poet
stringclasses
137 values
category
stringclasses
21 values
poem
stringlengths
9
18.7k
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
বসন্তের বইছে হাওয়া হৃদয় টলমল দুলছো তুমি, দুলছি আমি পৃথিবী চঞ্চল । উড়ছে রিকশা উড়ছে যাত্রী পুড়ছে আমার দেহ সবুজ আগুন উঠলো জ্বলে দু’চোখ ভরা মোহ । হাসপাতালে রুদ্র রায়ের গান বাজে, নেই শব আকাশ নদী কল্লোলিত সবুজের উৎসব । ভালোবাসার বৃষ্টি নামে পঙ্কিলতার স্রোতে এই শহরে হাজার হৃদয় বন্দি তোমার হাতে । এক মুহূর্তে হারিয়ে গেলে বিষাদ হাহাকার তোমার দু’চোখ আমার চোখে এক হলো না আর ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
তোমাকে ভালোবাসা ছাড়া আমার আর কী কাজ আছে বলো ? বোশেখের বৃষ্টি আটকে থাকুক কালো মেঘের মতো মেঘের পকেটে আমি তবু বলবো , তোমাকে ভালোবাসি আষাঢ়ের কদম গন্ধ না ছড়াক সবুজ পাতাগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে যাক আমি তবু বলবো , তোমাকে ভালোবাসি বঙ্গোপসাগরের প্রবল জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাক বিস্তীর্ণ ভূভাগ পালক ভাঙা পাখির হাহাকারে ভরে যাক আদিগন্ত আকাশ তবু আমি বলবো , তোমাকে ভালোবাসি বুকের ব-দ্বীপে ঘরবাঁধা সেই দুরন্ত কিশোরী স্টপেজহীন ট্রেনের চাকার তলে পিষ্ট হয়ে যাক তবু আমি বলবো, তোমাকে ভালোবাসি তোমাকে ভালোবাসা ছাড়া আমার আর কী কাজ আছে বলো ?
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
ট্রেনটি এসে থামলো যখন ইসটিশনে মেঘলা আকাশ নতজানু বাঁশের বনে মোচড় দিয়ে উঠলো আমার বুকের রেখা তোমার চোখে বিষাদঘন মৌন লেখা । এখান থেকেই হয়েছিলো যাত্রা শুরু বক্ষে ছিলো প্রথম প্রেমের দুরু দুরু নদীর সাথে চাঁদের ছিলো গোপন সখ্য তোমার আমার অলিখিত প্রনয়ালেখ্য । কৃষ্ণ কোথায় পাখির ডাকে সারা রাত্রি জানালা ভেঙ্গে হৃদয় আমার দিতো পাড়ি চোখের পাতায় স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ফেরা প্রেমান্ধ রাত ভাঙে শব্দের পলেস্তারা । ভালোবাসার বুনো স্রোতে ছিলাম মগ্ন বুঝিনি কখন ভালোবাসাই হয়েছে ভগ্ন ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
কিছুই জানিনা আমি কোনোই খবর কার মেয়ে কার বোন কার বা প্রেমিকা ? কোথায় চলেছো তুমি ঠিকানা কোথায় বহুদূর চায়ের বাগান ? নগ্ন জলের হাওর ? ট্রেনের জানালা বেয়ে ভেসে যায় বুনো মেঘ উদাস সবুজ বিদ্যুতের ধ্যানী থাম সন্ধানী রাখাল লঞ্চ বাস রোদ আর বৃষ্টির প্রণয় তারাও জানে না তুমি চলেছো কোথায় ? মুখোমুখি বসে শুধু দেখেছি তোমাকে মেয়ে আর, গেঁথে যাচ্ছি কৃষ্ণবর্ণ শব্দের কসুম উত্তরের উদ্বেল বাতাস সাদা ওড়নায় মুখ ঘষে ঘষে তোমাকে অস্থির করে তোলে ভ্রু বাঁকিয়ে তাকে যতই ধমকাও বাতাস তো শাসন মানে না । তোমার আনত চোখে দুপুরের নীল ঘুম নামে কয়েকটি স্খলিত চুল লুটেপুটে খায় দুটি ঠোঁটের সুষমা সুদূর নীলিমা থেকে ছুটে আসে মেঘ স্টিলের জানালা গলে ছুঁয়ে যায় চুলের বিনুনি হাতের পাতায় বোনা লাল কারুকাজ কাঞ্চনজঙ্ঘার ভোর ঝিলিমিলি করে ওঠে কখনো কখনো কালো চোখে এইভাবে একজোড়া চোখ ছুঁয়ে ছুঁয়ে কেটে গেলো দশ জুন গোলাপি প্রহর সিলেট স্টেশনে এই কবিতার শেষ একজোড়া চোখ গেলো চোখের গন্তব্যে পিছনে রইলো পড়ে হাহাকারপূর্ণ এক কবির হৃদয় ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
ক. তুমি আমার চৈত নিদানের বড় কষ্টের চাল ফুটছো ম্রিয়মাণ আলোতে বুকে অনন্ত কাল । খ. তোমার কথা ভেবে ভেবে আমার কাটে দিন তুমি তখন অন্য কারোর শুধতে আছো ঋণ । গ. ট্রেন ছুটছে হু- হু হাওয়ায় আমার চোখে জল তোমার কাছে রেখে এলাম সুখের করতল । ঘ. পোষ্টাপিসের পিয়ন বললো নেই চিঠি নেই নেই হঠাৎ মেঘে ঢাকলো আকাশ রোদের অজান্তেই ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
লণ্ঠনের সামান্য আলোয় অসামান্য হয়ে ওঠে আষাঢ়ের বৃষ্টিঝরা রাত বাইরে আঁধার ক্রমে জমে ওঠে , বাতাসের দুপদাপ বেড়ে বেড়ে সুতীক্ষ্ণ শিসের মতো হয় এমন সময়ে তুমি দাঁড়ালে দরজায়, সেই তুমি একদিন যার চোখে রেখেছি এ চোখ শিমুল ওড়ানো পথে যার হাতে ছুঁয়েছি এ হাত হোস্টেল পালিয়ে আসা যার ঠোঁটে গোধূলির মসৃণ আলোয় ছুঁয়েছি এ ঠোঁট । বাইরে জলের শব্দ পৃথিবীর  সবচেয়ে পুরোনো প্রেমের মতো গভীর গভীরতর হয় দাঁড়িয়ে দরোজায় তুমি প্রাচীন মূর্তির মতো একা তোমার শিথিল চুল ঢেকে দেয় সভ্যতার বিশীর্ণ সত্তাকে লণ্ঠনের আলো বেয়ে আষাঢ়ের রাত বেড়ে ওঠে ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
তোমার কাছে যাওয়ার আমার সকল রাস্তা হারিয়ে গেছে । পুরোনো বাসষ্টেশন ফেলে ট্রাফিক পয়েন্ট বাঁয়ে ঠেলে উকিলপাড়ার পয়েন্ট ঘুরে তোমার কাছে যাওয়ার আমার সকল রাস্তা হারিয়ে গেছে । ভালোবাসা হৃদয়পুরে পুজোর গন্ধে শরীর মেখে সন্ধ্যারাতের চাঁদের আলোয় তোমার কাছে যাওয়ার আমার সকল রাস্তা হারিয়ে গেছে । যানজটহীন এই শহরে শান্তি এবং প্রেমের খোঁজে তোমার কাছে যাওয়ার আমার সকল রাস্তা হারিয়ে গেছে ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
তোমার শিকড় আছে, আছে প্রিয় জোসনার বাঁধন আমি তো বন্ধনহীন হয়তো-বা শিকড়বিহীন আমার অস্তিত্ব জুড়ে শুন্যতার অসীম স্তব্ধতা দূর অরন্যের দীর্ঘশ্বাস আমি কাকে পরাব বন্ধন ? শিকড়ের সন্ধানে যার কাটে দিন কুড়িয়ে মাটির গন্ধ মেখে দেবো তার স্নিগ্ধ চুলে ! আমি তো সংসারছেঁড়া পথের মানুষ জন্ম জন্ম কেটে গেল হাহাকার বুকে যে আমাকে দিয়েছিল অন্ধকারে আলোকিত ঘরের খবর আমি তাকে করেছি বিবাগী । আমাকে দিও না কেউ বন্ধনের মায়া তার বুকে জ্বলে উঠবে চিতার আগুন ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
খুব বেশি দূরে নয় বড়জোর মিনিট দশেক দু’একটি বাঁক পেরুলেই সাদামাটা আটপৌরে বাসা। কোনো মোঘল স্তাপত্য নয় নয় কোনো সামন্তের ভগ্ন প্রাসাদ অথবা জাঁদরেল কোনো আমলার বিলিতি ভবন তবুও রহস্যময় বুকে তার সুবিন্যস্ত নীলের দ্যোতনা । সেখানে সে থাকে আর কে কে থাকে ? ফুল থাকে পাখি থাকে রোদ মেঘ বৃক্ষছায়া থাকে প্রেম থাকে প্রেমের ব্যর্থতা থাকে বিরহ ও হাহাকার থাকে । মৃন্ময় উঠোনে বাজে অবেলায় বৃষ্টির নূপুর রোদ আসে বাতাসের নরম পালকে ভেসে ভেসে বারান্দায় কুণ্ডলী পাকিয়ে শোয় বিরহী শ্রাবণ জানালায় লটকে থাকে প্রণয়বিমুগ্ধ এক অচেনা আকাশ ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
বাম পাঁজরে বৃষ্টি ঝরে ডান পাঁজরে রোদ ও ফুল তুমি ফুটছো এখন কোন পাহাড়ের ভাঁজে সে পাহাড় কি এতই সুদূর এতই দূরতম স্মৃতির রেখাও মেশে না তার ঝরনা পাথর ঢালে ! সোনালি রোদ ঘাই মারছে অপরাহ্ণের মেঘে ও বনফুল উড়ছো তুমি কোন আকাশের নীলে কার পকেটে সুঘ্রাণ ছড়াও গন্ধ মাখাও বুকে কাকে খুঁজছো প্রনয়মুগ্ধ অনির্দিষ্ট পথে ? গিটার শুনছো ? পদ্য পড়ছো ? কোন সে শিল্পতরু শিকড় মেললে নীল হৃৎপিণ্ডে দ্রুত পাঁজর ভাঙার শব্দ পাওনি মহাশুন্যে মৃদু শুনতে পাচ্ছো দূর সমুদ্রে স্টিমার ছাড়ার ভেঁপু ? দীর্ঘ তোমার পরিক্রমা কখন হবে শেষ জলগুল্ম দুলবে রঙিন ঢেউয়ে সবুজ হাওয়ায় ঝরবে নিশ্বাস পিঠে বিবসনা অন্ধকারে ফুটবে অসীম আলোর অবশেষ ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
তোমাকে ভোলার সাধ্য নাই তাই বারবার ফিরে আসা তোমার দরজায় তুমি থাকো অন্তরালে ছায়ার ভিতরে মেঘ হয়ে উড়ে যাও মেঘের আড়ালে হাহাকার করে উঠে তোমার গেটের পাশে পড়ে থাকি চৈত্রের আকাশ ভেঙে ঝাঁক ঝাঁক বৃষ্টি নামে মৃত্তিকায় পাথরে শিলায় তোমার উদাস চোখ হয়তো-বা চেয়ে থাকে সুদূর পথের প্রান্তে পড়ে থাকা একজোড়া চোখে আমার হৃদয় ছিঁড়ে সহসাই জ্বলে ওঠে অগ্নিময় শিখা এশিয়ার শান্ত দূর করুণ শহর পুড়ে যায় আগুনের নীল উত্তাপে ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
তোমার জন্যে ছিলো আমার যাওয়া পৌঁছে দেখি সবাই আছে তুমিই শুধু হাওয়া চারিদিকে বৃষ্টিবাদল বুকের ভিতর ঢেউ এগিয়ে এসে ভেজা হাতে হাত ধরেনি কেউ । মন তো খারাপ হতেই পারে কোথাও তুমি নেই তুমি তখন নিজের ভিতর আছো আনন্দেই ।।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
তোমার জন্যে ও মনপাখি বেরিয়ে পড়ি সকালবেলায় ঘর পালানো দুপুর বিকেল সন্ধ্যে কাটে এ কোন খেলায় ? কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায় মলিন ঝরাপাতা রাশি রাশি বুকের ভাঁজে দাঁড়িয়ে থাকো স্বপ্ন চোখে সর্বনাশী ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
পড়ে আছো দূরের স্টেশনে ভয়ঙ্কর অভিমান বুকে কাছেপিঠে কৃষ্ণচূড়া নেই কত বেশি প্রিয় ছিলো তোমার দু’চোখে ! স্টেশনের পুবে নীল ডোবা রাশি রাশি জলফল রোদ্দুরে উন্মুখ দুলে উঠতো ফ্রকের হাওয়ায়। ঠিক সাড়ে দশটা বেজে গেলে হুইসেল বাজিয়ে গ্রিনএরো ছুটে যেতো দক্ষিণ দিগন্তে । রোদে ভিজে যেতে যেতে শৈশবের স্কুলে বড় বড় চোখ মেলে দেখতে তুমি ফুলেদের মাতামাতি সে ডোবা অদৃশ্য আজ আছে মাটি প্রস্তরের ফুল । কিছুই তো অবশিষ্ট নেই বড় বড় চোখ দুটি ছাড়া পেছনে তাকালে মনে পড়ে মানুষের নির্মমতা স্বপ্নের সমাধি । এখনো কি হোস্টেলের উঠোনে শীতের রোদ পিঠে নিয়ে আড্ডা দেয় পাঁচ জন তরুণী এখনো কি মহিলা কলেজে আসে ঘুরে ঘুরে শুক্রবার অপরাহ্ণ দুলে ওঠে ভুল প্রেমিকের স্পর্শে সিলেটের পাহাড়ি সড়কে । পড়ে আছো দূরেরে স্টেশনে কখন ঘনাবে রাত চাপচাপ অন্ধকার তার প্রতীক্ষায় । গোধূলির বিমর্ষ আলোয় অবাধ্য শিশুটি খুব ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে রেশমি চুলে ঝরে পড়ে বাতাসের হিম সম্ভাষণ । মনে পড়ে কত রাত জেগে থাকতে ঘুমচোখে পিতার পায়ের প্রিয় শব্দের আশায় মাথায় ঝুলিয়ে লাল আলো মেলট্রেন থামতো এসে পাহাড়ি স্টেশনে একটি কিশোরীর খুব প্রিয় স্বপ্ন সুটকেসে ঢুকিয়ে জোসনাময় পথ তিনি পেরুতেন বুকে নিয়ে অপার বাৎসল্য । উঠোনে পৌষের চাঁদ বারান্দায় বাগানবিলাস আশ্চর্য গহিন কণ্ঠ ডেকে উঠতো তাহেরা তাহেরা তার বড় আদরের কনিষ্ঠ মেয়েটি জেগে উঠে খুলে দিতো রাত্রির দরোজা আজ সেই পিতা নেই মমতামাখানো বুকে নিবিড় আশ্রয় চলে গেছে কোন দূরলোকে আজ তুমি দাঁড়াবে কোথায় ?
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
তোমাকে নিয়েছি আমি তুমিও আমাকে অন্তহীন মধ্যরাতে নয় নয় চন্দ্রের উদ্যানে কোনো আমরা নিয়েছি আমাদের এক অপরাহ্ণে ঈষৎ আলোয় । তোমার নোনতা স্বাদ আমার জিহ্বায় আমার তৃষ্ণা কাঁপে তোমার অধরে আমরা দুজন এমন অচেনা স্মৃতিভ্রষ্ট মানুষের মতো আমাকে চেনো না তুমি আমিও তোমাকে ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
যাকে আমি কোনোদিন ভালোবেসে করিনি আপন সে এসেও ফিরে গেছে অমল কৈশোর তাকে ডাকেনি কখনো উদ্দাম যৌবন তাকে স্বপ্নাতুর চোখে করেনি স্পন্দিত পায়ের আওয়াজ তার ফিরে গেছে দূরগামী স্টিমারের মতো । ফ্যাকাসে সূর্যের নিচে কয়েক বছর পরে তার সাথে দেখা কী নিঃসঙ্গতায় ডুবে আছে তার রাত্রি দিন, শূন্য ব্যথিত হৃদয় , মনে হয় কৃষ্ণপক্ষের এক থমথমে আকাশ যেন করুণ চিবুকে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাকে আবার কখনো মনে হয় কালবোশেখের তাড়া খাওয়া পাখি পড়ে আছে পত্রহীন নির্জন বনের ধারে একা ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
প্রিয় বান্ধবী আমার কত যুগ পার হয়ে মুখোমুখি বসেছে ওখানে পানসির দাঁড়ের শব্দ ছপছপ ছপছপ বিধ্বস্ত প্রতিমা তাকে ফেলে এখন কোথায় যাবো কার কাছে, কে আছে নৈবেদ্য সাজায়ে তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও আমি এই ব্যাংকের ব্যস্ততার ভিড়ে আড়ালে আড়ালে সাদা পঙ্খিরাজ ওড়াবো ধবল মেঘের দেশে মেঘেদের বেশে জ্যৈষ্ঠ না আষাঢ় মাসে গাঙে নয়া পানি বৃন্দাবন দুবে যায় নেশা আজ দু’চোখে প্রবল বাঁকা দু’নয়নে নেশা আকাশ চৌচির বৃষ্টি নামে বাজ পড়ে বিদীর্ণ ভুবন হৃদয় গাঙের ঢেউয়ে বৈঠা বাই আমরা দু’জন ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
কবিতা যেমন গোপন থাকে না তুমিও থাকো না তেমনি নিজেকে ওড়াও বাতাসে ও মেঘে শহর কাঁপাও তোলপাড় বেগে শত যুবকের বিস্মিত চোখে জ্বলে না পাওয়ার বহ্নি ।
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
তোমাদের এই স্বপ্নালয়ে আমার আসা তোমার জন্যে উল্টোপাল্টা পথের ভিতর ঘুরছি একা হয়ে হন্যে এই যে আমার ফিরে যাওয়া না দেখা কষ্ট হৃদয়ারন্যে তোমার জন্যে । ও মন তুমি কোথায় থাকো সবুজ জামায় গন্ধ মাখো অন্তরালে রোদ পোহাচ্ছো চুল শুকাচ্ছো কবিতা পড়ছো দুই পা মেলে তোমার পায়ের ছায়ার জন্যে কাঁদছে পরান । হাওয়া যে আজ আলাভোলা বুকের ভিতর অদেখা জ্বালা কোথায় রাখি, কোথায় রাখি ও মনপাখি, কোথায় রাখি !
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
লাল সালোয়ার ঝুলছে রুপালী গ্রিলে ওখানে কি কেউ আছে ! ওই জানালায় এত মেঘ আর রোদের হল্লা কেন ওখানে কি কেউ আছে ! সামান্য এক বাড়ির এতটা কিসের অহংকার ওখানে কি কেউ আছে ! চিরকিশোরের অবাক দু’চোখে থমকে দাঁড়ায় কেন ওখানে কি কেউ আছে !
দেওয়ান মমিনুল মউজদীন
প্রেমমূলক
আমার ক্ষুধা ও শান্তি তোমার কাছেই আমার বিরহ আর মিলনের প্রথম যন্ত্রণা তোমার গভীরে উন্মীলিত । পৃথিবীর এপাশ ওপাশ দেখে কখনো স্পন্দিত দেশে কান্তিমান সবুজের কাছে নদী আর নাব্যতায় আত্মমগ্ন ব-দ্বীপের কাছে ফিরে যাই , শুনি কার পায়ের আওয়াজ ট্রেনের কম্পারটমেন্টে হুলুস্থুল বাসের ভিতরে লঞ্চের সিঁড়িতে বাজে কার যেন চলে যাওয়া অপার দুঃখের মতো , কার ? তুমি শুধু তুমি চলে যাও আমার সুমুখ দিয়ে মাথার উপর দিয়ে শানিত ছুরির মতো আমাকে খণ্ডিত করে যাও এপারে ওপারে যাও, এদেশে ওদেশে আর জীবনের এপিঠে ওপিঠে কখনো মৃত্যুর দুটি হিমচোখ ভেদ করে যাও আমার মগজ আর হৃদযন্ত্র পাকস্থলী শূন্যতায় ভেসে ভেসে ফেরে হঠাৎ আবার তুমি ফিরে এলে তাড়া ফের গেঁথে যায় শরীরে আমার আর গোধূলির প্রিয় স্বপ্ন ফিরে আসে । তুমি যাও তুমি আসো আমি যাই ফিরে আসি তোমার কাছেই এইভাবে যাওয়া-আসা বহুদিন বহুকাল বহুস্বপ্ন স্মৃতির পাতায় ।
গোলাম কিবরিয়া পিনু
স্বদেশমূলক
গৃহ থেকে বহুদূরে চলে যাওয়ার পরও আমি গৃহে ফিরে আসি আমি সেই কপোত ডানা দুটি আমার প্রত্যাবর্তনপ্রবণসাদামাটা গৃহকোণ আমার পছন্দ ঘরে ফিরে আসার জন্য আমি কাতরআমার বসতভিটে আমি চিনি বাস্তুভিটে ও খামারবাড়ি আমি চিনি মর্মঘাতি আঘাতের পরও আমার গৃহজারিত গন্ধ আমার গায়ে লেগে থাকে গৃহহীন করে প্রভুরা আমাকে টেনে নিয়ে যাবে? –পারবে না!শুধু কি সংসার-সুখ ও গার্হস্থ্য সুখের জন্য স্বগৃহে স্বচ্ছন্দ বোধ করি? যেখানেই যাই–আমার গৃহাভিমুখে আমার মুখ ও যাত্রা অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক ধ্বংস হওয়ার পরও ফিরে আসি বন্যায় ভেসে যাওয়ার পরও ফিরে আসি ঝড় ও টর্নোডেতে মুচড়ে যাওয়ার পরও ফিরে আসি আমি চোরাস্রোতে নিমজ্জিত হই না জীবনের যেকোনো নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে জীবনের তাৎপর্য উপলব্ধি করিপরতন্ত্র নিয়ে যন্ত্র হয়ে যেতে চাই না পরশাসিত শাসন আমি দেখেছি পোঁ ধরা স্বভাব আমার ধাতে নেই গুমটি ঘরের বদলে আমার বাঁচোয়া উঠান আছে আমার নিজস্ব পতাকা আছে নিজের জমিতে নিজে চাষ করিনিজের ভূখণ্ড যেন হাতছাড়া না হয়ে যায়– হুমকি ও ভয় দেখানোর লোক থাকলেও তাদের পরোয়া করি না, প্রতিরোধের তৃষ্ণা সবসময়ে জাগিয়ে রাখি কোনো সমুদ্রের জল সে তৃষ্ণা মিটাতে পারে না।টিকে থাকি নিজের দু’পায়ে ভর রেখে পথসংলগ্ন থাকি সহজে স্খলিত হই না মোড় ঘোরার সময়ে পিছলে যাই না মাথা উঁচু করে হাঁটি ঠেকিয়ে রাখার জন্য গতিরোধ করা হয় জমাট বরফের উপর হেঁটে হেঁটে আসিলোভী, নোংরা ও স্বার্থপর ব্যক্তির গন্ধ শুকি দুষ্টপ্রকৃতির কোনো অশরীরী কাল্পনিক শয়তানের ভারী জুতার তলায় আমি থাকি না !সযত্নে সঞ্চিত ও রক্ষিত স্বপ্ন নিয়ে ভূগর্ভ খুঁড়ে আমি বের হই! লাল লাল দাগ আমার শরীরে! গৃহে ফিরি কিন্তু গৃহপালিত নই নিজের ভাষা ও ধ্বনিতত্ব বুঝি প্রকৃতিপ্রত্যয় বুঝি আমার সভ্যতা কী–তা আমি ভুলি না আমারও আছে সংস্কৃতিমান।আমার অভিধান ও শব্দকোষ আছে আমার চিরায়ত সাহিত্য নিয়ে আমিও উঁকি দেই –আগামীর সূর্যালোকে। শুধু ব্রতচারী নৃত্য নয় নৃত্যের বহুবিধ মুদ্রা আমি জানি একতারা থেকে করতাল থেকে বাঁশিতে কী সুর জেগে ওঠে কণ্ঠে কণ্ঠে কত গান কখনো হয় না ম্রিয়মাণ!আমি আমার নদীর জোয়ার জানি মরানদীটা আরও মরে যাচ্ছে–তাও চিনি আমি আমার হাওড়-বাঁওড় চিনি সমুদ্রের তরঙ্গোচ্ছাস চিনি।কীভাবে শিশিরকণা জমে কীভাবে বৃষ্টিফোঁটা পড়ে কীভাবে মেঘ কেটে যায়–তা জানিবন্যাপীড়িত হয়ে কীভাবে মরুময় কষ্টের মুখে চৌচির হয়ে যাই তা কি আমি বুঝি না?লালমাটি-তিলকমাটির প্রান্তর নিয়ে এঁটেলমাটির জলকাদা মেখে পলিমাটির জমি নিয়ে স্বপ্ন-ফসল ফলাই আমি আমার গাছগাছালির ছায়াস্নিগ্ধ হয়ে অংশুমালা হয়ে সূর্যতাপ গ্রহণ করি বীজতলায অঙ্কুরমুখী হয়ে জীবন্ত হয়ে উঠি শিকড়-মূলরোম থেকে যে বৃক্ষ বেড়ে ওঠে–সেখানে আমার স্পর্শ থাকে কুসুমকোরক থেকে প্রসবন পর্যন্ত নিজেকে জড়িয়ে রাখা অরণ্যপুষ্প থেকে রবিশস্যের গন্ধে আমি প্রাণশক্তি পাই জিয়নকাঠির স্পর্শ পাই আমার চৈতন্য ও সংবেদনা নিয়ে আমি ফিরে আসিগৃহে ফিরে আসা মানে উৎসে ফিরে আসা গৃহে ফিরে আসা মানে সৃষ্টিমূলে ফিরে আসা গৃহে ফিরে আসা মানে আদ্যবীজে ফিরে আসা যেখানে আমার উত্থান হয়েছিল যেখানে আমার অভ্যুদয় হয়েছিল যেখানে আমার উম্মীলন হয়েছিল যেখানে আমার বিস্তার হয়েছিলযেখানে আমার আঁতুড়ঘর যেখান থেকে পৃথিবীর আলো দেখেছিলাম এখানে অবতীর্ণ হওয়া মানে ধরাধামে ফিরে আসাসেই সূতিকাঘর কীভাবে ভুলি ?
গোলাম কিবরিয়া পিনু
রূপক
আমরা এখন যাচ্ছি কোথায়? যাবো কোথায়? ঘুমের ঘোরে রাত কাটালাম ঘুম হলো না, ঘুম হলো না নিদ্রামগ্ন স্বপ্ন দেখা তাও হলো না, তাও হলো না। সকাল বেলা শিশির ঘাসে পা রেখেছি কোথায় যাবো? কোথায় যাবো? ঠিকঠিকানা নেই এখনো! যুদ্ধ হলো শুদ্ধ হবো বলে শ্যাওলা উঠোন নতুন করে টানবো কাছে ফুল ফুটাবো বলে, শূন্যগোলা মায়ের হাতে শস্যগোলা হবে এই আশাতে রক্তমাখা হাত মুছেছি জলে। এইতো এখন মাটি খুঁড়ে মূল দেখেছি একেবারে পচে গেছে, ঘুণ ধরেছে ঘরের বাঁশে পচা গন্ধ চতুর্দিকে তবুও হায় হয়না খোঁজা দিগন্ত। খোসা ছাড়ার হবে সময় কবে? নদীর প্রপাত টানবো কাছে কখন? আমরা এখন যাচ্ছি কোথায়? যাবো কোথায়?
গোলাম কিবরিয়া পিনু
মানবতাবাদী
সুড়ঙ্গ থেকে বের হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষ তাকে আবারও সুড়ঙ্গে ঢোকানো হচ্ছে কেন? গুহা থেকে বের হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষ তাকে আবারও গুহার ভেতর ঢোকানো হচ্ছে কেন? খোপ থেকে বের হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষ তাকে আবারও খোপে খোপে ঢোকানো হচ্ছে কেন? পোড়াবাড়ি থেকে বের হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষ তাকে আবারও পোড়াবাড়ির ভেতর ঢোকানো হচ্ছে কেন? দাঁতলাগা অবস্থা থেকে বের হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষ তাকে আবারও দাঁতলাগা পরিবেশে ঢোকানো হচ্ছে কেন? গণ্ডকূপের শব্দহীনতা থেকে বের হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষ তাকে আবারও শব্দহীনতার ভেতর ঢোকানো হচ্ছে কেন? মিথ্যে হয়ে যাবে এতদিনের সূর্যালোক নিয়ে বাঁচা, মিথ্যে হয়ে যাবে এতদিনের আকাশপ্রান্ত নিয়ে বাঁচা, মিথ্যে হয়ে যাবে এতদিনের ঘনবীথি নিয়ে বাঁচা, মিথ্যে হয়ে যাবে এতদিনের কল্লোলিনী নিয়ে বাঁচা, মিথ্যে হয়ে যাবে এতদিনের ঝুলনপূর্ণিমা নিয়ে বাঁচা, মিথ্যে হয়ে যাবে এতদিনের নবীনতা নিয়ে বাঁচা, মিথ্যে হয়ে যাবে এতদিনের প্রাণশক্তি নিয়ে বাঁচা, মিথ্যে হয়ে যাবে এতদিনের বোধভাষ্যি নিয়ে বাঁচা! আমরা তো বেঁচেছি অবলুপ্তি থেকে দুর্বিপাক ও মহাপ্রলয়ে পড়ার পরও! আমরা তো বেঁচেছি মৃত্যুশয্যা থেকে অন্তিমদশায় মর্গে থাকার পরও! আমরা তো বেঁচেছি ভৌতিকতা থেকে জ্ঞানশূন্য পাথুরে মাটিতে পরিণত হওয়ার পরও! আমরা কি ছেড়ে দেব মানুষখেকোর কাছে আমাদের শিশু-সন্তানদের? আমরা কি ছেড়ে দেব অন্ধ-টাট্টুঘোড়ার কাছে আমাদের মাঠ ও প্রান্তর? আমরা কি ছেড়ে দেব বুনোকুকুরের কাছে আমাদের কুঞ্জবন? আমরা কি ছেড়ে দেব শুঁয়োপোকার কাছে আমাদের বীজ ও বীজতলা? আমরা কি ছেড়ে দেব কাঠপিঁপড়ের কাছে আমাদের মাথার মগজ?
গোলাম কিবরিয়া পিনু
স্বদেশমূলক
মোল্লাচর থেকে কালাসোনা চর পর্যন্ত হেঁটেছে কতদিন, বালুচর পাড়ি দিয়ে গিয়েছে উত্তরে নদীতে সাঁতার আঁধারের রাত শরীরে মিশানো শিহরনে পার হয়ে গেছে শত্রু কবলিত রসুলপুরের বাঁধ, ঠাঁই নিয়েছিল কখনো গোয়াল ঘরে কখনো পলের পুন্জে, শীতকে করেছে পরাজিত, উষ্ণ — আশায় আশায়। ভাসানো ভেলায় গেছে উজানে স্রোতের বিপরীতে উলিপুর। দূর নয়, জনতার কাছাকাছি থেকে রেখেছিল হাত রাইফেলে — জনতার জন্যে, অরণ্যে ফুটেছে ফুল বরেণ্যে বলেছে তাঁকে — ‘মুক্তি’ ‘মুক্তি’।
গোলাম কিবরিয়া পিনু
মানবতাবাদী
কোন অভীষ্টের জন্যে এ রকম ছায়া নিয়ে যুক্ত শুদ্ধ হচ্ছে কার হাতে কার মুক্তিযুদ্ধ?তর্ক নামে শীতলতায় কিংবা উত্তাপে সূক্ষ্মভাবে ফেলে দিচ্ছি কাউকে কাউকে খাপে! রাজমুকুটের চাপে!দৃষ্টিগ্রাহ্য যা কিছু তা পিছু পিছু টেনে বোধগম্য কারণে-বারণে কীযে তোলা হচ্ছে ক্রেনে আর কীযে তোলা হচ্ছে ট্রেনে। কোন দফতর থেকে দেওয়া হচ্ছে খেতাপ-সর্বস্ব নাম আর রংমাখা মোমবাতি? পর্বতমালায় কি হয়েছে তৈরী এ ইতিহাস? নেই রক্ত, নেই কারো ঘাম!পোশাক পালটাতে পালটাতে উচু-নিচু গিয়ারে ওঠা-নামা করতে করতে কুচকাওয়াজকালেআটকে পড়ছি কোন জালে! আজকাল রং পালটায় কি শুধুই গিরগিটি? বাতিকগ্রস্ত চরিত্র রূপায়ণে যারা পারদর্শী তাদেরই হাতে পালটে যাচ্ছে বিজয়মুকুট- ইতিহাস হাসে মিটিমিটি ।
হুমায়ুন কবির
প্রকৃতিমূলক
শোন্ মা আমিনা, রেখে দে রে কাজ ত্বরা করে মাঠে চল, এল মেঘনায় জোয়ারের বেলা এখনি নামিবে ঢল। নদীর কিনার ঘন ঘাসে ভরা মাঠ থেকে গরু নিয়ে আয় ত্বরা করিস না দেরি–আসিয়া পড়িবে সহসা অথই জল মাঠ থেকে গরু নিয়ে আয় ত্বরা মেঘনায় নামে ঢল।এখনো যে মেয়ে আসে নাই ফিরে–দুপুর যে বয়ে যায়। ভরা জোয়ারের মেঘনার জল কূলে কূলে উছলায়। নদীর কিনার জলে একাকার, যেদিকে তাকাই অথই পাথার, দেখতো গোহালে গরুগুলি রেখে গিয়েছে কি ও পাড়ায় ? এখনো ফিরিয়া আসে নাই সে কি ? দুপুর যে বয়ে যায়।ভরবেলা গেলো, ভাটা পড়ে আসে, আঁধার জমিছে আসি, এখনো তবুও এলো না ফিরিয়া আমিনা সর্বনাশী। দেখ্ দেখ্ দূরে মাঝ-দরিয়ায় কাল চুল যেন ঐ দেখা যায়– কাহার শাড়ির আঁচল-আভাস সহসা উঠিছে ভাসি ? আমিনারে মোর নিল কি টানিয়া মেঘনা সর্বনাশী ?আরও পড়ুন…  দুঃখের ৫০ টি  উক্তি
শহীদ কাদরী
চিন্তামূলক
একটি মাছের অবসান ঘটে চিকন বটিতে, রাত্রির উঠোনে তার আঁশ জ্যোৎস্নার মতো হেলায়-ফেলায় পড়ে থাকে কোথাও কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না, কোথাও কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না;কবরের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে প্রবেশ করে প্রথম বসন্তের হাওয়া, মৃতের চোখের কোটরের মধ্যে লাল ঠোঁট নিঃশব্দে ডুবিয়ে বসে আছে একটা সবুজ টিয়ে, ফুটপাতে শুয়ে থাকা ন্যাংটো ভিখিরির নাভিমূলে হীরার কৌটোর মতো টলটল করছে শিশির এবং পাখির প্রস্রাব; সরল গ্রাম্যজন খরগোশ শিকার করে নিপুণ ফিরে আসে পত্নীর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে, চুল্লির লাল তাপে একটি নরম শিশু খরগোশের মাংস দেখে আহ্লাদে লাফায় সব রাঙা ঘাস স্মৃতির বাইরে পড়ে থাকে বৃষ্টি ফিরিয়ে আনে তার প্রথম সহজ রঙ হেলায়-ফেলায়কোথাও কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না, কোথাও কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না
শহীদ কাদরী
চিন্তামূলক
চেয়ার, টেবিল, সোফাসেট, আলমারিগুলো আমার নয় গাছ, পুকুর, জল, বৃষ্টিধারা শুধু আমার চুল, চিবুক, স্তন, ঊরু আমার নয়, প্রেমিকের ব্যাকুল অবয়বগুলো আমাররাষ্ট্রপ্রধান কি মেনে নেবেন আমার প্রস্তাবগুলো কবিতার লাবণ্য দিয়ে নিজস্ব প্রাধান্য বিস্তার অন্তিমে উদ্দেশ্য যার?
শহীদ কাদরী
প্রেমমূলক
ভয় নেই আমি এমন ব্যবস্থা করবো যাতে সেনাবাহিনী গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে মার্চপাস্ট করে চলে যাবে এবং স্যালুট করবে কেবল তোমাকে প্রিয়তমা। ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো বন-বাদাড় ডিঙ্গিয়ে কাঁটা-তার, ব্যারিকেড পার হয়ে, অনেক রণাঙ্গনের স্মৃতি নিয়ে আর্মার্ড-কারগুলো এসে দাঁড়াবে ভায়োলিন বোঝাই করে কেবল তোমার দোরগোড়ায় প্রিয়তমা। ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো- বি-৫২ আর মিগ-২১গুলো মাথার ওপর গোঁ-গোঁ করবে ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো চকোলেট, টফি আর লজেন্সগুলো প্যারাট্রুপারদের মতো ঝরে পড়বে কেবল তোমার উঠোনে প্রিয়তমা। ভয় নেই…আমি এমন ব্যবস্থা করবো একজন কবি কমান্ড করবেন বঙ্গোপসাগরের সবগুলো রণতরী এবং আসন্ন নির্বাচনে সমরমন্ত্রীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সবগুলো গণভোট পাবেন একজন প্রেমিক, প্রিয়তমা! সংঘর্ষের সব সম্ভাবনা, ঠিক জেনো, শেষ হবে যাবে- আমি এমন ব্যবস্থা করবো, একজন গায়ক অনায়াসে বিরোধীদলের অধিনায়ক হয়ে যাবেন সীমান্তের ট্রেঞ্চগুলোয় পাহারা দেবে সারাটা বৎসর লাল নীল সোনালি মাছি- ভালোবাসার চোরাচালান ছাড়া সবকিছু নিষিদ্ধ হয়ে যাবে, প্রিয়তমা। ভয় নেই আমি এমন ব্যবস্থা করবো মুদ্রাস্ফীতি কমে গিয়ে বেড়ে যাবে শিল্পোত্তীর্ণ কবিতার সংখ্যা প্রতিদিন আমি এমন ব্যবস্থা করবো গণরোষের বদলে গণচুম্বনের ভয়ে হন্তারকের হাত থেকে পড়ে যাবে ছুরি, প্রিয়তমা। ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো শীতের পার্কের ওপর বসন্তের সংগোপন আক্রমণের মতো অ্যাকর্ডিয়ান বাজাতে- বাজাতে বিপ্লবীরা দাঁড়াবে শহরে, ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো স্টেটব্যাংকে গিয়ে গোলাপ কিম্বা চন্দ্রমল্লিকা ভাঙালে অন্তত চার লক্ষ টাকা পাওয়া যাবে একটি বেলফুল দিলে চারটি কার্ডিগান। ভয় নেই, ভয় নেই ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো নৌ, বিমান আর পদাতিক বাহিনী কেবল তোমাকেই চতুর্দিক থেকে ঘিরে- ঘিরে নিশিদিন অভিবাদন করবে, প্রিয়তমা।
শহীদ কাদরী
চিন্তামূলক
আমাকে রাঙাতে পারে তেমন গোলাপ কখনও দেখি না। তবে কাকে, কখন, কোথায় ধরা দেবো? একমাত্র গোধূলি বেলায় সবকিছু বীরাঙ্গনার মতন রাঙা হয়ে যায়। শৈশবও ছিলো না লাল। তবে জানি, দেখেছিও, ছুরির উজ্জ্বলতা থেকে ঝরে পড়ে বিন্দু বিন্দু লাল ফোঁটাতবে হাত রাখবো ছুরির বাঁটে? সবুজ সতেজ- রূপালি রেকাবে রাখা পানের নিপুণ কোনো খিলি নয়, মাংস, মাংস, মাংস… মাংসের ভেতরে শুধু দৃঢ়মুখ সার্জনের রূঢ়তম হাতের মতন খুঁজে নিতে হবে সব জীবনের রাঙা দিনগুলি …
শহীদ কাদরী
চিন্তামূলক
অদৃশ্য ফিতে থেকে ঝুলছে রঙিন বেলুন রাত্রির নীলাভ আসঙ্গে আর স্বপ্নের ওপর যেন তার নৌকা- দোলা; সোনার ঘণ্টার ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত শহরের! আমি ফিরলাম ঝর্ণার মতো সেই গ্রীষ্ম দিনগুলোর ভেতর যেখানে শীৎকার, মত্ততা আর বেলফুলে গাঁথা জন্মরাত্রির উৎসবের আলো; দীর্ঘ দুপুর ভরে অপেমান ঘোড়ার ভৌতিক পিঠের মতো রাস্তাগুলো, গলা পিচে তরল বুদ্বুদে ছলছল নত্ররাজি, তার ওপর কোমল পায়ের ছাপ, -চলে গেছি শব্দহীন ঠাকুর মার ঝুলির ভেতর। দেয়ালে ছায়ার নাচ সোনালি মাছের। ফিরে দাঁড়ালাম সেই গাঢ়, লাল মেঝেয়, ভয়-পাওয়া রাত্রিগুলোয় যেখানে অসতর্ক স্পর্শে গড়িয়ে পড়লো কাঁচের সচ্ছল আধার, আর সহোদরার কান্নাকে চিরে শূন্যে, কয়েকটা বর্ণের ঝলক নিঃশব্দে ফিকে হল; আমি ফিরে দাঁড়ালাম সেই মুহূর্তটির ওপর, সেই ঠাণ্ডা করুণ মরা মেঝেয়
শহীদ কাদরী
রূপক
কে যেন চিৎকার করছে প্রাণপণে `গোলাপ! গোলাপ!’ ঠোঁট থেকে গড়িয়ে পড়ছে তার সুমসৃণ লালা, `প্রেম, প্রেম’ বলে এক চশমা-পরা চিকণ যুবক সাইকেল-রিকশায় চেপে মাঝরাতে ফিরছে বাড়ীতে, `নীলিমা, নিসর্গ, নারী’- সম্মিলিত মুখের ফেনায় পরস্পর বদলে নিলো স্থানকাল, দিবস শর্বরী হলো সফেদ পদ্মের মতো সূর্য উঠলো ফুটে গোধূরির রাঙা হ্রদে এবং স্বপ্নের অভ্যন্তরে কবিদের নিঃসঙ্গ করুণ গণ্ডদেশে মহিলার মতো ছদ্মবেশে জাঁদরেল নপুংসক এক ছুড়ে মারলো সুতীক্ষ্ণ চুম্বন।
শহীদ কাদরী
চিন্তামূলক
বন্য শূকর খুঁজে পাবে প্রিয় কাদা মাছরাঙা পাবে অন্বেষণের মাছ, কালো রাতগুলো বৃষ্টিতে হবে শাদা ঘন জঙ্গলে ময়ূর দেখাবে নাচ প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না… একাকী পথিক ফিরে যাবে তার ঘরে শূন্য হাঁড়ির গহ্বরে অবিরত শাদা ভাত ঠিক উঠবেই ফুটে তারাপুঞ্জের মতো, পুরোনো গানের বিস্মৃত-কথা ফিরবে তোমার স্বরে প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না… ব্যারাকে-ব্যারাকে থামবে কুচকাওয়াজ ক্ষুধার্ত বাঘ পেয়ে যাবে নীলগাই, গ্রামান্তরের বাতাস আনবে স্বাদু আওয়াজ মেয়েলি গানের- তোমরা দু’জন একঘরে পাবে ঠাঁই প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না…
আবদুল গাফফার চৌধুরী
স্বদেশমূলক
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু ঝরা এ ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি।।জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা জাগো কালবোশেখীরা শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা, দেশের সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবী দিন বদলের ক্রান্তিলগ্নে তবু তোরা পার পাবি? না, না, না, না খুন রাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেওয়া তারই একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।সেদিনও এমনি নীল গগনের বসনে শীতের শেষে রাত জাগা চাঁদ চুমো খেয়েছিল হেসে; পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকনন্দা যেন, এমন সময় ঝড় এলো এক ঝড় এলো খ্যাপা বুনো।।সেই আঁধারের পশুদের মুখ চেনা, তাহাদের তরে মায়ের, বোনের, ভায়ের চরম ঘৃণা ওরা গুলি ছোঁড়ে এদেশের প্রাণে দেশের দাবীকে রোখে ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই সারা বাংলার বুকে ওরা এদেশের নয়, দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয় ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে কাড়ি একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।তুমি আজ জাগো তুমি আজ জাগো একুশে ফেব্রুয়ারি আজো জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর নারী আমার শহীদ ভায়ের আত্মা ডাকে জাগো মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাটে বাটে দারুণ ক্রোধের আগুনে আবার জ্বালবো ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।
আখতারুজ্জামান আজাদ
মানবতাবাদী
এই যে তুমি মস্ত মুমিন, মুসলমানের ছেলে; বক্ষ ভাসাও, ফিলিস্তিনে খুনের খবর পেলে। রোহিঙ্গাদের দুঃখে তুমি এমন কাঁদা কাঁদো; ভাসাও পুরো আকাশ-পাতাল, ভাসাও তুমি চাঁদও! অশ্রু তোমার তৈরি থাকে— স্বচ্ছ এবং তাজা; হ্যাশের পরে লিখছ তুমি— বাঁচাও, বাঁচাও গাজা। কোথায় থাকে অশ্রু তোমার— শুধোই নরম স্বরে, তোমার-আমার বাংলাদেশে হিন্দু যখন মরে? মালেক-খালেক মরলে পরে শক্ত তোমার চোয়াল; যখন মরে নরেশ-পরেশ, শূন্য তোমার ওয়াল! তখন তোমার ওয়ালজুড়ে পুষ্প এবং পাখি, কেমন করে পারছ এমন— প্রশ্ন গেলাম রাখি।তোমরা যারা দত্ত-কুমার, মৎস্য ঢাকো শাকে; কবির লেখা পক্ষে গেলেই ভজন করো তাকে। মুসলমানের নিন্দে করে লিখলে কোথাও কিছু; তালির পরে দিচ্ছ তালি, নিচ্ছ কবির পিছু। কিন্তু তোমার অশ্রু, আহা, কেবল তখন ঝরে; বাংলাদেশের কোথাও কেবল হিন্দু যখন মরে! পুড়লে তোমার মামার বাড়ি, জীবন গেলে কাকুর; তখন তোমার কান্না শুনি— রক্ষে করো, ঠাকুর! কালীর ডেরায় লাগলে আগুন তখন কেবল ডাকো, রহিম-করিম মরলে তখন কোথায় তুমি থাকো? বাংলাদেশে সুশীল তুমি, ভারতজুড়ে যম; মুসলমানের মূল্য তখন গরুর চেয়ে কম!বাংলাদেশের কস্তা-গোমেজ— যিশুর দলের লোক; বোমায় ওড়ে গির্জা যখন, তখন কেবল শোক। বস্তাভরা শোকের রঙে কস্তা তখন রাঙে, যিশুর নামে মারলে মানুষ নিদ্রা কি আর ভাঙে! মরণ হলে মুসলমানের, হয় না কাঁদার ইশু; গভীর ঘুমে থাকেন তখন বাংলাদেশের যিশু! খেলার ওপর চলছে খেলা— টমের সাথে জেরি; বঙ্গদেশের সন্তানেরা এমন কেন, মেরি? তোমরা যারা কস্তা-গোমেজ কিংবা রোজারিও; মুখের ওপর মুখোশ খুলে জবাব এবার দিয়ো।রোহিঙ্গাদের রক্তে যখন বার্মা মরণ-কূপ; বাংলাদেশের বৌদ্ধ যারা, মড়ার মতোন চুপ! ভিক্ষু যখন বলছে হেঁকে— রোহিঙ্গাদের কাটো; তখন কেন, হে বড়ুয়া, ওষ্ঠে কুলুপ আঁটো? এমন করেই মরছে মানুষ ধর্ম নামের ছলে; বাংলাদেশের বৌদ্ধ কাঁদে, বুদ্ধ যখন জ্বলে। যখন জ্বলে বৌদ্ধবিহার, যখন রামুর পাহাড়; সব বড়ুয়ার জবানজুড়ে শান্তিবাণীর বাহার! শান্তিবাণীর এমন বাহার তখন কোথায় থাকে, রোহিঙ্গারা যখন মরে নাফের জলের বাঁকে?পাগড়ি দেখি, পৈতা দেখি, আকাশজুড়ে ফানুশ; চতুর্দিকে চতুষ্পদী, হচ্ছি কজন মানুষ! জগৎজুড়ে সৈয়দ কত, কত্ত গোমেজ-বসু; খতম কজন করতে পারি মনের মাঝের পশু! মরণখেলায় হারছে কে বা, জিতছে আবার কে রে; মরছে মানুষ, দিনের শেষে যাচ্ছে মানুষ হেরে। হারার-জেতার কষতে হিশেব মগজ খানিক লাগে, একটুখানি মানুষ হোয়ো কফিন হওয়ার আগে। রক্তখেলা অনেক হলো, সময় এবার থামার; বিভেদ ভুলে বলুক সবে— সকল মানুষ আমার।বন্ধ ঘরের দরজা ভাঙো, অন্ধ দু-চোখ খোলো; মরছে কেন আমার মানুষ— আওয়াজ এবার তোলো।এই যে তুমি মস্ত মুমিন, মুসলমানের ছেলে; বক্ষ ভাসাও, ফিলিস্তিনে খুনের খবর পেলে। রোহিঙ্গাদের দুঃখে তুমি এমন কাঁদা কাঁদো; ভাসাও পুরো আকাশ-পাতাল, ভাসাও তুমি চাঁদও! অশ্রু তোমার তৈরি থাকে— স্বচ্ছ এবং তাজা; হ্যাশের পরে লিখছ তুমি— বাঁচাও, বাঁচাও গাজা। কোথায় থাকে অশ্রু তোমার— শুধোই নরম স্বরে, তোমার-আমার বাংলাদেশে হিন্দু যখন মরে? মালেক-খালেক মরলে পরে শক্ত তোমার চোয়াল; যখন মরে নরেশ-পরেশ, শূন্য তোমার ওয়াল! তখন তোমার ওয়ালজুড়ে পুষ্প এবং পাখি, কেমন করে পারছ এমন— প্রশ্ন গেলাম রাখি।তোমরা যারা দত্ত-কুমার, মৎস্য ঢাকো শাকে; কবির লেখা পক্ষে গেলেই ভজন করো তাকে। মুসলমানের নিন্দে করে লিখলে কোথাও কিছু; তালির পরে দিচ্ছ তালি, নিচ্ছ কবির পিছু। কিন্তু তোমার অশ্রু, আহা, কেবল তখন ঝরে; বাংলাদেশের কোথাও কেবল হিন্দু যখন মরে! পুড়লে তোমার মামার বাড়ি, জীবন গেলে কাকুর; তখন তোমার কান্না শুনি— রক্ষে করো, ঠাকুর! কালীর ডেরায় লাগলে আগুন তখন কেবল ডাকো, রহিম-করিম মরলে তখন কোথায় তুমি থাকো? বাংলাদেশে সুশীল তুমি, ভারতজুড়ে যম; মুসলমানের মূল্য তখন গরুর চেয়ে কম!বাংলাদেশের কস্তা-গোমেজ— যিশুর দলের লোক; বোমায় ওড়ে গির্জা যখন, তখন কেবল শোক। বস্তাভরা শোকের রঙে কস্তা তখন রাঙে, যিশুর নামে মারলে মানুষ নিদ্রা কি আর ভাঙে! মরণ হলে মুসলমানের, হয় না কাঁদার ইশু; গভীর ঘুমে থাকেন তখন বাংলাদেশের যিশু! খেলার ওপর চলছে খেলা— টমের সাথে জেরি; বঙ্গদেশের সন্তানেরা এমন কেন, মেরি? তোমরা যারা কস্তা-গোমেজ কিংবা রোজারিও; মুখের ওপর মুখোশ খুলে জবাব এবার দিয়ো।রোহিঙ্গাদের রক্তে যখন বার্মা মরণ-কূপ; বাংলাদেশের বৌদ্ধ যারা, মড়ার মতোন চুপ! ভিক্ষু যখন বলছে হেঁকে— রোহিঙ্গাদের কাটো; তখন কেন, হে বড়ুয়া, ওষ্ঠে কুলুপ আঁটো? এমন করেই মরছে মানুষ ধর্ম নামের ছলে; বাংলাদেশের বৌদ্ধ কাঁদে, বুদ্ধ যখন জ্বলে। যখন জ্বলে বৌদ্ধবিহার, যখন রামুর পাহাড়; সব বড়ুয়ার জবানজুড়ে শান্তিবাণীর বাহার! শান্তিবাণীর এমন বাহার তখন কোথায় থাকে, রোহিঙ্গারা যখন মরে নাফের জলের বাঁকে?পাগড়ি দেখি, পৈতা দেখি, আকাশজুড়ে ফানুশ; চতুর্দিকে চতুষ্পদী, হচ্ছি কজন মানুষ! জগৎজুড়ে সৈয়দ কত, কত্ত গোমেজ-বসু; খতম কজন করতে পারি মনের মাঝের পশু! মরণখেলায় হারছে কে বা, জিতছে আবার কে রে; মরছে মানুষ, দিনের শেষে যাচ্ছে মানুষ হেরে। হারার-জেতার কষতে হিশেব মগজ খানিক লাগে, একটুখানি মানুষ হোয়ো কফিন হওয়ার আগে। রক্তখেলা অনেক হলো, সময় এবার থামার; বিভেদ ভুলে বলুক সবে— সকল মানুষ আমার।বন্ধ ঘরের দরজা ভাঙো, অন্ধ দু-চোখ খোলো; মরছে কেন আমার মানুষ— আওয়াজ এবার তোলো।এই যে তুমি মস্ত মুমিন, মুসলমানের ছেলে; বক্ষ ভাসাও, ফিলিস্তিনে খুনের খবর পেলে। রোহিঙ্গাদের দুঃখে তুমি এমন কাঁদা কাঁদো; ভাসাও পুরো আকাশ-পাতাল, ভাসাও তুমি চাঁদও! অশ্রু তোমার তৈরি থাকে— স্বচ্ছ এবং তাজা; হ্যাশের পরে লিখছ তুমি— বাঁচাও, বাঁচাও গাজা। কোথায় থাকে অশ্রু তোমার— শুধোই নরম স্বরে, তোমার-আমার বাংলাদেশে হিন্দু যখন মরে? মালেক-খালেক মরলে পরে শক্ত তোমার চোয়াল; যখন মরে নরেশ-পরেশ, শূন্য তোমার ওয়াল! তখন তোমার ওয়ালজুড়ে পুষ্প এবং পাখি, কেমন করে পারছ এমন— প্রশ্ন গেলাম রাখি।তোমরা যারা দত্ত-কুমার, মৎস্য ঢাকো শাকে; কবির লেখা পক্ষে গেলেই ভজন করো তাকে। মুসলমানের নিন্দে করে লিখলে কোথাও কিছু; তালির পরে দিচ্ছ তালি, নিচ্ছ কবির পিছু। কিন্তু তোমার অশ্রু, আহা, কেবল তখন ঝরে; বাংলাদেশের কোথাও কেবল হিন্দু যখন মরে! পুড়লে তোমার মামার বাড়ি, জীবন গেলে কাকুর; তখন তোমার কান্না শুনি— রক্ষে করো, ঠাকুর! কালীর ডেরায় লাগলে আগুন তখন কেবল ডাকো, রহিম-করিম মরলে তখন কোথায় তুমি থাকো? বাংলাদেশে সুশীল তুমি, ভারতজুড়ে যম; মুসলমানের মূল্য তখন গরুর চেয়ে কম!বাংলাদেশের কস্তা-গোমেজ— যিশুর দলের লোক; বোমায় ওড়ে গির্জা যখন, তখন কেবল শোক। বস্তাভরা শোকের রঙে কস্তা তখন রাঙে, যিশুর নামে মারলে মানুষ নিদ্রা কি আর ভাঙে! মরণ হলে মুসলমানের, হয় না কাঁদার ইশু; গভীর ঘুমে থাকেন তখন বাংলাদেশের যিশু! খেলার ওপর চলছে খেলা— টমের সাথে জেরি; বঙ্গদেশের সন্তানেরা এমন কেন, মেরি? তোমরা যারা কস্তা-গোমেজ কিংবা রোজারিও; মুখের ওপর মুখোশ খুলে জবাব এবার দিয়ো।রোহিঙ্গাদের রক্তে যখন বার্মা মরণ-কূপ; বাংলাদেশের বৌদ্ধ যারা, মড়ার মতোন চুপ! ভিক্ষু যখন বলছে হেঁকে— রোহিঙ্গাদের কাটো; তখন কেন, হে বড়ুয়া, ওষ্ঠে কুলুপ আঁটো? এমন করেই মরছে মানুষ ধর্ম নামের ছলে; বাংলাদেশের বৌদ্ধ কাঁদে, বুদ্ধ যখন জ্বলে। যখন জ্বলে বৌদ্ধবিহার, যখন রামুর পাহাড়; সব বড়ুয়ার জবানজুড়ে শান্তিবাণীর বাহার! শান্তিবাণীর এমন বাহার তখন কোথায় থাকে, রোহিঙ্গারা যখন মরে নাফের জলের বাঁকে?পাগড়ি দেখি, পৈতা দেখি, আকাশজুড়ে ফানুশ; চতুর্দিকে চতুষ্পদী, হচ্ছি কজন মানুষ! জগৎজুড়ে সৈয়দ কত, কত্ত গোমেজ-বসু; খতম কজন করতে পারি মনের মাঝের পশু! মরণখেলায় হারছে কে বা, জিতছে আবার কে রে; মরছে মানুষ, দিনের শেষে যাচ্ছে মানুষ হেরে। হারার-জেতার কষতে হিশেব মগজ খানিক লাগে, একটুখানি মানুষ হোয়ো কফিন হওয়ার আগে। রক্তখেলা অনেক হলো, সময় এবার থামার; বিভেদ ভুলে বলুক সবে— সকল মানুষ আমার।বন্ধ ঘরের দরজা ভাঙো, অন্ধ দু-চোখ খোলো; মরছে কেন আমার মানুষ— আওয়াজ এবার তোলো।
আখতারুজ্জামান আজাদ
চিন্তামূলক
আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি — না ঘরে, না বাইরে; না বাইরে, না ভিতরে; না ভিতরে, না ইতরে!আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি — না নরের, না নারীর; না আত্মীয়ের, না আততায়ীর; না আস্তিকের, না নাস্তিকের; না কবির, না নবির।আমার গলা নারীর বন্দনাগীত গায়নি, জিভ থেকে পুরুষের স্তবক বেরোয়নি, আমার হাত কারো পা ছোঁয়নি, চোখ কারো ভণ্ডামো এড়ায়নি, ঠোঁট ঢুকে পড়েনি অপঠোঁটে, একনায়িকার খামখেয়ালে আমার শরীর করেনি ওঠবস, আমার মগজ কাউকে দেয়নি পূর্ণ বা খণ্ডকালীন দাসখত!আমার আত্মঘাতে ঘা খেয়ে উঠেছে পেশিবহুল পুরুষও, আমার বিষবাক্যে চিত্‍কার করে উঠেছে পূজাপ্রত্যাশী নারীও!ধুতি-টুপিতে টান পড়ায় শীত্‍কার করে উঠেছে ধর্মজীবী ধার্মিকও, অজ্ঞাতনামা রোগে রাগান্বিত হয়ে উঠেছে নার্সিসাস নাস্তিকও!অবশেষে, আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি!তোষামুদে-জন প্রিয় হয় সবার, এই হলো পরিহাস; তোষামোদ করিনি কখনোই আমি, এই হলো ইতিহাস!আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি — না ঘরে, না বাইরে; না বাইরে, না ভিতরে; না ভিতরে, না ইতরে!আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি — না নরের, না নারীর; না আত্মীয়ের, না আততায়ীর; না আস্তিকের, না নাস্তিকের; না কবির, না নবির।আমার গলা নারীর বন্দনাগীত গায়নি, জিভ থেকে পুরুষের স্তবক বেরোয়নি, আমার হাত কারো পা ছোঁয়নি, চোখ কারো ভণ্ডামো এড়ায়নি, ঠোঁট ঢুকে পড়েনি অপঠোঁটে, একনায়িকার খামখেয়ালে আমার শরীর করেনি ওঠবস, আমার মগজ কাউকে দেয়নি পূর্ণ বা খণ্ডকালীন দাসখত!আমার আত্মঘাতে ঘা খেয়ে উঠেছে পেশিবহুল পুরুষও, আমার বিষবাক্যে চিত্‍কার করে উঠেছে পূজাপ্রত্যাশী নারীও!ধুতি-টুপিতে টান পড়ায় শীত্‍কার করে উঠেছে ধর্মজীবী ধার্মিকও, অজ্ঞাতনামা রোগে রাগান্বিত হয়ে উঠেছে নার্সিসাস নাস্তিকও!অবশেষে, আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি!তোষামুদে-জন প্রিয় হয় সবার, এই হলো পরিহাস; তোষামোদ করিনি কখনোই আমি, এই হলো ইতিহাস!আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি — না ঘরে, না বাইরে; না বাইরে, না ভিতরে; না ভিতরে, না ইতরে!আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি — না নরের, না নারীর; না আত্মীয়ের, না আততায়ীর; না আস্তিকের, না নাস্তিকের; না কবির, না নবির।আমার গলা নারীর বন্দনাগীত গায়নি, জিভ থেকে পুরুষের স্তবক বেরোয়নি, আমার হাত কারো পা ছোঁয়নি, চোখ কারো ভণ্ডামো এড়ায়নি, ঠোঁট ঢুকে পড়েনি অপঠোঁটে, একনায়িকার খামখেয়ালে আমার শরীর করেনি ওঠবস, আমার মগজ কাউকে দেয়নি পূর্ণ বা খণ্ডকালীন দাসখত!আমার আত্মঘাতে ঘা খেয়ে উঠেছে পেশিবহুল পুরুষও, আমার বিষবাক্যে চিত্‍কার করে উঠেছে পূজাপ্রত্যাশী নারীও!ধুতি-টুপিতে টান পড়ায় শীত্‍কার করে উঠেছে ধর্মজীবী ধার্মিকও, অজ্ঞাতনামা রোগে রাগান্বিত হয়ে উঠেছে নার্সিসাস নাস্তিকও!অবশেষে, আমি কখনোই কারো প্রিয় হতে পারিনি!তোষামুদে-জন প্রিয় হয় সবার, এই হলো পরিহাস; তোষামোদ করিনি কখনোই আমি, এই হলো ইতিহাস!
আখতারুজ্জামান আজাদ
চিন্তামূলক
মুখতার, চা দাও এক কাপ!প্রিয় দেশবাসী, আজ এই টিএসসির খোলা চত্বরে দাঁড়িয়ে ধূমায়মান চায়ের কাপ হাতে নিয়ে, আপনাদেরকে আমি আমার লাগামহীন চা-পানের ইতিবৃত্ত বর্ণনা করব।আমার হাতে চা-ভর্তি এই যে কাপটি দেখছেন — এই কাপটি একটি ইতিহাস, টিএসসির টি স্টলের প্রতিটি কাপই একেকটি ইতিহাস!খানিক আগে এই কাপে চা খেয়ে গেছে ঘামে-নাওয়া এক রিকশাশ্রমিক, সদ্য-চুমু-খাওয়া রেসকোর্সফেরত এক উদ্বাহু প্রেমিক।শ্রমিকের নাকের ঘাম, প্রেমিকের ঠোঁটের কাম — লেগে আছে এই চায়ের কাপে। শ্রমিকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, প্রেমিকের ওষ্ঠীভূত লোভ — গলে আছে এই চায়ের তাপে।হয়তো এই কাপেই চা খেতে খেতে কোনো খুনি এঁকে গেছে কোনো খুনের নকশা, কোনো মুণী আবিষ্কার করে গেছে দর্শনের নয়া নয়া ধোঁয়াশা, প্রেমবঞ্চিত কোনো কবি কারো প্রেমকেলী দেখে ফেলে গেছে দু ফোঁটা চোখের জল, সদ্য-অঙ্কুরোদগম-ঘটা কোনো প্রেমিকা লাগিয়ে গেছে ঠোঁটের ছল।প্রেমিক থেকে শ্রমিক, খুনি থেকে মুণী, কবিনেতা থেকে অভিনেতা — প্রত্যেকের মুখস্থ তপ্ত থুতু লেগে এই চায়ের কাপে!এই ঐতিহাসিক কাপে ঠোঁট ছুঁইয়ে আমি পাই ইতিহাসের ছোঁয়া, কেতলির নলে আমি দেখি ইতিহাসের দাউদাউ ধোঁয়া।প্রিয় ধোঁয়া উড়ছে, উড়ছে তো উড়ছেই; চোখের জল পুড়ছে, পুড়ছে তো পুড়ছেই!প্রিয় দেশবাসী, আমি বিশ্বাস করি — হাজার বছরের হাজার আয়োজন শেষে, বহু দূর হতে দ্ব্যর্থক হাসি হেসে, চায়ের চুলোর ধোঁয়ায় ভেসে ভেসে, একদিন সাবালিকা এসে দাঁড়াবে টিএসসির এই টি স্টলে!এবং বলবে — “শত বরষের শতেক স্বপন চায়ের কাপে মাখাও; স্বপ্ন এবার সত্যি তোমার, চা খাও কবি, চা খাও!”মুখতার, চা দাও এক কাপ!প্রিয় দেশবাসী, আজ এই টিএসসির খোলা চত্বরে দাঁড়িয়ে ধূমায়মান চায়ের কাপ হাতে নিয়ে, আপনাদেরকে আমি আমার লাগামহীন চা-পানের ইতিবৃত্ত বর্ণনা করব।আমার হাতে চা-ভর্তি এই যে কাপটি দেখছেন — এই কাপটি একটি ইতিহাস, টিএসসির টি স্টলের প্রতিটি কাপই একেকটি ইতিহাস!খানিক আগে এই কাপে চা খেয়ে গেছে ঘামে-নাওয়া এক রিকশাশ্রমিক, সদ্য-চুমু-খাওয়া রেসকোর্সফেরত এক উদ্বাহু প্রেমিক।শ্রমিকের নাকের ঘাম, প্রেমিকের ঠোঁটের কাম — লেগে আছে এই চায়ের কাপে। শ্রমিকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, প্রেমিকের ওষ্ঠীভূত লোভ — গলে আছে এই চায়ের তাপে।হয়তো এই কাপেই চা খেতে খেতে কোনো খুনি এঁকে গেছে কোনো খুনের নকশা, কোনো মুণী আবিষ্কার করে গেছে দর্শনের নয়া নয়া ধোঁয়াশা, প্রেমবঞ্চিত কোনো কবি কারো প্রেমকেলী দেখে ফেলে গেছে দু ফোঁটা চোখের জল, সদ্য-অঙ্কুরোদগম-ঘটা কোনো প্রেমিকা লাগিয়ে গেছে ঠোঁটের ছল।প্রেমিক থেকে শ্রমিক, খুনি থেকে মুণী, কবিনেতা থেকে অভিনেতা — প্রত্যেকের মুখস্থ তপ্ত থুতু লেগে এই চায়ের কাপে!এই ঐতিহাসিক কাপে ঠোঁট ছুঁইয়ে আমি পাই ইতিহাসের ছোঁয়া, কেতলির নলে আমি দেখি ইতিহাসের দাউদাউ ধোঁয়া।প্রিয় ধোঁয়া উড়ছে, উড়ছে তো উড়ছেই; চোখের জল পুড়ছে, পুড়ছে তো পুড়ছেই!প্রিয় দেশবাসী, আমি বিশ্বাস করি — হাজার বছরের হাজার আয়োজন শেষে, বহু দূর হতে দ্ব্যর্থক হাসি হেসে, চায়ের চুলোর ধোঁয়ায় ভেসে ভেসে, একদিন সাবালিকা এসে দাঁড়াবে টিএসসির এই টি স্টলে!এবং বলবে — “শত বরষের শতেক স্বপন চায়ের কাপে মাখাও; স্বপ্ন এবার সত্যি তোমার, চা খাও কবি, চা খাও!”মুখতার, চা দাও এক কাপ!প্রিয় দেশবাসী, আজ এই টিএসসির খোলা চত্বরে দাঁড়িয়ে ধূমায়মান চায়ের কাপ হাতে নিয়ে, আপনাদেরকে আমি আমার লাগামহীন চা-পানের ইতিবৃত্ত বর্ণনা করব।আমার হাতে চা-ভর্তি এই যে কাপটি দেখছেন — এই কাপটি একটি ইতিহাস, টিএসসির টি স্টলের প্রতিটি কাপই একেকটি ইতিহাস!খানিক আগে এই কাপে চা খেয়ে গেছে ঘামে-নাওয়া এক রিকশাশ্রমিক, সদ্য-চুমু-খাওয়া রেসকোর্সফেরত এক উদ্বাহু প্রেমিক।শ্রমিকের নাকের ঘাম, প্রেমিকের ঠোঁটের কাম — লেগে আছে এই চায়ের কাপে। শ্রমিকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, প্রেমিকের ওষ্ঠীভূত লোভ — গলে আছে এই চায়ের তাপে।হয়তো এই কাপেই চা খেতে খেতে কোনো খুনি এঁকে গেছে কোনো খুনের নকশা, কোনো মুণী আবিষ্কার করে গেছে দর্শনের নয়া নয়া ধোঁয়াশা, প্রেমবঞ্চিত কোনো কবি কারো প্রেমকেলী দেখে ফেলে গেছে দু ফোঁটা চোখের জল, সদ্য-অঙ্কুরোদগম-ঘটা কোনো প্রেমিকা লাগিয়ে গেছে ঠোঁটের ছল।প্রেমিক থেকে শ্রমিক, খুনি থেকে মুণী, কবিনেতা থেকে অভিনেতা — প্রত্যেকের মুখস্থ তপ্ত থুতু লেগে এই চায়ের কাপে!এই ঐতিহাসিক কাপে ঠোঁট ছুঁইয়ে আমি পাই ইতিহাসের ছোঁয়া, কেতলির নলে আমি দেখি ইতিহাসের দাউদাউ ধোঁয়া।প্রিয় ধোঁয়া উড়ছে, উড়ছে তো উড়ছেই; চোখের জল পুড়ছে, পুড়ছে তো পুড়ছেই!প্রিয় দেশবাসী, আমি বিশ্বাস করি — হাজার বছরের হাজার আয়োজন শেষে, বহু দূর হতে দ্ব্যর্থক হাসি হেসে, চায়ের চুলোর ধোঁয়ায় ভেসে ভেসে, একদিন সাবালিকা এসে দাঁড়াবে টিএসসির এই টি স্টলে!এবং বলবে — “শত বরষের শতেক স্বপন চায়ের কাপে মাখাও; স্বপ্ন এবার সত্যি তোমার, চা খাও কবি, চা খাও!”
আখতারুজ্জামান আজাদ
চিন্তামূলক
তোমরা কি দেখোনি কীভাবে আমি আমার খুনিদের বিচার করেছি? তোমরা কি জানো না আমার সংবিধানে আটচল্লিশ আছে,পঞ্চাশ আছে,উনপঞ্চাশতম অনুচ্ছেদ নেই? তোমরা দেখোনি,তোমরা জানো না।শেষকৈশোরে আমাকে একজন খুন করেছিল। আমার স্থির রক্তকে সে অস্থির করেছিল, আমার খরাক্লিষ্ট ঠোঁটকে সয়লাব করেছিল চুমোচ্ছ্বাসে, মুহূর্তে সে আমাকে কিশোর থেকে যুবক বানিয়েছিল। তারপর… তারপর আমাকে না জানিয়েই সে আমাকে খুন করে! তোমরা জানো?আমি জানতেও পারিনি সে আমাকে খুন করেছে!যখন জানতে পাই,আমিও দাউদাউ করে উঠি; হাতে তুলে নিই সশস্ত্র কলম,উদগীরণ করতে থাকি কাব্যলাভা; তার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিই মৃত্যুর পরোয়ানা। পরোয়ানা পড়েই সে মারা যায়, সে তো জানত না আমার কলমে-আঙ্গুলে লুকিয়ে ছিল বিষ, তাকে নিয়ে রচিত দু কুড়ি বিষাক্ত কাব্যে তার মরণ হয়!মৃত্যুর আগে সে সাশ্রুকণ্ঠে ক্ষমা চেয়েছিল, আমি বলেছি,’ক্ষমা নেই’!যৌবনে আমি দ্বিতীয়বার খুন হই। যে আমার মাংসে তুলেছিল মাংসের তুফান, মুহূর্তে পরিণত করেছিল যুবক থেকে পূর্ণপুরুষে, সে আমাকে ঘোষণা দিয়ে খুন করে,আমি দ্বিতীয়বার মারা যাই।আমার মৃত্যুর বিচার করতে আমি আবার বেঁচে উঠি।জীবদ্দশায় খুনিটিকে আমি উপর্যুপরি কবিতা শুনিয়েছিলাম। যে কান আমার গলায় কবিতা শুনেছে, সে কান আমার গলা ছাড়া আর কোনোভাবে কবিতা শুনতে পারবে না। আমি তার কানকে বধির করে দিয়েছি, আমি তাকে জ্যান্ত ফাঁসি দিয়েছি, সে বেঁচে গিয়েও মরে গেছে,মরে গিয়েও বেঁচে গেছে, কবিতাবঞ্চিত জীবন তো মৃত্যু অপেক্ষা ভয়াবহ!শপথ কবিতার,আমি আমার দ্বিতীয় খুনির বিচার করেছি।আমি তো বিচারকদের মধ্যে সবচাইতে নির্মম-নিষ্ঠুর-নির্দয়-নিরাবেগ-নিরাসক্ত!আমি তো নিরঙ্কুশ বিচারক, আমার রায় অখণ্ড্য-অলঙ্ঘ্য, আমার উপরে কোনো রাষ্ট্রপতি নেই।নেউল ক্ষমা করতে পারে অহিকে,অহি নেউলকে; আদম ক্ষমা করতে পারে ইবলিসকে,ইবলিস আদমকে; দুরাত্মা খুনিকে ক্ষমা করতে পারে রাষ্ট্রপতিরূপী ম্যাগনিফিসেন্ট সাইফার; কবি কাউকে ক্ষমা করে না, কবিতা কাউকে ক্ষমা করে না!ক্ষমা চাই?ক্ষমা চাই? ক্ষমা নেই,ক্ষমা নয়! একটিমাত্র ক্ষমায় হাজারও অপরাধের জন্ম হয়!তোমরা কি দেখোনি কীভাবে আমি আমার খুনিদের বিচার করেছি? তোমরা কি জানো না আমার সংবিধানে আটচল্লিশ আছে,পঞ্চাশ আছে,উনপঞ্চাশতম অনুচ্ছেদ নেই? তোমরা দেখোনি,তোমরা জানো না।শেষকৈশোরে আমাকে একজন খুন করেছিল। আমার স্থির রক্তকে সে অস্থির করেছিল, আমার খরাক্লিষ্ট ঠোঁটকে সয়লাব করেছিল চুমোচ্ছ্বাসে, মুহূর্তে সে আমাকে কিশোর থেকে যুবক বানিয়েছিল। তারপর… তারপর আমাকে না জানিয়েই সে আমাকে খুন করে! তোমরা জানো?আমি জানতেও পারিনি সে আমাকে খুন করেছে!যখন জানতে পাই,আমিও দাউদাউ করে উঠি; হাতে তুলে নিই সশস্ত্র কলম,উদগীরণ করতে থাকি কাব্যলাভা; তার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিই মৃত্যুর পরোয়ানা। পরোয়ানা পড়েই সে মারা যায়, সে তো জানত না আমার কলমে-আঙ্গুলে লুকিয়ে ছিল বিষ, তাকে নিয়ে রচিত দু কুড়ি বিষাক্ত কাব্যে তার মরণ হয়!মৃত্যুর আগে সে সাশ্রুকণ্ঠে ক্ষমা চেয়েছিল, আমি বলেছি,’ক্ষমা নেই’!যৌবনে আমি দ্বিতীয়বার খুন হই। যে আমার মাংসে তুলেছিল মাংসের তুফান, মুহূর্তে পরিণত করেছিল যুবক থেকে পূর্ণপুরুষে, সে আমাকে ঘোষণা দিয়ে খুন করে,আমি দ্বিতীয়বার মারা যাই।আমার মৃত্যুর বিচার করতে আমি আবার বেঁচে উঠি।জীবদ্দশায় খুনিটিকে আমি উপর্যুপরি কবিতা শুনিয়েছিলাম। যে কান আমার গলায় কবিতা শুনেছে, সে কান আমার গলা ছাড়া আর কোনোভাবে কবিতা শুনতে পারবে না। আমি তার কানকে বধির করে দিয়েছি, আমি তাকে জ্যান্ত ফাঁসি দিয়েছি, সে বেঁচে গিয়েও মরে গেছে,মরে গিয়েও বেঁচে গেছে, কবিতাবঞ্চিত জীবন তো মৃত্যু অপেক্ষা ভয়াবহ!শপথ কবিতার,আমি আমার দ্বিতীয় খুনির বিচার করেছি।আমি তো বিচারকদের মধ্যে সবচাইতে নির্মম-নিষ্ঠুর-নির্দয়-নিরাবেগ-নিরাসক্ত!আমি তো নিরঙ্কুশ বিচারক, আমার রায় অখণ্ড্য-অলঙ্ঘ্য, আমার উপরে কোনো রাষ্ট্রপতি নেই।নেউল ক্ষমা করতে পারে অহিকে,অহি নেউলকে; আদম ক্ষমা করতে পারে ইবলিসকে,ইবলিস আদমকে; দুরাত্মা খুনিকে ক্ষমা করতে পারে রাষ্ট্রপতিরূপী ম্যাগনিফিসেন্ট সাইফার; কবি কাউকে ক্ষমা করে না, কবিতা কাউকে ক্ষমা করে না!ক্ষমা চাই?ক্ষমা চাই? ক্ষমা নেই,ক্ষমা নয়! একটিমাত্র ক্ষমায় হাজারও অপরাধের জন্ম হয়!তোমরা কি দেখোনি কীভাবে আমি আমার খুনিদের বিচার করেছি? তোমরা কি জানো না আমার সংবিধানে আটচল্লিশ আছে,পঞ্চাশ আছে,উনপঞ্চাশতম অনুচ্ছেদ নেই? তোমরা দেখোনি,তোমরা জানো না।শেষকৈশোরে আমাকে একজন খুন করেছিল। আমার স্থির রক্তকে সে অস্থির করেছিল, আমার খরাক্লিষ্ট ঠোঁটকে সয়লাব করেছিল চুমোচ্ছ্বাসে, মুহূর্তে সে আমাকে কিশোর থেকে যুবক বানিয়েছিল। তারপর… তারপর আমাকে না জানিয়েই সে আমাকে খুন করে! তোমরা জানো?আমি জানতেও পারিনি সে আমাকে খুন করেছে!যখন জানতে পাই,আমিও দাউদাউ করে উঠি; হাতে তুলে নিই সশস্ত্র কলম,উদগীরণ করতে থাকি কাব্যলাভা; তার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিই মৃত্যুর পরোয়ানা। পরোয়ানা পড়েই সে মারা যায়, সে তো জানত না আমার কলমে-আঙ্গুলে লুকিয়ে ছিল বিষ, তাকে নিয়ে রচিত দু কুড়ি বিষাক্ত কাব্যে তার মরণ হয়!মৃত্যুর আগে সে সাশ্রুকণ্ঠে ক্ষমা চেয়েছিল, আমি বলেছি,’ক্ষমা নেই’!যৌবনে আমি দ্বিতীয়বার খুন হই। যে আমার মাংসে তুলেছিল মাংসের তুফান, মুহূর্তে পরিণত করেছিল যুবক থেকে পূর্ণপুরুষে, সে আমাকে ঘোষণা দিয়ে খুন করে,আমি দ্বিতীয়বার মারা যাই।আমার মৃত্যুর বিচার করতে আমি আবার বেঁচে উঠি।জীবদ্দশায় খুনিটিকে আমি উপর্যুপরি কবিতা শুনিয়েছিলাম। যে কান আমার গলায় কবিতা শুনেছে, সে কান আমার গলা ছাড়া আর কোনোভাবে কবিতা শুনতে পারবে না। আমি তার কানকে বধির করে দিয়েছি, আমি তাকে জ্যান্ত ফাঁসি দিয়েছি, সে বেঁচে গিয়েও মরে গেছে,মরে গিয়েও বেঁচে গেছে, কবিতাবঞ্চিত জীবন তো মৃত্যু অপেক্ষা ভয়াবহ!শপথ কবিতার,আমি আমার দ্বিতীয় খুনির বিচার করেছি।আমি তো বিচারকদের মধ্যে সবচাইতে নির্মম-নিষ্ঠুর-নির্দয়-নিরাবেগ-নিরাসক্ত!আমি তো নিরঙ্কুশ বিচারক, আমার রায় অখণ্ড্য-অলঙ্ঘ্য, আমার উপরে কোনো রাষ্ট্রপতি নেই।নেউল ক্ষমা করতে পারে অহিকে,অহি নেউলকে; আদম ক্ষমা করতে পারে ইবলিসকে,ইবলিস আদমকে; দুরাত্মা খুনিকে ক্ষমা করতে পারে রাষ্ট্রপতিরূপী ম্যাগনিফিসেন্ট সাইফার; কবি কাউকে ক্ষমা করে না, কবিতা কাউকে ক্ষমা করে না!ক্ষমা চাই?ক্ষমা চাই? ক্ষমা নেই,ক্ষমা নয়! একটিমাত্র ক্ষমায় হাজারও অপরাধের জন্ম হয়!
টোকন ঠাকুর
প্রেমমূলক
প্রেম হলে সেই পাখি, যার সোনালি ডানা ছুঁয়ে দেখবার সৌভাগ্য পাওয়া চাই। যার একটি মায়াবী পালক খসিয়ে নিতে ইচ্ছে করে। প্রেম সেই পাখি, যার চোখের মণিতে সামুদ্রিক নৌকার মাস্তুল দেখা যায়। যার মসৃণ গ্রীবায় নিঃসন্দেহে রোমিও-জুলিয়েট মঞ্চস্থ হতে পারে। প্রেম সেই পাখি, যার ঠোঁট দেখলেই প্রতীয়মাণ হয়- একজন একা মানুষের আত্মজীবনী কী ভয়ঙ্কর পিপাসার্ত! বীভৎস! যখনই কেউ প্রেমে পড়ে মানে সেই পাখিতে পড়ে। তখন সে প্রেমরূপ পাখির ডানা ছুঁতে চায়। কারণ, তার অবচেতন মন প্রার্থনা করে ডানার নিচে আত্মগোপন। একুশ শতকের যন্ত্রণায় জ্বলেও প্রেমে এরকম আত্মগোপন এখনো উঠে যায়নি। কিন্তু হঠাৎ কোনো পাখি যখন উড়ে যায়, ডানার নিচের ওমে যে আত্মগোপনকারী সে ধপ করে পড়ে যায়। নিঃশব্দে শব্দ হয়, ধপাস! অর্থাৎ পাখি উড়ে গেলেই প্রেম উড়ে যায়। সেই প্রেম সেই পাখি আর সন্ধান করেও পাওয়া যায় না। এরপর যত পাখি চোখে পড়ে, সব অন্য পাখি। কোনোভাবেই আমি ভুলতে পারি না, সেই পাখি কোথায় গেল- যার অপরিসীম ডানার নিচে একদিন আত্মগোপনে ছিলাম, ওম সম্মেলন করেছিলাম! আজ যেসব পাখি ওড়াউড়ি করছে, ডালে বসে আলস্য ভাঙছে- এরা তো জানেই না যে, প্রকাশ্যে ঘোরাঘুরি করলেও আমি আত্মগোপনে থাকতে ভালোবাসি। ফলে, এখন আমি বুঝতেই পারছি না, কোন পাখিটার ডানার নিচে ওম্ সম্মেলন সফল হবে, সার্থক হবে? কোন পাখিটা উড়বে না আর, স্বভাব ভেঙে?
সৃজন সেন
স্বদেশমূলক
সেই সময়ের এক রাশ কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে যে ধোঁয়া- আকাশে মিলিয়ে যাচ্ছিল, আমাদের বাড়ির শেষপ্রান্তে বুড়ো বটগাছটার নিচে দাঁড়িয়ে সবাই ভিড় করে সেই ধোঁয়া দেখছিল, আমিও মায়ের কোলে চড়ে সেই ধোঁয়া দেখছিলাম, সবাই আতঙ্কে ‘রায়ট লাগছে, রায়ট লাগছে’ বলে ছোটাছুটি করছিলএবং তার কদিন পরেই সদ্য-বিবাহিত দাদা-বৌদির সঙ্গে আমাকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। আমি ছেড়ে এসেছিলাম আমার মাকে, আমার বাবাকে আমি ছেড়ে এসেছিলাম আমাদের সেই বুড়ো বটগাছ, টিনের চালাওয়ালা গোবরলেপা বেড়ার ঘর, বাড়ির পেছনের পুকুর, পুকুরপাড়ের নোনা গাছ এবং আমার প্রিয় কাজলা দিদিকে, ছেড়ে এসেছিলাম আমার মাতৃভূমিকে, আমার জন্মভূমিকে। আর সেদিনের পর থেকে একদিনের জন্যও আমি আর ওই জন্মভূমিতে ফিরে যেতে পারিনি, একবারের জন্যও না। এখন আমার স্মৃতিতে সব কিছু ঝাপসা- সেই ঘর, সেই গাছ, সেই কাজলাদিদি, … সব, সব !চাঁদপুর থেকে স্টিমারে, স্টিমারে করে গোয়ালন্দ, গোয়ালন্দ থেকে ট্রেন, দর্শনায় আমাদের বাক্স-প্যাঁটরা ওলোট-পালট এবং অবশেষে, এক সন্ধেবেলা শিয়ালদা স্টেশনে। তারপর ঘোড়ার গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি চেপে প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিট, প্রেমচাঁদ বড়াল স্ট্রিটের সাড়ে তিন হাত চওড়া এক অন্ধ গলি সেই অন্ধগলির এগারোর বি নম্বর বাড়িতে একটি ঘর সেই ঘরের দাদাবৌদির সঙ্গে খাঁচায় বন্দি আমি। আমি, যার মুখে তখনও নোয়াখাইল্যা ভাষার টান, আমি, যাকে দেখলেই প্রাইমারি স্কুলের ছেলেরা কানের উপর উপুড় হয়ে চিৎকার করে বলত- ‘বাঙালো রস খাইল ভাঁড় ভাঙিল, পয়সা দিল… ও… না…’ সেই আমি চারদিকের ওই টিটকারির ভয়ে নিজের বাঙালপনাকে গোপন করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে করতে ধীরে ধীরে যখন অন্য মানুষ হয়ে উঠছিলাম ঠিক তখনই আমার জন্মভূমি থেকে বাবার একখানা চিঠি এসেছিল, সবাই সে চিঠি নিয়ে জোরে জোরে আলোচনা করছিল এবং আমি শুনেছিলাম- ঢাকায় নাকি গুলি চলেছে, গুলি ! বহু বছর পরে জেনেছিলাম সেই গুলি চলেছিল তাদের ওপর যারা আমাদের মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষা করতে ওপার বাংলায় লড়াই শুরু করেছিল, শুনেছিলাম- তারা নাকি পুলিশের বন্দুকের সামনে জামার বোতাম খুলে চিৎকার করে গাইছিল- “ওরা আমার মুখের কথা কাইড়্যা নিতে চায়”, আর সেই ‘মুখের কথা’র গৌরব রক্ষা করতেই তারা নাকি পুষ্পাঞ্জলির মতই তাদের প্রাণকে সমর্পণ করেছিল। আর এপার বাংলায় আমি আমার সমস্ত বাঙালপনাকে ঝেড়ে ফেলে তখন ধীরে ধীরে হয়ে উঠছি কেতাদুরস্ত অন্য এক মানুষ, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে একটার পর একটা ক্লাস টপকে আমি রণপায়ে এগিয়ে চলেছি, ইংরাজিতে কথা বলায়, চালচলনে, আদব কায়দায় আমি তখন সবাইকে মুগ্ধ করতে পারি, রাম ব্যানার্জি লেনের বাড়ি ছেড়ে আমরা উঠে এসেছি কলকাতার এক অভিজাত পাড়ায়, কেউ আর আমায় ‘বাঙাল’ বলতে সাহস পায় না, বরং একটু সমীহ করেই চলে, আমার দাদা-বৌদি আমাকে নিয়ে গর্ব করে, আমাদের ভূতপূর্ব বাঙাল জীবনকে আমরা তখন রীতিমতো ঘৃণা করতে শিখে গেছি।তারপর থেকে আমার জীবনে শুধুই চড়াই … আমি এখন এক সাহেবি কোম্পানির নামি অফিসার, যে কোম্পানির অভিভাবক এক নামজাদা বহুজাতিক কোম্পানি, সেই কোম্পানির স্বার্থে আমি এখন দেশে-বিদেশে উড়ে বেড়াই, অধিকতর বিদেশী ব্যবসা, অধিকতর বিদেশী চুক্তি, অধিকতর বিদেশী পরামর্শ, কমিশন ইত্যাদি অর্জনের মধ্য দিয়েই আমার আজকের বিকাশ, আমার প্রতিপত্তি। আমার ছেলেমেয়েরা আমাকে ‘ড্যাডি’ বলে ডাকে মাকে ‘মাম্মি’, আমার মত ওরাও এখন শুদ্ধ করে বাংলায় বথা বলতে পারে না, শুদ্ধ করে লিখতে পারে না মাতৃভাষায় কয়েকটা লাইন, আমার ছেলেমেয়েদের কাছে বাংলা ভাষা একান্তই বিদেশী !সেবার লন্ডনে এক জাপানি শিল্পপতিকে বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে তার মাতৃভাষা জাপানিতে অন্যদের সঙ্গে যখন অনর্গল কথা বলতে দেখেছিলাম তখন আমার বুকের ভেতরে কেমন যেন একটা কষ্ট হচ্ছিল, ইংরাজিতে কথা বলতে না পারার জন্য ওই মানুষটির ভেতরে কোনও লজ্জা ছিল না, বরং মাতৃভাষায় কথা বলতে পারার অহমিকায় মানুষটিকে যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠতে দেখেছিলাম, আমার ভেতরে সেই অভিজ্ঞতার যন্ত্রণা একটা কান্না হয়ে গুমরে গুমরে উঠছিল, আমার মনে হচ্ছিল- আমার কোনও মাতৃভূমি নেই, আমার কোনও মাতৃভাষা নেই, আমি যেন এক শিকড়বিহীন চিরবিদেশী ! তাই- মাতৃভাষার জন্য যারা জীবন দেয় তারা কেমন মানুষ আজ আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে, আমার বুকের মধ্যে সেই বাংলাদেশের জন্য সেই বাংলা ভাষার জন্য একটুখানি বাঙালী হয়ে ওঠার জন্য একটা ভয়ংকর যন্ত্রণা টনটন করে ওঠে !
যোগীন্দ্রনাথ সরকার
ছড়া
আতা গাছে তোতা পাখি ডালিম গাছে মউ, কথা কও না কেন বউ ? কথা কব কী ছলে, কথা কইতে গা জ্বলে !
যোগীন্দ্রনাথ সরকার
ছড়া
কাকাতুয়া, কাকাতুয়া, আমার যাদুমণি, সোনার ঘড়ি কি বলিছে, বল দেখি শুনি ? বলিছে সোনার ঘড়ি, "টিক্ টিক্ টিক্, যা কিছু করিতে আছে, করে ফেল ঠিক। সময় চলিয়া যায়- নদীর স্রোতের প্রায়, যে জন না বুঝে, তারে ধিক্ শত ধিক।" বলিছে সোনার ঘড়ি, "টিক্ টিক্ টিক্।" কাকাতুয়া, কাকাতুয়া, আমার যাদুধন, অন্য কোন কথা ঘড়ি বলে কি কখন ? মাঝে মাঝে বল ঘড়ি, "টঙ্-টঙ্-টঙ্, মানুষ হইয়ে যেন হয়ো না ক সঙ। ফিটফিটে বাবু হলে, ভেবেছ কি লবে কোলে ? পলাশে কে ভালবাসে দেখে রাঙা রঙ্।" মাঝে মাঝে বলে ঘড়ি, "টঙ্-টঙ্-টঙ্।"
যোগীন্দ্রনাথ সরকার
ছড়া
দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল,চিনি-পাতা দৈ, দু’টা পাকা বেল, সরিষার তেল, ডিমভরা কৈ। পথে হেঁটে চলি, মনে মনে বলি, পাছে হয় ভুল; ভুল যদি হয়, মা তবে নিশ্চয়,” ” ছিঁড়ে দেবে চুল। দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল, চিনি-পাতা দৈ, দু’টা পাকা বেল, সরিষার তেল, ডিমভরা কৈ। বাহবা বাহবা – ভোলা ভুতো হাবা খেলিছে তো বেশ! দেখিব খেলাতে, কে হারে কে জেতে, কেনা হলে শেষ। দাদখানি চাল, মুসুরির ডাল, চিনি-পাতা দৈ, ডিম-ভরা বেল, দু’টা পাকা তেল, সরিষার কৈ। ওই তো ওখানে ঘুরি ধরে টানে, ঘোষদের ননী; আমি যদি পাই, তা হলে উড়াই আকাশে এখনি! দাদখানি তেল, ডিম-ভরা বেল, দুটা পাকা দৈ, সরিষার চাল, চিনি-পাতা ডাল, মুসুরির কৈ! এসেছি দোকানে-কিনি এই খানে, যত কিছু পাই; মা যাহা বলেছে, ঠিক মনে আছে, তাতে ভুল নাই! দাদখানি বেল, মুসুরির তেল, সরিষার কৈ, চিনি-পাতা চাল, দুটা পাকা ডাল, ডিম ভরা দৈ।
যোগীন্দ্রনাথ সরকার
ছড়া
হারাধনের দশটি ছেলে ঘোরে পাড়াময়, একটি কোথা হারিয়ে গেল রইল বাকি নয়। হারাধনের নয়টি ছেলে কাটতে গেল কাঠ, একটি কেটে দু’খান হল রইল বাকি আট। হারাধনের আটটি ছেলে বসলো খেতে ভাত, একটির পেট ফেটে গেল রইল বাকি সাত। হারাধনের সাতটি ছেলে গেল জলাশয়, একটি সেথা ডুবে ম’ল রইল বাকি ছয়। হারাধনের ছয়টি ছেলে চ’ড়তে গেল গাছ, একটি ম’ল পিছলে পড়ে রইল বাকি পাঁচ। হারাধনের পাঁচটি ছেলে গেল বনের ধার, একটি গেল বাঘের পেটে রইল বাকি চার। হারাধনের চারটি ছেলে নাচে ধিন ধিন, একটি ম’ল আছাড় খেয়ে রইল বাকি তিন। হারাধনের তিনটি ছেলে ধরতে গেল রুই, একটি খেলো বোয়াল মাছে রইল বাকি দুই। হারাধনের দুইটি ছেলে মারতে গেল ভেক, একটি ম’ল সাপের বিষে রইল বাকি এক। হারাধনের একটি ছেলে কাঁদে ভেউ ভেউ, মনের দুঃখে বনে গেল রইল না আর কেউ।
যোগীন্দ্রনাথ সরকার
ছড়া
এক যে আছে মজার দেশ, সব রকমে ভালো, রাত্তিরেতে বেজায় রোদ, দিনে চাঁদের আলো ! আকাশ সেথা সবুজবরণ গাছের পাতা নীল; ডাঙ্গায় চরে রুই কাতলা জলের মাঝে চিল ! সেই দেশেতে বেড়াল পালায়, নেংটি-ইঁদুর দেখে; ছেলেরা খায় 'ক্যাস্টর-অয়েল' -রসগোল্লা রেখে ! মণ্ডা-মিঠাই তেতো সেথা, ওষুধ লাগে ভালো; অন্ধকারটা সাদা দেখায়, সাদা জিনিস কালো ! ছেলেরা সব খেলা ফেলে বই নে বসে পড়ে; মুখে লাগাম দিয়ে ঘোড়া লোকের পিঠে চড়ে ! ঘুড়ির হাতে বাঁশের লাটাই, উড়তে থাকে ছেলে; বড়শি দিয়ে মানুষ গাঁথে, মাছেরা ছিপ্ ফেলে ! জিলিপি সে তেড়ে এসে, কামড় দিতে চায়; কচুরি আর রসগোল্লা ছেলে ধরে খায় ! পায়ে ছাতি দিয়ে লোকে হাতে হেঁটে চলে ! ডাঙ্গায় ভাসে নৌকা-জাহাজ, গাড়ি ছোটে জলে ! মজার দেশের মজার কথা বলবো কত আর; চোখ খুললে যায় না দেখা মুদলে পরিষ্কার !
যোগীন্দ্রনাথ সরকার
ভক্তিমূলক
ছোটো শিশু মোরা তোমার করুণা হৃদয়ে মাগিয়া লব জগতের কাজে জগতের মাঝে আপনা ভুলিয়া রব। ছোটো তারা হাসে আকাশের গায়ে ছোটো ফুল ফুটে গাছে; ছোটো বটে তবু তোমার জগতে আমাদেরো কাজ আছে। দাও তবে প্রভু হেন শুভমতি প্রাণে দাও নব আশা; জগত মাঝারে যেন সবাকারে দিতে পারি ভালবাসা। সুখে দুখে শোকে অপরের লাগি যেন এ জীবন ধরি; অশ্রু মুছায়ে বেদনা ঘুচায়ে জীবন সফল করি।।
অরুণ মিত্র
চিন্তামূলক
নানা গোপনতার মধ্যে আমি বাস করি, আমার পায়ের আঙুলে রেগে নুড়ি বাজলে আমি শুনি ঝর্ণা সে-আওয়াজ কি আর কারো কাছে পৌঁছয়? একটা ঝিঁঝির ডাক যেই ওঠে সারা বন অন্ধকারে দুলতে থাকে আর সারা শুন্য গাছপালার কথা চালাচালিতে ভরে যায়, ছড়িয়ে পড়ে অরণ্যের ছায়া তারপর কাঁকরমাটির সবুজ পাহাড় আঁকড়ে-ধরা শেকড়ের খবর আসে, আমি তা বুকে চেপে রাখি। কেউ কি তা জানে? কেই-বা জানে আমার রাজ্য-সমাচার? অনেক গোপনতা ধরে রাখার ফন্দিও আমার অনেক, যখন চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে শিরাতন্তু থেকে আমি হোহো হাসিতে চমকে দিচ্ছি আকাশ, দ্যাখো দ্যাখো কী ফুর্তিবাজ বলে কত হাততালি জোটে তখন আমি যেন জয়গর্বে আরো ফুর্তিবাজ হয়ে উঠি, আমি যে সময়ের চকচকে ধারের উপর পা রেখে হাঁটছি আমি যে এগিয়ে যাচ্ছি প্রকাণ্ড পাথরচাঙের ফাঁকে সে-কথা কাওকে আমি জানতে দিই না। কেন দেব? আমি তো জীবনমরণ খেলায় কাওকে আমার শরিক করিনি। আমার গোপনতা নিয়ে আমি আছি সবাই দেখছে চিকচিক চোখের কোণ ঠোঁটের বাঁকা টান আর আমি দেখছি মুহুর্মুহু মেঘবিদ্যুৎ বুকের মধ্যে শুনছি সমস্ত ওলটপালটের বাজনা, গোপনতায় আমি বুঁদ হয়ে আছি।
সুদীপ্ত বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
দু’আনা তার দুঃখ ছিল। চোদ্দো আনা সুখ জানালাপারের গন্ধমাখা। চম্পাবরণ মুখ সেও যদি যায় ঝাপসা হয়ে সমীকরণ স্পষ্ট দু’আনা তার সুখ বাঁচে ‘আর চোদ্দো আনা কষ্টকন্যে মুখে কিছুই বলাে না কন্যে তােমার সকল ছলনাডাইনির মতন চুল এলাে করে ওইভাবে জানালার পাশে বসে আছিস কেন? কী হয়েছে তাের, রাগ? আধ ঘণ্টা বসে আছি। চুপ করে। চলে যাব? রাগ করব কার উপরে? ঠিক এই কথাটাই আমি জানতে চাইছিলাম। রাগ করছিস কার উপরে? আমি রাগ করিনি। আমার কথা বলতে ভাল লাগছে না, আর কিছু বলবি? না বলব না কিছু। আমি চললাম, তাের রােদ পােহানাে দেখার জন্য আমি বসে থাকতে পারব না। কোথায় যাবি এখন? জাহান্নামে, তােকে বলব কেন? রাগলে তাের কানগুলাে বেগুনি হয়ে যায়, জানিস সেটা? বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু! একটা কবিতা শােনাবি? পারব না।চম্পাবরণ রােদ নেমেছে ঠিক দুক্কুরবেলা চম্পাবরণ কন্যে তােমার চক্ষে মেঘের খেলাশাড়িটা পরে তােকে বেশ কেমন একটা ইয়ে লাগছে। ইয়েটা কী? জঘন্য লাগছে বলতে বাধছে বুঝি? তাের মুখেও কিছু আটকায় তা হলে! জানিস না, বড়রা কি বলেছেন, “সত্যম ব্রুয়াত, প্রিয়ম বড়ুয়া”। অপ্রিয় সত্য বলতে নেই আসলে। জঘন্য লাগছে তাে? আমি কি তাই বললাম? আসলে শাড়ি পরে তােকে অন্যরকম লাগছে। বিকেলবেলার রােদটা সরে গেলে বােধ হয় তােকে আবার তাের মতন লাগবে। এখন কার মতন লাগছে? তাের মতনই, তবু যেন তুই নয়। আচ্ছা, তাের চুলগুলাে কি মেঘবরণ? রাজকন্যা বলছিস আমাকে? তাই কখনও বলতে পারি! রাজা-গজার খুব আকাল দেশে। শেষ অবধি রাজপুত্তুর জোটাবি কোথা থেকে? রাখাল ছেলে কি জুটবে না এক-আধটা? ঠাকুরমার ঝুলি হাতড়ে দ্যাখ, পেতেও পারিস। আসলে তাকে বোধ হয় খুব সুন্দর লাগছে আর মনে হচ্ছে তুই অনেক দূরে। ট্রাম লাইনের উপরে, ওটা কী পাখি রে? কাক নয়, চড়ুই, শালিখও নয় দেখছি। এই শহরে পাখি বলতে আর একটাই। ওটা মন পাখি।চোখের কোণে মুকুতা দোলে হাসলে করে আলাে নীলাম্বরী উপচানাে তার কেশের বরণ কালােকনুইতে ব্যান্ড-এজ লাগিয়েছিস কেন? কেটে গেছে। কাটল কী করে? একটা কঠিন ক্যাচ নিতে গিয়ে। এখনও ক্রিকেট খেলে যাচ্ছিস? পরীক্ষার ক’টা দিন বাকি? পরীক্ষার সঙ্গে ক্রিকেটের সম্পর্ক যে ব্যস্তানুপাতিক সেটা জানা ছিল না তাে! সেভেনথ পেপারের প্রিপারেশন কেমন হয়েছে? ফেল করব ওটাতে। আর এইটথ পেপার? ডাহা ফেল। বলতে একটুও লজ্জা করছে না আমার মতন খারাপ ছাত্র কিছু না থাকলে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি যে লাটে উঠবে। বছর বছর একজামিনেশন ফিজ দিয়ে টিকিয়ে রেখেছি তাে আমরাই। ক’ঘন্টা পড়ছিস দিনে? সারা রাত। সকালে প্রথম ট্রামটাকে রওনা করে দিয়ে তবে ঘুমােতে যাই।। সারা রাত পড়ছিস? সারা রাত জাগছি অন্তত। কী করিস, সারা রাত জেগে? ঘুমিয়ে পড়লে কলকাতা শহরকে খুব বােকা বােকা লাগে। ল্যাম্পপােস্টগুলাে হাই তােলে মাঝে মাঝে। আমার পড়ার টেবিলের সামনে যে জানলাটা, ওটার ঠিক উল্টোদিকের রাস্তায় একটা টিউবওয়েল আছে। ওইটা ঘুমের মধ্যে খুব ককথা বলে। তখন নেড়িগুলো এইসা ধমক লাগায় কী বলবো! সারা রাত এইসব পাগলামি? পাগলামি কেন হবে, এ ছাড়াও পরীক্ষায় পাস করার জন্য কত কসরত করি। কাল রাতেই খাতা ভর্তি করে তাের নাম লিখেছি, প্রতি পাতায় ১০৮ বার। কেন? তাের মতন ভাল ছাত্রী আমাদের ডিপার্টমেন্টে আর আছেটা কে? যদি তাের নাম জপ করে উতরে যাই কোনওমতে। শুধুই তাই? না, এছাড়াও আছে। তাের নামটা লিখলে বেশ লাগে দেখতে।কন্যে কন্যে চম্পাবরণ কাজল চক্ষু বশীকরণপরীক্ষার পরে কী করবি? ইচ্ছে আছে জেএনইউতে পড়ার। তুই কিছু ভেবেছিস? ভাবার কিছু নেই তাে। পরের বার পরীক্ষা দেবার জন্য আবার তৈরি হব। তুই সত্যি দিল্লি চলে যাবি? যদি সুযােগ পাই, যাব। পারবিই না যেতে। কাকু কিছুতেই তাের মতন একটা পুঁচকে মেয়েকে দিল্লিতে একা থাকতে দেবেন না। আমি তাের থেকে তিন সপ্তাহের বড় বয়সে এটা মনে রাখিস। আর দিল্লিতে একা থাকব কেন? মাসির বাড়ি আছে তাে। কেন, মাসি দিল্লিতে থাকেন কেন? আর জায়গা পেলেন না থাকার! মাসির দিল্লিতে থাকার কারণটা খুব সহজ। মেসােমশাই থাকেন ওইখানে তাই। কিন্তু তাের এত রাগ কেন দিল্লির উপরে? তুই দিল্লিতে যেতে চাইছিস কেন? পড়াশুনাে করবার জন্য। পড়াশুনাে করার জন্য কলকাতা ছেড়ে চলে যাবি? হ্যাঁ যাব। তুই জানিস, তুই চলে গেলে কলকাতা শহর মুখ গােমড়া করে বসে থাকবে, ভিক্টোরিয়ার পরি ঘুরবে না আর ফুচকাওয়ালারা কবিরাজি ওষুধের কোঅপারেটিভ স্টোর খুলবে? আর তুই কী করবি? তাের সঙ্গে আমার কী? আমি কিছুই করব না।করব নাই বা কেন? সারাদিন ক্রিকেট খেলব, রােজ বিকেলে দুটো করে এগ রােল খাব সেনাপতির দোকান থেকে আর সারা রাত্তির ফুটপাথের সাথে গল্প করব। যা ইচ্ছে করব, যা খুশি করব। কী দরকার তাের এত পড়াশোনা করার শুনি? তুই সারাদিন ক্রিকেট খেলবি, সারা রাত ফুটপাথের সঙ্গে গল্প করবি, বছর বছর পরীক্ষা দিবি, যা ইচ্ছে করবি। আমি যদি পড়াশােনা করে চাকরি না করি, রােজ বিকেলে তােকে দু’টো করে এগ রােল খাওয়াবে কে?
শ্যামল চন্দ্র দাস
নীতিমূলক
The quick brown fox jumps over the lazy dog এ যেমন ইংরেজি সব অক্ষর আছে তেমনি নিচের পংতি গুলোতে বাংলা সব অক্ষর ও যুক্তাক্ষর আছে। যারা বাংলা দ্রুত টাইপ করতে চান পংতি গুলো তাদের অনুশীলনে সাহায্য করবে।হৃদয়ের চঞ্চলতা বন্ধে ব্রতী হলে জীবন পরিপূর্ণ হবে নানা রঙের ফুলে। কুঞ্ঝটিকা প্রভঞ্জন শঙ্কার কারণ লণ্ডভণ্ড করে যায় ধরার অঙ্গন। ক্ষিপ্ত হলে সাঙ্গ হবে বিজ্ঞজনে বলে শান্ত হলে এ ব্রহ্মাণ্ডে বাঞ্ছিতফল মেলে। আষাঢ়ে ঈশান কোনে হঠাৎ ঝড় উঠে গগন মেঘেতে ঢাকে বৃষ্টি নামে মাঠে ঊষার আকাশে নামে সন্ধ্যার ছায়া ঐ দেখো থেমে গেছে পারাপারে খেয়া। শরৎ ঋতুতে চাঁদ আলোয় অংশুমান সুখ দুঃখ পাশা পাশি সহ অবস্থান। যে জলেতে ঈশ্বর তৃষ্ণা মেটায় সেই জলেতে জীবকুলে বিনাশ ঘটায়। রোগ যদি দেহ ছেড়ে মনে গিয়ে ধরে ঔষধের সাধ্য কি বা তারে সুস্থ করে ?
আসাদ চৌধুরী
মানবতাবাদী
কোথায় পালালো সত্য? দুধের বোতলে, ভাতের হাঁড়িতে! নেই তো রেষ্টুরেন্টে, হোটেলে, সেলুনে, গ্রন্থাগারের গভীর গন্ধে, টেলিভিশনে বা সিনেমা, বেতারে, নৌকার খোলে, সাপের ঝাঁপিতে নেই তো। গুড়ের কলসি, বিষের কৌটো, চিনির বয়াম, বাজারের ব্যাগ, সিগারেট কেস, পানের ডিব্বা, জর্দার শিশি, লক্ষ্মীর সরা, নকশী পাতিল, চৌকির তলা, সবি খুঁজলাম, খুঁজে দেখলাম নেই তো! সাংবাদিকের কাঠের ডেস্কে, কাগজে, কেতাবে, পুঁথিতে, কলমে, ইনজেকশনে, দাঁদের মলমে, ভ্যানিটি ব্যাগে বা পকেটে, আঁচলে ড্রয়ারে, ব্যাংকে, আয়রণ সেফে সত্য নামক মহান বস্তু নেই তো! কবিতায় নেই, সঙ্গীতে নেই রমণীর চারু ভঙ্গিতে নেই পাগলের গাঢ় প্রলাপেও নেই নাটকের কোন সংলাপে নেই শাসনেও নেই, ভাষণে নেই আঁধারেও নেই, আলোতেও নেই রেখাতেও নেই, লেখাতেও নেই, উত্তরে নেই, প্রশ্নেও নেই লেবাসে নেই, সিলেবাসে নেই পারমিটে নেই, বোনাসেও নেই হতাশায় নেই, আশাতেও নেই প্রেম-প্রীতি ভালবাসাতেও নেই এমন কি কালোবাজারেও নেই কোথায় গেলেন সত্য?
আসাদ চৌধুরী
স্বদেশমূলক
বারবারা ভিয়েতনামের উপর তোমার অনুভূতির তরজমা আমি পড়েছি- তোমার হৃদয়ের সুবাতাস আমার গিলে-করা পাঞ্জাবিকে মিছিলে নামিয়েছিল প্রাচ্যের নির্যাতিত মানুষগুলোরজন্যে অসীম দরদ ছিল সে লেখায় আমি তোমার ওই একটি লেখাই পড়েছি আশীর্বাদ করেছিলাম, তোমার সোনার দোয়াত কলম হোক। আমার বড়ো জানতে ইচ্ছে করে বারবারা, তুমি এখন কেমন আছ ? নিশ্চয়ই তুমি ডেট করতে শিখে গেছ। গাউনের রঙ আর হ্যাট নিয়ে কি চায়ের টেবিলে মার সঙ্গে ঝগড়া হয়? অনভ্যস্ত ব্রেসিয়ারের নিচে তোমার হৃদয়কে কি চিরদিন ঢেকে দিলে। আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করে বারবারা। তোমাদের কাগজে নিশ্চয়ই ইয়াহিয়া খাঁর ছবি ছাপা হয়- বিবেকের বোতামগুলো খুলে হৃদয় দিয়ে দেখো ওটা একটা জল্লাদের ছবি পনেরো লক্ষ নিরস্ত্র লোককে ঠাণ্ডা মাথায় সে হ্ত্যা করেছে মানুষের কষ্টার্জিত সভ্যতাকে সেগলা টিপে হত্যা করেছে অদ্ভুত জাদুকরকে দেখ বিংশ শতাব্দীকে সে কৌশলে টেনে হিঁচড়ে মধ্যযুগে নিয়ে যায়। দেশলাইয়ের বাক্সর মতো সহজে ভাঙে গ্রন্থাগার, উপাসনালয়, ছাত্রাবাস, মানুষের সাধ্যমত ঘরবাড়ি সাত কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের ফুলকে সে বুট জুতোয় থেতলে দেয়। ২ টু উইমেন ছবিটা দেখেছ বারবারা ? গির্জার ধর্ষিতা সোফিয়া লোরেনকেদেখে নিশ্চয়ই কেঁদেছিলে আমি কাঁদিনি, বুকটা শুধু খাঁ খাঁ করেছিল- সোফিয়া লোরেনকে পাঠিয়ে দিয়ো বাংলাদেশে তিরিশ হাজার রমণীর নির্মম অভিজ্ঞতা শুনে তিনি শিউরে উঠবেন। অভিধান থেকে নয় আশি লক্ষ শরণার্থীর কাছে জেনে নাও, নির্বাসনের অর্থ কী ? জর্জ ওয়াশিংটনের ছবিওলা ডাকটিকেটে খোঁজ থাকবে না স্বাধীনতার আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কাছে এসো- সাধু অ্যাবের মর্মর মূর্তিকে গণতন্ত্র আর মানবতার জন্য মালির ঘামে ভেজা ফুলের তোড়া দিয়োনা- নিহত লোকটি লজ্জায় ঘৃণায় আবার আত্মহত্যা করবে। বারবারা এসো, রবিশঙ্করের সুরে সুরে মুমূর্ষু মানবতাকে গাই বিবেকের জংধরা দরোজায় প্রবল করাঘাত করি অন্যায়ের বিপুল হিমালয় দেখে এসে ক্রুদ্ধ হই, সংগঠিত হই জল্লাদের শাণিত অস্ত্র সভ্যতার নির্মল পুষ্পকে আহত করার পূর্বে, দর্শন ও সাহিত্যকে হত্যা করার পূর্বে এসো বারবারা বজ্র হয়ে বিদ্ধ করি তাকে।
আসাদ চৌধুরী
স্বদেশমূলক
প্রাচ্যের গানের মতো শোকাহত, কম্পিত, চঞ্চল বেগবতী তটিনীর মতো স্নিগ্ধ, মনোরম আমাদের নারীদের কথা বলি, শোনো। এ-সব রহস্যময়ী রমণীরা পুরুষের কণ্ঠস্বর শুনে বৃক্ষের আড়ালে স’রে যায়- বেড়ার ফোঁকড় দিয়ে নিজের রন্ধনে তৃপ্ত অতিথির প্রসন্ন ভোজন দেখে শুধু মুখ টিপে হাসে। প্রথম পোয়াতী লজ্জায় অনন্ত হ’য়ে কোঁচরে ভরেন অনুজের সংগৃহীত কাঁচা আম, পেয়ারা, চালিতা- সূর্য্যকেও পর্দা করে এ-সব রমণী। অথচ যোহরা ছিলো নির্মম শিকার সকৃতজ্ঞ লম্পটেরা সঙ্গীনের সুতীব্র চুম্বন গেঁথে গেছে- আমি তার সুরকার- তার রক্তে স্বরলিপি লিখি। মরিয়ম, যীশুর জননী নয় অবুঝ কিশোরী গরীবের চৌমুহনী বেথেলহেম নয় মগরেবের নামাজের শেষে মায়ে-ঝিয়ে খোদার কালামে শান্তি খুঁজেছিলো, অস্ফুট গোলাপ-কলি লহুতে রঞ্জিত হ’লে কার কী বা আসে যায়। বিপন্ন বিস্ময়ে কোরানের বাঁকা-বাঁকা পবিত্র হরফ বোবা হ’য়ে চেয়ে দ্যাখে লম্পটেরক্ষুধা, মায়ের স্নেহার্ত দেহ ঢেকে রাখে পশুদের পাপ। পোষা বেড়ালের বাচ্চা চেয়ে-চেয়ে নিবিড় আদর সারারাত কেঁদেছিলো তাহাদের লাশের ওপর। এদেশে যে ঈশ্বর আছেন তিনি নাকি অন্ধ আর বোবা এই ব’লে তিন কোটি মহিলারা বেচারাকে গালাগালি করে। জনাব ফ্রয়েড, এমন কি খোয়াবেও প্রেমিকারা আসে না সহজ পায়ে চপল চরণে। জনাব ফ্রয়েড, মহিলারা কামুকের, প্রেমিকের, শৃঙ্গারের সংজ্ঞা ভুলে গ্যাছে। রকেটের প্রেমে পড়ে ঝ’রে গ্যাছে ভিক্টোরিয়া পার্কের গীর্জার ঘড়ি, মুসল্লীর সেজদায় আনত মাথা নিরপেক্ষ বুলেটের অন্তিম আজানে স্থবির হয়েছে। বুদ্ধের ক্ষমার মূর্তি ভাঁড়ের মতন ভ্যাবাচেকা খেয়ে প’ড়ে আছে, তাঁর মাথার ওপরে এক ডজন শকুন মৈত্রী মৈত্রী ক’রে হয়তো বা উঠেছিলো কেঁদে।
আসাদ চৌধুরী
স্বদেশমূলক
মাত্র পা রেখেছ কলেজে সেই বার, শব্দ দিয়ে গাঁথো পূর্ব সীমান্তে সাহসী ‘সীমান্ত’। দ্বিজাতিতত্ত্বের লোমশ কালো থাবা শ্যামল সুন্দর সোনার বাংলাকে করেছে তছনছ, গ্রাম ও জনপদে ভীতির সংসার, কেবল হাহাকার। টেবিলে মোমবাতি কোমল কাঁপা আলো বাহিরে বৃষ্টির সুরেলা রিমঝিম_ স্মৃতির জানালায় তোমার মৃদু টোকা। রূপার সংসারে অতিথি সজ্জন শিল্পী কতজন হিসেব রাখিনি তো! স্মরণে ওস্তাদ_ গানের মমতাজ। দারুণ উচ্ছ্বাস, সামনে চা’র কাপ প্রধান অতিথি তো আপনি, বলবেন_ কিন্তু তার আগে এ ঘোর বরষায় সমানে বলছেন নিজের সব কথা। ওয়াজিউল্লাহ ইনস্টিটিউটে ভাষণ, প্রতিবাদ_ যাত্রা, থিয়েটার রমেশ শীল আর আবুল ফজলের, কলিম শরাফীর সাহসী আচরণ কী হলো? কী হয়েছে? আজ তো আপনার মুখে যে খৈ ফোটে! স্বপ্ন-স্মৃতি দোলে। দ্বিজাতিতত্ত্বের কবর খুঁড়ছো সঙ্গী বেড়ে চলে, সঙ্গে সঙ্গীত নাটক, সাহিত্য, সাম্প্রদায়িকতা ঘেঁষতে পারছে না, আপনি লিখবেন অমর কবিতাটি জ্বরের ঘোরে, একা প্রেসের ছোট ঘরে_ আঙুল কাঁপছিল? কর্ণফুলী সেও জোয়ারে ফুঁসছিল_ নদীরা চঞ্চল সাগরে মিশবে যে। ঢাকা ও কলকাতা, সুচক্রদণ্ডী কুনতি, কুমিল্লা কোথায় নেই কবি? সেই তো শুভ শুরু, শহীদ মিনারের আকুল হাতছানি, মিশেছে সাভারে অটল স্থাপনায়। এই কি শেষ তবে? প্রতিটি অর্জন ধুলায় মিশে যায়, নতুন উৎপাত মৌলবাদ আর জঙ্গীবাদ আসে, পশ্চিমের থেকে, মানবাধিকারের লালিত বাণী যেনই স্বেচ্ছাচারিতার প্রতাপ চৌদিকে_ দৃপ্ত পায়ে কবি কাতারে মিছিলের কারফু কার ফুঁতে ওমন ক’রে ভাগে? কবি কি দেখছেন প্রমিত বাংলার করুণ হালচাল? ভাষণে, সংলাপে সিনেমা, থিয়েটারে ছোট্ট পর্দার যাদুর বাক্সতে এ কোন বাংলার মাতম ছড়াছড়ি? হায় রে মূলধারা! প্রথম কবি তুমি, প্রথম বিদ্রোহী এমন দুর্দিনে তাই তো মনে পড়ে তোমার হাসি মুখ, তোমার বরাভয় ভীরুতা চারদিকে, তুমিও নেই পাশে।
আসাদ চৌধুরী
স্বদেশমূলক
নদীর জলে আগুন ছিলো আগুন ছিলো বৃষ্টিতে আগুন ছিলো বীরাঙ্গনার উদাস-করা দৃষ্টিতে। আগুন ছিলো গানের সুরে আগুন ছিলো কাব্যে, মরার চোখে আগুন ছিলো এ-কথা কে ভাববে? কুকুর-বেড়াল থাবা হাঁকায় ফোসে সাপের ফণা শিং কৈ মাছ রুখে দাঁড়ায় জ্বলে বালির কণা। আগুন ছিলো মুক্তি সেনার স্বপ্ন-ঢলের বন্যায়- প্রতিবাদের প্রবল ঝড়ে কাঁপছিলো সব-অন্যায়। এখন এ-সব স্বপ্নকথা দূরের শোনা গল্প, তখন সত্যি মানুষ ছিলাম এখন আছি অল্প।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ভক্তিমূলক
দুর্গোৎসব 5 ১ বর্ষে বর্ষে এসো যাও এ বাঙ্গালা ধামে কে তুমি ষোড়শী কন্যা, মৃগেন্দ্রবাহিনি? চিনিয়াছি তোরে দুর্গে,    তুমি নাকি ভব দুর্গে, দুর্গতির একমাত্র সংহারকারিণী || মাটি দিয়ে গড়িয়াছি,      কত গেল খড় কাছি, সৃজিবারে জগতের সৃজনকারিণী। গড়ে পিটে হলো খাড়া,   বাজা ভাই ঢোল কাড়া, কুমারের হাতে গড়া ঐ দীনতারিণী। বাজা-ঠমকি ঠমকি ঠিকি, খিনিকি ঝিনিকি ঠিনি || ২ কি সাজ সেজেছ মাতা রাঙ্গতার সাজে। এ দেশে যে রাঙ্গই সাজ কে তোরে শিখালে? সন্তানে রাঙ্গতা দিলে      আপনি তাই পরিলে, কেন মা রাঙ্গের সাজে এ বঙ্গ ভুলালে? ভারত রতন খনি,          রতন কাঞ্চন মণি, সে কালে এদেশে মাতা, কত না ছড়ালে? বীরভোগ্যা বসুন্ধরা,    আজ তুমি রাঙ্গতা পরা, ছিঁড়া ধুতি রিপু করা, ছেলের কপালে? তবে-বাজা ঢোল কাঁশি মধুর খেমটা তালে || ৩ কারে মা এনেছ সঙ্গে, অনন্তরঙ্গিণি! কি শোভা হয়েছে আজি, দেখ রে সবার! আমি বেটা লক্ষ্মীছাড়া, আমার ঘরে লক্ষ্মী খাড়া, ঘরে হতে খাই তাড়া, ঘরখরচ নাই || হয়েছিল হাতে খড়ি,       ছাপার কাগজ পড়ি, সরস্বতী তাড়াতাড়ি, এলে বুঝি তাই? করো না মা বাড়াবাড়ি,  তোমায় আমায় ছাড়াছাড়ি, চড়ে না ভাতের হাঁড়ি, বিদ্যায় কাজ নাই। তাক্ তাক্ ধিনাক্ ধিনাক্ বাজনা বাজা রে ভাই || ৪ দশ ভুজে দশায়ুধ কেন মাতা ধর? কেন মাতা চাপিয়াছ সিংহটার ঘাড়ে? ছুরি দেখে ভয় পাই,     ঢাল খাঁড়া কাজ নাই, ও সব রাখুক গিয়ে রামদীন পাঁড়ে। সিংহ চড়া ভাল নয়,      দাঁত দেখে  পাই ভয়, প্রাণ যেন খাবি খায়, পাছে লাফ ছাড়ে, আছে ঘরে বাঁধা গাই,      চড়তে হয় চড় তাই, তাও কিছু ভয় পাই পাছে সিঙ্গ নাড়ে। সিংহপৃষ্ঠে মেয়ের পা!           দেখে কাঁপি হাড়ে হাড়ে || ৫ তোমার বাপের কাঁধে-নগেন্দ্রের ঘাড়ে তুঙ্গ শৃঙ্গোপরে সিংহ-দেখে গিরিবালে! শিমলা পাহাড়ে ধ্বজা,      উড়ায় করিয়া মজা, পিতৃ সহ বন্দী আছ, হর্য্যক্ষের জালে। তুমি যারে কৃপা কর        সেই হয় ভাগ্যধর- সিংহের চরণ দিয়ে কতই বাড়ালে! জনমি ব্রাহ্মণ কুলে,          শতদল পদ্ম তুলে আমি পূজে পাদপদ্ম পড়িনু আড়ালে! রুটি মাখন খাব মা গো! আলোচাল ছাড়ালে! ৬ এই শুন পুনঃ বাজে মজাইয়া মন, সিংহের গভীর কণ্ঠ, ইংরেজ কামান! দুড়ুম দুড়ুম দুম,          প্রভাতে ভাঙ্গায় ঘুম, দুপুরে প্রদোষে ডাকে, শিহরয় প্রাণ! ছেড়ে ফেলে ছেঁড়া ধুতি, জলে ফেলে খুঙ্গী পুঁথি, সাহেব সাজিব আজ  ব্রাহ্মণ সন্তান। লুচি মণ্ডার মুখে ছাই,    মেজে বস্যে মটন খাই, দেখি মা পাই না পাই তোমার সন্ধান। সোলা-টুপি মাথায় দিয়ে পাব জগতে সম্মান || ৭ এনেছ মা বিঘ্ন-হরে কিসের কারণে? বিঘ্নময় এ বাঙ্গালা, তা কি আছে মনে? এনেছ মা শক্তিধরে,      দেখি কত শক্তি ধরে? মেরেছ মা বারে বারে দুষ্টাসুরগণে, মেরেছ তারকাসুর,        আজি বঙ্গ ক্ষুধাতুর, মার দেখি ক্ষুধাসুর, সমাজের রণে? অসুরে করিয়া ফের,   মায়ে পোয়ে মারলে ঢের, মার দেখি এ অসুরে, ধরি ও চরণে || তখন-“কত নাচ গো রণে!” বাজাব প্রফুল্ল মনে। ৮ তোমার মহিমা মাতা বুঝিতে নারিনু, কিসে লাগিয়া আন কাল বিষধরে? ঘরে পরে বিষধর,    বিষে রঙ্গ জ্বর জ্বর, আবার এ অজগর দেখাও কিঙ্করে? হই মা পরের দাস,    বাঁধি আঁটি কেটে ঘাস, নাহিক ছাড়ি নিশ্বাস কালসাপ ডরে। নিতি নিতি অপমান,   বিষে জ্বর জ্বর প্রাণ, কত বিষ কণ্ঠ মাঝে, নীলকণ্ঠ ধরে; বিষের জ্বালায় সদা প্রাণ ছটফট করে! ৯ দুর্গা দুর্গা বল ভাই দুর্গাপূজা এলো, পুঁতিয়া কলার তেড় সাজাও তোরণ। বেছে বেছে তোল ফুল    সাজাব ও পদমূল, এবার হৃদয় খুলে পূজিব চরণ || সাজা ভাই ঢাক ঢোল,    কাড়া নাগড়া গণ্ডগোল, দেব ভাই পাঁটার ঝোল, সোনার বরণ || ন্যায়রত্ন এসো সাজি,       প্রতিপদ হল আজি, জাগাও দেখি চণ্ডীরে বসায়ে বোধন? ১০ যা দেবী সর্ব্বভূতেষু-ছায়া রূপ ধরে! কি পুঁথি পড়িলে বিপ্র! কাঁদিল হৃদয়! সর্ব্বভূতে সেই ছায়া!    হইল পবিত্র কায়া, ঘুচিবে সংসারে মায়া, যদি তাই হয় || আবার কি শুনি কথা!    শক্তি নাকি যথা তথা? যা দেবী সর্ব্বভূতেষু, শক্তিরূপে রয়? বাঙ্গালি ভূতের দেহ-    শক্তি ত না দেখে কেহ; ছিলে যদি শক্তিরূপে, কেন হলে লয়? আদ্যাশক্তি শক্তি দেহ। জয় মা চণ্ডীর জয়। ১১ পরিল এ বঙ্গবাসী, নূতন বসন, জীবন্ত কুসুমসজ্জা, যেন বা ধরায়। কেহ বা আপনি পরে,     কেহ বা পরায় পরে, যে যাহারে ভালবাসে, সে তারে সাজায়। বাজারেতে হুড়াহুড়ি,      আপিসেতে তাড়াতাড়ি, লুচি মণ্ডা ছড়াছড়ি ভাত কেবা খায়? সুখের বড় বাড়াবাড়ি,  টাকার বেলা ভাঁড়াভাঁড়ি, এই দশা ত সকল বাড়ী, দোষিব বা কায়? বর্ষে বর্ষে ভুগি মা গো, বড়ই টাকার দায়! ১২ হাহাকার বঙ্গদেশে, টাকার জ্বালায়। তুমি এলে শুভঙ্করি! বাড়ে আরো দায়। কে এসো কেন দাও,      কেন চাল কলা খাও, তোমার প্রসাদে যদি টাকা কুলায়। তুমি ধর্ম্ম তুমি অর্থ,        তার বুঝি এই অর্থ, তুমি মা টাকারূপিণী ধরম টাকায়। টাকা কাম, টাকা মোক্ষ,    রক্ষ মাতঃ রক্ষ রক্ষ, টাকা দাও লক্ষ লক্ষ, নৈলে প্রাণ যায়। টাকা ভক্তি, টাকা মতি,  টাকা মুক্তি, টাকা গতি, না জানি ভকতিস্তুতি, নমামি টাকায়? হা টাকা যো টাকা দেবি,  মরি যেন টাকা সেবি, অন্তিম কালে পাই মা যেন রূপার চাকায়? ১৩ তুমিই বিষ্ণুর হস্তে সুদর্শন চক্র, হে টাকে! ইহ জগতে তুমি সুদর্শন। শুন প্রভু রূপচাঁদ,         তুমি ভানু তুমি চাঁদ, ঘরে এসো সোনার চাঁদ, দাও দরশন || আমরি কি শোভা,    ছেলে বুড়ার মনোলোভা, হৃদে ধর বিবির মুণ্ড, লতায় বেষ্টন। তব ঝন্ ঝন্ নাদে,        হারিয়া বেহালা কাঁদে, তম্বুরা মৃদঙ্গ বীণা কি ছার বাদন। পশিয়া মরম-মাঝে,        নারীকণ্ঠ মৃদু বাজে, তাও ছার তুমি যদি কর ঝন্ ঝন্! টাকা টাকা টাকা টাকা! বাক্‌সতে এসো রে ধন। ১৪ তোর লাগি সর্ব্বত্যাগী, ওরে টাকা ধন! জনমি বাঙ্গালী-কুলে, ভুলিনু ও রূপে! তেয়াগিনু পিতা মাতা,     শত্রু যে ভগিনী ভ্রাতা, দেখি মারি জ্ঞাতি গোষ্ঠী, তোরে প্রাণ সপে! বুঝিয়া টাকার মর্ম্ম,       ত্যজেছি যে ধর্ম্ম কর্ম্ম, করেছি নরকে ঠাঁই, ঘোর কৃমিকূপে || দুর্গে দুর্গে ডাকি আজ,    এ লোভে পড়ুক বাজ, অসুরনাশিনি চণ্ডি আয় চণ্ডিরূপে! এ অসুরে নাশ মাত! শুম্ভে নাশিলে যেরূপে! ১৫ এসো এসো জগন্মাতা, জগদ্ধাত্রী উমে হিসাব নিকাশ আমি, করি তব সঙ্গে। আজি পূর্ণ বার মাস,     পূর্ণ হলো কোন আশ? আবার পূজিব তোমা, কিসের প্রসঙ্গে? সেই ত কঠিন মাটি,     দিবা রাত্রি দুখে হাঁটি, সেই রৌদ্র সেই বৃষ্টি, পীড়িতেছে অঙ্গে। কি জন্য গেল বা বর্ষ?   বাড়িয়াছে কোন হর্ষ? ‍ মিছামিছি আয়ুঃক্ষয়, কালের ভ্রূভঙ্গে। বর্ষ কেন গণি তবে,        কেন তুমি এস ভবে, পিঞ্জর যন্ত্রণা সবে বনের বিহঙ্গে? ভাঙ্গ মা দেহ-পিঞ্জর! উড়িব মনের রঙ্গে। ১৬ ওই শুন বাজিতেছে গুম্ গাম্ গুম্ ঢাক ঢোল কাড়া কাঁশি, নৌবত নাগরা। প্রভাত সপ্তমী নিশি,   নেয়েছে শঙ্করী পিসী, রাঁধিবে ভোগের রান্না, হাঁড়ি মাল্‌শা ভরা। কাঁদি কাঁদি কেটে কলা,  ভিজায়েছি ডাল ছোলা, মোচা কুমড়া আলু বেগুন, আছে কাঁড়ি করা || আর মা চাও বা কি?    মট্‌কিভরা আছে ঘি, মিহিদানা সীতাভোগ, লুচি মনোহরা! আজ এ পাহাড়ে মেয়ের, ভাল কর‍্যে পেট ভরা। ১৭ আর কি খাইবে মাতা? ছাগলের মুণ্ড? রুধিরে প্রবৃত্তি কেন হে শান্তিরূপিণি। তুমি গো মা জগন্মাতা,  তুমি খাবে কার মাথা!? তুমি দেহ তুমি আত্মা, সংসারব্যাপিনি! তুমি কার কে তোমার, তোর কেন মাংসাহার? ছাগলে এ তৃপ্তি কেন, সর্ব্বসংহারিণি? করি তোমায় কৃতাঞ্জলি,    তুমি যদি চাও বলি, বলি দিব সুখ দুঃখ, চিত্তবৃত্তি জিনি ; ছ্যাডাং ড্যাড্যাং ড্যাং ড্যাং! নাচো গো রণরঙ্গিণি। ১৮ ছয় রিপু বলি দিব, শক্তির চরণে ঐশিকী মানসী শক্তি!     তীব্র জ্যোতির্ম্ময়ি! বলি ত দিয়াছি সুখ,     এখন বলি দিব দুখ, শক্তিতে ইন্দ্রিয় জিনি হইব বিজয়ী। এ শক্তি দিতে কি পার?   ঠুসে তবে পাঁটা মার, প্রণমামি মহামায়ে তুমি ব্রহ্মময়ী। নৈলে তুমি মাটির ঢিপি,    দশমীতে গলা টিপি, তোমায় ভাসিয়ে গাঁজা টিপি, সিদ্ধিরস্তু কই। ঐটুকু মা ভাল দেখি, পূজি তোমায় মৃণ্ময়ি! ——————
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
১ এই মধুমাসে,     মধুর বাতাসে, শোন লো মধুর বাঁশী। এই মধু বনে,     শ্রীমধুসূদনে, দেখ  লো সকলে আসি || মধুর সে গায়,    মধুর বাজায়, মধুর মধুর ভাষে। মধুর আদরে,    মধুর অধরে, মধুর মধুর হাসে || মধুর শ্যামল,    বদন কমল, মধুর চাহনি তায়। । কনক নূপুর,      মধুকর যেন, মধুর বাজিছে পায় || মধুর ইঙ্গিতে,    আমার সঙ্গেতে, কহিল মধুর বাণী। সে অবধি চিতে,  মাধুরি হেরিতে, ধৈরয নাহিক মানি || এ সুখ রঙ্গেতে    পর লো অঙ্গেতে মধুর চিকণ বাস। তুমি মধুফল,     পর কানে দুল, পরাও মনের আশ || গাঁথি মধুমালা,    পর গোপবালা হাস লো মধুর হাসি। চল যথা বাজে,   যমুনার কূলে, শ্যামের মোহন বাঁশী || ২ চল কথা বাজে,       যমুনার কূলে ধীরে ধীরে ধীরে বাঁশী। ধীরে ধীরে যথা,   উঠিছে চাঁদনি, স্থল জল পরকাশি || ধীরে ধীরে রাই,   চল ধীরে যাই, ধীরে ধীরে ফেল পদ। ধীরে ধীরে শুন,   নাদিছে যমুনা, কল কল গদ গদ || ধীরে ধীরে জলে,   রাজহংস চলে, ধীরে ধীরে ভাসে ফুল। ধীরে ধীরে বায়ু,    বহিছে কাননে দোলায়ে আমার দুল || ধীরে যাবি তথা,    ধীরে কবি কথা রাখিবি দোহার মান। ধীরে ধীরে তার     বাঁশীটি কাড়িবি, ধীরেতে পূরিবি তান || ধীরে শ্যাম নাম,      বাঁশীতে বলিবি, শুনিবে কেমন বাজে। ধীরে ধীরে চূড়া       কাড়িয়ে পরিবি, দেখিব কেমন সাজে || ধীরে বনমালা,         গলাতে দোলাবি, দেখিব কেমন দোলে। ধীরে ধীরে তার,          মন করি চুরি, লইয়া আসিবি চলে || ৩ শুন মোর মন             মধুরে মধুরে, জীবন করহ সায়। ধীরে ধীরে ধীরে,          সরল সুপথে, নিজ গতি রেখ তায় || এ সংসার ব্রজ,            কৃষ্ণ তাহে সুখ, মন তুমি ব্রজনারী। নিতি নিতি তার,          বংশীরব শুনি, হতে চাও অভিসারী || যাও যাবে মন,            কিন্তু দেখ যেন, একাকী যেও না রঙ্গে। মাধুর্য্য ধৈরয,             সহচরী দুই, রেখ আপনার সঙ্গে || ধীরে ধীরে ধীরে,          কাল নদীতীরে, ধরম কদম্ব তলে। মধুর সুন্দর,              সুখ নটবর, ভজ মন কুতূহলে ||
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ব্যঙ্গাত্মক
১ বাগানে যাবি রে ভাই?      চল সবে মিলে যাই, যথা হর্ম্ম্য সুশোভন,  সরোবরতীরে। যথা ফুটে পাঁতি পাঁতি,      গোলাব মল্লিকা জাতি, বিগ্নোনিয়া লতা দোলে মৃদুল সমীরে || নারিকেল বৃক্ষরাজি,         চাঁদের কিরণে সাজি, নাচিছে দোলায় মাথা ঠমকে ঠমকে। চন্দ্রকরলেখা তাহে, বিজলি চমকে || ২ চল যথা কুঞ্জবনে,         নাচিবে নাগরী গণে, রাঙ্গা সাজ পেসোয়াজ, পরশিবে অঙ্গে। তম্বুরা তবলা চাটি,       আবেশে কাঁপিবে মাটি, সারঙ্গ তরঙ্গ তুলি, সুর দিবে সঙ্গে || খিনি খিনি খিনি খিনি, ঝিনিক ঝিনিক ঝিনি তাধ্রিম্ তাধ্রিম্ তেরে গাও না বাজনা! চমকে চাহনি চারু, ঝলকে গহনা || ৩ ঘরে আছে পদ্মমুখী          কভু না করিল সুখী, শুধু ভাল বাসা নিয়ে, কি হবে সংসারে। নাহি জানে নৃত্যগীত,         ইয়ার্‌কিতে নাহি চিত, একা বসি ভাল বাসা ভাল লাগে কারে? গৃহকর্ম্মে রাখে মন,            হিত ভাবে অনুক্ষণ, সে বিনা দুঃখের দিনে অন্য গতি নাই! এ হেন সুখের দিনে, তারে নাহি চাই || ৪ আছে ধন গৃহপূর্ণ,                যৌবন যাইবে তূর্ণ, যদি না ভুঞ্জিনু সুখ, কি কাজ জীবনে? ঠুসে মদ্য লও সাতে,            যেন না ফুরায় রাতে, সুখের নিশান গাঢ় প্রমোদভবনে। খাদ্য লও বাছা বাছা,           দাড়ি দেখে লও চাচা, চপ্ সুপ কারি কোর্ম্মা, করিবে বিচিত্র। বাঙ্গালির দেহ রত্ন,                ইহাতে করিও যত্ন, সহস্র পাদুকা স্পর্শে, হয়েছে পবিত্র। পেটে খায়, পিঠে সয়, আমার চরিত্র || ৫ বন্দে মাতা সুরধুনি,             কাগজে মহিমা শুনি, বোতলবাহিনি পুণ্যে একশ নন্দিনি! করি ঢক ঢক নাদ,               পূরাও ভকতসাধ, লোহিত বরণি বামা,    তারেতে বন্দিনি! প্রণমামি মহানীরে,               ছিপির কিরীটি শিরে, উঠ শিরে ধীরে ধীরে যকৃৎজননি! তোমার কৃপার জন্য,            যেই পড়ে সেই ধন্য শয্যায় পতিত রাখ, পতিতপাবনি! বাক্‌স বাহনে চল, ডজন ডজনি || ৬ কি ছার সংসারে আছি,          বিষয় অরণ্যে মাছি, মিছা করি ভন্‌ভন্ চাকরি কাঁটালে। মারে জুতা সই সুখে,             লম্বা কথা বলি মুখে, উচ্চ করি ঘুষ তুলি দেখিলে কাঙ্গালে || শিখিয়াছি লেখা পড়া,          ঠাণ্ডা দেখে হই কড়া, কথা কই চড়া চড়া, ভিখারি ফকিরে। দেখ ভাই রোখ কত, বাঙ্গালি শরীরে! ৭ পূর পাত্র মদ্য ঢালি,                  দাও সবে করতালি, কেন তুমি দাও গালি, কি দোষ আমার? দেশের মঙ্গল চাও?                 কিসে তার ত্রুটি পাও? লেক্‌চারে কাগজে বলি, কর দেশোদ্ধার || ইংরেজের নিন্দা করি,            আইনের দোষ ধরি, সম্বাদ পত্রিকা পড়ি, লিখি কভু তায়। আর কি করিব বল স্বদেশের দায়? ৮ করেছি ডিউটির কাজ,       বাজা ভাই পাখোয়াজ, কামিনি, গোলাপি  সাজ, ভাসি আজ রঙ্গে। গেলাস পূরে দে মদে, দে দে দে আরো আরো দে, দে দে এরে দে ওরে দে, ছড়ি দে সারঙ্গে। কোথায় ফুলের মালা,আইস্ দে না? ভাল জ্বালা, “বংশী বাজায় চিকণ কালা?” সুর দাও সঙ্গে। ইন্দ্র স্বর্গে খায় সুধা,           স্বর্গ ছাড়া কি বসুধা? কত স্বর্গ বাঙ্গালায় মদের তরঙ্গে। টলমল বসুন্ধরা ভবানী ভ্রূভঙ্গে || ৯ যে ভাবে দেহের হিত,        না বুঝি তাহার চিত, আত্মহিত ছেড়ে কেবা, পরহিতে চলে? না জানি দেশ বা কার?    দেশে কার উপকার? আমার কি লাভ বল,  দেশ ভাল হলে? আপনার হিত করি,          এত শক্তি নাহি ধরি, দেশহিত করিব কি, একা ক্ষুদ্র প্রাণী। ঢাল মদ! তামাক দে! লাও ব্রাণ্ডি পানি || ১০ মনুষ্যত্ব? কাকে বলে?         স্পিচ দিই টোনহলে, লোকে আসে দলে দলে, শুনে পায় প্রীত। নাটক নবেল কত,             লিখিয়াছে শত শত, এ কি নয় মনুষ্যত্ব? নয় দেশহিত? ইংরেজি বাঙ্গালা ফেঁদে,  পলিটিক্‌‌স লিখি কেঁদে, পদ্য লিখি নানা ছাঁদে,  বেচি সস্তা দরে। অশিষ্টে অথবা শিষ্টে,            গালি দিই অষ্টে পৃষ্ঠে, তবু বল দেশহিত কিছু নাহি করে? নিপাত যাউক দেশ! দেখি বসে ঘরে || ১১ হাঁ! চামেলি ফুলিচম্পা!         মধুর অধর কম্পা! হাম্বীর কেদার ছায়ানট সুমধুর‌! হুক্কা না দুরস্ত বোলে?  শের মে ফুল না ডোলে! পিয়ালা ভর দে মুঝে! রঙ্ ভরপুর! সুপ্ চপ কটলেট,               আন বাবা প্লেট প্লেট, কুক্ বেটা ফাষ্টরেট,  যত পার খাও! মাথামুণ্ড পেটে দিয়ে,           পড় বাপু জমি নিয়ে, জনমি বাঙ্গালিকুলে, সুখ কর্যেও যাও। পতিতপাবনি সুরে, পতিতে তরাও || ১২ যাব ভাই অধঃপাতে,        কে যাইবি আয় সাতে, কি কাজ বাঙ্গালি নাম,  রেখে ভূমণ্ডলে? লেখাপড়া ভস্ম ছাই,         কে কবে শিখিছে ভাই লইয়া বাঙ্গালি দেহ, এই বঙ্গস্থলে? হংসপুচ্ছ লয়ে করে,         কেরাণির কাজ করে, মুন্সেফ চাপরাশি আর ডিপুটী পিয়াদা। অথবা স্বাধীন হয়ে,           ওকালতি পাশ লয়ে, খোশামুদি জুয়াচুরি, শিখিছে জিয়াদা! সার কথা বলি ভাই,         বাঙ্গালিতে কাজ নাই, কি কাজ সাধিব মোরা, এ সংসারে থাকি, মনোবৃত্তি আছে যাহা,          ইন্দ্রিয় সাগরে তাহা বিসর্জ্জন করিয়াছি, কিবা আছে বাকি? কেহ দেহভার বয়ে, যমে দাও ফাঁকি? ১৩ ধর তবে গ্লাস আঁটি,            জ্বলন্ত বিষের বাটি শুন তবলার চাঁটি, বাজে খন্ খন্। নাচে বিবি নানা ছন্দ,           সুন্দর খামিরা গন্ধ, গম্ভীর জীমূতমন্দ্র হুঁকার গর্জ্জন || সেজে এসো সবে ভাই,          চল অধঃপাতে যাই, অধম বাঙ্গালি হতে, হবে কোন কাজ? ধরিতে মনুষ্যদেহ, নাহি করে লাজ? ১৪ মর্কটের অবতার,                   রূপগুণ সব তার বাঙ্গালির অধিকার, বাঙ্গালি ভূষণ! হা ধরণি, কোন্ পাপে,            কোন্ বিধাতার শাপে হেন পুত্রগণ গর্ব্ভে, করিলে ধারণ? বঙ্গদেশ ডুবাবারে,              মেঘে কিম্বা পারাবারে, ছিল না কি জলরাশি? কে শোষিল নীরে? আপনা ধ্বংসিতে রাগে         কতই শকতি লাগে? নাহি কি শকতি তত বাঙ্গালি শরীরে? কেন আর জ্বলে আলো বঙ্গের মন্দিরে? ১৫ মরিবে না? এসো তবে,        উন্নতি সাধিয়া সবে, লভি নাম পৃথিবীতে, পিতৃ সমতুল! ছাড়ি দেহ খেলা ধূলা,         ভাঙ বাদ্যভাণ্ডগুলা মারি খেদাইয়া দাও, নর্ত্তকীর কুল। মারিয়া লাঠির বাড়ি,         বোতল ভাঙ্গহ পাড়ি, বাগান ভাঙ্গিয়া ফেল পুকুরের তলে। সুখ নামে দিয়ে ছাই,         দুঃখ সার কর ভাই, কভু না মুছিবে কেহ, নয়নের জলে, যত দিন বাঙ্গালিকে লোকে ছি ছি বলে ||
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ভক্তিমূলক
(সুন্দরী) ১ কেন না হইলি তুই, যমুনার জল, রে প্রাণবল্লভ! কিবা দিবা কিবা রাতি,    কূলেতে আঁচল পাতি শুইতাম শুনিবারে, তোর মৃদুরব || রে প্রাণবল্লভ! ২ কেন না হইলি তুই, যমুনাতরঙ্গ, মোর শ্যামধন! দিবারাতি জলে পশি,    থাকিতাম কালো শশি, করিবারে নিত্য তোর, নৃত্য দরশন || ওহে শ্যামধন! ৩ কেন না হইলি, তুই, মলয় পবন, ওহে ব্রজরাজ! আমার অঞ্চল ধরি,       সতত খেলিতে হরি, নিশ্বাসে যাইতে মোর, হৃদয়ের মাঝ || ওহে ব্রজরাজ! ৪ কেন না হইলি তুই, কাননকুসুম, রাধাপ্রেমাধার। না ছুঁতেম অন্য ফুলে,    বাঁধিতাম তোরে চুলে, চিকণ গাঁথিয়া মালা, পরিতাম হার || মোর প্রাণাধার! ৫ কেন না হইলে তুমি, চাঁদের কিরণ, ওহে হৃষীকেশ! বাতায়নে বিষাদিনী,     বসিতে যবে গোপিনী, বাতায়নপথে তুমি, লভিতে প্রবেশ || আমার প্রাণেশ! ৬ কেন না হইলে তুমি, চিকণ বসন, পীতাম্বর হরি! নীলবাস তেয়াগিয়ে,   তোমারে পরি কালিয়ে, রাখিতাম যত্ন কর্যে  হৃদয় উপরি || পীতাম্বর হরি! ৭ কেন না হইলে শ্যাম, যেখানে যা আছে, সংসারে সুন্দর। ফিরাতেম আঁখি যথা,      দেখিতে পেতেম তথা, মনোহর এ সংসারে, রাধামনোহর। শ্যামল সুন্দর! (সুন্দর) ১ কেন না হইনু আমি, কপালের দোষে, যমুনার জল। লইয়া কম কলসী,       সে জল মাঝারে পশি, হাসিয়া ফুটিত আসি, রাধিকা-কমল- যৌবনেতে ঢল ঢল || ২ কেন না হইনু আমি, তোমার তরঙ্গ, তপননন্দনি! রাধিকা আসিলে জলে, নাচিয়া হিল্লোল ছলে, দোলাতাম দেহ তার, নবীন নলিনী- যমুনাজলহংসিনী || ৩ কেন না হইনু আমি, তোর অনুরূপী মলয় পবন! ভ্রমিতাম  কুতূহলে,  রাধার কুন্তল দলে, কহিতাম কানে কানে, প্রণয় বচন- সে আমার প্রাণধন || ৪ কেন না হইনু, হায়! কুসুমের দাম, কণ্ঠের ভূষণ। এক নিশা স্বর্গ সুখে,  বঞ্চিয়া রাধার বুকে, ত্যজিতাম নিশি গেলে জীবন যাতন- মেখে শ্রীঅঙ্গচন্দন || ৫ কেন না হইনু আমি, চন্দ্রকরলেখা, রাধার বরণ। রাধার শরীরে থেকে,    রাধারে ঢাকিয়ে রেখে, ভুলাতাম রাধারূপে,    অন্যজনমন- পর ভুলান কেমন? ৬ কেন না হইনু আমি চিকণ বসন, দেহ আবরণ। তোমার অঙ্গেতে থেকে,  অঙ্গের চন্দন মেখে, অঞ্চল হইয়ে দুলে, ছুঁতেম চরণ,- চুম্বি ও চাঁদবদন || ৭ কেন না হইনু আমি, যেখানে যা আছে, সংসারে সুন্দর। কে হতে না অভিলাষে, রাধা যাহা ভালবাসে, কে মোহিতে নাহি চাহে, রাধার অন্তর- প্রেম-সুখরত্নাকর?
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
১ জন্ম মম সূর্য্য-তেজে, আকাশ মণ্ডলে। যথা ডাকে মেঘরাশি, হাসিয়া বিকট হাসি, বিজলি উজলে || কেবা মম সম বলে, হুহুঙ্কার করি যবে, নামি রণস্থলে। কানন ফেলি উপাড়ি, গুঁড়াইয়া ফেলি বাড়ী, হাসিয়া ভাঙ্গিয়া পাড়ি, অটল অচলে। হাহাকার শব্দ তুলি এ সুখ অবনীতলে || ২ পর্ব্বতশিখরে নাচি, বিষম তরসে, মাতিয়া মেঘের সনে, পিঠে করি বহি ঘনে, সে ঘন বরষে। হাসে দামিনী সে রসে। মহাশব্দে ক্রীড়া করি, সাগর উরসে || মথিয়া অনন্ত জলে সফেন তরঙ্গবদলে, ভাঙ্গি তুলে নভস্তলে, ব্যাপি দিগ্‌দশে। শীকরে আঁধারি জগৎ, ভাসাই দেশ অলসে || ৩ বসন্তে নবীন লতা, ফুল দোলে তায়। যেন বায়ু সে বা নহি, অতি মৃদু মৃদু বহি, প্রবেশি তথায় || হেসে মরি যে লজ্জায়- পুষ্পগন্ধ চুরি করি, মাখি নিজ গায়ে || সরোবরে স্নান করি, যাই যথায় সুন্দরী, বসে বাতায়নোপরি, গ্রীষ্মের জ্বালায় || তাহার অলকা ধরি, মুখ চুম্বি ঘর্ম্ম হরি, অঞ্চল চঞ্চল করি, স্নিগ্ধ করি কায় || আমার সমান কেবা যুবতিমন ভুলায়? ৪ বেণুখণ্ড মধ্যে থাকি, বাজাই বাঁশরী। রন্ধ্রে রন্ধ্রে যাই আসি, আমিই মোহন বাঁশী, সুরের লহরী || আর কার গুণে হরি, ভুলাইত বৃন্দাবনে, বৃন্দাবনেশ্বরী? ঢল ঢল চল চল, চঞ্চল যমুনা জল, নিশীথে ফুলে উজল, কানন বল্লরী, তার মাঝে বাজিতাম বংশীনাদ রূপ ধরি || ৫ ৫ জীবকণ্ঠে যাই আসি, আমি কণ্ঠস্বর! আমি বাক্য, ভাষা আমি, সাহিত্য বিজ্ঞান স্বামী, মহীর ভিতর || সিংহের কণ্ঠেতে আমিই হুঙ্কার ঋষির কণ্ঠেতে আমিই ওঙ্কার গায়ককণ্ঠেতে আমিই ঝঙ্কার, বিশ্ব-মনোহর || আমিই রাগিণী আমি ছয় রাগ, কামিনীর মুখে আমিই সোহাগ, বালকের বাণী অমৃতের ভাগ, মম রূপান্তর || গুণ গুণ রবে ভ্রময়ে ভ্রমর, কোকিল কুহরে বৃক্ষের উপর, কলহংস নাদে সরসী ভিতর আমারি কিঙ্কর || আমি হাসি আমি কান্না, স্বরূপে শাসি নর || ৬ কে বাঁচিত এ সংসারে, আমার বিহনে? আমি না থাকিলে ভুবনে? আমিই জীবের প্রাণ, দেহে করি অধিষ্ঠান, নিশ্বাস বহনে। উড়াই খগে গগনে।4 দেশে দেশে লয়ে যাই, বহি যত ঘনে। আনিয়া সাগরনীরে, ঢালে তারা গিরিশিরে সিক্ত করি পৃথিবীরে, বেড়ায় গগনে। মম সম দোষে গুণে, দেখেছ কি কোন জনে? ৭ মহাবীর দেব অগ্নি জ্বালি সে অনলে। আমিই জ্বালাই যাঁরে, আমিই নিবাই তাঁরে, আপনার বলে। মহাবলে বলী আমি, মন্থন করি সাগর। রসে সুরসিক আমি, কুসুমকুলনাগর || শিহরে পরসে মম কুলের কামিনী। মজাইনু বাঁশী হয়ে, গোপের গোপিনী || বাক্যরূপে জ্ঞান আমি স্বরূপে গীত। আমারি কৃপায় ব্যক্ত ভক্তি দম্ভ প্রীত || প্রাণবায়ুরূপে আমি রক্ষা করি জীবগণ। হুহু হুহু! মম সম গুণবান্ আছে কোন জন?
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
১ মরুভূমি মাঝে যেন, একই কুসুম, পূর্ণিত সুবাসে। বরষার রাত্রে যেন, একই নক্ষত্র, আঁধার আকাশে || নিদাঘ সন্তাপে যেন, একই সরসী, বিশাল প্রান্তরে। রতন শোভিত যেন,  একই তরণী, অনন্ত সাগরে। তেমনি আমার তুমি, প্রিয়ে, সংসার-ভিতরে || ২ চিরদরিদ্রের যেন, একই রতন, অমূল্য, অতুল। চিরবিরহীর যেন, দিনেক মিলন, বিধি অনুকূল || চিরবিদেশীর যেন, একই বান্ধব, স্বদেশ হইতে। চিরবিধবার যেন, একই স্বপন, পতির পীরিতে। তেমনি আমার তুমি, প্রাণাধিকে, এ মহীতে || ৩ সুশীতল ছায়া তুমি, নিদাঘ সন্তাপে, রম্য বৃক্ষতলে। শীতের আগুন তুমি, তুমি মোর ছত্র, বরষার জলে || বসন্তের ফুল তুমি, তিরপতি আঁখি, রূপের প্রকাশে। শরতের চাঁদ তুমি, চাঁদবদনি লো, আমার আকাশে। কৌমুদীমুখের হাসি, দুখের তিমির নাশে || ৪ অঙ্গের চন্দন তুমি, পাখার ব্যজন, কুসুমের বাস। নয়নের তারা তুমি, শ্রবণেতে শ্রুতি, দেহের নিশ্বাস || মনের আনন্দ তুমি, নিদ্রার স্বপন, জাগ্রতে বাসনা। সংসার সহায় তুমি, সংসার-বন্ধন, বিপদে সান্ত্বনা। তোমারি লাগিয়ে সই, ঘোর সংসার-যাতনা ||
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
গাথাকাব্য
১ তমিস্রা রজনী ব্যাপিল ধরণী, দেখি মনে মনে পরমাদ গণি, বনে একাকিনী বসিলা রমণী কোলেতে করিয়া স্বামীর দেহ। আঁধার গগন ভুবন আঁধার, অন্ধকার গিরি বিকট আকার দুর্গম কান্তার ঘোর অন্ধকার, চলে না ফেরে না নড়ে না কেহ || ২ কে শুনেছে হেথা মানবের রব? কেবল গরজে হিংস্র পশু সব, কখন খসিছে বৃক্ষের পল্লব, কখন বসিছে পাখী শাখায়। ভয়েতে সুন্দরী বনে একেশ্বরী, কোলে আরও টানে পতিদেহ ধরি, পরশে অধর অনুভব করি, নীরবে কাঁদিয়া চুম্বিছে তায় || ৩ হেরে আচম্বিতে এ ঘোর সঙ্কটে, ভয়ঙ্কর ছায়া আকাশের পটে, ছিল যত তারা তাহার নিকটে ক্রমে ম্লান হয়ে গেল নিবিয়া। সে ছায়া পশিল কাননে,-অমনি, পলায় শ্বাপদ উঠে পদধ্বনি, বৃক্ষশাখা কত ভাঙ্গিল আপনি, সতী ধরে শবে বুকে আঁটিয়া || ৪ সহসা উজলি ঘোর বনস্থলী, মহাগদাপ্রভা, যেন বা বিজলী, দেখিয়া সাবিত্রী যেন রত্নাবলী, ভাসিল নিঝরে আলোক তার। মহাগদা দেখি প্রণমিলা সতী, জানিল কৃতান্ত পরলোকপতি, এ ভীষণা ছায়া তাঁহারই মূরতি, ভাগ্যে যাহা থাকে হবে এবার || ৫ গভীর নিস্বনে কহিলা শমন, থর থর করি কাঁপিল গহন, পর্ব্বতগহ্বরে ধ্বনিল বচন, চমকিল পশু বিবর মাঝে। “কেন একাকিনী মানবনন্দিনী, শব লয়ে কোলে যাপিছ যামিনী, ছাড়ি দেহ শবে ; তুমি ত অধীনী, মম অঙ্গে তব বাদ কি সাজে ||” ৬ “এ সংসারে কাল বিরামহীন, নিয়মের রথে ফিরে রাত্রি দিন, যাহারে পরশে সে মম অধীন, স্থাবর জঙ্গম জীব সবাই। সত্যবানে আসি কাল পরশিল, লতে তারে মম কিঙ্কর আসিল, সাধ্বী অঙ্গ ছুঁয়ে লইতে নারিল, আপনি লইতে এসেছি তাই ||” ৭ সব হলো বৃথা না শুনিল কথা, না ছাড়ে সাবিত্রী শবের মমতা, নারে পরশিতে সাধ্বী পতিব্রতা, অধর্ম্মের ভয়ে ধর্ম্মের পতি। তখন কৃতান্ত কহে আর বার, “অনিত্য জানিও এ ছার সংসার, স্বামী পুত্র বন্ধু নহে কেহ কার, আমার আলয়ে সবার গতি || ৮ “রত্নছত্র শিরে রত্নভূষা অঙ্গে, রত্নাসনে বসি মহিষীর সঙ্গে, ভাসে মহারাজা সুখের তরঙ্গে, আঁধারিয়া রাজ্য লই তাহারে। বীরদর্প ভাঙ্গি লই মহাবীরে, রূপ নষ্ট করি লই রূপসীরে, জ্ঞান লোপ করি গরাসি জ্ঞানীরে, সুখ আছে শুধু মম আগারে || ৯ “অনিত্য সংসার পুণ্য কর সার, কর নিজ কর্ম্ম নিয়ত যে যার, দেহান্তে সবার হইবে বিচার, দিই আমি সবে করমফল। যত দিন সতী তব আয়ু আছে, করি পুণ্য কর্ম্ম এসো স্বামী পাছে- অনন্ত যুগান্ত রবে কাছে কাছে, ভুজিবে অনন্ত মহা মঙ্গল || ১০ “অনন্ত বসন্তে তথা অনন্ত যৌবন, অনন্ত প্রণয়ে তথা অনন্ত মিলন, অনন্ত সৌন্দর্য্যে হয় অনন্ত দর্শন, অনন্ত বাসনা, তৃপ্তি অনন্ত। দম্পতি আছয়ে, নাহি বৈধব্য-ঘটনা, মিলন আছয়ে, নাহি বিচ্ছেদযন্ত্রণা, প্রণয় আছয়ে, নাহি কলহ গঞ্জনা, রূপ আছে, নাহি রিপু দুরন্ত || ১১ “রবি তথা আলো করে, না করে দাহন, নিশি স্নিগ্ধকরী, নহে তিমির কারণ, মৃদু গন্ধবহ ভিন্ন নাহিক পবন, কলা নাহি চাঁদে, নাহি কলঙ্ক। নাহিক কণ্টক তথা কুসুম রতনে, নাহিক তরঙ্গ স্বচ্ছ কল্লোলিনীগণে, নাহিক অশনি তথা সুবর্ণের ঘনে, পঙ্কজ সরসে নাহিক পঙ্ক ||” ১২ “নাহি তথা মায়াবশে বৃথায় রোদন, নাহি তথা ভ্রান্তিবশে বৃথায় মনন, নাহি তথা রিপুবশে বৃথায় যতন, নাহি শ্রমলেশ, নাহি অলস। ক্ষুধা তৃষ্ণা তন্দ্রা নিদ্রা শরীরে না রয়, নারী তথা প্রণয়িনী বিলাসিনী নয়, দেবের কৃপায় দিব্য জ্ঞানের উদয়, দিব্য নেত্রে নিরখে দিক্ দশ ||” ১৩ “জগতে জগতে দেখে পরামাণুরাশি মিলিছে ভাঙ্গিছে পুনঃ ঘুরিতেছে আসি, লক্ষ লক্ষ বিশ্ব গড়ি ফেলিছে বিনাশি, অচিন্ত্য অনন্ত কালতরঙ্গে। দেখে লক্ষ কোটী ভানু অনন্ত গগনে, বেড়ি তাহে কোটী কোটী ফিরে গ্রহগণে, অনন্ত বর্ত্তন রব শুনেছি শ্রবণে, মাতিছে চিত্ত সে গীতের সঙ্গে || ১৪ “দেখে কর্ম্মক্ষেত্রে নয় কত দলে দলে, নিয়মের জালে বাঁধা ঘুরিছে সকলে, ভ্রমে পিপীলিকা যেন নেমীর মণ্ডলে, নির্দ্দিষ্ট দূরতা লঙ্ঘিতে নারে। ক্ষণকাল তবে সবে ভবে দেখা দিয়া, জলে যেন জলবিম্ব যেতেছে মিশিয়া, পুণ্যবলে পুণ্যধামে মিলিছে আসিয়া, পুণ্যই সত্য অসত্য সংসার || ১৫ “তাই বলি কন্যে, ছাড়ি দেহ মায়া, ত্যজ বৃথা ক্ষোভ ; ত্যজ পতিকায়া, ধর্ম্ম আচরণে হও তার জায়া, গিয়া পুণ্যধাম। গৃহে যাও ত্যজি কানন বিশাল থাক যত দিন পরশে কাল, কালের পরশে মিটিবে জঞ্জাল, সিদ্ধ হবে কাম ||” ১৬ শুনি যমবাণী জোড় করি পাণি, ছাড়ি দিয়া শবে, তুলি মুখখানি ডাকিছে সাবিত্রী ;- কোথায় না জানি, কোথা ওহে কাল। দেখা দিয়া রাখ এ দাসীর প্রাণ, কোথায় গেলে পাব কালের সন্ধান, পরশিয়ে কর এ সঙ্কটে ত্রাণ, মিটাও জঞ্জাল || ১৭ “স্বামীপদ যদি সেবে থাকি আমি, কায় মনে যদি পূজে থাকি স্বামী, যদি থাকে বিশ্বে কেহ অন্তর্য্যামী, রাখ মোর কথা। সতীত্বে যদ্যপি থাকে পুণ্যফল, সতীত্বে যদ্যপি থাকে কোন বল, পরশি আমারে, দিয়ে পদে স্থল, জুড়াও এ ব্যথা ||” ১৮ নিয়মের রথ ঘোষিল ভীষণ, আসি প্রবেশিল সে ভীম কানন, পরশিল কাল সতীত্ব রতন, সাবিত্রী সুন্দরী। মহাগদা তবে চমকে তিমিরে, শবপদরেণু তুলি লয়ে শিরে, ত্যজে প্রাণ সতী অতি ধীরে ধীরে পতি কোলে করি || ১৯ বরষিল পুষ্প অমরের দলে, সুগন্ধি পবন বহিল ভূতলে, তুলিল কৃতান্ত শরীরিযুগলে, বিচিত্র বিমানে। জনমিল তথা দিব্য তরুবর, সুগন্ধি কুসুমে শোভে নিরন্তর, বেড়িল তাহাতে লতা মনোহর, সে বিজন স্থানে ||
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
১ কে ভাসাল জলে তোরে কানন-সুন্দরী! বসিয়া পল্লবাসনে,       ফুটেছিলে কোন্ বনে নাচিতে পবন সনে, কোন্ বৃক্ষোপরি? কে ছিঁড়িল শাখা হতে শাখার মঞ্জরী? ২ কে আনিল তোরে ফুল তরঙ্গিণী-তীরে? কাহার কুলের বালা,      আনিয়া ফুলের ডালা, ফুলের আঙ্গুলে তুলে ফুল দিল নীরে? ফুল হতে ফুল খসি, জলে ভাসে ধীরে! ৩ ভাসিছে সলিলে যেন, আকাশেতে তারা। কিম্বা কাদম্বিনী-গায়,       যেন বিহঙ্গিনী প্রায়, কিম্বা যেন মাঠে ভ্রমে, নারী পথহারা; কোথায় চলেছ ধরি, তরঙ্গিণীধারা? ৪ একাকিনী ভাসি যাও, কোথায় অবলে! তরঙ্গের রাশি রাশি,        হাসিয়া বিকট হাসি, তাড়াতাড়ি করি তোরে খেলে কুতূহলে? কে ভাসাল তোরে ফুল কাল নদীজলে! ৫ কে ভাসাল তোরে ফুল, কে ভাসাল মোরে! কাল স্রোতে তোর(ই) মত, ভাসি আমি অবিরত, কে ফেলেছে মোরে এই তরঙ্গের ঘোরে? ফেলেছে তুলিছে কভু, আছাড়িছে জোরে ৬ শাখার মঞ্জরী আমি, তোরই মত ফুল। বোঁটা ছিঁড়ে শাখা ছেড়ে, ঘুরি আমি স্রোতে পড়্যে, আশার আবর্ত্ত বেড়ে, নাহি পাই কূল। তোরই মত আমি ফুল তরঙ্গে আকুল। ৭ তুই যাবি ভেসে ফুল, আমি যাব ভেসে। কেহ না ধরিবে তোরে    কেহ না ধরিবে মোরে অনন্ত সাগরে তুই,       মিশাইবি শেষে। চল যাই দুই জনে অনন্ত উদ্দেশে।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
গীতিগাথা
১ রাজপুরী মাঝে           কি সুন্দর আজি। বসেছে বাজার, রসের ঠাট, রমণীতে বেচে           রমণীতে কিনে লেগেছে রমণীরূপের হাট || বিশালা সে পুরী           নবমীর চাঁদ, লাখে লাখে দীপ উজলি জ্বলে। দোকানে দোকানে         কুলবালাগণে খরিদদার ডাকে, হাসিয়া ছলে || ফুলের তোরণ,           ফুল আবরণ ফুলের স্তম্ভেতে ফুলের মালা। ফুলের দোকান,           ফুলের নিসান, ফুলের বিছানা ফুলের ডালা || লহরে লহরে             ছুটিছে গোলাব, উঠিছে ফুয়ারা জ্বলিছে জল। তাধিনি তাধিনি          নাচিতেছে নটী, গায়িছে মধুর গায়িকা দল || রাজপুরী মাঝে          লেগেছে বাজার, বড় গুলজার সরস ঠাট। রমণীতে বেচে         রমণীতে কিনে লেগেছে রমণীরূপের হাট || কত বা সুন্দরী,        রাজার দুলালী ওমরাহজায়া, আমীরজাদী। নয়নেতে জ্বালা,        অধরেতে হাসি, অঙ্গেতে ভূষণ মধুর-নাদী || হীরা মতি চুণি                  বসন ভূষণ কেহ বা বেচিছে কেনে বা কেউ। কেহ বেচে কথা               নয়ন ঠারিয়ে কেহ কিনে হাসি রসের ঢেউ || কেহ বলে সখি                এ রতন বেচি হেন মহাজন এখানে কই? সুপুরুষ পেলে                আপনা বেচিয়ে বিনামূল্যে কেনা হইয়া রই || কেহ বলে সখি               পুরুষ দরিদ্র কি দিয়ে কিনিবে রমণীমণি। চারি কড়া দিয়ে               পুরুষ কিনিয়ে গৃহেতে বাঁধয়ে রেখ লো ধনি || পিঞ্জরেতে পুরি,              খেতে দিও ছোলা, সোহাগ শিকলি বাঁধিও পায়। অবোধ বিহঙ্গ                পড়িবে আটক তালি দিয়ে ধনি, নাচায়ো তায় || ২ একচন্দ্রাননী,           মরাল-গামিনী, সে রসের হাটে ভ্রমিছে একা। কিছু নাহি বেচে         কিছু নাহি কিনে, কাহার(ও) সহিত না করে দেখা || প্রভাত-নক্ষত্র            জিনিয়া রূপসী, দিশাহারা যেন বাজারে ফিরে। কাণ্ডারী বিহনে          তরণী যেন বা ভাসিয়া বেড়ায় সাগরনীরে || রাজার দুলালী          রাজপুতবালা চিতোরসম্ভবা কমলকলি। পতির আদেশে         আসিয়াছে হেথা সুখের বাজার দেখিবে বলি || দেখে শুনে বামা        সুখী না হইল- বলে ছি ছি এ কি লেগেছে ঠাট। কুলনারীগণে,           বিকাইতে লাজ বসিয়াছে ফেঁদে রসের হাট! ফিরে যাই ঘরে        কি করিব একা এ রঙ্গসাগরে সাঁতার দিয়ে? এত বলি সতী         ধীরি ধীরি ধীরি নির্গমের দ্বারে গেল চলিয়ে || নির্গমের পথ           অতি সে কুটিল, পেঁচে পেঁচে ফিরে, না পায় দিশে। হায় কি করিনু         বলিয়ে কাঁদিল, এখন বাহির হইব কিসে? না জানি বাদশা        কি কল করিল ধরিতে পিঞ্জরে, কুলের নারী। না পায় ফিরিতে       নারে বাহিরিতে নয়নকমলে বহিল বারি || ৩ সহসা দেখিল          সমুখে সুন্দরী বিশাল উরস পুরুষ বীর। রতনের মালা         দুলিতেছে গলে মাথায় রতন জ্বলিছে স্থির || যোড় করি কর,       তারে বিনোদিনী বলে মহাশয় কর গো ত্রাণ। না পাই যে পথ        পড়েছি বিপদে দেখাইয়ে পথ, রাখ হে প্রাণ || বলে সে পুরুষ        অমিয় বচনে আহা মরি, হেন না দেখি রূপ। এসো এসো ধনি       আমার সঙ্গেতে আমি আকব্বর-ভারত-ভূপ || সহস্র রমণী           রাজার দুলালী মম আজ্ঞাকারী, চরণ সেবে। তোমা সমা রূপে     নহে কোন জন, তব আজ্ঞাকারী আমি হে এবে || চল চল ধনি         আমার মন্দিরে আজি খোষ রোজ সুখের দিন। এ ভারত ভূমে       কি আছে কামনা বলিও আমারে, শোধিব ঋণ || এত বলি তবে       রাজারাজপতি বলে মোহিনীরে ধরিল করে। যূথপতি বল         সে ভূজবিটপে টুটিল কঙ্কণ তাহার ভরে || শূকাল বামার       বদন-নলিনী ডাকি ত্রাহি ত্রাহি ত্রাহি মে দুর্গে। ত্রাহি ত্রাহি ত্রাহি     বাঁচাও জননী! ত্রাহি ত্রাহি ত্রাহি ত্রাহি মে দুর্গে || ডাকে কালি কালি       ভৈরবী করালি কৌষিকি কপালি কর মা ত্রাণ। অর্পণে অম্বিকে      চামুণ্ডে চণ্ডিকে বিপদে বালিকে হারায় প্রাণ || মানুষের সাধ্য      নহে গো জননি এ ঘোর বিপদে রক্ষিতে লাজ। সমর-রঙ্গিণি       অসুর-ঘাতিনি এ অসুরে নাশি, বাঁচাও আজ || ৪ বহুল পুণ্যেতে        অনন্ত শূন্যেতে দেখিল রমণী, জ্বলিছে আলো। হাসিছে রূপসী        নবীনা ষোড়শী মৃগেন্দ্র বাহনে, মূরতি কালো || নরমুণ্ডমালা          দুলিছে উরসে বিজলি ঝলসে লোচন তিনে। দেখা দিয়া মাতা     দিতেছে অভয় দেবতা সহায় সহায়হীনে || আকাশের পটে      নগেন্দ্র-নন্দিনী দেখিয়া যুবতী প্রফুল্ল মুখ। হৃদি সরোবর        পুলকে উছলে সাহসে ভরিল, নারীর বুক || তুলিয়া মস্তক        গ্রীবা হেলাইল দাঁড়াইল ধনী ভীষণ রাগে। নয়নে অনল        অধরেতে ঘৃণা বলিতে লাগিল নৃপের আগে || ছিছি ছিছি ছিছি       তুমি হে সম্রাট্, এই কি তোমার রাজধরম। কুলবধূ ছলে        গৃহেতে আনিয়া বলে ধর তারে নাহি শরম || বহু রাজ্য তুমি     বলেতে লুটিলে, বহু বীর নাশি বলাও বীর। বীরপণা আজি     দেখাতে এসেছ রমণীর চক্ষে বহায়ে নীর? পরবাহুবলে        পররাজ্য হর, পরনারী হর করিয়ে চুরি। আজি নারী হাতে      হারাবে জীবন ঘুচাইব যশ মারিয়ে ছুরি || জয়মল্ল বীরে      ছলেতে বধিলে ছলেতে লুটিয়ে চারু চিতোর। নারীপদাঘাতে     আজি ঘুচাইব তব বীরপণা, ধরম চোর। এত বলি বামা    হাত ছাড়াইল বলিতে ধরিল রাজার অসি। কাড়িয়া লইয়া,    অসি ঘুরাইয়া, মারিতে তুলিল, নবরূপসী || ধন্য ধন্য বলি      রাজা বাখানিল এমন কখন দেখিনে নারী। মানিতেছি ঘাট    ধন্য সতী তুমি রাখ তরবারি ; মানিনু হারি || ৫ হাসিয়া রূপসী      নামাইল অসি, বলে মহারাজ, এ বড় রস। পৃথিবীপতির বাড়িল যশ || দুলায়ে কুণ্ডল,     অধরে অঞ্চল, হাসে খল খল, ঈষৎ হেলে। বলে মহাবীর,     এই বলে তুমি রমণীরে বল করিতে এলে? পৃথিবীতে যারে,   তুমি দাও প্রাণ, সেই প্রাণে বাঁচে, বল হে সবে। আজি পৃথ্বিনাথ     আমার চরণে প্রাণ ভিক্ষা লও, বাঁচিবে তবে || যোড়ো হাত দুটো,         দাঁতে কর কুটো করহ শপথ ভারতপ্রভু। শপথ করহ        হিন্দুললনার হেন অপমান না হবে কভু || তুমি না করিবে,        রাজ্যেতে না দিবে হইতে কখন এ হেন দোষ। হিন্দুললনারে         যে দিবে লাঞ্ছনা তাহার উপরে করিবে রোষ || শপথ করিল,      পরশিয়ে অসি, নারী আজ্ঞামত ভারপ্রভু। আমার রাজ্যতে               হিন্দুললনার হেন অপমান না হবে কভু || বলে শুনি ধনি                  হইয়াছি প্রীত দেখিয়া তোমার সাহস বল। যাহা ইচ্ছা তব                 মাগি লও সতি, পূরাব বাসনা, ছাড়িয়া ছল || এই তরবারি             দিনু হে তোমারে হীরক-খচিত ইহার কোষ। বীরবালা তুমি               তোমার সে যোগ্য না রাখিও  মনে আমার দোষ || আজি হতে তোমা             ভগিনী বলিনু, ভাই তব আমি ভাবিও মনে। যা থাকে বাসনা                মাগি লও বর যা চাহিবে তাই দেব এখান || তুষ্ট হয়ে সতী                  বলে ভাই তুমি সম্প্রীত হইনু তোমার ভাষে। ভিক্ষা যদি দিবা                দেখাইয়া দাও নির্গমের পথ, যাইব বাসে || দেখাইল পথ                 আপনি রাজন্ বাহিরিল সতী, সে পুরী হতে। সবে বল জয়,          হিন্দুকন্যা জয়, হিন্দুমতি থাক্ ধর্ম্মের পথে || ৬ রাজপুরী মাঝে,                কি সুন্দর আজি বসেছে বাজার রসের ঠাট। রমণীতে কেনে                রমণীতে বেচে লেগেছে রমণীরূপের হাট || ফুলের তোরণ                ফুল আবরণ ফুলের স্তম্ভেতে ফুলের মালা। ফুলের দোকান               ফুলের নিশান ফুলের বিছানা ফুলের ডালা || নবমীর চাঁদ                  বরষে চন্দ্রিকা লাখে লাখে দীপ উজলি জ্বলে || দোকানে দোকানে            কুলবালগণে ঝলসে কটাক্ষ হাসিয়া ছলে || এ হতে সুন্দর,               রমণী-ধবম আর্য্যনারীরধ্‍ঁচ্চমর্ম, সতীত্ব ব্রত। জয় আর্য্য নামে,           আজ(ও) আর্য্যধামে আর্য্যধর্ম্ম রাখে রমণী যত || জয় আর্য্যকন্যা              এ ভুবন ধন্যা, ভারতের আলো, ঘোর আঁধারে। হায় কি কারণে,                আর্য্যপুত্রগণে আর্য্যের ধরম রাখিতে নারে ||
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
মানবতাবাদী
চল নামি-আষাঢ় আসিয়াছে-চল নামি। আমরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৃষ্টিবিন্দু, একা এক জনে যূথিকাকলির শুষ্ক মুখও ধুইতে পারি না-মল্লিকার ক্ষুদ্র হৃদয় ভরিতে পারি না। কিন্তু আমরা সহস্র সহস্র, লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি,-মনে করিলে পৃথিবী ভাসাই। ক্ষুদ্র কে? দেখ, যে একা, সেই ক্ষুদ্র, সেই সামান্য। যাহার ঐক্য নাই, সেই তুচ্ছ। দেখ, ভাই সকল কেহ একা নামিও না-অর্দ্ধপথে ঐ প্রচণ্ড রবির কিরণে শুকাইয়া যাইবে,-চল, সহস্রে সহস্রে, লক্ষে লক্ষে, অর্ব্বুদে, অর্ব্বুদে এই বিশোষিতা পৃথিবী ভাসাইব। পৃথিবী ভাসাইব। পর্ব্বতের মাথায় চড়িয়া, তাহার গলা ধরিয়া, বুকে পা দিয়া, পৃথিবীতে নামিব ; নির্ঝরপথে স্ফটিক হইয়া বাহির হইব। নদীকূলের শূন্যহৃদয় ভরাইয়া, তাহাদিগকে রূপের বসন পরাইয়া, মহাকল্লোলে ভীম বাদ্য বাজাইয়া, তরঙ্গের উপর তরঙ্গ মারিয়া, মহারঙ্গে ক্রীড়া করিব। এসো, সবে নামি। কে যুদ্ধ দিবে-বায়ু। ইস! বায়ুর ঘাড়ে চড়িয়া দেশ দেশান্তরে বেড়াইব। আমাদের এ বর্ষাযুদ্ধে বায়ু ঘোড়া মাত্র ; তাহার সাহায্য পাইলে স্থলে জলে এক করি। তাহার সাহায্য পাইলে, বড় বড় গ্রাম অট্টালিকা, পোত মুখে করিয়া ধুইয়া লইয়া যাই। তাহার ঘাড়ে চড়িয়া, জানালা লোকের ঘরে ঢুকি। যুবতীর যত্ননির্ম্মিত শয্যা ভিজাইয়া দিই-সুষুপ্ত সুন্দরীর গায়ের উপর গা ঢালি। বায়ু! বায়ু ত আমাদের গোলাম। দেখ ভাই, কেহ একা নামিও না-ঐক্যেই বল-নহিলে আমরা কেহ নাই। চল-আমরা ক্ষুদ্র বৃষ্টিবিন্দু-কিন্তু পৃথিবী রাখিব। শস্যক্ষেত্রে শস্য জন্মাইব-মনুষ্য বাঁচিবে। নদীতে নৌকা চালাইব-মনুষ্যের বাণিজ্য বাঁচিবে। তৃণ লতা বৃক্ষাদির পুষ্টি করিব-পশু পক্ষী কীট পতঙ্গ বাঁচিবে। আমরা ক্ষুদ্র বৃষ্টিবিন্দু-আমাদের সমান কে? আমরাই সংসার রাখি। তবে আয়, ডেকে ডেকে, হেঁকে হেঁকে, নবনীল কাদম্বিনী! বৃষ্টিকুলপ্রসূতি! আয় মা দিঙ্মণ্ডলব্যাপিনী ; সৌরতেজঃসংহারিণি! এসো এসো গগনমণ্ডল আচ্ছন্ন কর, আমরা নামি! এসো ভগিনি সুচারুহাসিনি চঞ্চলে! বৃষ্টিকুলমুখ আলো কর! আমরা ডেকে ডেকে, হেসে হেসে, নেচে নেচে, ভূতলে নামি। তুমি বৃত্রমর্ম্মভেদী বজ্র, তুমিও ডাক না –এ উৎসবে তোমার মতো বাজান কে‌ ? ‌তুমিও ভূতেল পড়িবে? পড়, কিন্তু কেবল গর্ব্বোন্নতের মস্তকের উপর পড়িও। এই ক্ষুদ্র পরোপকারী শস্যমধ্যে পড়িও না-আমরা তাহাদের বাঁচাইতে যাইতেছি। ভাঙ্গ ত এই পর্ব্বতশৃঙ্গ ভাঙ্গ ; পোড়াও ত ঐ উচ্চ দেবালয়চূড়া পোড়াও। ক্ষুদ্রকে কিছু বলিও না-আমরা ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্রের জন্য আমাদের বড় ব্যথা। দেখ, দেখ, আমাদের দেখিয়া আহ্লাদ দেখ! গাছপালা মাথা নাড়িতেছে-নদী দুলিতেছে, ধান্যক্ষেত্র মাথা নামাইয়া প্রণাম করিতেছে-চাষা চষিতেছে-ছেলে ভিজিতেছে-কেবল বেনে বউ আমসী ও আমসত্ত্ব লইয়া পলাইতেছে। মর্ পাপিষ্ঠা! দুই একখানা রেখে যা না-আমরা খাব। দে, মাগীর কাপড় ভিজিয়ে দে। আমরা জাতিতে জল, কিন্তু রঙ্গরস জানি। লোকের চাল ফুটা করিয়া ঘরে উঁকি মারি-দম্পতির গৃহে ছাদ ফুটা করিয়া টু দিই। যে পথে সুন্দর বৌ জলের কলসী লইয়া যাইবে, সেই পথে পিছল করিয়া রাখি। মল্লিকার মধু লইয়া গিয়া, ভ্রমরের অন্ন মারি। মুড়ি মুড়কির দোকান দেখিলে প্রায় ফলার মাখিয়া দিয়া যাই। রামী চাকরাণী কাপড় শুকুতে দিলে, প্রায় তাহার কাজ বাড়াইয়া রাখি। ভণ্ড বামুনের জন্য আচমনীয় যাইতেছে দেখিলে, তাহার জাতি মারি। আমরা কি কম পাত্র! তোমরা সবাই বল-আমরা রসিক। তা যাক্-আমাদের বল দেখ। দেখ, পর্ব্বতকন্দর, দেশ প্রদেশ ধুইয়া লইয়া, নূতন দেশ নির্ম্মান বিশীর্ণা সূত্রাকারা তটিনিকে কূলপ্লাবিনী দেশমজ্জিনী অনন্তদেহধারিণী অনন্ত তরঙ্গিণী জলরাক্ষসী করিব। কোন দেশের মানুষ রাখিব-কোন দেশের মানুষ মারিব-কত জাহাজ বহিব, কত জাহাজ ডুবাইব-পৃথিবী জলময় করিব-অথচ আমরা কি ক্ষুদ্র! আমাদের মত ক্ষুদ্র কে? আমাদের মত বলবান্ কে?
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
খদ্যোত যে কেন আমাদিগের উপহাসের স্থল, তাহা আমি বুঝিতে পারি না। বোধ হয়, চন্দ্র সূর্য্যাদি বৃহৎ আলোকাধার সংসারে আছে বলিয়াই জোনাকির এত অপমান। যেখানেই অল্পগুণবিশিষ্ট ব্যক্তিকে উপহাস করিতে হইবে, সেইখানেই বক্তা বা লেখক জোনাকির আশ্রয় গ্রহণ করেন। কিন্তু আমি দেখিতে পাই যে, জোনাকির অল্প হউক, অধিক হউক, কিছু আলো আছে-কই, আমাদের ত কিছুই নাই। এই অন্ধকারে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়া কাহার পথ আলো করিলাম? কে আমাকে দেখিয়া, অন্ধকারে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করিয়া কাহার পথ আলো করিলাম? কে আমাকে দেখিয়া, অন্ধকারে, দুস্তরে, প্রান্তরে, দুর্দ্দিনে, বিপদে, বিপাকে বলিয়াছে, এস ভাই, চল চল, ঐ দেখ আলো জ্বলিতেছে, চল, ঐ আলো দেখিয়া পথ চল? অন্ধকার! এ পৃথিবী ভাই বড় অন্ধকার! পথ চলিতে পারি না। যখন চন্দ্র সূর্য্য থাকে, তখন পথ চলি-নহিলে পারি না। তারাগণ আকাশে উঠিয়া, কিছু আলো করে বটে, কিন্তু দুর্দ্দিনে ত তাহাদের দেখিতে পাই না। চন্দ্রসূর্য্যও সুদিনে-দুর্দ্দিনে, দুঃসময়ে, যখন মেঘের ঘটা, বিদ্যুতের ছটা, একে রাত্রি, তাহাতে ঘোর বর্ষা, তখন কেহ না। মনুষ্যনির্ম্মিত যন্ত্রের ন্যায় তাহারাও বলে- “Hora non numero nisi serenas!” কেবল তুমি খদ্যোৎ,-ক্ষুদ্র, হীনভাস, ঘৃণিত, সহজে হন্য, সর্ব্বদা, হত-তুমিই সেই অন্ধকার দুর্দ্দিনে বর্ষাবৃষ্টিতে দেখা দাও। তুমিই অন্ধকারে আলো। আমি তোমাকে ভাল বাসি। আমি তোমায় ভাল বাসি, কেন না, তোমার অল্প, অতি অল্প আলো আছে-আমিও মনে জানি, আমারও অল্প, অতি অল্প আলো আছে-তুমিও অন্ধকারে, আমিও ভাই, ঘোর অন্ধকারে। অন্ধকারে সুখ নাই কি? তুমিও অনেক অন্ধকারে বেড়াইয়াছ-তুমি বল দেখি? যখন নিশীথমেঘে জগৎ আচ্ছন্ন, বর্ষা হইতেছে ছাড়িতেছে, ছাড়িতেছে হইতেছে ; চন্দ্র নাই, তারা নাই, আকাশের নীলিমা নাই, পৃথিবীর দীপ নাই-প্রস্ফুটিত কুসুমের শোভা পর্য্যন্ত নাই-কেবল অন্ধকার, অন্ধকার! কেবল অন্ধকার আছে-আর তুমি আছ-তখন, বল দেখি, অন্ধকারে কি সুখ নাই? সেই তপ্ত রৌদ্রপ্রদীপ্ত কর্কশ স্পর্শপীড়িত, কঠোর শব্দে শব্দায়মান অসহ্য সংসারের পরিবর্ত্তে সংসার আর তুমি! জগতে অন্ধকার ; আর মুদিত কামিনীকুসুম জলনিষেকতরুণায়িত বৃক্ষের পাতায় পাতায় তুমি! বল দেখি ভাই, সুখ আছে কি না? আমি ত বলি আছে। নহিলে কি সাহসে, তুমি ঐ বন্যান্ধকারে, আমি এই সামাজিক অন্ধকারে এই ঘোর দুর্দ্দিনে ক্ষুদ্র আলোকে আলোকিত করিতে চেষ্টা করিতাম? আছে-অন্ধকারে মাতিয়া আমোদ আছে। কেহ দেখিবে না-অন্ধকারে তুমি জ্বলিবে-আর অন্ধকারে আমি জ্বলিব ; অনেক জ্বালায় জ্বলিব। জীবনের তাৎপর্য্য বুঝিতে অতি কঠিন-অতি গূঢ় অতি ভয়ঙ্কর-ক্ষুদ্র হইয়া তুমি কেন জ্বল, ক্ষুদ্র হইয়া আমি কেন জ্বলি? তুমি তা ভাব কি? আমি ভাবি। তুমি যদি না ভাব, তুমি সুখী,-আমি ভাবি-আমি অসুখী। তুমিও কীট-আমিও কীট, ক্ষুদ্রাধিক ক্ষুদ্র কীট-তুমি সুখী,-কোন পাপে আমি অসুখী? তুমি ভাব কি? তুমি কেন জগৎসবিতা সূর্য্য হইলে না, এককালীন আকাশ ও সমুদ্রের শোভা যে সুধাকর, কেন তাই হইলে না-কেন গ্রহ উপগ্রহ ধূমকেতু নীহারিকা,-কিছু না হইয়া কেবল জোনাকি হইলে, ভাব কি? যিনি এ সকলকে সৃজন করিয়াছেন, তিনিই তোমায় সৃজন করিয়াছেন, যিনিই উহাদিগকে আলোক দিয়াছেন, তিনিই তোমাকে আলোক দিয়াছেন-তিনি একের বেলা বড় ছাঁদে-অন্যের বেলা ছোট ছাঁদে গড়িলেন কেন? অন্ধকারে এত বেড়াইলে, ভাবিয়া কিছু পাইয়াছ কি? তুমি ভাব না ভাব, আমি ভাবি। আমি ভাবিয়া স্থির করিয়াছি যে, বিধাতা তোমায় আমায় কেবল অন্ধকার রাত্রের জন্য পাঠাইয়াছেন। আলো একই-তোমার আলো ও সূর্য্যের-উভয়ই জগদীশ্বরপ্রেরিত-তবে তুমি কেবল বর্ষার রাত্রের জন্য ; আমি কেবল বর্ষার রাত্রের জন্য।-এসো কাঁদি। এসো কাঁদি-বর্ষার সঙ্গে, তোমার আমার সঙ্গে নিত্য সম্বন্ধ কেন? আলোকময়, নক্ষত্রপ্রোজ্জ্বল বসন্তগগনে তোমার আমার স্থান নাই কেন? বসন্ত চন্দ্রের জন্য, সুখীর জন্য, নিশ্চিন্তের জন্য; বর্ষা তোমার জন্য, দুঃখীর জন্য, আমার জন্য। সেই জন্য কাঁদিতে চাহিতেছিলাম-কিন্তু কাঁদিব না। যিনি তোমার আমার জন্য এই সংসার অন্ধকারময় করিয়াছেন, কাঁদিয়া তাঁহাকে দোষ দিব না। যদি অন্ধকারের সঙ্গে তোমার আমার নিত্য সম্বন্ধই তাঁহার ইচ্ছা, আইস, অন্ধকারই ভালবাসি। আইস, নবীন নীল কাদম্বিনী দেখিয়া, এই অনন্ত অসংখ্য জগন্ময় ভীষণ বিশ্বমণ্ডলের করাল ছায়া অনুভূত করি ; মেঘগর্জ্জন শুনিয়া, সর্ব্বধ্বংসকারী কালের অবিশ্রান্ত গর্জ্জন স্মরণ করি ;-বিদ্যুদ্দাম দেখিয়া কালের কটাক্ষ মনে করি। মনে করি, এই সংসার ভয়ঙ্কর ক্ষণিক,-তুমি আমি ক্ষণিক, বর্ষার জন্যই প্রেরিত হইয়াছিলাম ; কাঁদিবার কথা নাই। আইস, নীরবে জ্বলিতে জ্বলিতে, অনেক জ্বালায় জ্বলিতে জ্বলিতে সকল সহ্য করি। নহিলে, আইস মরি। তুমি দীপালোক বেড়িয়া বেড়িয়া পুড়িয়া মর, আমি আশারূপ প্রবল প্রোজ্জ্বল মহাদীপ বেড়িয়া বেড়িয়া পুড়িয়া মরি। দীপালোকে তোমার কি মোহিনী আছে জানি না-আশার আলোকে আমার যে মোহিনী আছে, তাহা জানি। এ আলোকে কত বার ঝাঁপ দিয়া পড়িলাম, কত বার পুড়িলাম, কিন্তু মরিলাম না। এ মোহিনী কি, আমি জানি। জ্যোতিষ্মান্ হইয়া এ সংসারে আলো বিতরণ করিব-বড় সাধ ; কিন্তু হায়! আমরা খদ্যোৎ! এ আলোকে কিছুই আলোকিত হইবে না! কাজ নাই! তুমি ঐ বকুলকুঞ্জকিসলয়কৃত অন্ধকারমধ্যে, তোমার ক্ষুদ্র আলোক নিবাও, আমিও জলে হউক, স্থলে হউক, রোগে হউক, দুঃখে হউক, এ ক্ষুদ্র দীপ নিবাই। মনুষ্য খদ্যোৎ।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
মানবতাবাদী
(সমবেত বাঙ্গালিদিগের সভা দেখিয়া) ১ এক বঙ্গভূমে জনম সবার, এক বিদ্যালয়ে জ্ঞানের সঞ্চার, এক দুঃখে সবে করি হাহাকার, ভাই ভাই সবে, কাঁদ রে ভাই। এক শোকে শীর্ণ সবার শরীর, এক শোকে বয় নয়নের নীর, এক অপমানে সবে নতশির, অধম বাঙ্গালি মোরা সবাই || ২ নাহি ইতিবৃত্ত নাহিক গৌরব, নাহি আশা কিছু নাহিক বৈভব, বাঙ্গালির নামে করে ছিছি রব, কোমল স্বভাব, কোমল দেহ। কোমল করেতে ধর কমলিনী, কোমল শয্যাতে, কোমল শিঞ্জিনী, কোমল শরীর, কোমল যামিনী, কোমল পিরীতি, কোমল স্নেহ || ৩ শিখিয়াছ শুধু উচ্চ চীৎকার! “ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও!” সার দেহি দেহি দেহ বল বার বার না পেলে গালি দাও মিছামিছি। দানের অযোগ্য চাও তবু দান, মানের অযোগ্য রাখ তবু মান, বাঁচিতে অযোগ্য রাখ তবু প্রাণ, ছিছি  ছিছি  ছিছি! ছি  ছি  ছি  ছি। ৪ কার উপকার করেছ সংসারে? কোন্ ইতিহাসে তব নাম করে? কোন্ বৈজ্ঞানিক বাঙ্গালির ঘরে? কোন্ রাজ্য তুমি করেছ জয়? কোন্ রাজ্য তুমি শাসিয়াছ ভাল? কোন্ মারাথনে ধরিয়াছ ঢাল? এই বঙ্গভূমি এ কাল সে কাল অরণ্য, অরণ্য অরণ্যময় || ৫ কে মিলাল আজি এ চাঁদের হাট? কে খুলিল আজি মনের কপাট? পড়াইব আজি এ দুঃখের পাঠ, শুন ছি ছি রব, বাঙ্গালি নামে, য়ুরোপে মার্কিনে ছিছি ছিছি বলে, শুন ছিছি ছিছি রব, হিমালয়তলে, শুন ছিছি ছিছি রব, সমুদ্রের জলে, স্বদেশে, বিদেশে, নগরে, গ্রামে || ৬ কি কাজ বহিয়া এ ছার জীবনে, কি কাজ রাখিয়া এ নাম ভুবনে, কলঙ্ক থাকিতে কি ভয় মরণে? চল সবে মরি পশিয়া জলে। গলে গলে ধরি, চল সবে মরি, সারি সারি সারি, চল সবে মরি, শীতল সলিলে এ জ্বালা পাসরি, লুকাই এ নাম সাগরতলে ||
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ভক্তিমূলক
গাছ পুঁতিলাম ফলের আশায়, পেলাম কেবল কাঁটা। সুখের আশায় বিবাহ করিলাম পেলাম কেবল ঝাঁটা || বাসের জন্য ঘর করিলাম ঘর গেল পুড়ে। বুড়ো বয়সের জন্য পুঁজি করিলাম সব গেল উড়ে || চাকুরির জন্যে বিদ্যা করিলাম, ঘটিল উমেদারি। যশের জন্য কীর্ত্তি করিলাম, ঘটিল টিটকারী || সুদের জন্য কর্জ্জ দিলাম, আসল গেল মারা। প্রীতির জন্য প্রাণ দিলাম, শেষে কেঁদে সারা || ধানের জন্য মাঠ চষিলাম, হলো খড় কুটো || পারের জন্য নৌকা করিলাম, নৌকা হলো ফুটো || লাভের জন্য ব্যবসা করিলাম, সব লহনা বাকি। সেটাম দিয়া আদালত করিলাম, ডিক্রীর বেলায় ফাঁকি || তবে আর কেন ভাই, বেড়াও ঘুরে, বেড়ে ভবের হাট। ঘূর্ণী জলে নৌকা যেমন, ঝড়ের কুটো, জ্বলন্ত আগুনের কাঠ || মুখে বল হরিনাম ভাই, হৃদে ভাব হরি! এ ব্যবসায় লোকসান নেই ভাই, এসো লাভে ঘর ভরি || এ গুণেতে শত লাভ, শত গুণে হাজার। হাজারেতে লক্ষ লাভ, ভারি ফলাও কারবার || ভাই বল হরি, হরি বোল, ভাঙ্গ ভবের হাট! রাজার উপর হওগে রাজা লাট সাহেবের লাট ||
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
গাথাকাব্য
সংযুক্তা1১। স্বপ্ন১নিশীথে শুইয়া, রজত পালঙ্কে পুষ্পগন্ধি শির, রাখি রামা অঙ্কে, দেখিয়া স্বপন, শিহরে সশঙ্কে, মহিষীর কোলে, শিহরে রায়। চমকি সুন্দরী, নৃপে জাগাইল, বলে প্রাণনাথ, এ বা কি হইল, লক্ষ যোধ রণে, যে না চমকিল মহিষীর কোলে সে ভয় পায়!২উঠিয়া নৃপতি কহে মৃদু বাণী যে দেখিনু স্বপন, শিহরে পরাণি, স্বর্গীয়া জননী চৌহনের রাণী বন্য হস্তী তাঁরে মারিতে ধায়। ভয়ে ভীত প্রায় রাজেন্দ্রঘরণী আমার নিকটে আসিল অমনি বলে পুত্র রাখ, মরিল জননী বন্যহস্তি-শূণ্ডে প্রাণ বা যায় ||৩ধরি ভীম গদা মারি হস্তিতুণ্ডে না মানিল গদা, বাড়াইয়া শূণ্ডে জননীকে ধরি, উঠাইলে মুণ্ডে; পড়িয়া ভূমেতে বধিল প্রাণ। কুস্বপন আজি দেখিলাম রাণি, কি আছে বিপদ কপালে না জানি মত্ত হস্তী আসি বধে রাজেন্দ্রাণী আমি পুত্র নারি করিতে ত্রাণ ||৪শুনিয়াছি নাকি তুরস্কের দল আসিতেছে হেথা, লঙ্ঘি হিমাচল কি হইবে রণে, ভাবি অমঙ্গল, বুঝি এ সামান্য স্বপন নয়। জননীরূপেতে বুঝি বা স্বদেশ বুঝি বা তুরস্ক মত্ত হস্তী বেশ, বার বার বুঝি এইবার শেষ! পৃথ্বীরাজ নাম বুঝি না রয় ||৫শুনি পতিবাণী যুড়ি দুই পাণি জয় জয় জয়! বলে রাজরাণী জয় জয় জয় পৃথ্বীরাজের জয়- জয় জয় জয়! বলিল বামা। কার সাধ্য তোমা করে পরাভব ইন্দ্র চন্দ্র যম বরুণ বাসব। কোথাকার ছার তুরষ্ক পহ্লব জয় পৃথ্বীরাজ প্রথিতনামা ||৬আসে আসুক না পাঠান পামর, আসে আসুক না আরবি বানর, আসে আসুক না নর না অমর। কার সাধ্য তব শকতি সয়? পৃথ্বীরাজ সেনা অনন্ত মণ্ডল পৃথ্বীরাজভূজে অবিজিত বল অক্ষয় ও শিরে কিরীট কুণ্ডল জয় জয় পৃথ্বীরাজের জয় ||৭এত বলি বামা দিল করতালি দিল করতালি গৌরবে উছলি, ভূষণে শিঞ্জিনী, নয়নে বিজলি দেখিয়া হাসিল ভরতপতি। সহসা কঙ্কণে লাগিল কঙ্কণ, আঘাতে ভাঙ্গিয়া খসিল ভূষণ, নাচিয়া উঠিল দক্ষিণ নয়ন, কবি বলে তালি না দিও সতি ||২। রণসজ্জা।১রণসাজে সাজে চৌহানের বল, অশ্ব গজ রথ পদাতির দল, পতাকার রবে, পবন চঞ্চল, বাজিল বাজনা-ভীষণ নাদ। ধূলিতে পূরিল গগনমণ্ডল, ধূলিতে পূরিল যমুনার জল, ধূলিতে পূরিল অলক কুন্তল, যথা কূলনারী গণে প্রমাদ ||২দেশ দেশ হতে এলো রাজগণ স্থানেশ্বর পদে বধিতে যবন সঙ্গে চতুরঙ্গ সেনা অগণন- হর হর বলে যতেক বীর। মদবার2 হতে আইল সমর3 আবু হতে এলো দুরন্ত প্রমর আর্য্য বীরদল ডাকে হর! হর! উছলে কাঁপিয়া কালিন্দী-নীর ||৩গ্রীবা বাঁকাইয়া চলিল তুরঙ্গ শূণ্ড আছাড়িয়া চলিল মাতঙ্গ ধনু আস্ফালিয়া- শুনিতে আতঙ্গ- দলে দলে দলে পদাতি চলে। বসি বাতায়নে কনৌজনন্দিনী দেখিলা অদূরে চলিছে বাহিনী ভারত ভরসা, ধরম রক্ষিণী- ভাসিলা সুন্দরী নয়নজলে ||৪সহসা পশ্চাতে দেখিল স্বামীরে, মুছিলা অঞ্চলে নয়নের নীরে, যুড়ি দুই কর বলে “হেন বীরে রণসাজে আমি সাজাব আজ।” পরাইল ধনী কবচকুণ্ডল মুকতার দাম বক্ষে ঝলমল ঝলসিল রত্ন কিরীট মণ্ডল ধনু হস্তে হাসে রাজেন্দ্ররাজ ||৫সাজাইয়া নাথে যোড় করি পাণি ভারতের রাণী কহে মৃদু বাণী “সুখী প্রাণেশ্বর তোমায় বাখানি এ বাহিনীপতি চলিলা রণে। লক্ষ যোধ প্রভু তব আজ্ঞাকারী, এ রণসাগরে তুমি হে কাণ্ডারী মথিবে সে সিন্ধু নিয়তি প্রহারি সেনার তরঙ্গ তরঙ্গসনে ||৬আমি অভাগিনী জনমি কামিনী অবরোধে আজি রহিনু বন্দিনী না হতে পেলাম তোমার সঙ্গিনী, অর্দ্ধাঙ্গ হইয়া রহিনু পাছে। যবে পশি তুমি সমর-সাগরে খেদাইবে দূরে ঘোরির বানরে না পাব দেখিতে, দেখিবে ত পরে, তব বীরপনা! না রব কাছে ||৭সাধ প্রাণনাথ সাধ নিজ কাজ তুমি পৃথ্বীপতি মহা মহারাজ হানি শত্রুশিরে বাসবের বাজ ভারতের বীর আইস ফিরে। নহে যদি শম্ভু হয়েন নির্দ্দয় যদি হয় রণে পাঠানের জয় না আসিও ফিরে,- দেহ যেন বয় রণক্ষেত্রে ভাসি শত্রুরুধিরে ||৮কত সুখ প্রভু, ভুঞ্জিলে জীবনে! কি সাধ বা বাকি এ তিন ভূবনে? নয় গেল প্রাণ, ধর্ম্মের কারণে? চিরদিন রহে জীবন কার? যুগে যুগে নাথ ঘোষিবে সে যশ গৌরবে পূরিত হবে দিক্ দশ এ কান্ত শরীর এ নব বয়স স্বর্গ গিয়ে প্রভু পাবে আবার ||৯করিলাম পণ শুন হে রাজন নাশিয়া ঘোরীরে, জিতি এই রণ নাহি যতক্ষণ কর আগমণ, না খাব কিছু, না করিব পান। জয় জয় বীর জয় পৃথ্বীরাজ, লভ পূর্ণ জয় সমরেতে আজ যুগে যুগে প্রভু ঘোষিবে এ কাজ হর হর শম্ভো কর কল্যাণ ||১০হর হর হর! বম্ বম্ কালী! বম্ বম্ বলি রাজার দুলালি, করতালি দিল- দিল করতালি রাজরাজপতি ফুল্ল হৃদয়। ডাকো বামা জয় জয় পৃথ্বীরাজ জয় জয় জয় জয় পৃথ্বীরাজ- জয় জয় জয় জয় পৃথ্বীরাজ কর, দুর্গে, পৃথ্বীরাজের জয় ||১১প্রসারিয়া রাজ মহা ভূজদ্বয়ে, কমনীয় বপু, ধরিল হৃদয়ে, পড়ে অশ্রুধারা চারি গণ্ড বয়ে, চুম্বিল সুবাহু চন্দ্রবদনে। স্মরি ইষ্টদেবে বাহিরিল বীর, মহাগজপৃষ্ঠে শোভিল শরীর মহিষীর চক্ষে বহে ঘন নীর। যে জানে এতই জল নয়নে।১২লুটাইয়া পড়ি ধরণীর তলে তবু চন্দ্রাননী জয় জয় বলে জয় জয় বলে- নয়নের জলে জয় জয় কথা না পায় ঠাই। কবি বলে মাতা মিছে গাও জয় কাঁদ যতক্ষণ দেহ প্রাণ রয়, ও কান্না রহিবে এ ভারতময় আজিও আমরা কাঁদি সবাই ||৩। চিতারোহণ১কত দিন রাত পড়ে রহে রাণী না খাইল অন্ন না খাইল পানি কি হইল রণে কিছুই না জানি, মুখে বলে পৃথ্বীরাজের জয়। হেন কালে দূত আসিল দিল্লীতে রোদন উঠিল পল্লীতে পল্লীতে- কেহ নারে কারে ফুটিয়া বলিতে, হায় হায় শব্দ ফাটে হৃদয়!২মহারবে যেন সাগর উছলে উঠিল রোদন ভারতমণ্ডলে ভারতের রবি গেল অস্তাচলে প্রাণ ত গেলই, গেল যে মান। আসিছে যবন সামাল সামাল আর যোদ্ধা নাই সে ধরিবে ঢাল? পৃথ্বীরাজ বীরে হরিয়াছে কাল, এ ঘোর বিপদে কে করে ত্রাণ ||৩ভূমিশয্যা ত্যজি উঠে চন্দ্রানী, সখীজনে ডাকি বলিল তখনি, সম্মুখ সমরে বীরশিরোমণি গিয়াছে চলিয়া অনন্ত স্বর্গে। আমি যাইব সেই স্বর্গপুরে, বৈকুণ্ঠেতে গিয়া পূজিব প্রভুরে, পূরাও রে সাধ; দুঃখ যাক দূরে, সাজা মোর চিতা সজনীবর্গে ||৪যে বীর পড়িল সম্মুখ সমরে অনন্ত মহিমা তার চরাচরে সে নহে বিজিত; অপ্সরে কিন্নরে, গায়িতেছে তাহার অনন্ত জয়। বল সখি সবে জয় জয় বল, জয় জয় বলি চড়ি গিয়া চল জ্বলন্ত চিতার প্রচণ্ড অনল, বল জয় পৃথ্বীরাজের জয় ||৫চন্দনের কাষ্ঠ এলো রাশি রাশি কুসুমের হার যোগাইল দাসী রতন ভূষণ কর পরে হাসি বলে যাব আজি প্রভুর পাশে। আয় আয় সখি, চড়ি চিতানলে কি হবে রহিয়ে ভারতমণ্ডলে? আয় আয় সখি যাইব সকলে যথা প্রভু মোর বৈকুণ্ঠবাসে ||৬আরোহিলা চিতা কামিনীর দল চন্দনের কাষ্ঠে জ্বলিল অনল সুগন্ধে পূরিল গগনমণ্ডল- মধুর মধুর সংযুক্তা হাসে। বলে সবে বল পৃথ্বীরাজ জয় জয় জয় জয় পৃথ্বীরাজ জয় করি জয়ধ্বনি সঙ্গে সখীচয় চলি গেলা সতী বৈকুণ্ঠবাসে ||৭কবি বলে মাতা কি কাজ করিলে সন্তানে ফেলিয়া নিজে পলাইলে, এ চিতা অনল কেন বা জ্বালিলে, ভারতের চিতা, পাঠান ডরে। সেই চিতানল, দেখিল সকলে আর না নিবিল ভারতমণ্ডলে দহিল ভারত তেমনি অনলে শতাব্দী শতাব্দী শতাব্দী পরে ||
শতাব্দী রায়
মানবতাবাদী
ও মেয়ে তোর বয়স কত? : কি জানি গো,মা থাকলে বলে দিত। সেই যে বারে দাঙ্গা হল,শয়ে শয়ে লোক মরল, হিন্দুদের ঘর জ্বলল, মুসলমানের রক্ত ঝরল, তখন নাকি মা পোয়াতি,দাঙ্গা আমার জন্মতিথি। ও মেয়ে তোর বাবা কোথায়? : মা বলেছে,গরিব দের বাবা হারায় কেউ তো বলে বাপটা আমার হারামি ছিল। মায়ের জীবন নষ্ট করে,অন্য গাঁয়ে ঘর বাঁধল। মা বলত, শিবের দয়াই তোকে পেলাম, শিবকেই তাই বাপ ডাকলাম। ও মেয়ে তোর প্রেমিক আছে? ছেলেরা ঘোরে ধারে-কাছে? : প্রেমিক কি গো?মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে? স্বপ্ন দেখাই দিন দুপুরে? চুড়ি কাজল মেলাতে কেনায়, ঝোপের ধারে জামা খোলায়? এসব নন্দ কাকা করেছে দুবার প্রেমিক ওকেই বলব এবার। ও মেয়ে তোর পদবি কি? : বাপই নাকি দেয় শুনেছি পদবী থাকলে ভাত পাওয়া যায়? বাপের আদর কাঁদায় হাসায় ওটা কি বাজারে মেলে? কিনব তবে দু-দশে দিলে দামী হলে চাই না আমার থাক তবে ও বাপ-ঠাকুরদার ও মেয়ে তুই রূপসী? :লোকে বলে ডাগর গতর সর্বনাশী রুপ তো নয়, চোখের ধাঁধা। যৌবনেতে কুকুরী রাঁধা। পুরুষ চোখের ইশারা আসে, সুযোগ বুঝে বুকে পাছায় হাত ও ঘষে। রুপ কি শুধুই মাংসপেশী? তবে তো আমি খুব রূপসী। ও মেয়ে তোর ধর্ম কি রে? : মেয়েমানুষের ধর্ম কি গো? সব কিছু তো শরীর ঘিরে, সালমা বলে ধর্মই সমাজ বানায়, সন্ধেবেলা যখন দাঁড়াই কেউ তো বলে না,হিন্দু নাকি? সবাই বলে,কতই যাবি? বিছানা নাকি ধর্ম মেলায় শরীর যখন শরীর খেলায় তাই ভাবছি এবার থেকে ধর্ম বলব শরীর বা বিছানাকে।
শতাব্দী রায়
মানবতাবাদী
পাঁচ বছরের মেয়েটি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলো- বাবা, স্বাধীনতা মানে কি? বাবা বলেছিলো- স্বাধীনতা মানে, এই আমরা যা কিছু বলতে পারি, যা খুশি করতে পারি, কাউকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই, আমার ইচ্ছেতে আমি চলতে পারি। মেয়েটি বলেছিলো- তাহলে আজ থেকে আমিও স্বাধীনতা। বাবা বললো- না। প্রথমত স্বাধীনতা নয়, তুমি স্বাধীন। কিন্তু এখন নয়। তুমি এখন ছোট। স্বাধীনতা পেয়ে কি করবে? বড় হও। বড় হলে স্বাধীনতা আপনাআপনি আসবে। বড় হলেই তুমি স্বাধীন। মেয়েটি বাবাকে জিজ্ঞেস করলো- বাবা, মা কবে বড় হবে?
কাজী কাদের নেওয়াজ
নীতিমূলক
বাদশাহ আলমগীর- কুমারে তাঁহার পড়াইত এক মৌলভী দিল্লীর। একদা প্রভাতে গিয়া দেখেন বাদশাহ- শাহজাদা এক পাত্র হস্তে নিয়া ঢালিতেছে বারি গুরুর চরণে পুলকিত হৃদে আনত-নয়নে, শিক্ষক শুধু নিজ হাত দিয়া নিজেরি পায়ের ধুলি ধুয়ে মুছে সব করিছেন সাফ্ সঞ্চারি অঙ্গুলি। শিক্ষক মৌলভী ভাবিলেন আজি নিস্তার নাহি, যায় বুঝি তার সবি। দিল্লীপতির পুত্রের করে লইয়াছে পানি চরণের পরে, স্পর্ধার কাজ হেন অপরাধ কে করেছে কোন্ কালে! ভাবিতে ভাবিতে চিন্তার রেখা দেখা দিল তার ভালে। হঠাৎ কি ভাবি উঠি কহিলেন, আমি ভয় করি না’ক, যায় যাবে শির টুটি, শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার দিল্লীর পতি সে তো কোন্ ছার, ভয় করি না’ক, ধারি না’ক ধার, মনে আছে মোর বল, বাদশাহ্ শুধালে শাস্ত্রের কথা শুনাব অনর্গল। যায় যাবে প্রাণ তাহে, প্রাণের চেয়েও মান বড়, আমি বোঝাব শাহানশাহে।তার পরদিন প্রাতে বাদশাহর দূত শিক্ষকে ডেকে নিয়ে গেল কেল্লাতে। খাস কামরাতে যবে শিক্ষকে ডাকি বাদশা কহেন, ”শুনুন জনাব তবে, পুত্র আমার আপনার কাছে সৌজন্য কি কিছু শিখিয়াছে? বরং শিখেছে বেয়াদবি আর গুরুজনে অবহেলা, নহিলে সেদিন দেখিলাম যাহা স্বয়ং সকাল বেলা” শিক্ষক কন-”জাহপানা, আমি বুঝিতে পারিনি হায়, কি কথা বলিতে আজিকে আমায় ডেকেছেন নিরালায়?” বাদশাহ্ কহেন, ”সেদিন প্রভাতে দেখিলাম আমি দাঁড়ায়ে তফাতে নিজ হাতে যবে চরণ আপনি করেন প্রক্ষালন, পুত্র আমার জল ঢালি শুধু ভিজাইছে ও চরণ। নিজ হাতখানি আপনার পায়ে বুলাইয়া সযতনে ধুয়ে দিল না’ক কেন সে চরণ, স্মরি ব্যথা পাই মনে।”উচ্ছ্বাস ভরে শিক্ষকে আজি দাঁড়ায়ে সগৌরবে কুর্ণিশ করি বাদশাহে তবে কহেন উচ্চরবে- ”আজ হতে চির-উন্নত হল শিক্ষাগুরুর শির, সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ্ আলমগীর।”
কাজী কাদের নেওয়াজ
ভক্তিমূলক
মা কথাটি চোট্ট অতি কিন্তু জেনো ভাই, ইহার চেয়ে নাম যে মধুর তিন ভুবনে নাই। সত্য ন্যায়ের ধর্ম থাকুক মাথার ‘পরে আজি, অন্তরে মা থাকুন মম ঝরুক স্নেহরাজি। রোগ বিছানায় শুয়ে শুয়ে যন্ত্রণাতে মরি, সান্তনা পাই মায়ের মধু নামটি হৃদে স্মরি। বিদেশ গেলে ঐ মধু নাম জপ করি অন্তরে, মন যে কেমন করে আমার প্রাণ যে কেমন করে। মা যে আমার ঘুম পাড়াত দোলনা ঠেলে ঠেলে শীতল হত প্রাণটা, মায়ের হাতটা বুকে পেলে।
সুকুমার রায়
ছড়া
মাসি গো মাসি পাচ্ছে হাসি নিম গাছেতে হচ্ছে শিম্- হাতীর মাথায় ব্যাঙের ছাতা কাগের বাসায় বগের ডিম্ ।।   (অন্যান্য ছড়াসমূহ)
সুকুমার রায়
ছড়া
অতি খাসা মিহি সূতি ফিনফিনে জামা ধুতি, চরণে লপেটা জুতি জরিদার । এ হাতে সোনার ঘড়ি, ও হাতে বাঁকান ছড়ি, আতরের ছড়াছড়ি চারিধার । চক্‌চকে চুল ছাঁটা তায় তোফা টেরিকাটা- সোনার চশমা আঁটা নাসিকায় । ঠোঁট দুটি এঁকে বেঁকে ধোঁয়া ছাড়ে থেকে থেকে, হালচাল দেখে দেখে হাসি পায় ।ঘোষেদের ছোট মেয়ে পিক্‌ ফেলে পান খেয়ে, নিচু পানে নাহি চায় হায়রে । সেই পিক থ্যাপ ক'রে লেগেছে চাদর ভরে দেখে বাবু কেঁদে মরে যায়রে । ওদিকে ছ্যাকরাগাড়ি ছুটে চলে তাড়াতাড়ি ছিট্‌কিয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি ঘোলাজল । সহসা সে জল লাগে জামার পিছন বাগে, বাবু করে মহারাগে কোলাহল ।।
সুকুমার রায়
স্বদেশমূলক
পর্ব ১ছিল এ ভারতে এমন দিন মানুষের মন ছিল স্বাধীন ; সহজ উদার সরল প্রাণে বিস্ময়ে চাহিত জগত পানে। আকাশে তখন তারকা চলে, নদী যায় ভেসে, সাগর টলে, বাতাস ছুটিছে আপন কাজে, পৃথিবী সাজিছে নানান সাজে ; ফুলে ফলে ছয় ঋতুর খেলা, কত রূপ কত রঙের মেলা; মুখরিত বন পাখির গানে, অটঁল পাহাড় মগন ধ্যানে; নীলকাশে ঘন মেঘের ঘটাঁ, তাহে ইন্দ্রধনু বিজলী ছঁটা, তাহে বারিধারা পড়িছে ঝরি- দেখিত মানুষ নয়ন ভরি। কোথায় চলেছে কিসের টানে কোথা হতে আসে, কেহ না জানে। ভাবিত মানব দিবস-যামী, ইহারি মাঝারে জাগিয়া আমি, কিছু নাহি বুঝি কিছু নাহি জানি, দেখি দেখি আর অবাক মানি। কেন চলি ফিরি কিসের লাগি কখন ঘুমাই কখন জাগি, কত কান্না হাসি দুখে ও সুখে ক্ষুধা তৃষ্ণা কত বাজিছে বুকে। জন্ম লভি জীব জীবন ধরে, কোথায় মিলায় মরণ পরে? ভবিতে ভাবিতে আকুল প্রাণে ডুবিত মানব গভীর ধ্যানে। অকূল রহস্য তিমির তলে, জ্ঞানজ্যোতিময় প্রদীপ জ্বলে, সমাহিত চিতে যতন করি অচঞ্চল শিখা সে আলো ধরি দিব্য জ্ঞানময় নয়ন লভি, হেরিল নতুন জগত ছবি। অনাদি নিয়মে অনাদি স্রোতে ভাসিয়া চলেছে অকুল পথে প্রতি ধুলিকণা নিখিল টানে এক হতে ধায় একেরি পানে, চলেছে একেরি শাসন মানি, লোকে লোকান্তরে একেরি বাণী এক সে অমৃতে হয়েছে হারা নিখিল জীবন-মরণ ধারা। সে অমৃতজ্যোতি আকাশ ঘেরি, অন্তরে বাহিরে অমৃত হেরি। যাঁহা হতে জীব জনম লভে, যাহা হতে ধরে জীবন সবে, যাহার মাঝারে মরণ পরে ফিরি পুন সবে প্রবেশ করে, তাহার জানিবে যতন ধরি। তিনি ব্রহ্ম তারে প্রনাম করি। আনন্দেতে জীব জনম লভে আনন্দে জীবিত রয়েছে সবে; আনন্দে বিরাম লভিয়া প্রাণ আনন্দের মাঝে করে প্রয়াণ। শুন বিশ্বলোক শুনহ বাণী অমৃতের পুত্র সকল প্রাণী, দিব্যধামিবাসী শুনহ সবে- জেনেছি তাহারে, যিনি এ ভবে মহান পুরুষ নিখিল গতি, তমসার পরে পরম জ্যোতি : তেজোময় রূপে হেরিয়া তাঁরে স্তব্ধ হয় মন, বচন হারে। বামে ও দখিনে উপরে নীচে, ভিতরে বাহিরে সমুখে পিছে, কিবা জলেস্থলে আকাশ পরে আধারে আলোকে চেতনে জড়ে: আমার মাঝারে আমারে ঘেরি এক ব্রহ্মময় প্রকাশ হেরি। সে আলোকে চাহি আপন পানে আপনারে মন স্বরূপ জানে। আমি আমি করি দিবস- যামী, না জানি কেমন কোথা সে আমি অজর অমর অরূপ রূপ নহি আমি এই জড়ের স্তুপ দেহ নহে মোর চির-নিবাস দেহের বিনাশে নাহি বিনাশ। বিশ্ব আত্মা মাঝে হয়ে মগন আপন স্বরূপ হেরিলে মন না থাকে সন্দেহ না থাকে ভয় শোক তাপ মোহে নিমেষে লয়, জীবনে মরণে না রহে ছেদ, ইহা পরলোকে না রহে ভেদ। ব্রহ্মানন্দময় পরম ধাম, হেথা আসি সবে লভে বিরাম; পরম সম্পদ পরম গতি, লভ তাঁরে জীব যতনে অতি। পর্ব ২ কালচক্রে হায় এমন দেশে ঘোর দুঃখদিন আসিল শেষে। দশদিকে হতে আঁধার আসি ভারত আকাশ ফেলিল গ্রাসি। কোথা সে প্রাচীন জ্ঞানের জ্যোতি, সত্য অন্বেষণে গভীর মতি ; কোথা ব্রহ্মজ্ঞান সাধন ধন, কোথা ঋষিগণ ধ্যানে মগন; কোথা ব্রহ্মচারী তাপস যত, কোথা সে ব্রাহ্মণ সাধনা রত? একে একে সবে মিলাল কোথা, আর নাহি শুনি প্রাচীন কথা। মহামূল্য নিধি ঠেলিয়া পায় হেলায় মানুষ হারাল তায়। আপন স্বরূপ ভুলিয়া মন ক্ষুদ্রের সাধনে হল মগন। ক্ষুদ্র চিন্তা মাঝে নিয়ত মজি, ক্ষুদ্র স্বার্থ-সুখ জীবনে ভাজি; ক্ষুদ্র তৃপ্তি লয়ে মূঢ়ের মত ক্ষুদ্রের সেবায় হইল রত। রচি নব নব বিধি-বিধান নিগড়ে বাঁধিল মানব প্রাণ; সহস্র নিয়ম নিষেধ শত ; তাহে বদ্ধ নর জড়ের মত ; লিখি দাসখত ললাটে তার রুদ্ধ করি দিল মনের দ্বার। জ্বলন্ত যাঁহার প্রকাশ ভাবে- হায়রে তাঁহারে ভুলিল সবে; কল্পনার পিছে ধাইল মন, কল্পিত দেবতা হল সৃজন, কল্পিত রূপের মূরতি গড়ি, মিথ্যা পূজাচার রচন করি, ব্যাখ্যা করি তার মহিমা শত, মিথ্যা শাস্ত্রবাণী রচিল কত। তাহে তৃপ্ত হয়ে অবোধ নরে রহে উদাসীন মোহের ভরে। না জাগে জিজ্ঞাসা অলস মনে, দেখিয়া না দেখে পরম ধনে। ব্রাহ্মণেরে লোকে দেবতা মানি নির্বিচারে শুনে তাহারি বাণী। পিতৃপুরুষের প্রসাদ বরে বসি উচ্চাসনে গরব ভরে পূজা-উপচার নিয়ত লভি ভুলিল ব্রাহ্মণ নিজ পদবী। কিসে নিত্যকালে এ ভারতভাবে আপন শাসন অঁটুট রবে- এই চিন্তা সদা করি বিচার হল স্বার্থপর হৃদয় তার। ভেদবুদ্ধিময় মানব মন নব নব ভেদ করে সৃজন। জাতিরে ভাঙিয়া শতধা করে, তাহার উপরে সমাজ গড়ে; নানা বর্ণ নানা শ্রেণীবিচার , নানা কুটবিধি হল প্রচার। ভেদ বুদ্ধি কত জীবন মাঝে অশনে বসেন সকল কাজে, ধর্ম অধিকারে বিচার ভেদ মানুষে মানুষে করে প্রভেদ। ভেদ জনে জনে, নারী ও নরে, জাতিতে জাতিতে বিচার ঘরে। মিথ্যা অহংকারে মোহের বশে জাতির একতা বাঁধন খসে: হয়ে আত্মঘাতী ভারতভবে আপন কল্যণ ভুলিল সবে। পর্ব ৩এখনও গভীর তমসা রাতি, ভারত ভবনে নিভিছে বাতি - মানুষ না দেখি ভারতভূমে, সবাই মগন গভীর ঘুমে। কত জাতি আজ হেলার ভরে হেথায় আসিয়া বসতি করে। ভারতের বুকে নিশান গাথি বসেছে সবলে আসন পাতি। নিজ ধনমান নিজ বিভব বিদেশীর হাতে সঁপিয়া সব, ভারতের মুখে না ফুটে বাণী, মৌন রহে দেশ শরম মানি। - হেনকালে শুন ভেদি আঁধার সুগম্ভীর বানী উঠিল কার- “ভাব সেই এক ভাবহ তারে, জলে স্থলে শুন্যে হেরিছ যারে নিয়ত যাহার স্বরূপ ধ্যানে দিব্য জ্ঞান জাগে মানব প্রাণে। ছাড় তুচ্ছ পূজা জড় সাধন, মিথ্যা দেবসেবা ছাড়া এখন, বেদান্তের বাণী স্মরণ কর, ব্রহ্মজ্ঞান-শিখা হৃদয়ে ধর সত্য মিথ্যা দেখে করি বিচার খুলি দাও যত মনের দ্বার । মানুষের মত স্বাধীন প্রাণ নির্ভয়ে তাকাও জগত পানে- দিকে দিকে দেখ ঘুচিছে রাতি, দিকে দিকে জাগে কত না জাতি; দিকে দিকে লোক সাধনারত জ্ঞানের ভান্ডার খুলেছে কত। নাহি কি তোমার জ্ঞানের খনি ? বেদান্ত রতন মুকুটমণি? অসারে মজে কি ভুলেছ তুমি- ধর্মে গরীয়ান ভারতভুমি?” -শুনি মৃতদেশ পরান পায়, বিস্ময়ে মানুষ ফিরিয়া চায়। দেখে দিব্যরূপ পুরুষ বরে কান্তি তেজোময় নয়ন হরে, গবল শরীর সুঠাম অতি, ললাট প্রসর, নয়নে জ্যোতি, গম্ভীর স্বভাব,বচন ধীর, সত্যের সংগ্রামে অজেয় বীর; অতুল প্রখর প্রতিভা ধরে নানা শাস্ত্র ভাষা বিচার করে। রামমোহনের১ জীবন স্মরি, কৃতজ্ঞতা ভরে প্রনাম করি। দেশের দুর্গতি সকলখানে হেরিয়া বাজিল রাজার প্রাণে । কত অসহায় অবোধ নারী সতীত্বের নামে সকল ছাড়ি, কেহ স্ব-ইচছায়, কেহবা ভয়ে, শাসনে তাড়নে পিষিত হয়ে, পতির চিতায় পুড়িয়া মরে- শুনি কাদে প্রাণ তাদের তরে । নারীদুঃখ নাশ করিল পণ, ঘুচিল নারীর সহমরণ । নিষ্কাম করম- যোগীর মত দেশের কল্যাণ সাধনে রত, নানা শাস্ত্রবাণী করে চয়ন, দেশ দেশান্তের ঋষিবচন; পশ্চিমের নব জ্ঞানের বাণী দেশের সমুখে ধরিল আনি। কিরূপেতে পুন এ ভারতভবে ব্রহ্মজ্ঞান কথা প্রচার হবে , নিয়ত যতন তাহারি তরে, কত শ্রম কত প্রয়াস করে ; তর্ক আলোচনা কত বিচার কত গ্রন্থ রচি’ করে প্রচার; -ক্রমে বিনাশিতে জড় ধরম ‘ব্রহ্ম সমাজে’র হল জনম । শুনে দেশবাসি নুতন কথা, মূরতিবিহীন পুজার প্রথা উপাসনা -গৃহ দেখে নতুন- যেথায় স্বদেশী বিদেশী জন শুদ্র দ্বিজ আদি মিলিয়া সবে নির্বিচারে সদা আসন লাভে। মহাপুরুষের বিপুল শ্রমে দেশে যুগান্তর আসিল ক্রমে। স্বদেশের তার আকুল প্রাণ প্রবাসেতে রাজা করে প্রয়ান; সেথায় সুদুর বিলাতে হায় অকালেতে রাজা ত্যজিল কায়। অসমাপ্ত কাজ রহিল পড়ে, ফিরে যায় লোকে নিরাশা ভরে; একে একে সব যেতেছে চলে- ভাসে রামচন্দ্র২ নয়নজলে। রাজার জীবন নিয়ত স্মরি’ উপাসনা গৃহে রহে সে পড়ি, নিয়ম ধরিয়া পূজার কালে নিষ্ঠাভাবে সেথা প্রদীপ জ্বালে। একা বসি ভাবে রাজার কাজ এমন দুর্দিনে কে লবে আজ। পর্ব ৪ধনী যুবা এক শ্মশান ঘাটে একা বসি তার রজনী কাটে। অদূরে অন্তিম শয়নোপরি দিদিমা তাহার আছেন পড়ি, সম্মুখে পূর্ণিমা গগনতলে পিছনে শ্মশানে আগুন জ্বলে, তাহারি মাঝারে নদীর তীরে হরিনাম ধ্বনি উঠিছে ধীরে। একাকী যুবক বসিয়া কুলে সহসা কি ভাবি আপনা ভুলে। প্রসন্ন আকাশ চাঁদিম রাতি ধরিল অপূর্ব নতুন ভাতি, তুচ্ছ বোধ হল ধন – বিভব বিলাস বাসনা অসার সব, অজানা কি যেন সহসা স্মরি পলকে পরান উঠিল ভরি। আর কি সে মন বিরাম মানে? গভীর পিপাসা জাগিল প্রাণে। কোথা শান্তি পাবে ব্যাকুল তৃষা শুধায় সবারে না পায় দিশা। -সহসা একদা তাহার ঘরে ছিন্নপত্র এক উড়িয়া পড়ে ; কি যেন বচন লিখিত তায় অর্থ তার যুবা ভাবি না পায়। বিদ্যাবাগীশের নিকটে তবে যুবা সে বাণীর মরম লভে- “যাহা কিছু এই জগততলে অনিত্যের স্রোতে ভাসিয়া চলে রহ্মে আচ্ছাদিত জানিবে তায়-” শুনিয়া যুবক প্রবোধ পায়। শুনি মহাবাণী চমক লাগে, আরো জানিব রে বাসনা জাগে ব্রহ্মজ্ঞান লাভে পিপাসু মন গভীর সাধনে হল মগন: যত ডোবে আরো ডুবিতে চায় ডুবি নব নব রতন পায়া। হেনকালে হল অশনিপাত যুবকের পিতা দ্বারকানাথ, অতুল সম্পদ ধন বিভব ঋণের পাথারে ডুবায়ে সব কিছু না বুঝিতে জানিতে কেহ অকালে সহসা ত্যজিল দেহ। আত্মীয় -স্বজন কহিল সবে, “যে উপায়ে হোক বাঁচিতে হবে- কর অস্বীকার ঋণের দায় নহিলে তোমার সকলি যায়।” নাহি টলে তায় যুবার মন, পিতৃঋণ শোধ করিল পণ, হয়ে সর্বত্যাগী ফকির দীন ছাড়ি দিল সব শোধিতে ঋণ। উত্তমর্ণজনে অবাক মানি কহে শ্রদ্ধাভারে অভয় বাণী, “বিষয় বিভব থাকুক তব, মোরা তাহা হতে কিছু না লব। সাধুতা তোমার তুলনাহীন; সাধ্যমত তুমি শোধিও ঋণ।” বরষের পর বরষ যায়, যুবক এখন প্রবীণ -প্রায়। সংসারে বাসনা -বিগত মন, ঋষি কল্পরুপ ধ্যানে মগ্ন, ব্রহ্ম-ধ্যান -জ্ঞানে পুরিত প্রান , ব্রহ্মানন্দ রস করিছে পান; বচনেতে যেন অমৃত ঝরে- নমি নমি তাঁরে ভকতি ভরে। ব্রাহ্মসমাজে আসন হতে দীপ্ত অগ্নিয় বচন স্রোতে ব্রহ্মজ্ঞান ধারা বহিয়া যায়, কত শত লোকে শুনিতে ধায়। “ব্রহ্মে কর প্রীতি নিয়ত সবে, প্রিয়কার্য় তাঁর সাধহ ভবে। হের তারে নিজ হৃদয় মাঝে, সেথা ব্রজ্যেতি নিয়ত রাজে। জ্ঞান সমুজ্জল বিমল প্রাণে , যে জানে তাহারে ধ্রুব সে জানে । জানিবার পথ নাহিক আর, নহে শাসত্র বাণী প্রমান তাঁর । বহু তর্ক বহু বিচার বলে বহু জপ তপ সাধন ফলে বহু তত্ত্বকথা আলোড়ি চিতে নাহি পায় সেই বচনাতীতে।” ব্রহ্ম সমাজের অসাড় প্রাণে , মহর্ষির৩ বানী চেতনা আনে। দলে দলে লোক সেথায় ছোটে ঊৎসাহের স্রোতে আসিয়া জোটে। মত্ত অনুরাগে কেশব৪ ধায়, প্রতিভার জ্যোতি নয়নে ভায়; আকুল আগ্রহে পরান খুলি ঝাঁপ দিল স্রোতে আপনা ভুলি। হেরি মহর্ষির পুলক বাড়ে “ব্রহ্মনন্দ” নাম দিলেন তারে । লভি নব প্রানে সমাজ কায় নব নব ভাবে বিকাশ পায় ; ধর্ম গ্রন্থ নব,নব সাধন, ব্রহ্ম উপাসনা বিধি নূতন ধর্মপ্রান কত নারী ও নরে তাহে নিমগন পুলক ভরে । পর্ব ৫সমাজে সুদিন এল আবার, ক্রমে প্রসারিল জীবন তার। কেশব আপন প্রতিভা বলে যতনে গঠিল যুবকদলে। নগরে নগরে হল প্রচার- "ধর্ম রাজ্যে নাহি জাতিবিচার; নাহি ভেদ হেথা নারী ও নরে, ভক্তি আছে যার সে যায় ত'রে। জাতিবর্ণ- ভেদ কুরীতি যত ভাঙি দাও চিরদিনের মত। দেশ দেশান্তরে ধাঊক মন, সর্বধর্মবাণী কর চয়ন; ধর্মে ধর্মে নাহি বিরোধ রবে, মহা সমম্বয় গঠিত হবে।" পশিল সে বাণী দেশের প্রাণে, মুগ্ধ নরনারী অবাক মানে । নগরে নগরে তুফান উঠে, ঘরে ঘরে কত বাঁধন টুটে; ব্রহ্ম নামে সবে ছুটিয়া চলে, প্রাণ হতে প্রাণে আগুন জ্বলে। আসিল গোঁসাই৫ ব্যাকুল হয়ে প্রেমে ভরপূর ভকতি লয়ে। আসিল প্রতাপ৬ স্বভাব ধীর, গম্ভীর বচন জ্ঞানে গভীর। স্বল্পভাষী সাধু অঘোরনাথ৭ যোগমগ্ন মন দিবসরাত। গৌরগোবিন্দের৮ সাধক প্রাণ হিন্দুশাস্ত্রে তাঁর অতুল জ্ঞান। কান্তিচন্দ্র৯ সদা সেবায় রত সেবাধর্ম তাঁর জীবন-ব্রত। ত্রৈলোক্যনাথের১০ সরস গান নব নব ভাবে মাতায় প্রাণ। আরো কত সাধু ধরমমতি বঙ্গচন্দ্র১১ আদি প্রচার-ব্রতী একসাথে মিলি প্রেমের ভরে প্রেমপরিবার গঠন করে। কাল কিবা খাবে কেহ না জানে, আকুল উৎসাহ সবার প্রাণে । নূতন মন্দির নব সমাজ নব ভাবে কত নূতন কাজ। দিনে দিনে নব প্রেরণা পায়, উৎসাহের স্রোত বাড়িয়া যায়। সমাজ-চালনা বিধি-বিচার কেশবের হাতে সকল ভার; কেশবপ্রেরণা সবার মূলে তাঁর নামে সবে আপনা ভুলে। ধন্য ব্রহ্মানন্দ যাঁহার বাণী শিরে ধরে লোকে প্রমাণ মানি। যাঁহার সাধনা আজিও হেরি রয়েছে সমাজ জীবন ঘেরি ; যাঁহার মূরতি স্মরণ করি, যাঁহার জীবন হৃদয়ে ধরি, শত শত লোক প্রেরণা পায়- আজি ভক্তিভরে প্রণমি তাঁয়। আবার বহিল নূতন ধারা, সমাজের প্রাণে বাজিল সাড়া; ভাসি বহুজনে সে নব স্রোতে বাহির হাইল নূতন পথে। মিলি অনুরাগে যতন ভরে এই "সাধারণ" সমাজ গড়ে। ওদিকে কেশব নূতন বলে বাঁধিল আবার আপন দলে। নব ভাবে "নববিধান" গড়ি, নূতন সংহিতা রচনা করি, ভগ্নদেহ লয়ে অবশপ্রায়, খাটিতে খাটিতে ত্যজিল কায়। পর্ব ৬ধরি নব পথ নূতন ধারা নবীন প্রেরণে আসিল যারা, আজি তাঁহাদের চরণ ধরি ভক্তিভরে সবে স্মরণ করি। শাস্ত্রী শবনাথ সকল ফেলি বিষয় বাসনা চরণে ঠেলি বহু নির্যাতন বহিয়া শিরে, অনুরাগে ভাসি নয়ন নীরে, সর্বত্যাগী হয়ে ব্যাকুল প্রাণে ছুটে আসে ওই কিসের টানে, দেখ ওই চলে পাগলমত ভক্তশ্রেষ্ট বীর বিনয়নত, বিজয় গোঁসাই সরল প্রাণ- হেরি আজি তাঁই প্রেম বয়ান। সাধু রামতনু১২ জ্ঞানে প্রবীণ, শিশুর মতন চির নবীন। শিবচন্দ্র দেব সুধীর মন, কর্মনিষ্ঠাময় সাধু জীবন । নগেন্দ্রনাথের১৩ যুকতি বানে কূট তর্ক যত নিমেষে হানে । আনন্দমোহন১৪ মুরতি যার। উমেশচন্দ্রের১৫ জীবণ মন , নীরব সাধনে সদা মগন। দুর্গামোহনের১৬ জীবনগত সমাজের সেবা দানের ব্রত। দ্বারকানাথের১৭ স্মরন হয় ন্যায়ধর্মে বীর অকুতোভয় । পূর্ব বঙ্গে হোথা সাধক কত নবধর্ম বানী প্রচারে কত। সংসারে নিলিপ্ত ভাবুক প্রাণ স্বার্থক প্রচারে কালীনারা'ণ১৮ কত নাম কব কত যে জ্ঞানী কত ভক্ত সাধু যোগী ও ধ্যানী; কত মধুময় প্রেমিক মন আড়ম্বহীন সেবকজন ; আসিল হেথায় আকাশ ভরে সবার যতনে সমাজ গড়ে। এই যে মন্দির হেরিছ যার ইটকাঠ ময় স্থুল আকার ; ইহারি মাঝারে কত যেস্মৃতি, কত আকিঞ্চন সমাজ প্রীতি, ব্যাকুল ভাবনা দিবস রাত বিনিদ্র সাধনে জীবন পাত । বহু কর্মময় এই সমাজ সে সব কাহিনী না কব আজ, আজিকে কেবল স্মরণে আনি ব্রাহ্মসমাজের মহান বাণী । যে বাণী শুনুনু রাজার মুখে, মহর্ষি যাহারে ধরিল বুকে, কেশব যে বাণী প্রচার কারে- স্মরি আজ তাহা ভকতি ভরে। রক্তাক্ষরে লিখা যে বাণী রটে এই সমাজের জীবনপটে- “স্বাধীন মানবহৃদয়তলে বিবেকের শিখা নিয়ত জ্বলে। গুরুর আদেশ সাধুর বাণী ইহার উপরে কারে না মানি?” স্বাধীন মানে এই সমাজ মুক্ত ধর্মলাভে ইহার কাজ। হেথায় সকল বিরোধ গুচি রবে নানা মত নানান্ রুচি কাহারো রচিত বিধি বিধান রুধিবে না হেথা কাহারো প্রাণ। প্রতি জীবনের বিবেক ভাতি সবার জীবনে জ্বলিবে বাতি। নর নারী হেথা মিলিয়া সবে সম অধিকারে আসন লাভে। প্রেমেতে বিশাল জ্ঞানে গভীর চরিত্রে সংযত করমে বীর ; ঈশ্বরে ভক্তি মানবে প্রীতি, হেথা মানুষের জীবন নীতি। ফুরাল কি সব হেথায় আসি ? আসিবে না প্রেম জড়তা নাশি? জাগিবে না প্রাণ ব্যাকুল হয়ে, নব নব বাণী জীবনে লয়ে ? জ্বলিবে না নব সাধন শিখা ? নব ইতিহাস হবে না লিখা ? চিররুদ্ধ রবে পুজার দ্বার ? আসিবে না নব পুজারী আর ? কোথাও আশার আলো কি নাহি ? শুধাই সবার বদন চাহি।
সুকুমার রায়
ছড়া
রামধনুকের আবছায়াতে, তাল বেতালে খেয়াল সুরে, তান ধরেছি কন্ঠ পুরে। হেথায় নিষেধ নাইরে দাদা, নাইরে বাঁধন নাইরে বাধা। হেথায় রঙিন্ আকাশতলে স্বপন দোলা হাওয়ায় দোলে, সুরের নেশায় ঝরনা ছোটে, আকাশ কুসুম আপনি ফোটে, রঙিয়ে আকাশ, রঙিয়ে মন চমক জাগে ক্ষণে ক্ষণ। আজকে দাদা যাবার আগে বল্‌ব যা মোর চিত্তে লাগে- নাই বা তাহার অর্থ হোক্না ইবা বুঝুক বেবাক্ লোক। আপনাকে আজ আপন হতে ভাসিয়ে দিলাম খেয়াল স্রোতে। ছুট‌লে কথা থামায় কে? আজকে ঠেকায় আমায় কে? আজকে আমার মনের মাঝে ধাঁই ধপাধপ তব্‌লা বাজে- রাম-খটাখট ঘ্যাচাং ঘ্যাঁচ্ কথায় কাটে কথায় প্যাঁচ্ । আলোয় ঢাকা অন্ধকার, ঘন্টা বাজে গন্ধে তার। গোপন প্রাণে স্বপন দূত, মঞ্চে নাচেন পঞ্চ ভুত! হ্যাংলা হাতী চ্যাং দোলা, শূন্যে তাদের ঠ্যাং তোলা! মক্ষিরাণী পক্ষীরাজ- দস্যি ছেলে লক্ষ্মী আজ! আদিম কালের চাঁদিম হিম তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম। ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর, গানের পালা সাঙ্গ মোর।
সুকুমার রায়
ছড়া
নাচ্ছি মোরা মনের সাধে গাচ্ছি তেড়ে গান হুলো মেনী যে যার গলার কালোয়াতীর তান। নাচ্ছি দেখে চাঁদা মামা হাস্‌ছে ভরে গাল চোখটি ঠেরে ঠাট্টা করে দেখ্‌না বুড়োর চাল।
সুকুমার রায়
ভক্তিমূলক
নমি সত্য সনাতন নিত্য ধনে, নমি ভক্তিভরে নমি কায়েমনে। নমি বিশ্বচরাচর লোকপতে নমি সর্বজনাশ্রয় সর্বগতে। নমি সৃষ্টি-বিধারণ শক্তিধরে, নমি প্রাণপ্রবাহিত জীব জড়ে। তব জ্যোতিবিভাসিত বিশ্বপটে মহাশুন্যতলে তব নাম রটে। কত সিন্ধুতরঙ্গিত ছন্দ ভরে কত স্তব্ধ হিমাচল ধ্যান করে। কত সৌরভ সঞ্চিত পুষ্পদলে কত সূর্য বিলুন্ঠিত পাদতলে। কত বন্দনঝঙ্কৃত ভক্তচিতে নমি বিশ্ব বরাভয় মৃত্যুজিতে।  (অন্যান্য ছড়াসমূহ)
সুকুমার রায়
ছড়া
কল করেছেন আজবরকম চণ্ডীদাসের খুড়ো— সবাই শুনে সাবাস বলে পাড়ার ছেলে বুড়ো। খুড়োর যখন অল্প বয়স— বছর খানেক হবে— উঠল কেঁদে ‘গুংগা’ বলে ভীষন অট্টরবে। আর তো সবাই ‘মামা’ ‘গাগা’ আবোল তাবোল বকে, খুড়োর মুখে ‘গুংগা’ শুনে চম্‌কে গেল লোকে। বল্‌লে সবাই, “এই ছেলেটা বাঁচলে পরে তবে, বুদ্ধি জোরে এ সংসারে একটা কিছু হবে।” সেই খুড়ো আজ কল করেছেন আপন বুদ্ধি বলে, পাঁচ ঘণ্টার রাস্তা যাবে দেড় ঘণ্টায় চলে। দেখে এলাম কলটি অতি সহজ এবং সোজা, ঘণ্টা পাঁচেক ঘাঁটলে পরে আপনি যাবে বোঝা। বলব কি আর কলের ফিকির, বলতে না পাই ভাষা, ঘাড়ের সঙ্গে যন্ত্র জুড়ে এক্কেবারে খাসা। সামনে তাহার খাদ্য ঝোলে যার যেরকম রুচি— মণ্ডা মিঠাই চপ্‌ কাট্‌লেট্‌ খাজা কিংবা লুচি। মন বলে তায় ‘খাব খাব’, মুখ চলে তায় খেতে, মুখের সঙ্গে খাবার ছোটে পাল্লা দিয়ে মেতে। এমনি করে লোভের টানে খাবার পানে চেয়ে, উত্সাহেতে হুঁস্ রবে না চলবে কেবল ধেয়ে। হেসে খেলে দু‐দশ যোজন চলবে বিনা ক্লেশে, খাবার গন্ধে পাগল হয়ে জিভের জলে ভেসে। সবাই বলে সমস্বরে ছেলে জোয়ান বুড়ো, অতুল কীর্তি রাখল ভবে চণ্ডীদাসের খুড়ো।
সুকুমার রায়
ছড়া
এক যে ছিল রাজা- (থুড়ি, রাজা নয় সে ডাইনি বুড়ি) ! তার যে ছিল ময়ূর- (না না, ময়ূর কিসের ? ছাগল ছানা) । উঠানে তার থাক্‌ত পোঁতা- -(বাড়িই নেই, তার উঠান কোথা) ? শুনেছি তার পিশতুতো ভাই- -(ভাই নয়ত, মামা-গোঁসাই ) । বল্‌ত সে তার শিষ্যটিরে- -(জন্ম-বোবা বলবে কিরে) । যা হোক, তারা তিনটি প্রানী- -(পাঁচটি তারা, সবাই জানি !) থও না বাপু খ্যাঁচাখেচি -(আচ্ছা বল, চুপ করেছি) ।। তারপরে যেই সন্ধ্যাবেলা, যেম্নি না তার ওষুধ গেলা, অম্‌নি তেড়ে জটায় ধরা- -(কোথায় জটা ? টাক যে ভরা !) হোক্‌ না টেকো তোর তাতে কি ? গোমরামুখো মুখ্যু ঢেঁকি ! ধরব ঠেসে টুটির পরে পিট্‌ব তোমার মুণ্ডু ধরে । এখন বাপু পালাও কোথা ? গল্প বলা সহজ কথা ?
সুকুমার রায়
হাস্যরসাত্মক
পড়তে বসে মুখের পরে কাগজ খানি থুয়ে রমেশ ভায়া ঘুমোয় পড়ে আরাম ক’রে শুয়ে। শুনছ নাকি ঘড়র্ ঘড়র্ নাক ডাকার ধুম? সখ যে বড় বেজায় দেখি- দিনের বেলায় ঘুম! বাতাস পোরা এই যে থলি দেখ্‌ছ আমার হাতে, দুড়ম করে পিট্‌লে পরে শব্দ হবে তাতে। রমেশ ভায়া আঁতকে উঠে পড়বে কুপোকাৎ লাগাও তবে -ধুম ধাড়াক্কা! ক্যাবাৎ! ক্যাবাৎ! ও বাবারে! এ কেরে ভাই! মারবে নাকি চাটি? আমি ভাবছি রমেশ বুঝি! সব করেছে মাটি! আবার দেখ চোখ পাকিয়ে আস্‌ছে আমায় তেড়ে, আর কেন ভাই? দৌড়ে পালাই, প্রানের আশা ছেড়ে!
সুকুমার রায়
প্রকৃতিমূলক
রৌদ্র ঝলে আকাশতলে অগ্নি জ্বলে জলেস্থলে। ফেল্‌ছে আকাশ তপ্ত নিশাস ছুট্‌ছে বাতাস ঝলসিয়ে ঘাস, ফুলের বিতান শুক্‌নো শ্মশান যায় বুঝি প্রাণ হায় ভগবান। দারুণ তৃষায় ফির্‌ছে সবায় জল নাহি পায় হায় কি উপায়, তাপের চোটে কথা না ফোটে হাঁপিয়ে ওঠে ঘর্ম ছোটে। বৈশাখী ঝড় বাধায় রগড় করে ধড়্‌ফড়্‌ ধরার পাঁজর, দশ দিক হয় ঘোর ধূলিময় জাগে মহাভয় হেরি সে প্রলয়, করি তোলপাড় বাগান বাদাড় ওঠে বারবার ঘন হুঙ্কার, শুনি নিয়তই থাকি থাকি ওই হাঁকে হৈ হৈ মাভৈ মাভৈঃ।
সুকুমার রায়
ছড়া
ছুটি! ছুটি! ছুটি! মনের খুশি রয়না মনে হেসেই লুটোপুটি। ঘুচল এবার পড়ার তাড়া অঙ্ক কাটাকুটি দেখ্‌ব না আর পন্ডিতের ঐ রক্ত আঁখি দুটি। আর যাব না স্কুলের পানে নিত্য গুটি গুটি এখন থেকে কেবল খেলা কেবল ছুটোছুটি। পাড়ার লোকের ঘুম ছুটিয়ে আয়রে সবাই জুটি গ্রীষ্মকালের দুপুর রোদে গাছের ডালে উঠি আয়রে সবাই হল্লা ক'রে হরেক মজা লুটি একদিন নয় দুই দিন নয় দুই দুই মাস ছুটি।
সুকুমার রায়
ছড়া
আরে আরে, ওকি কর প্যালারাম বিশ্বাস? ফোঁস্ ফোঁস্ অত জোরে ফেলো নাকো নিশ্বাস। জানোনা কি সে বছর ওপাড়ার ভূতোনাথ, নিশ্বাস নিতে গিয়ে হয়েছিল কুপোকাৎ? হাঁপ ছাড় হ্যাঁস্‌ফ্যাঁস্ ও রকম হাঁ করে- মুখে যদি ঢুকে বসে পোকা মাছি মাকড়ে? বিপিনের খুড়ো হয় বুড়ো সেই হল' রায়, মাছি খেয়ে পাঁচ মাস ভুগেছিল কলেরায়। তাই বলি- সাবধান! ক'রোনাকো ধুপ‌্ধাপ্, টিপি টিপি পায় পায় চলে যাও চুপ্ চাপ্। চেয়োনাকো আগে পিছে, যেয়োনাকো ডাইনে সাবধানে বাঁচে লোকে,- এই লেখে আইনে। পড়েছ ত কথা মালা? কে যেন সে কি করে পথে যেতে পড়ে গেল পাতকো'র ভিতরে ? ভালো কথা- আর যেন সকালে কি দুপুরে , নেয়োনাকো কোনো দিন ঘোষেদের পুকুরে, এরকম মোটা দেহে কি যে হবে কোন্ দিন, কথাটাকে ভেবে দেখ কি রকম সঙ্গিন! চটো কেন? হয় নয় কে বা জানে পষ্ট, যদি কিছু হ'য়ে পড়ে পাবে শেষে কষ্ট। মিছিমিছি ঘ্যান্ ঘ্যান্ কেন কর তক্ক? শিখেছ জ্যাঠামো খালি, ইঁচরেতে পক্ক , মানবে না কোন কথা চলা ফেরা আহারে , একদিন টের পাবে ঠেলা কয় কাহারে । রমেশের মেঝ মামা সেও ছিল সেয়না, যত বলি ভালো কথা কানে কিছু নেয়না শেষকালে একদিন চান্নির বাজারে প'ড়ে গেল গাড়ি চাপা রাস্তার মাঝারে!
সুকুমার রায়
হাস্যরসাত্মক
গিরিধি আরামপুরী, দেহ মন চিৎপাত, খেয়ে শুয়ে হু হু করে কেটে যায় দিনরাত; হৈ চৈ হাঙ্গামা হুড়োতাড়া হেথা নাই; মাস বার তারিখের কোন কিছু ল্যাঠা নেই; খিদে পেলে তেড়ে খাও, ঘুম পেলে ঘুমিও- মোট কথা, কি আরাম, বুঝলে না তুমিও ! ভুলেই গেছিনু কোথা এই ধরা মাঝেতে আছে যে শহর এক কলকাতা নামেতে- হেন কালে চেয়ে দেখি চিঠি এক সমুখে, চায়েতে অমুক দিন ভোজ দেয় অমুকে । 'কোথায়? কোথায়?' বলে মন ওঠে লাফিয়ে তাড়াতাড়ি চিঠিখানা তেড়ে ধরি চাপিয়ে, ঠিকানাটা চেয়ে দেখি নীচু পানে ওধারে লেখা আছে 'কলিকাতা' - সে আবার কোথারে ! স্মৃতি কয় 'কলিকাতা ' রোস দেখি; তাই ত , কোথায় শুনেছি যেন , মনে ঠিক নাই ত, বেগতিক শুধালেম সাধুরাম ধোপারে ; সে কহিল, হলে হবে উশ্রীর ওপারে। ওপারের জেলেবুড়ো মাথা নেড়ে কয় সে , 'হেন নাম শুনি নাই আমার এ বয়সে ।' তারপরে পুছিলাম সরকারী মজুরে তামাম মুলুক সে ত বাৎলায় 'হুজুরে' বেঙাবাদ বরাকর , ইদিকে পচম্বা , উদিকে পরেশনাথ ,পাড়ি দাও লম্বা ; সব তার সড়গড় নেই কোন ভুল তায় - 'কুলিকাতা কাঁহা' বলি সেও মাথা চুলকায় ! অবশেষে নিরুপায় মাথা যায় ঘুলিয়ে ' 'টাইম টেবিল' খুলি দেখি চোখ বুলয়ে । সেথায় পাটনা পুরী গয়া গোমো মাল্‌দ বজবজ দমদম হাওড়া ও শ্যালদ - ইত্যাদি কত নাম চেয়ে দেখি সামনেই তার মাঝে কোন খানে কলিকাতা নাম নেই !! -সব ফাঁকি বুজ্‌রুকী রসিকতা -চেষ্টা ! উদ্দেশে 'শালা ' বলি গাল দিনু শেষটা।- সহসা স্মৃতিতে যেন লাগিল কি ফুৎকার উদিল কুমড়া হেন চাঁদপানা মুখ কার! আশে পাশে ঢিপি ঢুপি পাহাড়ে পুঞ্জ, মুখ চাঁচা ময়দান, মাঝে কিবা কুঞ্জ ! সে শোভা স্মরণে ঝরে নয়নের ঝরনা ; গৃহিনীরে কহি 'প্রিয়ে !মারা যাই ধর না । তার পরে দেখি ঘরে অতি ঘোর অনাচার - রাখে না কো কেউ কোন তারিখের সমাচার ! তখনি আনিয়া পাঁজি দেখা গেল গণিয়া, চায়ের সময় এল একেবারে ঘনিয়া ! হায়রে সময় নেই, মন কাদে হতাশে- কোথায় চায়ের মেলা! মুখশশী কোথা সে ! স্বপন শূকায়ে যায় আধারিয়া নয়নে , কবিতায় গলি তাই গাহি শোক শয়নে।
সুকুমার রায়
ছড়া
ঐ এল বৈশাখ, ঐ নামে গ্রীষ্ম, খাইখাই রবে যেন ভয়ে কাঁপে বিশ্ব ! চোখে যেন দেখি তার ধুলিময় অঙ্গ, বিকট কুটিলজটে ভ্রুকুটির ভঙ্গ, রোদে রাঙা দুই আঁখি শুকায়েছে কোটরে, ক্ষুধার আগুন যেন জ্বলে তার জঠরে ! মনে হয় বুঝি তার নিঃশ্বাস মাত্রে তেড়ে আসে পালাজ্বর পৃথিবীর গাত্রে ! ভয় লাগে হয় বুঝি ত্রিভুবন ভস্ম- ওরে ভাই ভয় নাই পাকে ফল শস্য ! তপ্ত ভীষণ চুলা জ্বালি নিজ বক্ষে পৃথিবী বসেছে পাকে, চেয়ে দেখ চক্ষে,- আম পাকে, জাম পাকে, ফল পাকে কত যে, বুদ্ধি যে পাকে কত ছেলেদের মগজে !
সুকুমার রায়
হাস্যরসাত্মক
আয় তোর মুণ্ডুটা দেখি, আয় দেখি 'ফুটোস্কোপ' দিয়ে, দেখি কত ভেজালের মেকি আছে তোর মগজের ঘিয়ে। কোন দিকে বুদ্ধিটা খোলে, কোন দিকে থেকে যায় চাপা, কতখানি ভস্ ভস্ ঘিলু, কতখানি ঠক্‌ঠকে ফাঁপা। মন তোর কোন দেশে থাকে, কেন তুই ভুলে যাস্ কথা— আয় দেখি কোন ফাঁক দিয়ে, মগজেতে ফুটো তোর কোথা। টোল–খাওয়া ছাতাপড়া মাথা, ফাটা–মতো মনে হয় যেন, আয় দেখি বিশ্লেষ ক'রে–চোপ্‌রাও ভয় পাস্ কেন? কাৎ হয়ে কান ধ'রে দাঁড়া, জিভখানা উল্‌টিয়ে দেখা, ভালো ক'রে বুঝে শুনে দেখি–বিজ্ঞানে যে–রকম লেখা। মুণ্ডুতে 'ম্যাগনেট' ফেলে, বাঁশ দিয়ে 'রিফ্‌লেক্‌ট' ক'রে, ইঁট দিয়ে 'ভেলসিটি' ক'ষে দেখি মাথা ঘোরে কি না ঘোরে।
সুকুমার রায়
ছড়া
পরশু রাতে পষ্ট চোখে দেখনু বিনা চশমাতে, পান্তভূতের জ্যান্ত ছানা করছে খেলা জোছনাতে৷ কচ্ছে খেলা মায়ের কোলে হাত পা নেড়ে উল্লাসে, আহলাদেতে ধুপধুপিয়ে কচ্ছে কেমন হল্লা সে৷ শুনতে পেলাম ভূতের মায়ের মুচকি হাসি কট্‌কটে— দেখছে নেড়ে ঝুন্‌টি ধ'রে বাচ্চা কেমন চট্‌পটে৷ উঠছে তাদের হাসির হানা কাষ্ঠ সুরে ডাক ছেড়ে, খ্যাঁশ্‌ খ্যাঁশানি শব্দে যেন করাত দিয়ে কাঠ চেরে! যেমন খুশি মারছে ঘুঁষি, দিচ্ছে কষে কানমলা, আদর করে আছাড় মেরে শূন্যে ঝোলে চ্যাং দোলা৷ বলছে আবার, "আয়রে আমার নোংরামুখো সুঁটকো রে, দেখনা ফিরে প্যাখনা ধরে হুতোম–হাসি মুখ করে! ওরে আমার বাঁদর–নাচন আদর–গেলা কোঁত্‌কা রে! অন্ধবনের গন্ধ–গোকুল, ওরে আমার হোঁত্‌কা রে! ওরে আমার বাদলা রোদে জষ্টি মাসের বিষ্টি রে, ওরে আমার হামান–ছেঁচা যষ্টিমধুর মিষ্টি রে৷ ওরে আমার রান্না হাঁড়ির কান্না হাসির ফোড়নদার, ওরে আমার জোছনা হাওয়ার স্বপ্নঘোড়ার চড়নদার৷ ওরে আমার গোবরা গণেশ ময়দাঠাসা নাদুস্‌ রে, ছিঁচকাঁদুনে ফোক্‌লা মানিক, ফের যদি তুই কাঁদিস রে—" এই না ব'লে যেই মেরেছে কাদার চাপটি ফট্‌ ক'রে, কোথায় বা কি, ভূতের ফাঁকি মিলিয়ে গেল চট্‌ ক'রে!
সুকুমার রায়
হাস্যরসাত্মক
ছবির টানে গল্প লিখি নেইক এতে ফাঁকি যেমন ধারা কথায় শুনি হুবহু তাই আঁকি ।পরীক্ষাতে গোল্লা পেয়ে হাবু ফেরেন বাড়িচক্ষু দুটি ছানাবড়া মুখখানি তার হাঁড়িরাগে আগুন হলেন বাবা সকল কথা শুনেআচ্ছা ক'রে পিটিয়ে তারে দিলেন তুলো ধুনেমারের চোটে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় ক'রে তোলেশুনে মায়ের বুক ফেটে যায় 'হায় কি হল' ব'লেপিসী ভাসেন চোখের জলে কুট্‌নো কোটা ফেলেআহ্লাদেতে পাশের বাড়ি আটখানা হয় ছেলে ।
সুকুমার রায়
ছড়া
কান্না হাসির পোঁটলা বেঁধে, বর্ষভরা পুঁজি, বৃদ্ধ বছর উধাও হ'ল ভূতের মুলুক খুঁজি। নূতন বছর এগিয়ে এসে হাত পাতে ঐ দ্বারে, বল্‌ দেখি মন মনের মতন কি দিবি তুই তারে? আর কি দিব?- মুখের হাসি, ভরসাভরা প্রাণ, সুখের মাঝে দুখের মাঝে আনন্দময় গান।
সুকুমার রায়
ছড়া
গাছের গোড়ায় গর্ত করে ব্যাং বেঁধেছেন বাসা, মনের সুখে গাল ফুলিয়ে গান ধরেছেন খাসা। রাজার হাতি হাওদা -পিঠে হেলে দুলে আসে- বাপরে ব'লে ব্যাং বাবাজি গর্তে ঢোকেন ত্রাসে! রাজার হাতি মেজাজ ভারি হাজার রকম চাল ; হঠাৎ রেগে মটাং করে ভাঙল গাছের ডাল। গাছের মাথায় চড়াই পাখি অবাক হ'য়ে কয়- বাসরে বাস! হাতির গায়ে এমন জোরও হয়! মুখ বাড়িয়ে ব্যাং বলে, ভাই তাইত তোরে বলি- "আমরা, অর্থাৎ চার-পেয়েরা, এন্মি ভাবেই চলি"।।
সুকুমার রায়
হাস্যরসাত্মক
গান জুড়েছেন গ্রীষ্মকালে ভীষ্মলোচন শর্মা— আওয়াজখানা দিচ্ছে হানা দিল্লী থেকে বর্মা! গাইছে ছেড়ে প্রাণের মায়া, গাইছে তেড়ে প্রাণপণ, ছুটছে লোকে চারদিকেতে ঘুরছে মাথা ভন্‌ভন্। মরছে কত জখম হয়ে করছে কত ছট্‌ফট্— বলছে হেঁকে “প্রাণটা গেল, গানটা থামাও ঝট্‌পট্।” বাঁধন‐ছেঁড়া মহিষ ঘোড়া পথের ধারে চিত্‍‌পাত; ভীষ্মলোচন গাইছে তেড়ে নাইকো তাহে দৃক্‌পাত। চার পা তুলি জন্তুগুলি পড়ছে বেগে মূর্ছায়, লাঙ্গুল খাড়া পাগল পারা বলেছে রেগে “দূর ছাই!”       জলের প্রাণী অবাক মানি গভীর জলে চুপচাপ্, গাছের বংশ হচ্ছে ধ্বংস পড়ছে দেদার ঝুপ্‌ঝাপ্। শূন্য মাঝে ঘূর্ণা লেগে ডিগবাজি খায় পক্ষী, সবাই হাঁকে, “আর না দাদা, গানটা থামাও লক্ষ্মী।” গানের দাপে আকাশ কাঁপে দালান ফাটে বিল্‌কুল, ভীষ্মলোচন গাইছে ভীষণ খোশমেজাজে দিল্ খুল্। এক যে ছিল পাগলা ছাগল, এমনি সেটা ওস্তাদ, গানের তালে শিং বাগিয়ে মারলে গুঁতো পশ্চাত্‍‌। আর কোথা যায় একটি কথায় গানের মাথায় ডাণ্ডা, ‘বাপ রে’ বলে ভীষ্মলোচন এক্কেবারে ঠাণ্ডা।
সুকুমার রায়
হাস্যরসাত্মক
ইঁদুর দেখে মাম্‌দো কুকুর বল্‌লে তেড়ে হেঁকে- 'বলব কি আর, বড়ই খুশি হলেম তোরে দেখে। আজকে আমার কাজ কিছু নেই, সময় আছে মেলা, আয় না খেলি দুইজনাতে মোকদ্দমা খেলা । তুই হবি চোর তোর নামেতে করব নালিশ রুজু'- 'জজ্ কে হবে?' বল্লে ইঁদুর ,বিষম ভয়ে জুজু, 'কোথায় উকিল প্যায়দা পুলিশ , বিচার কিসে হবে?' মাম্‌দো বলে 'তাও জানিসনে ? শোন বলে দেই তবে! আমিই হব উকিল হাকিম , আমিই হব জুরি, কান ধরে তোর বলব ব্যাটা, ফের করেছিস চুরি? সটান দেব ফাসির হুকুম অমনি একেবারে- বুঝবি তখন চোর বাছাধন বিচার বলে কারে।'
সুকুমার রায়
হাস্যরসাত্মক
বয়স হল অষ্টআশি, চিমসে গায়ে ঠুন্‌কো হাড়, নাচছে বুড়ো উল্টোমাথায়- ভাঙলে বুঝি মুন্ডু ঘাড়! হেঁইয়ো ব'লে হাত পা ছেড়ে পড়ছে তেড়ে চিৎপটাং, উঠছে আবার ঝট্পটিয়ে এক্কেবারে পিঠ সটান্। বুঝিয়ে বলি, 'বৃদ্ধ তুমি এই বয়েসে কর্‌ছ কি? খাও না খানিক মশলা গুলে হুঁকোর জল আর হরতকী। ঠান্ডা হবে মাথায় আগুন, শান্ত হবে ছটফ্‌টি-' বৃদ্ধ বলে, 'থাম্ না বাপু সব তাতে তোর পট্‌পটি! ঢের খেয়েছি মশ্‌লা পাঁচন, ঢের মেখেছি চর্বি তেল, তুই ভেবেছিস আমায় এখন চাল্ মেরে তুই করবি ফেল?' এই না ব'লে ডাইনে বাঁয়ে লম্ফ দিয়ে হুশ ক'রে হঠাৎ খেয়ে উল্টোবাজি ফেললে আমায় 'পুশ' করে। 'নাচলে অমন উল্টো রকম, আবার বলি বুঝিয়ে তায়, রক্তগুলো হুড়হুড়িয়ে মগজ পানে উজিয়ে যায়।' বললে বুড়ো, 'কিন্তু বাবা, আসল কথা সহজ এই- ঢের দেখেছি পরখ্ করে কোথাও আমার মগজ নেই। তাইতে আমরা হয় না কিছু- মাথায় যে সব ফক্কিফাঁক- যতটা নাচি উল্টো নাচন, যতই না খাই চর্কিপাক।বলতে গেলাম 'তাও কি হয়'- অম্নি হঠাৎ ঠ্যাং নেড়ে আবার বুড়ো হুড়মুড়িয়ে ফেললে আমায় ল্যাং মেরে। ভাবছি সবে মারব ঘুঁষি এবার বুড়োর রগ্ ঘেঁষে, বললে বুড়ো 'করব কি বল্ ? করায় এ সব অভ্যেসে। ছিলাম যখন রেল-দারোগা চড়্‌তে হত ট্রেইনেতে চলতে গিয়ে ট্রেনগুলো সব পড়ত প্রায়ই ড্রেইনেতে। তুব্‌ড়ে যেত রেলের গাড়ি লাগত গুঁতো চাক্কাতে, ছিটকে যেতাম যখন তখন হঠাৎ এক এক ধাক্কাতে। নিত্যি ঘুমাই এক চোখে তাই, নড়লে গাড়ি- অম্নি 'বাপ্- এম্-নি ক'রে ডিগ্‌বাজিতে এক্কেবারে শুন্য লাফ। তাইতে হল নাচের নেশা, হঠাৎ হঠাৎ নাচন পায়, বসতে শুতে আপ্‌নি ভুলে ডিগ্‌বাজি খাই আচম‌্কায়! নাচতে গিয়ে দৈবে যদি ঠ্যাং লাগে তোর পাজরাতে, তাই বলে কি চটতে হবে? কিম্বা রাগে গজ্‌রাতে?' আমিও বলি, 'ঘাট হয়েছে তোমার খুরে দন্ডবৎ! লাফাও তুমি যেমন খুশি, আমরা দেখি অন্য পথ।'
সুকুমার রায়
হাস্যরসাত্মক
এক যে ছিল সাহেব, তাহার গুণের মধ্যে নাকের বাহার। তার যে গাধা বাহন, সেটা যেমন পেটুক তেমনি ঢ্যাঁটা। ডাইনে বল্‌লে যায় সে বামে তিন পা যেতে দুবার থামে । চল্‌তে চল্‌তে থেকে থেকে খানায় খন্দে পড়ে বেঁকে। ব্যাপার দেখে এম্নিতরো সাহেব বললে 'সবুর করো- মাম্‌দোবাজি আমার কাছে? এ রোগেরও ওষুধ আছে।' এই না বলে ভীষন ক্ষেপে গাধার পিঠে বস্‌ল চেপে মুলোর ঝুটি ঝুলিয়ে নাকে আর কি গাধা ঝিমিয়ে থাকে? মুলোর গন্ধে টগবগিয়ে দৌড়ে চলে লম্ফ দিয়ে - যতই ছোটে 'ধরব' ব'লে ততই মুলো এগিয়ে চলে ! খাবার লোভে উদাস প্রাণে কেবল ছোটে মুলোর টানে - ডাইনে বাঁয়ে মুলোর তালে ফেরেন গাধা নাকের চালে।
সুকুমার রায়
হাস্যরসাত্মক
নিরীহ কলম, নিরীহ কালি, নিরীহ কাগজে লিখিল গালি-- "বাঁদর বেকুব আজব হাঁদা বকাট্‌ ফাজিল অকাট্‌ গাধা।" আবার লিখিল কলম ধরি বচন মিষ্টি, যতন করি-- "শান্ত মানিক শিষ্ট সাধু বাছারে, ধনরে লক্ষ্মী যাদু।" মনের কথাটি ছিলো যে মনে, রটিয়া উঠিল খাতার কোণে, আঁচরে আঁকিতে আখর ক'টি কেহ খুশি, কেহ উঠিল চটি! রকম রকম কালির টানে কারো কারো অশ্রু আনে, মারে না, ধরে না, হাঁকে না বুলি লোকে হাসে কাঁদে কি দেখি ভুলি? শাদায় কালোয় কি খেলা জানে? ভাবিয়া ভাবিয়া না পাই মানে।
সুকুমার রায়
হাস্যরসাত্মক
ওই আমাদের পাগলা জগাই, নিত্যি হেথায় আসে; আপন মনে গুন্ গুনিয়ে মুচ্‌কি হাসি হাসে । চলতে গিয়ে হঠাৎ যেন ধমক লেগে থামে; তড়াক্ করে লাফ দিয়ে যায় ডাইনে থেকে বামে। ভীষন রোখে হাত গুটিয়ে সামলে নিয়ে কোচাঁ ; "এইয়ো" বলে ক্ষ্যাপার মতো শুন্যে মারে খোচাঁ । চেঁচিয়ে বলে ,"ফাদঁ পেতেছ ? জগাই কি তায় পড়ে? সাত জার্মান, জগাই একা, তবুও জগাই লড়ে।" উৎসাহেতে গরম হয়ে তিড়িং বিড়িং নাচে, কখনও যায় সামনে তেড়ে, কখনও যায় পাছে। এলোপাতাড়ি ছাতার বাড়ি ধুপুস ধাপুস্ কত! চক্ষু বুজে কায়দা খেলায় চর্কিবাজির মত। লাফের চোটে হাঁপিয়ে ওঠে গায়েতে ঘাম ঝরে, দুড়ুম ক'রে মাটির পরে লম্বা হয়ে পড়ে। হাত পা ছুঁড়ে চেঁচায় খালি চোখ্‌টি ক'রে ঘোলা, "জগাই মেলো হঠাৎ খেয়ে কামানের এক গোলা"! এই না বলে মিনিট খানেক ছট্ফটিয়ে খুব, মড়ার মত শক্ত হ'য়ে এক্কেবারে চুপ ! তার পরেতে সটান্ বসে চুলকে খানিক মাথা, পকেট থেকে বার করে তার হিসেব লেখার খাতা। লিখলে তাতে- "শোনরে জগাই, ভীষন লড়াই হলো পাচ ব্যাটাকে খতম করে জগাই দাদা মোলো।"
সুকুমার রায়
ছড়া
চলে খচ্‌খচ্ রাগে গজ্‌গজ্ জুতো মচ্‌মচ্ তানে, ভুরু কট্‌মট্ ছড়ি ফট্‌ফট্ লাথি চট্‌পট্ হানে। দেখে বাঘ-রাগ লোকে 'ভাগ ভাগ' করে আগভাগ থেকে, বয়ে লাফ ঝাঁপ বলে 'বাপ্ বাপ্' সবে হাবভাব দেখে। লাথি চার চার খেয়ে মার্জার ছোটে যার যার ঘরে, মহা উৎপাত ক'রে হুটপাট্ চলে ফুটপাথ্ পরে। ঝাড়ু–বর্দার হারুসর্দার ফেরে ঘরদ্বার ঝেড়ে, তারি বালতিএ- দেখে ফাল্ দিয়ে আসে পালটিয়ে তেড়ে। রেগে লালমুখে হেঁকে গাল রুখে মারে তাল ঠুকে দাপে, মারে ঠন্‌ঠন্ হাড়ে টন্‌টন্ মাথা ঝন ঝন কাঁপে! পায়ে কলসিটে! কেন বাল্‌তিতে মেরে চাল দিতে গেলে? বুঝি ঠ্যাং যায় খোঁড়া ল্যাংচায় দেখে ভ্যাংচায় ছেলে।
সুকুমার রায়
ছড়া
দেখ বাবাজি দেখবি নাকি দেখরে খেলা দেখ চালাকি, ভোজের বাজি ভেল্কি ফাঁকি পড়্ পড়্ পড়্ পড়বি পাখি - ধপ্! লাফ দিয়ে তাই তালটি ঠুকে তাক করে যাই তীর ধনুকে, ছাড়ব সটান উর্ধ্বমুখে হুশ করে তোর লাগবে বুকে - খপ্! গুড়্ গুড়্ গুড়্ গুড়িয়ে হামা খাপ্ পেতেছেন গোষ্ঠ মামা এগিয়ে আছেন বাগিয়ে ধামা এইবার বাণ চিড়িয়া নামা - চট্! ঐ যা! গেল ফস্কে ফেঁসে - হেই মামা তুই ক্ষেপলি শেষে? ঘ্যাচঁ করে তোর পাঁজর ঘেঁষে লাগ্‌ল কি বাণ ছটকে এসে- ফট্?