষের স্বাভাবিক অভিমান থাক, শিশুদের প্রতি থাক, গোলাপের প্রতি এই অভিমান থাক নারী ও গোলাপ এই একটি শব্দের প্রতি মানুষের সনাতন অভিমান থাক, সব মানুষের মধ্যে কিছু অভিমান থাকে, সেইটুকু থাক।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
পথে পথে ঘুরে দেখি না, না, হারিয়ে যায়নি একটিও না-লেখা কবিতা- আছে আগুনে, ইথারে, বাষ্পে, বকটি মৌলিক পদার্থে, ণক্ষেত্রে, সমুদ্রে, আকামে আছে এই না-লেখা কবিতা। দেখি তাকে কারো চোখে হয়ে আছে দুফোঁটা নিবিড় অশ্রু, কারো বুকে অবিরাম তপ্ত দীর্ঘশ্বাস্ত কোথাওবা ফুটে আছে সবচেয়ে সুদৃশ্য গোলাপ সূনীল আকাশে রাশি রাশি তারা; সব মানুষের বুকের ভেতরে আছে যে অনন্ত ফল্গুধারা স্বচ্ছ সরোবর, স্নেহমমতার স্বর্ণখনি অলিখিত আমার কবিতাগুলি সেই নায়েগ্রার জলের প্রপাত এই না-লেখা কবিতা দেখি মাঝে মাঝে একাকী ঝর্নার জলে ভেজায় বিশুস্ক কণ্ঠ যেন তৃষ্ণার্ত হরিণ, যা কিছু সুন্দর, অপরূপ, কদাকার তার দিকে তাকিয়েও মনে হয় একেকটি না-লেখা কবিতা; তারা কখনো দেকেনি মুখ আলো-বাতাসের কোথায় যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কোথাওবা হয়ে আছে সবুজ প্রেইরী, কোথাওবা ছায়াঘেরা শান্ত বনস্পতি, এই না-লেখা কবিতা।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
এক কোটি বছর হয় তোমাকে দেখি না একবার তোমাকে দেখতে পাবো এই নিশ্চয়তাটুকু পেলে- বিদ্যাসাগরের মতো আমিও সাঁতরে পার হবো ভরা দামোদর … কয়েক হাজার বার পাড়ি দেবো ইংলিশ চ্যানেল; তোমাকে একটিবার দেখতে পাবো এটুকু ভরসা পেলে অনায়াসে ডিঙাবো এই কারার প্রাচীর, ছুটে যবো নাগরাজ্যে পাতালপুরীতে কিংবা বোমারু বিমান ওড়া শঙ্কিত শহরে। যদি জানি একবার দেখা পাবো তাহলে উত্তপ্ত মরুভূমি অনায়াসে হেঁটে পাড়ি দেবো, কাঁটাতার ডিঙাবো সহজে, লোকলজ্জা ঝেড়ে মুছে ফেলে যাবো যে কোনো সভায় কিংবা পার্কে ও মেলায়; একবার দেখা পাবো শুধু এই আশ্বাস পেলে এক পৃথিবীর এটুকু দূরত্ব আমি অবলীলাক্রমে পাড়ি দেবো। তোমাকে দেখেছি কবে, সেই কবে, কোন বৃহস্পতিবার আর এক কোটি বছর হয় তোমাকে দেখি না।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
সমস্ত শহর করে তোলপাড় গ্রীসীয় যুবার মতো ভুঁড়ে দেবো শব্দের মাতাল নিনাদ আমার প্রেমিকা, প্রিয়তমা নারী উদ্দেশে তোমার; তোমাকে ডাকবো আমি নির্লজ্জ গেঁয়োর মতো সমবেত অগ্রজের মুখোমুখি বসে- দীর্ঘদিন বলি না প্রেমিকা, বলি না গোলাপ কতোদিন আনি না মুখে প্রেয়সী নারীর নাম যেন উচ্চারণে অস্পষ্ট শিশুর মতো কতিপয় শব্দ ছিলো সীমাহীন দূরত্বে আমার, আজ বর্ষণের রাতে আমি বুঝি প্রথম কৃষাণ শতাব্দীর অকর্ষিত মাটি ভেদ করি কতোদিন তোমাকে আনি না মুখে প্রেম, প্রিয় স্বাধীনতা, রম্য গোলাপ যুদ্ধক্ষেত্রে গ্রেনেডের শব্দে, মাইনের মুখর সঙ্গীতে শত্রুর রণদামামায় শুনতাম কবিতার পরিচিত পঙ্‌ক্তি, একঝাঁক রাইফেলের শব্দে ঝরে পড়ে অসংখ্য খুলির মালা যেন প্রিয়ার হাতে রডোডেনড্রনগুচ্ছ আজ এ-বৎসরের শেষ রবিবারে, যুদ্ধ শেষে তোমাকে ডাকার স্বাধীনতা প্রিয়তমা প্রেমিকা আমার!
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
কিছুদিন শোকে ছিলাম, মোহে ছিলাম, কিছুদিন নারীতে শোকাচ্ছন্ন ছিলাম আরো কিছুদিন, আরো কিছুদিন কিছুদিন এদিক সেদিক কিছুদিন ঘোরাফেরায় কিছুদিন চাঁদ দেখতে দেখতে গোল মাঠের মধ্যে বুনো শিকারী শসন্য তোলার কথা যেমন ভুলে গিয়েছি, ঘরে ফেরার কথা যেমন তোমাদের মহুয়া মধুর স্মৃতির সঙ্গী হতে হতে নেমে গিয়েছি বেশ করেছি, বেশ করেছি, বেশ করেছি। কিছু করিনি। আজ নাহয় দু’চারদিন এদক সেদিক, কিছুদিন এমন তেমন, কিছুদিন চলতে ফিরতে চলতে ফিরতে হাঁটতে হাঁটতে কোথায় কোনো মায়াভরা মেয় ধুলোরমধ্যে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছি, বসে পড়েছি পড়তে পড়তে ধরে উঠেছি একটা করুণ লতার মতো প্রসন্নতা একটা কোনো কিছুর মতো কিছুদিন জড়িয়ে ছিলাম কিছুদিন শুষে ছিলাম, স্নেহে ছিলাম, সুখে দুঃখে সম্পন্ন ছিলাম চলতে চলতে বসে পড়েছি এইখানে এই জলের ধারে তোমাদের গোলাপ তোলার এই উৎসবে আমি পিছন ফিরে দেখিনি কিছুদিন নারী কেমন, লুটিয়ে ছিলাম, কিছুদিন কাম ও ক্লান্তি চঞ্চলতা অধীর তাকেই অঙ্গে রাখি, কিছুদিন নারীত্বকে কিছুদিন শিশুর গন্ধ, কিছুদিন দীর্ঘ দাহ, কিছুদিন অধীনতা কিছুদিন এই কিছুদিন চলতে চলতে চলতে চলতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছি লোকে বলে এইখানে এই মায়াদিঘি, বসন্তকাল, আমি কোনো মূর্তি চাই না আরো কিছুদিন চন্দ্রাসক্ত, আরো কিছুদিন ঘুমিয়ে পড়বো, আরো কিছুদিন।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
হায় আমাদের দুঃখ আছে কতো রকম বুকের ক্ষত, মনের বারো গাঢ় জখম মা যেমন দুঃখ করেন হলো না তার ঘটিবাটি সোনার বাসন ন্যায্য আসন ছেলেরা তার দিলো না কেউ রইলো পড়ে বাইরে যেমন উড়োনচন্ডী জোয়ারে ঢেউ ; ঘর হলো না, নিজের কোনো ঠাঁই হলো না পায়ে দাঁড়াবার হত বাড়াবার বিপদ আপদ কতোই আছে মা রাখলেন মনেই চেপে মনের দুঃখ মনের কাছে, আমি যেমন দুঃখ করি দুঃখ করি অনেক কিছু ঠিক য়ে আমি চুটলি কখন কিসের পিছু তাই জানি না শীতের দিনে হাত বাড়িয়েও ঘরে একটু রোদ আনি না কেন যে ঠিক দুঃখ করি তাই জানি না ; এই তো আমি ইচ্ছে করলে খেতে পারি, ঘুমোতে পাই যখন তখন অসুখ হলে কিনতে পারি অ্যাসপ্রো কিংবা চোখের জন্যে দামী লোশন বাসে চড়ে ঘুরতে পারি এখান থেকে অনেক খানি, কিংবা যেমন কারো কারো প্রেমের জন্য প্যানপ্যানানি প্রেম হলো না, হলো না ঠিক আলাপ কোনো মেয়ের সাথে দিনেরাতে বাদশাজাদীর তসবী নিয়ে নরম বিলাস ও-সব ছাই নেই কিছুরই কোনো আভাস আমার মধ্যে, তবু আমি দুঃখ করি কিসের জন্যে দুঃখ করি তাই জানি না গাই বিয়োবার আশায় ঘরে ধান ভানি না সবাই আমরা দুঃখ করি একটা কিছুর দুঃখ করি ঘটিবাটি, বসতবাড়ি, ফুলদানি বা সোনার বাসন নিজের জন্য হলো না ঠিক যোগ্য আসন হাত বাড়াবার শক্ত লাঠি পরিপাটি সোনার জীবন হলো না ঠিক যেমনটি চাই দুঃখ করি সবাই আমরা একটা কিছু দুঃখ করি কেন যে ঠিক দুঃখ করি তাই জানি না কেবল বুঝি বুকের নিচে সুনীল জখম।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
ভালোবাসা তুমি এমনি সুদূর স্বপ্নের চে’ও দূরে, সুনীল সাগরে তোমাকে পাবে না আকাশে ক্লান্ত উড়ে! ভালোবাসা তুমি এমনি উধাও এমনি কি অগোচর তোমার ঠিকানা মানচিত্রের উড়ন্ত ডাকঘর সেও কি জানে না? এমনি নিখোঁজ এমনি নিরুদ্দেশ পাবে না তোমাকে মেধা ও মনন কিংবা অভিনিবেশ? তুমি কি তাহলে অদৃশ্য এতো এতোই লোকোত্তর, সব প্রশ্নের সম্মুখে তুমি স্থবির এবং জড়? ভালোবাসা তবে এমনি সুদূর এমনি অলীক তুমি এমনি স্বপ্ন? ছোঁওনি কি কভু বাস্তবতার ভূমি? তাই বা কীভাবে ভালোবাসা আমি দেখেছি পরস্পর ধুলো ও মাটিতে বেঁধেছো তোমার নশ্বরতার ঘর! ভালোবাসা, বলো, দেখিনি তোমাকে সলজ্জ চঞ্চল, মুগ্ধ মেঘের মতোই কখনো কারো তৃষ্ণার জল।
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
মানুষ কিছুই শিখলো না আর, কিছুই শিখলো না এইসব বয়স্ক বালক- শুধু আদিবিদ্যা তীর ছোঁড়া ছাড়া তার কিচুই হলো না শেখা, কেবল শিকার আর রক্তপাত ব্যতীত বিশেষ কোনো পাঠ করলো না শেষ বুঝি এই নির্বোধ মানুষ; মনে হয় হিংসা তার আদিগ্রন্থ, শেষ বই এই রক্তপাত তাই কি এখনো তার চোখেমুখে লেখা সেই আদিম অক্ষর? সে কোনো নিলো না শিক্ষা আলোকিত দিবসের কাছে উজ্জ্বল সূর্যের কাছে, দ্যুতিময় নক্ষত্রের কাছে- তার যা কিছু সামান্য বিদ্যা অন্ধকার রাত্রি আর বধ্যভূমি, পিশাচের কাছ থেকে শেখা। কখনো বসলো না সে হাঁটু গেড়ে স্নিগ্ধ নদী, নীলাকাশ শ্যামল বৃক্ষের পাদদেশে- শিশুর পবিত্র মুখ থেকে নিলো না সে অনন্ত সুঘ্রাণ, সে কেবল বারবার তুলে নিলো শিকারীর তীর, তরবারি আজো সে তেমনি কুরুক্ষেত্রে দুষ্ট দুঃশাসন। পাঁচ সহস্র বছর আগে যেখানে সে ছিলো এখনো তেমনি সেখানেই হামাগুঁড়ি দেয়, চার পায়ে হাঁটে, এর বেশি কিছুই হলো না তার শেখা একচুলও এগুলো না তার এই লনড় জাহাজ। ঘুরে ফিরে সেখানেই ফিরে এলো অর্বাচীন অথর্ব মানুষ নিজেকে ধ্বংস করা ছাড়া সম্ভবত কিছুই হলো না জানা তার- আর অপরের হৃদয় রক্তাক্ত করা ছাড়া কিছুই শিখলো না এই মানুষ নামের দ্বিপদ প্রাণীরা।
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
তোমার মতন কোনো গাছ নেই স্বয়ংসম্পূর্ণ এই উদার বৃক্ষমূলে নতজানু নবীন তাপস ক্ষমায় স্নেহে ও প্রেমে কখনো হিংসায় তুমি বাঁধো বিপুল মজ্জায় তাকে রক্তে রক্তে তুমি তার লাল তরু, কিংশুক-অশোক তোমার ছায়ায়, করতলে আভূমি আকাশ নত, নীল গঢ় নিসর্গসম্ভার তোমার মতন কোনো পরিপূর্ণ গাছ নেই, কখনো গভীর রাতে দুঃস্বপ্নে সন্ত্রস্ত যুবা খোঁজে যে-স্নিগ্ধ গাছ মনে হয় যদি পাই ডালে ডালে জ্যোৎ্লারাত আলোকিত ক্রিসমাস বৃক্ষের বিক্রম কিংবা ফেরারী মানুষ অকস্মাৎ ঘরে ফিরে যার নিচে দাঁড়ায় স্বস্তিতে রাস্তায়, পার্কে, গহন অরণ্যে তেমন গাছ কোথায়? বনজ বৃক্ষরাজি বড়ো ম্লান, একা, নির্জন ভয়াবহভাবে নীরব, নিরপরাধ, সহানুভূতিহীন সে শুধু দাঁড়িয়ে আছে যেন হৃতরাজ্য দণ্ডিত সুলতন, অধোবধনে দেখছে সব, তার করণীয় কিছু নেই, এই অক্ষম গাছের নিচে আমাদের এতোচটুকু বয়স কমে না দুঃখে-সন্তাপে হৃদয়ে হৃদয়ে ওঠে বিস্তীর্ণ মৈনাক কাঁদি, চিৎকারে বলি অধঃপতিত যুবার এই শাসি-ভোগের আগে তুমি তাকে উদ্ধার করো, গাছ তোমার জন্মগত অদৃশ্য পোশাক খুলে ফেলো গাছ, দাঁড়াও সম্মুখে উজ্জ্বল নীল বাহু মেলে আলোড়নে আজন্ম জড়াও গাছ তবু চিবরদিন নিঃশব্দ ও অমানবিক। তোমার মতন কোনো গাছ নেই, সীতা, তুমি গাছ, জীবনের পরিপূর্ণ তরু অরণ্যে, প্রকৃতিতে দাঁড়ালেই বুঝি সীতা, তোমার মতন কোনো গাছ নেই এমন সম্পূর্ণ, মানবিক।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
ভালোবাসা আমি তোমাকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিব্রত আজ তেমাকে নিয়েই এমন আহত এতো অপরাধী, এতো অসহায়! তোমাকে নিয়েই পালিয়ে বেড়াই তোমাকে নিয়েই ব্যাকুল ফেরারী। ভালোবাসা তুমি ফুল হলে তার ফুলদানি পেতে অভাব ছিলো না, মেঘ হলে তুমি সুদূর নীলিমা তোমাকে দিতাম উড়ে বেড়াবার; জল হলে তুমি সমুদ্র ছিলো তোমারই জন্য অসীম পাত্র- প্রসাধনী হলে তোমাকে রাখার ছিলো উজ্জ্বল অশেষ শো-কেস, এমনকি তুমি শিশির হলেও বক্ষে রাখার তৃণ ছিলো, আর সবুজ পাতাও তোমার জন্য হয়তোবা হতো স্মৃতির রুমাল। ভালোবাসা তুমি পাখি হতে যদি তোমাকে রাখার ভাবনা কি ছিলো এই নীলকাশ তোমারই জন্য অনায়াসে হতো অনুপম খাঁচা! কিন্তু তুমি তো ফুল নও কোনো মেঘ নও কোনো দূর আকাশের, ভালোবাসা তুমি টিপ নও কোনো তোমাকে কারো বা কপালে পরাবো; ঘর সাজাবার মেহগনি হলে ভালোবাসা তুমি কথা তো ছিলো না তুমি তো জানোই ভালোবাসা তুমি চেয়েছো মাত্র উষ্ণ হৃদয়! খোঁপায় তোমাকে পরালেই যদি ভালোবাসা তুমি ফুটতে বকুল, কারো চোখে যদি রাখলেই তুমি হতে ভালোবাসা স্নিগ্ধ গোধূলি- তাহলে আমার তোমাকে নিয়ে কি বলো ভালোবাসা এমন দৈন্য, আমি তো জানিই তোমার জন্য পাইনি যা সে তো একটি হৃদয় সামান্যতম সিক্ত কোমল, স্পর্শকাতর অনুভূতিশীল!
মহাদেব সাহা
শোকমূলক
তোমাকে পানুই বলি, খুব ছোটো প্রিয় ডাকনাম ভালো নাম তোমার জানি না; তবু নও তুমি কোনো অচেনা মানুষ, খুব পরিচিত, খুব কাছের, পাশের তুমিই হারিয়ে গেলে বহুদূরে অজানা আকাশে; যতোই তোমার কথা ভাবি মনে হয় ফিরে এসে ঠিক আবার বসবে কাছাকাছি, শধানে কুশল। হয়তোবা এ-রকমই হবে, নিশ্চিতই হবে, মনে মনে ভাবি কিন্তু তুমি আর বুঝি কথাই রাখবে না কোনোদিন। তোমার টিকিট ছিলো, হ্যাণ্ডব্যাগ ছিলো, তবু কেন মানুষ এমন তুমি ফিরে এলে কারগো-আরোহী কেন হলে চলন্ত মানুষ তুমি স্তবির লাগেজ, কেন হলে, তোমার টিকেট ছিলো, জামাজুতো ছিলো, সবকিছু ছিলো। তুমি তো ভালোই ছিলে সামাজিক স্বচ্ছন্দ মানুষ তোমার মমতা ছিলো, বুকভরা ভালোবাসা ছিলো, তাই কি নিজেই তুমি হলে এই প্রেমের শহীদ ভালোবাসা বেঁচে থাক, মানুষ মরেও যদি যায়। হায়রে তোমাকে নিয়ে বেহুলার মতো সেই যে ভাসায় তার ভেলা দূর নীলিমায়; মাদ্রাজ-সমুদ্র থেকে বাংলাদেশে লালমাই পাহাড়ের কোলে, এই দীর্ঘ শবযাত্রা শেষ হয়ে যায়, লখিন্দর উঠে বসে, কিন্তু তুমি তবুও ওঠোনা। তোমাকে পানুই বলি, প্রিয় ডাকনাম গোলাপ ফুটেছে আজো, দেখো চেয়ে ক্রিসানথিমাম।
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
সুন্দরের হাতে আজ হাতকড়া, গোলাপের বিরুদ্ধে হুলিয়া, হৃদয়ের তর্জমা নিষিদ্ধ আর মননের সম্মুখে প্রাচীর বিবেক নিয়ত বন্দী, প্রেমের বিরুদ্ধে পরোয়ানা; এখানে এখন পাখি আর প্রজাপতি ধরে ধরে কারাগারে রাখে- সবাই লাঞ্ছিত করে স্বর্ণচাঁপাকে; সুপেয় নদীর জলে ঢেকে দেয় বিষ, আকাশকে করে উপহাস। আলোর বিরুদ্ধাচারী আঁধারের করে শুধু স্ততি, বসন্তের বার্তা শুনে জারি করে পূর্বাহ্নে কারফিউ, মানবিক উৎসমুখে ফেলে যতো শিলা ও পাথর- কবিতাকে বন্দী করে, সৌন্দর্যকে পরায় শৃঙ্খল।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
ভূদৃশ্য এমন হয় চতুর্দিকে অদম্য পাহাড়, বাবলার ঝোপ পাশে মানুষের খেয়ালি বসতি, কাদামাটি ধুলোর বিস্তার কেউ করে গান, কেউ অশ্রু ফেলে, নিমজ্জিত ঘর আর বাড়ি, ভূদৃশ্য এমন হয় মাঝে নদী মাথায় আকাশ, উঁকি দেয় ছেঁড়া চাঁদ, গাঢ় পাতা, হাস্যহীন কলরোলহীন তবু পাড়া- মানুষ ফেলেছে তাঁবু বহুদূর বনের পশ্চাতে কিন্তু চিতাবাঘ আর প্রফুল্ল হরিণ জল খায় ঘোরে ফেরে বাৎসল্যে দ্বিধায় হঠাৎ আক্রান্ত কেউ মৃত্যু এসে নিয়ে যায় তাকে, এই খেলাধুলা ভূদৃশ্য এমন হয় চারদিকে উড়ন্ত পাহাড় পাশে সামাজিক নদী মানুষের ব্যবহার মেঘ ধরে মেঘ বন্দী করে তার ক্ষেতে ও টিলায়!
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
মানুষ সহজে ভুলে যায়, আমি ভুলতে পারি না এখনো শিশির দেখে অশ্রুভেজা চোখ মনে পড়ে, সবুজ অরণ্য দেখে মনে পড়ে স্নেহের আঁচল ভোরের শিউলি দেখে শৈশবের স্মৃতি চোখে ভাসে। মানুষের মতো আমি এতো বেশি স্বাভাবিক নই আমার নিশ্বয় কিছু স্নেহমায়া, পিছুটান আছে, শোকদুঃখ, ভালোবাসা আমাকে এখনো দগ্ধ করে পাথরের মতো এতোটা নিস্পৃহ আমি হতে পারি নাই। মানুষ সহজে ভুলে যায়, বেশ ভুলে যেতে পারে আমি এ-রকম ভুলতে পারি না। শুধু মনে পড়ে, জল দেখে মনে পড়ে, মেঘ দেখে মনে পড়ে যায় আঁধারে হারালো যারা সেইসব হারানো মানুষ। কোথাও পাবো না তারে বৈশাখে কি ব্যথিত শ্রাবণে মানুষ সহজে ভোলে, আমি কেন ভুলতে পারি না?
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
আমি হয়তো কোনোদিন কারো বুকে জাগাতে পারিনি ভালোবাসা, ঢালতে পারিনি কোনো বন্ধুত্বের শিকড়ে একটু জল- ফোটাতে পারিনি কারো একটিও আবেগের ফুল আমি তাই অন্যের বন্ধুকে চিরদিন বন্ধু বলেছি; আমার হয়তো কোনো প্রেমিকা ছিলো না, বন্ধু ছিলো না, ঘরবাড়ি, বংশপরিচয় কিচ্ছু ছিলো না, আমি ভাসমান শ্যাওলা ছিলাম, শুধু স্বপ্ন ছিলাম; কারো প্রেমিকাকে গোপনে বুকের মধ্যে এভাবে প্রেমিকা ভেবে, কারো সুখকে এভাবে বুকের মধ্যে নিজের অনন্ত সুখ ভেবে, আমি আজো বেঁচে আছি স্বপ্নমানুষ। তোমাদের সকলের উষ্ণ ভালোবাসা, তোমাদের সকলের প্রেম আমি সারি সারি চারাগাছের মতন আমার বুকে রোপণ করেছি, একাকী সেই প্রেমের শিকড়ে আমি ঢেলেছি অজস্র জলধারা। সকলের বুকের মধ্যেই একেকজন নারী আছে, প্রেম আছে, নিসর্গ-সৌন্দর্য আছে, অশ্রুবিন্দু আছে আমি সেই অশ্রু, প্রেম, ও নারী ও স্বপ্নের জন্যে দীর্ঘ রাত্রি একা জেগেছি; সকলের বুকের মধ্যে যেসব শহরতলী আছে, সমুদ্রবন্দর আছে সাঁকো ও সুড়ঙ্গ আছে, ঘরবাড়ি আছে একেকটি প্রেমিকা আছে, প্রিয় বন্ধু আছে, ভালোবাসার প্রিয় মুখ আছে সকলের বুকের মধ্যে স্বপ্নের সমুদ্রপোত আছে, অপার্থিব ডালপালা আছে। আমি সেই প্রেম, সেই ভালোবাসা, সেই স্বপ্ন সেই রূপকথার জীবন্তমানুষ হয়ে আছি; আমি সেই স্বপ্নকথা হয়ে আছি, তোমাদের প্রেম হয়ে আছি, তোমাদের স্বপ্নের মধ্যে ভালোবাসা হয়ে আছি আমি হয়ে আছি সেই রূপকথার স্বপ্নমানুষ।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তুমি দিয়ে শুরু একটি বাক্য শেষ তার তুমিহীন- একেই আমরা বলেছি তো প্রেম, বিচ্ছেদ চিরদিন।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তুমি যদি আমাকে না ভালোবাসো আর এই মুখে কবিতা ফুটবে না, এই কণ্ঠ আবৃতি করবে না কোনো প্রিয় পঙ্‌ক্তিমালা তাহলে শুকিয়ে যাবে সব আবেগের নদী। আমি আর পারবো না লিখতে তাহলে অনবদ্য একটি চরণ, একটিও ইমেজ হবে না রচিত, তুমি যদি আমাকে না ভালোবাসো তবে কবিতার পান্ডুলিপি জুড়ে দেখা দেবে ঘুরে ঘুরে অনাবৃষ্টি, খরা। তুমি যদি না তাকাও এই চোখ দেখবে না কিছু উজ্জ্বল আলোর ভোর ঘন অন্ধকারে ঢেকে যাবে, সন্ধ্যাতারা মনে হবে মৃত নিষ্পলক চোখ যদি ফিরে না তাকাও মর্মে আর পল্লবিত হবে না কবিতা। তুমি যদি না দাও চুম্বন এই মুখে ফুটবে না ভাষা মরা গাঙে জাগবে না ঢেউ, দুই তীরে প্রাণের স্পন্দন, হবে না শস্যের মাঠে শ্রাবণের ব্যাপক বর্ষণ হৃদয়ে হৃদয়ে আর অঙ্কুরিত হবে না কবিতা, বাজবে না গান। তুমি যদি আমাকে না ভালোবাসো আর প্রকৃতই আমি আগের মতন পারবো না লিখতে কবিতা আমার আঙুলে আর খেলবে না জাদুর ঝিলিক, এই শাদা পৃষ্ঠা জুড়ে ফুটবে না জুঁই আর চাঁপা। একবার ভালোবেসে দেখো, একবার কাছে ডেকে দেখো আবার আগের মতো কীভাবে ফুটাই এক লক্ষ একটি গোলাপ অনায়াসে কীভাবে আবার অনুভূতি করি সঞ্চারিত, একবার ভালোসেবে দেখো আবার কীভাবে লিখি দুহাতে কবিতা।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
ঢাকার আকাশ আজ মেঘাচ্ছন্ন, মাধবী এখন তুমি বাইরে যেও না এই করুণ বৃষ্টিতে তুমি ভিজে গেলে বড়ো ম্লান হয়ে যাবে তোমার শরীর এই বৃষ্টিতে ঝরে যদি কারো হিমে তোমার কোমল দেহের আদল মাধবী বৃষ্টিতে তুমি বাইরে গেও না। মাধবী তুষারপাতে বাইরে যেও না। এ শহরে বৃষ্টি এলে আমি ভেসে যাই কান্নার করুণ ভেলায় হাতে নিয়ে তোমার একদা দেয়া উপহারের গোপন অ্যালবাম এই তুষর বৃষ্টিতে যদি সব ছবি মুছে গিয়ে লেগে থাকে জলের গভীর চিহ্ন শুধু জল, আমার কান্নার মতো করুণ কোমল সেই জল, সেই তুষারের দাগ আমি যদি ভেসে যাই এমনি অথই তুষারজলে তুমি তবু নিরাপদে থাবো সেই হৃদয়ের হৃতরাজ্যে কোনোদিন আর ফিরে যাবো না, যাবো না সেখানে প্রত্যহ এক আততায়ী যুবকের বহুবিধ কঠিন শসন ; শহরে বৃষ্টি এলে গলে গলে পড়ে সব ময়লা কফ বিভিন্ন অসুখ শোকের তুষার জলে বড়ো ভয়, মাধবী তুমি তাই বাইরে এসো না সেই ভালো আমার জীবনে তুমি সুবিখ্যাত কিংবদন্তী হয়ে থাকো আজ।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তুমি শুদ্ধ করো আমার জীবন, আমি প্রতিটি ভোরের মতো আবার নতুন হয়ে উঠি, হই সূর্যোদয় আমার জীবন তুমি পরিশুদ্ধ করো, আমি প্রস্ফুটিত হই আমি বহুদিন ঝরা ব্যথিত বকুল অন্ধকারে, আমি বহুদিন বিষন্ন বিধুর ; একবার আমার মাথায় হাত রাখো, সুপ্রসন্ন হও এই দগ্ধ বুকে করো শ্রাবণের অঝোর বর্ষণ আমি শ্যামল সবুজ বৃক্ষ হয়ে উঠি । তুমি শুদ্ধ করো আমার জীবন, আমি হই সূর্যোদয়, আমি হই উদিত আকাশ আমি হয়ে উঠি প্রতিটি শিশুর হাতে প্রথম বানান শেখা বই, হয়ে উঠি ভোরবেলাকার পাখিদের গান ; আমার জীবন তুমি শুদ্ধ করো, আমি হই নতুন সবুজ কোনো দ্বীপ, আমি হই বর্ষাকাল, আমি হই বরষার নব জলধারা আমি বহুদিন ব্যথিত বিষাদ, আমি বহুদিন একা ঝাউবন । তুমি শুদ্ধ করো আমার জীবন, আমি হয়ে উঠি সদ্যফোটা ফুল আমি হয়ে উঠি সকালের ঘুমভাঙ্গা চোখ ।
মহাদেব সাহা
ভক্তিমূলক
মুখ দেখে তোমাকে চিনেছি, দুঃখে নয় আনন্দে আমার মৃত্যু হবে আমি সন্দেহ করি না তবু স্নেহে জেনেছি তুমি সেই প্রিয় মৃত্যুসখা তুমি সেই প্রিয়তম মানুষের প্রত্যাশিত মুখ শীতগ্রীষ্মে তোমাকেই স্মরণ করেছি। একদিন গ্রাম ছেড়ে গৃহস্থালি ছেড়ে নদীর ভাঙন ছেড়ে এসেছি এখানে এই শহরের আলোকিত উৎসবের নিচে, ব্যবধানে মনে হয় তোমরা সবাই আজ আমার মৃত্যু চাও নিকটে তাকালে তার নিদর্শন দেখি, বড়ো ভীত হই, এমন কবিত্ব কিছু নয়, প্রকৃতই মরিতে চাহি না। শুনেছি শীতের শেষে এইখানে সমারোহ হবে হাওয়ায় উদ্ভিদে ঘাসে ফুলেজলে নতুন পাতায় সমস্ত বোধের উৎস খুলে যাবে আর মানুষের উৎসাহ জাগাবে, সে-রকম সুখী হবে লোকে। আমি তাই আয়ত্তের অধিক চলেছি যেন এইভাবে উড়িয়ে পুড়িয়ে আমি ঝরে খসে যাই। শুধু মনে মনে ভয় পাছে তৃপ্তি পাই পাশে সুখী হই পাশে মৃত্যু হয়, বিবাহিত সুখ তাই স্পর্শও করেনি, কামে প্রেমে আরো হয়েছি সন্ন্যাসী, সুখী আমি একথা বুঝেছি আজ ভিতরে বাহিরে তাই ঘরছড়া তাই অন্যমুখী তাই এভাবে উড্ডীন একদিন ভালোবাসা ছাড়া আর অন্য খেলা আমার ছিলো না আজ বড়ো ভয় পাই ভালোবেসে যদি বন্দী হই তাই জড়ত্বে সঁপেছি, অন্ধকারে হাওয়া এসে লাগে এই মূক বন্দী প্রাণে আমি টের পাই। তোমাকে চিনেছি আমি মুখ দেখে ব্যবহার দেখে, তুমি দুঃখ নও তুমি শারীরিকভাবে সহনীয়, তুমি সুখ, এইখানে এই সুখে আমার মৃত্যু হবে।
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
কাকে ভালোবাসে, কাকে করে প্রত্যাখ্যান, না বুঝেই কাকে বা পরায় মালা, কাকে ছুঁড়ে ফেলে। এই মূঢ় মানুষেরা বোঝেনা কিছুই, মূর্তি ভাঙে, উন্মত্ত উল্লাসে মাতে এমনকি ফেলে না চোখের জল যার জন্য প্রকৃতই হাজার বছর কাঁদবার কথা; বিশ শতক শেষের এই পৃথিবীকে আজ বড়ো অবিম্বাসী বলে বোধ হয়, মানুসের কোনো মহৎ কীর্তি আর ত্যাগের স্বাক্ষর ধারণ করে না এই কুটিল সময়- আজ সে কেবল শূন্যতাকে গাঢ় আলিঙ্গন করে, পৃথিবীর এই আদিম আঁধারে বুঝি যায়, সবই অস্ত যায়।
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
মেঘ নই আমি জলধারা দেবো তোমাদের তৃষিত মানুষ! আমি অসীম নীলিমা নই ছাড়া দেবো, মায়া দেবো ব্যথিত মানুষ, এমন হৃদয়ভরা ভালোবাসা কই! তোমাদের কারো ঘরে কোনো ফুল ফোটাবো কখনো হাসিরাশি দেবো উপহার তার মতো কিছুই তো নেই, আমার আঙুলগুলি এতো বেশি আলোকিত নয় অসুখী মানুষ, ছোঁবে আর সেরে যাবে তোমার অসুখ! আমার তো বুক নয় নক্ষত্রখচিত কিংবা জ্যোৎস্নাজড়ানো তোমাদের গৃহে আলো দেবো, অন্ধকারে আনত মানুষ এমনকি মাটির প্রদীপ যদি হতো এই বুক টিমটিম তোমাদের ঘরে জ্বলতাম! আমি তো শিশির নই তোমাদের রুক্ষ পথ স্নেহসিক্ত করি শালবন নই আমি তোমাদের শ্যামল আতিথ্যটুকু দেবো! কোনো কুলকুল নদী নই আমি তোমাদের শস্যক্ষেতে উর্বরতা প্রবাহিত হবো অরণ্যউদ্ভিদ নই তোমার দুঃখের পাশে ফুটে থাকবো চাঁপা কি বকুল! আমি তো শিউলি নই তোমাদের জন্য ভোরে শুভ্রশয্যা বিছাবো তেমন তৃণ নই বুক পেতে দেবো মাথা রেখে অবসাদে শোবে, কোনো ঝরাপাতা নই বন হবো, ভালোবেসে টুপটাপ সারারাত ঝরবো শিথানে। ব্যথিত মানুষ, আমি ছায়া দেবো বনভূমি নই! আমি শুধু দিতে পারি শোভাহীন একগুচ্ছ গান।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তুমি যখন প্রশ্ন করো আমি কি তোমায় ভালোবাসি? অন্ধকারে লুকিয়ে মুখ আমি নিজের মনেই হাসি । উত্তরে কি বলবো বলো বিশ্বকোষেও হয়তো নাই, উথালপাথাল খুঁজে মরি কোথায় যোগ্য শব্দ পাই । জানো কি এই প্রশ্নে তোমার হঠাত্ থামে নদীর ধারা আকাশখানি কালো করে মেঘে ঢাকা সন্ধ্যাতারা । তার চেয়েও গভীর ঘন লজ্জা ঢাকে আমার মুখ পাইনে খুঁজে একটি কথাও শঙ্কা ভয়ে কাঁপে বুক । এতোদিনেও বোঝেনি যে আজ বোঝাবো কোন ভরসায়? না বলা সেই ছোট্টো কথা বলিনি কি কোনো ভাষায়? বলিনি কি এই কথাটি তোমার দিকে নীরব চেয়ে, এই গান কি সারাজীবন জীবন দিয়ে যাইনি গেয়ে? সেই কথা তো জানে ভালো শিশির ভেজা ভোরের ফুল তুমি যখন প্রশ্ন করো আমি করি অধিক ভুল; ।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
আর যে-ই হোক, ভালোবাসা, আমি তোমার যোগ্য নই- তুমি যে বিমুখ সে-দুঃখ তাই নিজেই নীরবে সই।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
অভাব দিয়ে প্রিয়, তোমার মুছিয়ে দিলাম মুখ, ফোটেনি ফুল, ঝরেনি জল ভেঙেছে যতো বুক! তোমার চেয়ে সে-কথা ভালো কে আর জানে প্রিয়, না-থাকাগুলি দিয়েই তোমায় করেছি স্মরণীয়!
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তোমার হাতের জল পেলে শুধু এই তৃষ্ণা যাবে না হলে যাবার নয় এই তৃষ্ণা, এই গ্রীষ্মকাল। তোমার হাতের জল ছাড়া ভিজবে না পোড়া জমি এই পোড়ামাটির মানুষ; তোমার হাতের জল পেলে তাই ফিরে পাবো এ জীবনে ফের সুসময় সমস্ত অসুখ থেকে আবার উঠবো হয়ে ভলো। তোমার হতের জল ছাড়া এই চারা কিসে বাঁচে, কিসে পল্লবিত হয় বলো এই শষ্ক ডালপালা? তোমার হাতের জল পেলে মেলে অপর্থিব সুখ মুহূর্তেই হয়ে উঠি পরিপূর্ণ সবুজ, সতেজ। এমন বর্ষণে তবু ভেজৈ নাই দেখো এই বুক সমুদ্র সামান্য যেন তোমার হাতের জল ছাড়া; তোমার হাতের জল একফোঁটা শুধু যদি পাই, কাঁটার বিরুদ্ধে আমি অনায়াসে বুনে যাবো ফুল।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তোমার দেখা না পেলে একটিও কবিতা হবে না দুই চোখ কোথাও পাবে না খুঁজে একটি উপমা, কবিতার পান্ডুলিপি হবে দগ্ধ রুক্ষ মরুময় তোমার দেখা না পেলে কাটবে না এই দু:সময়। তোমার দেখা না পেলে সবখানে গোলযোগ হবে দুর্ঘটনা,যানজট,বিশৃঙ্খলা বাড়বে কেবল, সর্বত্র বাড়বে রোগ,অনাবৃষ্টি আর দীর্ঘ খরা প্রত্যহ বাধবে শুধু কলহ-কোন্দল আর যুদ্ধ-হানাহানি তোমার দেখা না পেলে হবে শুষ্ক এই জলাশয়, তোমার দেখা না পেলে বাঁচবে না কবির হৃদয়।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
কোথায় কেমন আছ তুমি প্রিয় ষাটের দশক তোমার কি এখন খুবই কষ্ট, তুমি খুবই একা, দরোজায় তোমার কি শুধু দীর্ঘশ্বাস গ্রিলে বিষণ্ন গোধূলি? কোথায় তোমার সেই উদ্দাম অশ্বের গতিবেগ, মধ্যরাতে কাঁপানো ফুটপাত- রক্তমাংসে পরস্পর ভালোবাসাবাসি, সেই বাঁধভাঙা অথই জোয়ার আজ এই বয়সের ভাঁজপড়া তোমার মুখের দিকে আমি আর তাকাতে পারি না; প্রিয় ষাট, কোথায় তোমার সেই আলোকিত ডানা চিতার চোখের মতো ভীষণ উজ্জ্বল দুটি চোখ, বুকে অজস্র প্রেমের পঙ্‌ক্তিমালা- কোথায় তোমার সেই হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে অবাধ্য উত্তাল কেশরাশি চলেছো কেমন একা দুপুরের খররৌদ্রে ঢাকার রাস্তায়, এখন এসব কিছু শুধু অতীতের দূর ম্লান স্‌সৃতি এখানে ওখানে তুমি মাত্র স্মৃতির পাথর- কোথঅওবা সকরুণ মৌন এপিটাফ, এখন তোমা রদিকে প্রিয় ষাটের দশক মুখ তুলে তাকাতে পারি না। নিজেরই আমর ভয় করে এখন তোমার সাথে বাক্যালাপ করে কী রকম স্বার্থপর, দারুণ হিশেবী হয়ে গেছো তুমি- মেপে মেপে মদ্যপান করো, সিগারেট একটি কি দুটি, নানা অসুখ বেঁধেছে বাসা তোমার শরীরৈ- কারো বক্ষে, শিরদাঁড়ায়, কারো হৃৎপিণ্ডে, পাকযন্ত্রে কারো রক্তে শর্করা, কারো উচ্চ রক্তচাপ উত্তর-চল্লিশে এই বিভেদের বিরূপ বাতাসে সবাই বিচ্ছিন্ন একা একা; তোমার লাবণ্য আর রূপ বুঝি শীতের বিবর্ণ পাতা মতো যায়, ঝরে যায়। প্রিয় ষাটের দশক, আমাদের সবুজ সোনালি দিনরাত এখনো তোমার সেই অসম্ভব মায়াময় সুন্দর মুখটি মনে পড়ে, তোমার দুফোঁটা অশ্রু, নিবিড় আবেগ, সবচেয়ে হার্দ্য অনুভূতি, প্রেম, ঘৃণা, তীব্র উত্তেজনা এখনো তোমার সেই সুখদুঃখ আর স্মৃতি বুকে নিয়ে বহুরাত একা জেগে থাকি; দুঃখ করো না, প্রিয় ষাট, আমাদের সোনালি যৌবন শোনো তাহলে তোমার কানে কানে বলি- এখনো তোমাকে আমি ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
আমার কাছে কেউ কেউ জানতে চায় পৃথিবীর কোন নারীকে আমি প্রথম ভালোবাসি কেউ কেউ জানতে চায় কাকে আমি প্রথম চিঠি লিখি, কেউ বলে, প্রথম গোপনে কোন নামটি আমি লিখে রেখেছিলাম; প্রথম আমি কী দেখে মুগ্ধ হই, প্রথম কার হাত ধরি আমার প্রথম স্মৃতির এই সব প্রশ্নে আমি ঠিক কিছুই বলতে পারি না, বোকার মতো চেয়ে থাকি।প্রথম অশ্রুবিন্দুর কথা কার মনে থাকে, তারপর এতো বৃষ্টি এতো বর্ষা মাটির শ্লেটে প্রথম যে অক্ষর লিখেছিলাম আমি তা আর কিছুতেই কারো কাছে বলা যাবে না, প্রথম কবে সেই রাজহাঁসটিকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরেছিলাম সেই শিহরণ কবে বাতাসে মিশে গেছে, পুকুরপাড়ের ঘাটলার সিঁড়িতে যে নাম প্রথম খোদাই করেছিলাম আমি এতোদিনে চোখের জলে তার কোনো চিহ্নই আর নেই আমি সেই আদ্যক্ষর কী করে দেখাব?আমি কী করে দেখাব প্রথম স্বপ্ন দেখে আমি কীভাবে সারারাত কেঁদেছিলাম, ভালোবাসা কথাটা প্রথম বলতে গিয়ে কত লক্ষবার মুখ ঢেকেছি আমি, প্রথম কবে আমি বর্ষণ দেখলাম পৃথিবীতে কবে প্রথম পাখির ডাক শুনলাম, সন্ধ্যাতারা দেখলাম না, না, সেসব কিছুই আর আমার মনে নেই কারোরই মনে থাকে না।কবে কে আমার হাতে লুকিয়ে একটি গোলাপ ফুল দিয়েছিল বইয়ের ভাঁজে রেখে দিয়েছিল একখানা লাজুক চিঠি কে বলেছিল কানের কাছে কোকিলের মতো মাতাল করা একটি শব্দ সেসব কিছুই আর আমার মনে নেই, মনে নেই।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তরুণ প্রেমিক তুমি তো জানো না তোমার উতল আলুথালু প্রেম একদিন ছিলো আমারই আকাশে উদাসীন মেঘ, মাতাল নৌকা- সারারাত বেয়ে জ্যোৎস্নার খেয়া ভোরবেলা হাতে ব্যর্থ কুয়াশা তুমি তো জানো না এসব কাহিনী ঝরে গেছে কতো যামিনীর চাঁদ, তবু যে প্রেমিক আজো খুঁজে পাও কোথাও স্বপ্ন, কোথাও গন্ধ কোথাও স্মৃতির স্নিগ্ধ বকুল কুড়াও এখনো তেমনি বিভোর তুমি তো জানো না তুমি তো জানো না বকুলগুলি যে কার ব্যর্থতা! তরুণ প্রেমিক আমি ঠিকই জানি তুমি তাকালেই খুলবে পাপড়ি মেঘ জমা হবে আবেগে তোমার; কিংবা নদীর দূর মোহনায় ভাসবে আবার তোমাদেরই নামে অনাদি কলস! তরুণ প্রেমিক তুমি তো জানো না তোমার উতল আলুথালু প্রেম একদিন ছিলো আমার এ-বুকে বিয়াত্রিচের ব্যথিত তৃষ্ণা তাই ঘুরে মরি অন্ধ নরকে ভীষণ একাকী আহত দান্তে তুমি তো জানো না তুমি তো জানো না অর্ফিয়ুসের কর্তিত মাথা তবু করি এই পুরাতন গান যে-গান এখনো তোমার শোণিতে লেখে চিরায়ত করুণ কাব্য তোমার মতোই তরুণ প্রেমিক আমি কি ধরিনি বেদনার হাত ছুঁইনি কি তার অধীর ওষ্ঠ তোমার মতোই আমি একদিন? সুন্দর বলে ভুল করে আমি সেই বেদনাকে নিয়েছি বক্ষে তরুণ প্রেমিক তুমি তো জানো না তোমাদের আগে এখানে ঝরেছি! তরুন প্রেমিক তুমি তো জানো না তোমার উতল আলুথালু প্রেম একদিন ছিলো আমারই চোখের অতৃপ্ত নেশা, চিরজাগরণ তোমার মতোই মেঘে মেঘে আমি খুঁজেছি হরিণ, অশোকগুচ্ছ কিংবা খুঁজেছি দূর নভে কোনো গাঢ় ম্যানসন পাইনি তবুও বাড়িয়েছি হাত তোমার মতোই কেবল শূন্যে ভেবেছি হয়তো সেখানেই আছে হাড়ের গায়ে কোমল ঝর্ণা কুলুকুলু নদী আর তার পাশে ফুটে আছে বুঝি আমার কাম্য তোমার মতোই তরুন প্রেমিক আমিও একদা খুঁজেছি অলীক! তরুণ প্রেমিক তুমি যে ভাসাও স্বপ্ন বোঝাই এই সাম্পান তুমি তো জানো না ভিড়বে কিনা সে তোমার সবুজ নির্জন দ্বীপে তবু যে প্রেমিক আজো করো তুমি আকাশকুসুম তেমনি চয়ন তেমনি আজো যে নগ্ন দুহাতে তুলে নাও তুমি রঙিন গোধূলি তোমার মতোই আমিও একদা রাতের শিশিরে ভরেছি পকেট! তরুন প্রেমকি তুমি তো জানো না তোমার উতল আলুথালু প্রেম আমার বুকের কোথায় লালিত, কতোদিন তাকে দিয়েছি আহার তরুণ প্রেমিক তোমাদের হাসি, তোমার কুজন তুমি তো জানো না আমারই বুকের ঝরাপাতাদের গান!
মহাদেব সাহা
স্বদেশমূলক
আজ আর কীভাবে তোদের কাতর মুখের দিকে চেয়ে বলি কোথাও তোদের জন্য একখণ্ড জমি যদি নাও থাকে তবুও আছে তোদের পিতার এই বুক, যে-কোনো সবুজ জমির চেয়ে স্নেহচ্ছায়াময়, অধিক সবুজ; যে-কোনো নদীর চে’ও জলময় তোদের এ পিতার হৃদয় আজ কী করে তোদের বলি, তোদের পিতার এই দুটি চোখ পৃথিবীর সব আশ্রয়ের চে’ও নিরাপদ অনন্ত আশ্রয় এই তোদের অক্ষম পিতার দুইখানি হাত তোদের আগলে রাখার জন্য যে-কোনো কিছুর চেয়ে বেশি কার্যকর, শক্তিশালী- আজ আর কীভাবে তোদের বলি এই পিতৃহৃদয় প্রেইরী অঞ্চলের চেয়েও তৃণাচ্ছাদিত ছায়াময়; বড়ো ভয় হয় অক্ষম পিতার এই নিস্ফল আশ্বাস শুনে যদি তোমরা না পাও ফিরে মনোবল কিংবা সাহস আজ তাই বারবার ভাবি কীভাবে তোদের কাতর মুখের দিকে চেয়ে বলি এইসব কথা!
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
আমি কি কিছুর মতো? কারো মতো? কোনো সদৃশ বস্তুর মতো? যে আমাকে মেলাবে, সোনালি ঝর্নার সাথে, সবুজ বৃক্ষের সাতে, নদী বা তারার সাথে? আমি কি কিছুর মতো? শিশু ও শিল্পির মতো? রদাঁর মূর্তির মতো? হয়তোবা পাখি, হয়তোবা ফুল, হয়তো সে দরবেশ আমি এ কিসের মতো?- যে আমাকে মেলাবে; চাঁদের বর্ণের মতো? টিয়ার চোখের মতো? অরণ্যে শিলার মতো? আমি ঠিক কিসের মতন না ঝর্ণার সদৃশ, পাখির সমান, না বৃক্ষের তুলনা আমি কি নদীর শব্দ, পাতার শিশির নাকি কোনো যুবতীর রাঙা অভিমান! আমাকে যা ভাবো, ধরো হাতের অঙ্গুরি মেঘ, ভাঁটফুল, সিংহের আকৃতি, আমি ঠিক কিসের মতন, কার মতো? কোনো সদৃশ বস্তুর মতো? আমাকে যা ভাবো, ধরো নদী, ধরো স্তল, ধরো অগ্নি, আমি বস্তুত স্বভাব।
মহাদেব সাহা
প্রকৃতিমূলক
এমন চৈত্রের রাতে আমি লিখি শ্রাবনের গান বর্ষণ থামেনি আজো দুই চোখ জলে ভাসমান, সবাই উল্লাসে মাতে, চৈত্রনিশি করে উদ্‌যাপন আমর ফাল্গুন নেই চৈত্রে নামে অঝোর শ্রাবণ। এই চৈত্রে আমি বড়ো ভয়ানক মনঃকষ্টে আছি এতো যে ফুটেছে ফুল আমি তবু দুঃখ পেয়ে বাঁচি, সকলেই চৈত্রে সব দেখে-শোনে, আয়োজন করে আমি এই চৈত্রে আরো মরে যাই বাহিরে-ভিতরে। সবাই এনেছে ফুল, সকরেই শুনেছে আহ্বান আমাকে ডাকেনি কেউ আমি কারো শুনি নাই গান, এমন চৈত্রের রাতে দুঃখ পাই, কাঁদে বড়ো মন সবার ফুলের মাস এই চৈত্রে আমার শ্রাবণ।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
তোমার দুঃখের সাতমহল বাড়ির পুরনো বাসিন্দা বলেই আমি হৈচৈ শামিয়ানার নিচে যাই না, ভালোবাসার জন্য ব্যাকুলতা আছে বলেই তো রঙিন কুয়াশা কুড়াতে যাই না কোথাও- ঝরা বকুলের জন্য ব্যাকুল হয়েছি বহুবার কিন্তু বিদেশী খেলনার দিকে ছুটিনি নক্ষত্রপুঞ্জকে ডলার ভেবেছি বলেই আমি বসে আছি এমন তোমার পথ চেয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের কোনো বিমান ধরার তাড়া নেই আমার, তবু তোমার চোখ যদি একবার অশ্রুসজল হয়! কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই আমার, কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই আমি আরো বহুদিন তোমার দুঃখের সাতমহল পাহাড়া দিতে পারবো তুমি যতো অপেক্ষা করতে বলো আমি তার চেয়েও বেশি প্রস্তুত আমি শুধু দেখতে চাই তোমার চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রু গড়াতে গড়াতে কীভাবে সোনার খনি গড়ে ওঠে- আর কোনো তাড়া নেই আমার, কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই!
মহাদেব সাহা
রূপক
গোলাপ বিষয়ে কোনো সূক্ষ্ম অনুভূতি প্রেমিকের মতো কোনো গভীর মুগ্ধতা- আমার তেমন কিছু নেই; গোলাপের কাছে আমি পর্যটক, বিদেশী পথিক বড়ো জোর এমন সম্পর্ক হে বন্ধু বিদুয়, দেখা হবে। আমি তাই গোলপকে গোলাপ বলি না বলি মহিমার ফুল, বলি মৃত্যু, বলি মর্মান্তিক। সম্পূর্ণ নির্দোষ নগ্ন, আঙুলে কাঁটার কালো ক্ষত কালো বিষ, কালো অন্ধ প্যারিসের পতের ভিক্ষুক, পাপী ঘোর গৃহত্যাগী। গোলাপ সম্পকে ঠিক নদীর মতন সম্পূর্ণ ধারণা কিছু নেই গোলাপ বিষয়ৈ জ্ঞান বড়ো অসম্পূর্ণ, গোলাপ, তোমাকে ঠিক বুঝতে পারি না। হয়তো নদী সম্পর্কে আমার এক ধরনের দুর্বলতা আছে কোথাও কোনোভাবে নদীর কাছে বাঁধা পড়েছি, তাই বলে গোলপবিরোধী আমি নই এখনো বহু রাত আমি গোলাপের স্বপ্নে ঘুমাতে পারি না দৃঢ়বন্ধে জপটে ধরি গোলাপ, গোলাপ ভেবে ঘুম ও মৃত্যু, নিঃসঙ্গতা গোলাপ বস্তুত এই ঘুমের মঘ্যে স্বপ্ন; জেগে উঠেই গোলাপ দেখি রক্তমাখা, গোলাপ দেখি কলুষকালো গোলাপ দেখি গভীর গোপন অসুস্থতায় অবসন্ন, মর্মে ভীষণ বিষের ফণা। সেই একবার বাল্যে আমি গোলপ ছুঁয়ে সংজ্ঞা হারিয়েছিলাম আরো একবার কৈশোরে গোলাপ দেখে আতঙ্কিত, তারপর পর্যটনে নেমে একে একে গোলাপ বিষয়ৈ এই অভিজ্ঞতা। এখন গোলাপ বিষয়ে আমার তেমন কোনো সূক্ষ্ম অনুভূতি নেই গোলাপ বিষয়ে আমার জ্ঞান বড়ো অস্বচ্ছ, বড়ো অগভীর তাকে যতোটা জানি সে মাত্রই একজন পর্যটকের মতো কিংবা একজন কৃষকের মতো। এক সময় গোলাপের মধ্যে আমি নদীর কুলুকুলু কান্না শুনেছিলাম মানুষের বিশুদ্ধ আত্মপ্রকাশের শিল্প দেখেছিলাম গোলাপের সৌন্দর্যে। সেই মুগ্ধতা এখন আমার নেই, সত্যি বলছি গোলাপ বিষয়ে এখন আমি সাধারণ একজন কৃষক মাত্র; ঠিক গোলাপ নয় আমি অরণ্য-উদ্ভিদ খুঁজতে এসেছি হয়তো পাথর তুলতে এসেছি তবু আমি গোলাপকে গোলাপ বলি না বলি স্বপ্ন, বলি মৃত্যু, বলি মর্মান্তিক।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
শরীর জুড়ে আমার শুধু ভালোবাসার গন্ধ কেউ বা তাকে ভালো বলে কেউ বা বলে মন্দ; আকাশে মেঘ হৃদয়ে ঝড় যতোই চলে দ্বন্দ্ব তুমি ঠিকই জানো আমি ভালোবাসায় অন্ধ!
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
আমি একটি বন্ধু খুঁজছিলাম যে আমার পিতৃশোক ভাগ করে নেবে, নেবে আমার ফুসফূস থেকে দুষিত বাতাস ; বেড়ে গেলে শহরময় শীতের প্রকোপ তার মুখ মনে হবে সবুজ চয়ের প্যাকেট, এখানে ওখানে দেখা দিলে সংক্রামক রোগ, ক্ষয়কাশ উইয়ে-খাওয়া কারেন্সি নোটের মতো আমার ফুসফুসটিকে তীক্ষ্ণ দাঁতে ছিদ্র করে দিলে, সন্দেহজনকভাবে পুলিশ ঘুরলে পিছে, ডবল ডেকার থেকে সে আমাকে ফেলে দেবে কোমল ব্যান্ডেজ, সে আমাকে ফেলে দেবে ট্রান্সপেরেন্ট পাদুর রুমাল, আমি যাবো পাথি হয়ে পুলিশ-স্কোয়াড থেকে জেনেভায় নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে, বলবো- আমি প্রেমিকার পলাতক গুপ্তচর ; সে এসে অন্ধকারে চতুর চেরের মতো আমার পকেট থেকে নেবে সব স্তলপদ্মগুলি বলবে কনের কাছে চুপিচুপি অসম্ভব বদমাশ সে, -চল্‌ ঘুরে আসি রাতের শো থেকে তারপর নিয়ে যাবে ক্রমাগত ভুল ঠিকানায় তবু সেই ভীষণ বদমাশটা আমার সমস্ত ভুল ভাগ করে নেবে, ওর সমস্ত পাপ লিখে যাবে আমার ডায়েরিতে আমার পাপ হাতে নিয়ে ধর্মযাজকের মতো অহঙ্কারে ঢুকবে গির্জায় আমি এই ঢাকা শহরের সর্বত্র, প্রেসক্লাবে, রেস্তরাঁয়, ঘোড়দৌড়ের মাঠে এমন একজন বন্ধু খঁজে বেড়াই যাকে আমি মৃত্যৃর প্রাক্কালে উইল করে যাবো এইসব অবৈধ সম্পত্তি, কুৎসা আমার লাম্পট্য, পরিবর্তে সে আমার চিরদিন যোযাবে ঘুমের ওষুধ আমার অপরাধের ছুরি রেখে দেবে তার বুকের তলায়, আমার পিতার কাছে চিঠি দেবে এই বলে-ওর কথা ভাববেন না, ও বড়ো ভালো ছেলে নিয়মিত অফিস করে দশ টা পাঁচটা ; অথচ সে জানবে আমার সব বদঅভ্যাস, স্বভাবের যাবতীয় দোষ তবু সে যাবে আমার সাথে ক্যামেরায় ফিল্ম ভর্তি করে নিয়ে আত্মহত্যাকারী এক যুবকের ছবি তুলে নিতে, অবশেষে মফস্বল শহরগামী কোনো এক ট্রেন চড়ে নেমে যাবে আমার সাথে ভুল ইস্টিশনে; এখনে ওখানে সর্বত্র আমি একটি বন্ধু খুঁজছিলাম যে আমাকে নিয়ে যাবে সুন্দরবনে হরিণ শিকারে, হরণের শিং থেকে তার স্বচ্ছ খুর থেকে খুঁটে নেবে দামী অংশগুলি যেন ও গাভীর খুর থেকে বানাবে বোতাম, সে আমাকে প্রতিদিন ধার দেবে লোভ, এখনে সেখানে শহরের পরিচিত অঞ্চলগুলিতে আমি সেই করল সাঙাতটিকে খুঁজি, আমি শুধু সারাজীবন একটি বন্ধুর জন্য প্রত্যহ বিজ্ঞাপন দিই কিন্তু হায়, আমার ব্লাডগ্রুপের সাথে কারো রক্ত মেলে না কখনো।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
কবিতার মদে ডুবে যেতে চাই, নিমজ্জিত হয়ে যেতে চাই- আপাদমস্তক ডুবে যেতে চাই এই ঘোরে, টাইটানিকের চেয়েও বেশি অতল গভীরে পুরেপুরি নিমজ্জিত হয়ে যেতে চাই- গলূই-মাস্তুলসহ একেবারে ডুবে যেতে চাই এই জলে। পুরোপুরি ডুবে যেতে চাই এই কবিতার মদে, এই ওষ্ঠে, সমুদ্রের চেয়েও বড়ো একটি কাচের গ্লাসে- আপাদমস্তক ডুবে যেতে চাই এই ঘোরে, এই আচ্ছন্নতায় মেঘে গোধূলিতে।
মহাদেব সাহা
শোকমূলক
টুঙ্গিপাড়া একটি সবুজ গ্রাম, এই গ্রাম গাভীর চোখের মতো সজল করুন আজ সবকুছিতেই উদাসীন বিষন্ন বাউল; এই গ্রামখানি বড়োই ব্যথিত যদিও সে প্রকৃত কবির মতো ঢেকে রাখে তার দুঃখ, শোক; কাউকে বলে না কিছু তবু এই মধুমতী নদীটিকে দেখে মনে হয় যেন অন্তহীন অশ্রুর সাগর; এই সুনীল আকাশ যেন এক শোকের চাদর এই নদীজলে, বৃক্ষের অন্তরে অবিরাম শ্রাবণের বর্ষণের মতো বাজে শোকগাথা; এখানে ঝিঁঝির ডাকে সন্ধ্যা নামে মাঝে মাঝে দূর মাঠে রাখালের বাঁশি শোনা যায়, কিন্তু জ্যোৎ্লারাতে শিশিরের স্পর্শে জেগে ওঠে কার যেন অথই ক্রন্দন; কাঁদে দেশ এইখানে নির্জন সমাধির পাশে। এখানে এই সবুজ নিভৃত গ্রামে, মাটির হৃদয়ে দোয়েল-শ্যামার শিসে, নিরিবিলি গাছের ছায়ায় ঘুমায় একটি দেশ, জ্যোতির্ময় একটি মানুষ; টুঙ্গিপাড়া মাতৃস্নেহে তাকে বুকে রাখে।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
দুপুর গড়িয়ে গেলো আমাদের মেলা দেখতে যাওয়া হলো না তো, দুপুর গড়িয়ে গেলে মেলার শৌখিন সব খেলনা ফুরিয়ে গায়, একে একে ফুরিয়ে যায় মেলার জৌলুস ধনীর দুলাল এসে ফি বছর আগেভাগে আমাদের মেলা থেকে নিয়ে যায় মজার খেলনাগুলো, নিয়ে যায় দামী সব কাঠের আসবাব, সারা মেলা থেকে তন্নতন্ন করে খুঁজে নিয়ে যায় মেলার যা কিছু রম্য দর্শনীয় শৌখিন দ্রব্যাদি অথচ আমরা মেলায় যাই দুপুর গড়িয়ে গেলে শেষবেলা করে, যা কিছু না কিনলে নয় নেহাৎ সেটুকু কেনাকাটা করে ঘরে ফিরি, কিন্তু আমার বড়োই ইচ্ছে মেলা থেকে ঘর সাজাবার কিছু ছবি কিনে নেবো; প্রতি বঠর আমাদের বাড়ির লাগানো মাঠে মেলা বসে দিব্যি সবাই সময়মতো মেলায় যায় ছেলেমেয়েদের হতে দেয় এটাসেটা লজেন্স বা মেলার মিঠাই বউঝির জন্যে নিয়ে আসে ডুড়ে শাড়ি, পছন্দমতো নানান মাপের চুড়ি, মেলার আনন্দ তারা লুটে ঘরে নিয়ে আসে, মেলা থেকে ফিরে এসে ঘরে তারা মেলাই বসায়, আমাদের এই বাড়ির লাগোয়া মেলা বসে তবু মেলায় পা বাড়ালে দেখি দুপুর গড়িয়ে গেছে সেই তো কখন ; আমরা মেলায় গাবো কথা ছিলো ঘুরে ঘুরে দেখবো মেলায় কোথায় বসেছে সারি সারি ছবির দোকান, কোথায় নাগরদোলায় ঘুরছে ঘর সাজাবার কিছু ছবি কিনে নেবো, এই মেলা থেকে আমি নিয়ে আসবো ঘরে কিছু আনন্দ-সম্ভার; অথচ মেলায় গেলে দেখি মেলা থেকে ঘরে ফিরছে লোকজন, কারো হাতে প্রসাধনী, কারো ফুলতোলা মাটির কলস হাতে, নানান পণ্য নিয়ে দেখি ঘরমুখো মেলা-ফিরতি লোক, মেলায় মানুষ নেই, দেকানপাট একে একে উঠে গেছে, সারা মেলা ভর খাঁখাঁ শূন্যতা চাদ্দিকে ভাঙএচারা, ছেঁড়া মোড়কের অংশ, খোসা, এই শূন্য মেলা থেকে আমি কী করে কিনবো বলো ঘর সাজাবার ছবি, আনন্দের কিছুটা আশ্বাস, কথা ছিলো মেলায় যাবো সময়মতো ডাকবে আমায়, দুপুর গড়িয়ে গেলো, বিকেল গড়িয়ে গেলো, আমাদের মেলা দেখতে যাওয়া হলো না তো, আমরা মেলায় যাবো আমাদের কোনোদিন হলো না সময়।
মহাদেব সাহা
স্বদেশমূলক
ঢাকা আমার খুব প্রিয়, কিন্ত আমি থাকি আজিমপুর নামক একটি গ্রামে; খুবই ছোটোখাটো একটি গ্রাম, বলা চলে শান্ত-স্নিগ্ধ ছোট্ট একটি পাড়া এখানেই এই কবরের পাশে আমি আছি; বস্তুত এখান থেকে ঢাকা বহুদুরে, আমি সেই ঢকা শহরের কিছুই জানি না আমাকে সবাই জানে আমি ঢাকার মানুষ, কিন্তু আমি বাস করি খুবই ছোট্ট নিরিবিলি গ্রামে আমি এই ঢাকার খুব সামান্যই চিনি, সামান্যই জানি। এখনো আমার কাছে ঢাকার দূরত্ব ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে, এখনো ঢাকায় যেতে বাসে চেপে, ট্রেন ধরে, ফেরি পার হতে হয় রোজ, এমনকি তারপরও ঢাকা গিয়ে পৌঁছতে পারি না; ঢাকার মানুষ তবু বিশটি বছর এই একখানি গ্রামেই রয়েছি, খুব চুপচাপ, নিরিবিলি, একখানি অভিভূত গ্রাম। ঢাকা আমার খুব প্রিয় শহর, কিন্তু আমি পছন্দ করি গ্রাম আজিমপুরের এই খোলা মাঠ, এই সরু গলি, ঢাকার মানুষ তবু আজিমপুরের এই ছোট্ট গ্রামেই থাকতে ভালোবাসি পৃথিবী আমার খুব প্রিয়, কিন্তু আমি বাংলাদেশ ছেড়ে কোথাও যাবো না।
মহাদেব সাহা
মানবতাবাদী
আমার এই কবিতা, গোলাপ ও স্বর্ণচাঁপার প্রতি যার বিশেষ দুর্বলতা ছিলো যার তন্ময়তা ছিলো পাখি, ফুল ও প্রজাপতির দিকে সে এখন প্যালেস্টাইনী গেরিলাদের কানে স্বাধীনতার গান গাইছে; ইসরাইলী হামলায় ক্ষতবিক্ষত লেবাননের পল্লীতে সে এখন ব্যস্ত উদ্ধারকর্মী, হাতে শুশ্রূষার ব্যাগ নিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের বাহুতে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দিচ্ছে আমার এই কবিতা; ধ্বংসস্তপের মধ্যে কুড়িয়ে পাওয়া একটি ভাঙা গিটারে সে আবার বাজিয়ে দিচ্ছে প্রত্যাশার গান, আমার এই উদাসীন ও লাজুক কবিতাটিই এখন নক্ষত্র ও চন্দ্রমল্লিকার বদলে আহরণ করছে বুলেট- যে-হাতে গোলাপ কুড়াতো সেই হাতেই সে এখন প্যালেস্টাইন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তুলে দিচ্ছে মেশিনগান, বুকে বাংলাদেশের নয় কোটি মাুনষের উষ্ণ ভালোবাসা নিয়ে আমার এই কবিতাটি এখন সারারাত জেগে আছে অবরুদ্ধ গেরিলাদের পাশে। আমার এই কবিতাটি এখন আহত একজন প্যালেস্টাইনী যোদ্ধার সামনে দাঁড়িয়ে আছে শুভ্র নার্স, যুদ্ধে মৃত লেবাননের সেই স্বজনহারা যুবতীটার জন্য আমার কবিতাটিই এখন ব্যথিত এপিটাফ; প্যালেস্টাইনের সেইসব শহীদ যাদের জন্য কোনো শোকের গান গাওয়া হয়নি আমার কবিতাটিই তাদের জন্য আজ সারাদিন শোকের গান গাইবে, শ্রাবণের বর্ষণের মতো আমার এই কবিতাটিই এখন তাদের কবরে ঝরে-পড়া নীরব শোকাশ্রু। স্বাধীন প্যালেস্টাইন তোমাকে কেউ স্বীকৃতি দেবে কি না দেবে সে-কথা আমার জানা নেই- কিন্তু আমার এই কবিতাটির নিবিড় উষ্ণতার মধ্যে প্যালেস্টাইন তোমার স্বাধীনতার চিরকালীন স্বীকৃতি লেখা রইলো; আমি জানি জাতিসঙ্ঘের স্বীকৃতির সনদপত্রের চাইতেও এই ভালোবাসার স্বীকৃতি অনেক বেশি মূল্যবান! তাই তোমাদের জন্য বাড়িয়ে দিচ্ছি বাংলাদেশের সবুজ মাঠের বিশাল হাতছানি, ভাটিয়ালি গানের ব্যঞ্জনা আর পৃথিবীর একই আকাশের অভিন্নতার সাথে আমার এই কবিতার রক্তিম অভিনন্দন।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
চৈত্রে হয়তো ফোটেনি কৃষ্ণচুড়া তাতে ক্ষতি নেই; তোমার ঠোঁটেই দেখি এসেছে আবার কৃষ্ণচুড়ার ঋতু তুমি আছে তাই অভাব বুঝিনি তার; না হলে চৈত্রে কোথায়ইবা পাবো বলো কৃষ্ণচুড়ার অযাচিত উপহার, বর্ষায় সেই ফুটবে কদম ফুল তোমার খোঁপায় চৈত্রেই আনাগোনা। তাই সন্দেহে চোখ মেলে কেউ কেউ তাকায় কোথায় ফুটেছে কৃষ্ণচুড়া, কেউ খোঁজে এই নিরিবিলি ফুলদানি; চৈত্রে কোথাও ফোটেনি কৃষ্ণচুড়া কিন্তু ফুটেছে তোমার দুইটি ঠোঁটে, কবির দুচোখ এড়াতে পারেনি, তাই ধরা পড়ে গেছে কবিতার পংতিতে।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
চৈত্রের এই শেষ রজনীতে তোমাকে পাঠাই বিব্রত খাম, লিখেছি কি তাতে ঠিক মনে নেই তবু এই চিঠি, এই উপহার! তোমার খামে কি আদৌ লিখেছি স্বপ্নের মতো স্মরণীয় নাম? তাও মনে নেই; আমি শুধু জানি তবু এই চিঠি তোমারই জন্যে। যদি কোনোদিনও মলিন চিঠিটি পৌঁছবে না গিয়ে সেই ঠিকানায় বছর এমনি আসবে ও যাবে, ভাসবে না তবু যুগল কলস! আমি বসে আছি, তুমিও কি পারে তাহলেই থামে কালের যাত্রা এই চিঠিখানি অনন্তকাল তাহলেই পারে সাহসে উড়তে। তাহলেই শুধু ক্ষীণ ভরসায় সময়কে বলি, একটু দাঁড়াও!
মহাদেব সাহা
প্রকৃতিমূলক
আকাশের বান্ধাব পাখিরা, মেঘলোকে রহস্যের সতত সন্ধানপ্রার্থী; কখনো বেড়াও উড়ে সকৌতুকে সমুদ্রের নীল জলরাশির ওপর; তোমাদের বিশাল ডানার ছায়া পড়ে হ্রদে আমার হৃদয়ে, উড়বার সাধ নেই, তবু তোমাকে আমার বড়ো ভালো লাগে পাখি, আমি চিরদিন একটি স্বপ্নের পাখি পুষে রাখি বুকের ভিতর। খুব ছোটবেলা থেকে আমি পাখিদের প্রতি বড়ো মনোযোগী, যদিও কখনো আমি ডানায় করিনি ভর, পাখিদেরই ডেকেছি মাটির কাছাকাছি, আকাশকে সবুজ উঠোনে; পাখিদের প্রতি এই পক্ষপাত থেকে আমি কখনো নিইনি হাতে শিকারীর তীর, কখনো শিখিনি তীর ছোঁড়া, কোথাও দেখলে তীর, গুলি, কেমন আঁতকে ওঠে বুক, এই বুঝি বিদ্ধ হলো প্রকৃতির শুদ্ধ সন্তানেরা; আকাশে তোমার ওড়া দেখে আমি স্বচ্ছেন্দে বেড়াই ভেসে স্বপ্নপুরীতে দূর দেশে যেখানে প্রত্যহ মায়াবী পাখিরা দিব্য সরোবরে মনোরম জলক্রীড়া করে; এই পাখির পৃথিবী কেন কিরাতের তীরে ভরে গেলো, আমি পাখিদের নিরাপদ অবাধ আকাশ চাই, চাই পাখিদের স্বাধীন স্বদেশ।
মহাদেব সাহা
প্রেমমূলক
আজ বন্ধের দিন; কোথাও কিছু খোলা নেই সবখানে শুধু বন্ধ, শুধু বন্ধ; একেকটি দরোজার সামনে বড়ো বড়ো শাটার নামানো যেন বন্ধ-করা একটি কাঠের বাক্সের মতো সমস্ত শহর, তালাবন্ধ যেন এই সুনীল আকাশ; আজ বন্ধের দিন, নিউ মার্কেটের সবগুলো গেটে তালা সাকুরায় যেন বহুদিনের কারফিউ; পোষ্টাপিসের হলূদ বারান্দা জনশূন্য, কাঠের সিঁড়ি শব্দহীন ব্যাঙ্ক, বীমা, নীলক্ষেত টেলিফোন অফিস কোথাও কোনো স্বাভাবিক কাজকর্ম নেই, এই বন্ধের দিনে বেইলী রোডের দোকানগুলোতে কিছুই পাওয়া যাবে না- সারা এলিফ্যান্ট রোড যেন কোন এক অচিন ঘুমের দেশ। আজ বন্ধের দিন, কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, নিউ মার্কেটের বইয়ের দোকান বন্ধু, সাকুরা আজ খুলবে না স্টেডিয়ামের সবগুলো দোকানে ঝাঁপফেলা, খবরের কাগরের অফিসে কেউ নেই, টেলিফোন বন্ধ আমি আজ কোথায় যাই; শহরের একটি রেস্তোরাঁ কিংবা পানশারও খোলা নেই, শিশুপার্ক, কার্জন হল, কলা ভবন বন্ধ, বন্ধ, সব বন্ধ, এই বন্ধের দেনে এই জনশূন্য গোধূলিতে তাহলে আমি কোথায় যাই, কার কাছে যাই! বন্ধুরা ছুটিতে কেউ গেছে দেশের বাড়িতে, কেউ দেশের বাইরে যারা ঢাকায় তারাও যে যার গর্তে ঢুকে আছে, সবখানে এই দরোজা-লাগানো শহরে, এই গেটবন্ধ নগরীতে আমি কোথায় যাই। ব্যাঙ্ক, বীমা, পত্রিকার অফিস আজ সব বন্ধ, কোথাও কেউ নেই, তাহলে এই একলা রিকশায়, উদাসীন সাইকেলে চেপে আমি কোথায় যাবো, কার কাছে যাবো! এই বিষণ্ণ সন্ধায় একাকী ঘুরতে ঘুরতে যদি তোমাদের বাড়ির কাছে চলে যাই- তোমাদের সেই বন্ধু গেটটিও কি কিছুতেই খুলবে না, সারারাত ডাকাডাকিতেও কি ঘুম ভাঙবে না তোমাদের কারো, এই শহরে একটিবারের জন্যেও কি কেউ এই বন্ধ দরোজা আর খুলবে না, আর খুলবে না? তাহলে এই বন্ধের দিনে, এই সর্বত্র তালা-লাগানো শহরে এই নিঃসঙ্গ সাইকেলে চেপে অবিরাম বেল বাজাতে বাজাতে বলো আমি কোথায় যাই, কার কাছে যাই, কোন নরকে যাই!
মহাদেব সাহা
শোকমূলক
আমারও শীতকাল আসে, আসে হুহু প্রকৃতির জ্বর কুয়াশায় ভেজে জমি, ভিজে ওঠে তোমার কবর মনে হয় এই শীতে আমিও বিদেশী! আমারও সঞ্চয় ছিলো লাল মোজা, পশমের টুপি ছিলো কাশ্মীরি শালের মিহি কাজ, কিছু হাতে বোনা উলের আদর আর উষ্ণ জল, সহিষ্ণু যুবতী একজন ছিলো তার রক্তিম রাখাল; এই শীতে সেই যে রাখাল গেলো দূর বনে, একজন কবি গেলো কুয়াশায় হাতের তালুতে তারা শিশিরের ঘ্রাণ নিয়ে কই আর কখনো ফিরলো না! আর কখনো ফিরলো না! শহরে শীতকাল বেশ স্বাস্ত্যকর পিকনিকে পার্টিতে কেটে যায় সবুজ সবজির ঘ্রাণে হয় ভালো ময়দানে ক্রিকেট ভোরের রোদুদর মেখে চলে যায় ইস্কুলের ছাতা; আমারও শীতকাল আসে পাতা ঝরে, পাতা ঝরে যায়! মনে পড়ে সেই যে রাখাল আর ঘরে ফেরে নাই সেই যে ব্যথিত কবি বলে গেলো, আবার আসবো আমি চুলে মেখে কুয়াশার দাগ তার পথে কতো ঝরলো শিশির, কতো শিউলির শোক …. আমারও শীতকাল আসে, আসে হুহু প্রকৃতির জ্বর পাতা ঝরে, পাতা ঝরে যায়! এমন শৈশব কেন আমি আছি আর তুমি নাই!
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
তোমরা আঘাত দেবে আমি গোলাপ ফোটাবো তোমরা দুঃখ দেবে আমি কেন দুঃখে গানও গাইবো না? যতোই আগাত দেবে ততোই ফোটাবো আমি ফুল ততোই দুহাতে আমি মাখবো এই আকাশের আলো। আমাকে দুঃখ দেবে আমি আরো লিখবো কবিতা আমাকে আঘাত দেবে আমি আরো যোগ্য হবো তাই, আমাকে জ্বালাবে যতো আমিততো পুড়ে হবো খাঁটি দুঃখের দীর্ঘ পথ আমি ঠিকই পাড়ি দেবো। ভেবো না দুঃখ দিলে আমি কোনো ফুল ফোটাবো না বেবো না আগাত দিলে আমি কোনো কবিতা লিখবো না, আমাকে দুঃখ দেবে আমি তাতে পরাস্ত হবো না যতো দুঃখ দেবে আমি ততো লিখবো কবিতা।
মহাদেব সাহা
চিন্তামূলক
তাহলে কি গোলাপেরও দেশপ্রেম নেই যদি সে সবারে দেয় ঘ্রাণ, কারো কথামতো যদি সে কেবল আর নাই ফোটে রাজকীয় ভাসে বরং মাটির কাছে ফোটে এই অভিমানী ফুল তাহলে কি তারও দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ উঠবে চারদিকে! গাছগুলি আদেশ অমান্য করে মাঝে মাঝে যদি তোলে ঝড় অতঃপর তাকেও কি দেশদ্রোহী আখ্যায়িত করে ফেলা হবে! যদি তারা বাধ্যানুগতের মতো ক্ষমতাকে না করে কুর্নিশ তাদের সবুজ শোভা বরঞ্চ বিস্তৃত থাকে নিষেধের বেড়া ভেদ করে তাহলে কি গাছগুলি দেশপ্রেম বর্জিত বড়োই! পাখিরা কি পুনরায় দেশপ্রেম শিখবে সবাই আর তাই তাদের নিজস্ব গান ছেড়ে তাদেরও শিখতে হবে দেশাত্মবোধক গানগুলি যদি তারা অসীম আকাশে উড়ে মাঝে মাঝে ভুলে যায় আকাশের ভৌগলিক সীমা তবে কি নীলিমা তারও দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলবে এমন? কিংবা এ-আবহমান নদী কতোটা দেশকে ভালোবাসে কোনো ভাবোচ্ছ্বাসে তাও কি জানাতে হবে তাকে? যদিও সে কখনো কখনো ভাঙে কুল, ভাসায় বসতি তা বলে কি এই নদী দেশপ্রেমহীন একেবারে? কোকিলও কি দেশদ্রোহী যদি সে আপন মনে কারো নাম ধরে ডাকে কুলও দন্ডিত হবে যদি কিনা সেও কোনো নিষিদ্ধ কবরে একা নিরিবিলি ঝরে আর এই আকাশও যদি বা তাকে অকাতরে দেয় স্নিগ্ধ ছায়া, তাহলে কি আকাশেরও দেশপ্রেম নিয়ে কেউ কটাক্ষ করবে অবশেষে!
আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ
স্বদেশমূলক
‘কুমড়ো ফুলে ফুলে নুয়ে পড়েছে লতাটা, সজনে ডাঁটায় ভরে গেছে গাছটা, আর, আমি ডালের বড়ি শুকিয়ে রেখেছি— খোকা তুই কবে আসবি! কবে ছুটি?’চিঠিটা তার পকেটে ছিল, ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা।‘মাগো, ওরা বলে, সবার কথা কেড়ে নেবে তোমার কোলে শুয়ে গল্প শুনতে দেবে না। বলো, মা, তাই কি হয়? তাইতো আমার দেরী হচ্ছে। তোমার জন্য কথার ঝুড়ি নিয়ে তবেই না বাড়ী ফিরবো। লক্ষ্মী মা রাগ ক’রো না, মাত্রতো আর কটা দিন।’‘পাগল ছেলে’ , মা পড়ে আর হাসে, ‘তোর ওপরে রাগ করতে পারি!’নারকেলের চিঁড়ে কোটে, উড়কি ধানের মুড়কি ভাজে এটা সেটা আরো কত কি! তার খোকা যে বাড়ী ফিরবে! ক্লান্ত খোকা!কুমড়ো ফুল শুকিয়ে গেছে, ঝ’রে প’ড়েছে ডাঁটা; পুঁইলতাটা নেতানো,— ‘খোকা এলি?’ঝাপসা চোখে মা তাকায় উঠোনে, উঠোনে যেখানে খোকার শব শকুনিরা ব্যবচ্ছেদ করে।এখন, মা’র চোখে চৈত্রের রোদ পুড়িয়ে দেয় শকুনিদের। তারপর, দাওয়ায় ব’সে মা আবার ধান ভানে, বিন্নি ধানের খই ভাজে, খোকা তার কখন আসে! কখন আসে!এখন, মা’র চোখে শিশির ভোর, স্নেহের রোদে ভিটে ভরেছে।
মাকিদ হায়দার
স্বদেশমূলক
কর্তব্যপরায়ন হিসেবে এই মহল্লার সকলেই সর্বাগ্রে উচ্চারণ করে আমাদের নাম৷দেশ বিদেশে যে কেউ এসে জিজ্ঞেস করলেই একবাক্যে সকলেই উচ্চারণ করেন ছেলে গুলো ভালো৷ কর্তব্য পরায়ন৷ নির্দেশ মতো সব কিছু করে৷সমপ্রতি একদল লোক মধ্যপ্রাচ্য থেকে এসেছেন পর্যবেক্ষক হয়ে৷ আমরা ঠিক মতো মাতৃপরায়ণ প্রতি অবহেলা কতটুকু করি সেই সাথে বিরোধিতা কতটুকু বহুটুকু শুধু দেখবেন পর্যবেক্ষক দল৷কর্তব্য পরায়নে এ মহল্লায় অদ্বিতীয় বলে আশা করি আমরা ক-ভাই অচিরেই পেয়ে যাবো৷হীরকের মালা৷
মাকিদ হায়দার
প্রেমমূলক
যে আমাকে প্রেম শেখালো জোৎস্না রাতে ফুলের বনে সে যেন আজ সুখেই থাকেসে যেন আজ রানীর মত ব্যক্তিগত রাজ্যপাটে পা ছড়িয়ে সবার কাছে বসতে পারে বলতে পারে মনের কথা চোখের তারায় হাত ইশারায়ঐ যে দেখ দুঃখি প্রেমিক যাচ্ছে পুড়ে রোদের ভিতর ভিক্ষে দিলে ভিক্ষে নেবে ছিন্ন বাসে শীর্ন দেহে যাচ্ছে পুড়ে রোদের ভিতরকিন্তু শোন প্রজাবৃন্দ দুঃসময়ে সেই তো ছিলো বুকের কাছে হৃদয় মাঝে আজকে তারে দেখলে শুধু ইচ্ছে করে চোখের পাতায় অধর রাখিযে আমাকে প্রেম শেখালো প্রেম শিখিয়ে চিনিয়েছিলো দুষ্টু গ্রহ অরুন্ধতী বৃষ্টি ভেজা চতুর্দশী জোৎস্না রাতের উজ্জ্বলতা ভোরের বকুল শুভ্র মালা নগর নাগর ভদ্র ইতর রাজার বাড়ি সেই তো আবার বুঝিয়েছিলোযাওগো চলে আমায় ছেড়েযে আমাকে প্রেম শেখালো জোৎস্না রাতে ফুলের বনে সে যেন আজ সুখেই থাকেনিজের দেহে আগুন জ্বেলে ভেবেছিলাম নিখাদ সোনা হবোই আমি শীত বিকেলের টুকরো স্মৃতি রাখবো ধরে সবার মত হৃদয় বীণার মোহন তারে ভুলেই গেলাম যখন তুমি আমায় ডেকে বললে শুধুপথের এখন অনেক বাকি যাও গো শোভন যাও গো চলে বহুদুরে কণ্ঠে আমার অনেক তৃষা যাও গো চলে আপন পথেএই না বলেই হাসলে শুধু করুন ঠোঁটে বাজলো দুরে শঙ্খ নিনাদ কাঁদলো আমার বুকের পাথর কাঁদলো দুরে হাজার তারা একলা থাকার গভীর রাতে একলা জাগার তিন প্রহরেতাইতো বলি সবার কাছে যে আমাকে দুঃখ দিলো সে যেন আজ সবার চেয়ে সুখেই থাকে যে আমাকে প্রেম শেখালো প্রেম শিখিয়ে বুকের মাঝে অনল দিলো সে যেন আজ সবার চেয়ে সুখেই থাকেসুখেই থাকে[কবি অনীক মাহমুদ প্রিয়জনেষু]মাঝে মাঝে আমার খুব ইচ্ছে করে আপনাদের কাছে গিয়ে গল্প করতে৷শুনেছি আপনারা খুবই নিরীহ এবং সুবিধেমতো জল থেকে উঠে আসেন ডাঙ্গায়, গ্রীষ্মকালে ডুবে থাকেন গভীর জলে_কেন যে থাকেন, আমি শুধু সেই রহস্যটুকু জানার জন্যেই আপনাদের সাথে গল্প করতে যাবো যে কোন একদিন৷বোকা কুমির এবং চতুর শিয়ালের নিকট থেকে শুনেছি, আপনারা নাকি ভীষণ সুবিধেবাদী, আপনাদের সমাজ-সংসার-সুযোগ সুবিধে নিয়ে কথা উঠলেই অনেকে তুলনা করেন আমার ভাইবোনদের সাথে৷যে-কোন সামাজিক উত্‍সবে অথবা নাগরিক কোলাহলে আপনারা নাকি আপনাদের সরু গলাটাকে শক্ত আবরণের ভেতরে লুকিয়ে না রেখে আমার প্রিয় ভাইবোনদের মতো কখনো উঠে আসেন ডাঙ্গায় আবার কখনো ডুব দেন গভীর জলে, কথাগুলো সত্যি নাকি মিথ্যে, শুধু ঐটুকু জানার জন্যেই যে কোন একদিন গিয়ে জেনে আসবো সত্যমিথ্যে কতটুকু৷সুযোগ সুবিধে পেলেই যে-কোন জায়গায় আপনারা নাকি ঘুমিয়ে নিতে পারেন রোদে অথবা ছায়ায়, আপনাদের জীবনবৃত্তান্ত পড়তে গিয়ে হঠাত্‍ লক্ষ্য করলাম, উভচর প্রাণীদের ভেতরে সবচে’ দীর্ঘ আয়ুষ্কাল আপনাদের, ধর্মকর্ম, রাজনীতি, আপনাদের সমাজে প্রচলিত থাকলেও ইদানিং অনেকেই নাকি যাচ্ছেন মৌলবাদীদের দলে, এবং আপনারা নাকি শীতের সকালে ধানের শীষের নীচ দিয়ে গিয়ে উঠে বসেন নৌকোর গলুইয়ে পাটাতনে?জীবনবৃত্তান্তে আরো দেখলাম, এক খরগোশের সাথে দৌড়াদৌড়ি খেলায় আপনাদেরই একজন প্রথম হয়েছিলো, ঐ কথা জানবার পরপরই আমি আমার ভাইবোনদের সাথে নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছে গেছি, কখনো থাকবো জলে, কখনো ডাঙ্গায়, এবং সুবিধে মতো দৌড়াদৌড়ি খেলায় আমিই প্রথম হবো,_তাই,যে কোন একদিন৷
মাকিদ হায়দার
স্বদেশমূলক
বাবা হরিপদ, চিঠি পাইবামাত্র জুতা কিনিবা, আমি জানি তোমার পদযুগলে কোন জুতা নাই জুতা ছাড়া ঢাকা শহরে তুমি চলাফেরা করিতেও পারিবেনা। শুনিলাম জুতার দাম আগের মত নাই আরো শুনিলাম ঢাকা শহরের একদল লোক সারা বছরই রাস্তায়, খাল-খন্দক কাটিতে পছন্দ করে তাই ভয় হয় তুমি যদি সেই খানা-খন্দকে একবার পড়িয়া যাও তোমাকে ডাঙ্গায় তুলিবার মতো লোকজন আজকাল নাই বলিলেই চলে তাই তোমাকে বলিতেছি তুমি দুই জোড়া জুতা কিনিবা। একজোড়া তোমার জন্য আরেক জোড়া মুক্তিযুদ্ধের নামে। মুক্তিযুদ্ধ যেন সেই জুতা পায়ে দিয়া তোমার সাথেই আমাদের দোহার পাড়ার বাড়ীতে একবার আসিয়া বেড়াইয়া যায়। ইতি তোমার মা।
মাকিদ হায়দার
প্রেমমূলক
কেন যে সম্মতি দিলাম তার প্রস্তাবে যেতে হবে সাথে নিয়ে তাকে দেখবেন তিনি চৈত্র সংক্রান্তির মেলা।গিয়ে দেখি শহরের সব লোকজন উঠে বসে আছে নাগরদোলায়।হঠাৎ আমায় সেই তিনি বললেন চলো যাই দূরে যাই যাওয়া যাক দূরে কোথাও।পুনরায় সম্মতি দিতে গিয়ে মনে হলো হয়তোবা মেয়েটির প্রিয় হতে পারে গুড়ের বাতাসা। কিছু না বলে হঠাৎ তাকালেম আকাশের দিকে চেয়ে দেখি চৈত্রের শেষ মেঘ দ্রুত লয়ে আসছে আমার দিকে।অদূরের নাগরদোলায় কেউ নেই আর। চৈত্র সংক্রান্তির মেলায় শুধু ছিলেম দুজনে।
মাকিদ হায়দার
প্রেমমূলক
ডাকবে শুধু আমায় তুমি থাকবে শুধু আমার পাশে থাকবে তুমি।কাঁদলে শুধু কাঁদবো আমি বিজন রাতে একলা আমি তোমার পাশে।জোনাক আলো জ্বালবো আমি যেথায় তুমি একলা থাকো আমায় ছেড়ে।ডাকবে লোকে হঠাৎ করে সাতসকালে সাঁঝের বেলা তখন তুমি বাসর ছেড়ে একপা দু’পা তিনপা করে বেড়িয়ে এলে দেখতে পাবে।দাঁড়িয়ে আছি তোমার পাশে।
মাকিদ হায়দার
চিন্তামূলক
(কবি মাহমুদ আল জামানকে, শ্রদ্ধাসহ)প্রথমে ওয়েব সাইটে দেখুন, না হলে ফ্যাক্সে খোঁজ নিন৷ তারপরেও যদি না পাওয়া যায় তাহলে সার্চ করুন ইন্টারনেটে৷ এই বলে তিনি দ্রুত পায়ে চলে এলেন অফিসের গেটে দাঁড়ানো গাড়ীর কাছে৷বোশেখের তপ্তরোদে চারিদিক যখন পুড়ে ছারখার তখন কাউকে কিছু না জানিয়ে গাড়ীর মালিক পায়ে হেঁটে কিছুদূর যেতে না যেতেই সেই লোকটির সাথে দেখা, যাকে তিনি একটু আগেই ধরতে চেয়েছিলেন ইন্টারনেটে ফ্যাক্সে ওয়েব সাইটে৷ধৃত লোকটি বললেন–কণ্ঠ ভোটে পার্লামেন্ট পাশ করে দিয়েছে এখন থেকে আমরা সকলেই গাইতে পারবোপুরাতন জাতীয় সংগীত৷
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
এ শহর ছেড়ে আমি পালাবো কোথায় যেদিকে তাকাই দেখি সারাটি ভুবনময় আলো আর মৃত্তিকার বুকের ভিতর তোমার দু’চোখ সুরভিত শস্যময় সজল দু’চোখ । কখনো বৈশাখ আসে প্রমত্ত ঝরের চিঠি নিয়ে আবার ফাল্গুন এলে একগুচ্ছ কুমারীর কলহাস্য ঝরে পড়ে শহরের আনাচে কানাচে মৃত্যু- ক্ষুধা- ভালোবাসা খেলা করে উত্তর হাওয়ায় । হাওয়ায় হাওয়ায় উড়ে রাতের আকাশ প্লাবনের গান বাজে শিরায় স্নায়ুতে । একজোড়া কালো চোখ বসে থাকে যে শহরে অপেক্ষার প্রদীপ জ্বালিয়ে সে শহর ছেড়ে আমি পালাবো কোথায় !
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
সারাদিনের পরে যখন বাড়ি ফেরার তাড়া বুকের ভিতর বাজে তখন বিষণ্ণ একতারা ঘরের ভিতর ঘরটি তো নেই গানেও নেই সুর হাত বাড়ালেই পেতাম যাকে সে তো অনেক দূর ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
আমি বললাম, ও মেঘ তোমার ঠোঁটের মধ্যে কী ? মেঘ বললো , তোমার চিঠি বয়ে বেড়াচ্ছি । আমি বললাম, নদী তুমি কেন তরঙ্গিত ? নদী বললো , তোমার স্বভাব ছাড়তে পারিনি তো । আমি বললাম, জোসনা তুমি অন্ধকারের ভুল ? জোসনা বললো, তোমার প্রেমের শিশিরসিক্ত ফুল । আমি বললাম, শস্য তোমার সবুজ জামা কার ? শস্য বললো , একটি মেয়ের প্রিয় অলঙ্কার । আমি বললাম , মেয়ে, তোমার ওই চোখে কী আঁকা ? বললো মেয়ে , তাও বোঝনি তোমার ওড়ার পাখা ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
পাহাড় দেখতে বেরিয়েছিলাম পথে তুমি এসে আগলে পথের বাঁক দাঁড়ালে যেন অদেখা এক পাহাড় বললে দেখো, আমায় চেয়ে দেখে পাহাড় দেখার সাধ কি তোমার মেটে ! তোমার দেহে হাজার উপত্যকা ভাঁজে ভাঁজে জ্বলছে অহরহ তোমার চুলে বুনো ঝাউয়ের ছায়া কাঁপছে যেন রাতের কালো ঢেউ তোমার চোখে মেঘের ওড়াওড়ি বৃষ্টি হয়ে ভিজিয়ে চলে যায় । সেবার আমার হয়নি পাহাড় দেখা তোমায় দেখেই ফিরতে হলো ঘরে ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
কলেজ রোডের অনেক স্মৃতি চৈত্র মাঘের ফুল্ল প্রীতি রেখেছিলাম তোমার জন্য জমা বললে তুমি নেড়ে দু’হাত চোখের পাতায় বিপন্ন রাত এই কি ভালোবাসার সীমা ! ভেবেছিলাম করবে তুমি ক্ষমা কোঁকড়ানো চুল হাওয়ায় মেলে বললে তুমি আমায় কেমন করে ভুললে ভাষা আমার পথ পেলো না খুঁজে হৃদয় জুড়ে তোমার ব্যথা বাজে । ফিরিয়ে দিলে ফিরিয়ে দিলে তুমি যেন আমি করেছি দুষ্টুমি ফিরিয়ে দিলে গভীর চোখের জল বিপন্ন মন তাই বড় চঞ্চল । আকাশ নদী রেখেছিলাম জমা নিলে না তুমি নিলে না প্রিয়তমা ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
এখন সন্ধ্যা, হৃদয় বন্ধ্যা যেই তুমি চলে গেলে যত ছিলো সুখ রাঙা কিংশুক নিয়ে গেলে অঞ্চলে । রোদ্রের ফণা বৃষ্টির কণা হয়ে ঝরে যার চোখে সে এখন দূরে রাতের শরীরে খোঁজে তার দয়িতকে ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
শীতের শহর ঘুরে প্রতিটি শীতার্ত দরোজায় কড়া নেড়ে যাই দরোজা খোলে না । একটি কুৎসিত হাত যদি খুলে দিতো আবদ্ধ কপাট একজোড়া অন্ধ চোখও নীমিলিত বিপন্ন পাতায় সহানুভূতির নম্র কেশর ওড়াতো একজোড়া বোবা ঠোঁটও যদি কাঁপতো না বলা কিছু শব্দের তাড়ায়! তবু জানি এই পোড়া গ্রহে মোহন বন্দিত্ব নিয়ে একটি বাড়ানো হাত হোক সে বিষণ্ণ ম্লান বিশীর্ণ পাণ্ডুর খুব ক্লান্ত একজোড়া চোখ থাকে নিত্য পথ চেয়ে না হোক ভ্রমরকৃষ্ণ কালো তবু তার সজল উঠোনে জ্বলে প্রতিদিন মঙ্গল প্রদীপ একজোড়া ঠোঁট আছে অপেক্ষায় তৃষ্ণার্ত তবুও যেন এক শান্ত ছায়া অন্তহীন রোদের হাওরে তালাবদ্ধ সন্ত্রস্ত এ দেশে আছে একটি দরোজা সর্বদাই খোলা ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
জানালাটা খুলতেই শীতের সোনালী ভোর আমার গ্রীবায় দু’বাহু জড়িয়ে বলে, নেই, সে তো নেই নিঃশব্দ আকাশ বলে, নেই পাতাঝরা শাখা বলে, নেই রোদের চিকন ছায়া , সেও বলে , নেই তোমার অস্তিত্ব তবু তুমিহীন ঘরে বলে ওঠে সকাল গড়িয়ে যায় ওঠো হাত ধরে টেনে টেনে অবশেষে অভিমান করে কিছুক্ষণ বসে থাকে অদূর চেয়ারে কখনো- বা উদাসীন দু’চোখ বুলায় আকাশের বিশাল প্রচ্ছদে তারপর উঠে এসে মশারিটা তুলে ফেলে তোয়ালেটা ভাঁজ করে রাখে আলনায় অতঃপর সন্তর্পণে শিয়রে নিবিড় বসে আমার চুলের যত অলিগলি মেঠোপথে নিপুণ আঙুল তার বেড়াতে বেরোয় এইভাবে কাটে দিন তুমিহীন একাকী প্রহর ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
চিন্তামূলক
নিশাপুর কত দূর সেখানে কি হেঁটে যেতে হয় ? নাকি ট্রেনে ? লঞ্চে ? বাসে ? আমার  কিছুই নেই, আমি কী করে সেখানে যাবো ! বসন্ত বাতাস যদি নিয়ে যায় যাবো শ্রাবণের উতলা নদীও যদি নেয় যাবো আশ্বিনের কিশোর মেঘেরা যদি নেয় যাবো তুমি যদি হাত ধরে নিয়ে যাও যাবো । নিশাপুর কত দূর সেখানে কী করে যেতে হয় আমি তা জানিনা ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
চোখের নিচে কিসের এ দাগ রাত্রি জাগা কালি বুকের ভিতর জমেছে স্তর পলিবিহীন বালি ? ঠোঁটের শস্য কীটপতঙ্গ খায় কি কুরে কুরে স্বপ্নগুলো আটকে আছে শীর্ণ নদীর চরে ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
খুঁজতে খুঁজতে খুঁজতে খুঁজতে বাড়িয়ে দিলাম হাত আকাশ বললো , নেই অন্ধকারের জঠর ছিঁড়ে বেরিয়ে এলাম যেই দিবস বললো , নেই নদীও বললো, নেই পথও বললো , নেই হঠাৎ দেখি বুকের ভিতর নকশা কাটা মেঘের ভিতর তার দু’ডানায় দাঁড়িয়ে আছে কালো চুলের কে অই !
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
আমি শুধু যাই না কোথাও । মেঘের প্রাসাদ ভেঙে , মেঘেরাও চলে যায় দূরে শোণিতে আগুন জ্বলে , কখনো- বা শ্বৈত্যপ্রবাহ মাটির লালিমা ঢেকে দেয় হিমবাহ বিবস্ত্র মানচিত্রে লেগে থাকে বন্যা মহামারী হাঙ্গামা মড়ক আমি শুধু যাই না কোথাও । অমূর্ত প্রহরে এক বিপন্ন তরুণী তার বুকের দেরাজ খুলে ডাকছে আমায় দ্বিধায় দ্বিধায় কাটে আরো কিছুক্ষণ মলিন দিবস আমি তবু যাই না কোথাও ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
মধ্যরাত পেরুতে পেরুতে তুমি এলে বিক্ষুব্ধ ঝড়ের রাত পার হয়ে প্লাবিত শস্যের মাঠ আর খরাদগ্ধ বিশাল ভূভাগ পাড়ি দিয়ে জমানো দুঃখের সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে অবশেষ । তোমারই জন্যে কত মেঘময় দ্বিপ্রহর গেলো কত অন্ধকার রাত গেলো , কত অকালবর্ষণ কত জ্বলোচ্ছাস, কত বৈশাখের অসীম আগুন কান্নাভেজা একজোড়া চোখ খুব স্তব্ধ রাতে একা ঝরে গেলো অবশেষে মধ্যরাত পেরুতে পেরুতে তুমি এলে । তোমার মুঠোয় আজ তুলে দেবো কোথায় সে হিরন্ময় ফুলের স্তবক ? কোথায় সে অলৌকিক সংগীতময়তা ? আনি এই দরিদ্র স্বদেশে এক কবি আমার কিছুই নেই তোমাকে দেবার সাজনো অক্ষর নেই শব্দের বাহার নেই স্বপ্নের বাগান কোনো নেই শুধু আছে তোমাকে পাবার এক নেশাগ্রস্ত অদম্য বাসনা ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
কতদিন অন্ধকারে নক্ষত্র দেখি না দেখি না দিগন্তব্যাপী মেঘের বিস্তার কতদিন আকাশ দেখি না দেখি না বহতা নদী থই থই জলের যৌবন কতদিন নিসর্গের সান্নিধ্যে আসি না নিসর্গ কখনো ছিলো আমার প্রেমিকা । কতযুগ পর আমি ভেজানো দরোজা খুলে দেখি আমার মায়ের সেই মুখ শান্ত স্নিগ্ধ প্রসন্ন বিকেল পাপবিদ্ধ আমার আত্মায় পড়ে ছায়া। কতদিন পরে আজ নিজেকে দেখলাম এতটাই বদলে গেছি আমি? কতদিন দেখি না, সেই তুমি যে আমাকে করেছিলো মাতৃহীন, বন্ধুহীন নিসর্গবিহীন ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
দূরের মানুষ দুরেই থাকা ভালো সাইবেরিয়ান হাঁসের মতো দূরে কাছে এলে দূরত্বটাই বাড়ে দূরে গেলে বিরহের উত্তাপে নির্বাপিত তৃষ্ণা আবার জাগে । দূরের মানুষ দূরেই থাকা ভালো কখনো যদি প্রশ্ন জাগে মনে দূরের মানুষ কাছে কেন এলে ? ভালোবাসা খুদ-কুঁড়ো জল চেয়ে কাটলো অনেক বছর অনেক মাস কালো গোলাপ আর পারি না যে দশ বছরের তৃষ্ণা বুকের মাঝে এবার তোমায় দিলাম বনবাস ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
তোমাকে করেছি আমি নিজের শাসক আজ তুমি রাজ্যপাট ভক্ত প্রজা ছেড়ে কোন তীর্থে হয়েছো উধাও ? ভ্রাম্যমান তোমার বহর গেছে সাথে এদিকে যে পোড়া মাঠে দুর্গন্ধ ও বমি শুন্য সিংহাসন কাঁদে নির্জন আঁধারে তোমার দেহের গন্ধে বুনো রাত্রি আসে পাহাড়ি সিংহ ডাকে রক্তের গভীরে । তোমার স্তনের ঘাম উদ্ভিন্ন গোলাপ উড়ে যায় অনিচ্ছায় সপ্তর্ষিমণ্ডলে একদিন দিয়েছিলে বিদ্যুৎ উষ্ণতা তার তাপে রক্ত মাংস ছিন্ন হয়ে যায় । তোমার রাজত্বে কেউ বসিয়েছে ঈগল নখর? অবাধ্য হয়েছে কোনো রাজভক্ত প্রজা? রাজ উদ্যানে লেগেছে আগুন ? বলো , কোন অভিমানে নির্বাসিত আজ সুদূর ভুবনে ?