poet
stringclasses
137 values
category
stringclasses
21 values
poem
stringlengths
9
18.7k
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
প্রকৃতিমূলক
আজ ফাল্গুনী চাঁদের জ্যোছনা জুয়ারে ভুবন ভাসিয়া যায় ওরে স্বপন দেশের পরী বিহঙ্গী পাখা মেলে উড়ে যায়। এই শ্যামল কোমল ঘাসে এই বিকচ পুন্দরাসে এই বন-মল্লিকা বাসে এই ফুরফুরে মলয়ায়। দেখ ঘাসের ডাঁটায় ফড়িং ঘুমায়  সবুজ স্বপন সুখে দেখ পদ্মকোরকে অচেতন অলি শেষ মধুকণা মুখে হেথা ঝিঁঝির ঝি ঝিট তান দেখ নিশি শেষে অবসান ছোট টুনটুনিদের গান এবে বিরত ক্লান্ত বুকে দেখ্ মোহ মুর্ছিত মধুর ধরণী  সব ধ্বনি গেছে চুকে । তোরে শিরীষ ফুলের পাপগি খসায়ে পরাগ করিব দান তোরে রজনীগন্ধা গেলাস ভরিয়া অমিয়া করাব পান শেষে ঘুম যদি তোর পায়,, গাহি মৃদু গুঞ্ন গান চারু ঊর্ণনাভের ঝিকিমিকি জালে কেশরের উপাধান। শেষে জোনাকির আলো নিভাবে যখন ঊষার কুয়শাসারে মোরা স্বপন শয়ন ভাঙ্গি দিব তোর পাপিয়ার ঝংকারে। যদি ফিরে যেতে মন চায় যাস ঝিরি ঝিরি ঊষা বায় চড়ি প্রজাপতির পাখায় হিম সিক্ত শিশিরধারে সাথে নিয়ে যাস এই রজনীর স্মৃতি ধরণীর পরপারে।।
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
প্রকৃতিমূলক
দখিন হাওয়া---রঙিন হাওয়া, নূতন রঙের ভাণ্ডারী, জীবন-রসের রসিক বঁধু, যৌবনেরি কাণ্ডারী! সিন্ধু থেকে সদ্দ বুঝি আসছ আজি স্নান করি'--- গাং-চিলেদের পক্ষধ্বনির শন্ শনানির গান্ ধরি'; মৌমাছিদের মনভুলানি গুনগুনানির সুর ধরে'--- চললে কোথায় মুগ্ধ পথিক, পথটি বেয়ে উত্তরে? অনেক দিনের পরে দেখা, বছর-পারের সঙ্গী গো, হোক্ না হাজার ছাড়াছাড়ি, রেখেছ সেই ভঙ্গি তো! ---তেমনি সরস ঠাণ্ডা পরশ, তেমনি গলার হাঁকটি , সেই দেখতে পেলেই চিনতে পারি, কোনোখানেই ফাঁকটি নেই! ---কোথায় ছিলে বন্ধু আমার, কোন্ মলয়ের বন ঘিরে,' নারিকেলের কুঞ্জে-বেড়া কোন্ সাগরের কোন্ তীরে! লকলকে সেই বেতসবীথির বলো তো ভাই কোন্ গলি, এলা-লতার কেয়াপাতার খবর তো সব মঙ্গলই? ---ভালো কথা, দেখলে পথে সবাই তোমায় বন্দে তো,--- বন্ধু বলে' চিনতে কারো হয়নি তো ভাই সন্দেহ? নরনারী তোমার মোহে তেমনি তো সব ভুল করে--- তেমনিতর পরস্পরের মনের বনে ফুল ধরে! আসতে যেতে দীঘির পথে তেমনি নারীর ছল করা; পথিকবধুর চোখের কোণে তেমনি তো সেই জলভরা? রঙ্গনে সেই রং তো আছে, অশোকে তাই ফুটছে তো, শাখায় তারি দুলতে দোলায় তরুণীদল জুটছে তো? তোমায় দেখে' তেমনি দেখে উঠছে তো সব বিহঙ্গ, সবুজ ঘাসের শীষটি বেয়ে রয় তো চেয়ে পতঙ্গ? তেমনি---সবই তেমনি আছে! --- হ'লাম শুনে' খুব খুশী, প্রাণটা ওঠে চনচনিয়ে, মনটা ওঠে উসখুসি', --- নূতন রসে রসল হৃদয়, রক্ত চলে চঞ্চলি', --- বন্ধু তোমায় অর্ঘ্য দিলাম উচ্ছলিত অঞ্জলি। গ্রহণ করো, গ্রহণ করো---বন্ধু আমার দণ্ডেকের--- জানিনাক আবার কবে দেখা তোমার সঙ্গে ফের।।
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
শোকমূলক
বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই, মাগো আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই? পুকুর ধারে লেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না একলা জেগে রই- মাগো আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই?সেদিন হতে কেন মা আর দিদিরে না ডাকো;- দিদির কথায় আঁচল দিয়ে মুখটি কেন ঢাকো? খাবার খেতে আসি যখন, দিদি বলে ডাকি তখন, ওঘর থেকে কেন মা আর দিদি আসে নাকো? আমি ডাকি তুমি কেন চুপটি করে থাকো?বল মা দিদি কোথায় গেছে, আসবে আবার কবে? কাল যে আমার নতুন ঘরে পুতুল-বিয়ে হবে! দিদির মত ফাঁকি দিয়ে, আমিও যদি লুকাই গিয়ে তুমি তখন একলা ঘরে কেমন করে রবে, আমিও নাই-দিদিও নাই- কেমন মজা হবে।ভুঁই চাপাতে ভরে গেছে শিউলি গাছের তল, মাড়াস্ নে মা পুকুর থেকে আনবি যখন জল। ডালিম গাছের ফাঁকে ফাঁকে বুলবুলিটি লুকিয়ে থাকে, উড়িয়ে তুমি দিও না মা, ছিঁড়তে গিয়ে ফল,- দিদি এসে শুনবে যখন, বলবি কি মা বল!বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই- এমন সময় মাগো আমার কাজলা দিদি কই? লেবুর ধারে পুকুর পাড়ে ঝিঁঝিঁ ডাকে ঝোপে ঝাড়ে’ ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, তাইতে জেগে রই রাত্রি হলো মাগো আমার কাজলা দিদি কই?
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
চিন্তামূলক
শক্তি মায়ের ভৃত্য মোরা- নিত্য খাটি নিত্য খাই, শক্ত বাহু, শক্ত চরণ, চিত্তে সাহস সর্বদাই। ক্ষুদ্র হউক, তুচ্ছ হউক, সর্ব সরম-শঙ্কাহীন--- কর্ম মোদের ধর্ম বলি কর্ম করি রাত্রি দিন। চৌদ্দ পুরুষ নিঃস্ব মোদের - বিন্দু তাহে লজ্জা নাই, কর্ম মোদের রক্ষা করে অর্ঘ্য সঁপি কর্মে তাই। সাধ্য যেমন - শক্তি যেমন - তেমনি অটল চেষ্টাতে-- দুঃখে-সুখে হাস্যমুখে কর্ম করি নিষ্ঠাতে। কর্মে ক্ষুধার অন্ন যোগায়, কর্মে দেহে স্বাস্থ্য পাই; দুর্ভাবনায় শান্তি আনে --- নির্ভাবনায় নিদ্রা যাই। তুচ্ছ পরচর্চাগ্লানি--- মন্দ ভালো--- কোন্ টা কে--- নিন্দা হতে মুক্তি দিয়া হাল্কা রেখে মনটাকে। পৃথ্বি-মাতার পুত্র মোরা, মৃত্তিকা তার শয্যা তাই; পুষ্পে-তৃণে বাসটি ছাওয়া, দীপ্তি-হাওয়া ভগ্নী-ভাই। তৃপ্তি তাঁরি শস্যে-জলে ক্ষুত্ পিপাসা দুঃসহ। মুক্ত মাঠে যুক্ত করে বন্দি তাঁরেই প্রত্যহ। ক্ষুদ্র নহি - তুচ্ছ নহি - ব্যর্থ মোরা নই কভু। অর্থ মোদের দাস্য করে - অর্থ মোদের নয় প্রভু। স্বর্ণ বল, রৌপ্য বল, বিত্তে করি জন্মদান, চিত্ত তবু রিক্ত মোদের নিত্য রহে শক্তিমান। কীর্তি মোদের মৃত্তিকাতে প্রত্যহ রয় মুদ্রিত, শুণ্য' পরে নিত্য হের স্তোত্র মোদের উদ্গীত। সিন্ধুবারি পণ্য বহি' ধন্য করে তৃপ্তিতে, বহ্নি' মোদের রুদ্র প্রতাপ ব্যক্ত করে দীপ্তিতে। বিশ্ব জুড়ি' সৃষ্টি মোদের, হস্ত মোদের বিশ্বময়, কাণ্ড মোদের, সর্বঘটে - কোন্ খানে তা দৃষ্য নয়? বিশ্বনাথের যজ্ঞশালে কর্মযোগের অন্ত নাই, কর্ম সে যে ধর্ম মোদের, -- কর্ম চাহি -- কর্ম চাই।
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
প্রকৃতিমূলক
বইয়ের পাতায় মন বসেনা, খোলা পাতা খোলাই পড়ে’ থাকে, চোখের পাতায় ঘুম আসেনা—- দেহের ক্লান্তি বুঝাই বলো কা’কে ? কাজের মাঝে হাত লাগাব, কোথাও কোন’ উত্সাহ নাই তার, চেয়ে আছি চেয়েই আছি, চাওয়ার তবু নাইক কিছু আর !বেলা বাড়ে, রোদ চড়ে’ যায়, প্রখর রবি দহে আকাশ তল, ঝাঁঝাঁ করে ভিতর-বাহির, চোখের পথে শুকায় চোখের জল ; মোহাচ্ছন্ন মৌন জগৎ, কোথাও যেন জীবনচেষ্টা নাহি, ক্লিষ্ট আকাশ নির্ণিমেষে দিনের দাহ দেখছে শুধু চাহি’ !ঘরে ঘরে আগল আঁটা, আমার ঘরেই মুক্ত শুধু দ্বার, সেই যে খুলে’ চলে’ গেছে তেম্ নি আছে, কে দেয় উঠে’ আর ! পথের ধারে নিমের গাছে একটি কেবল তিক্ত মধুর শ্বাস ক্ষণে ক্ষণে জানায় শুধু গোপন বুকের উদাসী উচ্ছ্বাস !হাহা করে তপ্ত হাওয়া শষ্যহারা বসন্ত-শেষ মাঠে, চোতের ফসল বিকিয়ে গেছে কবে কোথায় অজানা কোন্ হাটে ! উদার মলয় নিঃস্ব আজি, সাম্ নে শুধু ধূসর বালুচর পঞ্চতপা দিক্-বিধবার বসন খানি লুট্ ছে নিরন্তর !কোন্ পথে সে গেছে চলি’ মরু-বেলায় চিহ্নটি নাই তার, লুপ্ত সকল শ্যামলিমা লয়ে তাহার মুগ্ধ উপাচার ; জাগ্ ছে শুধু প্রখর দাহ তৃষ্ণাভরা বিশুষ্ক জিহ্বায় দিনান্ত সে আস্ বে কখন ? দম্ কা বাতাস ধমক্ দিয়ে যায় !
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
চিন্তামূলক
কলঙ্ক যতীন্দ্রমোহন বাগচীবাতাবিকুঞ্জে সন্ধ্যার বায় পুষ্পপরাগচোর------ কলঙ্কী মন, চেয়ে দেখ্ আজি সঙ্গী মিলেছে তোর। দিবা অবসান, রবি হ’ল রাঙা, পশ্চিমাকাশে নট্ কনা -ভাঙা; সঙ্গহীনের যাহা কিছু কাজ সাঙ্গ করেছি মোর, কুঞ্জদুয়ারে ব’সে আছি একা কুসুমগন্ধে ভোর! আধফুটন্ত বাতাবিকুসুমে কানন ভরিয়া আছে,---- কি গোপন কথা গুঞ্জরি’ অলি ফিরিছে ফুলের কাছে! ফুটনোন্মুখ ফুলদলগুলি পুলক-পরশে উঠে দুলিদুলি গন্ধভিখারী সন্ধ্যার বায় ফুলপরিমল যাচে----- সঙ্কোচে নত পুষ্পবালিকা---অতিথি ফিরে বা পাছে! বেলা বয়ে যায়, সন্ধ্যার বায় আসি’ কহে বার বার, সন্ধ্যা হয় যে অন্ধ কুসুম-----খোলো অন্তর-দ্বার! মুকুলগন্ধ অন্ধ ব্যথায় কুঁড়ির বন্ধ টুটিবারে চায়, লুটাইতে চায় সন্ধ্যার পায় রুদ্ধ আবেগভার, বিকাইতে চায় চরণের পরে কৌমার সুকুমার। মন্থরপদে সন্ধ্যা নামিছে কাজলতিমিরে আঁকা, দুয়ারে অতিথি, অন্তরে ব্যথা--- সম্ভব সে কি থাকা? গন্ধে পাগল অন্তর যার, আবরণ মাঝে থাকে সে কি আর, খুলি’ দিল দ্বার, পরান তাহার পরাগে-শিশিরে মাখা; কুঞ্জ ঘিরিয়া আঁধারে ছাইল স্বপ্নপাখীর পাখা। বাতাবিকুঞ্জে সন্ধ্যার বায় পুষ্পপরাগচোর---- হা রে কলঙ্কী হৃদয় আমার, সঙ্গী মিলেছে তোর। দূরদিগন্তে দিবা হল সারা; অন্তর ভরি ফুটে’ উঠে তারা, নব-ফুটন্ত নেবুর গন্ধে আসিল তন্দ্রাঘোর----- কলঙ্কী প্রেম, মুগ্ধ হৃদয়-----একই "পরিণাম তোর।
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
মানবতাবাদী
পরের দুয়ারে দাসী বটে আজি, তবু সে মোদেরই মা,--- ভুলিবারে চাই সতত সে কথা ; ভুলিবারে পারি না। কাঙালের ঘরে যাহা কিছু জোটে, সে যে ধূলিমাখা খুদ, উপবাস ক্ষীণ শীর্ণ বক্ষে শুকায়ে গিয়াছে দুধ,--- তবু তাই খেয়ে বাঁচে এই প্রাণ, তাই দিয়ে এই দেহ, ধূলামাটি মাখা তাহারই অঙ্কে বাঁধি দুদিনের গেহ, হাঁটিতে শিখেছি যার হাঁটু ধরে, যে বুকে মেলিয়া পা, হক ভিখারিনী---তবু সে জননী, কেমনে ভুলিব তা? মাতা বিনতার দুখের দুলাল, মানুষ নয় সে, পাখি! মায়ের দুঃখ-ভরা দাসীত্ব ঘুচাইয়াছিল না কি? যতই এ-হিয়া উঠে গুমরিয়া বিপদ-বেদনা-বিষে, মানুষের ঘরে জন্ম লভিয়া সে-কথা ভুলিব কিসে? কোথা প্রাণপণ প্রবল নিষ্ঠা, চিত্ত অকুতোভয়, কই সে বেদনা, শক্তিসাধনা, পণ মৃত্যুঞ্জয়? প্রচণ্ড তেজ চাই সে গরুড়---আমাদেরই মাঝে চাই, অমৃতের লাগি সেই প্রাণপণ--- ভুলিবনা ভুলি নাই। এস তপস্বী, উগ্রশক্তি, এস হে কর্মবীর, কর দৃঢ় পণ মায়ের চক্ষে মুছাতে অশ্রুনীর; পায়ে-পায়ে যত বিভেদের বাধা ভুলায়ে পরস্পরে ভায়ে ভায়ে আজি মিলাইতে হবে জননীর ভাঙা ঘরে; এস হে হিন্দু, এস খ্রীষ্টীয়, পারসী, মুসলমান যে মায়ের বুকে জন্ম তোমার, রাখ আজি তার মান। যে জননী আজ ভিখারিনী হয়ে ভুলেছে আপন বাণী, অর্জিয়া তারি ধর্মরাজ্য কর তাঁরে রাজরাণী।
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
চিন্তামূলক
চিত্ততলে যে নাগবালা ছড়িয়ে ছিঁগে কেশের কেশর কাঁদছে অফুরন্ত অশ্রুধারা সহস্রবার নাসার বশের বাঁধছে ; মানিক-হারা পাগল-পারা যে বেদনা বাজছে তাহার বক্ষে পলে-পলে পলক বেয়ে অলক ছেয়ে ঝরছে যাহা চক্ষে ; দুঃখে ভাঙা বক্ষে যাহা নশ্চিসিয়া সকাল-সাঁঝে টুটছে মহাকালের সোপানতলে নাগকেশরের ফুল হয়ে তাই ফুটছে।মন-মাতালে যে নাগবালা রতন-জ্বালা কক্ষে বসে হাসছে দীপ্তি যাহার নেত্রপথে শুভ্র-শুচি দৃষ্টি হয়ে আসছে ; মুক্তামানিক সবার মাঝে বিলিয়ে দিয়ে উল্লাসে যে চঞ্চল, উদ্বেলিত সিন্ধুসম দুলছে যাহার উচ্ছ্বসিত অঞ্চল ; বিশ্বভূবন পূর্ণ করে যে আনন্দ শঙ্খস্বরে উঠছে মহাকালের সোপানতলে নাগকেশরের ফুল হয়ে তাই ফুটছে।
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
প্রকৃতিমূলক
পরাজিতা তুই সকল ফুলের কাছে, তবু কেন তোর অপরাজিতা নাম? বর্ণ-সেও ত নয় নয়নাভিরাম। ক্ষুদ্র অতসী, তারো কাঞ্চন-ভাতি ; রূপগুণহীন বিড়ম্বনার খ্যাতি! কালো আঁখিপুটে শিশির-অশ্রু ঝরে— ফুল কহে—মোর কিছু নাই কিছু নাই, ফুলসজ্জায় লজ্জায় যাই নাক, বিবাহ-বাসরে থাকি আমি ম্রিয়মাণ। মোর ঠাঁই শুধু দেবের চরণতলে, পূজা-শুধু-পূজা জীবনের মোর ব্রত ; তিনিও কি মোরে ফিরাবেন আঁখিজলে—
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
মানবতাবাদী
পায়ের তলায় নরম ঠেকল কী! আস্তে একটু চলনা ঠাকুর-ঝি — ওমা, এ যে ঝরা-বকুল ! নয়? তাইত বলি, বদোরের পাশে, রাত্তিরে কাল — মধুমদির বাসে আকাশ-পাতাল — কতই মনে হয় । জ্যৈষ্ঠ আসতে কদিন দেরি ভাই — আমের গায়ে বরণ দেখা যায় ? —অনেক দেরি? কেমন করে’ হবে ! কোকিল-ডাকা শুনেছি সেই কবে, দখিন হাওয়া —বন্ধ কবে ভাই ; দীঘির ঘাটে নতুন সিঁড়ি জাগে — শেওলা-পিছল — এমনি শঙ্কা লাগে, পা-পিছলিয়ে তলিয়ে যদি যাই! মন্দ নেহাৎ হয়না কিন্তু তায় — অন্ধ চোখের দ্বন্ধ চুকে’ যায়! দুঃখ নাইক সত্যি কথা শোন্ , অন্ধ গেলে কী আর হবে বোন? বাঁচবি তোরা —দাদা তো তার আগে? এই আষাড়েই আবার বিয়ে হবে, বাড়ি আসার পথ খুঁজে’ না পাবে — দেখবি তখন —প্রবাস কেমন লাগে ? —কী বল্লি ভাই, কাঁদবে সন্ধ্যা-সকাল ? হা অদৃষ্ট, হায়রে আমার কপাল ! কত লোকেই যায় তো পরবাসে — কাল-বোশেখে কে না বাড়ি আসে ? চৈতালি কাজ, কবে যে সেই শেষ ! পাড়ার মানুষ ফিরল সবাই ঘর, তোমার ভায়ের সবই স্বতন্তর — ফিরে’ আসার নাই কোন উদ্দেশ ! —ঐ যে হথায় ঘরের কাঁটা আছে — ফিরে’ আসতে হবে তো তার কাছে ! এই খানেতে একটু ধরিস ভাই, পিছল-ভারি — ফসকে যদি যাই — এ অক্ষমার রক্ষা কী আর আছে ! আসুন ফিরে’ — অনেক দিনের আশা, থাকুন ঘরে, না থাক্ ভালবাসা — তবু দুদিন অভাগিনীর কাছে! জন্ম শোধের বিদায় নিয়ে ফিরে’ — সেদিন তখন আসব দীঘির তীরে। ‘চোখ গেল ঐই চেঁচিয়ে হ’ল সারা। আচ্ছা দিদি, কি করবে ভাই তারা — জন্ম লাগি গিয়েছে যার চোখ ! কাঁদার সুখ যে বারণ তাহার — ছাই! কাঁদতে গেলে বাঁচত সে যে ভাই, কতক তবু কমত যে তার শোক! ‌‌‍‍‍‌’চোখ’ গেল– তার ভরসা তবু আছে — চক্ষুহীনার কী কথা কার কাছে ! টানিস কেন? কিসের তাড়াতাড়ি — সেই তো ফিরে’ যাব আবার বাড়ি, একলা-থাকা-সেই তো গৃহকোণ — তার চেয়ে এই স্নিগ্ধ শীতল জলে দুটো যেন প্রাণের কথা বলে — দরদ-ভরা দুখের আলাপন পরশ তাহার মায়ের স্নেহের মতো ভুলায় খানিক মনের ব্যথা যত ! এবার এলে, হাতটি দিয়ে গায়ে অন্ধ আঁখি বুলিয়ে বারেক পায়ে — বন্ধ চোখের অশ্রু রুধি পাতায়, জন্ম-দুখীর দীর্ঘ আয়ু দিয়ে চির-বিদায় ভিক্ষা যাব নিয়ে — সকল বালাই বহি আপন মাথায় ! — দেখিস তখন, কানার জন্য আর কষ্ট কিছু হয় না যেন তাঁর। তারপরে – এই শেওলা-দীঘির ধার — সঙ্গে আসতে বলবনা’ক আর, শেষের পথে কিসের বল’ ভয় — এইখানে এই বেতের বনের ধারে, ডাহুক-ডাকা সন্ধ্যা-অন্ধকারে — সবার সঙ্গে সাঙ্গ পরিচয়। শেওলা দীঘির শীতল অতল নীরে — মায়ের কোলটি পাই যেন ভাই ফিরে’!
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
চিন্তামূলক
ভুটিয়া যুবতি চলে পথ; আকাশ কালিমামাখা কুয়াশায় দিক ঢাকা। চারিধারে কেবলই পর্বত; যুবতী একেলা চলে পথ। এদিক-ওদিক চায় গুনগুনি গান গায়, কভু বা চমকি চায় ফিরে; গতিতে ঝরে আনন্দ উথলে নৃত্যের ছন্দ আঁকাবাঁকা গিরিপথ ঘিরে। ভুটিয়া যুবতি চলে পথ।টসটসে রসে ভরপুর-- আপেলের মত মুখ আপেলের মত বুক পরিপূর্ণ প্রবল প্রচুর; যৌবনের রসে ভরপুর। মেঘ ডাকে কড়-কড় বুঝিবা আসিবে ঝড়, একটু নাহিকো ডর তাতে; উঘারি বুকের বাস, পুরায় বিচিত্র আশ উরস পরশি নিজ হাতে!অজানা ব্যাথায় সুমধুর-- সেথা বুঝি করে গুরুগুরু! যুবতি একেলা পথ চলে; পাশের পলাশ-বনে কেন চায় অকারণে? আবেশে চরণ দুটি টলে-- পায়ে-পায়ে বাধিয়া উপলে! আপনার মনে যায় আপনার মনে গায়, তবু কেন আনপানে টান? করিতে রসের সৃষ্টি চাই কি দশের দৃষ্টি? --স্বরূপ জানেন ভগবান!সহজে নাচিয়া যেবা চলে একাকিনী ঘন বনতলে-- জানি নাকো তারো কী ব্যাথায় আঁখিজলে কাজল ভিজায়!
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
নীতিমূলক
ও ভাই, ভয়কে মোরা জয় করিব হেসে- গোলাগুলির গোলাতে নয়, গভীর ভালবেসে। খড়ুগ, সায়ক, শাণিত তরবার, কতটুকুন সাধ্য তাহার, কি বা তাহার ধার? শত্রুকে সে জিনতে পারে, কিনতে নারে যে সে- ও তার স্বভাব সর্বনেশে। ভালবাসায় ভুবন করে জয়, সখ্যে তাহার অশ্রুজলে শত্রু মিত্র হয়- সে যে সৃজন পরিচয়। শত আঘাত-ব্যথা-অপমানে লয় সে কোলে এসে, মৃত্যুরে সে বন্ধু বলে ধরে শেষে।
যতীন্দ্রমোহন বাগচী
প্রেমমূলক
ফুল চাই ---- চাই কেয়াফুল!---- সহসা পথের ‘পরে আমার এ ভাঙ্গা ঘরে কন্ঠ কার ধ্বনিল আকুল। তখনো শ্রাবণ-সন্ধ্যা নিঃশেষে হয়নি বন্ধ্যা----- থেকে থেকে ঝরিতেছে জল; পবন উঠিছে জেগে, বিজলী ঝলিছে বেগে------ মেঘে মেঘে বাজিছে মাদল। জনহীন ক্ষুব্ধ পথ জাগিছে দুঃস্বপ্নবৎ---- বুকে চাপি’ আর্ত্ত অন্ধকার; কোনমতে কাজ সারি’ যে যার ফিরিছে বাড়ী, ঘরে ঘরে বন্ধ যত দ্বার। শূন্য ঘরে হিয়া গুমরিয়া মরে স্মরি’ যত জীবনের ভুল; অকস্মাৎ তারি মাঝে ধ্বনি কার কানে বাজে----- চাই ফুল----চাই কেয়াফুল! পাগল!   আজি এ রাতে এ দুর্য্যোগ-অভিঘাতে---- বৃষ্টিপাতে বিলুপ্ত মেদিনী; তার মাঝে কে আছে, কেতকী-সৌরভ যাচে! কোথায় বা হবে বিকিকিনি? পবন উঠিছে মাতি! কিছুক্ষণ কান পাতি’ মনে হ’ল গিয়াছে বালাই; সহসা আমারি দ্বারে ডাক এল একেবারে---- চাই ফুল --- কেয়াফুল চাই! ভাবিলাম মনে মনে----- হয়ত বা এ জীবনে কোনোদিন কিনেছিনু ফুল; সেই কথা মনে ক’রে আজো বা আশায় ঘোরে; কিম্বা কারে করিয়াছে ভুল! তাড়াতাড়ি আলো তুলি’ বাহিরিনু দ্বার খুলি, সবিস্ময়ে দেখিলাম চেয়ে---- মাথায় বৃহৎ ডালা, দাঁড়ায়ে পসারী-বালা----- শ্রাবণ ঝরিছে অঙ্গ বেয়ে; কহিলাম, এ কি কান্ড! তোমার পসরাভান্ড আজ রাতে কে কিনিবে আর ? এ প্রলয়ে কারো কাছে কিছু কি প্রত্যাশা আছে----- কেন মিছে বহিছ এ ভার! আর্দ্র দেহে আর্দ্র বাসে সে কহিল মৃদু হাসে,----- শিরে বায়ু সুগন্ধ ছড়ায়---- যে ফুল বেসাতি করি, বাদল যে শিরে ধরি,----- কপালে লিখিল বিধি তাই! বহিয়া দুখের ঋণ যে কষ্টে কাটাই দিন----- এ দুর্দ্দিন কিবা তার কাছে? ওগো তুমি নেবে কিছু? নয়ন হইল নীচু---- সেথাও বা মেঘ নামিয়াছে! খোলা দরজার পাশে বায়ু গরজিয়া আসে, ফুলবাসে ভরি দেহ-মন; ঝর-ঝর  ঝরে জল, আঁখি করে ছল-ছল ঘনাইয়া প্রাণের শ্রাবণ! বাদলের বিহ্বলতা---- বুঝি হায়!   লাগিল তা’ নয়নে বচনে সর্ব্ব দেহে; সহসা চাহিয়া আড় রমণী ফিরাল ঘাড়----- উর্দ্ধে যেন কি দেখিবে চেয়ে! না কহিয়া কোন বাণী পসরা লইনু টানি’----- মূল্য তার হাতে দিনু যবে, উজার করিতে ডালা কাঁদিয়া ফেলিল  বালা------ ওমা এ কি ---- এত কেন হবে? কহিনু ---যা’ কিনিলাম, এ নহে তাহারি দাম----- প্রতিদিন দিতে হবে মোরে; এক পণ দুই পণ---- যেদিন যেমন মন, তাহারি আগাম দিনু তোরে; কতক বুঝে’  না-বুঝে’ হৃদয়ের ভাষা খুঁজে’ বহুকষ্টে জানাইয়া তাই, পুষ্পগন্ধে মোরে ঘিরে’ অন্ধকারে ধীরে-ধীরে পসারিনী লইল বিদায়। ফিরিনু একলা ঘরে----- বাদল তখনো ঝরে, পুষ্পগন্ধে পূর্ণ গৃহতল; শয্যা লইলাম পাতি’ নিবায়ে দিলাম বাতি---- আবার আসিল বেগে জল! রুদ্ধ জানালার ফাঁকে বাতাস কাহারে ডাকে, বিজলী চমকি’ কারে চায়! কোন্ অন্ধ অনুরাগে ত্রিযামা যামিনী জাগে শ্রাবণ ব্যাকুল-ব্যর্থতায়! সঙ্গীহীন শূন্য ঘরে হিয়া গুমরিয়া মরে---- স্মরিয়া এ জীবনের ভুল; সেই সাথে থেকে- থেকে মনে হয় --- গেল ডেকে’ কাননের যত কেয়াফুল!
সুকুমার বড়ুয়া
ছড়া
এমন যদি হতো ইচ্ছে হলে আমি হতাম প্রজাপতির মতো নানান রঙের ফুলের পরে বসে যেতাম চুপটি করে খেয়াল মতো নানান ফুলের সুবাস নিতাম কতো । এমন হতো যদি পাখি হয়ে পেরিয়ে যেতাম কত পাহাড় নদী দেশ বিদেশের অবাক ছবি এক পলকের দেখে সবই সাতটি সাগর পাড়ি দিতাম উড়ে নিরবধি । এমন যদি হয় আমায় দেখে এই পৃথিবীর সবাই পেতো ভয় মন্দটাকে ধ্বংস করে ভালোয় দিতাম জগৎ ভরে খুশির জোয়ার বইয়ে দিতাম এই দুনিয়াময় । এমন হবে কি ? একটি লাফে হঠাৎ আমি চাঁদে পৌঁছেছি ! গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে দেখে শুনে ভালো করে লক্ষ যুগের অন্ত আদি জানতে ছুটেছি ।
শ্রীজাত
চিন্তামূলক
এখনওএখনও আসে নতুন লেখা, মগজ থেকে শব্দ নামে ঠোঁটে এখনও মাথাখারাপ, ঘোড়া দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছোটেবাচ্চাদের গান শেখাই, ছাত্রপিছু দেড়শো টাকা মোটে শুঁকে বেড়াই ঘরদুয়ার, কোথাও যদি কিছু একটা জোটেএখনও পাড়া সাজানো হয়। সবাই মিলে ছুটি কাটায় ভোটে কোনও হাতের ছাপ পড়ে না গান্ধীজির হাসিতে ভরা নোটেএখনও জমে ক্রিকেট ম্যাচ, উত্তেজিত মানুষ নখ খোঁটে ঘাড়ে রদ্দা পড়লে কথা বেরিয়ে যায় ভেদবমির চোটেএখনও লোকে হাঁপায় আর টিকটিকিরা দেয়ালে মাথা কোটে এখনও প্রেম জনপ্রিয়। এখনও টবে গোলাপফুল ফোটে…তোমার কথা ভাবলে আজও পুরুষাঙ্গ শক্ত হয়ে ওঠে
শ্রীজাত
চিন্তামূলক
বিকেলবেলা বাড়ি থাকাও পাপ বাইরে হাওয়া, ঘরে নতুন টিউব মাথায় বাজে একলা ডায়াল টোনগ্যাসের দাম বাড়ছে, প্রেম নেই, দুটো প্রাচীন টিউশানি হারালাম তবু আমায় চিনছে এতজন…একেকদিন বাড়ি ফেরার পথে একেকদিন, সত্যি মনে হয় আমি বোধহয়… আমি বোধহয় ক্লোন !এখন আমার স্বপ্ন বলতে শুধু পাড়ার ছোট ছেলেমেয়ের হাতে নানা রঙের মুখোশ বিতরণ
শ্রীজাত
প্রেমমূলক
ভ্রু পল্লবে ডাক দিয়েছ, বেশ। আমার কিন্তু পুরনো অভ্যেস মিনিট দশেক দেরীতে পৌঁছনোতোমার ঘড়ি একটু জোরেই ছোটে আস্তে করে কামড় দিচ্ছ ঠোঁটে ঠোঁটের নীচে থমকে আছে ব্রণকুড়ি মিনিট? বড্ড বাড়াবাড়ি! দৌড়ে ধরছ ফিরতিপথের গাড়ি ফিরতিপথেই ভুল হল সময়—আমারও সব বন্ধুরা গোলমেলে বুঝিয়েদেবে তোমায় কাছে পেলে কেমন করে গল্প শুরু হয়!খোলাচুলের সংজ্ঞা দিতে দিতে সন্ধে নেমে আসবে বস্তিতে ভাবছ তোমার অপেক্ষা সার্থক?জানবেও না আমি ততক্ষনে অন্ধকার চন্দনের বনে ঘুরে মরছি, কলকাতার লোক…
শ্রীজাত
প্রেমমূলক
জাপটে ধরে বলব, ‘আমায় চাই? বৃষ্টি তখন উল্টো ডাঙার মোড়ে নরম গালে মাখিয়ে দেবো ছাই। জানিস না তুই, পাখিরা রােজ ওড়ে?ডানার ভাঁজে মুখ ঘষে, বেশ। ভিড় করে সব দেখবে কেমন যা তা! লজ্জা উধাও, ওড়না যখন শেষ… এক মুহূর্ত থমকে কলকাতা।পাখির নীড়ের মত না, তাদের চোখ। আমি বরং বলে, ‘ছিলি কোথায়? আজকে একটা হেস্তনেস্ত হোক দিস না বাধা, আমার অসভ্যতায়।ঠোটের গায়ে ঠোটের গরম ফু… বৃষ্টি ভেজা শরীর দেখে সবাই মন কখনও দেখতে পারে, ধর তারে দেখি, আয় তোকে আজ সবাইজাপটে ধরে থাকব বহুক্ষণ রাত নামছে উল্টোডাঙা মোড়ে অন্ধ আকাশ, বন্ধ টেলিফোন… দুটো মানুষ জলের ভাষায় পােড়ে।‘কি হচ্ছে কি?’ বললে খাবি চড়। আদর খেয়ে চুপ হে, প্রিয় চড়াই দুটো পাখির ঠোটেই এখন খড়… চল না, তাদের আবার প্রেমে পড়াই?
শ্রীজাত
প্রেমমূলক
অনেকদিনের উপােসী ঠোঁট না-হয় তাকে না আটকালে বরং তােমার জমিয়ে রাখা আগুন দিও রংমশালে…এক ডাকে সক্কলে চেনে। লুঙ্গি থেকে চম্পাহাটি সে কেন রােজ তােমার কোলে খুঁজতে আসে শীতলপাটি?তুমিও তেমন, ঠান্ডা ভীষণ রােদে দেওয়াই হয়নি তােমায় উনিশ হল। তফাত বােঝাে, রংমশালে, দেওয়াল বােমায়?আজ দেওয়ালি। পাড়ায় টুনি।। চরকি হাউই তুবড়ি দারুণ! হঠাৎ যদি সামনে আসে, আবার বলবে, “রাস্তা ছাড়ুন?রাস্তা দিতেই চাইছে তাে সে ঝাকড়া চুলে সলতে পাকাও কাছে এলেই বারুদসীমা যাচ্ছে না আর দূরে থাকাও।ওর ভেতরে বারুদ ভর্তি। রঙিন, যখন অন্যে জালে। ওদের কিন্তু তিন পুরুষের ব্যবসা আছে রংমশালের।
শ্রীজাত
প্রেমমূলক
রাক্ষসেরা বন্ধু সেজে আসে। পাহাড়চুড়ােয় থমকে থাকে হাওয়া… ঠোঁট খুলে যায়। বুকদুটো দু’পাশে কামড়ে ধরে চুমু খাওয়ার আওয়াজ।চুল খােলাচুল দিগন্তে ডাক পাঠায় মেঘের সেনা ঘােড়ার পিঠে সওয়ার রক্ত গিয়ে ছিটকে লাগে ছাতায় দরকার কী, এমন শ্রাবণ হওয়ারখিদের মুখে জিভ বাপের ব্যাটা। সবাই তােমায় আদর করে দিত… তখন আমার হাতের মুঠোয় ব্যথা, সেসব আমি লিখতে পারিনি তাে!লিখতে গেলেই সর্বনাশ হাওয়া ঝাপটা এসে উল্টে দেবে খাতা । মেঘ ডেকেছে। শরীরে তার আওয়াজ… রক্ত এসে ছিটকে লাগে ছাতায়!
শ্রীজাত
চিন্তামূলক
ঠিক যেরকম আজকে তোমার মুখের উপর পড়ন্ত রোদ্দুর। আমারও খুব ইচ্ছে পাঁচিল শ্যাওলা ধরা, সন্ধ্যা ভেঙ্গে চুরঠিক যে রকম কাঁদলে তোমার অফিস ফেরত রুমাল জানে সব আমারও বেশ মেঘ করেছে, ব্যালকনিতে আষাঢ়ে বিপ্লব।ঠিক যে রকম বারুদের তোমার বন্ধু না তাও আগুন চেয়েছ। আমারও আজ ফুলকি দেখে আর না-পেরে ঠিকরে পড়ে চোখঠিক যে রকম মেসেজ লিখে ডিলিট আবার ওপাশ ফিরে শুই আমারও রোজ ভাল লাগে না, বিরক্তিকর সামান্য তর্ক।ঠিক যেরকম তোমার মুখে এলাচ সুবাস, গলার কাছে ঘাম। আমারও সব ভুল পথে যায়। সঙ্গে কেবল পুরনাে ডাকনাম।ঠিক যেরকম মেট্রোতে রােজ মুখ বুজে সব ভুলতে চাওয়ার ছল আমারও দিন ব্যর্থ তা পায়, সন্ধে বুকে ক্লান্ত মফস্বল….ঠিক যেরকম ঝাপসা দেখা, বারান্দায় কাটতে থাকে রাত তাকিয়ে দ্যাখো, নীচে আমি ফুটপাতে ঠায় দাড়িয়ে আছি। ঠিক করে নাও, ধরবে আমার হাত?
শ্রীজাত
প্রেমমূলক
অন্ধকারের ছমছমে হাত, চমকে গেছে গা। কে তার পিঠে হাত রেখেছে? ‘অমন করে না’কে বলে রে? চেনা গলি? আবছা মুখে সে ছাদের ধারে হাত বাড়িয়ে ধরতে এসেছে।কাঁদছিলো বেশি আপন মনে, জোরসে অভিমান… এমন সময় ঠান্ডা হাতে ওড়না ধরে টান।যেমন ভূতের ভয় পেতে তুই, ঠিক হয়েছে, বল? সন্ধে বেলায় একলা ছাদে কাঁদতে আসার ফল।জানিস তুই, তবুও তাকে টান মেরেছে ছাদ বেশ হয়েছে। ভূতের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদে!
শ্রীজাত
প্রেমমূলক
ওই কথা কি এভাবে কেউ বলতে পারে? হঠাৎ করে, সিড়ির বাঁকে, অন্ধকারেনিশ্বাস নাক গন্ধ পোহায়, চনমিয়া… ঘুপচি মতাে মুঠোর ভেতর একলা টিয়াছটফটাচ্ছে দেখতে পাচ্ছি। চাই না উড়ান? ঠাকুর ঘরের চাল থেকে পাহাড়চূড়া?ঠোটের উপর ঘাম মুছে নাও। ডাকছে নীচে। নখের ঘরে কেটেছে হাত, ওষুধ মিছে।বুকটুকুনির ওঠানামায় ধুকপুকুনি জড়িয়ে নেওয়ার মন হলে কে ছাড়ত শুনি?কিন্তু এখন সবটা ইচ্ছে করছে না যে হয়তো হঠাৎ উড়ে টিয়া, ভিড়ের মাঝে…এইটুকু তো অতৃপ্তি দাও প্রেমিক জনে, একটা চুমু না-খাওয়া থাক, এই জীবনে!
শ্রীজাত
মানবতাবাদী
এর পরেও চুপ করে থাকা এর পরেও সংযমী সময় এর পরেও পতপত পতাকা এর পরেও দৃঢ় কনভয় এর পরেও সন্দেহ অতীত এর পরেও চকচকে স্যালুট এর পরেও লক্ষ্য শুধু জিত এর পরেও বাহিনী মজুতএর পরেও শব্দশালীনতা এর পরেও স্তুতি আর স্তব এর পরেও টক শো আর কথা এর পরেও কবিতা উৎসবএর পরেও বিশ্বাস, প্রণতি এর পরেও ঘুম আসবে চোখে এর পরেও বাকি আছে ক্ষতি এর পরেও ভোট দেবে লোকে ।
শ্রীজাত
প্রেমমূলক
এমন বিকেল আসবে না আর কক্ষনও ঠিক। যাদবপুরের মাঠ পেরিয়ে একখানা মেঘ। যেমন তেমন একবিনুনি, হাওয়াই চটি… তোমার পাড়ায় যখন আমার সন্ধে নামে।ছাত্রীরা সব জটলা করে গাছের নীচে চায়ের গেলাস ভাগ হয়ে যায় একটাকে তিন কোথাও দাবার চুপ জটলা, একবারই চেক… বারাসাতের বাস বলে যায় চরৈবেতি…মন খারাপের কারণ খোঁজার বাহানা চাই।। বন্ধুর মুখ ভিড়ের ভেতর হয়তো কোথাও…। হয়তো কোথাও টিমটিমে এই এমনি বাঁচা পাহাড় থেকে আছড়ে পড়ে খরস্রোতা।কে জানে কার কি মনে হয়। আজ বাদে কাল। মুখগুলো সব পাল্টে যাওয়ার গল্প শোনায়। ইটের গায়ে ঠোকর খেয়ে হাঁটতে শেখা… জীবন তো রোজ পাতায় পাতায় বিখ্যাত না।দোসার গাড়ি টাঙিয়ে। খদ্দের নেই। টিভি চলার আওয়াজ আসে কাছ থেকে দূর কী একটা বেশ আবছামতাে পড়ছে মনে…। মানুষ এরই নাম দিয়েছে স্মৃতিমেদুর?গাছগুলাে সব অলস হল। ক্যাম্পাসও ঝিম। যাদবপুরের মাঠ পেরিয়ে একখানা মেঘ। খুব-চেনা-নয় কারওর মতাে হাঁটছে রােজই তােমার পাড়ায় যখন আমার সন্ধে নামে….
শ্রীজাত
প্রেমমূলক
বিকেল বেলার ভাঙা ঘুমে পর এক কাপ চা, ধোঁয়ায় ঢাকা ঘর,দুপুরে খুব বৃষ্টি হয়ে ঝিম দূরে যত বাড়ি টিম টিমকেমন একটা ভিজে মত মন মুখ থুবড়ে বন্ধ আছে ফোন।পাড়ার মোড়ে মাথার গিজগিজ গাড়ি টানায় পিছল ওভার ব্রিজভাঁজফতুয়া ঘুমপাজামার বেশ বৃষ্টি থেকে উঠেই এ কোন দেশ?ঠান্ডা হাওয়ায় মনে পড়ার ছল। কোথাও কোথাও দাড়িয়ে গেছে জল…রিক্সার ভেঁপু মন কেমনের সুর। কলেজ ফেরত মেয়েরা চুরমুরজানলা খুলে এমনি বসে। চুপ। থমকে থাকা মেঘেরা বিদ্রুপযা গেছে তা গেছে জানি, যাও। এমন বিকেল অনন্ত হয়। তাওচোখের কোণে যেটুকু চিকচিক… তুমি এলেই সরিয়ে দিতে, ঠিক।।
শ্রীজাত
প্রেমমূলক
সোনা, তোমায় সাহস করে লিখছি। জানি বকবে প্রিপারেশন হয়নি কিচ্ছু। বসছি না পার্ট টুতে মাথার মধ্যে হাজারখানেক লাইন ঘুরছে, লাইন এক্ষুনি খুব ইচ্ছে করছে তোমার সঙ্গে শুতেচুল কেটে ফেলেছ? নাকি লম্বা বিনুনিটাই এপাশ ওপাশ সময় জানায় পেন্ডুলামের মতো দেখতে পাচ্ছি স্কুলের পথে রেলওয়ে ক্রসিং-এ ব্যাগ ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছ শান্ত, অবনতএখানে ঝড় হয়ে গেল কাল। জানলার কাচ ভেঙে ছড়িয়ে পড়েছিল সবার নোংরা বিছানায় তুলতে গিয়ে হাত কেটেছে। আমার না, অঞ্জনের একেকজনের রক্ত আসে একেক ঝাপটায়সবাই বলছে আজও নাকি দেদার হাঙ্গামা বাসে আগুন, টিয়ার গ্যাস, দোকান ভাঙচুর কিন্তু আমি কোনও আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি না বৃষ্টি এসে টিনের ছাদে বাজাচ্ছে সন্তুর…ঝালা চলছে। ঘোড়া যেমন সমুদ্রে দৌড়য় ভেতর-ভেতর পাগল, কিন্তু সংলাপে পোশাকি… তুমিই উড়ান দিও, আমার ওড়ার গল্প শেষ পালক বেচি, আমিও এখন এই শহরের পাখি
শ্রীজাত
প্রেমমূলক
বিপদ আবার ডাক দিয়েছে, দমকা বাতাস… আলগা বোতাম… বসন্তকে সাক্ষী রেখে আজ যদি ফের সঙ্গী হতাম?একখানা দিন ওলোট পালট, একখানা বেশ ঝাপটা বিকেল পাগল হওয়া বিশুই কেবল সামলে রাখে নন্দিনীকে।যা ইচ্ছে তাই বলুক লোকে, নিন্দুকে আর কী না রটায় অনামী সেই বাস স্টপেজে দেখা হবেই পৌনে ছ’টায়।একটু হাঁটা, একটু চলা, একটু বসা পাড়ার রোয়াক… মিথ্যে একটা আঙুল তোমার কপালে আজ সত্যি ছোঁয়াক।এই দেখা তো মুহূর্ত নয়, অন্যরকম অনন্তকাল মাথার মধ্যে গুমরে মরে পাগলা হাওয়ার একলা পোকা।ফিরবে তুমি ভিড় বাসে আর আমার ফেরা চুপবালিশে চোখের পাতা কমল কি না, কে আর অত রাখছে হিসেব…কেবল তোমার ফুলের মালা, রাজার দিকে সপাট জেহাদ – যুগ পেরিয়ে আরেকটিবার আমার হাতে দিও সে হাত…হাতের রেখায় থাকবে জানি মাইলফলক, সরাইখানা… কৃষ্ণচূড়ার ছোট্ট চিঠি, রাধাচূড়ার বলতে মানাবিপদ আসুক, লাগুক বাতাস, ছুটুক সময় তোমার দিকে পাগল হওয়া বিশুই জেনো আগলে রাখে নন্দিনীকে!
শ্রীজাত
প্রকৃতিমূলক
মেঘের নিচে লাইন পাতা। ট্রেন চলে না। সকাল থেকেই দিচ্ছে হাওয়া ইচ্ছে বুড়ি হাত বাড়িয়ে বর্ষাকালের মিছরি কেনা… মনখারাপের সাক্ষী কেবল ইলশেগুঁড়ি।জানলা খোলা, ভিজছে শহর ঝমঝমিয়ে তোমার খেলা ভাঙার কথা, মেঘ কি জানে? আজ বাদে কাল পরশু আসছে। না ছেড়ে বিয়ে। কাদের জন্য ট্রেন চলে যায় আকাশ পানে…আকাশে মা থাকেন তোমার। অনেক দিনই। খবর পাঠান ভাল মন্দ রান্না হলে… হাত বাড়িয়ে বর্ষাকালের কাবাব চিনি। তুমিই বলে, খুব সহজে পায় সকলে?যে যায় তাকে যেতে দেওয়াই সবচেয়ে’ ভাল। যে থাকে, তার থাকতে পারাই আসল কথা। পাখির বাসায় দু’এক কুচি রঙ্গিন পালক… মানুষই তার নাম রেখেছে বিষণ্ণতা।মায়ের কথা মনে পড়ে। ঘা-এর কথা। মনে পড়ছে শেষ চিঠিটা কেমন কঠিন… মেহেদী সন্ধ্যা শোনায় নগ্ন ছটা। বর্ষাকালের মারুবেহাগ, সমস্ত দিন…পারলে কারো, কোলবালিশের শরীর ভেজা। পারলে ভাঙো একটা দুটো কাচের চুড়ি মেঘের নিচে লাইন পাতা। আড়ালে যাও। মন খারাপের সাক্ষী থাকুক ইলশেগুঁড়ি…
শ্রীজাত
প্রেমমূলক
দাড়িয়ে দুরে। অনেকদিনের চেনা। আজকাল যার সঙ্গে থাকো, সে না।একলা তুমি কফিশপের ভেতর ঝগড়া করে পালিয়ে এলে। সে তাে।দাঁড়িয়ে আছে উল্টো ফুটপাতে আগের মতই ব্রিফকেস হাতেতোমার কফি আসতে দেরি, তারও বাস আসতে মিনিট পাঁচেক আরও।আজকাল যার সঙ্গে থাকো, হঠাৎ মনে হচ্ছে ফুরিয়ে গেছে কথা।।আজ ফের সেই ঝগড়াঝাটি করে। বসেছ কফিশপের ভেতরে।উল্টো দিকের ফুটপাতে যে, তাকে ডাকবে নাকি, সময় যদি থাকে?আঙ্গুল দিয়ে নাড়ছে চামচ, মানে। ভাবছ সে লােক যাবে কতক্ষণেআসলে তার অনেক আগেই যাওয়া আগের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে হাওয়াপ্রাক্তন বর, প্রেমিক ভবিষ্যতের! আজকাল তাদের আকসার এসব ঘটে—
শ্রীজাত
প্রেমমূলক
কোনওদিন তোকে বলাও হবে না জানি আমি কোন-কোন সুড়ঙ্গে বেঁচে থাকি কপ্টার থেকে ত্রাণের বদলে কারা বিষ ছুড়েছিল… কলেজে-পালানো পাখি—কোনওদিন তোকে বোঝানো যাবে না, কেন কবিতায় আর বিশ্বাস থাকছে না তার চে’ আমার নতুন চেহারা ভাল, ফুটপাত থেকে দরদাম করে কেনা—চাপিয়ে নিয়েছি। শহরের ধোঁয়াপথে ভাঙা ভাঁড়ে লাথি মারতে-মারতে হাঁটি চির অদৃশ্য গোলকিপারের দিকে থুতু ছুঁড়ে দিই… ফিরে আসে… থুতু চাটি…রোজ ভোরবেলা আয়নায় ক্রীতদাস দাঁত মেজে যায়, বলতে পারি না কিছু আমার শরীরে বসে থাকে সারাদিন দুটো করে স্মৃতি খুলে দেয় মাথাপিছুবিকেল হলেই মৃদু নার্সিংহোম… ভাই আর্মিতে। যুদ্ধ লাগতে পারে। নিয়তির কাছে গরীবের প্রার্থনা— সব ক্ষত যেন বোরোলীন দিয়ে সারেকোনওদিন তোকে দেখানো যাবে না তবু চামড়ার নীচে রেডিয়ো অ্যাকটিভিটি অথচ মগজে অতীতের ঠোঙাওয়ালা বিজ্ঞাপনের পাতায় খুঁজছে চিঠিনাকচোখমুখকান দিয়ে হু-হু করে শরীরে তখন ঈশ্বর ঢুকছেন— শীতের সন্ধে। আটটা সতেরো বাজে। কলকাতা ছেড়ে উড়ে গেছে তোর প্লেন…
সৈয়দ শামসুল হক
স্বদেশমূলক
সভ্যতার মণিবন্ধে সময়ের ঘড়ি শিশুর জন্ম থেকে জরাদেহ ক্ষীণশ্বাস মানবের অবলুপ্তির সীমারেখায় বলে গেল সেই কথা। সেই কথা বলে গেল অনর্গল–তপ্তশ্বাস হাহুতাশ পাতাঝরা বিদীর্ণ বৈশাখীর জ্বালাকর দিগন্তে আষাঢ়ের পুঞ্জীভূত কালো মেঘ আসবেই ঠিক। সাগরের লোনাজলে স্নিগ্ধ মাটীর দ্বীপ শ্যামলী স্বপ্নের গান বুকে পুষে নবীন সূর্য্যেরে তার দৃঢ় অঙ্গীকার জানাবেই। সংখ্যাহীন প্রতিবাদ ঢেউয়েরা আসুক, তুমি স্থির থেকো। প্রাকৃতিক ঝঞ্ঝাবাত অবহেলা করি সঞ্চয় করে যাও মুঠো মুঠো গৈরিক মাটী: সবুজ গন্ধবাহী সোনালী সূর্য্যের দিশা অকস্মাৎ উদ্ভাসিত কোরে দেবে তোমার চলার পথ।সভ্যতার মণিবন্ধে সময়ের ঘড়ি শিশুর জন্ম থেকে জরাদেহ ক্ষীণশ্বাস মানবের অবলুপ্তির সীমারেখায় বলে গেল সেই কথা। সেই কথা বলে গেল অনর্গল– পৃথিবীর জিজীবিষু আত্মার আছে। ঘনীভূত জনতার হৃদয়ে হৃদয়ে উজ্জ্বল শিখা সেই অমর সংবাদে ঢেউ তুলে দিয়ে গেল।।
সৈয়দ শামসুল হক
সনেট
আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় ক্যান, ক্যান এত তপ্ত কথা কয়, ক্যান পাশ ফিরা শোয়, ঘরের বিছান নিয়া ক্যান অন্য ধানখ্যাত রোয়? অথচ বিয়ার আগে আমি তার আছিলাম ধ্যান। আছিলাম ঘুমের ভিতরে তার য্যান জলপিপি, বাঁশির লহরে ডোবা পরানের ঘাসের ভিতরে, এখন শুকনা পাতা উঠানের পরে খেলা করে, এখন সংসার ভরা ইন্দুরের বড় বড় ঢিপি। মানুষ এমন ভাবে বদলায়া যায়, ক্যান যায়? পুন্নিমার চান হয় অমাবস্যা কিভাবে আবার? সাধের পিনিস ক্যান রঙচটা রদ্দুরে শুকায়? সিন্দুরমতির মেলা হয় ক্যান বিরান পাথার? মানুষ এমন তয়, একবার পাইবার পর নিতান্ত মাটির মনে হয় তার সোনার মোহর।।
সৈয়দ শামসুল হক
প্রেমমূলক
নষ্ট জলে পা ধুয়েছো এখন উপায় কি? আচ্ছাদিত বুকের বোঁটা চুমোয় কেটেছি। কথার কোলে ইচ্ছেগুলো বাৎসায়নের রতি, মানে এবং অন্য মানে দুটোই জেনেছি। নষ্ট জলে ধুইয়ে দেবে কখন আমার গা, তোমার দিকে হাঁটবে কখন আমার দুটো পা? সেই দিকে মন পড়েই আছে, দিন তো হলো শেষ; তোমার মধ্যে পবিত্রতার একটি মহাদেশ এবং এক জলের ধারা দেখতে পেয়েছি- একেই বুঝি মানুষ বলে, ভালোবেসেছি।
সৈয়দ শামসুল হক
প্রেমমূলক
এ বড় কঠিন রাতকনকনে শীতের রাত হাড়ের ভেতরে শীত কনকনে শীত যদি এ কেমন শীত—এই জিজ্ঞাসায় নিজের ভেতরে যে তাকায় সে দেখতে পায় ভালোবাসায় যে ছিল সে যখন চলে গিয়েছিল তখন হৃদয়ে তার নেমে এসেছিল বরফের মতো যে শূন্যতা তাকে বলে শীত কনকনে শীত হাওয়ার ভেতরে যদি কারও শব্দ ওঠে পায়ের কোমল শব্দ যদি অকস্মাৎ— তখন বসন্তদিন শীত ছিন্ন করে তখন এ বড় নয় কনকনে রাত তখন বসন্ত আর পাখিদের গাঢ় কলরব— কিন্তু এ এখন আমি মধু থেকে এত দূরে বরফে জমাট এক মানবিক শব।
সৈয়দ শামসুল হক
স্বদেশমূলক
নিলক্ষা আকাশ নীল, হাজার হাজার তারা ঐ নীলে অগণিত আর নিচে গ্রাম, গঞ্জ, হাট, জনপদ, লোকালয় আছে ঊনসত্তর হাজার। ধবলদুধের মতো জ্যোৎস্না তার ঢালিতেছে চাঁদ – পূর্ণিমার। নষ্ট খেত, নষ্ট মাঠ, নদী নষ্ট, বীজ নষ্ট, বড় নষ্ট যখন সংসার তখন হঠাৎ কেন দেখা দেয় নিলক্ষার নীলে তীব্র শিস দিয়ে এত বড় চাঁদ? অতি অকস্মাৎ স্তব্ধতার দেহ ছিঁড়ে কোন ধ্বনি? কোন শব্দ? কিসের প্রপাত? গোল হয়ে আসুন সকলে, ঘন হয়ে আসুন সকলে, আমার মিনতি আজ স্থির হয়ে বসুন সকলে। অতীত হঠাৎ হাতে হানা দেয় মরা আঙিনায়। নূরলদীনের বাড়ি রংপুরে যে ছিল, রংপুরে নূরলদীন একদিন ডাক দিয়েছিল ১১৮৯ সনে। আবার বাংলার বুঝি পড়ে যায় মনে, নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায় যখন শকুন নেমে আসে এই সোনার বাংলায়; নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায় যখন আমার দেশ ছেয়ে যায় দালালেরই আলখাল্লায়; নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায় যখন আমার স্বপ্ন লুট হয়ে যায়; নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায় যখন আমার কণ্ঠ বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যায়; নূরলদীনের কথা মনে পড়ে যায় যখন আমারই দেশে এ আমার দেহ থেকে রক্ত ঝরে যায় ইতিহাসে, প্রতিটি পৃষ্ঠায়। আসুন, আসুন তবে, আজ এই প্রশস্ত প্রান্তরে; যখন স্মৃতির দুধ জ্যোৎস্নার সাথে ঝরে পড়ে, তখন কে থাকে ঘুমে? কে থাকে ভেতরে? কে একা নিঃসঙ্গ বসে অশ্রুপাত করে? সমস্ত নদীর অশ্রু অবশেষে ব্রহ্মপূত্রে মেশে। নূরলদীনের কথা যেন সারা দেশে পাহাড়ী ঢলের মতো নেমে এসে সমস্ত ভাসায়, অভাগা মানুষ যেন জেগে ওঠে আবার এ আশায় যে, আবার নূরলদীন একদিন আসিবে বাংলায়, আবার নূরলদীন একদিন কাল পূর্ণিমায় দিবে ডাক,”জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়?
সৈয়দ শামসুল হক
স্বদেশমূলক
আমি জন্মেছি বাংলায় আমি বাংলায় কথা বলি। আমি বাংলার আলপথ দিয়ে, হাজার বছর চলি। চলি পলিমাটি কোমলে আমার চলার চিহ্ন ফেলে। তেরশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে ?আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে আমি তো এসেছি সওদাগরের ডিঙার বহর থেকে। আমি তো এসেছি কৈবর্তের বিদ্রোহী গ্রাম থেকে আমি তো এসেছি পালযুগ নামে চিত্রকলার থেকে।এসেছি বাঙালি পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার থেকে এসেছি বাঙালি জোড়বাংলার মন্দির বেদি থেকে। এসেছি বাঙালি বরেন্দ্রভূমে সোনা মসজিদ থেকে এসেছি বাঙালি আউল-বাউল মাটির দেউল থেকে।আমি তো এসেছি সার্বভৌম বারোভূঁইয়ার থেকে আমি তো এসেছি ‘কমলার দীঘি’ ‘মহুয়ার পালা’ থেকে। আমি তো এসেছি তিতুমীর আর হাজী শরীয়ত থেকে আমি তো এসেছি গীতাঞ্জলি ও অগ্নিবীণার থেকে।এসেছি বাঙালি ক্ষুদিরাম আর সূর্যসেনের থেকে এসেছি বাঙালি জয়নুল আর অবন ঠাকুর থেকে। এসেছি বাঙালি রাষ্ট্রভাষার লাল রাজপথ থেকে এসেছি বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর থেকে।আমি যে এসেছি জয়বাংলার বজ্রকণ্ঠ থেকে আমি যে এসেছি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে। এসেছি আমার পেছনে হাজার চরণচিহ্ন ফেলে শুধাও আমাকে ‘এতদূর তুমি কোন প্রেরণায় এলে ?তবে তুমি বুঝি বাঙালি জাতির ইতিহাস শোনো নাই- ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ একসাথে আছি, একসাথে বাঁচি, আজো একসাথে থাকবোই সব বিভেদের রেখা মুছে দিয়ে সাম্যের ছবি আঁকবোই।পরিচয়ে আমি বাঙালি, আমার আছে ইতিহাস গর্বের- কখনোই ভয় করিনাকো আমি উদ্যত কোনো খড়গের। শত্রুর সাথে লড়াই করেছি, স্বপ্নের সাথে বাস; অস্ত্রেও শান দিয়েছি যেমন শস্য করেছি চাষ; একই হাসিমুখে বাজায়েছি বাঁশি, গলায় পরেছি ফাঁস; আপোষ করিনি কখনোই আমি- এই হ’লো ইতিহাস।এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ, আমি কি তেমন সন্তান ? যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান; তারই ইতিহাস প্রেরণায় আমি বাংলায় পথ চলি- চোখে নীলাকাশ, বুকে বিশ্বাস পায়ে উর্বর পলি।
সৈয়দ শামসুল হক
প্রেমমূলক
এখন মধ্যরাত। তখন দুপুরে রাজপথে ছিলো মানুষের পদপাত। মিছিলে মিছিলে টলমল ছিলো সারাদিন রাজধানী। এখন কেবল জননকূল ছল বুড়িগঙ্গার পানি শান্ত নীরব নিদ্রিত সব। ওই একজন জানালায় রাখে তার বিনিদ্র হাত ছিলো একদিন তার উজ্জ্বল দিন, ছিলো যৌবন ছিলো বহু চাইবার। সারা রাত চষে ফিরেছে শহর খুঁজেছে সে ভালোবাসা। পেতেছে সে হাত জীবনের কাছে ছিলো তারও প্রত্যাশা পাওয়া না পাওয়ার প্রশ্নে হাওয়ার বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে এখন সারারাত হাহাকার।পথে ওড়ে ধুলো, ছাই ওড়ে শুধু পথে যে আগুন ছিলো একদা সে জ্বেলে ছিলো। হৃদয়ে এখন সৌধের ভাঙা টুকরো আছাড় খায়। আলো নিভে যায়, নিভে যায় আলো একে একে জানালায়। থেমে যায় গান তারপরও প্রাণ বাঁশিটির মতো বেজে চলে যেন সবই আছে সবই ছিলো।
সৈয়দ শামসুল হক
সনেট
সে কোন বাটিতে কও দিয়াছিলা এমন চুমুক নীল হয়া গ্যাছে ঠোঁট, হাত পাও শরীল অবশ, অথচ চাও না তুমি এই ব্যাধি কখনো সারুক। আমার জানতে সাধ, ছিল কোন পাতার সে রস? সে পাতা পানের পাতা মানুষের হিয়ার আকার? নাকি সে আমের পাতা বড় কচি ঠোঁটের মতন? অথবা বটের পাতা অবিকল মুখের গড়ন? তুঁতের পাতা কি তয়, বিষনিম, নাকি ধুতুরার? কতবার গেছি আমি গেরামের শ্যাষ সীমানায় আদাড় বাদার দিয়া অতিঘোর গহীন ভিতরে, কত না গাছের পাতা কতবার দিয়াছি জিহ্বায়, এমন তো পড়ে নাই পানি এই পরানে, শিকড়ে। তয় কি অচিন বৃক্ষ তুমি সেই ভুবনে আমার, আমারে দিয়াছো ব্যাধি, নিরাময় অসম্ভব যার?
সৈয়দ শামসুল হক
সনেট
উঠানের সেই দিকে আন্ধারের ইয়া লম্বা লাশ, শিমের মাচার নিচে জোছনার সাপের ছলম, পরীরা সন্ধান করে যুবতীর ফুলের কলম, তারার ভিতরে এক ধুনকার ধুনায় কাপাশ, আকাশে দোলায় কার বিবাহের রুপার বাসন, গাবের বাবরি চুল আলখেল্লা পরা বয়াতির, গাভির ওলান দিয়া ক্ষীণ ধারে পড়তাছে ক্ষীর, দুই গাঙ্গ এক হয়া যাইতাছে- কান্দন, হাসন। একবার আসবা না?- তোমারেও ডাক দিতে আছে যে তুমি দুঃখের দিকে একা একা যোজন গিয়াছো? একবার দেখবা না তোমারেও ডাক দিতে আছে যে তুমি আঘাত নিয়া সারাদিন কি তফাত আছো? যে নাই সে নাই সই, তাই সই, যা আছে তা আছে, এমন পুন্নিমা আইজ, কোন দুঃখে দুয়ার দিয়াছো?
সৈয়দ শামসুল হক
সনেট
তোমার খামাচির দাগ এখনো কি টকটাকা লাল, এখনো জ্বলন তার চোৎরার পাতার লাহান। শয়তান, দ্যাখো না করছ কি তুমি কি সোন্দর গাল, না হয় দুপুর বেলা একবার দিছিলাম টান? না হয় উঠানে ছিল লোকজন কামের মানুষ, চুলায় আছিল ভাত, পোলাপান পিছের বাগানে, তোমারে পরান দিছি, তাই বইলা দেই নাই হুঁশ, আমি তো তোমারে নিতে চাই নাই ঘরের বিছানে। হ, জানি নিজের কাছে কোনো কথা থাকে না গোপন। দিনের দুফুর বেলা যেই তুমি আসছিলা ঘরে আতখা এমন মনে হইছিল- আন্ধার যেমন, আতখা এমন ছায়া সোহাগের আর্শির ভিতরে। আবার ডাকলে পরে কিছুতেই স্বীকার হমু না। বুকের পাষাণ নিয়া দিমু ডুব শীতল যমুনা।।
সৈয়দ শামসুল হক
শোকমূলক
ইজদানি মারা গেছে বিমান-পতনে । স্পর্ধা ছিল পৃথিবীকে মুঠো করে ধরে নরোম সুগোল এক কমলালেবুর মতো। মাথা ভরা ছিল তার বইয়ের মলাট, টাই, নাম আর নকটান ভিউ, সম্ভবতঃ আলো ছিল গজ দুই নাইলন সুতো; মারা গেল অল্প বয়সেই অনেক ওপর থেকে নানা চাপ হাওয়া সাঁতারিয়ে। তোমরা এখনো যারা যাবে কোনো চায়ের বিকেলে সদাশয়া মহিলার কাছে; -একদিন সমবেত শোক করা গেছে- আজকে আসেনি ওরা? চায়ে চিনি নেই? কথা আর হাওয়া এই- র‌্যাবো কি মাতাল কোনো কিশোর লেখক? যাই বলো ক কতো সে বড্ড বেয়াড়া। -জেনে রেখো, ইজাদানি সুক্ষ্ম দেহে পেছনেই আছে॥
সৈয়দ শামসুল হক
সনেট
নদীর কিনারে গিয়া দেখি নাও নিয়া গ্যাছে কেউ অথচ এই তো বান্ধা আছিল সে বিকাল বেলায়। আমার অস্থির করে বুঝি না কে এমন খেলায়, আমার বেবাক নিয়া শান্তি নাই, পাচে পাছে ফেউ। পানির ভিতরে য্যান ঘুন্নি দিয়া খিলখিল হাসে যত চোর যুবতীরা, গ্যারামের শ্যাষ সীমানায় বটের বৈরাগী চুল, ম্যাঘে চিল হারায় বারায়, বুকের ভিতরে শিস দিয়া সন্ধা হাঁটে আশেপাশে। এখন কোথায় যাই, এইখানে বড় সুনসান, মানুষের দুঃখ আছে, জগতের আছে কিনা জানি না- জগৎ এমনভাবে হয়া যায় হঠাৎ অচিনা। মনে হয় আমার থিকাও একা বৃক্ষের পরান, আমার থিকাও দুঃখী যমুনার নদীর কিনার। আমার তো গ্যাছে এক, কত কোটি লক্ষ গ্যাছে তার।।
সৈয়দ শামসুল হক
চিন্তামূলক
যদি মনে করো ভালোবাসা মরে গেছে যদি মনে করো ভালোবাসা আর নেই যদি মনে করো ভালোবাসা বলে কখনো ছিল না কিছু— তখন তাকিয়ে দেখো বাগানের দিকে— সূর্যের দিকে শিমলতা চেয়ে আছে! অথবা গাছের গুঁড়িতে পিঁপড়ে বাসা করে দেখে নিয়ো, বেরিয়েছে ওরা তোমার গলার মতির মালার মতো দীর্ঘ সারিতে মানুষের দিকে শর্করা সন্ধানে, যদি মনে করো ভালোবাসা মরে গেছে ভালোবাসার এই শব্দের মানে ওখানে উল্টে দেখো। পথের কুকুর শুয়ে থাকে ঘুমে ল্যাম্পপোস্টের নিচে, ভিখিরি খোঁড়ায় হেঁটে যায় তবু হাত তার পেতে রাখে, কোথাও কিছুই মরে যায়নি তো,ঘুমে জাগরণে অভাবে অধীরে তবু রৌদ্রের দিকে। পাতা ঝরে যায়, পাতা ধরে ওঠে মাঠ, শাকান্ন তবু পরিতৃপ্তিতে সংশয়ী হাত চাটে— যদি মনে করো ভালোবাসা বলে কখনো ছিল না কিছু, অন্তত নিয়ো আমার অন্ন তোমাদের পাতে তুলে।২১ সেপ্টেম্বর ২০১৫, লন্ডন, সকাল সাড়ে আটটা
সৈয়দ শামসুল হক
স্বদেশমূলক
ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া নীল এই মখমল রাতে চাঁদের সোনালি থালা, রাশি রাশি নক্ষত্রের ফুল; মনে হয় মানুষ এমন রাত দেখেছে বোগদাদে। অথচ কী অগ্নিদাহ, স্তব্ধতার দীর্ঘ কালো চুল খুলে পড়ে আছে পথে রাজপথে অন্ধকারময়। ছদ্মবেশে—হারুনর রশিদের মতো—নামী পথে, এখন আমার সঙ্গী সেদিনের হাবশি খোজা নয়— আমারই কবিতাগুলো, নাছোড় সঙ্গী সে কোনোমতে। শব্দের অমৃত আমি পান করে উঠি সেই কবে, এখনো জিহ্বায় স্বাদ, চেতনায় অমরত্ব ধরি, না, আমার নয় সেটি, আমাদেরই ভাষার—আ মরি! ভাষার খবর নাই, তবু কথা ভাষাতেই ক’বে! কী কথা তাহার সাথে? তার সাথে? প্রশ্ন প্রেমিকের যখন প্রেমিকা তার কথা বলে অপরের সাথে। ওটি কি কাব্যেই শুধু? ওই ভাষা—জীবনানন্দের। এখনো কি তরুণ প্রেমিক তার প্রমিত ভাষাতে? পথ চলতে থেমে যাই!—ওর লগে তুই কি করোস? কিয়ের প্যাচাল এত? উত্তরে সে, তুই কি জেলাস? দিন পরে দিন যায়, সরোদের টংকারে খরজ। বানরের হাতে খন্তা—বাংলা আজ ব্যবহৃত লাশ। ভাষার গভীরে ভাষা, চেতনার গভীরে চেতনা— এ যদি কানে না পশে, বোধে যদি নাই এসে যায়, তবে তো বাহান্ন সাল একাত্তর কখনো পেত না! ভাষার গভীরে দেশ, দেশকণ্ঠ রয়েছে ভাষায়। কে তাকে আবার দেবে প্রাণ ফিরে জীবন ফুৎকারে? কে আছে প্রেমিক আজও হৃদয়ের এবং ভাষার? মানুষ যদি না নামে পাঁক থেকে প্রতিমা উদ্ধারে! পঙ্গু যদি তবু তারই দায় আজ পাহাড় ভাঙার। ইতিহাসে এত রক্ত দেখেছি এ একটি জীবনে— সন্ধ্যায় আকাশ মাখে রক্ত সেই কারবালা যুদ্ধের, সে কথা সুদূর কথা, বাহান্নর কথা পড়ে মনে— ফেব্রুয়ারি একুশের রক্ত আজও এ বুকে ক্ষুদ্রের।
সৈয়দ শামসুল হক
স্বদেশমূলক
তোমার বয়স কতো, আঠারো উনিশ? মুখশ্রী কেমন? রঙ চোখ চুল কী রকম? চলার ভঙ্গিমা? ছিল কি বাগান, আর তোমার মল্লিকা বনে ধরেছিল কলি? ছিলে তুমি কারো প্রতিমা? জানি না।না, জানি। পৃথিবীর সব মাস সব দিন তোমার হাতের মধ্যে এসে গিয়েছিল, দুপুরের মতো মুখ, রৌদ্রদগ্ধ চোখ, পায়ে চৈত্রের বাতাস, তোমার বাগানে- কলোনি স্বদেশে- ধরেছিল সাড়ে সাত কোটি মল্লিকার কলি, তুমি ছিলে মুক্তির প্রতিমা।ওই বুকে মাইন বেঁধে বলেছিলে- জয় বাংলা- মানুষের স্বাধীনতা দীর্ঘজীবী হোক, ট্যাঙ্কের ওপর ঝাঁপ দিতে দিতে বলেছিলে- বর্বরতা এইভাবে মুছে যাক, ধ্বংস হোক সভ্যতার কীট। অন্তিমবারের মতো পথিকেরা পথে এসে দাঁড়িয়েছে, আকাশে উঠেছে ধ্রুবতারা- ধ্রুবতারা হয়ে গেছে মুক্তির জননী রোশেনারা। [কে রোশেনারা? শুদ্ধ উচ্চারণে হয়তো রওশনআরা। গ্রাম-বাংলায় তা-ই রুশেনারা কিংবা রোশেনারা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ কালে এই রোশেনারাই ছিল ট্রেঞ্চে ট্রেঞ্চে প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার এক অসম্ভব ভালোলাগা প্রত্যয়ের নাম। রোশেনারার মতো একজনকে বোন ভেবে গর্বে বুক ফুলে উঠত তাদের। শরণার্থী শিবিরগুলোতেও তাই, তারা উদ্দীপ্ত হতো তেজোদ্দীপ্ত এক বাঙালী মেয়ের দূরন্ত সাহসীপনায়। 
সৈয়দ শামসুল হক
সনেট
আমারে তলব দিও দ্যাখো যদি দুঃখের কাফন তোমারে পিন্ধায়া কেউ অন্যখানে যাইবার চায় মানুষ কি জানে ক্যান মোচড়ায় মানুষের মন, অহেতুক দুঃখ দিয়া কেউ ক্যান এত সুখ পায়? নদীরে জীবন কই, সেই নদী জল্লাদের মতো ক্যান শস্য বাড়িঘর জননীর শিশুরে ডুবায়? যে তারে পরান কই, সেই ব্যাক্তি পাইকের মতো আমার উঠানে ক্যান নিলামের ঢোলে বাড়ি দ্যায়? যে পারে উত্তর দিতে তার খোঁজে দিছি এ জীবন, দ্যাখা তার পাই নাই, জানা নাই কি এর উত্তর। জানে কেউ? যে তুমি আমার সুখ, তুমিই কি পারো আমারে না দুঃখ দিয়া? একবার দেখি না কেমন? কেমন না যায়া তুমি পারো দেখি অপরের ঘর?- অপর সন্ধান করে চিরকাল অন্য ঘর কারো।।
সৈয়দ শামসুল হক
স্বদেশমূলক
আমি একটুখানি দাঁড়াব এবং দাঁড়িয়ে চলে যাব; শুধু একটু থেমেই আমি আবার এগিয়ে যাব; না, আমি থেকে যেতে আসিনি; এ আমার গন্তব্য নয়; আমি এই একটুখানি দাঁড়িয়েই এখান থেকে চলে যাব। আমি চলে যাব তোমাদের এই শহরের ভেতর দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি এর মার্চপাস্টের যে সমীকরণ এবং এর হেলিকপ্টারের যে চংক্রমণ, তার তল দিয়ে তড়িঘড়ি; আমি চলে যাব তোমাদের কমার্সিয়াল ব্লকগুলোর জানালা থেকে অনবরত যে বমন সেই টিকার-টেপের নিচ দিয়ে এক্ষুনি; আমি চলে যাব তোমাদের কম্পিউটারগুলোর ভেতরে যে বায়ো-ডাটার সংরক্ষণ তার পলকহীন চোখ এড়িয়ে অবিলম্বে; আমি চলে যাব যেমন আমি যাচ্ছিলাম আমার গন্তব্যের দিকে ধীরে ধীরে বহুকাল ধরে আমি একটি দু’টি তিনটি প্রজন্ম ধরে। আমি কথা দিচ্ছি তোমাদের কোনো রমণীকে আমি চুম্বন করব না; আমি কথা দিচ্ছি তোমাদের কোনো সন্তানকে আমি কোলে করব না; এবং কথা দিচ্ছি তোমাদের এপার্টমেন্টের জন্যে আমি দরখাস্ত করব না, তোমাদের ব্যাংক থেকে আমি ঋণ গ্রহণ করব না, তোমাদের শাসন-পরিষদে আমি সদস্য হতে চাইব না, তোমাদের নির্বাচনে আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব না; এবং আমি আরো কথা দিচ্ছি তোমাদের বেতারে কোন ভাষণ দেব না, তোমাদের কম্পিউটারে কোন তথ্য ফিড করব না, তোমাদের হেলিকপ্টারে আমি উড্ডীন হতে চাইব না, তোমাদের মার্চপাস্টে আমি ড্রামবাদক হব না। তোমাদের এপার্টমেন্ট আমার কষ্ট, তোমাদের উনোন আমার কষ্ট, তোমাদের ব্যাংক আমার কষ্ট, তোমাদের পরিষদ আমার কষ্ট, তোমাদের আয়না আমার কষ্ট, তোমাদের গেলাশ আমার কষ্ট, তোমাদের রমণী আমার কষ্ট, তোমাদের সন্তান আমার কষ্ট। আমি শুধু একটু সময় দাঁড়িয়ে দেখে যাব- এ সবের ভেতর দিয়েই তো আমার বাড়ি যাবার পথ, আমি বাড়ি যাব, পৃথিবীতে সমস্ত বাড়ি যাবার পথেই আছে এরকম একেকটি শহর; আমি এক্ষুনি এগিয়ে যাব। তোমাদের যে এপার্টমেন্ট, আমি জানি, তার ছাদ নেই; তোমাদের যে উনোন, আমি জানি, তার আগুন নেই; তোমাদের যে ব্যাংক, আমি জানি, তার স্বচ্ছলতা নেই; তোমাদের যে পরিষদ – কারো সম্মতি নেই; তোমাদের যে আয়না – কোনো প্রতিফলন নেই; তোমাদের যে গেলাশ – কোনো পানীয় নেই; আমি জানি তোমাদের রমণীদের গর্ভধারণ করবার ক্ষমতা নেই; আমার জানা আছে তোমাদের সন্তানদের হাতে শস্যের একটিও বীজ নেই। একটি দু’টি তিনটি প্রজন্ম ধরে আমি একাধিক যুদ্ধ – একটি শান্তিকে, একাধিক মন্বন্তর – একটি ফসলকে, একাধিক স্তব্ধতা – একটি উচ্চারণকে, একাধিক গণহত্যা – একটি নৌকোকে, একাধিক পতাকা – একটি স্বাধীনতাকে শরীরে আমার বীভৎস ক্ষতের মধ্যে লাল স্পন্দনের মতো অনুভব করতে করতে এই যে ক্রমাগত এগিয়ে চলেছি- সে একটি বাড়ির দিকে যে কখনো ভেঙে পড়ে না, সে একটি উনোনের দিকে যে কখনো নিভে যায় না, সে একটি ব্যাংকের দিকে যে কখনো দেউলে হয় না, সে একটি পরিষদের দিকে যে কখনো যুদ্ধ ঘোষণা করে না, এমন একটি আয়নার দিকে যেখানে প্রতিফলন, এমন একটি গেলাশের দিকে যেখানে পরিস্রুত পানীয়, এমন একটি রমণীর দিকে যে এইমাত্র চুল খুলেছে, এমন এক সন্তানের দিকে যে এইমাত্র বর্ষায় ভিজেছে। আমার এই অগ্রসর সে তোমাদের ভেতর দিয়েই অগ্রসর। রাতের পর রাত ভেঙে উৎকর্ণ জন্তুর মতো চলেছি চাঁদের নিচে পানির সন্ধানে, সমস্ত স্তব্ধতাকে মাকড়শার জালের মতো ছিঁড়ে ছিঁড়ে গুহাবন্দী মানুষের মতো আমি চলেছি পানির শব্দ নির্ণয় করে। আমি এখনো জানি না তার শেষে অপেক্ষা করছে কিনা একটি রমণী অথবা তার হাঁসুলী ছেঁড়া পুঁতি; আমি এখনো জানি না তার শেষে দেখতে পাব কিনা সরোবরের ভেতরে চাঁদ অথবা কাদার ভেতরে করোটি। তবু আমাকে যেতে হবে এবং তবু আমাকে যেতেই হবে, সহস্র ক্ষত শরীরে। তোমাদের এই শহরের ভেতর দিয়ে যেতে যদিবা আমার চোখে পড়ল কচিৎ একটি যুগল যাদের গান এখনো বহন করতে বাতাস বড় ইচ্ছুক, আমি জানি আমিও তো একটি যুগল হতে চেয়েছি- তাই আমার একটুখানি থামা। যদিবা আমার চোখে পড়ল ছেঁড়া কিছু কাগজ যার ভেতরে বন্দী কোনো কবির লেখা ছিন্ন ক’টি অক্ষর, আমি জানি আমিও তো একটি কবিতার জন্যে কলম ধরেছি- তাই আমার একটু এই দাঁড়ানো। যদিবা আমার চোখে পড়ল শাদা একটি ফুল যা রাতের অন্ধকারে ছোট্ট কিন্তু তীব্র সুগন্ধ নিয়ে ফুটেছিল, আমি জানি আমিও তো একটি উদ্যানই আমার স্বপ্নে দেখেছি- তাই আমার একটু শুধু বিরতি। আমাকে এক রমণী তার রাতের প্রস্তুতি নিয়ে ডাকছে, আমাকে যেতেই হবে; আমাকে একটি কাগজ তার কবিতার সম্ভাবনা নিয়ে ডাকছে, আমাকে যেতেই হবে; আমাকে একটি উদ্যান তার চারাগাছগুলো নিয়ে ডাকছে, আমাকে যেতেই হচ্ছে আমাকে ডাকছে একটি শিশু, আমাকে ডাকছে একটি রাষ্ট্র, আমাকে ডাকছে একটি আয়না তার সমুখে স্থাপিত হবার জন্যে। তাই একটুখানি দাঁড়িয়েই আমি এগিয়ে যাব আবার যেমন যাচ্ছিলাম ধীরে ধীরে বহুকাল ধরে আমি একটি দু’টি তিনটি প্রজন্ম ধরে। তোমাদের ভেতর দিয়েই তো সর্বকাল চলে গেছে আমার পথ এবং সর্বকাল আমি দাঁড়িয়েছি আমি আবার নিয়েছি পথ।
সৈয়দ শামসুল হক
সনেট
কি আছে তোমার দ্যাশে? নদী আছে? আছে নাকি ঘর? ঘরের ভিতরে আছে পরানের নিকটে যে থাকে? উত্তর সিথানে গাছ, সেই গাছে পাখির কোটর আছে নাকি? পাখিরা কি মানুষের গলা নিয়া ডাকে? যখন তোমার দ্যাখা জানা নাই পাবো কি পাবো না, যখন গাছের তলে এই দেহ দিবে কালঘুম, যথন ফুরায়া যাবে জীবনের নীল শাড়ি-বোনা তখন কি তারা সব কয়া দিবে আগাম-নিগুম? আমার তো দ্যাশ নাই, নদী নাই, ঘর নাই, লোক, আমার বিছানে নাই সোহাগের তাতের চাদর, আমার বেড়ায় খালি ইন্দুরের বড় বড় ফোক, আমার বেবাক ফুল কাফনের ইরানী আতর। তোমার কি সাধ্য আছে নিয়া যাও এইখান থিকা, আমার জীবন নিয়া করো তুমি সাতনরী ছিকা।
সৈয়দ শামসুল হক
স্বদেশমূলক
তোমাকে অভিবাদন, বাংলাদেশ, তুমি ফিরে এসেছ তোমার মানচিত্রের ভেতরে যার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তেরো শো নদীর ধারা ; তোমাকে অভিবাদন, বাংলাদেশ, তুমি ফিরে এসেছ তোমার করতলে পাঙরাটির বুকে যার ডানা এখন রক্ত আর অশ্রুতে ভেজা ; তোমাকে অভিবাদন, বাংলাদেশ, তুমি ফিরে এসেছ তোমার বৃষ্টিভেজা খড়ের কুটিরে যার ছায়ায় কত দীর্ঘ অপেক্ষায় আছে সন্তান এবং স্বপ্ন ; তোমাকে অভিবাদন, বাংলাদেশ, তুমি ফিরে এসেছ তোমার তোমার নৌকার গলুইয়ে যার গ্রীবা এখন ভবিষ্যতের দিকে কেটে চলেছে স্রোত ; তোমাকে অভিবাদন, বাংলাদেশ, তুমি ফিরে এসেছ তোমার মাছধরা জালের ভেতরে যেখানে লেজে মারছে বাড়ি একটা রুপালী চিতল ; তোমাকে অভিবাদন, বাংলাদেশ, তুমি ফিরে এসেছ তোমার হালের লাঙলের ভতরে যার ফাল এখন চিরে চলেছে পৌষের নবান্নের দিকে ; তোমাকে অভিবাদন, বাংলাদেশ, তুমি ফিরে এসেছ তোমার নেহাই ও হাতুড়ির সংঘর্ষের ভতরে যার একেকটি স্ফুলিঙ্গে এখন আগুন ধরছে অন্ধকারে ; তোমাকে অভিবাদন, বাংলাদেশ, তুমি ফিরে এসেছ তোমার কবিতার উচ্চারণে যার প্রতিটি শব্দ এখন হয়ে উঠছে বল্লমের রুপালী ফলা ; তোমাকে অভিবাদন, বাংলাদেশ, তুমি ফিরে এসেছ তোমার দোতারার টান টান তারের ভেতরে যার প্রতিটি টঙ্কার এখন ইতিহাসকে ধ্বনি করছে ; তোমাকে অভিবাদন, বাংলাদেশ, তুমি ফিরে এসেছ তোমার লাল সূর্য্ আঁকা পতাকার ভেতরে যার আলোয় এখন রঞ্জিত হয়ে উঠছে সাহসী বদ্বীপ ; তোমাকে অভিবাদন, বাংলাদেশ, তুমি ফিরে এসেছ তোমার অনাহারী শিশুটির কাছে যার মুঠোর ভেতরে এখন একটি ধানের বীজ ; তোমাকে অভিবাদন, বাংলাদেশ, তুমি ফিরে এসেছ তোমার প্লাবনের পর কোমল পলিমাটিতে যেখানে এখন অনবরত পড়ছে কোটি কোটি পায়ের ছাপ ।
সৈয়দ শামসুল হক
সনেট
তোমার দ্যাশের দিকে ইস্টিশানে গেলেই তো গাড়ি সকাল বিকাল আসে, এক দন্ড খাড়ায়া চম্পট, কত লোক কত কামে দূরে যায়, ফিরা আসে বাড়ি- আমার আসন নাই, যাওনেরও দারুন সংকট। আসুম? আসার মতো আমি কোনো ঘর দেখি নাই। যামু যে? কোথায় যামু, বদলায়া গ্যাছে যে বেবাক। কেমন তাজ্জব সব পাল্টায়া যায় আমি তাই দেইখাছি চিরকাল। পরানের ভিতরে সুরাখ- সেখানে কেবল এক ফরফর শব্দ শোনা যায়, পাখিরা উড়াল দিয়া গ্যাছে গিয়া, এখন বিরান, এখন যতই আমি ছড়া দেই কালিজিরা ধান, সে কি আর আঙিনায় ফিরা আসে? আর কি সে খায়? সকাল বিকাল গাড়ি, চক্ষু আছে তাই চক্ষে পড়ে; পলকে পলকে গাড়ি সারাদিন মনের ভিতরে।।
সৈয়দ শামসুল হক
সনেট
জামার ভিতর থিকা যাদুমন্ত্রে বারায় ডাহুক, চুলের ভিতর থিকা আকবর বাদশার মোহর, মানুষ বেকুব চুপ,হাটবারে সকলে দেখুক কেমন মোচড় দিয়া টাকা নিয়া যায় বাজিকর ৷ চক্ষের ভিতর থিকা সোহাগের পাখিরে উড়াও, বুকের ভিতর থিকা পিরীতের পূর্ণিমার চান, নিজেই তাজ্জব তুমি – একদিকে যাইবার চাও অথচ আরেক দিকে খুব জোরে দেয় কেউ টান৷ সে তোমার পাওনার এতটুকু পরোয়া করে না, খেলা যে দেখায় তার দ্যাখানের ইচ্ছায় দেখায়, ডাহুক উড়ায়া দিয়া তারপর আবার ধরে না, সোনার মোহর তার পড়া থাকে পথের ধূলায় ৷ এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর ৷
সৈয়দ শামসুল হক
সনেট
আন্ধার তোরঙ্গে তুমি সারাদিন কর কি তালাশ? মেঘের ভিতর তুমি দ্যাখ কোন পাখির চক্কর? এমন সরল পথ তবু ক্যান পাথরে টক্কর? সোনার সংসার থুয়া পাথারের পরে কর বাস? কি কামে তোমার মন লাগে না এ বাণিজ্যের হাটে? তোমার সাক্ষাৎ পাই যেইখানে দারুণ বিরান, ছায়া দিয়া ঘেরা আছে পরিস্কার তোমার উঠান অথচ বেবাক দেখি শোয়া আছে মরনের খাটে। নিঝুম জঙ্গলে তুমি শুনছিলা ধনেশের ডাক? হঠাৎ আছাড় দিয়া পড়ছিল রূপার বাসন? জলপির গাছে এক কুড়ালের কোপের মতন তাই কি তোমার দেহে ল্যাখা তিন বাইন তালাক? এমন বৃক্ষ কি নাই, যার ডালে নাই কোন পরী? এমন নদী কি নাই, যার বুকে নাই কোন তরী?
সৈয়দ শামসুল হক
সনেট
কে য্যান কানতে আছে- তার শব্দ পাওয়া যায় কানে, নদীও শুকায়া যায়, আকালের বাতাস ফোঁপায়, মানুষেরা বাড়িঘর বানায় না আর এই খানে, গোক্ষুর লতায়া ওঠে যুবতীর চুলের খোঁপায়। বুকের ভিতর থিকা লাফ দিয়া ওঠে যে চিক্কুর, আমি তার সাথে দেই শিমুলের ফুলের তুলনা, নিথর দুফুর বেলা, মরা পাখি, রবি কি নিষ্ঠুর, আগুন লাগায়া দিবে, হবে খাক, তারি এ সূচনা। অথচ আমারে কও একদিন এরও শ্যাষ আছে- আষাঢ়ের পুন্নিমার আশা আর এ দ্যাশে করি না, চক্ষু যে খাবলা দিয়া খায় সেই পাখি বসা গাছে, অথচ খাড়ায়া থাকি, এক পাও কোথাও নড়ি না। সকল কলস আমি কালঘাটে শূণ্য দেইখাছি, তারে না দেইখাছি তাই দ্যাখনের চক্ষু দিতে রাজি।।
সৈয়দ শামসুল হক
সনেট
একবার চাই এক চিক্কুর দিবার, দিমু তয়? জিগাই কিসের সুখে দুঃখ নিয়া তুমি কর ঘর? আঙিনার পাড়ে ফুলগাছ দিলে কি সোন্দর হয়, দুঃখের কুসুম ঘিরা থাকে যার, জীয়ন্তে কবর। পাথারে বৃক্ষের তরে ঘন ছায়া জুড়ায় পরান, গাঙের ভিতরে মাছ সারাদিন সাঁতরায় সুখে, বাসরের পরে ছায়া য্যান দেহে গোক্ষুর জড়ান, উদাস সংসারে ব্যথা সারাদিন ঘাই দেয় বুকে। তবুও সংসার নিয়া তারে নিয়া তুমি কি পাগল, তোলো লালশাক মাঠে, ফসফস কোটো পুঁটিমাছ, সাধের ব্যাঞ্জন করো, রান্ধো ক্ষীর পুড়ায়া আঞ্চল, বিকাল বেলায় কর কুঙ্কুমের ফোঁটা দিয়া সাজ। ইচ্ছা করে টান দিয়া নিয়া যাই তোমারে রান্ধুনি, তোমার সুতায় আমি একখান নীল শাড়ি বুনি।।
সৈয়দ শামসুল হক
সনেট
কিছু শব্দ উড়ে যায়, কিছু শব্দ ডানা মুড়ে থাকে, তরল পারার মতো কিছু শব্দ গলে পড়ে যায়। এমন সে কোন শব্দ নক্ষত্রের মতো ফুটে থাকে_ তুমি কি দেখেছো তাকে হৃদয়েশ্বরের আয়নায়? দ্যাখোনি যখন কালো অন্ধকার উঠে আসে_ গ্রাসে। যখন সৌজন্য যায় কবরে মাটি কল্পতায়, যখন স্তব্ধতা গিলে খেতে থাকে কামুকেরা ত্রাসে, তখন তাকিয়ে দেখো শুদ্ধতার গভীর ব্যাথায়_ আমার ঠোঁটের থেকে একটি যে শব্দ একদিন ফুটেছিলো এই ঠোঁটে তোমারই যে দেহস্পর্শ তাপে, আজ সেই শব্দ দ্যাখো পৃথিবীর বুকে অন্তরীণ_ তবু তারই উচ্চারণে বৃক্ষপাতা বারবার কাঁপে। পড়ে নিও তুমি তাকে, দেখে নিও আকাশে নয়তো সেই শব্দ ‘ভালোবাসি’ নক্ষত্রের মতোই হয়তো।।
সৈয়দ শামসুল হক
স্বদেশমূলক
তোমার দেহে লতিয়ে ওঠা ঘন সবুজ শাড়ি। কপালে ওই টকটকে লাল টিপ। আমি কি আর তোমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারি? তুমি আমার পতাকা, আমার কৃষির বদ্বীপ।করতলের স্বপ্ন-আমন ধানের গন্ধ তুমি তুমি আমার চিত্রকলার তুলি। পদ্য লেখার ছন্দ তুমি−সকল শব্দভুমি। সন্তানের মুখে প্রথম বুলি।বুকে তোমার দুধের নদী সংখ্যা তেরো শত। পাহাড় থেকে সমতলে যে নামি−নতুন চরের মতো তোমার চিবুক জাগ্রত− তুমি আমার, প্রেমে তোমার আমি।এমন তুমি রেখেছ ঘিরে−এমন করে সব− যেদিকে যাই−তুমিই শুধু−তুমি! অন্ধকারেও নিঃশ্বাসে পাই তোমার অনুভব, ভোরের প্রথম আলোতেও তো তুমি!
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
মনটা আমার গোপন করে রাখা আছে যার আশ্রয়ে সে কেন যে অশান্ত হয়, অশান্ত এই মনের ভয়ে ? সব কিছুই জেনে শুনে মরে কিসের প্রমদ গুণে ? সাধ্য আমার আছে কি-আর না চলে তার তালে লয়ে ?।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
সনেট
বহুদিন শুনিনাতো আত্মার নির্মোহ উচ্চারণ কেবল ক্ষমতা লোভে ধাবমান বিবেক মগজ--- নগরীর ডাস্টবীনে জমে থাকা মাছিদের ভোজ বয়ে যেন চলেছে মানুষ আজো --- মানুষের মন হয়ে গেছে গাঢ় নীল মাছি --- যার পাখার গুঞ্জন গানের মতই বাজে ক্ষমতাবানের চেতনায় অথবা আরোগ্যহীন অচৈতন্য ব্যাধির লোনায় সমাজের প্রতি রন্ধ্রে চলেছে ক্ষয়ের সংক্রমণ ক্ষমতার কীট জানে প্রভূ তার নরকের দূত বিশ্বময় রক্তপাত --- লক্ষ-কোটি অযুত-নিযুত ---- নেতা-নেত্রী নতজানু --- পণ্ডিতেরা পরিনত দাসে করুণার পলেস্তারা টেনে নেয় ভঙ্গুর আবাসে কুঁজো হয়ে খোঁজে কার ব্যাঙ্ক হলো কতটা গরবী তবু এর মধ্যে জাগে একাকী নির্ভীক এক কবি
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
স্বদেশমূলক
ঠাকুর মায়ের ঝুলি থেকে উঠে আসা আমি নই আমাকে রাক্ষস আখ্যা দিয়েছিলো বর্বরের দল দানব বা দৈত্য বলে গালি দেয়া মিথ্যুকের বই বানানো গল্পের বুলি, কোনোদিন হবে না সফল আমার শিশুকে আমি শেখবো না মিথ্যের ভাষণ --- শেখাবো আমার পূর্বপুরুষেরা - কালো মানুষেরা ভূমিপুত্র ছিলো, এই ভূমিতেই তাদের আসন চিরস্থায়ী ছিলো আর সে আমার সত্য দিয়ে ঘেরাকোনো রাজপুত্র নয়, কেউ নয় স্বর্গলোকবাসী লুটেরা দস্যুর দল ভয়ঙ্কর স্বভাব-আগ্রাসী রক্ত পিপাসায় মত্ত ছিলো তারা গণ-হন্তারক বহিরাগতের দল, অশ্বারোহী, অস্ত্রের ধারক--- ছিলো না কৃষির জ্ঞান মাটি থেকে ফলাতে ফসল শেখেনি, আথচ তারা নিয়েছিলো মাটির দখল ভূমিপুত্রদের তারা শূদ্র আর অচ্ছুৎ বানিয়ে রেখেছিলো মিথ্যে যতো সাস্ত্রাচার সংস্কার দিয়েমানুষের সভ্যতার হত্যাকারী দেবলোক থেকে আসেনি সে সত্য আজ জেনে গেছে কালো মানুষেরা আমাদের শিশুরাও সেই সত্যে শানাবে নিজেকে জানাবে এ মাটি তার। নয় কোনো দস্যুদের ডেরা------------ ০৭ / ০৮ / ২০১৫
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
ভীষণ রেগে অনেকগুলো পাথর ছোড়ে কথার অবাক লাগে এখনো কেউ রাগতে পারে দেখে থুথুর চেয়ে পাথর ভালো - ছোড়ার স্বাধীনতার প্রয়োগ গুনে প্রতিরোধের পাহাড় গড়ে রেখে দাঁড়ায় একা বুক চিতিয়ে ক্রান্তি খোঁজা মোড়েলোকটাকে তো চেনাই লাগে - দেখেছিলাম কোথায় চতুর্দিকে পতনবাহী বাতাস শুধু ওড়ে- বহু যুগের অন্ধ চোখে দৃষ্টি খোঁজা প্রথায় ঘৃণার চেয়ে ক্রোধের দিকে তাকাতে ভয় পেলে পরিচয়ের প্রতিকৃতি আত্মাটাকে কাঁপায় মেরুদণ্ডে শীতল ধারা কে যেন দেয় ঢেলে- কোথায় ছিলো এই যুবা যে ভয়াল ক্রোধে দাপায়নিজের থেকে পালাই যত ততই ঘেরে আঁধার চেনা যে পথ তাতেও দেখি ছায়া গোলক ধাঁধার
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
আমার প্রথম লেখা প্রেমপত্রটা ফিরিয়ে দিয়েই দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে যেন পঞ্চান্নটা বছরের ভার মুক্ত হয়ে ফেরালো সে অতি দ্রুত বিষন্ন দু’চোখ - ‘‘চাই না মৃত্যুর পরে কেউ এটা করুক উদ্ধার’’ বললো সে অস্ফুট স্বরে – ‘‘নষ্ট করে দিতেও পারিনি’’ তারপর ফিরে গেলো সেই তার জগত-সংসার যেখানে বিছানো আছে সেখানের অভ্যস্ত ছায়ায় এখন আমার হাতে পঞ্চান্নটা বছরের দ্বার যে কোনো সময় যেন খুলে দিতে পারে সব ভাঁজ অথচ সেখানে ঢুকি – সে সাহস নেই জানি আর পকেট হাতড়িয়ে তাই বের করি পুরানো দেশলাই দাউ দাউ জ্বলে ছাই পঞ্চান্নটা বছরের ভার –
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
তোমার প্রেমের অগ্নিশিখায় পুড়বে না কে আছে এমন ? সাধ আমারো ছিলো কিন্তু সাধ্যে বড়ই সামান্য ধন । মন সে কথা জানে তবু জীবননাশা অবাধ্যতায় বলে, এমন মরণ পেলে সর্বনাশে ভয়টা কোথায় ? আমি বড়ই অসহায়ের মতো দেখি নিজের দহন ।।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
ব্যর্থ হয়ে যাবে কেন তোমার অমন তীরন্দাজি লক্ষ্য যখন হাতের মুঠোয়, কে পাল্টাবে তোমার বাজী? দুঃখ শুধু একটুখানি, তৃষ্ণাময়ী ভাবলে তুমি কী সহজেই হলে জয়ী জানলে না-তো কী উৎসাহে মরতে আমি ছিলাম রাজী ।।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
মানবতাবাদী
।।১।। নেমেছে হিম এবারো ফুটবে কি ঘোড়ার ডিম ।।২।। সত্য তাই হাজারো বার শোনা মিথ্যেটাই ।।৩।। অশ্বডিম পাড়তে অশ্বিনী ধরেছে ঝিম ।।৪।। আমলা চাই মামলা দিতে লাখো কামলা চাই ।।৫।। ঘটিয়ে দাও ঘটনা না ঘটুক রটিয়ে দাও
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
সনেট
এখন মরণ ঘোরে পথেঘাটে, 'মরণ' শব্দটা অতিশয় রোম্যান্টিক, তার চেয়ে 'মৃত্যু' বড় যথাযোগ্য হিংস্র এক নাম শোনামাত্র লোকেদের অন্তরাত্মা কেঁপ ওঠে, আনত সালাম জনিয়ে আড়ালে সরে, শুধু এক কবি যার লেখার বিষয় গানের কবিতা জুড়ে শতবার লিখে লিখে 'মরণ মরণ' মৃত্যুকেও তার সাথ মিলিয়ে বানিয়ে নিয়ে নিত্য অন্ন জল ভোজনে ঢেকুর তোলে মানুষের মতো, তার বাঁচার ধরণ প্রত্যহ ঘোষণা করে মৃত্যু পুনরুত্থানের সূচনা কেবল ।শরীর সবাই দেখে, জীবনের দেখা পায় ক্বচিৎ ক'জন কখনো কাউকে দেখে জীবন হয়তো বলে, 'মরণ আমার!' মেঘ চেরা হাসি হয়ে বেজে ওঠে আচম্বিতে যার উচ্চারণ মৃত্যুর সাধ্য কি তার আলিঙ্গিত অন্তরের গহীনে নামার কবি সেই বর্ম পরে একাই অসংখ্য কন্ঠে গেয়ে ওঠে গান মৃত্যু নয় তার অতি কাংখিত 'মরণ' হয়ে ওঠার সমান ।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
স্মৃতির ভিতরে এক শূন্যতাও বসবাস করে যাকে আমি খুঁজে ফিরি মৃতদের কবরে কবরে শ্মশানের পরিত্যাক্ত করোটিতে বাতাসের বাঁশি কান পেতে শুনে হই সে ধ্বনির অর্থের প্রত্যাশীআজ কেউ এসেছিলো আজ কেউ চলে গেছে ফিরে বোধের ভিতরে বোধ আরো কোন বোধের গভীরে ঝিম ধরে থাকে এক মাতালের বুঁদ অনুভব বাহিরের কোলাহল শোনে না সে শূন্যতার শবসময়ের নষ্ট গন্ধ গায়ে মেখে ভিড় হেঁটে চলে --- সে নেশার কড়া মদ আমাকেও সাথী হতে বলে লুটে নিতে বলে যতো বিনষ্টির শরীরী বৈভব আজ কেউ এসেছিলো শূন্য করে দিয়ে গেছে সবভিড় আসে ভিড় যায় অবিরাম তার চলাচল পারিনা সেখানে যেতে শিখে নিতে চতুর কৌশল কেবল শূন্যতা খুঁজি শ্মশানে কি কবরে কবরে করোটির বাঁশি শুনি একা একা খিল দিয়ে ঘরে
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
হাজার কথার ঢেউ তুলি এই জীবন নদীর বাঁকে বাঁকে একটি কথাই কোথায় যেন বুকের ভিতর আটকে থাকে । ঘূর্ণিপাকের কোন অতলে বন্দী সে যে গহীন জলে হয়নি বলা হয় না বলা অনেক চোখের ব্যকুল ডাকে, একটু তুমি দৃষ্টি দিলেই দেখতে পেতে সেই কথাকে ।।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
মানবতাবাদী
চাঁদ ওঠেনি ফুল ফোটেনি, কদমতলা ফাঁকা চাঁদ ওঠাতে ফুল ফোটাতে দিসনি কেন টাকা ?ফুটতে কদম টাকা লাগে টাকার বৃষ্টি ঝরা আগে মাগনা হাতে কদম তলায় হয় না ঝাকা-নাকা ।রাখিস টাকা নাম-বেনামে যতোই জগত জুড়ে ঘোড়া হাতি নাচ নাচাবে লাথি এবং শুঁড়ে ।লুটবি শুধুই মেরে কেটে নিজের স্বার্থে নিবি বেঁটে? একই দিকে সকল সময় ঘুরবে না তো চাকা ।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
ভিতরে এক মানুষ আছে তাকেই খুঁজি কোথায় আছে কোনখানে যে ঠিক ঠিকানা মানুষটাকে ভিতর থেকে বাইরে আনা হলোই না যে - সাধ্যে এতো অল্প পুঁজিআয়না ধরে মিথ্যে দেখি - সত্যিটা কে সত্যিটা কি - কেমন লাগে দেখতে তাকেএসব কথা ভাবি শুধুই - আঁকতে গিয়ে রঙে রেখায় আঁকি আত্ম-প্রতিকৃতি তার ভিতরে নদী ও মাঠ হাজার স্মৃতি মগজ হয়ে কাগজ হয়ে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে থাকে কাদামাটির আবর্জনা জাপটে ধরে বলে - অবোধ এও বোঝো না
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
কতিপয় হাস্যকর লোক বসে বসে কথার পিঠের সাথে কথা জুড়ে জুড়ে উদ্ভট মজার খেলা দেখাবার নির্লজ্জ সাহসে মূল্যবান কাগজের শুভ্রতাকে খুঁড়ে কবরের মত শুধু গহ্বর বানিয়ে চলেছেকতিপয় হাস্যকর লোক বসে বসে সারি সারি ম্যাচের খোলসে বারুদবিহীন কাঠি ঠুকে ঠুকে - আগুন জ্বলেছে আগুন জ্বলেছে বলে কর্কশ চিৎকার করে যাচ্ছে অযথাই - আরকতিপয় হাস্যকর লোক বসে বসে বাজিকর সুলভ কৌশলে ভীষণ বুড়িয়ে যাওয়া সভ্যতার করতল ঘষে রেখাগুলো ইচ্ছেমত পাল্টে দেবে বলে তৎপর রয়েছে -- এই নিরেট সময়ে দেয়ালের ক্যালেন্ডার লাল-কালো অথবা রঙিন মুদ্রিত তারিখগুলো মুছে ফেলে ভয়ে সাদা হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রকৃতিমূলক
ওই পারে খেয়া এই পারে দেয়া মাঝ-নদী জুড়ে পাগলা বাতাস ভিজছে, এ যেন আমার মন হারাবার খেয়েলী খেলার ইচ্ছে ।।দেখে) খ্যাপা শ্রাবণের এই পাগলামী এই আমি, তবু নেই যেন আমি বুঝি না কে কারে ওপারে এপারে কোথায় ভুলিয়ে নিচ্ছে ।।চেনার ভেতরে বাইরে জানি না কোথায় যাইরে শুধু) বাদল ধারার বিরাম নাইরে নাইরে ।আমি) ভাবি নাতো আর কার সংগীতে কোন খেয়া আসে কোন পারে নিতে ভাসাতে যে পারে ওপারে এপারে সে আজ মিলিয়ে দিচ্ছে ।।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
মানবতাবাদী
।।১।। শকুনী কয় লাশের হিসেব নে এলাকাময় ।।২।। হিসেব নেবো খুনি যারা, সবারে পোশাক দেবো ।।৩।। মৃত জোনাকি মাকড়-জালে রাতে যাবে গোণা কি ।।৪।। মাইকে চড় ভোটের ধমকানি কাঁপায় ধড় ।।৫।। গোপন ছক এক পা তুলে চেয়ে শিকারী বক
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
এই ভালো - তুমি আছো তুমি হয়ে - আছো অনেকের আমিও কেমন করে আমি হয়ে আছি চেয়ে দ্যাখো আকাশ আচ্ছন্ন করা সব মেঘ ঝরে গেলে পরে আকাশ আকাশ হয়ে একা থাকে আমার মতন মেঘেরা মাটির হয় - নদী হয় - অথবা সাগর এই ভালো তুমি আছো - তুমি হয়ে - আছো অনেকেরকখনো আবার মেঘ হতে সাধ হলে চলে এসো আমার শূন্যতা ছুঁয়ে মেলে দিও আবার নিজেকে০৬ / ১০ / ২০১৭
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
মানবতাবাদী
বিধি আমায় ভিন্ন জনম দাও পশু পাখী বৃক্ষ লতা কীট পতঙ্গ যথা-তথা যা খুশী রূপ দিয়ে আমার এ রূপ কেড়ে নাও অভিশপ্ত মানব-জনম নাও-গো কেড়ে নাও ।। শিশু রাজন হত্যাকারী সবাই মানব জনমধারী মানুষ বড়ই পাপাচারী পোকা-মাকড় বানাও আমায় মেনে নেবো তাও অভিশপ্ত মানব-জনম নাও গো-কেড়ে নাও ।।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
মানবতাবাদী
ক্রসফায়ারের এক দুর্নাম শিকার হয়ে ফজর বয়াতি চিৎপাত পড়ে আছে ডোবার জঙ্গলে - শুধু তার বাম পা'টা ঝোপে বেঁধে ঊর্ধ্বমুখী ঔদ্ধত্যের লাথি হয়ে আছে কারো দিকে, এপার-ওপার ছিদ্র মগজ সাঁতার দিচ্ছে না এখন তার তর্জা কিংবা বিচারগানের কোনো ধারা-- যদি দিতো - তবে কি তা জমাট রক্তের গন্ধ শুঁকে খুঁজে পেতো কারো পাপ - এবং সে বাজিয়ে দোতারা শোনাতো তর্জার ছন্দে কার হিংস্র বুকের সিন্দুকে জমে আছে পাপ-লোভ-পোশাকি বারুদ-ক্রোধ-ঘৃণানা - এখানে গান নেই - এমনকি নেই কোনো ক্রন্দন বিলাপ ফজর আলীর মতো মৃত চোখে চেয়ে সদ্য-বিধবা সখিনা রিমান্ডের কথা শোনে - বোঝে না এ তার না-কি সময়ের পাপ
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
জুলুম তোমার সয়েই গেছে তাইতো আজো যায়নি প্রাণ বেশ তো আছি হয়ে তোমার জুলুমবাজীর গুলিস্তান । প্রতিবারের জুলুম থেকেই বুঝতে পারি যাওনি ছেড়ে তাইতো হেসেই গ্রহণ করি বুকটা ভরে তোমার দান ।।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
মানবতাবাদী
ঐ দেখা যায়, নেই তো কিছুই! কোথায় আমার গাঁ ? কানা বগী তালগাছেরও খবর রাখে না । প্রশ্ন করার - সাহস বা কার, ও বগী তুই খাস কী ? মিলবে জবাব - ঘিলুর কাবাব মুণ্ডু দিতে চাস কি ? আসবে ছুটে বগী তো নয়, হাজার খয়ের খাঁ ।পান্তা পুটির - ভগ্ন কুটীর করছে দখল অন্যে রাজধানীটার - ফুটপাতই তার ছাউনী পাতার জন্যে । কংক্রিটে সে শুয়ে খোঁজে, কোথায় মাটি মা !
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
রূপক
তালপুকুরে ডুবলো না-তো ঘটি সেই পুকুরের এমন শোভা নেমে দেখি এঁদো ডোবা কাদায় আটকে রয়ে গেলো বাম পায়েরই চটি ।।ও মন তুমি মিছেই ভাবো চটির বদল চটি পাবো কতোই চটি আসবে যাবে এমন কোটি কোটি ।।ঘটির বুলি ঘটাং ঘটাং - চটির বুলি চটাং চটাং গাইবে না আর ফটাং ফটাং ঘোলা জলের গান তালপুকুরে মাল কিছু নেই কিসের পিছুটান ।ও মন তুমি ও সব ফেলে নিজেই নদীর জলে এলে নিজেই তুমি বুঝলে ভালো, কেমন ছিলো ওটি !!২৪/ ০৯/ '১৬
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
চিন্তার আঙুলগুলো দীর্ঘ করে টেনে আনি বিষাদের ঘন অন্ধকার তারপর ডুব দিয়ে স্বপ্ন খুঁজি - অঙ্কের হিসাবে নয়, কোনো অদ্ভুত নিয়মে যেন পৃথিবীর ভরকেন্দ্রে পৌঁছে গিয়ে তার স্থিতি মেপে সটান দাঁড়াই আর কখনো কখনো আকাশে বাড়াই হাত সূর্যটাকে ঠেলে দিতে অন্য কোনো দিকে বিষাদের গহিন ভিতর থেকে উঠে আসে বিষণ্ণ ফ্যাকাশে একজোড়া চাঁদ - আর আমার দু'চোখ থেকে অব্যর্থ নিরিখে একজোড়া ছুরি ছুটে বিদ্ধ করে দু'টোকেই - রক্ত নেমে আসে হিমসাদা জোছনার - শুয়ে পড়ি, শুয়ে শুয়ে আমার পূর্ণিমা চোখ ভরে দেখি - বিষাদের অতল গভীরে ডুবে ঝিম ধরে বলি - আহ্ অনাবৃত বিষাদ আমার, তোর সীমা যত পাড়ি দিতে চাই তত বেশি ডুবে যাই তোরই ভিতরে--বুকে হেঁটে হেঁটে আসে আত্মহত্যা - উদোম শরীরে হেসে হেসে-- আমি তার আলিঙ্গনে উষ্ণ হয়ে - উষ্ণ হয়ে মরি অবশেষে
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
বেশ আছি ভালো আছি কালো মুখে বলি রোজ থাকা-টাকা নিয়ে বাপু কেন এতো করো খোঁজ? থাকাটাকে দেখা যায় - টাকাটা অদৃষ্টেই ছিলো নাতো কোনোদিন, আজো দেখি নেই নেই টেলিফোনে, মেসেজেও কে বা দ্যাখে এই মুখ ভালো আছি, বলি তাই, বলাতেই পাই সুখ। রয়েছে যে ধড়ে প্রাণ, এটাই কি কম আর না-ও যদি থাকতাম, তাতে ক্ষতি হতো কার! সান্ত্বনা একটাই, চামচামী করি নাই কোনো আমলেই কারো হাতে-পায়ে ধরি নাই কারো ত্যালা মাথা আরো তেল দিয়ে ভরি নাই তাই ভাবি, বেশ আছি, না মরেই মরি নাই ।।২৬ / ০৪ / ২০১৮
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
ছড়া
এ কি তোর কাণ্ড রে সাপুড়ে ও বাবুরাম শিং নেই চোখ আছে হা করার রোখ আছে এ কী সাপ এনেছিস? অজগর ওর নাম ।এটা খেয়ে ওটা খায় যেটা পায় গোটা খায় চিকনেরে হেলে ফেলে মেলে গ্রাস মোটা খায় চেরা জিভে ঝাণ্ডা মেলে খায় আন্ডা পিপাসাতে কাছে পেলে নাড়ী-ভুড়ি ঘোটা খায়। নেই বাছ বিচারে সে কোনটার কতো দাম ।ছোট বড় প্রাণী খায় রাজা খায় রাণী খায় মুখে পুরে ধীরে ধীরে সে তো সবখানি খায় তেড়ে মারি ডাণ্ডা ? হাত পা যে ঠাণ্ডা ! কথা দিয়ে বোঝাবো যে, সে কি কারো বাণী খায়? ভাবতেই মাথা বেয়ে দর দর ঝরে ঘাম ।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
নীতিমূলক
যা গেছে তা চলেই গেছে, ফিরবে ভাবো, না রে না অজগরে গিলতে পারে, উগলে দিতে পারে না । অজের মতো থাকলে পরে, অজগর তো হারবে না গজের মতো বিশাল হলেই, গিলতে সে আর পারবে না ।বাঘের পিঠের সাওয়ার জানে, নামলে পরে হয় কি হাল নামবে না তাই থামবে না তাই, রইবে বসে ঠিক ত্রিকাল । বাঁচতে হলে থামাও প্রথম বাঘ নামের ওই হিংস্র ত্রাস বাঘই তখন সাওয়ারটাকে কামড়ে ছিড়ে করবে গ্রাস ।নিঃশ্বাসে আর বিষের হাওয়া টনবে না কেউ, তাই কি চাও? শিকড় সমেত তাহলে সব বিষের বৃক্ষ উপড়ে দাও ।৩০ / ১১ / ২০১৮
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
রাত্রি আমার বুড়ীগঙ্গার দূষণের মত কালো নষ্ট ডিমের কুসুমের মত চাঁদ কী করে লাগবে ভালো ।।আড্ডাখানার দাগী পেয়ালার চা উষ্ণ করে না বুকে কোনো ইচ্ছা। আঁধারে একাই হামা দিয়ে তাই খুঁজি কোথাও কি নেই আলো ?। জ্বলছে নিওন কঙ্ক্রিট বনে চোখ ঝলসানো ভবনে ভবনে রমনার পাশে তবুও একটি মেয়ে আঁধারে ডুবছে - আঁধারে ডুবছে কোথাও আলো না পেয়ে। ক্লান্তি আমার ক্ষমা করে আর কে নষ্ট শ্মশানে পরিনত পার্কে? নিজেকে চিতায় মেলে দিয়ে তাই বলি এবারে আগুন জ্বালো ।।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
আমি কাল সারারাত চিৎকারের ভূগোল খুঁজেছি ব্যাকরণ থেকে আমি য্যফলাটা খুলে নিয়ে খোদনের কাজে ব্যবহার করে শেষে উৎপত্তি ব্যুৎপত্তি খুঁজে খুঁজে বাক্যগঠনের যত অনর্থ ঘটিয়ে - কবিতাকে সারা রাত ধর্ষণ করেছি - অথচ সে মৃত ছিলো চিৎকার করেনি একবার - আর তার চারপাশে পড়েছিলো বিড়ালের পাঁজরের সাদা সাদা হাড়প্রকৃতি বিজ্ঞান মতে অনায়াসে সিদ্ধান্তে এলাম প্রথম ধর্ষক আমি নই - প্রায় শতাব্দী কালের নির্যাতনে ভূগোলের বিকৃতি ঘটেছে বারে বারে কবিতাও সেই ভাবে ব্যবচ্ছেদ হয় নিত্য লাশকাটা ঘরে - নাকি সেটা ইদানীং মাংসের দোকান হয়ে তাতে কবিতার স্তন ঠোঁট চোখ উড়ু নিতম্ব যৌনাঙ্গ সব চিন্তার শলায় গেঁথে গেঁথে সারি সারি সাজিয়ে ঝুলিয়ে রাখে অথর্ব চিৎকার
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
কথা ছিলো না কি ! নগরীর ওই পারে নেমে গেলে রোদ --- আশ্চর্য বিকেল হয়ে নরম আঙুলে আমার গভীরে তুমি বাজাবে সরোদ --- কথা ছিলো না কি !!গাছের নিবিড় ছায়া ঘাসের শরীরে ছড়ায় যে ভাবে ধীরে ধীরে সে ভাবে গড়িয়ে নেমে তোমার আদর হয়ে যাবে এই বুকে শুক-শারী বোধ --- কথা ছিলো না কি ।।কথা ছিলো না কি -- তুমি আমি মিলে হয়ে যাবো সন্ধ্যার আঁচলে জ্বলা প্রথম জোনাকী কথা ছিল না কি !আঁধার নামার মতো গহন গোপনে কোথাও হারাবো দেহ-মনে, যা কিছু না বলা আছে আপন অসুখ ঠোঁটে ঠোঁটে তাই হবে নীল অনুরোধ --- কথা ছিলো না কি !!
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
মানবতাবাদী
এক এককে এক আমার দিকে দ্যাখ চাঁদাবাজির টাকায় কেমন ফুলিয়েছি ট্যাক । দুই এককে দুই কি ভাবছিস তুই কেমন করে বুক ফুলিয়ে পরের টাকা ছুঁই? তিন এককে তিন ভাবনা চিন্তাহীন নেতার হস্ত মাথার উপর আছে যতো দিন । চার এককে চার কে ধারে কার ধার এই টাকাতেই করবো শুরু ইয়াবা কারবার । পাঁচ এককে পাঁচ নেশার ঘোরে নাচ কার সাথে কি ঘটে যাবে পাবো না তার আঁচ । ছয় এককে ছয় পুলোক যখন হয় ফুটুস-ফাটাস ছুড়তে গুলি পাই না কোনো ভয় । সাত এককে সাত হত্যা-তো ডাল-ভাত বিশ্বজিতের মতো কতোই মরবে তো নির্ঘাত । আট এককে আট এতোই আমার ঠাট আমার সাথে হাত মিলিয়ে যা খুশী মার-কাট । নয় এককে নয় আমার পরিচয়? এতক্ষণেও হলো না তোর কোনোই বোধোদয় ! দশ এককে দশ সবই আমার বশ ক্ষমতাটা আছে পিছে তাই এতো হাত-যশ ।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
মানবতাবাদী
অ-য় অজগর তেড়ে আসুক যা বলতে চায়, ঝেড়ে কাশুক আ-এর আমে ভাগ দেবোনা গা পেতে আর দাগ নেবো না তাইলে কিসের ভয়? দেখেনি কি পিচ্চিগুলো দেশের মাটি দেশের ধুলো ভালোবেসে বুকের জোরে প্রাণটাকেও তুচ্ছ করে আনতে পারে জয় ? আজকে যতোই আসুক তেড়ে চোয়াল ধরেই ফেলবো ফেড়ে গিলে খাওয়ার হীন লালসা বিষের বারুদ পেটে পোষা হজম হবার নয় ।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
নীতিমূলক
এখন তোমার জন্যে ধূমপান নিষেধ - তা বেশ---- বহুকাল উপভোগ করেছো তো ধোঁয়ার আবেশ কিছু কিছু স্বাধীনতা হয়তো বা ভালো লুপ্ত হলে স্বেচ্ছায় পারোনি যেটা, আজ হৃদ-রোগের কবলে পড়ে সেটা থামিয়েছো। হৃদয়ের গেছে কি বাসনা ? নিজেকে সম্রাট ভেবে যে দু'ঠোটে পুড়িয়েছো সোনা সেই ঠোঁট সে হৃদয় কখনো কি বলে না তোমাকে শুধু মাত্র বেঁচে থাকা - এই লোভে প্রিয় বাসনাকে হত্যা করা স্বার্থপর প্রাণী তুমি - হ্যাঁচোড় প্যাঁচোড় করে আরো বড় এক মৃত্যুকেই ভেবে নিয়ে জোড় একা হয়ে, অধমের ক্লিষ্ট ক্লিব মুঢ় অপমানে বেঁচে থাকাকেই ভাবো জীবনের সর্বৎকৃষ্ট মানে
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
মানবতাবাদী
দারিদ্রকে মেরো না কেউ দরিদ্রকে মারো মারো যতো পারো ।। রাষ্ট্র-শাসন আইন কানুন বানাও এমন করে মার খেলেও দরিদ্র সব যায় না যেন মরে ডর দেখিয়ে ঘর ভেঙে দাও জমি জিরেত সব কেড়ে নাও পেটের দায়ে কাজের খোঁজে যখন হবে হন্যে তখন ওদের কাজে লাগাও রক্ত চোষার জন্যে । ভেবে দ্যাখো মারার উপায় কী কী আছে আরো মারো যতো পারো ।। সুযোগ লোভী মধ্যবিত্ত সুজন বুদ্ধিজীবী ওদের নিয়ে ভয় পেয়ো না, ওরা তো সব ক্লীব-ই । গুণ্ডাদেরে পাণ্ডাদেরে আদর করে ডাকো চাপড়িয়ে পিঠ বাহবা দাও তাদের পাশে থাকো চোরদেরে দাও বাহাদুরী ব্যাংক বীমা সব করুক চুরি দরিদ্রদের মধ্য থেকে দু'এক জনকে পাকড়ে লেলিয়ে দাও, ভাইকে মারুক তোমার আস্তিন পাকড়ে । মার না খেলে দরিদ্রদের ভরবে না পেট কারো মারো যতো পারো ।।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
মানবতাবাদী
মহামান্য আদালত --- অধীনের বিনীত নালিশ আমি যাকে চিনিও না দেখিওনি যাকে কোনো দিন সে কি করে হলো এই অধীনের বৈধ প্রতিনিধি ভৌতিক বিন্যাসে কেন চাপে এই ঘাড়ে রোজ ঋণ বাদী হতে এসে হই কি কারণে নিজেই বিবাদী কাকে টাকা দিয়ে আজ গৌরীসেন চেটে-পুটে খায় ফসল ফলানো হাত শ্রম দেয়া মুঠি থেকে খুন ফরিয়াদ এই --- যদি সদুত্তর কিছু পাওয়া যায়আমি এক হাইল্যা চাষা দিন আনা দিন খাওয়া নিদেন মজুর ভয়ে ভয়ে কথা কই --- ভয় আছে ছোট-বড় হাজার জুজুর আপনিতো অভয় দাতা নিক্তি হাতে বিদ্যমান পরম হুজুর
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
তুমি জানো ভালো করে, কর্ষণের শেষ আছে কিনা আরো ভালো জানো তুমি, কী চেয়েছো প্রেম না-কি ঘৃণা আমিতো কিছুই নই, বর্গাচাষী ক্ষেত্রের মজুর সজোরে বিঁধিয়ে ফাল চাষ করি ক্ষেত্র যত দূর তুমি জানো কতো বার ঘোরে সীতা, কি তোমার সীমা কী বীজ বোনাতে চাও কিসে বাড়ে তোমার মহিমাতুমি জানো কে তোমার কর্ষিত এ ক্ষেত্রের মালিক যে বীজ বোনাবে তাও খেয়ে যাবে সে কোন শালিক কর্ষণেই সুখ যদি সেও শুধু একা জানো তুমি আমার সুখের কথা না জানে তো না জানুক ভূমীআমারো তা নিয়ে কোনো খেদ নেই, নেই আন্দোলন যতোই শুনি না কেন উর্বরা সে ক্ষেত্রের ক্রন্দন
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
চিন্তামূলক
তোমাকে দেখিনি আলোয় ছিলাম বলে কি আঁধারে তোমার এতো রূপ ওঠে জ্বলে কি !!আলোয় কি এই আলো মিশে থাকে ? তাই দেখে ভুলি, দেখিনা তোমাকে। নিজের ভিতর তাকালেই তবে তোমার দুয়ার খোলে কি ?।এতো কাছে থাকো এতোটা নিবিড় বাঁধনে সুখে দুখে হাসি কাঁদনে এতোটা নিবিড় বাঁধনে ?তোমার এ রূপ, এ-কি ভালোবাসা ? তাই হলে যেন মেটেনা পিপাসা । রূপের অরূপ পেয়ালার নেশা দিয়েই আমার হলে কি ?।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
স্বদেশমূলক
শোনো হে বিশ্বকবি --- তোমার কলম তুলির আঁচোড়ে কোনোদিন তুমি আঁকনি যাদের ছবি যে চাষির ঘামে হয়েছে তোমার অন্ন সংস্থান যে মজুর গড়ে দিয়েছে তোমার রম্য বাসস্থান যে শ্রমিক গড়ে শহর নগর পথ-ঘাট প্রতিদিন হিসেব করেছো তাদের কাছেই তোমার কতোটা ঋণ ?।যে তাঁতিটি বসে বুনছে কাপড়, যে জেলেটি মাছ ধরে কোনোদিন তুমি যাওনি তাদের জীর্ণ মলিন ঘরে কুমোর কামার সুতার কাউকে কখনো ডাকোনি পাশে বসতে পারোনি পথের ধুলায় অথবা আলের ঘাসে ভাই বলে তুমি ডাকোনি কাউকে যারা বড়ো দীন-হীন ।।কান পেতে আছো শুনতে সে কার, সে কোন কবির বাণী হৃদয়ে তোমার বেজেছে কি কোনো পরাধীনতার গ্লানি ? কতো বিদ্রোহ কতো প্রাণ দান কতো রক্তের খেলা না দেখেই বলো কাটলো কী করে তোমার জীবনবেলা ? বিলেতি বুলেটে মৃত্যু দেখোনি - দেখোনি কি সংগিন ?।ভারত পাকিস্তান পাড়ি দিয়ে খুনেরাঙা বীর হয়ে আমরা তো এক গর্বিত জাতি স্বাধীন পতাকা বয়ে তিরিশ লক্ষ শহীদি রক্তে লেখা কবিতাটা পড়ো এই বাণীটাই সে কবির বাণী, যে সবার চেয়ে বড় তোমার বাণীও পতাকার সাথে রেখেছে সে উড্ডীন ।।১১ / ১২ / ২০১৭
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
তোমার সুখে সুখ মেনেছি বলে দুঃখ পাবার অধিকারটা যায়নি আমার চলে ।।দুঃখ আমার আমারই থাক গোপন বুকে তাকে ) আড়াল করে সুখের চারা করবো নাহয় রোপন বুকে দোষ কি বলো সেই সবুজে তোমার তৃপ্তি হলে ।।আমি যখন আমার আমি - একা দুঃখগুলোর সঙ্গে তখন দেখা, অনেক যত্ন করে তখন কাঁদি অনেক যত্নে আবার বুকে বাঁধি ।একটু আমার অভিনয়েই সুখের ছবি তাকে ) তোমার হাতে দিলেই দেখি হাসছে তোমার মুখের ছবি পড়বে কেন সেই প্রহরে আমার অশ্রু গলে !!০৪-০৫/ ১০/ ২০১৬
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
শোকমূলক
সকালের খবরের কাগজটা নিয়ে আর কারো সাথে টানাটানি হয় না, ''একটু থাম না খোকা, শিরোনামগুলো দেখি,'' এ কথা এখন কেউ কয় না । প্রতি ভোরে কাগজটা দরোজায় পড়ে থাকে চেয়ে দেখি যেই --- বড় বেশী মনে পড়ে, বাবা তোমাকেই ।।কাজে বের হতে গেলে, কাঁধে হাত রেখে, বলো না এখন তুমি, ''সাবধানে যাস,'' থমকে দাঁড়িয়ে তবু অপেক্ষা করি --- বুক ভরে জমে ওঠে গাঢ় নিঃশ্বাস । পথে যেতে সারা-পথ ভাবি আর ভাবি কেন চলে যেতে হয়, কেন তুমি নেই ।।রাতে ঘরে ফিরে দেখি --- দরোজায় এসে ''এতো দেরী হয় কেন'' -- বলছে না কেউ, থমকে দাঁড়িয়ে তবু অপেক্ষা করি --- যদি ফেরে হারানো সে সময়ের ঢেউ ! জেগে জেগে সারা রাত নীরবেই কাঁদি একা নীরবতা আর, একা আমি এই ।।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
মানবতাবাদী
লক্ষ টাকায় একটি জামা কিনে কী উল্লাসে এক বেহায়া হাসে ---- আর এক বৃদ্ধা বিবস্ত্রপ্রায়, সেই দোকানের পাশে হাত বাড়িয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে একটা টুকরো কাপড় যদি কারো দয়ায় আসে ।। নিজের গালে চড় কষিয়ে নিজেরে দেই গালি কোন দেশে তুই জন্ম নিলি কোবতে বনের মালী? কী ফলালি জনম ভরে তোর কলমের চাষে ?? মাথার উপর ঠ্যাঙের ছায়া দোলায় মহাচোরে তার গলা তো বড় গলা, পাত্তা দেয় কে তোরে?
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
মানবতাবাদী
মাঠে এখন ডিম পাড়েনা হাট্টিমাটিমটিম মহান কক্ষে মহান বচন শুনেই ধরে ঝিম। শিংদুটো ঠিক তেমনি খাড়াই আছে ডিমের মূল্য তুচ্ছ তাদের কাছে সে সব হিসেব লিখতে লাগে কাগজ হাজার রিম ।মহান কক্ষের সদস্যদের ডিম পাড়া কি সাজে একদা যে ডিম দিতো তা ভেবেই মরে লাজে। সেই ছোট কাজ এখন যাদের ঘাড়ে বুঝুক তারা বুঝুক হাড়ে হাড়ে মাঠের গরম ভাবলে এখন চোষে আইসক্রিম ।হাট্টিমাটিমটিম দু'বেলা বেগানা ডিম খেয়ে হাই তুলে কয়, করমযজ্ঞে কে বড় এর চেয়ে? ডিম যারা দেয় এখন দেশের মাঠে কঠিন রৌদ্রে রাস্তা এবং ঘাটে মহান সভায় তাদের বেলায় ভাবনাটাও হিম ।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
কোথায় এলাম তা জানি না জানি শুধু এলাম চলে তোমার ডাকে এসেছি তাই তুমিই দায়ী বেভুল হলে । পথের রেখা কোনো দিনই হয়নি আমার এঁকে রাখা চলে চলেই পথ গড়েছি, এ পথ তোমার হবে বলে ।।
মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান
প্রেমমূলক
হারিয়ে এসেছি কবে শৈশবের সেই খেলাঘর খেলা খেলা সাজ-গোজ, বউ আমি আর তুমি বর নকল কবুল বলা, মিছে বর – মিছে বধুবেশ তবুও কী সুখী-সুখী ভাব নিয়ে খেলা হতো শেষ ।।হাজার বাহানা করে পালাতাম আমি খেলা ফেলে তুমি ছাড়া বরাসনে কোনো ভাবে আর কেউ এলে তখন তুমিও তাতে মনে মনে খুশী হতে বেশ ।।ধনীর দুলালী আমি, তুমি না-কি অতি সাধারণ কিশোরী দিনেই তাই পুড়ে গেলো বিরহে এ-মন ।সেদিন পারোনি তুমি সামাজিক বাধা ভেঙে দিতে কেন আজো কাঁদি আমি, পারোনি তো তার খোঁজ নিতে সোনার খাঁচাটি ফেলে আমি খুঁজি হারানো আবেশ !!০৫/ ০১/ ২০১৯