poet
stringclasses
137 values
category
stringclasses
21 values
poem
stringlengths
9
18.7k
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
ভালোবাসার আর একটা নাম কষ্ট কষ্ট আমার বড় আপন - ভালোবাসা পর ভালোবাসা বাইরে থাকে, কষ্ট নিয়ে বাঁচে এ অন্তর ।।মেঘের কাঁদন ফুরালে হয় আকাশটা উজ্জ্বল । হৃদয় কাঁদলে কেউ দেখে না ভালোবাসা বাইরে থেকে মোছে চোখের জল । অন্তরের আকাশে আমার মেঘ বেঁধেছে চিরদিনের ঘর ।।সুখী সুখী মুখে যাদের ভালোবাসা-বাসি ধন্য বলে মানতে গিয়ে দেখি --- অন্তর ঢেকে রেখে তারা মুখে আনে হাসি ।সময় কেবল অভিনয়ের, জীবনটা কষ্টের । মনের মধ্যে মন পুড়িয়ে জ্বলে ওঠা সেই হাসিও শুধু বিনষ্টের । নষ্ট এই আগুনে আমার কষ্ট আহ কী অবিনশ্বর ।। ২/ ১১/ '১৬
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
একজনা কেউ বলেছিলো, জামান তোমার ঠিকানা কী ? আমি বলি, আমি কে তাই জানতে আজও রইলো বাকি । আছি কি নেই সেটাই আগে ফয়সালা হোক নিজের কাছে হাত দিয়ে এই শরীরটা ছুঁই চমকে সে কয় কে ওরে তুই ? আমিও তো বুঝি না সে সত্যি সত্যি আমার নাকি !!
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
অতীত যেখানে শুরু সেই পথে হেঁটে যেতে যেতে নৃমুণ্ডের মাঠ আর রুক্ষ পাহাড়ের গায়ে হাত রেখে দেখি সেদিনের মানুষের দহনের ইতিহাস লেখা আছে নির্বাক পাথরে বৃক্ষের কঙ্কালে আর ফসিলের দোকানে দোকানে সেই পথে যেতে যেতে আস্ত এক চাঁদ ঢুকে আমার খুলিতে কল্পনার দরোজায় তোমাকে হাজির করে দিলো এসব আমার ভালো লাগে না মোটেই - তবু পাশাপাশি চলি যেতে যেতে মনে হয় তুমিও দোকানে ঝুলে ছিলে বাঁকানো সলাকা বিদ্ধ মাংসের ফসিল হয়ে আমার পাশেই মাংস শব্দটায় এক জৈবিক আস্বাদ আছে বলেই দৈবাৎ আদিম ইচ্ছের রাতে জেগে উঠি সেকালের তুমি আর আমিদু'জনে যুদ্ধের সাজে - তখনো প্রস্তর যুগ আসেনি এ পৃথিবীতে তাই- যৌনগন্ধী অস্ত্র দিয়ে পরস্পর হয়ে যাই শিকার-শিকারী তারপর ক্লান্ত দুই প্রাগৈতিহাসিক নর-নারী নৈশভোজ সারি বসে শুক্রের তরল স্যুপ জরায়ুর ঝোল আর কোষবদ্ধ ডিমে ডিমের ভিতরে আমি কুসুমের হাসি খুঁজি - যে হাসি ফোটেনিযৌনতার দাহ দিয়ে পোড়ানো এ পথ আর কত দূর গেছে সে হিসেব মেলাবার প্রয়োজনে তুমি আর আমি খুঁড়ে খুঁড়ে পৃথিবীর ছবি আঁকি সূর্যের জন্মের কাল থেকে শুরু করে অথচ কেবল সূর্য আঁকার পরেই দেখি বিস্ময়ে দু'জন পৃথিবীর আয়ু মাপা থেকে ঢের বড় এক মানবিক কাজ মস্তিষ্কের কোষে কোষে পাপবোধ জন্মাবার পোশাক পরানো ক্ষুধা আয় যৌনতার মত যেটা প্রাকৃতিক নয়
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
মানবতাবাদী
একদা এখানে এক মেরুদণ্ডী মানুষ ছিলেন তালের আঁশের টুপি -- তার নিচে বলিকীর্ণ গাল কী দৃপ্ত স্পর্ধায় ঋজু -- এমন কি যা বল্লাল সেন কৌলীন্য প্রথায় মেপে কোনোদিন পাবে না নাগাল --তুলোট সফেদ দাড়ি অথচ কী জ্বলন্ত যৌবন হঠাৎ 'খামোশ' বলে বজ্রগর্ভ তার উচ্চারণ সময়ের সীমাছাড়া বেয়াদব ঘোড়ার কেশর টেনে ধরে নামাতো ধুলায় -- তার চোখের চাবুক উদ্যত দেখেই যত চাটুকার চর-অনুচর লুকাতো পেচক-মুখ -- কখনো বা সাধক ভাবুক হয়ে যেতো সেই চোখ -- আনুপূর্ব দ্রষ্টার ভাষায় বাঙময় নৈশব্দ জুড়ে লিখে দিতো জনতার রায়সাধারণ মাপে তার হাতে-কাচা ধবল পাঞ্জাবি পল্টনের সমাবেশে ঢেকে দিতো সমগ্র আকাশ সূর্যদগ্ধ দুটি হাত কোটিকণ্ঠ মানুষের দাবী ছুড়ে দিতো -- রাজকীয় চাতুর্যের তুরুপের তাস ছত্রখান করে সব ছিড়ে-খুঁড়ে নর্দমায় দিয়ে ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইলের হৃদয় চিতিয়ে দাঁড়াতেন তিনি যেন মজলুমের পুঞ্জীভূত রোষ অতিমানবীয় কন্ঠে গর্জে উঠে - খামোশ - খামোশ --
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
মানবতাবাদী
আয়-রে আমার গ্রামের মানুষ, আয় আয় রে চলে রাজধানী ঢাকায় দেখবি) তোদের মতো সাজ করেছে কয়েক শ' ধাঙ্গড় । ওরা) জীবনেও হাল চালায়নি চাষ-আবাদের চুল ফেলায়নি ভাঙেনি তো রুক্ষ মাটির একখানি চাঙ্গড় ।।দেখবি কেমন পান্তা খাবে তোদের খাদ্যকে ভেংচাবে নাচবে যেন কৃমির নাচন সব কটা ভাঙ্গড় ।।মুখ দেখাতে লজ্জ্বা বলেই মুখোস পরে থাকে পশুর অধম বলেই পশুর মুখোসে মুখ ঢাকে ।সমবছরে তোমার পাকে একদিনও কি ইলিশ থাকে ? এদের দেখবি ইলিশ ছাড়া ভাঙ্গেই না আঙ্গড় ।।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
সনেট
কে বাঁশি বাজাস তুই আকাশের মতো উদলা গায় কোমরের ত্যানা যেন উপমেয় মলিন মেঘের বাতাস কেবল কাঁদে হুহু করে অবুঝ বীণায় নদীর ঘাটের কোন কিশোরীর বুকে আবেগের ঘাই লাগে ঘাই লাগে ঘাই লাগে ঢেউ-ভাঙ্গা ঘাই দুপুরের নির্জনতা অবিরাম পুড়ে হয় ছাই বাঁশিকে কাঁদাস তুই না-কি তুই নিজেই কাঁদিস কে তুই কোথার থেকে কতো দূর পথ ভেঙে এলি তরুণ যুবার রূপে --- বিরহের কতো জন্ম বিষ ফোটায় এমন করে ঝরে মরে যাবার চামেলি এক-বুক জলে নামা কিশোরীর মরণের ঘাই প্রশ্ন যদি করে তার জবাব কি দেবে কোনো সাঁই নটে গাছ মুড়োবেই বহুবার জন্ম নিয়ে নিয়ে কাহিনী শেষ না করে --- কোনো সৎ জবাব না দিয়ে
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
উল্টো হয়ে ঝুলে আছি অন্ধকারের ডালে অন্ধকারের লতা-পাতা খাচ্ছে ছিড়ে গানের খাতা যাচ্ছে ঢুকে মাংস ফুড়ে ক্ষয়িষ্ণু কঙ্কালে ।। চোখের থেকে দৃষ্টি ঝুলে অন্ধ ভাগ্য ভালো বন্ধ-নাকে ঢোকে না দুর্গন্ধ বোধ ঢেকেছে মগজ-গলা অজস্র জঞ্জালে ।। রক্ত বড় হীম সাপের না-কি অভিশাপের জিহ্বা-চেরা পরিমাপের লোভ ধরেছে ঝিম । দিনের মুখে মুষ্টি হেনে রাত্রি বলছে ডেকে, দ্যাখ না চেয়ে কে নরকের যাত্রী বুঝবি আরো সাপ-অভিশাপ একত্রে দংশালে ।।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
সকালে তোমার চিঠি হাতে এলো আজ যার হাতে পাঠিয়েছো তার মুখ দেখিনি কারণ কুয়াশার দীর্ঘ হাত বাড়িয়ে সে পৌছে দিয়ে গেছে-- আমাদের পৃথিবীতে পত্র যোগাযোগ ক্রমেই অচল হতে চলেছে এখন চিঠির ঘ্রাণের কথা - স্বাদ ভুলে যাচ্ছে মানুষেরা অবলীলাক্রমে শোক দুঃখ প্রকাশের কান্না নেই - তাকে হজম করেছে এক লৌকিকতার নামে কালো ফিতা হৃদয়ের যত কথা আঙুলের অস্থির ডগায় অভিন্ন অক্ষর হয়ে নির্বোধের মত চেয়ে থাকেতোমার এ ভেজা চিঠি হাতে নিয়ে আমি তোমার ঘ্রাণের উষ্ণ ছোঁয়ার আহ্লাদে খুলেছি প্রতিটি ভাঁজ আদরের মত কোটিবার পড়ার আশায়--
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
শিশির-পাতের মতো শব্দেরা জড়িয়ে ধরে বুক এফোঁড় ওফোঁড় বেঁধে অশরীরী হিমের চাবুক অথচ আমি তো চাই জ্বলন্ত আগুন মেলে শুতে ঘুমের মতন ধোঁয়া হতে চাই দহনের তাপ ছুঁতে ছুঁতে নক্ষত্রেরা গলে গলে অগনিত অক্ষরের মেলায় সহজে মিশে যায় --- ঘুম জুড়ে ধোঁয়া জুড়ে নষ্ট চিত্র বানিয়ে বানিয়ে আমাকে দেখায় তবু আমি অন্য উত্তাপের খোঁজে নাড়া-চাড়া করি এক নিঃসঙ্গ ম্যাচের কাঠি নিয়ে অগনিত অক্ষরের বিচিত্র বর্ণের ছবি সাজিয়ে সাজিয়ে আমি চাই ভিন্ন এক রহস্যের শরীর বানাতে যেখানে ম্যাচের কাঠি জ্বেলে দেবো আমি ক্ষিপ্র হাতে শরীর তখন এক জ্বলন্ত বিছানা হয়ে গিয়ে আমাকে জড়াবে --- আমি ভাবি --- শুধু ভাবি কিন্তু তবু ভাবনার বুক চিরে অশরীরী হিম উঠে এসে আমাকে আড়ষ্ট করে --- কাকে বলি ক্ষমা করো প্রভু ---- শিশির পাতের শব্দ সম্মোহের মায়াবী আবেশে আমাকে আচ্ছন্ন করে --- ঝিমাই ঝিমাই যেন আমি আর নাই হে আমার আড়ষ্টতা ক্ষমা করো দোহাই দোহাই
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
স্বদেশমূলক
আমার) নাকের উপর ছোঁ দিয়েছে ভিনদেশী এক চিল আমি বলি, ও কিছু নয়, দোষটা তো এক তিল । আমার) মাথার উপর বিষ্ঠা ফেলে যাচ্ছে উড়ে কাক আমি বলি, ভুল করেছে, থাক ও কথা থাক । আমার) চোখের দিকে তাক করেছে শকুনি ভিনদেশী আমি বলি, আসেনি তো, ভাবছো বেশী বেশী । আমার) ঘরে ঠেলে নিজের বোঝা বাঁধছে তারের বেড়া আমি বলি, কী আর করা, ওরা বড়ই ত্যাড়া । আমার) কান ফাটিয়ে করছে ওরা হুকুমনামা জারি আমি জানি, ফক্কা আমার নিধিরাম সরদারি । আমার) এই অসহায় অবস্থাকে ঢাকবে দালালেরা আমি জানি, আমি কতো দালাল দিয়ে ঘেরা । আমার) গলার জোরে দেশের লোকে ঠকঠকিয়ে কাঁপে আমি জানি, ভিনদেশীরা কী দিয়ে তা মাপে ।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
সেদিন সন্ধ্যা-রাতে একটি কাগজ দিয়েছিলে হাতে, এক পিঠে তার লেখা ভালোবাসা অন্য পিঠে ঘৃণা ------ জানতে চেলাম দুটোই নেবো কি না ?। বাড়ছিলো রাত--- মেঘের ফাঁকে তারার লুকোচুরি তারার আলোয় তোমার দু'চোখ তীক্ষ্ণ ঝিলিক ছুরি । কোন খানে যে বিঁধলো এসে --- হায়রে তা জানি না ।। মধ্যরাতে বৃষ্টি নেমে এলো তখন তোমার দৃষ্টি এলোমেলো বুকের কোথায় গুমরে উঠে এমন কান্না পেলো ? জানতে চেলাম, সুখের ব্যাথা --- ব্যাথার সুখে মিশে প্রেমেই না কি ঘৃণায় এমন তৃষ্ণা মেটায় বিষে ? রাত্রি শেষের পলকা আঁধার রইলো জবাবহীনা ।।[৩১-৭-২০১৪]
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
বেশ, ভেঙে দিয়ে যাও --- বলবো না আমি বলবো না কোনো কথা, কবেই তো তুমি পেয়েছো আমাকে ভাঙবার স্বাধীনতা।। বেশ, ভেবে নাও কাচের আয়না, ভাঙাটা অতি সহজ কিন্তু যদি তা এ-হৃদয় হয়, পাবে কি সেটার খোঁজ? কী তুমি ভাঙবে বলো? পারো যদি তবে ভাঙো এই নিরবতা।। শর্ত দেবার অধিকারটাও থাকেনি আমার হয়ে কখনো বলিনি, দুঃখ যে দেবে - সে কিসের বিনিময়ে? থাক, হয়ে থাক প্রেমের কাব্য কখনো না পড়া বই স্বপ্ন ভেঙেছো, সে তোমার সুখ, আমি তো সুখের নই। তুমি কি ভাঙতে পারো বুকে বাসা বাঁধা স্মৃতিময় কাতরতা।।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
বিষণ্ণতা, তোর কাছে ক্ষমা চাই ছেড়ে দে আমাকে কাকের বিষ্ঠার থেকে জন্ম নেয়া বটের মতন শিকড়ের জটাজালে আষ্টেপৃষ্ঠে যদি বাঁধা থাকে মগজের প্রতি কোষ, তবে এই জরাজীর্ণ মন পুরানো দালান হয়ে টিকে থাকে কতো দিন আর পলেস্তারা খসে পড়ে ক্ষয়গ্রস্থ ইটের কাতার মৃত্যুর যন্ত্রণা হয়ে খিঁচিয়ে নিজের দাঁত মুখ প্রত্যহ জানান দেয় এ কেমন জটিল অসুখ
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
এইখানে এইখানে - আহা খুব যত্নে রাখো লাশ শোকসভা আয়োজনে পবিত্রতা বড় প্রয়োজন তা ছাড়াও এ তো নয় যে কোনো লাবণ্যময়ী -- যেন তেন জন অন্তত নিজেকে দেখে এ আমার একান্ত বিশ্বাস ঈশ্বরের ইচ্ছে থেকে শুরু করে অধম নশ্বর এই আমি - ওর সাথে সৃষ্টির আনন্দে সহবাস করেছি বিদগ্ধ হয়ে -- ওর ওষ্ঠ পীন পয়োধর পদ্মরাগ ত্রিবেণীও পূর্ণ কামে অমূর্ত থাকেনি আবার কখনো ওকে গড়েছে আমার তীক্ষ্ণ ছেনি আমারই আরাধ্য করে -- আমি তার দাস অনুদাস চেয়ে চেয়ে সম্মোহিত হয়ে আমি পরম বিষ্ময়ে পড়েছি রহস্যময় ওর দুটি চোখের কুয়াশা মরাল গ্রীবার ভঙ্গি - হাসির বিদ্যুৎবাহী ভাষা বাহুর পেলবতায় বাঁধা পড়ে নানা ছন্দে লয়ে রমণ-রঙ্গের স্রোতে দ্রুততর করেছি নিঃশ্বাসআহা খুব যত্নে রাখো - ও কী - ও কী দেখোতো দেখোতো কী ভীষণ হট্টগোল করে আসে ভাগাড়ের শিয়াল-শকুন কে ওদের শেখবে যে এ সময় নীরবতা পালনের রীতি -- তালহীন ছন্দলয় মাত্রাজ্ঞানহীন এই অপগণ্ডদের বহুকাল ধরে ক্ষিপ্ত দংশনেই মৃত এই মহামান্যা আজ উচ্চকিত বাদ্য তবু বাজাতে এসেছে ওরা লাশের কঙ্কালে -- এমত অবস্থা তাই শোকসভা বাতিল -- রহিতআহা খুব যত্নে রাখো লাশ এই নদীটার পাড়ে শিয়ালেরা শকুনেরা ফিরে যাক পৃথিবীর ভাগাড়ে ভাগাড়ে এ নদী আমার বুক - মৃত্যুপুরী অভিমুখী শোকাতুর নদী এখানে ভাসান হবে উপদংশে মৃত কবিতার বিপরীত যাত্রা করে পাড়ি দিয়ে মরণের অন্ধকার দ্বার ঈশ্বরের সভাকক্ষে আলো জ্বেলে হবো আমি সাঁইজী দরদী আবার জাগিয়ে দেব অমরায় ঐশ্বরিক মীন তিনের জোয়ারে -- আর এবার সে হবে মৃত্যুহীন ।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
পৃথিবী নামের এই গ্রহটাকে একদিন আমার মগজে ভরে নিয়ে - বুদ্ধির কাঁচিতে কেটে ছেটে প্রাগৈতিহাসিক এক রমণীর ফসিলের খোঁজে আতস কাঁচের চোখে দৃষ্টি দেবো কালের পকেটে - সে না-কি আবার তার সব কিছু পকেটে রাখে না অথচ আমার চাই মহাবৃদ্ধ বিধাতার গল্প থেকে চেনা সুনির্দিষ্ট রমণীর খোঁজ -- তবুও কী জানি কেন মনে হয় চিন্তার আঙুল পকেট মারের মত পৌছে যাবে নিপুণ সহজ কৌশলে সেখানে - সেই রমণীকে চিনে নিতে ভুল হবে না মোটেই তার - আর আমি বাম পাঁজরের হারানো অস্থিটা পেয়ে হয়ে যাবো ফের পরিপূর্ণ প্রতিকৃতি - কালের পকেটমুক্ত আদি অন্তহীন একক নির্ভার সত্তা - মহাশূন্যে নির্ভার স্বাধীন ।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
মাঝে মাঝে ভুলে যাই আমি এক আমরণ কারাদণ্ডে দণ্ডিত আসামী আমার জবানবন্দী মুছে গেছে সময়ের খেরো খাতা থেকে হঠাৎ উচ্ছাস এসে নিয়ে যেতে চায় কোন বহুদূরগামী নবীন জাহাজে তুলে, তখনি তো শিকলের আর্তনাদ বলে পিছু ডেকে মুক্তি নেই মুক্তি নেই, তুমি সেই পুণ্য-শূন্য ঘৃণ্য অপরাধী জীবন কৃপাণ মেলে ঘোষণা দিয়েছে যাকে- জীবন-বিবাদীগরাদের ফাঁক দিয়ে কী কারণে বাহিরে তাকাই আমি নিজেই জানি না ওখানে আমার জন্যে নেই কোনো ফল্গুধারা হিমেল বাতাস তাসের বান্ডিল থেকে ফেলে দেয়া জোকারের মতো এক তাস নাকের ডগায় লাল বল সেঁটে হাসাতে গিয়েও শুধু ঘৃণা কুড়াই দু'হাত ভরে -- মরে যায় সবুজেরা আমার পাপিষ্ঠ দৃষ্টিপাতে না আমার বৃক্ষ নেই ছায়া নেই -- এ কথাও জানি না, কখনো স্বাভাবিক মৃত্যু ছুঁয়ে সুখী হবো, এমন বাসনা নিয়ে কোনো স্বপ্ন ছিলো কি না বুকে, অন্ধকার ছিলো কি-না কোনো কোনো রাতে ঘুমিয়ে পড়ার মতো - কিম্বা জেগে ওঠার সকাল --- এখন কেবলি ক্ষণ গুণে গুণে দ্রুত হাতে পেতে চাই অন্তের নাগাল
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
সূর্যটা পশ্চিম দিকে হেলে আছে, পূবে যাবো আমি বাতাবী লেবুর ঘ্রাণে যে শরীর তামাটে বাদামী ---- ফেলে এসেছি তো আমি কবে সেই স্মৃতির দুপুর আমার শরীরে তবে কেন বাজে ঘুঙুরের সুর পড়ন্ত বিকেলে এসে যেন কোন অদৃশ্য সূতায় পড়েছে ব্যাকুল টান যা আমাকে নিয়ে যেতে চায় ফিরিয়ে পূবের দিকে বহুদূর পূবের রোদ্দুরে একা এক নদী ডাকে গহীনের পাকে ঘুরে ঘুরে হিজলের ছায়া সেই জলে নেমে দুলে দুলে ডাকে বাতাবীর ঘ্রাণ আরো তীব্র হয়ে জড়ায় আমাকে সূর্যটা পশ্চিমে হেলে, আমি ঘুরি তার বিপরিতে পূবে যেতে পা বাড়াই, ভাবি কেউ এসেছে কি নিতে ---- কেবল নিজের ছায়া পা বাড়ায় আমার সাথেই আর কোনো সঙ্গী-সাথী কোনো খানে কোনো দিকে নেই ছায়ার পেছনে হাঁটি ছায়া ক্রমে দীর্ঘতর হয় অথচ চাই না আমি বর্তমান জটিল সময় ছায়া হয়ে সাথে যাক, আমি যাবো বাতাবীর ঘ্রাণে তামাটে-বাদামী এক প্রাকৃতিক শরীরের টানে এ সময় সাথে নিলে জানি না সে ভয় পাবে কি-না কেন যে নিজের ছায়া কিছুতেই পেরোতে পারি না
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
আদ্যপ্রান্ত কোনোখানে দেহকাব্যে পাবে না তো অনায়াস পাঠ মস্তিষ্কের সূক্ষ্মতম তন্ত্রীতেও ঘটে গেলে হঠাত বিভ্রাট প্রেমিক লম্পট হয় প্রেমিকাও হতে পারে সেরেফ পতিতা দৃষ্টির বিভ্রম নিয়ে কেটে গেলে জন্ম থেকে কবর বা চিতা অপঠিত থেকে যায় দেহকাব্যে সর্গ - অনুসর্গ - পাদটিকা অথবা মুহূর্তে কোনো সংঘটিত অনুকাব্য - ক্ষুদ্রাঙ্ক নাটিকা --- লুকানো বিদ্যুৎ কোনো, ভ্রূকম্পে ভূকম্প কোনো যদি অগোচরে ঘটে যায় তাহলেই ভুল অংক লেখা হবে শাস্ত্রের আকরেদেহকাব্যে অনায়াস পাঠ নেই -- তবু দেখি নিত্য আয়োজন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করা মগজের খোঁয়ারিতে হাতড়ে ফেরে ধন বোঝে না কোথায় ভুল, দেহের ভিতরে দেহ, কিসের সন্ধান --- গানের ভঙ্গিতে শুধু স্বরযন্ত্র গোঙানিতে মুখের ব্যাদান বিপর্যস্ত করে দেয় সুরে স্বরে তত্বে সত্তে বাণীর বিন্যাস হাজার বিচ্যুতি নিয়ে, নামে শুধু সাধু থাকে, কামে হয় দাস কাব্য হয়ে যায় পণ্য, কিনে খায় নাগরিক শিশ্ন কিম্বা যোনি দেহের খোলস তাই বাজারের প্রান্তে পড়ে হারায় লাবনীআসলে এ দেহকাব্যে সত্যের সন্ধান খুঁজে পেয়েছে ক'জন এ প্রশ্ন বাতাসে ঘোরে, জবাব দেবেন কোন সাঁইজ্বী স্বজন০৪ / ১০ / ২০১৭
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
ছোট বড় দুটো হাতে ঘড়িতে সময় বেঁধে ঘোরাতে ঘোরাতে নিয়ে যাচ্ছে কোথায় কে জানে - তবু তাকে যত্ন করে দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখে আমার মাথায় দিনে রাতে পেণ্ডুলাম দোলাই নিজেই - আর নিজের ভিতরে ঘোড়ার নালের শব্দ শুনি সেই কত যুগ থেকে - এ নিয়ে কখনো কোনো প্রশ্ন আমি করিনি নিজেকে যে প্রেতিনী দীর্ঘশ্বাস গোপনে লুকিয়ে খায় পাঁজরের হাড় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু পা-ঠোকা ঘোড়ার নালে সেও প্রীত হয় - আমাদের ভূগোলোকে যেমন সাগর নদী সমতল এবং পাহাড় আঁকা থাকে স্থির - শুধু ঘোরালেই ঘোরে তাতে কিসের বিষ্ময়চেঙ্গিস খানের মতো ভূগোলের বুক চিরে আমার ঘোড়াটা কখনো ছোটেনি - শুধু বৃত্তের ভিতরে তার স্লথ পায়ে হাঁটা ক্লান্তির নেশায় এক ঝিমধরা মাতালের গান - আয়ুর বিশাল বোঝা পিঠে নিয়ে ঝুলে পড়া চোয়ালের কশে ফেনা তুলে ভাবে আর কতবার ঘুরে তবে হবে অবসান ঈশ্বরের বিজ্ঞাপনে লেখা সেই ভয়ংকর সর্বাত্মক ধ্বসে -ভূগোলোক কুরে কুরে সে প্রেতিনী দীর্ঘশ্বাস কবে উড়িয়ে ঘুণের ধুলো অশ্বটার শেষ হাঁচি হবে
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
দুপুর মাথায় করে আমাকে হাঁটিয়ে নিয়ে পথ আচানক থেমে যায় অশ্বত্থের নিচে - আর ঘুঘুদের বিরহ কাসিদা তখনি কি জানি কেন ছিঁড়ে দেয় তক্ষকের কঠিন ধমক- বুঝি বা জানিয়ে দিতে, তাদের আহার নিদ্রা সহবাস খিদা এসবের একচ্ছত্র অধিকার আছে এই অশ্বত্থ বাড়িতে সেখানে আমিতো এক অনাহুত আগন্তুক ছাড়া কিছু নই তবুও অশ্বত্থ কোনো কার্পণ্য করে না ছায়া দিতে ঘুম দিতে- স্বপ্নের ভিতরে ঢুকে আমার মাথার চুলে যত্নের কাঁকই চালাতে নিপুণমন্ত্রে - গৌতম বুদ্ধের কথা শোনাতে শোনাতে-যে সব শব্দকে আমি মৃত জেনে সেই কবে লাশকাটা ঘরে নিজেই এসেছি ফেলে - সেই সব মৃতদেহগুলো হাতে হাতে জড়াজড়ি করে এসে নির্বাণের শ্লোক হয় মাথার ভিতরেঘুম ভেঙে জেগে উঠে মনে হয় এইসব শব্দেরা অমর সম্মোহিত স্বরে বলি - আমি হবো এ অমর শব্দের রক্ষক চিন্তার আঙুল দিয়ে মগজে এসব কথা সাজাবার পর হঠাৎ চিৎকারে সব ছিন্নভিন্ন করে দেয় অদৃশ্য তক্ষকতারপর পথ এসে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে-যেতে-যেতে নিজেই হারিয়ে যায় - তার আগে দিয়ে যায় নির্জনতা আর এককের গানে বাঁধা একতারা - আর আমি বুকে কান পেতে শুনি কোন অন্তহীন শূন্যতার বুক ফাঁটা নিঃশব্দ চিৎকার
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
নীতিমূলক
বিবেক যখন কড়াও নাড়ে না দুয়ারে তখন কোনোই বিভেদ থাকে কি মানুষে এবং শুয়ারে মাকড়ের ছানা মাকে খেয়ে হয় পুষ্ট নিজে বেঁচে আছে এতেই সে সন্তুষ্ট আপাত এসব সন্তুষ্টির পুলকে অষ্ট চরণে নাচে আর নাচে ভুলেও আসেনা স্মরণে মায়ের মতোই সেও একদিন শূন্য খোলস হবে তো তাকে খেয়ে কিছু অটপেয়ে প্রাণী মাতবেই উৎসবে তো শুয়ার মাকড় ইত্যাদি যত ইতর প্রাণীর ধর্ম মর্মে পোষণ করার পরেও শুধু মানুষের চর্ম বাঁচাতে পারে কি মনুষ্যত্ব --- প্রশ্নটা না-কি হেঁয়ালি জবাব না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন ছোঁড়ে তাই খ্যাপা শেয়ালই জানে না শেয়াল তাকে পণ্ডিত বলে বিদ্রূপ বচনে মূর্খের কাছে সেটাই সত্যি, বোঝা যায় তার রচনে।মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান // ১৫/ ০৪/ '১৭ (১লা বৈশাখ)
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
মানবতাবাদী
ঘুমপাড়ানি মাসি পিসি খালা ফুপুর দল জেগে ওঠা বাচ্চাদেরে সঙ্গে নিয়ে চল মানবি কেন ঘুমপাড়িয়ে শান্ত রাখার ছল মা বাবারও ঘুম ভাঙিয়ে সঙ্গে যেতে বল খোকা-খুকুর ভয় ভেঙেছে, তাদের কিসের ভয় মা বাবারা সামনে গেলেই দেশের হবে জয় যারা দেখায় ধান ভেনে তার কুড়ো পাবার লোভ তাদের উপর খোকা-খুকুর আজকে বড় ক্ষোভ চক্ষু পেতে আর বসা নয়, বোঝ না ওদের মন বাঁচার মতো বাঁচতে সবার সাহস প্রয়োজন ।০৩/ ১২/ ২০১৮
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
সনেট
প্রাচীন অশ্বত্থ বৃক্ষ, হ্যা তা বটে, বৃক্ষ নাম অনায়াসে তাকেই মানায় প্রসারিত শাখা তার জুড়ে আছে ছায়া ফেলে অনুর্বর বিস্তীর্ণ এলাকা ছায়ায় অনেকে বসে, তাস পেটে, নিদ্রা যায়, কেউ মত্ত গঞ্জিকা টানায় গুঁড়ি ঘেঁষে মুত্রত্যাগ করে কেউ, তবু তার নম্রতায় নির্বিকার থাকা পেয়ে গেছে প্রাজ্ঞতার নামাবলি, দৃশ্যতও মাথা তার কিছুটা ঝুঁকেছে নানাবিধ কর্মভারে, তবু মুখে সাঁটা আছে এঁকে রাখা আশীর্বাদী হাসি তবে খুব অন্তরালে বার্ধক্যের কোটরে কোটরে বহু মালিন্য ঢুকেছে এ সব ঢাকার জন্যে নাম-গান প্রয়োজন, প্রয়োজন শ্যাম-স্নিগ্ধ বাঁশিআয়োজন কম নেই মাঝে মাঝে বসে তার ছায়াঘেরা প্রশস্ত চত্তরে নাটকের অভিনয় স্তোত্রপাঠ মঙ্গলের গীতধ্বনি সমবেত স্বরে কখনো সাহিত্যসভা কাব্যকৃতি, দীপান্বিতা দেহভঙ্গে কখনো বা ঝরে বিলোল মুদ্রার ছটা, তবু বড় বিষাদের ছায়া তার নিভৃত অন্তরে এতোটা বিস্তৃত শাখা অথচ কোথাও নেই নিজস্ব পুষ্পের সমাহার অতি ক্ষুদ্র ফল থেকে কাক-পক্ষী বিষ্ঠা ছাড়া নেই পরিচয়ের বিস্তার
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
কোথায় যাবো সাঁই- ভেতর থেকে যন্ত্রণা দেয় দ্বিতীয় সংকেত কোন জমিনে চাষ দেবো যে - কোথায় সোনার খেতঘরের পাশে ঘর- শুদ্ধবাদী চেঁচিয়ে কয় - ঢুকিসনে বর্বর দেখেও না কোথায় বসে হাসেন পরাশর অঙ্গে অঙ্গে আঘাত করে শাস্ত্রজীবীর বেতকোথায় যাবো সাঁই ডাঙাতে বাঘ জলে কুমির মধ্যখানে ঠাইকালের পরে কাল- ঊর্ধ্বলোকে তাকিয়ে রই বিবস্ত্র কঙ্কাল অলৌকিকের দ্যুলোক জুড়ে আলোর কী আকাল রন্ধ্রে রন্ধ্রে নাচে আমার লৌকিকতার প্রেত
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
দোষ সময়ের নয় অথবা জন্মের কারো কারো ধারণা এমন জন্ম তার ঘটে গেছে অন্যের সময়ে -- অন্ধের হস্তির মত সময়ের লেজ কান শুড় দেহ অথবা চরণ ইত্যাদি বিচ্ছিন্ন সব অনুভব থেকে যারা বেরুতে অক্ষম তারা কি কখনো হয় সময়ের চালক মাহুতঅবক্ষয়ে দৃষ্টি রেখে সমগ্রকে বোঝা এক বিভ্রান্তির নাম বিশ্রামের ছায়া নয় চিন্তার নখের অন্ধকার সেখানে আশ্রয় নিয়ে কেবল নিজের পিঠ আঁচড়ে বিক্ষত করা যায় যন্ত্রণার সেই অঙ্কে হিসাব মিলায় শুধু করণিক মাথা সৃষ্টির চিৎকার তার বুক ফেটে বেরোতে না পেরে আপন অস্তিত্বকেই বমনে ভাসায়--অনন্তের কবি শুধু জন্মান্তর ধরে করে সমগ্রের খোঁজ।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
ইদানীং হুট-হাট চিন্তা তার লম্বা লম্বা পা ফেলে বেড়াতে চলে আসে এসেই স্বভাব মত খুলির ভিতরে ঢুকে মাকড়ের জাল বুনে চলে - আমার ইচ্ছের বিপরীতে সেই জালে ধরা পড়ে বিচিত্র পতঙ্গ-কীট - যেমন কেবল আজ প্রথম সকাল উঁকি দিতে না দিতেই এক উড়ো মাছি এসে জড়িয়ে সেখানে ভন-ভন করে যাচ্ছে - এসব আমার ভালো লাগে না বলেই আমি তাকে যেতে বলি কিন্তু সে জাঁকিয়ে বসে বলে- তার মত এতখানি নিকটের প্রতিবেশী আর কেউ নেই শুধুমাত্র পাগল ছাড়া তার তীক্ষ্ণ নখের আশ্রয়ে আঁচড়ের সুখ থেকে বঞ্চিত থাকে না কোনো মানুষ কখনো- আমারই মগজে আমি এই ভাবে শত্রু পুষে আপ্যায়ন করি বুঝি এর থেকে আর পালাবার পথ নেই কোনো
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
মানবতাবাদী
মানুষের ডাকে জাগতে পারো না জাগতে পারো না হাজারো মৃত্যু শোকে অমন তোমাকে বিনা ভ্রুক্ষেপে মাড়িয়ে যাবেই লোকে ।।ফুলের বিছেনা ভেবে লুকিয়েছো মুখ নিজেকে লুকাতে কিনেছ নিজে অসুখ পরের বিছানো বিছানা সহসা পালটে যাবে পলকে ।।ফুলের গভীর আড়ালে রয়েছে কাটার কঠিন বিষ অথচ তাকেই ভেবেছো তোমার দেব-দেবীর আশিস !মানুষ বোঝোনা বোঝো ক্ষমতার ঘ্রাণ ক্ষমতা বাঁচাতে বেচেছো নিজেরই ত্রাণ পরের হাতে তো চাবিটা দিয়েছো, মুক্তি দেবে বলো কে !!
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রকৃতিমূলক
শেষ যে কবে দেখেছিলাম, বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ ! বাঁশ বাগানই নেই সেখানে, দাঁড়িয়ে তোর ইট-পাথরের কঠিন আর্তনাদ ।।বন বনানী আবাদি খেত ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক খা গিলে খা সবুজ যতো, নদ নদি বিল হোক নিহত বাঁচুক রে তোর সর্বগ্রাসী ক্ষুধাই বেঁচে থাক । ধর্ষিতা এই প্রকৃতিকে রোজ দেখা তোর সর্বনাশের ফাঁদ ।।ফাঁদের পরে ফাঁদ পেতেছিস, এবারে তুই নিজেই ফাঁদে পড়, কে ঠেকাবে অকাল খরা, অকাল প্লাবন, কে ঠেকাবে ঝড় ?সভ্যতা কি এমনই হয়, ক্ষুধা এতোই তার যা পাবে তা খেয়েই যাবে? সব ফুরালে আর কি খাবে ? নিজেই নিজের খাদ্য হবে, কোথায় যাবে আর ? সান্ত্বনা কেউ দেবে না-তো, বলবে না কেউ কাঁদ ওরে তুই কাঁদ ।।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
এখনো প্রানের কম্পন শুনি বুকের ভিতরে চলছে তুমি কেন থেমে - বিনষ্ট প্রেমে আবারো আগুন দিয়ে দেখে নাও, হৃদয় কতোটা জ্বলছে ।।আগুনের প্রতি ফুলকি এ-বুকে কাঁটায় ধন্য ফুল হয় নইলে যে আমি মরে গেছি বলে ভুল হয়। এখনো আতশ বাকি আছে আরো, পোড়া প্রেম তাই বলছে ।।এ-জীবন শুধু জ্বলবে বলে-ই প্রেমের জন্ম বুকটায় পুড়ছে সে তবু আরো পুড়ে পুড়ে সুখ চায়। সুখের নেশায় পেয়ালা ভরানো, বুঝি তাই মন টলছে ।।আতশের ডালি শেষ হলেও-তো জ্বালার তৃষ্ণা রইবেই শ্বাস ছেড়ে তাতে কালো ধোঁয়া ওড়া, সইবেই। শেষের সময় খুশী হয়ে দেখো, পোড়া এক মোম গলছে ।।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
স্বদেশমূলক
১) ১৯৪৭ অতঃপর ------------------------------------- আমার চালায় বিয়োলো গাই সেই সুবাদে খালাতো ভাই ।আমার চালায় গাই থাকবে দুধ দোয়ানোর ঠাই থাকবে ঘাস খাওয়াবো দুধ দোয়াবো দুধের মালিক ভাই থাকবে । ভাই-এ ভাই-এ গলায় গলায় নিজে বলে আমায় বলায় এমন আপন খালাতো ভাই ।।২) ১৯৭১ অতঃপর ------------------------------------- আমার পুকুর আমারই মাছ আমার বোনা জাল সে জাল দিয়ে পুকুর থেকে মাছ ধরেছি কাল । কাটতে পিয়াজ কান্না হলো হাত পুড়িয়ে রান্না হলো কিন্তু সালুন গেলো কোথায় পাইনা খুঁজে তাল, আমার মাথায় বাসন রেখে দাদা গেলেন সালুন চেখে তারই স্বাদে রইলো মেখে আমার ঠোঁটে ঝাল ।।
সুব্রত পুরু
মানবতাবাদী
শামুকখোলে শরীর ঢাকো মুখটি লুকাও শামুকখোলে, নষ্ট সময় নষ্ট সমাজ নষ্টামিতে জীবন দোলে। দুশো ছয়টি হাড়ে গড়া ছিল তোমার অমন দেহ, হাড্ডিবিহীন হলো শরীর হাড়ের দেখা পায় না কেহ। বিবর্তনের ধারায় পড়ে বদল তোমার জেলি ফিসে, মানিয়ে নেওয়াই আসল কথা টিকে থাকায় লজ্জা কিসে! শামুক দেখে ঘেন্না ভরে কত কিছুই বলতে তুমি, নিজেই এখন শামুকখোলে আঁকড়ে থাকো পলল ভূমি। হারিয়ে যাওয়া ডাইনোসরের এখনও আছে ফসিল কত, তোমার এমন হারিয়ে যাওয়ায় ধরণী আজ লজ্জা-নত। শামুকখোলে শরীর ঢাকো মুখটি লুকাও শামুকখোলে, মানুষ কি আর যায় রে হওয়া মানুষবেশেই জন্ম নিলে?
সুনির্মল বসু
হাস্যরসাত্মক
হবুচন্দ্র রাজা বলেন গবুচন্দ্রে ডেকে– “আইন জারী করে দিও রাজ্যেতে আজ থেকে, মোর রাজ্যের ভিতর– হোক্ না ধনী, হোক্ না গরীব, ভদ্র কিংবা ইতর, কাঁদতে কেহ পারবে নাক, যতই মরুক শোকে– হাসবে আমার যতেক প্রজা, হাসবে যত লোকে। সান্ত্রী-সেপাই, প্যায়দা, পাইক ঘুরবে ছদ্মবেশে, কাঁদলে কেহ, আনবে বেঁধে, শাস্তি হবে শেষে।” বলে গবু- “হুজুর– ভয় যদি কেউ পায় কখনো দৈত্য, দানা জুজুর, কিম্বা যদি পিছলে পড়ে মুণ্ডু ফাটায় কেহ, গাড়ীর তলে কারুর যদি থেঁতলিয়ে যায় দেহ; কিম্বা যদি কোনো প্রজার কান দুটি যায় কাটা, কিম্বা যদি পড়ে কারুর পিঠের ওপর ঝাঁটা; সত্যিকারের বিপন্ন হয় যদি, তবুও কি সবাই তারা হাসবে নিরবধি ?” রাজা বলেন- “গবু- আমার আইন সকল প্রজার মানতে হবে তবু। কেউ যদি হয় খুন বা জখম, হাড্ডিতে ঘুণ ধরে, পাঁজরা যদি ঝাঁঝরা হয়ে মজ্জা ঝরে পড়ে, ঠ্যাংটি ভাঙে, হাতটি কাটে, ভুঁড়িটি যায় ফেঁসে, অন্ধকারে স্কন্ধ কাটা ঘাড়টি ধরে ঠেসে, কিম্বা যদি ধড়ের থেকে মুণ্ডুটি যায় উড়ে, কাঁদতে কেহ পারবে নাক বিশ্রী বিকট সুরে। হবুচন্দ্রের দেশে– মরতে যদি হয় কখনো, মরতে হবে হেসে।”পিটিয়ে দিলো ঢ্যাঁড়া গবু, রাজার আদেশ পেয়ে– “কাঁদতে কেহ পারবে না আর, পুরুষ কিম্বা মেয়ে; যতই শোকের কারণ ঘটুক হাসতে হবে তবু, আদেশ দিলেন রাজাধিরাজ হবু; রাজার আদেশ কেউ যদি যায় ভুলে, চড়তে হবে শূলে।”সেদিন হতে হবুর দেশে উল্টে গেল রীতি, হররা-হাসির হট্টগোলে, অট্টহাসির অট্টরোলে, জাগলো তুফান নিতি। হাসির যেন ঝড় বয়ে যায় রাজ্যখানি জুড়ে, সবাই হাসে যখন তখন প্রাণ কাঁপানো সুরে। প্যায়দা পাইক ছদ্মবেশে হদ্দ অবিরত, সবাই হাসে আশে পাশে, বিষম খেয়ে ভীষণ হাসে, আস্তাবলে সহিস হাসে, আস্তাকুঁড়ে মেথর, হাসছে যত মুমূর্ষরা হাসপাতালের ভেতর। আইন জেনে সর্বনেশে ঘাটের মড়া উঠছে হেসে, বেতো-রোগী দেঁতো হাসি হাসছে বসে ঘরে; কাশতে গিয়ে কেশো-বুড়ো হাসতে শুরু করে। হাসছে দেশের ন্যাংলাফ্যাচাং হ্যাংলা হাঁদা যত, গোমড়া উদো-নোংরা-ডেঁপো-চ্যাংরো শত শত; কেউ কাঁদে না কান্না পেলেও, কেউ কাঁদে না গাট্টা খেলেও, পাঠশালাতে বেত্র খেয়ে ছাত্রদলে হাসে, কান্না ভুলে শিশুর দলে হাসছে অনায়াসে।রাজা হবু বলেন আবার গবুচন্দ্রে ডাকি, “আমার আদেশ মেনে সবাই আমায় দিলে ফাঁকি ? রাজ্যে আমার কাঁদার কথা সবাই গেল ভুলে, কেউ গেল না শূলে ? একটা লোকো পেলাম না এইবারে শূলে চড়াই যারে। নিয়ম আমার কড়া– প্রতিদিনই একটি লোকের শূলেতে চাই চড়া। যা হোক, আজই সাঁঝের আগে শূলে দেবার তরে– যে করে হোক একটি মানুষ আনতে হবে ধরে।”গবুচন্দ্র বল্লে হেসে চেয়ে রাজার মুখে, “কাঁদতে পারে এমন মানুষ নাই যে এ মুল্লুকে; আমি না হয় নিজেই কেঁদে আইন ভেঙে তবে চড়ব শূলে, মহারাজের নিয়ম রক্ষা হবে। কিন্তু একি, আমিও যে কাঁদতে গেছি ভুলে, কেমন করে চড়ব তবে শূলে ?” রাজা বলেন, “তোমার মত মূর্খ দেখি না-যে, কাঁদতে তুমি ভুলে গেলে এই ক’দিনের মাঝে। এই দ্যাখো না কাঁদে কেমন করে”– এই না বলে হবু রাজা কেঁদে ফেল্লেন জোরে।মন্ত্রী গবু বল্লে তখন, “এবার তবে রাজা– নিজের আইন পালন করুন গ্রহণ করুন সাজা।” বলেন হবু, “আমার হুকুম নড়বে না এক চুল, আমার সাজা আমিই নেব তৈরি কর শূল !”
সুনির্মল বসু
হাস্যরসাত্মক
তোমরা …যাই বল না ভাই, এমন কী আর খাই! আস্ত পাঁঠা হলেই পরে_ ছোট্ট আমার পেটটা ভরে যদি…তার সঙ্গে ফুলকো-লুচি গণ্ডা বিশেক পাই;- এমন কী আর খাই! চপ কাটলেট পড়লে পাতে, আপত্তি আর নাইকো তাতে, আর…কোপ্তা-কাবাবা-কালিয়াতে অমত আমার নাই; এমন কী আর খাই! হয় না হজম এখন দাদা খাওয়া দাওয়ায়া অনেক বাধা, এখন…তাইতো অনেক বুঝে-সুঝে খাবার খেতে চাই; এমন কী আর খাই! সের পাঁচ-ছোয় রাবড়ি-দধি তোমরা আমায় খাওয়াও যদি, কষ্ট করে ‘এই বয়সেও খেতেও পারি তাই’ এমন কি আর খাই! সন্দেশ আর পান্তুয়াতে, রুচি বিশেষ নাইকো তাতে, আপাতত দুসের হলেই, ঠাণ্ডা হয়ে যাই; এমন কী আর খাই! মা কেঁদে কয় “এমন করে না খেয়ে তুই যাবি মরে- শুকিয়ে শরীর আমসি হল-” কি আর করি ছাই; এমন কি আর খাই!
সুনির্মল বসু
মানবতাবাদী
কিশোর মোরা ঊষার আলো, আমরা হাওয়া দুরন্ত মনটি চির বাঁধন হারা পাখির মত উরন্ত।আমরা আসি এই জগতে ছড়িয়ে দিতে আনন্দ, সজীবতায় ভরিয়ে দিতে এই ধরণীর আনন তো।আমরা সরল কিশোর শিশু ফুলের মত পবিত্র, অন্তরেতে গোপন মোদের শিল্প, গীতি, কবিত্ব।জাগাই যদি, লাগাই তাদের এই দুনিয়ার হিতার্থ, ভবিষ্যতের নবীন ধরা হবেই তবে কৃতার্থ।যে বীজ আছে মনের মাঝে চায় যে তারা আহার্য, ফসল লয়ে ফলবে সে বীজ একটু পেলে সাহায্য।একান্ত যার ইচ্ছা আছে, দাম আছে তার কথার তো, এই জগতে অবশ্য সে মানুষ হবে যথার্থ।শোনরে কিশোর ভাইরা আমার, সত্য পথের শরণ নে, হারিয়ে তোরা যাস নে যেন অমানুষের অরণ্যে।
সুনির্মল বসু
নীতিমূলক
আকাশ আমায় শিক্ষা দিল উদার হতে ভাই রে, কর্মী হবার মন্ত্র আমি বায়ুর কাছে পাই রে।পাহাড় শিখায় তাহার সমান- হই যেন ভাই মৌন-মহান, খোলা মাঠের উপদেশে- দিল-খোলা হই তাই রে।সূর্য আমায় মন্ত্রণা দেয় আপন তেজে জ্বলতে, চাঁদ শিখাল হাসতে মোরে, মধুর কথা বলতে।ইঙ্গিতে তার শিখায় সাগর- অন্তর হোক রত্ন-আকর; নদীর কাছে শিক্ষা পেলাম আপন বেগে চলতে।মাটির কাছে সহিষ্ণুতা পেলাম আমি শিক্ষা, আপন কাজে কঠোর হতে পাষান দিল দীক্ষা।ঝরনা তাহার সহজ গানে, গান জাগাল আমার প্রাণে; শ্যাম বনানী সরসতা আমায় দিল ভিক্ষা।বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র, নানান ভাবে নতুন জিনিস শিখছি দিবারাত্র।এই পৃথিবীর বিরাট খাতায়, পাঠ্য যেসব পাতায় পাতায় শিখছি সে সব কৌতূহলে, নেই দ্বিধা লেশমাত্র।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
ইচ্ছে ছিলো তোমার কাছে ঘুরতে-ঘুরতে যাবোই আমার পুবের হাওয়া। কিন্তু এখন যাবার কথায় কলম খোঁজে অস্ত্র কোথায় এবং এখন তোমার পাশে দাঁড়িয়ে-থাকা কুঞ্জলতায় রক্তমাখা চাঁদ ঢেকেছে আকুল চোখ ও মুখের মলিন আজকে তোমার ভিতর-বাইরে বিষম যুদ্ধ পুবের হাওয়া।।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
তুমুল বৃষ্টিতে সব পাতা ভিজে গেলো এখনই শুকাতে হবে রোদ্দুর কোথায়? তিজেলে চড়াতে হবে অন্ন, তা কোথায়? মানুষ বৃষ্টিতে ভিজে শুকাতেও জানে। এই অন্ন, পাতা-পত্র, এর অন্য মানে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
দূরে যাও থেকো না এখানে চিরদিন উড়ন্ত শাম্পানে ছন্নছাড়া চিঠি তো পুড়েছে একতাড়া আগুনে পুড়েছে শত পাড়াদূরে যাও থেকো না এখানে দূরে যাও থেকো না এখানে কাকে পাও?
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
ভ্রম -- শক্তি চট্টোপাধ্যায়আসলে তুমি ক্ষুদ্র ছোট, ফুলের মত বাগানে ফোটো, বিরহে যদি দাঁড়িয়ে ওঠো ভূতের মত দেখায়, আসলে কেউ বড় হয়না, বড়র মত দেখায় |
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
বাগানে অদ্ভুত গন্ধ, এসো ফিরি আমরা দু'জনে। হাতের শৃঙ্খল ভাঙো, পায়ে পড়ে কাঁপুক ভ্রমর যা-কিছু ধূলার ভার, মানসিক ভাষায় পুরানো তাকে রেখে ফিরে যাই দুজনে দু-পথে মনে মনে।বয়স অনেক হলো নিরবধি তোমার দুয়ার... অনুকূল চন্দ্রালোক স্বপ্নে-স্বপ্নে নিয়ে যায় কোথা। নাতি-উষ্ণ কামনার রশ্মি তার লাক্ষারসে আর ভ'রো না, কুড়াও হাতে সামুদ্রিক আঁচলের সীমা।সে-বেলা গেলেই ভালো যা ভোলাবে গাঢ় এলোচুলে রূপসী মুখের ভাঁজে হায় নীল প্রবাসী কৌতুক; বিরতির হে মালঞ্চ, আপতিক সুখের নিরালা বিষাদেরে কেন ঢাকো প্রয়াসে সুগন্ধি বনফুলে।তারে দাও, কোলে করি অনভিজ্ঞ প্রাসাদ আমার বালকের মৃতদেহ, নিষ্পলক ব্যাধি, ভীত প্রেম। তুমি ফেরো প্রাকৃতিক, আমি বসি কৃত্রিম জীবনে শিল্পের প্রস্রাবরসে পাকে গণ্ড, পাকে মজ্জা কেশ।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
ছাতার নিচে ছড়িয়ে বসছি — বৃষ্টি পড়ে রাত দুপুরে আকাশে চাঁদ শায়া শুকোচ্ছে কি নরম জোছনা-আলোয় আমরা দুজন ছড়িয়ে বসছি, ছাতার নিচে রাতদুপুরে চঞ্চলতার ঝড়কে বলি, বেশতো আছি মন্দে-ভালোয় তুমি বরং বকুলগাছের মগডালে দাও ক্ষিপ্র ঝাঁকি– সঙ্গিনী চায় পাঁচটি কুসুম, উসুম-কুসুম সঙ্গে নিতে আমরা পাথর মস্ত পাথর — তার কাছে সন্দেহ জোনাকি তুচ্ছ এবং দরজিও নয়, তার হাতে কি মানায় ফিতে? আমরা দুজন ছড়িয়ে বসছি–ছাতার নিচে রাতদুপুরে চঞ্চলতার ঝড়কে বলি, বেশ তো আছি মন্দে-ভালোয়।কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
শিশিরভেজা শুকনো খর শিকড়বাকড় টানছে মিছুবাড়ির জনলা দোর ভিতের দিকে টানছে প্রশাখাছাড় হৃদয় আজ মূলের দিকে টানছেভাল ছিলুম জীর্ণ দিন আলোর ছিল তৃষ্ণা শ্বেতবিধুর পাথর কুঁদে গড়েছিলুম কৃষ্ণা নিরবয়ব মূর্তি তার, নদীর কোলে জলাপাহার … বনতলের মাটির ঘরে জাতক ধান ভানছে শুভশাঁখের আওয়াজ মেলে জাতক ধান ভানছে করুণাময় ঊষার কোলে জাতক ধান ভানছে অপরিসীম দুঃখসুখ ফিরিয়েছিলো তার মুখ প্রসারণের উদাসীনতা কোথাও ব’সে কাঁদছে প্রশাখাছাড় হৃদয় আজ মূলের দিকে টানছে
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
একজন দীর্ঘ লোক সামনে থেকে চলে গেলো দূরে — দিগন্তের দিকে মুখ, পিছনে প্রসিদ্ধ বটচ্ছায়া কে জানে কোথায় যাবে— কোথা থেকে এসেছে দৈবাৎ-ই এসেছে বলেই গেলো, না এলে যেতো না দূরে আজ। সমস্ত মানুষ, শুধু আসে বলে, যেতে চায় ফিরে। মানুষের মধ্যে আলো, মানুষেরই ভূমধ্য তিমিরে লুকোতে চেয়েছে বলে আরো দীপ্যমান হয়ে ওঠে — আশা দেয়, ভাষা দেয়, অধিকন্তু, স্বপ্ন দেয় ঘোর। যে যায় সে দীর্ঘ যায়, থাকা মানে সীমাবদ্ধ থাকা। একটা উদাত্ত মাঠে, শিকড়ে কি বসেছে মানুষ-ই? তখন নিশ্চিতই একা, তার থাকা—তার বর্তমানে, স্বপ্নহীন, ঘুমহীন— ধূলা ধূম তাকে নাহি টানে। একজন দীর্ঘলোক সামনে থেকে চলে গেলো দূরে — এভাবেই যেতে হয়, যেতে পারে মানুষ, মহিষ!কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
তোমার হাত যে ধরেইছিলাম তাই পারিনি জানতে এই দেশে বসতি করে শান্তি শান্তি শান্তি তোমার হাত যে ধরেইছিলাম তাই পারিনি জানতে সফলতার দীর্ঘ সিঁড়ি, তার নিচে ভুল-ভ্রান্তি কিছুই জানতে পারিনি আজ, কাল যা-কিছু আনতে তার মাঝে কি থাকতো মিশে সেই আমাদের ক্লান্তির দু-জন দু-হাত জড়িয়ে থাকা–সেই আমাদের শান্তি? তোমার হাত যে ধরেইছিলাম তাই পারিনি জানতে।বেশ কিছুদিন সময় ছিলো–সুদুঃসময় ভাঙতে গড়তে কিছু, গড়নপেটন–তার নামই তো কান্তি? এ সেই নিশ্চেতনের দেশের শুরু না সংক্রান্তি– তোমার হাত যে ধরেইছিলাম তাই পারি নি জানতে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
একটি চেনা পাথর পড়ে আছে পরনে তার অসংখ্য মৌমাছি ভিতরে মৌ–কী জানি কার কাছে ভালোবাসার অমল মালাগাছি?একটি চেনা পাথর পড়ে আছে পাথর, ওকে নাম দিয়েছি ওরা ভয় ক’রে তার শক্তি আগাগোড়াই ঝর্না বলে ডাক দিলে প্রাণ বাঁচে।।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
বেজে ওঠে দূর টেলিফোনে কাঁটাতার ওদিকে যেও না তুমি আর ওদিকে যেও না তুমি আর। আছো তুমি ভালো! দুইটি বিড়াল শাদা-কালো আছে দুই হাতে কথা হবে তোমাতে-আমাতে। সে-কথা কি আজো মনে পড়ে? বেজে ওঠে দূর টেলিফোনে কাঁটাতার ওদিকে যেও না তুমি আর ওদিকে যেও না তুমি আর।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
ভাবছি, ঘুরে দাঁড়ানোই ভাল এত কালো মেখেছি দু হাতে এত কাল ধরে। কখনো তোমার করে, তোমাকে ভাবিনি। এখন খাদের পাশে রাত্তিরে দাঁড়ালে চাঁদ্ ডাকে আয়, আয়, আয়। এখন গঙ্গার তীরে ঘুমন্ত দাঁড়ালে চিতা কাঠ ডাকে আয়, আয়, আয়।যেতে পারি, যেকোনো দিকেই আমি চলে যেতে পারি কিন্তু, কেন যাবো?সন্তানের মুখ ধরে একটি চুমো খাবো যাবো কিন্তু, এখনি যাবো না তোমাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাবো একাকী যাবো না অসময়ে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
ছোট্ট হয়েই আছে আমার, না হয় তোমার, না হয় তাহার বুকের কাছে দুঃখ নিবিড় একটি ফোঁটায় – দুঃখ চোখের জলে দুঃখ থাকে ভিখারিনীর একমুঠি সম্বলে। ছোট্ট হয়েই আছে একের, না হয় বহুর, না হয় ভিড়ের বুকের কাছে। একটি ঝিনুক তাকে জন্ম থেকেই, একটু-আধটু, বাইরে ফেলে রাখে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
একটি জীবন পোড়ে, শুধুই পোড়ে আকাশ মেঘ বৃষ্টি এবং ঝড় ফুলছে নদী যেন তেপান্তর চতুর্দিকে শীতল সর্বনাশে- পেয়েছে, যাকে পায়নি কোনোদিনও একটি জীবন পোড়ে, কেবল পোড়ে আর যেন তার কাজ ছিল না কোনো
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
যদি সারাদিন তাঁকে কাছে পাওয়া যেতো শুনেছি ছিলেন তিনি গাছের বাকলে গা এলিয়ে যতটুকু ছায়া তাঁর প্রয়োজন, ছিলো ততটুকু দক্ষিণ হাওয়ায় উড়ে শুকনো পাতা আসে তাঁর কাছে যেন নিবেদন, যেন মন্ত্র ভাষা ছিন্নভিন্ন মালা তাঁর জন্য ঐ দূর মাঠের রোদ্দুরেও ছিলো জ্বালা কিছুটা রোদ্দুরে হেঁটে, খালি পায়ে পড়েছেন শুয়ে – নিদ্রা নয়, ধ্যান নয়, বেদনার ব্যথার ভিতরে মনোকষ্ট বুকে নিয়ে শুয়ে রয়েছেন একা একা ।যদি সারাদিন তাঁকে কাছে পাওয়া যেতো কাছে পেতে গেলে কাছে যেতে হয়, এভাবে চলে না হাতের সমস্ত সেরে, ধুয়ে-মুছে সংসার, সমাধি – গুছিয়ে-গাছিয়ে রেখে, সাধে ঢেকে – তবে যদি যাও দেখবে, দাঁড়িয়ে আছে গাছ একা দৃষ্টি ক’রে নিচু যেতেও হয়নি তাঁকে, এসেছিলেন তিনি সময়ে গেছেন সময়ে চলে, সেই পথে, যে-পথে যাবার ।কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
ছড়া
আতাচোরা পাখিরে কোন তুলিতে আঁকি রে হলুদ ? বাঁশ বাগানে যাইনে ফুল তুলিতে পাইনে কলুদ হলুদ বনের কলুদ ফুল বটের শিরা জবার মূল পাইতে দুধের পাহাড় কুলের বন পেরিয়ে গিরি গোবর্ধন নাইতে ঝুমরি তিলাইয়ার কাছে যে নদিটি থমকে আছে তাইতে আতাচোরা পাখিরে কোন তুলিতে আঁকি রে —হলুদ ?
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
যেখানেই থাকো এপথে আসতেই হবে ছাড়ান্ নেই সম্বল বলতে সেই দিন কয়েকের গল্প অল্প অল্পই আমি যাই তোমরা পরে এসো ঘড়ি-ঘন্টা মিলিয়ে শাক-সবজি বিলিয়ে তোমরা এসো
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
বুকের মধ্যে বৃষ্টি নামে, নৌকা টলোমলো কূল ছেড়ে আজ অকূলে যাই এমনও সম্বল নেই নিকটে – হয়তো ছিলো বৃষ্টি আসার আগে চলচ্ছক্তিহীন হয়েছি,তাই কি মনে জাগে পোড়োবাড়ির স্মৃতি? আমার স্বপ্নে-মেশা দিনও? চলচ্ছক্তিহীন হয়েছি, চলচ্ছক্তিহীন। বৃষ্টি নামলো যখন আমি উঠোন-পানে একা দৌড়ে গিয়ে ভেবেছিলাম তোমার পাবো দেখা হয়তো মেঘে-বৃষ্টিতে বা শিউলিগাছের তলে আজানুকেশ ভিজিয়ে নিচ্ছো আকাশ-ছেঁচা জলে কিন্তু তুমি নেই বাহিরে- অন্তরে মেঘ করে ভারি ব্যাপক বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে ঝরে!কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
এখন সন্ন্যাসী দুইজন-- একজন আমি আর অন্যজন আমার পিতার মমতাবিহীন চক্ষু মাঝেমধ্যে রাত্রে দেন দেখা যখন একাকী আমি একা মাঝেমধ্যে রাত্রে দেন দেখা কেন তাঁর নামত সন্ন্যাস কেন তিনি মাত্র মায়াহীন মনে ভাবি এমন দেখিনি তাঁকে আগে কোনদিন এখন সন্ন্যাসী দুইজন-- একজন আমি আর অন্যজন আমার পিতার মমতাবিহীন চক্ষু মাঝেমধ্যে রাত্রে দেন দেখা যখন একাকী আমি একা।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
বড় দীর্ঘতম বৃক্ষে ব’সে আছো, দেবতা আমার । শিকড়ে, বিহ্বল প্রান্তে, কান পেতে আছি নিশিদিন সম্ভ্রমের মূল কোথা এ-মাটির নিথর বিস্তারে ; সেইখানে শুয়ে আছি মনে পড়ে, তার মনে পড়ে ?যেখানে শুইয়ে গেলে ধীরে-ধীরে কত দূরে আজ ! স্মারক বাগানখনি গাছ হ’য়ে আমার ভিতরে শুধু স্বপ্ন দীর্ঘকায়, তার ফুল-পাতা-ফল-শাখা তোমাদের খোঁড়া-বাসা শূন্য ক’রে পলাতক হলো ।আপনারে খুঁজি আর খুঁজি তারে সঞ্চারে আমার পুরানো স্পর্শের মগ্ন কোথা আছো ? বুঝি ভুলে গেলে । নীলিমা ঔদাস্যে মনে পড়ে নাকো গোষ্ঠের সংকেত ; দেবতা সুদূর বৃক্ষে, পাবো প্রেম কান পেতে রেখে ।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
সুখের বারান্দা জুড়ে রোদ পড়ে আছে শীতের বারান্দা জুড়ে রোদ পড়ে আছে অর্ধেক কপাল জুড়ে রোদ পড়ে আছে শুধু ঝড় থমকে আছে গাছের মাথায় আকাশমনির ।ঝড় মানে ঝোড়ো হাওয়া, বাদ্ লা হাওয়া নয় ক্রন্দনরঙের মত নয় ফুলগুলি চন্দ্রমল্লিকার ।জয়দেবের মেলা থেকে গান ভেসে আসে সঙ্গে ওড়ে ধুলোবালি, পায়ের নূপুর সুখের চট্ কা ভাঙে গৈরিক আবাসে দিন যায় রে বিষাদে, ষাদে, মিছে দিন যায়…
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রকৃতিমূলক
আজ বাতাসের সঙ্গে ওঠে, সমুদ্র, তোর আমিষ গন্ধ দীর্ঘ দাঁতের করাত ও ঢেউ নীল দিগন্ত সমান করে বালিতে আধকোমর বন্ধ এই আনন্দময় কবরে আজ বাতাসের সঙ্গে ওঠে, সমুদ্র, তোর আমিষ গন্ধ | হাত দুখানি জড়ায় গলা, সাঁড়াশি সেই সোনার অধিক উজ্জ্বলতায় প্রখর কিন্তু উষ্ণ এবং রোমাঞ্চকর আলিঙ্গনের মধেযে আমার হৃদয় কি পায় পুচ্ছে শিকড় আঁকড়ে ধরে মাটির মতন চিবুক থেকে নখ অবধি ? সঙ্গে আছেই রুপোর গুঁড়ো, উড়ন্ত নুন, হল্লা হাওয়ার মধ্যে, কাছে সঙ্গে আছে হয়নি পাগল এই বাতাসে পাল্লা আগল বন্ধ ক’রে সঙ্গে আছে … এক অসুখে দুজন অন্ধ ! আজ বাতাসের সঙ্গে ওঠে, সমুদ্র, তোর আমিষ গন্ধ ।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
অভিনব দুটি হাতে দেয়াল দরোজা খুলে দাও। ততক্ষণে রোদ্দুর পৌচেছে গোটারাত ঘুরে ঘুরে রোদ্দুর পৌঁচেছে ঘরে। কিছুটা নড়বড়ে ছিলো ঘর। এককোণে পাথর তেমন সন্তুষ্ট নয়, ‘দখল দখল শব্দ করে। দাবি তার ঘরটি ভরাবে মানুষের মাথায় চড়াবে তার ভার। আর যদি পারে গিলে খাবে মানুষের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচা অন্ধকারে! তা কি হয়? রোদ্দুরের ফুল ফোটে ঘরে যে-হাতে দরোজা খোলো সেই হাত শানাও পাথরে!
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রকৃতিমূলক
এবার হয়েছে সন্ধ্যা। সারাদিন ভেঙেছো পাথর পাহাড়ের কোলে আষাঢ়ের বৃষ্টি শেষ হয়ে গেলো শালের জঙ্গলে তোমারও তো শ্রান্ত হলো মুঠি অন্যায় হবে না – নাও ছুটি বিদেশেই চলো যে কথা বলনি আগে, এ-বছর সেই কথা বলো।শ্রাবনের মেঘ কি মন্থর! তোমার সর্বাঙ্গ জুড়ে জ্বর ছলোছলো যে কথা বলনি আগে, এ-বছর সেই কথা বলো।এবার হয়েছে সন্ধ্যা, দিনের ব্যস্ততা গেছে চুকে নির্বাক মাথাটি পাতি, এলায়ে পড়িব তব বুকে কিশলয়, সবুজ পারুল পৃথিবীতে ঘটনার ভুল চিরদিন হবে এবার সন্ধ্যায় তাকে শুদ্ধ করে নেওয়া কি সম্ভবে?তুমি ভালোবেসেছিলে সব বিরহে বিখ্যাত অনুভব তিলপরিমাণ স্মৃতির গুঞ্জন – নাকি গান আমার সর্বাঙ্গ করে ভর? সারাদিন ভেঙ্গেছো পাথর পাহাড়ের কোলে আষাঢ়ের বৃষ্টি শেষ হয়ে গেলো শালের জঙ্গলে তবু নও ব্যথায় রাতুল আমার সর্বাংশে হলো ভুল একে একে শ্রান্তিতে পড়েছি নুয়ে। সকলে বিদ্রূপভরে দ্যাখে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
যদি পারো দুঃখ দাও, আমি দুঃখ পেতে ভালোবাসি দাও দুঃখ, দুঃখ দাও – আমি দুঃখ পেতে ভালোবাসি। তুমি সুখ নিয়ে থাকো, সুখে থাকো, দরজা হাট-খোলা।আকাশের নিচে, ঘরে , শিমূলের সোহাগে স্তম্ভিত আমি পদপ্রান্ত থেকে সেই স্তম্ভ নিরীক্ষণ করি। যেভাবে বৃক্ষের নিচে দাঁড়ায় পথিক, সেইভাবেএকা একা দেখি ঐ সুন্দরের সংশ্লিষ্ট পতাকা।ভালো হোক মন্দ হোক যায় মেঘ আকাশে ছড়িয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাওয়া তার বন্ধনে বাহুর। বুকে রাখে, মুখে রাখে – ‘না রাখিও সুখে প্রিয়সখি! যদি পারো দুঃখ দাও আমি দুঃখ পেতে ভালোবাসি দাও দুঃখ, দুঃখ দাও – আমি দুঃখ পেতে ভালোবাসি। ভালোবাসি ফুলে কাঁটা, ভালোবাসি, ভুলে মনস্তাপ – ভালোবাসি শুধু কূলে বসে থাকা পাথরের মতো নদীতে অনেক জল, ভালোবাসা, নম্রনীল জল – ভয় করে।কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
মালবিকা স্তন দাও, দুই স্তনে মাখামাখি করি। যেভাবে পর্বতশীর্ষে টেনে আনি বুকের পাঁজরে সেইভাবে নদী আনি গহ্বরে বুকের, মালবিকা দেহ দাও আলিঙ্গন করি, যেভাবে পর্বত-নদী করি আলিঙ্গন, সেইভাবে, মালবিকা বৃদ্ধে সুখ দাও- অজপা রেখো না তাকে, প্রেম দিতে থাকো।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
চক্রাকারে বসেছি পাঁচজনে মাঠে, পিছনের পর্চে আলো অন্ধকার সন্ধ্যা নামে বিড়ালের মতো ধীর পায়ে তুমি এসে বসেছো আসনে অকস্মাৎ। হঠাৎই পথে ঘুরতে-ঘুরতে কীভাবে এসেছো একেবারে পাশে, তোমার গায়ের গন্ধ নাকে এসে লাগে বৃদ্ধের রোমাঞ্চ হয়! খুব ভালো আছো? অন্তত এখন, তুমি? তুমি ঠিক আছো? না থাকার মানে হয় বিশেষত যখন এসেছো কৃপা করে। কৃপা বাক্যবন্ধ তুমি কিছুতে ছাড়বে না! ছাড়া যায়? কিছুক্ষণ আছো? হ্যাঁ, হাতে সময় আছে তাই, পায়ে পায়ে এখানে এসেছি চলে। শুনেছি, সন্ধ্যার আড্ডা তোমার এখানে যদি ভাগ্য ভালো হয়, দেখা পেয়ে যাবো, ভাগ্য ভালো। এমনই এসেছি, তোমাকে দেখার জন্য আজ কটি দিন কী ইচ্ছা করছিলো। জানালে যেতাম। কিছুতে যেতে না।‘কাল আসবো’ বলে তুমি পালিয়ে এসেছো সেই কাল কবে হবে? ভেবেছি তোমার সময় অত্যন্ত কম, আমি নিজে আসি। আমার সময় আছে…দীর্ঘ অবসর! চক্রাকারে বসেছি পাঁচজনে। পাঁচজনের মধ্যে থেকে একা একা একান্ত দুজন, পাঁচজন বুঝেছে সবই নিচুস্বরে কথা চালাচলি করে যাচ্ছে অহেতুক শ্লথ, পাঁচজনের মধ্যে থেকে একা একা একান্ত দুজন অকস্মাৎ।ধীরে ধীরে রাত বেড়ে যায়। সন্ধ্যার আঁচলে মুড়ে করতল অন্য পাতে পায়– করস্পর্শ। পাখির পালক হাত খেলা করে কর্কশ মুঠিতে, পাঁচজনে সমস্ত দেখে ধীরে ধীরে কোথা উঠে যায় একাকী দুজনে রেখে। চলো পৌঁছে দিয়ে আসি তোমার বাড়িতে। যাবে? কেন নয়। চলো।একগাড়ি আঁধার আজ দক্ষিণে দৌড়ায় দ্রুত। মনে হয়, গতি বড় দ্রুত বিদ্যুতের মতো! কথা বলো। কী কথা বলার? আছে। কাছে আছো, এ যথেষ্ট নয়? যথেষ্ট যথেষ্ট। আজ দিন বড় বেশি কিছু দিল। সত্যি একে দেওয়া বলো এখনো তুমিও।না বলার সাধ্য আছে? বহুদিনই ভাবি, হঠাৎ চলেই যাই, গিয়ে দেখে আসি– আছোটা কেমন? কিন্তু বড়ো ভয় করে যদি তুমি কিছু ভাবো? অন্যের সংসারে ও কেন হঠাৎ আসে? সেই জন্যে ভয়, জড়িয়ে যাবার ভয়, মন্দ ভাগ্যে ভয়! বড়ো দ্রুত যাচ্ছে গাড়ি সমূহ দক্ষিণেগাড়ির আঁধার হলো হাসিতে উজ্জ্বল এবং মধুর গন্ধ ছড়ালো বাতাসে। আবাল্য তোমার কিছু পাওনা রয়ে গেলো। আমি বলি শোধ হয়ে গেছে। আজি, এইমাত্র, এই এতো কাছে পেয়ে জীবনে এতোটা কাছে তোমাকে পাইনি, একা বহুক্ষণ ধরে গাড়ির ভিতরে।গাড়ি বাঁয়ে চলো, গাড়ি এখন দক্ষিণে কিশোর প্রেমের মতো অত্যন্ত রঞ্জিত এই সুসময় আজ দিনশেষে কেন!মূর্ছার ভিতরে নেমে, দু’কদম গিয়ে ফিরে এসেছিলে… আজ নয়, অন্য একদিন। আর দরজা থেকে একা ক্লান্ত ফিরে যাও, দুর্বলতা গলা টিপে আছে, আজ নয়, অন্য কোনদিন আমার সর্বস্ব নিও। আজ নয়, অন্য কোদিন… তুমি হাত দুটি ধরে মুখমণ্ডলের উপরে আগ্নেয় পাত কেন বা ঘটালে? সর্বস্ব পেয়েছি আমি আজই, অকস্মাৎ। সুখে থাকো, আমি ফিরে যাই একা একা।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
ঈশ্বর থাকেন জলে তাঁর জন্য বাগানে পুকুর আমাকে একদিন কাটতে হবে। . আমি একা... ঈশ্বর থাকুন কাছে, এই চাই--জলেই থাকুন! . জলের শান্তিটি তাঁর চাই, আমি, এমনই বুঝেছি কাছাকাছি থাকলে শুনি মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পর্ক রাখাই দায় . তিনি তো মানুষ নন! তা ছাড়াও, দূরের বাগানে --থাকলে, শূন্য দূরত্বও আমাদের সম্পর্ক বাঁচাবে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
একবার তুমি ভালোবাসতে চেষ্টা কর– দেখবে, নদির ভিতরে, মাছের বুক থেকে পাথর ঝরে পড়ছে পাথর পাথর পাথর আর নদী-সমুদ্রের জল নীল পাথর লাল হচ্ছে, লাল পাথর নীল একবার তুমি ভাল বাসতে চেষ্টা কর ।বুকের ভেতরে কিছু পাথর থাকা ভাল–ধ্বনি দিলে প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় সমস্ত পায়ে-হাঁটা পথই যখন পিচ্ছিল, তখন ওই পাথরের পাল একের পর এক বিছিয়ে যেন কবিতার নগ্ন ব্যবহার, যেন ঢেউ, যেন কুমোরটুলির সলমা-চুমকি-জরি-মাখা প্রতিমা বহুদূর হেমন্তের পাঁশুটেনক্ষত্রের দরোজা পর্যন্ত দেখে আসতে পারি ।বুকের ভেতরে কিছু পাথর থাকা ভাল চিঠি-পত্রের বাক্স বলতে তো কিছু নেই–পাথরের ফাঁক-ফোকরে রেখে এলেই কাজ হাসিল– অনেক সময় তো ঘর গড়তেও মন চায় ।মাছের বুকের পাথর ক্রমেই আমাদের বুকে এসে জায়গা করে নিচ্ছে আমাদের সবই দরকার । আমরা ঘরবাড়ি গড়বো–সভ্যতার একটা স্থায়ী স্তম্ভ তুলে ধরবো ।রূপোলি মাছ পাথর ঝরাতে-ঝরাতে চলে গেলে একবার তুমি ভালবাসতে চেষ্টা করো ।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
ভক্তিমূলক
একটি মানুষ দেখেছিলাম, দাঁড়িয়েছিলেন একা হঠাৎ পথে দেখা আমার, হঠাৎ পথে দেখা সবাই তাঁকে দেখতে পায় না সবাই তাঁকে দেখতে পায় না কিন্তু, তিনি দেখেন– কোথায় তোমার দুঃখ কষ্ট, কোথায় তোমার জ্বালা আমায় বলো, আমারই ডালপালা তোমার এবং তোমার, তুমি যেমন ভাবেই কাটো আমি একটু বৃহৎ, তুমি ছোট্ট করেই ছাঁটো লাগবে না লাগবে না আমি কি আর পাথর, আমায় লাগবে একটুতে? মানুষ আমি, কী মনে হয়? মানুষ সহ্য করে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
মনে মনে বহুদূর চলে গেছি – যেখান থেকে ফিরতে হলে আরো একবার জন্মাতে হয় জন্মেই হাঁটতে হয় হাঁটতে-হাঁটতে হাঁটতে-হাঁটতে একসময় যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে পৌঁছুতে পারি পথ তো একটা নয় – তবু, সবগুলোই ঘুরে ফিরে ঘুরে ফিরে শুরু আর শেষের কাছে বাঁধা নদীর দু – প্রান্তের মূল একপ্রান্তে জনপদ অন্যপ্রান্ত জনশূণ্য দুদিকেই কূল, দুদিকেই এপার-ওপার, আসা-যাওয়া, টানাপোরেন – দুটো জন্মই লাগে মনে মনে দুটো জন্মই লাগে
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
অবনী বাড়ি আছো অবনী বাড়ি আছো দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া কেবল শুনি রাতের কড়ানাড়া ‘অবনী বাড়ি আছো?’বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে পরাঙ্মুখ সবুজ নালিঘাস দুয়ার চেপে ধরে– ‘অবনী বাড়ি আছো?’আধেকলীন হৃদয়ে দূরগামী ব্যথার মাঝে ঘুমিয় পড়ি আমি সহসা শুনি রাতের কড়ানাড়া ‘অবনী বাড়ি আছ?’
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
আমার ভিতর ঘর করেছে লক্ষ জনায়– এবং আমায় পর করেছে লক্ষ জনে এখন আমার একটি ইচ্ছে, তার বেশি নয় স্বস্তিতে আজ থাকতে দে না আপন মনে।লক্ষ জনে আমার ভিতর ঘর করেছে, লক্ষ জনে পর করেছে। আমার একটি ইচ্ছা, স্বগতোক্তির মতো–আপন মনে থাকার। যারা থাকতে দিচ্ছে না, তাদের কাছে আমার এই সামান্য নিবেদন বার বার ঘুরে ফিরে এসেছে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
চন্দনের ধূপ আমি কবে পুড়িয়েছি মনে নেই। মন আর স্মৃতিগুলি ধরে না আদরে। সংশ্লিষ্ট চন্দন এই অবহেলা সহ্য করে গেছে। কখনো বলেনি কিছু, বলেনি বলেই পরিত্রাণ পেয়েছে সহজে, নয়তো অসহ্য কুঠারে ধ্বংস হতো।আমার সংহারমূর্তি দেখেছে চন্দন একদিন কিশোর বয়সে, সেই অভিপ্রেত সুকালে, সময়ে। দেখেছে এবং একা-একা ভয়ে-রহস্যে কেঁপেছে– বলেছে, আমার দুটি সুগন্ধি কৌটায় হাত রাখো, পায়ের নখর থেকে জ্বালিও না শিখর অবধি আমি একা, বড়ো একা, চন্দনের গন্ধে উতরোল।।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
শালিখের ডাকে আমি হয়েছি বাহির রোজ ঘর থেকে পাতায় লুকায় সে যে ডেকে জনশূন্য অথচ নিবিড় এ-উঠানে শালিখেরই ভিড়!দুপুরে শালিখের হাতে ভাসিয়ে দিয়েছি অকস্মাতে চেতনার পাখা– ডাকের আড়ালে তার বেদনাই রাখা।সন্ধ্যায় দিলো না আর প্রতি ডাকে সারা শালিখের দল আমার জীবন যেন শ্রুতির নিষ্ফল প্রবাসের পাড়া সন্ধ্যায় দিলো না পাখি প্রতি ডাকে সাড়া।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
যাবো না আর ঘরের মধ্যে অই কপালে কী পরেছো যাবো না আর ঘরে সব শেষের তারা মিলালো আকাশ খুঁজে তাকে পাবে না ধরে-বেঁধে নিতেও পারো তবু সে-মন ঘরে যাবে না বালক আজও বকুল কুড়ায় তুমি কপালে কী পরেছো কখন যেন পরে? সবার বয়স হয় আমার বালক-বয়স বাড়ে না কেন চতুর্দিক সহজ শান্ত হদৃয় কেন স্রোতসফেন মুখচ্ছবি সুশ্রী অমন, কপাল জুড়ে কী পরেছো অচেনা, কিছু চেনাও চিরতরে।কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
ও চির প্রনম্য অগ্নি আমাকে পোড়াও প্রথমে পোঁড়াও ওই পা দুটি যা ছলৎ শক্তি হীন । তারপর যে হাতে আজ প্রেম পরিচ্ছন্নতা কিছু নেই এখন বাহুর ফাদে ফুলের বর এখন কাঁধের পরে দায়িত্বহীনতা ওদের পুঁড়িয়ে এসো , এসো হৃদয়ের কাছে দাঁড়াও লহমা। তারপর ,ধংস করো সত্য মিথ্যা রঙ্গে শীতে স্তব্ধ জ্ঞান পীট । রক্ষা করো, রক্ষা করো দুটি চোখ হয়ত তাদের এখনো দেখার কিছু কিছু বাকী আছে । অশ্রুপাত শেষ হলে , নষ্ট করো আঁখি । কুঁড়িয়ো না ফুলো মালা স্তবক সুগন্ধে আলু থালু প্রিয়কর স্পর্শ ওর গায়ে লেগে আছে গঙ্গা জ্বলে ভেসে যেতে দিও ওকে মুক্ত ,স্বেচ্ছাচারী ও চির প্রনম্য অগ্নি আমাকে পোড়াও ।কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুনও চির প্রনম্য অগ্নি আমাকে পোড়াও প্রথমে পোঁড়াও ওই পা দুটি যা ছলৎ শক্তি হীন । তারপর যে হাতে আজ প্রেম পরিচ্ছন্নতা কিছু নেই এখন বাহুর ফাদে ফুলের বর এখন কাঁধের পরে দায়িত্বহীনতা ওদের পুঁড়িয়ে এসো , এসো হৃদয়ের কাছে দাঁড়াও লহমা। তারপর ,ধংস করো সত্য মিথ্যা রঙ্গে শীতে স্তব্ধ জ্ঞান পীট । রক্ষা করো, রক্ষা করো দুটি চোখ হয়ত তাদের এখনো দেখার কিছু কিছু বাকী আছে । অশ্রুপাত শেষ হলে , নষ্ট করো আঁখি । কুঁড়িয়ো না ফুলো মালা স্তবক সুগন্ধে আলু থালু প্রিয়কর স্পর্শ ওর গায়ে লেগে আছে গঙ্গা জ্বলে ভেসে যেতে দিও ওকে মুক্ত ,স্বেচ্ছাচারী ও চির প্রনম্য অগ্নি আমাকে পোড়াও ।কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
ভাবছি, ঘুরে দাঁড়ানোই ভালো।এতো কালো মেখেছি দু হাতে এতোকাল ধরে! কখনো তোমার ক’রে, তোমাকে ভাবিনি।এখন খাদের পাশে রাত্তিরে দাঁড়ালে চাঁদ ডাকে : আয় আয় আয় এখন গঙ্গার তীরে ঘুমন্ত দাঁড়ালে চিতাকাঠ ডাকে : আয় আয়যেতে পারি যে-কোন দিকেই আমি চলে যেতে পারি কিন্তু, কেন যাবো?সন্তানের মুখ ধরে একটি চুমো খাবোযাবো কিন্তু, এখনি যাবো না তোমাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাবো একাকী যাবো না, অসময়ে।।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
দিনরাত মৃত্যু চলে সন্তান অবধি। দেখা তো হয়েছে ক্রূর যমের সহিত, তাকে বলা গেছে, আমি একাকীই যাবো। গঙ্গার তরঙ্গভঙ্গে নিভে যাবে আলো, আমি যাবো, সঙ্গে নিয়ে যাবো না কারুকে একা যাবো দিনরাত মৃত্যু চলে সন্তান অবধি!
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
মনে পড়ে স্টেশন ভাসিয়ে বৃষ্টি রাজপথ ধ’রে ক্রমাগত সাইকেল ঘন্টির মতো চলে গেছে, পথিক সাবধান… শুধু স্বেচ্ছাচারী আমি, হাওয়া আর ভিক্ষুকের ঝুলি যেতে-যেতে ফিরে চায়, কুড়োতে-কুড়োতে দেয় ফেলে যেন তুমি, আলস্যে এলে না কাছে, নিছক সুদূর হয়ে থাকলে নিরাত্মীয় ; কিন্তু কেন? কেন, তা জানো না। মনে পড়বার জন্য? হবেও বা । স্বাধীনতাপ্রিয় ব’লে কি আক্ষেপ? কিন্তু বন্দী হয়ে আমি ভালো আছি।তবু কোনো খর রৌদ্রে, পাটকিলে কাকের চেরা ঠোঁটে তৃষ্ণার চেহারা দেখে কষ্ট পাই, বুঝে নিতে পারি জলের অভাবে নয়, কোন টক লালার কান্নায় তার মর্মছেঁড়া ডাক; কাক যেন তোমারই প্রতীক রূপে নয়, বরং স্বভাবে – মনে পড়ে, মনে পড়ে যায় কোথায় বিমূঢ় হয়ে বসে আছো হাঁ-করা তৃষ্ণায়!
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
পথের উপর একটি গাছের মধ্যে আপন অন্য গাছের গভীর কাছে-থাকার দৃশ্য দেখতে-দেখতে দেখতে-দেখতে আমার মনে পড়লো, আমি আগাগোড়াই ভীষণ একা। . গাছ দুটি কি সবার দেখা? গাছটি কি নয় সবার দেখা? . এমন কথা ভাবতে-ভাবতে, আলতো কথা ভাবতে-ভাবতে পুকুরে মুখ গেলাম ধুতে আর একটি মুখ আমায় ছুঁতে — আসতে-আসতে ভাসতে গেলো যেভাবে যায়, সক্কলে যায়, যেমনভাবে যাবার কথা একলা রেখে।কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
ছেলেটা খুব ভুল করেছে শক্ত পাথর ভেঙে মানুষ ছিলো নরম, কেটে, ছড়িয়ে দিলে পারতো । অন্ধ ছেলে, বন্ধ ছেলে, জীবন আছে জানলায় পাথর কেটে পথ বানানো , তাই হয়েছে ব্যর্থ । মাথায় ক্যারা , ওদের ফেরা যতোই থাক রপ্ত নিজের গলা দুহাতে টিপে বরণ করা মৃত্যু ছেলেটা খুব ভুল করেছে শক্ত পাথর ভেঙে মানুষ ছিলো নরম, কেটে , ছড়িয়ে দিলে পারতো। পথের হদিস পথই জানে, মনের কথা মত্ত মানুষ বড় শস্তা , কেটে, ছড়িয়ে দিলে পারতো ।কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
ভক্তিমূলক
বার বার নষ্ট হয়ে যাই প্রভু, তুমি আমাকে পবিত্র করো, যাতে লোকে খাঁচাটাই কেনে, প্রভু নষ্ট হয়ে যাই বার বার নষ্ট হয়ে যাই একবার আমাকে পবিত্র করো প্রভু,  যদি বাঁচাটাই মুখ্য, প্রভু, নষ্ট হয়ে যাই!
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
ওইখানে ওই বাগানে তার ফুল ফুটেছে কতো জানতে পারি, ওর মধ্যে কি একটি দেবার মতো? একটি কিম্বা দুটির ইচ্ছে আসতে আমার কাছে তাহার পদলেহন করতে সমস্ত ফুল আছে। সব ফুলই কি গোষ্ঠীগত, সব ফুলই কি চাঁদের একটি দুটি আমায় চিনুক, বাদবাকি সব তাঁদের গাছ তো তাঁহার বাগানভর্তি, আমার রোপণ ছায়া– প্রবীণ তাঁদের ভালোবাসা, আমার বাসতে চাওয়াই।।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
তুচ্ছ এইসব–এই জানালা কপাট গোরস্থান তুচ্ছ, তুচ্ছ এইসব, ভালোবাসা, ভালো-মন্দে বাসা তুচ্ছ, তুচ্ছ, এইসব জানালা কপাট গোরস্থান…তারপর, কে আছো মন্দিরে? মন্দিরে ভিতে কি ফড়িং? ভালোবাসা মানে এক হিম অন্ধকার খুঁজে নিয়ে পুঁতে ফেলা অশ্লীল ডালিমতারপর, কে আছো মন্দিরে? আমি যাই ভিত্তি খুঁড়ে খুঁড়ে আমি যাই ভিত্তি খুঁড়ে খুঁড়ে…
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
আমার কাছে এখনো পড়ে আছে তোমার প্রিয় হারিয়ে যাওয়া চাবি কেমন করে তোরংগ আজ খোলো?থুতনিপরে তিল তো তোমার আছে এখন? ও মন নতুন দেশে যাবি? চিঠি তোমায় হঠাত্‍ লিখতে হলো ।চাবি তোমার পরম যত্নে কাছে রেখেছিলাম, আজই সময় হলো - লিখিও, উহা ফিরত্‍ চাহো কিনা?অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে তোমার মুখ অশ্রু-ঝলোমলো লিখিও, উহা ফিরত্‍ চাহো কি না?
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
রূপক
জন্মদিনে কিছু ফুল পাওয়া গিয়েছিলো। অসম্ভব খুশি হাসি গানের ভিতরে একটি বিড়াল একা বাহান্নটি থাবা গুনে গুনে উঠে গেলো সিঁড়ির উপরে লোহার ঘোরানো সিঁড়ি, সিঁড়ির উপরে সবার অলক্ষ্যে কালো সিঁড়ির উপরে। শুধু আমিই দেখেছি তার দ্বিধান্বিত ভঙ্গি তার বিষণ্ণতা।জন্মদিনে কিছু ফুল পাওয়া গিয়েছিলো এখন শুকিয়ে গেছে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
শুয়ো না কখনো দিনে মৃত ঝরা বাতিটার পাশে। ও কার চোখের জল ও কার মুখের মতো ম্লান; প্রতিকূল হাওয়া এসে দাঁড়ালেই শুরু বালি খসা খুঁজি সে সোনালি চুল চুল চুল তখনো আকাশে।পাই না; ঘুরায়ে তালু মুছে দেবো চোখের আভাস হে বিষণ্ণ মর্মরের ফোঁটা যেন নীরবে সাজানো দেবতা, সুদূর স্মৃতি; প্রতিমা কি প্রচ্ছায়া তোমার। পুরানো ধূলায় খুঁজি, ধূলা হতে পুরানো হৃদয়ে।কখন ঢেকেছি মুখ আপনার দুঃখ মুছে নিতে বেদনা, অপর কষ্ট; এবং উজ্জ্বল বাতায়নে প্রকৃতির সম্ভাবন, স্থিতি, সুখ উত্তাল মৌসুমী... আতিশয্য দেখে চোখ অকারণ গলে গেছে কিনাজানি না; সে-স্বপ্নে রাতে অবশ্য তন্দ্রায় গাঢ় প্রেম তোমার মুখের 'পরে, বুকে, নাতিশীতল হৃদয়ে আমারি চোখের অশ্রু, অকস্মাৎ স্খলিত বিন্যাস... দুঃখের মুকুর তুমি অন্ধকারে আমার সান্ত্বনা॥
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
সাড়ে ছয় হাতে দেহ জড়াবে নিশ্চয়, থানকাপড়ের গন্ধ আর জাগাবে না মৃত্যু নয়, প্রসঙ্গত মূর্ছা মনে হবে।কিছু কাঠকুটো আমি উঠোনে রেখেছি কাচের বয়ামে আছে পুরাতন ঘৃত তাহলে তো মূর্ছা নয়, মানুষটি মৃত।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রকৃতিমূলক
হেমন্ত যেখানে থাকে, সেখানে কৌতুক থাকে গাছে সাড়া থাকে, সচ্ছলতা থাকে। মানুষের মতো নয়, ভেঙে ভেঙে জোড়ার ক্ষমতা গাছেদের কাছে নেই হেমন্ত বার্ধক্য নিতে আসে খসায় শুকনো ডাল, মড়া পাতা, মর্কুটে বাকল এইসব। হেমন্ত দরোজা ভেঙে নিয়ে আসে সবুজ নিশ্বাস… মানুষের মতো নয় রক্তে পিত্তে সৌভাগ্য সরল শিশুটির মতো রাঙা ক্রন্দন ছিটিয়ে চারিপাশে হেমন্ত যেখানে থাকে, সেখানে কৌতুক থাকে গাছে।।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
চারধারে তার উপঢৌকন, কিন্তু আছে স্থির, দুহাত মুঠিবদ্ধ কিন্তু ভিতরে অস্থির। কেউ তাকে দ্যাখেনি হতে, উচিত ভেবে সব ফিরিয়ে দিল, তার ছিলো এক কঠিন অনুভব।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রকৃতিমূলক
আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি এমন ছিলনা আষাঢ় শেষের বেলা উদ্যানে ছিল বরষা-পীড়িত ফুল আনন্দ ভৈরবী।আজ সেই গোঠে আসেনা রাখাল ছেলে কাঁদেনা মোহনবাঁশিতে বটের মূল এখনো বরষা কোদালে মেঘের ফাঁকে বিদ্যুৎ-রেখা মেলে।সে কি জানিতনা এমনি দুঃসময় লাফ মেরে ধরে মোরগের লাল ঝুঁটি সে কি জানিতনা হৃদয়ের অপচয় কৃপণের বামমুঠি।সে কি জানিতনা যত বড় রাজধানী তত বিখ্যাত নয় এ হৃদয়পুর সে কি জানিতনা আমি তারে যত জানি আনখ সমুদ্দুর।আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি এমন ছিলনা আষাঢ় শেষের বেলা উদ্যানে ছিল বরষা-পীড়িত ফুল আনন্দ ভৈরবী।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
দুঃখকে তোমার কোনো ভয় নেই, সেও ভালোবাসে ভালোবাসা থেকে তুমি ভয় পাও? সুখ থেকে পাও? উল্লেখযোগ্যতা যদি নিয়ে যায় সমুদ্রের তীরে– সেখানে তোমার ভয় আছে নাকি? আনন্দও আছে? তীরে সারবন্দী গাছ, সেখানে ভূমিষ্ঠ ছায়াতলে যদি তুমি একবার গিয়ে বসো পাথরের মতো তবেও তোমার ভয়? ভয় সবখানে! তোমার অবোধ ভয় থেকে আমি পাই অন্য মানে। দুঃখকে তোমার কোন ভয় নেই, সেও ভালোবাসে…
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
মানবতাবাদী
বছর-বিয়োনী মেঘ বৃষ্টি দেয়, বজ্রপাত দেয়– ডোবা’র রহস্য বাড়ে, পদ্মপাতা দীঘিতে তছনছ। শিকড়, কেঁচোর মত, জীবনের অনুগ্রহ পায়, পায় না মাথায় ছাতা, এত হাতা ভাতের মানুষও!মানুষ বারুদ খুবই ভালোবাসে, ধূপগন্ধ যেনআকাশপিদ্দিম গেঁথে মন্ত্রী যায় সানাই বাজাতে, পুলিস-মেথর যায় ঝাঁটা হাতে জানাতে বিদায়– দুষ্টু গরুর চেয়ে শূন্য গোয়ালই, লাগে ভালো।সমস্যার সমাধান পায় ভূয়োদর্শী রাজবাড়ি– অত্যন্ত সহজে, শুধু মানুষ পাথর নয় ব’লে পরিত্রাণ পেয়ে যায়। অথচ পাথরে যদি মারো, ঘা দাও, অমনি বগা ফোঁস করে, ঐতিহ্যমন্ডিত দেশের পাথর যদি ছেদ্‌রে যায়, বিদেশ কী কবে! ছাত নেই, ভাত নেই – কোন্‌ কাম পাথরে, মচ্ছবে– তোমাদের?
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
জঙ্গলে গিয়েছো তুমি একা একা, জঙ্গলে যেও না তুমি, মানে তুমি, মানে তুমি, ভুল বৃদ্ধ–ওহে তুমি জঙ্গলে গিয়েছো একা? হারিয়েছো পথ? সর্বস্ব হারিয়ে কোনো অন্নপূর্ণা গাছ ধরে জড়িয়ে কেঁদেছো? পাতা চেয়ে ফুলে চেয়ে রস-আঠা চেয়ে দাঁড়িয়েছো? ঠায় গাছ যেভাবে দাঁড়িয়ে আছে বহুদিন ধরে একা, তার আর্শি হয়ে, পারা-চটা আর্শি হয়ে, সিঁথির সিঁদুর হয়ে, পা-র আলতা হয়ে তুমি দাঁড়িয়েছো কিনা! নিজেও জানো না,–এই জানা, বহু অর্থ দাবি করে, দাবি রক্ত, অসম্মান, তুলোধোনা পিছমোড়াবাঁধা সিঁড়ি ভেঙে বস্তার গড়ানো, দাবি–চাবি নিয়ে রুগ্ন তালা খোলা দাবি তার বহুবিধ, দাবি তার সন্ন্যাস গৃহেই, দাবি ছেঁড়াখোঁড়া জামা নিচে নামা, গড়াতে গড়াতে–যেভাবে পাথর নামে, গাছ নামে, মানুষেও নামে ভয়ে পেয়ে নয়, শুধু তাড়া আছে বলে, তার কমলার বন থেকে, ভুটান পাহাড় থেকে মানুষ যেভাবে নেমে আসে, নেমে থমকে যায়, ধাক্কা খেতে হবে বলে এই ভয়ে চুরমার হতে হবে এই ভয়ে, থমকে, থেমে, পা তুলে দাঁড়ায় ভাস্করের, ছেনি-কাটা ঘোড়ার উড়ন্ত ব্রোন্‌জ যেভাবে দাঁড়ায় সেইভাবে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
সকল প্রতাপ হল প্রায় অবসিত জ্বালাহীন হৃদয়ের একান্ত নিভৃতে কিছু মায়া রয়ে গেলো দিনান্তের, শুধু এই – কোনোভাবে বেঁচে থেকে প্রণাম জানানো পৃথিবীকে। মূঢ়তার অপনোদনের শান্তি, শুধু এই – ঘৃনা নেই, নেই তঞ্চকতা, জীবনজাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক, বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
ছড়া
ছড়া এক্কে ছড়া, ছড়া দুগুণে দুই ছড়ার বুকের মদ্দিখানে পান্‌সি পেতে শুই। ধানের ছড়া গানের ছড়া ছড়ার শতেক ভাই ছড়ার রাজা রবিন ঠাকুর, আর রাজা মিঠাই। আরেক রাজা রায় সুকুমার, আছেন তো স্মরণে? আর ছড়াকার ঘুমিয়ে আছেন সব শিশুদের মনে। ছড়ার আমি ছড়ার তুমি ছড়ার তাহার নাই ছড়া তো নয় পালকি, বাপা, ছজন কাহার চাই! ছড়া নিজেই বইতে পারে কইতে পারে, দুইই– বাংলা ভাষা মায়ের ভাষা তার তুলোতে শুই।।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
ভালো, এই ভালো, এই সম্পর্কে জটিল হাওয়া লাগা। কতদিনে হবে? মুক্তি, ওই তার ছিঁড়ে দেয়াল ডিঙিয়ে ভেঙে নয় কোনকিছু, শক্তি ভেঙে নয় সম্মুখে সর্বস্ব বাধা–তাও ভেঙে নয় শুধু ডানা পেলে উড়ে অথবা ডিঙিয়ে ছিঁচকে কাজ, যা করে নির্বোধ চোর তাই করে, শুধু তাই করে আর কিছু নয় আর কিছু করতেও পারে না।।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
ওই বাড়ি, শিরীষের পাতায় আহত… এ-সত্য মৃত্যুর হিম ছোঁয়া দিয়ে তাকে ব’লে যাবে, আজই নয়, কিন্তু কাল তোর মসৃণ চূড়াটি ভাঙবো, পলেস্তরা খশাবো পীযূষে ভাঙবো, ভেঙে টুকরো করবো ইট কাঠ পাথর প্রতিমা শব্দের…শিরীষ তাই ছুঁয়ে গেলো মহিমা দুপুরে চুল-নাড়া খুশকি যেন, বালক বোকার পচা রাগ নিতান্ত সামান্য তার ঝরে-পড়া ধেয়ানি শহরে মসজিদের পাশাপাশি, কাঁচা ফল রোদের উপর ভয়ংকর ম্লান পাতা, তবু কত চোখ উন্নাসিক দ্যাখে ব্যস্ত চঞ্চল রঙিন চুড়ো-করা উড়ো মেয়ে পাগল একটি শুধু স্পৃষ্ট হয় হেমন্তবিদ্যুতে বলে, থাকো, চেয়ে থাকো, মৃত্যু এসে দাঁড়াবে এখানে পুলিশের মতো স্পষ্ট, হেমন্তের পাতায় আহত থাকো, তুমি চেয়ে থাকো–মুহূর্তে শতাব্দী সৃষ্টি হবে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
প্রেমমূলক
ভালোবাসা নিয়ে কত বিবাদ করেছো! এখন, টেবিল জোড়া নিবন্ত লণ্ঠনও সহনীয়। অনুভূতি। সবজির মতন বিকোয় না হাটে। হাত কাটে, না রক্ত পড়ে না। বিভীষিকা! দুচোখের পক্ষেও নড়ে না। প্রজড় পিণ্ডের মতো আছো– আজই বিবাদ করেছো। ভালোবাসা নিয়ে কিছু বিবাদ করেছো, কাতর পাথর মিছু বিবাদ করেছো!
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
চিন্তামূলক
মাঠের ধারে গড়েছে মিস্তিরি হলুদবাড়ি, সামান্য তার উঠান ইটের পাঁচিল, জাফরি-কাটা সিঁড়ি এই সমস্ত – গড়েছে মিস্তিরি।বাড়ির ওপর তার যে ছিলো কী টান মুখের মতো রাখতো পরিপাটি যাতে বিফল বলে না, বিচ্ছিরি কিংবা শূন্য সম্মেলনের ঘাঁটিমাঠের ধারে গড়েছে মিস্তিরি হলুদবাড়ি – যেখানে মেঘ করে এবং দোলে জাফরি-কাটা সিঁড়ি ভাগ্যবিহীন, তুচ্ছ আড়ম্বরে।হঠাৎ সেদিন সন্ধ্যাবেলা সড়ক কাঁপিয়ে গাড়ি দাঁড়ালো দক্ষিণে দৌড়ে এলো মজা দেখার মড়ক নিলেন তিনি সকল অর্থে কিনে।লোকালয়ের বাহির দিয়ে সিঁড়ি বদল করে দিলো না মিস্তিরি!কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পাতায় যেতে এখানে ক্লিক করুন
অমিতাভ দাশগুপ্ত
মানবতাবাদী
আজ রাতে .          যখন চারপাশ সুনসান, মশারির অনের নিচু থেকে .                  অম্লজান টানার শব্দ, গলি-উপগলি-কানাগলির শিরায়, টানেলে .                                     ঝুপঝাপ অন্ধকার, গাড়িবারান্দার নীচে .                     ঘর-ছুট্ মানুষ আর আকাশের অশ্রুর লবণ মিলে-মিশে একাকার, .                           শ্যামবাজারের পঞ্চমুখী মোহনায় নেতাজী সুভাষচন্দ্রের ঘোড়ার লেজের ওপর .                           ঘনঘন ছিপ্ টি মারছে বিদ্যুৎ বেশ্যার থালার ওপর .                    মাংসভুক পুলিশের থাবা, শ্মশানে-শ্মশানে চিতার আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসে থাকা মানুষজনের হাতে হাতে ভোলাবাবার ধোঁয়াটে প্রসাদ, তিন ইঁটের উনুনে টগবগ শাকপাতায় ত্রিনয়ন রেখে ফুটপাথের অন্নপূর্ণা, তাকে ঘিরে .            কয়েকটি হাভাতে-জাতকের ছায়া পাতালের দরজায় ঘাতক, হাসপাতালের দরজায় মরণ . . . ঠিক তখনই .           আমি তোমাকে এই চিঠি লিখতে বসেছি, জুলিয়াস সিজার! তোমাকে তিনবার মুকুট সাধা হয়েছিল। তিনবার তুমি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলে। কাস্ কা, ব্রুটাস, অ্যান্টনিদের ভীড় থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে এক গোলার্ধ থেকে আরেক গোলার্ধ .                                 তোমার পায়ের শব্দ, আগুনের কপাট-খোলা সব কটি চুল্লি এখন তোমার হাঁ-মুখ, আকাশ-প্রেমিক সোনালি অ্যাপার্টমেন্ট-এর মাথায় জ্বল জ্বল তোমার লাল চোখ,চিমনির ধোঁয়ায় গঙ্গার জলে বেবিফুডহীন শিশুদিবসের কালো আকাশে তোমার নিশ্বাসের বিষ, কলকাতার প্রতিটি মানুষের ঘাড়ের ওপর .              নেকড়ের মত গড়িয়ে ওঠা তোমার উল্লাস আমার হাতে তুলে নিয়েছি এই একাঘ্ন এই ক্ষমাহীন কলম যা দিয়ে আজ রাতে আমি তোমাকে চিঠি লিখতে বসেছি, .                             জুলিয়াস সিজার!তোমার শববাহকেরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরম অধীরতায় পাথুরে রাস্তায় জুতোর নালের শব্দ তুলছে, কালো কাপড় তোমাকে ঢেকে দেবে বলে অতিকায় ডানা মেলে .                  ছটফট করছে হাওয়ায় হাওয়ায়, হাজা-মজা মানুষের হাতে হাতে উঠে আসছে .                     প্রত্নের পাথর, কুষ্ঠরোগীর শক্ত মুঠি .              পাল্টে যাচ্ছে গ্রেনেডে, তোমার মধ্যরাতের সুরায় মিশে যাচ্ছে নিহত ভূমিপুত্রের বুক ভেঙে উঠে আসা .                                        আর্সেনিক, তোমার প্রিয় গোলাপের পাপড়ির আড়ালে অপেক্ষায় স্থির বজ্রকীট, ভিখারি ক্রীতদাস ধর্ষিতা কিশোরী অপমানিত বিদূষকদের চোখ আর আমার চিঠির প্রতিটি অক্ষর নিবু নিবু লণ্ঠনের আলোয় তোমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কত কল্পান্তের শেষে টেনে নিয়ে এসেছে আজ এই রাতে বলির বাজনায় ঝা ঝা মশানভাঙার মাটিতে।এই স্পার্টাকাস-রাত আর এই একাঘ্নী চিঠি তোমার শববাহকদের সঙ্গে শেষবারের মতো কিছু জরুরি কথাবার্তা সেরে নিচ্ছে, .                    জুলিয়াস সিজার!কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন আজ রাতে .          যখন চারপাশ সুনসান, মশারির অনের নিচু থেকে .                  অম্লজান টানার শব্দ, গলি-উপগলি-কানাগলির শিরায়, টানেলে .                                     ঝুপঝাপ অন্ধকার, গাড়িবারান্দার নীচে .                     ঘর-ছুট্ মানুষ আর আকাশের অশ্রুর লবণ মিলে-মিশে একাকার, .                           শ্যামবাজারের পঞ্চমুখী মোহনায় নেতাজী সুভাষচন্দ্রের ঘোড়ার লেজের ওপর .                           ঘনঘন ছিপ্ টি মারছে বিদ্যুৎ বেশ্যার থালার ওপর .                    মাংসভুক পুলিশের থাবা, শ্মশানে-শ্মশানে চিতার আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসে থাকা মানুষজনের হাতে হাতে ভোলাবাবার ধোঁয়াটে প্রসাদ, তিন ইঁটের উনুনে টগবগ শাকপাতায় ত্রিনয়ন রেখে ফুটপাথের অন্নপূর্ণা, তাকে ঘিরে .            কয়েকটি হাভাতে-জাতকের ছায়া পাতালের দরজায় ঘাতক, হাসপাতালের দরজায় মরণ . . . ঠিক তখনই .           আমি তোমাকে এই চিঠি লিখতে বসেছি, জুলিয়াস সিজার! তোমাকে তিনবার মুকুট সাধা হয়েছিল। তিনবার তুমি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলে। কাস্ কা, ব্রুটাস, অ্যান্টনিদের ভীড় থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে এক গোলার্ধ থেকে আরেক গোলার্ধ .                                 তোমার পায়ের শব্দ, আগুনের কপাট-খোলা সব কটি চুল্লি এখন তোমার হাঁ-মুখ, আকাশ-প্রেমিক সোনালি অ্যাপার্টমেন্ট-এর মাথায় জ্বল জ্বল তোমার লাল চোখ,চিমনির ধোঁয়ায় গঙ্গার জলে বেবিফুডহীন শিশুদিবসের কালো আকাশে তোমার নিশ্বাসের বিষ, কলকাতার প্রতিটি মানুষের ঘাড়ের ওপর .              নেকড়ের মত গড়িয়ে ওঠা তোমার উল্লাস আমার হাতে তুলে নিয়েছি এই একাঘ্ন এই ক্ষমাহীন কলম যা দিয়ে আজ রাতে আমি তোমাকে চিঠি লিখতে বসেছি, .                             জুলিয়াস সিজার!তোমার শববাহকেরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পরম অধীরতায় পাথুরে রাস্তায় জুতোর নালের শব্দ তুলছে, কালো কাপড় তোমাকে ঢেকে দেবে বলে অতিকায় ডানা মেলে .                  ছটফট করছে হাওয়ায় হাওয়ায়, হাজা-মজা মানুষের হাতে হাতে উঠে আসছে .                     প্রত্নের পাথর, কুষ্ঠরোগীর শক্ত মুঠি .              পাল্টে যাচ্ছে গ্রেনেডে, তোমার মধ্যরাতের সুরায় মিশে যাচ্ছে নিহত ভূমিপুত্রের বুক ভেঙে উঠে আসা .                                        আর্সেনিক, তোমার প্রিয় গোলাপের পাপড়ির আড়ালে অপেক্ষায় স্থির বজ্রকীট, ভিখারি ক্রীতদাস ধর্ষিতা কিশোরী অপমানিত বিদূষকদের চোখ আর আমার চিঠির প্রতিটি অক্ষর নিবু নিবু লণ্ঠনের আলোয় তোমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে কত কল্পান্তের শেষে টেনে নিয়ে এসেছে আজ এই রাতে বলির বাজনায় ঝা ঝা মশানভাঙার মাটিতে।এই স্পার্টাকাস-রাত আর এই একাঘ্নী চিঠি তোমার শববাহকদের সঙ্গে শেষবারের মতো কিছু জরুরি কথাবার্তা সেরে নিচ্ছে, .                    জুলিয়াস সিজার!
অমিতাভ দাশগুপ্ত
স্বদেশমূলক
আমার হাতে কোনও শাবল ছিল না, বাটালিও নয়, তবু, এতদিন তিলে তিলে গড়ে তোলা দুর্গ এক দুপুরের বৃষ্টিতে কীভাবে ধুয়ে গেল! আর ওই বিশাল পাথুরে অবরোধ-ই যে আড়াল করে রেখেছিল হার্মাদের মত এক খ্যাপা নদী, এতকাল .         তা আমি জানতেও পারিনি।সেই অর্গলহীন সজল সারাদিন, সারারাত আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে। ওই ভেসে যাচ্ছে আমার অঙ্গদ, শিরস্ত্রাণ, আবরণহীন ভাসতে ভাসতে আমি চড়তে পারছি গাঢ় দীঘিকার চেয়ে সজল তোমার দু চোখের ভাষা, আমি শুনতে পাচ্ছি সমুদ্রের নাভি থেকে উঠে আসা .        মারমেইডস-এর গলায় তোমার গান, দিশেহারা, ওলোট-পালোট ঢেউয়ে ধুয়ে যাচ্ছে আমার গার্হস্থ্য-সন্ন্যাস, জোয়ারে জোয়ারে .         এ তোমাকে কোথায় নিয়ে চলেছে, .         আমার নীরবতা আমার ভাষা। স্টেন গানের বুলেটে বুলেটে আমার ঝাঁঝরা বুকের উপরে ফুটে উঠেছে যে মানচিত্র— তার নাম ভারতবর্ষ।আমার প্রতিটি রক্তের ফোঁটা দিয়ে চা-বাগিচায় কফি খেতে, কয়লা-খাদানে, পাহাড়ে-অরণ্যে লেখা হয়েছে যে ভালোবাসা— তার নাম ভারতবর্ষ।আমার অশ্রুর জলসেচে আর হাড়ের ফসফেট-এ খুনীর চেয়েও রুক্ষ কঠোর মাটিতে বোনা হয়েছে যে-অন্তহীন ধান ও গানের স্বপ্ন— তার নাম ভারতবর্ষ।আমার ঠাণ্ডা মুখের ওপর এখন গাঢ় হয়ে জমে আছে ভাক্ রা নাঙ্গালের পাথুরে বাঁধের গম্ভীর ছায়া। ডিগবয়ের বুক থেকে মায়ের দুধের মত উঠে আসা তোলো ভেসে যাচ্ছে আমার সারা শরীর।কপাল থেকে দাঙ্গার রক্ত মুছে ফেলে আমাকে বুকে ক’রে তুলে নিতে এসেছে আমেদাবাদের সুতোকলের জঙ্গী মজুর। আমার মৃতদেহের পাহারাদার আজ প্রতিটি হাল বহনকারী বলরাম। প্রতিটি ধর্ষিতা আদিবাসী যুবতীর শোক নয় ক্রোধের আগুনে দাউ দাউ জ্বলে যাচ্ছে আমার শেষ শয্যা।ভরাট গর্ভের মত আকাশে আকাশে কেঁপে উঠছে মেঘ। বৃষ্টি আসবে। ঘাতকের স্টেনগান আর আমার মাঝবরাবর ঝরে যাবে বরফ-গলা গঙ্গোত্রী। আর একটু পরেই প্রতিটি মরা খাল-বিল-পুকুর কানায় কানায় ভরে উঠবে আমার মায়ের চোখের মত। প্রতিটি পাথর ঢেকে যাবে উদ্ভিদের সবুদ চুম্বনে।ওড়িশির ছন্দে ভারতনাট্যমের মুদ্রায় সাঁওতালী মাদলে আর ভাঙরার আলোড়নে জেগে উঠবে তুমুল উৎসবের রাত। সেই রাতে সেই তারায় ফেটে পরা মেহফিলের রাতে তোমরা ভুলে যেও না আমাকে যার ছেঁড়া হাত, ফাঁসা জঠর, উপড়ে আনা কল্ জে, ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু, রক্ত, ঘাম মাইল-মাইল অভিমান আর ভালোবাসার নাম .             স্বদেশ .                স্বাধীনতা .                   ভারতবর্ষ॥ আমার হাতে কোনও শাবল ছিল না, বাটালিও নয়, তবু, এতদিন তিলে তিলে গড়ে তোলা দুর্গ এক দুপুরের বৃষ্টিতে কীভাবে ধুয়ে গেল! আর ওই বিশাল পাথুরে অবরোধ-ই যে আড়াল করে রেখেছিল হার্মাদের মত এক খ্যাপা নদী, এতকাল .         তা আমি জানতেও পারিনি।সেই অর্গলহীন সজল সারাদিন, সারারাত আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে। ওই ভেসে যাচ্ছে আমার অঙ্গদ, শিরস্ত্রাণ, আবরণহীন ভাসতে ভাসতে আমি চড়তে পারছি গাঢ় দীঘিকার চেয়ে সজল তোমার দু চোখের ভাষা, আমি শুনতে পাচ্ছি সমুদ্রের নাভি থেকে উঠে আসা .        মারমেইডস-এর গলায় তোমার গান, দিশেহারা, ওলোট-পালোট ঢেউয়ে ধুয়ে যাচ্ছে আমার গার্হস্থ্য-সন্ন্যাস, জোয়ারে জোয়ারে .         এ তোমাকে কোথায় নিয়ে চলেছে, .         আমার নীরবতা আমার ভাষা। স্টেন গানের বুলেটে বুলেটে আমার ঝাঁঝরা বুকের উপরে ফুটে উঠেছে যে মানচিত্র— তার নাম ভারতবর্ষ।আমার প্রতিটি রক্তের ফোঁটা দিয়ে চা-বাগিচায় কফি খেতে, কয়লা-খাদানে, পাহাড়ে-অরণ্যে লেখা হয়েছে যে ভালোবাসা— তার নাম ভারতবর্ষ।আমার অশ্রুর জলসেচে আর হাড়ের ফসফেট-এ খুনীর চেয়েও রুক্ষ কঠোর মাটিতে বোনা হয়েছে যে-অন্তহীন ধান ও গানের স্বপ্ন— তার নাম ভারতবর্ষ।আমার ঠাণ্ডা মুখের ওপর এখন গাঢ় হয়ে জমে আছে ভাক্ রা নাঙ্গালের পাথুরে বাঁধের গম্ভীর ছায়া। ডিগবয়ের বুক থেকে মায়ের দুধের মত উঠে আসা তোলো ভেসে যাচ্ছে আমার সারা শরীর।কপাল থেকে দাঙ্গার রক্ত মুছে ফেলে আমাকে বুকে ক’রে তুলে নিতে এসেছে আমেদাবাদের সুতোকলের জঙ্গী মজুর। আমার মৃতদেহের পাহারাদার আজ প্রতিটি হাল বহনকারী বলরাম। প্রতিটি ধর্ষিতা আদিবাসী যুবতীর শোক নয় ক্রোধের আগুনে দাউ দাউ জ্বলে যাচ্ছে আমার শেষ শয্যা।ভরাট গর্ভের মত আকাশে আকাশে কেঁপে উঠছে মেঘ। বৃষ্টি আসবে। ঘাতকের স্টেনগান আর আমার মাঝবরাবর ঝরে যাবে বরফ-গলা গঙ্গোত্রী। আর একটু পরেই প্রতিটি মরা খাল-বিল-পুকুর কানায় কানায় ভরে উঠবে আমার মায়ের চোখের মত। প্রতিটি পাথর ঢেকে যাবে উদ্ভিদের সবুদ চুম্বনে।ওড়িশির ছন্দে ভারতনাট্যমের মুদ্রায় সাঁওতালী মাদলে আর ভাঙরার আলোড়নে জেগে উঠবে তুমুল উৎসবের রাত। সেই রাতে সেই তারায় ফেটে পরা মেহফিলের রাতে তোমরা ভুলে যেও না আমাকে যার ছেঁড়া হাত, ফাঁসা জঠর, উপড়ে আনা কল্ জে, ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু, রক্ত, ঘাম মাইল-মাইল অভিমান আর ভালোবাসার নাম .             স্বদেশ .                স্বাধীনতা .                   ভারতবর্ষ॥
অমিতাভ দাশগুপ্ত
চিন্তামূলক
কবি আজকাল ভোরবেলা ওঠে বাগবাজারের গঙ্গার ঘাঁটে যায় পাশে বাঁ হাতের মতো স্ত্রী কবির সারা শরীরে সার সার পিনিশ সালতি নৌকো লঞ্চের ছুঁচলো সিটি সমুদ্রগামী জাহাজের সুগ্মভীর ডাক অথচ পিত্তপ্রধান পায়ের পাতা সিঁড়ির প্রথম ধাপে পেতে সে চুপচাপ বসে থাকে আর সমস্ত গঙ্গা যখন একটি আভূমিপ্রণতা নারী হয়ে তাঁর রোগা পা ছুঁয়ে প্রণাম করে— রাগী বাবার মতো সে গোড়ালি সরিয়ে নেয়।সে জানে তাঁর রাতজাগা পিঠে বর্শা হয়ে বিঁধে আছে নিখাকি কলকাতার নিঃশ্বাস কাজল, মদ আর রুপোর গঁদের ভেতর আকন্ঠ ডুকে আছে মড়াপোড়ানো কলের চিমনি জোব চার্নকের থ্যাঁৎলানো অহঙ্কার।ওপারে বেলুড় মঠ দেখা যায় কবির পাশে সারদামণির মতো বসে থাকে কবির স্ত্রী কবির চোখের সামনে প্রতিদিন গলায় কলসি বেঁধে গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বারুইপুর হরিনাভি ভাটপাড়া জলে মিশে একাকার জোড়াসাঁকো হাড়কাটাবাজে বলিবাদ্য বানফোঁড়ার বাজনা জয়জোকার ডবকা দক্ষিণ থেকে হাজামজা উত্তরে উড়ে আসে কালো নোটের বান্ডিল কাগজের নৌকো স্ফুরিত পরিসংখ্যান অল-ক্লিয়ারের বিপ বিপআর কাশী মিত্তির নিমতলা রতনবাবুর ঘাটে ঘাটে শেষবারের মতো হাওয়ায় হাওয়ায় ডুক্রে ওঠে ভূপেন হাজারিকা— গঙ্গা আমার মা… গঙ্গা আমার মা… ।কবি আজকাল ভোরবেলা ওঠে বাগবাজারের গঙ্গার ঘাঁটে যায় পাশে বাঁ হাতের মতো স্ত্রী কবির সারা শরীরে সার সার পিনিশ সালতি নৌকো লঞ্চের ছুঁচলো সিটি সমুদ্রগামী জাহাজের সুগ্মভীর ডাক অথচ পিত্তপ্রধান পায়ের পাতা সিঁড়ির প্রথম ধাপে পেতে সে চুপচাপ বসে থাকে আর সমস্ত গঙ্গা যখন একটি আভূমিপ্রণতা নারী হয়ে তাঁর রোগা পা ছুঁয়ে প্রণাম করে— রাগী বাবার মতো সে গোড়ালি সরিয়ে নেয়।সে জানে তাঁর রাতজাগা পিঠে বর্শা হয়ে বিঁধে আছে নিখাকি কলকাতার নিঃশ্বাস কাজল, মদ আর রুপোর গঁদের ভেতর আকন্ঠ ডুকে আছে মড়াপোড়ানো কলের চিমনি জোব চার্নকের থ্যাঁৎলানো অহঙ্কার।ওপারে বেলুড় মঠ দেখা যায় কবির পাশে সারদামণির মতো বসে থাকে কবির স্ত্রী কবির চোখের সামনে প্রতিদিন গলায় কলসি বেঁধে গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বারুইপুর হরিনাভি ভাটপাড়া জলে মিশে একাকার জোড়াসাঁকো হাড়কাটাবাজে বলিবাদ্য বানফোঁড়ার বাজনা জয়জোকার ডবকা দক্ষিণ থেকে হাজামজা উত্তরে উড়ে আসে কালো নোটের বান্ডিল কাগজের নৌকো স্ফুরিত পরিসংখ্যান অল-ক্লিয়ারের বিপ বিপআর কাশী মিত্তির নিমতলা রতনবাবুর ঘাটে ঘাটে শেষবারের মতো হাওয়ায় হাওয়ায় ডুক্রে ওঠে ভূপেন হাজারিকা— গঙ্গা আমার মা… গঙ্গা আমার মা… ।
অমিতাভ দাশগুপ্ত
রূপক
কাল সারারাত একটা ছেলেকে ফলো করতে করতে আমার স্বপ্ন ক্লান্ত হয়ে গেছে। গোড়ালি-ছেঁড়া পাজাম আর মভ্ রঙের পাঞ্জাবি পরা সেই ছেলেটির মুখ কখনো দেখা যায় নি। স্রেফ ঐটুকু জায়গা সে ছায়া দিয়ে সব সময় চেপে রেখেছিল। আর, আমরা তো সকলেই জানি, কারো মুখ না দেখতে পেলে তাকে নিয়ে কবিতা লেখা কতখানি মুশকিল তবে .       ঐ ছেলেটির ব্যাপার-স্যাপারই আলাদা। তার ঠোঁটে গুনগুন করছিল আমার একটির পর একটি .                  প্রিয় রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত। আবার .        তারই গলার লী লী আগুন ঝলসে উঠছিল— ‘অব মছল উঠা হ্যায় দরিয়া হা’, ‘ভাই সাবধান বড়ি আ তুফান’, ‘ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না নিগ্রো ভাই আমার, পল রোবসন।’ ওর শরীরের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল মেঘ, পাখি আর লোহার গরাদের ছায়া। একটির পর একটি ফ্রেম ভাঙতে ভাঙতে শিকারী কুকুরের কালো দিগন্তরেখা পেরিয়ে কি অবলীলায় চলে যাচ্ছিল ছেলেটি।গাঢ় জঙ্গলের বুকচেরা পথে গোয়েন্দার টর্চের মত তার পিছনে ছুটতে ছুটতে একসময় চিত্কার করে উঠলাম —হল্ট! সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড ব্লাস্টিং-এর শব্দ, বারুদের ধোঁয়ায় ঢেকে গেল চারপাশ, পাহাড়ের কলজে-ফাটানো গলায় সে গর্জে উঠলো— আমি আসছি।অথচ কাল সারা স্বপ্ন চেষ্টা করেও তার মুখ দেখতে পাইনি আমি। আর আপনারা তো সকলেই জানেন কারো মুখ দেখতে না পেলে তাকে নিয়ে কবিতা লেখা কতখানি মুশকিল।কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন কাল সারারাত একটা ছেলেকে ফলো করতে করতে আমার স্বপ্ন ক্লান্ত হয়ে গেছে। গোড়ালি-ছেঁড়া পাজাম আর মভ্ রঙের পাঞ্জাবি পরা সেই ছেলেটির মুখ কখনো দেখা যায় নি। স্রেফ ঐটুকু জায়গা সে ছায়া দিয়ে সব সময় চেপে রেখেছিল। আর, আমরা তো সকলেই জানি, কারো মুখ না দেখতে পেলে তাকে নিয়ে কবিতা লেখা কতখানি মুশকিল তবে .       ঐ ছেলেটির ব্যাপার-স্যাপারই আলাদা। তার ঠোঁটে গুনগুন করছিল আমার একটির পর একটি .                  প্রিয় রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত। আবার .        তারই গলার লী লী আগুন ঝলসে উঠছিল— ‘অব মছল উঠা হ্যায় দরিয়া হা’, ‘ভাই সাবধান বড়ি আ তুফান’, ‘ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না নিগ্রো ভাই আমার, পল রোবসন।’ ওর শরীরের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল মেঘ, পাখি আর লোহার গরাদের ছায়া। একটির পর একটি ফ্রেম ভাঙতে ভাঙতে শিকারী কুকুরের কালো দিগন্তরেখা পেরিয়ে কি অবলীলায় চলে যাচ্ছিল ছেলেটি।গাঢ় জঙ্গলের বুকচেরা পথে গোয়েন্দার টর্চের মত তার পিছনে ছুটতে ছুটতে একসময় চিত্কার করে উঠলাম —হল্ট! সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড ব্লাস্টিং-এর শব্দ, বারুদের ধোঁয়ায় ঢেকে গেল চারপাশ, পাহাড়ের কলজে-ফাটানো গলায় সে গর্জে উঠলো— আমি আসছি।অথচ কাল সারা স্বপ্ন চেষ্টা করেও তার মুখ দেখতে পাইনি আমি। আর আপনারা তো সকলেই জানেন কারো মুখ দেখতে না পেলে তাকে নিয়ে কবিতা লেখা কতখানি মুশকিল।